#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
___
২.
সাইরাহ্-র যখন জ্ঞান ফেরে তখন প্রায় সন্ধ্যা। পিটপিট করে চোখ মেলে নিজেকে অন্য একটা জায়গায় আবিষ্কার করে বেশ অবাক হয়। আশে পাশে তাকিয়ে অচেনা মনে হলে আগে উঠে বসে। নিজের শাড়ি ঠিকঠাক করে চারপাশে চোখ বুলায়। সে এখানে কিভাবে এলো তা মাথায় আসে না। নিজের সাথে কি হয়েছিলো তা মনে পড়তেই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সেই লা’শ আর সেই রক্তে মাখা লোকটার মুখ চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে। ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে গুটিশুটি মেরে বসে। এর মাঝেই কানে আসে পুরুষালী কন্ঠ,
‘সাইরাহ্!’
কন্ঠের পুরুষকে চিনতে খুব বেশি দেড়ি হয় না সাইরাহ্-র। চট করে সামনে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নামে। শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে মুখ ঢাকে। সীমান্ত আহত কন্ঠে বলে,
‘তুমি আজও আমার থেকে লুকাবে সাইরাহ্? আমি তো তোমাকে একটু আগেও দেখেছি। তোমার সেই মায়াময় মুখটা দেখে আমি আমার এতোদিনের তৃষ্ণা নিবারণ করেছি।’
সাইরাহ্ শুকনো ঢোক গিলে। ঢেকে রাখা মুখের আঁচল শক্ত করে ধরে বলে, ‘কাজটা আপনি ঠিক করেননি সীমান্ত ভাই। আপনাকে আমি আগেও নিষেধ করেছিলাম। তবুও কেনো দেখেছেন মুখ?’
‘তুমি কুসংস্কার মানলেও আমি মানি না। আমি ভালোবাসি তোমায়। তোমার মুখ আমার কাছে অপয়া, অলক্ষী নয়। শান্তি, প্রশান্তি আর মুগ্ধতার জায়গা।’
সাইরাহ্ চোখ বন্ধ করে নেয়। এই মানুষটির কথার সঙ্গে সে হয়তো কোনোকালেই পেড়ে উঠবে না। তাই যথাসম্ভব কথাটুকু এড়িয়ে গিয়ে বলে, ‘আমি এখানে এলাম কেমন করে? কোন জায়গা এটা?’
সীমান্ত জবাব দেওয়ার আগেই পেছন থেকে আরো এক গম্ভীর পুরুষালী কন্ঠে কেউ বলে ওঠে, ‘আমি আনছি তোরে সাহেবা।’
সাইরাহ্ আর সীমান্ত একসাথে পিছনে তাকায়। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে সাইরাহ্-র ভ্রু আপনা আপনি কুঁচকে যায়। বিড়বিড় করে বলে, ‘আল্লাহ! দুনিয়াতে কি আর মানুষ ছিলো না? শেষ মেশ এই আধাপা’গল লোককেই পাইলেন!’
সাইরাহ্-র তথাকথিত আ’ধা’পা’গল লোকটি এগিয়ে আসে। সীমান্তের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সীমান্তের কাঁধে হাত রাখে। বাম হাতে গাল চুলকে বাম ভ্রু খানিকটা উঁচু করে বলে,
‘ঢং করে আবার মুখের ওপর কাপড় দিছিস ক্যান? তোর মুখ দেখে কি কেউ তোরে খাইয়ে ফেলবে?’
সাইরাহ্ জবাব দেয় না। সে বরাবর এই লোকের থেকে অন্তত ১০০ হাত দুরে থাকার চেষ্টা করে। সুস্থ মানুষকে কিছু বুঝিয়ে লাভ আছে কিন্তু এমন আ’ধা’পা’গলকে কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই৷ নিজের ভাবনায় নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সীমান্ত বলে,
‘বুঝলি সাহিত্য! ওর মুখ দেখলে নাকি মানুষের অ’মঙ্গল হয় তাই মুখ ঢেকে রাখছে।’
সাহিত্য মুখ বাকায়। দুম করে বিছানার ওপর বসতে বসতে বলে, ‘আজীবন তো দুই বেনী ঝুলিয়ে এই মুখ দেখিয়েই বেড়িয়েছিস তার বেলায় কারো অ’মঙ্গল হয়নি? আর হঠাৎ করে এখন হয়ে যাবে!’
