সাহেবা পর্ব-০৩

0
37

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
___

৩.
সাইরাহ্ যখন বাড়িতে পা রাখে তখন আযান পড়ছে চারপাশে। সাইরাহ্-কে বাড়িতে ঢুকতে দেখেই বুবু’ বলে ছুটে আসে সাইরাহ্-র ছোট ভাই সোহেল। সোহেলের বয়স ১১ বছর। সাইরাহ্ কোনো জবাব দেওয়ার আগেই বারান্দায় বসে থাকা তার দাদী খ্যাক করে উঠলেন। চমকে ওঠে সাইরাহ্। মহিলা নিজের বাজখাঁই কন্ঠ দ্বারা আক্রমণ করে বললেন,

‘নবাবজাদি কোন জমিদারি করতে গেছেলেন? সেই বিক্কেল ব্যালা বাড়িত্তে বাড়াইয়া তুই এহন আইলি! কোন নাগরের লগে ন’ষ্টি ফ’ষ্টি করতো গেসিলি?’

মহিলা নিজের মতো আরো যা তা বলতে থাকেন। সামনে যে একটা ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তা বোধহয় তার মাথাতেই নেই। সাইরাহ্-র কান ঝা ঝা করে ওঠে। কোনো রকমে সোহেলের কান চাপা দিয়ে বলে,

‘দোহাই দাদী! নিজের ভাষাটা সংযত করেন। সোহেল আছে এখানে।’

দাদী মুখ বাঁকালেন। রান্না ঘরের সামনে থেকে তাহেরা দেখলেন সব। এগিয়ে আসলেন না। তার মেয়েটা বিধবা হয়ে যে কত বড় অ’ন্যায় করেছে তা তিনি প্রতি মুহুর্তে টের পান। তিনি জানেন তার মেয়েটা ভাবে তিনি তাকে পছন্দ করেন না। সে তো মা। সে নিজর সন্তানকে অপছন্দ করবে কেমন করে? কিন্তু নিজের শ্বাশুড়ি আর স্বামীর মুখের ওপর কিছু বলার সাহস তার নেই। নয়তো তার আর মেয়ের এই বাড়িতে জায়গা হবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি এগিয়ে আসলেন। সাইরাহ্ ততক্ষণে ঘরের ভেতর চলে গেছে৷ সোহেলকে সামনে বসিয়ে সাইরাহ্ ঘরের এক কোণে বসে আছে। বাহির থেকে তখনো দাদী চেঁচিয়ে যাচ্ছেন। তাহেরা এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে পাকা মেঝেতে বসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলেন,

‘কই গেছিলি আম্মা? তোরে যে কইলাম হাস তাড়াইয়া আনতো! না আইনা কই চইলা গেছিলি? কহন থেকে খুঁজতাছি।’

সাইরাহ্ কিছু বলে না। তবে সেই পুকুর পাড়ের ঘটনাটি মনে পড়তেই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। তাহেরা হঠাৎ মেয়ের পরিবর্তনে একটু ঘাবড়ে যায়। সাইরাহ্ এগিয়ে মায়ের কোলের মধ্যে চলে যায়। গুটিসুটি মে’রে বসে। সেই মুহুর্তেই বাহির থেকে সাইরাহ্ বাবা সবুর মিয়া ডাকতে থাকে। তাহেরা মেয়েকে ছেড়ে কোনো রকম দৌড়ে বের হয়। সবুর মিয়া রক্তলাল চক্ষু নিয়ে চেঁচিয়ে বলে,

‘তোর অপয়া মাইয়াডা কই? বাইর কর ঘরেত্তে। ওয় কি ভাবসে আমারে শান্তি মতো বাঁচতে দিবো না? দুইডা খাইয়া পইড়া বাঁইচা আছি এইডার ওর সহ্য হইতেসে না?’

