সাহেবা পর্ব-০১

0
39

#সাহেবা
#সূচনা_পর্ব
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী

১.
‘বিয়ার রাইতেই যে মাইয়ার স্বামী ম’ইরা যায় ওই অলক্ষী মাইয়ার অ’শুভ মুখ দেখলে আমার মাইয়ার বিয়া কি শুভ হইবো?’

চোখ মুখ কুঁচকে কথাগুলো বললেন সাইরাহ্-র চাচী তুহিনা বেগম। সাইরাহ্ দাঁতে দাঁত খিঁচে মাটির দিকে চেয়ে থাকে। এক হাতে গায়ে জড়ানো সাদা শাড়ির আঁচল খুঁটছে আর পায়ের নখ দিয়ে মাটিতে খুঁটছে। তুহিনা বেগমের মেয়ে তুসির আজ বিয়ে। তুসিই সাইরাহ্ কে আসতে বলেছিলো। একমাত্র আদরের বোন হওয়ায় সাইরাহ্ অনিচ্ছা স্বত্বেও এসেছিলো। সে জানতো এখানে আসলে তার এ ধরণের কিছুই শুনতে হবে। গত ৬ মাস থেকে সে এ ধরণের কথায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবুও কোথাও একটা ব্যাথা থেকে যায়। সাইরাহ্-র ভাবনায় ছেদ পড়ে তার চাচীর ডাকে। সাইরাহ্ মাথা তুলে তাকাতেই তিনি চোখে মুখে অসম্ভব রকমের বিরক্তি ফুটিয়ে বলেন,

‘তোর কি আক্কেল জ্ঞান কিছু হইবো না রে সাইরা? তুসি তোরে ডাকছে দেইখা তোর ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা আওয়া লাগবো! তুই যে অ’লক্ষী এইডা বুঝোস না? আমার বাড়িত্তে যা তুই!’

সাইরাহ্ শুকনো ঢোক গিলে। মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলে নিচু স্বরে বলে, ‘যাইতেছি চাচী। এতোবার বলতে হবে নাহ। আর কোনো মেয়ে কখনো অলক্ষী হয় না। মেয়েরা হলো মায়ের জাত। যে মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত থাকে সেই মেয়ে জাতি, মা জাতি কখনো অলক্ষী হয় নাহ। যারা ওমন চিন্তা করে তাদের চিন্তা ভাবনা-ই অলক্ষী।’