‘সীমান্ত ভাই! আমি বাড়ি যাবো। আম্মা চিন্তা করতেছে আমার জন্য।’
‘তো তোরে ধইরা রাখছে কে? দরজা দেখিস না! নাকি কা’না টা’না হয়ে গেছিস?’
সাইরাহ্ কটমট করে ওঠে। চুপ থাকা দায় হয়ে পড়ে। লোকটাকে বলার সুযোগ দিলে সে বলতেই থাকে। ভালো, মন্দ যা মুখে আসে তাই বলে, মুখে আটকায় না কিছুই। তাই সে নিজের মুখের সামনে রাখা কাপড় টেনে আরো একটু নিচে নামায়৷ তারপর দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে,
‘আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবই ভালো আছে৷ একদম সুস্থ। আপনার উচিত মাথার ডাক্তার দেখানো। শুনেছি শহরে অনেক ভালো ডাক্তার আছে।’
সাহিত্য এক লাফে উঠে দাঁড়ায়৷ সীমান্ত হেঁসে ওঠে। বলে, ‘একমাত্র এই মেয়েটাই তোকে বলতে পারে যে ‘তুই পা’গল।’ ডাক্তার দেখা ভাই।’
বলেই ফের হাসতে শুরু করে। সাহিত্য দরজার দিকে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। এই সাহেবার এতো সাহস! যে তাকে পা’গল বলে! একে একটা শিক্ষা না দিলে হচ্ছে না। সাহিত্য ছুটে ঘর থেকে বের হয়৷ সাইরাহ্ তখন উঠোনে চলে এসেছে। বাড়িটা গ্রাম প্রধানের। এ বাড়িতে সাইরাহ্-র আসা একদমই মানা। কিন্তু অ’প’মা”ন যেখানে মুখিয়ে থাকে ভাগ্য তাকে সেখানে টেনে নিয়ে যায়। আজও তার ব্যাতিক্রম হলো না৷ প্রধান গিন্নি তাকে দেখা মাত্রই হই হই করে ওঠে। বারান্দা থেকে জোড় গলায় বলতে থাকে,
‘ওই মাইয়া! দাঁড়া ওইহানে।’
মুখে কাপড় থাকায় মহিলা তাকে প্রথমে চেনে না। কিন্তু সাদা শাড়ি পড়ায় আন্দাজ করে নেয় কে হতে পারে! কাছে এসে সাইরাহ্-র মুখের কাপড় না সরিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ক্যাডা তুই? দেইখা তো মনে হইতেছে কোনো বিধেবা! তা বিধবাগো যে এই বাড়িত আওন মানা, এইডা জানোস না?’
সাইরাহ্ ঢোক গিলে। শক্ত কিছুর শোনার জন্য শক্ত হয়। এর মাঝেই পেছন থেকে সাহিত্য বলে ওঠে, ‘ওইটা সাহেবা মামিজান।’
প্রধানের গিন্নি বুঝে ওঠে না। উল্টো শুধায়, ‘কে?’
সাহিত্য নিজের কথা সংশোধন করে বলে, ‘সাইরাহ্।’
সাইরাহ্-র নাম শোনার সাথে সাথে তার মাথায় হাত। হায় হায় করে ওঠেন। কাজের মেয়ে জরিনাকে জোড় গলায় ডেকে শুধান, ‘এ্যাই জরিনা! জরিনা! এই বিধেবা মাইয়া কেমনে ঢুকসে বাড়িত? তুই কি চোখ কফালে উডাইয়া ঘুরোস? হায় হায় গো! আমার বাড়িডায় অপয়ার ছাঁয়া পইড়া গেলো।’
সাইরাহ্-র চোখের কোণ জ্বা’লা করে ওঠে। হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে শাড়ি। সাহিত্য বারান্দার পিলারের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কাহিনী দেখতেছে। কর্ত্রীর ডাকে ছুটে আসে জরিনা। মাথা নত করে বলে,
‘আম্মা আমি তো জানি না হেয় কহন আইছে! জানলে তো আটকাইতাম।’
মহিলা ভ’য়ং’কর দৃষ্টিতে তাকান সাইরাহ-র দিকে৷ মুখ ঝামটা দিয়ে বলে ওঠেন,
‘এই বিধেবা অপয়া ডা বাড়ি থেইকে বাইর হইয়া গেলে বাড়ির কোণে কোণে ধুইয়া মুইছা ফকফকা কইরবি জরিনা। কতায় আছে অলক্ষীর মুখ দেকাও পাপ সেইখেনে আমার বাড়িতে, আমারই ঘরে থাইকা যায়তেসে! ওর পাপ লাইগা গেসে না! আল্লাহ আমাগো ওপর রহম করুক। ওর অপয়া ছায়াডা আমাগো ওপোরে জানি না পড়ে!’