তাহেরা আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করে, ‘হয়সে ডা কি? কইবেন তো! মাইয়াডার শরীল ভালা না৷ এমনে কইয়েন না। মাইয়াডা শুনলো কষ্ট পাইবো।’

বারান্দা থেকে সাইরাহ্-র দাদী চেচিয়ে বললেন, ‘শরীল ভালা না এর চাইয়া মরতো পারে না? ওয় মরলে তো আমাগোও ঝামেলার ল্যাটা চুইকা যায়।’

সাইরাহ্ ঘরের ভেতর থেকে সবটা শুনে বেড়িয়ে আসে। সবুর মিয়া তেড়ে যেতে নিলে তাহেরা কোনো মতে আটকায়। কিন্তু সবুর মিয়া সেই আটকানো না মেনে উল্টে তাহেরাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। তাহেরা ছিটকে পড়ে যায়। সবুর মিয়া সরাসরি সাইরাহ্-র কাছে গিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। চুলের গোছা ধরে টেনে এনে বাহিরে ফেলে অ’শ্রাব্য ভাষায় গালি দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

‘লজ্জা শরম কি বাজারে বেইচা খায়ছোস? কোন পোলার কোলে উইঠা তুই প্রধানের বাড়ি গেছোস? কোন সাহসে তুই প্রধানের বাড়িত গিয়া তাগো তোর পোড়া মুখ দেখাইয়া আইছোস? তোর জন্য আমাগো যত জ্বালা। স্বামী যহন মরসে তহন তুইও মরতে পারোস নাই? তোরে দেখলেই আমার মা’ইরা ফালাইতে মন চায়। এ্যাই তাহেরা! আজ তোর মাইয়ার খাওন বন্ধ। ওয় যদি খাওয়ার পায় তাইলে তোরে আমি বাড়ি ছাড়া করমু।’

সবুর মিয়া গটগট করে ঘরে চলে যায়। সাইরাহ্ পড়ে গিয়ে যথেষ্ট ব্যাথা পেয়েছিলো। গালটা টনটন করছে। তাহেরা ছুটে এসে মেয়েকে বুকে আগলে নেয়। সাইরাহ্-র কোনো হেলদোল নেই। সে এই ৬ মাসে এর থেকেও বাজে ব্যবহার সহ্য করেছে৷ এর থেকেও বড় বড় আঘাত সহ্য করেছে৷ তার কষ্ট হয় না। আফসোস লাগে। ক্যান সে বিধবা হইলো? ক্যান তার স্বামীরেই মরতে হইলো? ক্যান তার বাপ মা-ই তারে বুঝলো না। ক্যান? ক্যান? ক্যান? জবাব নেই। তাহেরার সাথে সাথে সোহেলও আসে৷ নিজের বুবুর কাছে বসে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

‘তুমি ব্যাথা পাইছো বুবু? থাক কষ্ট পাইয়ো না। আব্বা একটুও ভালা না। আসো আমি তোমার ব্যাথায় হাত বুলায়া দেই৷ দেখবা ব্যাথা ম্যাজিকের মতো পালাইয়া গেছে। বুবু তুমি আমার ভাত ভাগ কইরা খাইয়ো। আচ্ছা?’

সাইরাহ্ কষ্ট হজম করতে পারলেও এই ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো হজম করতেই তার ভীষন কষ্ট হয়। তাহেরা নিঃশব্দে কেঁদে চলে। সোহেলকে বুকে আঁকড়ে ধরে সাইরাহ্ বলে,

‘আচ্ছা আম্মা! আমি যদি সত্যিই মইরা যাই তাইলে কি সব ঝামেলা মিটে যাবে? আমি কি সত্যিই এতোটা অলক্ষী?’

তাহেরা জবাব দিতে পারে না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সমানে কেঁদে চলে। আহা ভাগ্য! তার এতো মায়াময় মেয়েটারই কেন এমন হইলো?

সেই রাতে আর খেলো না সাইরাহ্। এতো কিছুর পর পেটে যেনো গেলো না খাবারগুলো। রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। ভয় এবং ব্যাথার সংমিশ্রণে সেই জ্বর স্বাভাবিক তাপমাত্রা ছাড়ালো। সারা রাত আর ঘুম হলো না। জ্বরে পুরো শরীর জ্বলতে শুরু করেছে। মধ্য রাতে বাহিরে কিছুর শব্দ পেয়ে উঠে বসে সাইরাহ্। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকতেই একটা মেয়ের আবছা আর্তনাদ কানে আসে। চট করে দাঁড়িয়ে ঘরের জানালা খুলে বাহিরে নজর মেলতেই সাইরাহ্-র আত্মা কেঁপে ওঠে। তার থেকে কিছুটা দুরে একটা মেয়ের লাশ ঝুলছে আম গাছের সাথে। ভয়ে সাথে সাথে জানালা বন্ধ করে দেয় সাইরাহ্। গায়ে ঘাম দেয় হঠাৎ করেই৷ ছোট্ট চৌকিতে ছুটে গিয়ে শুয়ে পড়ে। কাথা দিয়ে মাথা ঢেকে দোয়া পড়তে থাকে। কাঁপতে থাকে অনবরত। এটা কি দেখলো সে? তার স্বপ্ন নাকি সত্যি ছিলো তা বুঝে পেলো না। জ্বরের ঘোরে ভুল দেখেছে ভেবে মনের ভয় কাটাতে চায়। কিন্তু সে ভয় না কেটে আরো জ্বর ঝেপে আসে।