সাইরাহ্ আর এক মুহুর্তও দাড়ালো নাহ। উল্টো ঘুরে হাঁটা লাগালো নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তুহিনা বেগম পেছন থেকে কিছু অ’ক’থ্য ভাষা ছুড়ে দিলেন। সাইরাহ্ শোনে সবই। কান ঝা ঝা করে ওঠে। গলা পাকিয়ে কান্নারা উগলে আসে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে হাঁটতে থাকে। তুহিনা বেগমের আওয়াজও ততক্ষণে কমে গেছে। সাইরাহ্ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
শহর থেকে বেশ অনেকটাই দুরে গ্রামটি। তবে একেবারে গ্রামও নই আবার একেবারে শহরও নেই। মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। গ্রাম থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই মোড়। সেখান থেকে মেইন রোড। ছোট্ট এই গ্রামের মেয়েটা সাইরাহ্। বয়স বেশি নাহ। কেবল ১৭ তে পা দিয়েছে অথচ সমাজ তাকে একঘরে করে রেখেছে। সালটা ১৯৯৫। কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজ। মেয়েদের যে স্বামী মা’রা যাওয়া কত বড় পা’প তা সমাজ তাকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দেয়। বাবা-মা যে খুব গরীব তাও নয়। গ্রামের মোড়েই সাইরাহ্-র বাবার মুদি দোকান৷ যা থেকে তাদের বেশ স্বচ্ছল ভাবেই চলে যায়। মাধ্যমিক পর্যন্ত কোনো মতে পড়ার সুযোগ হয়েছিলো। এরপর-ই বাবা মা বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দেয়। কিন্তু হায় কপাল! বিয়ের রাতেই স্বামীর ম’রা’দে’হ উদ্ধার করা হয়৷ সাইরাহ্ তখনো বউ সাজেই ছিলো। বাড়ির বাইরে স্বামীর মৃ’তদেহ ঝু’লতে দেখে জ্ঞান হারিয়েছিলো তখনই। শ্বশুরবাড়িতে আর জায়গা হয়নি। এমন অ’লক্ষী মেয়ে রাখবেই বা কে? যার সাথে বিয়ে হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাদের ছেলে মা’রা গেলো তাকে তারা রাখবে নাহ। মুখের ওপর যা তা ভাষা শুনিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো। সাইরাহ্-র বাবা মা তখন সেখানেই ছিলো। উহু তারা কিছুই বলেনি। বরং বাড়ি আসার পর সব দোষগুলো সাইরাহ্-র দিয়েছিলো। গোটা সমাজ তার দিকেই আঙুল তুলেছিলো। কেউ বোঝেওনি কোনো মেয়ে বিয়ের রাতেই বিধবা হতে চায় না। যে দিনে রঙ ঠেলে দেওয়া হয় সেদিনই কেউ রঙহীন হতে চায় না। কেউই বোঝেনি। সাইরাহ্-র ভাবনার মাঝেই চেঁচামেচির আওয়াজ পায়। আশে পাশে তাকিয়ে দেখে স্কুলের মাঠে ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে। সাইরাহ্ দ্রুত মাথায় কাপড় দিয়ে মুখটা আড়াল করে নেয়। হাঁটার গতি বাড়িয়ে কোনো রকমে স্কুল পাড় হতেই পেছন থেকে কেউ ডাকে,

‘সাইরাহ্!’

সাইরাহ্ চমকায়। যার সামনে পড়তে চায়নি সেই মানুষটাই তাকে পিছু ডাকে। বার কয়েক ঢোক গিলে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সীমান্ত ততক্ষণে কাছে চলে এসেছে। সাইরাহ্-র পাশাপাশি দাড়িয়ে বলে,

‘মুখ ঢেকেছো কেনো? রোদ লাগছে?’

সাইরাহ্ উপর নীচ মাথা নাড়ায়। সীমান্ত কপালের ঘামটুকু মুছে বলে, ‘ওদিকে কি তুসিদের বাড়ি গেছিলে?’

সাইরাহ্ এবারও জবাবে শুধু মাথা-ই নাড়ায়। নিজের মুখের ওপরের কাপড় সরায় না। সীমান্ত দু পা সামনে হেঁটে বলে, ‘আসো!’

সাইরাহ্ ব্যস্ত কন্ঠে বলে, ‘কোথায় যাবেন সীমান্ত ভাই? আপনার যেতে হবে না। আমি যেতে পারবো।’

‘আমি কি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি কিছু? এখানে রোদ লাগছে। আসো!’

সীমান্ত কথা না বাড়িয়ে হাঁটা লাগিয়েছে। সাইরাহ্ উপায় না পেয়ে পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। মনে মনে হাজারটা ভয় গিলে নিচ্ছে। রোদটুকু পেড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে আসলেই ছায়া পাওয়া যায়। সীমান্ত হাঁটার গতি কমিয়ে বলে,

‘মুখের ওপর থেকে আঁচল সরাও!’

সাইরাহ্ সরায় না। বরং আরো শক্ত করে চেপে ধরে থাকে। সীমান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাঁপা হাতটা সাইরাহ্-র দিকে এগিয়ে দিতেই সাইরাহ্ দু পা পিছিয়ে যায়। ভাঙা ভাঙা ভাবে বলে,

‘ছোঁবেন না সীমান্ত ভাই। আমাকে ছুলে, আমাকে দেখলে আপনারও ক্ষ’তি হবে। আমি যে সবার মতে অ’শুভ। আমাকে দেখলে যে মানুষের মঙ্গল হয় না।’

সীমান্ত বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা সরিয়ে নেয়। চোয়াল শক্ত হয়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলে, ‘এসব তুমি বিশ্বাস করো?’