জরিনা দাঁড়িয়ে কোনো রকম উপর-নীচ মাথা নাড়ায়। প্রধানের গিন্নির কথা গুলো বাড়ির সবাই শুনলো। সাইরাহ্ বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। কতজনের মুখের ওপর জবাব দেওয়া যায়! তার ওপর প্রধানের গিন্নির মুখের ওপর কিছু বলা মানে তার পরিবারসহ তাকে একঘরে করে দেওয়া হবে। তবে এই অপমান, এই কষ্টগুলো যে গিলে নেওয়াও দায়। কিছু বলবে না ভেবেও ফট করে বলে বসে,
‘এভাবে বলবেন না কাকি যেনো মনে হয় আমার স্বামী মা’রা যায়নি বরং আমিই তাকে মে’রে ফেলেছি! কেউ সাধ করে বিধবা হয় না। মেয়েরা কখনো অ’লক্ষী হয় না। যদি হতো তাহলে পৃথিবী কবেই ধ্বংস হয়ে যেতো। আর আমি আপনার বাড়িতে ঘুরতে কিংবা ইচ্ছে করে আসিনি। সাহিত্য ভাই এনেছে তাই যা বলার উনাকেই বলুন!’
প্রধানের স্ত্রী ফুঁসে ওঠেন। কেবলই তেড়ে যাবে এমন সময় সাহিত্য গটগট করে হেঁটে সাইরাহ্-র সামনে যেতে যেতে বলে, ‘আমি যখন তোরে আনছি তখন আমিই তোরে বের করতেছি চল!’
বলেই সাইরাহ্-র হাত ধরে টেনে সদর দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যায়। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেছে যে উপস্থিত সবাই অবাক। কি থেকে কি হলো কেউই বুঝে ওঠে না। নিজের অবাকতা কাটে ছেলের কথায়। সীমান্ত বিরক্তি নিয়ে বলে,
‘আম্মা! সবসময় সাইরাহ্-কে অপ’মান করাটা কি দরকার? ওকে বার বার অ’লক্ষী, অ’পয়া বলে কি পান আপনারা? ‘ও’ তো রক্তে মাং’সে গড়া মানুষ তাই না?’
সীমান্তের কথা ক্ষে’পে যান প্রধানের স্ত্রী। হায় হায় করে উঠে নিজের মতো কয়েকটা অ’ভি”শা’প ছোড়েন সাইরাহ্-র দিকে। নিজের কপাল চাপড়ে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন,
‘ওই মাইয়ার জন্য তুই তোর মায়ের লগে এমনে কথা কইলি? ওই মু’খ’পু’ড়ি মাইয়া আমার বাড়িত ঢুইকাই সংসারে আ’গুন ধরাইয়া দিয়া গেলো? তোর এহন মায়ের থেইকা ওই মাইয়ার লাইগা দরদ লাগতাছে!’
বলেই মুখে আঁচল গুজে কাঁদতে শুরু করেন। কান্না তো না কেবল শব্দ। সীমান্ত প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকায়। প্রধানের স্ত্রী সাথে সাথেই আবার উঠে দাঁড়ায়। কথার সুর পাল্টে বলে,
‘আইজ যা কইছোস তা তুই কইছোস! খবরদার ওই মাইয়ার লেইগা কোনো দরদ রাকবি না।’
সীমান্ত কোনো কথা বলে না। চুপচাপ চলে যায়। যে যায়-ই বলুক সে কখনোই সাইরাহ্-র মায়া ছাড়তে পারবে না। এবার পৃথিবী এদিক ওদিক হয়ে গেলেও সে ছাড়বে না সাইরাহ্-কে।
–
প্রধানের বাড়ি থেকে বের হয়ে সাহিত্য হাত ছেড়ে দেয়। সাইরাহ্ হা করে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। কিছুক্ষণের জন্য তার মুখের ভাষা-ই হারিয়ে যায়। সাহিত্য দু হাত পকেটে ঢুকিয়ে ঘাড় এদিক ওদিক ফিরায়। তারপর বলে,
‘তোর তো দেখা যায় মুখে বুলি ফুটে গেছে রে সাহেবা! বাহ বাহ।’
সাইরাহ্ সেসব না শুনে অবাক কন্ঠে বলে, ‘আপনার লজ্জা লাগে না সাহিত্য ভাই একটা পরনারীর হাত ধরতে?’