পরের দিন সকালে সাইরাহ্-দের বাড়ির পেছনে সত্যি সত্যি গাছে ঝুলন্ত এক মেয়ের লা’শ পাওয়া যায়৷ সাইরাহ্ তখন জ্বরের ঘোরে পড়ে আছে। তাহেরা সকাল সকাল সবার চিৎকার চেচামেচি শুনে বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখে এই অবস্থা। সবাই প্রধানকে খবর দিলে প্রধানসহ সাহিত্য আর সীমান্তও আসে। সাহিত্য মেয়েটার আশেপাশে ঘুরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। আশে পাশে ভালো করে দেখে প্রধানকে বলে,

‘মামা সাহেব! পুলিশরে খবর দেন।’

‘পুলিশরে ক্যান জানান লাগবো সাহিত্য? এই মাইয়ার লা’শ দেখলেই তো বোঝা যায়তেছে এইডা আ’ত্ম’হ’ত্যা।’

‘মামা সাহেব আমরা খালি চোখে যা দেখি এইটা সত্য হইতেও পারে আবার না-ও পারে। তাছাড়া আ’ত্ম’হ’ত্যা হোক বা খু’ন এইডা তো পুলিশ কেস-ই।’

প্রধান বোধহয় একটু বেজার হলেন সাহিত্যের ওপর। তবুও তিনি সাহিত্যের কথা অমান্য না করে পুলিশকে খবর দিলেন। সাহিত্য খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে মেয়েটির লাশ। সীমান্ত সামান্য এগিয়ে এসে সাহিত্যের কানের দিকে মুখ নিয়ে যায়। ফিসফিস করে বলে,

‘এসব ঝামেলা করার কোনো দরকার আছে সাহিত্য? অযথা পুলিশকে কেনো আবার খবর দেওয়ালি?’

সাহিত্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ‘তাতে তুই এতো অস্থির হইতেছিস ক্যান?’

সীমান্ত থতমত খেয়ে বলে, ‘আমি অস্থির হবো কেনো? এটা গ্রামের ব্যাপার। তাছাড়া দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা আত্মহত্যা। অযথা পুলিশে জড়িয়ে নিজেদের ঝামেলা বাড়ানোর দরকার আছে?’

সাহিত্য জবাব দিলো না। সে জানে কোনটাতে ঝামেলা বাড়বে আর কোনটাতে কি হবে! সাহিত্য চোখ ফিরিয়ে পাশে তাকাতেই সাইরাহ্-র ঘরের জানালা দেখতে পায়। সীমান্তকে কাছে ডেকে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,

‘ওইটা সাহেবার ঘরের জানালা না?’

‘হ্যাঁ। কেন? কি হইছে? ‘

‘চল একটু ঘুইরা আসি।’

সীমান্ত অবাক হয়ে বলে, ‘কোথায়?’

‘তোর না হওয়া শ্বশুরবাড়িতে।’

সীমান্ত ড্যাবড্যাব করে তাকায় সাহিত্যের দিকে। সাহিত্য সীমান্তের কাঁধে হাত রেখে এগোনো শুরু করে। সীমান্ত বোঝে না সাহিত্য চাচ্ছে টা কি! প্রশ্ন করে, ‘ওদের বাড়ি কেনো যাবি? কি দরকার?’

‘এমনিই। দেখে আসি চল!’