সাইরাহ্ জবাব দেয় না। সীমান্তও আর বায়না করে নাহ। নিজের পথে হাঁটতে শুরু করে। শুধু কন্ঠস্বর উচু করে বলে, ‘তুমি বড্ড পা’ষাণ সাইরাহ্। আমাকে তখনও বোঝোনি আজও বোঝো না। তোমার হাসির ঝংকারের মাঝে আমি প্রাণ পাই এ তুমি কবে বুঝবে? তোমার টানা টানা চোখের দিকে তাকালে আমি হারিয়ে যাই। তোমার মুখটা দেখলে আমার শান্তি লাগে। তুমি বুঝলে না সাইরাহ্!’

সাইরাহ্ পেছন থেকে অপলক তাকিয়ে রইলো পাগল প্রেমিকের যাওয়ার পথে। বুকের বাম পাশ টা চিনচিনে ব্যাথা করছে। ভেতরটা খা খা করছে কিছুর অভাবে। তবুও তার ভালোবাসা বারণ। তার যে পা’প হয় ভালোবাসার কথা ভাবলে! তার যে ভালোবাসা অ’ন্যায়। সাইরাহ্ পিছু ফিরে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। মুখের কাপড় সরিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

‘আপনি শুধু উন্মাদ প্রেমিক! কিন্তু চোখের ভাষা বোঝার মতো প্রেম কেনো নেই আপনার? যার কাছে ভালোবাসা খোঁজেন তার চোখ পড়তে পারেন না কেনো সীমান্ত ভাই? আপনি কেনো বোঝেন না?’


সাইরাহ্ বাড়িতে এসে প্রথমে হাত মুখ ধুয়ে নেয়। রান্না ঘর থেকে সাইরাহ্-র মা জোড় গলায় ডাকে। সাইরাহ্ শাড়ির আচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, ‘আসি!’

তাহেরা কাজ রেখে অবাক চোখে তাকায়। বলে, ‘তুসির না আজ বিয়া! তুই ওগো বাড়ি গেছিলি ক্যা? তুসির মা তোরে ঢুকতো দিছিলো বাড়িত? কিছু কয় নাই?’

সাইরাহ্ মাথা নিচু করে নেয়৷ তাহেরা বুঝে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কাজে মন দিয়ে বলে, ‘সবই তোর কপালের দোষ! অকালে বিধবা হইয়া তোর কপালডা আরো পু’ইড়া গেছে। কাকলীগো পুকুরে হাস আছে। ডাইকা নিয়া আয় যা! আর ইট্টু পরই দেহা যাইবো হাসগুলা বেজির পেটো গেসে।’

সাইরাহ্ শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে নিয়ে কাকলীদের পুকুরের যাওয়ার পথে হাঁটা লাগায়। কাকলী সাইরাহ্-র সেই ছোট্ট বেলার সই। কাকলীর এখনো বিয়ে হয়নি। তাই সাইরাহ্ ভাবে হাস তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে একবার কাকলীর সাথে দেখা করে যাবে। সময়টা তখন আসরের পর পর। সাইরাহ্ মাথার আচল ভালো মতো টেনে নিয়ে হাঁটতে থাকে। পুকুর পাড় ধরে হেঁটে কাকলীদের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। ইট পাথর দিয়ে গড়া টিনশেডের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একবার ডাকে। পর পর দু বার ডাকতেই বাড়ির ভেতর থেকে কাকলী চিৎকার করে বলে, ‘ভেতরে আয় সাইরাহ্।’

সাইরাহ্ অস্বস্তিতে দৃষ্টি এদিক ওদিক ঘোরায়। ইদানীং কারোর বাড়িতে ঢুকতে তার ভীষণ ভয় ভয় লাগে। মানুষ যেভাবে কথার তীর ছোড়ে তাতে তার ভয় হওয়াটা বোধহয় অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কাকলী আবারও সাইরাহ্-কে বাড়ির ভেতরে যেতে বলে। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির ভেতরে পা বাড়ায় সাইরাহ্। টিনের গেইট খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই প্রথমেই নজর যায় রান্নাঘরে বসা কাকলী, কাকলীর মা, কাকলীর চাচির দিকে। কাকলীর মা হেঁসে বলেন,