সাহিত্যর কপালে ভাজ পড়ে৷ ঘাড় বাকিয়ে কুঁচকানো মুখে তাকায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে বলে, ‘তুই যখন আইসা আমার বুকের ওপর পড়ছিলি তখন লজ্জা লাগে নাই তোর? এখন আমি হাত ধরছি দেখে আমার লজ্জা লাগবে? তুই আমার জন্য পরনারী হইলে আমি তোর জন্য কি? জামাই?’
সাইরাহ্ দাঁড়িয়ে পড়ে৷ এই লোকের এসব বেপরোয়া কথা বার্তা তার একদম পছন্দ না। এই লোকটাকেই আগা গোড়া তার পছন্দ না। সারাদিন কেবল দলবল নিয়ে একে ওকে মে’রে বেড়াবে, বেপরোয়া ভাবে চলাফেরা করবে আর ঝামেলা করে বেড়াবে৷ এছাড়া আর কোনো কাজ নেই তার। এরওপর কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও সাহিত্য সাইরাহ্-কে কখনোই তুই ছাড়া তুমি বলে ডাকে না। যা আরো বেশি বিরক্তিকর মনে হয় তার কাছে। ফোঁস করে শ্বাস নেয়। সাইরাহ্-কে দাড়াতে দেখে সাহিত্য টিটকারি মে’রে বলে,
‘সত্যি সত্যি জামাই বানানোর জন্য কি দাঁড়াইলি নাকি?’
সাইরাহ্ বুঝে উঠে না এই লোকটার সাথে তার এতো কিসের কথা! সাইরাহ্ বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘আপনি আমার জন্য পরপুরুষ না? দয়া করে নিজের রাস্তা দেখেন। আমাকে ক্ষমা দেন। আমার পথে আমি যেতে পারবো৷ নিজের কাজে যান।’
‘তো আমি কি সারাজীবন তোর শাড়ির আঁচলের নিচে থাকবো নাকি? আশ্চর্য!’
‘আপনি কি সোজা কথা সোজা ভাবে নিতে পারেন না?’
‘না।’
রাগে দুঃখে সাইরাহ্-র মন চায় ঠা’স করে একটা থা’প্প’ড় দিতে। কিন্তু উপায় নেই। গটগট করে হাঁটা লাগায়। পেছন থেকে সাহিত্যও হাঁটা শুরু করে। নিজেদের মাঝে খানিকটা দূরত্ব রেখে সে পিছু পিছু হাঁটে। সাইরাহ্ জোড়ে হাঁটা সত্বেও সাহিত্যের মনে হয় সে ধীরে ধীরে হেলেদুলে হাঁটছে। তাই চেঁচিয়ে বলে,
‘কচ্ছপের মতো না হেঁটে জোড়ে জোড়ে হাঁট। আমার এতো আস্তে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।’
‘আপনাকে কি আমি বলছি আমার পিছু পিছু আসেন? আসতেছেন কেন?’
‘তুই তো দিন দুপুরে র’ক্ত, ভুত দেখিস। তাই এগিয়ে দিচ্ছি যেনো ভয় না পাস!’
সাইরাহ্ হাঁটা থামিয়ে দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখনকার ঘটনা। গায়ে কাটা দেয়। সাহিত্য কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। সাইরাহ্ বড় বড় শ্বাস নিয়ে ভীতু চোখে তাকায়। সাহিত্য ভ্রু নাচিয়ে শুধায়, ‘ভয় পাইছিস?’