‘যাওয়াটা ঠিক হবে না সাহিত্য। এমনিতেই সাইরাহ্-কে অনেক কথা শুনতে হয়।’

‘তো আমরা কি সাহেবার সাথে তার বাড়িতে প্রেমালাপ করতে যাচ্ছি নাকি?’

সীমান্ত বোঝে না সাহিত্যের মতলব। জানে কথা এগিয়ে লাভ নেই। তাই চুপচাপ সাহিত্যের সাথে এগোতে থাকে৷ পেছন থেকে হঠাৎ মেয়েলী স্বরে ভেসে আসে, ‘ভাইজান!’

সাহিত্য ফিরে তাকায়। তাদের দিকে নাজিরাকে ছুটে আসতে দেখে কপাল কুঁচকায়। এই সময় এই মেয়ে এখানে কেন? নাজিরা কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘কোথায় যাইতেছেন?’

প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সাহিত্য প্রশ্ন করে, ‘তুই এখানে কেন? আম্মা তোরে আসতে দিলো?’

‘বড় আম্মা জানে না।’

‘তুই লুকাইয়া আসছিস?’

নাজিরা জবাব দেয় না। সাহিত্য ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সীমান্ত বলে, ‘আরেহ থাক না! নাজিরা তুমি এইসব জায়গাতে আসবে না। এগুলো ভালো না। আজ যখন আসছো তখন ঠিক আছে থাকো!’

নাজিরা মাথা নাড়ায়। লজ্জায় তার কান দিয়ে গরম আভা বের হয়। সাহিত্য আর সীমান্ত এগোতে গেলে নাজিরা ব্যস্ত কন্ঠে বলে, ‘আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?’

‘সাইরাহ্-দের বাড়ি।’

নাজিরা কিছু বলার আগেই পাশ থেকে সাহিত্য বলে, ‘তুইও আয়।’

সীমান্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকায়। সাহিত্য স্বাভাবিক ভাবেই এগোয়। পেছনে পেছনে নাজিরাও আসছে। নাজিরা সম্পর্কে সাহিত্যের চাচাতো বোন। সাহিত্যের মায়ের একই গ্রামে বিয়ে হয়েছে। সীমান্ত সম্পর্কে সাহিত্যের মামাতো ভাই হওয়ার সুবাদে প্রায়ই তাদের বাসায় যাওয়া আসা হতো। নাজিরার সাথেও তার কথা হতো। এই টুকটাক কথা বলা, আঘাতে সাবধান করা থেকে কখন যে একটা দুর্বলতা তৈরী হয়ে গেছে তা বোধহয় নাজিরারও জানা নেই। অথচ বোকা মেয়ে জানেই না তার মনে মনে চাওয়া প্রেমিক অন্যের প্রেম চায়। নাজিরা আড়চোখে সীমান্তের দিকে তাকায়। সীমান্ত তখন সাইরাহ্-কে দেখার উৎসাহে হৃদপিণ্ডের দ্রুতগতিকে সামলাতে ব্যস্ত।

তাহেরা তার অনেকক্ষণ আগেই ঘরে চলে গেছে৷ সাইরাহ্-কে ডাকতে গিয়ে দেখে সাইরাহ্-র শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। তিনি হায় হায় করে যত দ্রুত সম্ভব মাথায় পানি ঢালা শুরু করেন। তার হায় হায় শুনে সবুর মিয়া বাহির থেকে চেচাচ্ছেন। দাঁতে দাঁত পিষে বার বার বলছেন,

‘ওইরহম মাইয়ার জন্য তুই হায় হায় করতাছোস ক্যান? ম’রলেই তো আপদ দুর অয়।’

ঠিক সেসময়েই হাজির হয় সাহিত্য, সীমান্ত আর নাজিরা। তিনজনের কানেই কথাটা যায়৷ সীমান্ত চমকে ওঠে। সাহিত্য শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় তবে নিজের মুখভঙ্গি টা কঠোর করে রাখে৷ সীমান্তদের নিজের বাড়ির আঙিনায় দেখার সাথে সাথেই সবুর মিয়া চকচকে চোখ নিয়ে তাকান৷ দ্রুত পায়ে দৌড়ে এসে আন্তরিকতা নিয়ে বলেন,

‘আরেহ ছুডু সাহেব আপনেরা! আপনেরা আমাগো বাড়িত? কিচু হয়সে? আইয়েন আইয়েন। বইয়েন!’