‘কিগো সাইরা! বাইরে দাঁড়াইয়া আছিলা ক্যান? সরাসরি বাড়ির ভিত্রে না ঢুইকা বাহির থেইকা ডাকন লাগবো? আর কহনো যেনো এমন কাম না দেহি। আইসা বসো এইহানে!’

কাকলীর মায়ের ব্যবহারে একটু অবাকই হয় সাইরাহ্। বিয়ের পর আর কখনো সে এই বাড়িতে পা রাখেনি। কাকলীর সাথে মাঝে মাঝে বাহিরে দেখা হতো। ওখানেই কথা হতো। কাকলী সাইরাহ্-কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,

‘কিরে দাঁড়ায় আছোস কেন? বস আয়!’

সাইরাহ্ নিঃশব্দে কাকলীর পাশে বসে। কাকলীর মা তখন রুটি বেলছেন। কাকলীর কাকি সবজি কাটছেন। সাইরাহ্ এক পলক সবাইকে দেখে নেয়৷ মাথা ফিরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে বারান্দার ওপর কাকলীর দাদি বসে বসে তাসবিহ পাঠ করছেন। তিনি পুরোনো যুগের মানুষ। তিনি সাইরাহ্-কে দেখলে নাক ছিটকাবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনিও স্বাভাবিক। এটাই যেনো অস্বাভাবিক ঘটনা৷ সাইরাহ্-র হঠাৎ করেই অস্থিরতা বাড়ে। তবুও নিজেকে দমিয়ে রাখে। এর মাঝেই কাকলীর মা ফের বলেন,

‘সাইরা! কাকলীর তো বিয়া টিক কইরা ফালাইছি। তুমি আইবা নে তো?’

সাইরাহ্ জবাব দেওয়ার আগেই কাকলীর কাকি সবজি কা’টা রেখে হেঁসে ওঠে। ব্যাঙ্গ করে বলে, ‘ভাবী আপনের কি মাথা টাথা পুরাই খারাপ হইয়া গেসে? একটা বিধবা, অপয়া মাইয়ারে আপনি আপনার মাইয়ার বিয়াতে আইতে কইতাছেন কোন আক্কেলে কন তো!’

কাকলীর কাকির কথা শুনে একটুও অবাক হয় না সাইরাহ্। বরং সে অবাক হতো যদি তাকে কেউ আসা থেকে বারণ না করতো! সাইরাহ্ কাকলীর মায়ের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ হেঁসে বলে, ‘আমার তো ওসব শুভ কাজে যাওয়া মানা কাকি৷ সমস্যা নেই। কাকলীকে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি ওরে দেখে নিবোনি।’

কাকলীর মা চোখ মুখ কুঁচকালেন। মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে নিজের জা-এর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ছুডু ছুডুর মতোন থাক! তরে কইতে কইছি ওয় কি? আমি জানি না ওয় কি? বিধবা কি কেউ সাইধা হয়? কথা বারতা গুলা এট্টু হুশ কইরা কইস।’

কাকলীর কাকির মুখটা ছোট হয়ে যায়। সাইরাহ্-র জন্য তার অপমানিত হতে হয়েছে ভেবেই ক্ষণে ক্ষণে ফুঁসে ওঠে। সাইরাহ্ অবাক হয়। ভীষণ রকম অবাক হয়। তার অবাকতাকে আরো বাড়িয়ে কাকলীর মা ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠেন,

‘তুই আমার আরেক মাইয়া। তরে যদি কাকলীর বিয়ার দিন না পাইছি তাইলে মনে করিস আমার থেহে খারাপ আর কেউ অইবো না। ভালা মাইনষের মতো আগে ভাগে আইয়া পড়বি।’

কথার মাঝে কি ভীষণ অধিকারবোধ। সাইরাহ্ চোখ বন্ধ করে নেয়। কান্নাগুলো গিলে নেওয়ার চেষ্টা করে। কোনো রকমে নিজেকে সামলে বলে, ‘আচ্ছা কাকি আমি যাই৷ আম্মা খুঁজবে আবার।’

‘কিরে এখনই যাবি! আরেকটু বোস!’