সাইরাহ্ জবাব দেয় না। সাহিত্য হাঁটতে শুরু করে৷ এক আঙুল দিয়ে সাইরাহ্-র শাড়ির আঁচল টেনে বলে, ‘আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ কোনো ভুত তোর কাছে আসবে না। ভুতদের গুরু আমি। ভয় পায় আমারে দেখলে।’
সাইরাহ্ চোখ মুখ কুঁচকায়। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে বলে, ‘যেদিন ভুত এসে ঘাড়ের ওপর বসে ঘাড় মটকে দিবে সেদিন বুঝবেন কে গুরু আর কে শিষ্য!’
সাহিত্য শুনতে পায় কি না বোঝা যায় না। সে তার মতো হেলেদুলে হাঁটছে। সাইরাহ্ একবার নিজের শাড়ির আঁচলের দিকে তাকিয়ে আরেকবার তাকায় সাহিত্যের মুখের দিকে। নিজের শাড়ির আঁচল টেনে বলে,
‘আমার ঘোমটা সরে যাচ্ছে সাহিত্য ভাই। আঁচল টা ছাড়েন!’
সাহিত্য আঁচল আঙুলে পেঁচিয়েছিলো তাই একটা একটা করে প্যাঁচ খুলতে খুলতে বলে, ‘তো তোরে ঘোমটা দিতে কে বলছে?’
‘আপনাকে আমার শাড়ির আঁচল ধরতে কে বলছে? গ্রামের কেউ দেখলে জানেন কি হবে?’
সাহিত্য মুখটা বাচ্চাদের মতো করে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে বলে, ‘কি হবে রে?’
সাইরাহ্ টান দিয়ে আঁচল ছাড়িয়ে নেয়। কটমট করতে করতে বলে, ‘আপনার কিছু না হইলেও আমার নামে আরেকটা ক’ল’ঙ্ক ছড়াবে।’
সাহিত্য শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। সাইরাহ্ সে দৃষ্টি উপেক্ষা করে আপনমনে হাঁটতে থাকে। বাড়ির কিছুটা দুরে এসে সাহিত্য দাঁড়িয়ে যায়। সে আর এগোয় না। সাইরাহ্ থেমে একবার পিছে তাকিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। পেছন থেকে ডাকে সাহিত্য, ‘সাহেবা!’
সাইরাহ্ তাকায়। সাহিত্য দু’পা এগিয়ে এসে সামনাসামনি দাঁড়ায়। মুখের ওপর ধরে রাখা আঁচলের ভেতর খুব সুক্ষ্ম ভাবে খোঁজে সপ্তদশীর চোখ। পায় কি না বোঝা যায় না তবে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
”বিধবা হওয়াটা তোর অপরাধ না। কোনো নারী শখ করে বিধবা হয় না। তুই যত চুপ করে শুনবি, যত ওদের শোনাতে দিবি তত কোনঠাসা হয়ে যাবি৷ ওরা কি বলবে ভেবে নিজের ওপর কখনো অ’ন্যায় করিস না। কারোর অধিকার নাই তোকে অ’পয়া, অ’লক্ষী বলার। প্রতিবাদটা তোর নিজেরই করতে হবে।’
সাইরাহ্ অবাক চোখে তাকায়। এই লোকটা তাকে এসব বলছে? আসলেই? কথাগুলো বার কয়েক নিজেই আওড়ায়। তাচ্ছিল্য করে জবাব দেয়, ‘ক’জনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো? কার কার বিরুদ্ধে করবো? নিজের ঘরে কেমন করে প্রতিবাদ করবো? জানেন তো! একটা বয়স পরে মেয়েরা বাবা-মায়ের ঘাড়ে বোঝা হয়ে যায়! সেখানে একটা বিধবা মেয়েকে ঘরে রাখা কত বড় একটা বোঝা টানা! বোঝেন? নিজের ঘরেই যখন শুনতে হয় আমি অপয়া, অলক্ষী! যখন ২য় বিয়ের জন্য দেখতে এসেও মানা করে দেয় বিধবা বলে তখন যে যে কথা শুনতে হয় ওগুলো না হয় মুখেই না আনলাম। এবার বলেন কার কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো?’
সাহিত্য জবাব দেয় না। দিতে পারে না। শুধু শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সাইরাহ্ পিছু ঘুরে চলে যায়। আর একটিবারও পিছু ফিরে তাকায় না। চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত সাহিত্য নড়ে না নিজ জায়গা ছেড়ে। ঠায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয় মেয়েটির যাওয়ার পানে।
চলবে..