পরমুহূর্তেই নিজের স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়েন, ‘তায়েরা! তাত্তাড়ি তিনডা চেয়ার আনো!’

সাহিত্য খুবই শান্ত ভঙ্গিমায় বলে, ‘লাগবে না। নাজিরা একটু সাহে..’

বলতে গিয়েও থেমে যায়। ‘সাহেবা’ নামটা গিলে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে, ‘সাইরাহ্-র সাথে দেখা করতে আসছে। সাইরাহ্ কই?’

নাজিরা আর সীমান্ত হা করে তাকায়। সাহিত্য নাজিরার দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই সেও সায় দেয়। শুধায়, ‘হ্যাঁ চাচা। সাইরাহ্ বুবু কোথায়?’

সবুর মিয়া খুব একটা পাত্তা দিলেন না। আগের মতোই ব্যস্ততা নিয়ে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যা কথা কইবেন তা বইয়া বইয়া কইয়েন ছুডু সাহেব। ইট্টু খাড়ান আমি চেয়ার আনতাসি।’

সবুর মিয়া নিজেই ছুটে গিয়ে ঘর থেকে তিনটে কাঠের চেয়ার এনে সামনে রাখলেন। ৩ জন বসে পড়ে। তাহেরাও ততক্ষণে বেড়িয়ে এসেছে। সীমান্তর দৃষ্টি তখন সাইরাহ্-কে খুঁজতে ব্যস্ত। সবুর মিয়া হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কইবেন এহন আরাম কইরা কন!’

সাহিত্য নাজিরাকে চোখ দিয়ে ঈশারা করে। নাজিরা দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে, ‘চাচা আমি সাইরাহ্ বুবুর সাথে দেখা করে আসি?’

‘যান!’

সাহিত্য কথায় কথায় বলে, ‘চাচা আপনাদের বাড়ির পিছে তো ফিরোজ তাঁতির মেয়ের লা’শ পাওয়া গেছে। দেখছেন? আহারে। অকালে মাইয়াটা চলে গেলো।’

‘কি কন? ফিরোজ তাঁতির মাইয়াডার লা’শ পাওয়া গেছে? হায় হায়!’

সবুর মিয়ার হায় হায় শুনে তাহেরা বারান্দা থেকে তাচ্ছিল্য করে হাসে। নিজের মেয়ে ম’রুক তাতে তিনি দেখতেও যাবেন না আর অন্যের মেয়ে ম’রেছে শুনে হায় হায় করছেন। ভীষণ রাগ হলেও তা চেপে যায় তাহেরা। মেয়ে মানুষের যে রাগ করতে নাই। এ সমাজ তো তাদের শুধু পুরুষের মর্জিতে চলতে বলেছে৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে তাকাতেই দেখেন সাহিত্য তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন৷ একটু ঘাবড়ে যায় তাহেরা৷ সাহিত্য আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে বলে,

‘আপনি জানতেন ই না চাচা? আপনাদের ঘরের জানালা দিয়ে বাহির দেখা যায় তো! দেখেননি? কে থাকে ওই ঘরে?’

তাহেরা জবাব দেওয়ার আগেই সবুর মিয়া জোড়ে বলেন, ‘আমার মাইয়া সাইরা থাহে ওয় ঘরো।’

‘ওহ আচ্ছা। সাইরাহ্ কিছু দেখসে নাকি? দেখলে তো তাও বাঁচাইতে পারতো মেয়েটাকে।’

বেশ আফসুসের সুরেই কথাটা বলে সাহিত্য। সবুর মিয়া মাথা নাড়ান। সীমান্ত আগা মাথা কিছুই বুঝে ওঠে না। নাজিরা বাহিরে এসে বলে,
‘ভাইজান বুবুর তো জ্বরে গা পু’ড়ে যাচ্ছে। উঠতেই পারতেছে না।’

পাশ থেকে তাহেরা সবুর মিয়াকে করুণ স্বরে বলে, ‘মাইয়াটারে ওষুধ আইনা দেন না!’