কাকলীর কথায় পিছু তাকায় না সাইরাহ্। ‘নাহ রে। পরে আসবো।’ বলে বেড়িয়ে আসে। পিছু তাকায় না৷ বাড়ির বাইরে এসে চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস নেয়। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে মাথার আঁচল ঠিক ভাবে নেয়। হাঁটা শুরু করে কাকলীদের পুকুরের উদ্দেশ্যে। এসময়টা ওদিকে একদম ফাঁকা থাকে। ওদিকটাই কোনো বাড়ি নেই। শুধু বিলের পর বিল। জায়গা জমিতে ভর্তি। পুকুরের চারপাশের এক পাশ জঙ্গল। কেমন যেনো ভয় ভয় করে। সাইরাহ্ মাথা থেকে সকল চিন্তা ছুড়ে ফেলে এগিয়ে চলে পুকুরের উদ্দেশ্যে। পুকুর পাড় ধরে হাঁটতে থাকে আর একদল হাসকে ডাকতে থাকে। হাসগুলোকে ডাকতে ডাকতে সে জঙ্গলের পাশটায় চলে আসে। হঠাৎ করেই চোখ যায় তার থেকে একটু দুরে পড়ে থাকা কিছুর ওপর৷ সাইরাহ্ প্রথমে বুঝতে পারে না। কিন্তু ভালো করে খেয়াল করতেই মনে হয় পড়ে থাকা বস্তুটা কারো হাত। লাল রক্তে মেখে যাওয়া কারো হাত। আঁতকে উঠে দু পা পিছিয়ে আসে সাইরাহ্। ফাঁকা ঢোক গিলে একবার আশে পাশে তাকায়। সাহস নিয়ে দু কদম হাতটার দিকে এগোতে নিলেই ঝোপের মাঝ থেকে একটা রক্তে মাখা মুখের লোক লাফ দিয়ে বের হয়ে আসে। এবং মুখে ভিন্ন রকম একটা শব্দ করে। ভয়ে সাইরাহ্ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে। কোনো কিছু না দেখে, না ভেবে পিছু ফিরে ছুটতে থাকে। যতোটা জোড়ে দৌড়ালে লোকটা তাকে ধরতে পারবে না ঠিক ততটাই জোড়ে ছুটতে থাকে। এবড়োথেবড়ো রাস্তায় পড়তে গিয়েও পড়ে না৷ পুকুরের অংশ ছেড়ে সে বাগানে এসে পড়ে। ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তার খেয়াল নেই আশে পাশে কি আছে! একবার পিছু তাকিয়ে আরেকবার সামনে তাকিয়ে দৌড়ায়। বাগানের শেষ অংশে এসে ধাক্কা খায় একটা শক্তিশালী পেশিবহুল পুরুষের সাথে। বড় বড় দম নিয়ে মুখের দিকে তাকায়৷ পুরুষটি তার দু বাহু ততক্ষণে আগলে ধরেছে। সাইরাহ্ হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো রকমে গলা দিয়ে বের করে,

‘ওখানে! ওখানে রক্ত! মানুষ!’

বলতে বলতেই সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। সামনে দাঁড়ানো পুরুষটি তাকে আগলে নেয় নিজের প্রশস্ত বুকে। ভীষণ অস্বস্তি নিয়েও সে একবার তাকায় সাইরাহ্-র মুখপানে। শুভ্র রঙের শাড়িতে মেয়েটিকে যেনো স্নিগ্ধ লাগছে একটু বেশিই৷ উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মেয়েটি বেশি সুন্দর নাকি তার এই স্নিগ্ধ রুপটা বেশি সুন্দর?

চলবে..