সবুর মিয়া বিরক্ত হলেন। সাহিত্য একবার উঠে যাবে কি না ভাবে! সীমান্ত সাইরাহ্-র জ্বরের কথা শুনে অস্থির হয়। ভেতরে যেনো প্রচন্ড ব্যাথা লাগে। সাহিত্যের জবাবের আগেই সে নিজেই বলে,

‘চাচা আমরা যাবো ভেতরে?’

তাহেরা মাথা নিচু করে নিচু কন্ঠে বলে, ‘মাইয়াগো ঘরে পরপুরুষ ঢুকা মানা ছুডু সাহেব। আমার মাইয়ার দুর্নাম অইবো।’

‘চাচি ডাক্তার কাকারে খবর দেন। তাহলেই তো আসে। আমরা না-ই বা গেলাম ঘরে।’

ফের সবুর মিয়ার উদ্দেশ্যে বলে, ‘চাচা ডাক্তার ডাকেন না ক্যান? কি হইছে?’

সবুর মিয়া থতমত খায়। আমতা আমতা করে বলে, ‘এই তো ডাকমু সাহেব।’

‘আচ্ছা তাইলে ডাইকা আনেন। আমরা যাই। নাজিরা আয়! আর ভেতরে যাওয়া লাগবে না।’

সাহিত্যের কথায় সীমান্ত আশা ক্ষুন্ন হলো। এক পলক সাইরাহ্-কে দেখার তৃষ্ণা তার ভেতরটা ভীষণ করে দগ্ধ করে তোলে যেনো। কিন্তু এটাও সত্য মেয়েদের ঘরে পরপুরুষ ঢোকা নিষেধ। অগত্যা সে সাইরাহ্-কে দেখার তৃষ্ণা নিয়েই সবুর মিয়ার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে। আনমনা হয়ে হাঁটতে থাকে। সাহিত্য সবটাই খেয়াল করে। কিছুটা এগিয়ে সে হঠাৎ-ই বলে,

‘বিধবা মেয়েকে কখনোই মামা সাহেব কিংবা মামিমা বাড়ির বউ হিসেবে মানবে না। অতএব আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখিস না।’


চারপাশে সন্ধ্যার আযান দিচ্ছে। সাহিত্য ক্লান্ত পায়ে নিজের বাড়িতে ঢোকে। হাঁক ছেড়ে মা’কে ডেকে নিজের ঘরের দিকে ছোটে। পুরোনো বাড়ি। চারপাশে দেয়াল তোলা। এক পাশে সিড়ি। দু তলা পেড়িয়ে পাশ দিয়েই ছাঁদ গেছে। ছাঁদের ওপর এক পাশে চিলেকোঠার ঘরের মতো বড় এক ঘর। ওটাই সাহিত্য দখল করে বসে আছে। সাহিত্য ক্লান্ত পায়ে নিজের ঘরে গিয়েই টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে সময় ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। সাহিত্য না দেখেই বলে,

‘আসেন আম্মা।’

‘আমি মামিমা না। লুবনা।’

সাহিত্য মাথা তুলে তাকায়। দরজার পাশে লুবনাকে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে বসে। শিনা টান টান করে বলে, ‘তুই কখন আসলি? আর তুই আমার ঘরে কেন? আম্মা কই?’

‘মামিমা কাজ করে। আপনারে পানি দেওয়ার জন্য পাঠাইলো।’

‘টেবিলের ওপর রাইখা যা।’

লুবনা একবার চোখ তুলে তাকায়। সাহিত্যের দৃষ্টি তার দিকে নাই। লোকটা বড্ড পা’ষাণ। একটিবার তার দিকে তাকালে কি হয়? লোকটা কি জানে না এই কিশোরী সপ্তদশী তাকে দেখার জন্য বার বার ছুটে আসে! লুবনাকে একই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাহিত্য ভ্রু কুঁচকায়। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

‘মূর্তির মতো দাঁড়ায় আছিস কেন? গ্লাস রাইখা যা।’

লুবনা ব্যস্ত ভঙ্গিতে গ্লাস রেখে ছুটে চলে যায়৷ সাহিত্য ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়ে গ্লাসের দিকে তাকায়। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে আওড়ায়, ‘নিজেকে ভাঙার জন্য ম’রিয়া হয়ে আছিস। অথচ ভে’ঙে গেলে সহ্য করাটা তোর জন্য ভ’য়ং’কর বেদনার হবে।’

চলবে..

(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)