সাহেবা পর্ব-০৪

0
34

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
___

৪.
সাইরাহ্-র জ্বর কমেছে। তবে তা খুবই সামান্য। এখনো জ্বরে পুরো শরীর আগুনের মতো উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তাহেরা সারাদিনই মেয়ের মাথায় পানি ঢেলেছে, ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিয়েছে৷ যা একটু কমে আবার বেড়ে যায়। জ্বরে সারাদিনই হুশ ছিলো না সাইরাহ্-র। একটু আগে থেকে সে তাও নিজে নিজে উঠে বসতে পারছে। তাহেরা বেশ কয়েকবার সবুর মিয়াকে বলেছে গ্রামের ডাক্তারকে ডাকতে কিন্তু সে কানেই তুলছে না। পুরো গ্রামে একজন মাত্র ডাক্তার। তাও হাতুড়ে। যার যা সমস্যা হয় তা শহরে গিয়ে দেখিয়ে আসে। তাহেরা টেনশনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে৷ শ্বাশুড়ির জ্বালায় মেয়ের আশে পাশে থাকা যাচ্ছে না। কাজ করতে হচ্ছে। মনে মনে আক্ষেপ নিয়েই সে কাজ করছে৷ সোহেল একটু পর পর এসে বোনকে দেখে যাচ্ছে। সাইরাহ্ যখন উঠে বসেছে তখনই সোহেল ঘরে আসে। সাইরাহ্ জ্বরে লাল হওয়া চোখ নিয়ে কোনোরকম তাকিয়ে শুধায়,

‘আম্মা কোথায় রে ভাই?’

‘আম্মা তো বাইরে কাম করে। তোমার কিছু লাগবো বুবু? আমারে কও! আমি আইনা দেই?’

‘কিছু লাগবো না ভাই। আমি একটু বাইরে যাবো। ঘরে থাকলে দম আটকে আসতেছে। বাইরের বাতাস গায়ে লাগলে শান্তি লাগবে।’

‘আচ্ছা আসো! আমি তোমারে নিয়া যাই।’

সোহেলের কথায় খানিকটা হাসে সাইরাহ্। ভাইয়ের হাত ধরেই সে ঘর থেকে বের হয়৷ তার মা কলপাড়ে কি যেনো করছে আর দাদী রান্নাঘরে রান্না দেখছে। কারোরই বাইরে মনোযোগ নেই। জ্বরে কোনো রকম ঢুলতে ঢুলতে বাড়ির আঙিনা থেকে বেড়িয়ে আসে৷ সোহেল কন্ঠস্বর নিচু করে বলে,

‘বুবু! আম্মা জানলে কিন্তু বকবো।’

‘বকবে না৷ চল!’

ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়। বিশাল নদীর শান বাঁধানো পাড়ে বসে। রোদ নেই৷ গাছের ছায়াও পড়েছে। বাতাস এসে গায়ে লাগছে। চোখ বন্ধ করে বাতাসটা অনুভব করে সাইরাহ্। সোহেল দুগালে হাত দিয়ে বোনের মুখের দিকে চেয়ে বলে,

‘জ্বরে তোমার চোখ মুখ লাল হইয়া গেসে বুবু।’

সাইরাহ্ কিছু বলে না। কিছুটা সময় কাটে ওভাবেই। সাইরাহ্ শাড়ির আঁচল ভালো মতো পেঁচিয়ে গায়ে নেয়। ঠান্ডা লাগছে। তখনই পেছন থেকে কেউ বলে,

‘জ্বর শরীর নিয়েও নাচতে নাচতে বাইরে চলে আসছিস?’

সাইরাহ্ পুরুষের কন্ঠ শুনে দ্রুত মাথায় কাপড় দেয়। মুখ ঢেকে পেছনে তাকায়। সাহিত্য ভ্রু কুঁচকায়। সাইরাহ্ হতাশ দৃষ্টিতে তাকায়। এই লোকটা এখানে মানে এখন তার জ্বর বাড়বে বয় কমবে না৷ সাহিত্য এগিয়ে আসে। সোহেল দু হাত কোমড়ে রেখে, কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। সাহিত্য তা দেখে দ্বিগুণ ভাবে কপাল কুঁচকায়। শুধায়,

‘কিরে মাইনষের শা’লা! ওমনে কি দেখোস?’

সোহেল আগের ভঙ্গিতেই বলে, ‘আপনেরে দেখি মাইনষের দুলাভাই।’

সাহিত্য চোখ বড় বড় করে বলে, ‘তুই দেখি আমারে ভেঙ্গাস! যা ভাগ।’

‘যামু না। আপনে যান।’

সাহিত্য সাইরাহ্-র দিকে এগোতে এগোতে বলে, ‘কিরে! তোর ভাই দেখি তোর থেকে বড় মাপের বি’চ্চু। যাইতে বল ওরে।’

সাইরাহ্-র তর্ক করতে ইচ্ছে করে না। জ্বর শরীরে তাকিয়ে থাকাটাই অনেক শক্তির কাজ মনে হচ্ছে তার কাছে৷ অগত্যা নিভু নিভু স্বরে বলে, ‘আপনি কি এমন বলবেন যে সোহেলের থাকা যাবে না?’

‘তোর সাথে প্রেমালাপ করবো। ‘ও’ তো ছোট মানুষ তাই থাকলে যদি আবার শিখে যায়!’

সাইরাহ্-র ইচ্ছে করে সাহিত্যকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দিতে। কিন্তু সম্ভব নয়। তাই সোহেলের দিকে তাকিয়েই বলে, ‘ভাই তুই ওপরে যা! আমি আসছি।’

সোহেল সাহিত্যর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে ধীরে ধীরে ওপরে চলে যায়। সাইরাহ্ এক পলক সেদিকে তাকিয়ে আরেক পলক তাকায় সাহিত্যর দিকে। অনুভব করে তার জ্বর আর রাগ দুটোই তরতর করে বাড়ছে। তাই দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

‘আপনার মতো অ’ভদ্র লোকের সাথে প্রেমালাপের চেয়ে আমি মনে করি নদীর পানিতে ডুবে ম”রা অনেক বেশি সুখের।’

‘সত্যি? তাইলে ধাক্কা দিই? তুই ডুবে ম”র!’

সাইরাহ্ জানে কথা বাড়ালে শুধু কথা-ই বাড়বে। এর বেশি কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই নিজ থেকেই বলে, ‘ভাই আমার ভুল হইছে মাফ করেন। আর দু মিনিট এখানে থাকলে আমি জ্বরে এখানেই পড়ে ম’র’বো। তাই কি বলতে আসছেন বলে আমাকে ধন্য করুন।’

সাহিত্য গা ছাড়া ভাবে বলে, ‘ধন্য করার জন্যই আসছি। তোর বাড়ির পিছে যে একজন আ’ত্ম’হ’ত্যা করলো তুই দেখিসনি?’

সাইরাহ্ কিছু বলার আগেই সাহিত্য থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুইও জানিস তোর ঘর থেকে সোজা ওই জায়গা দেখা যায় আমিও জানি এটা। তাই প্যাচাইয়া নিজের মাথা ন’ষ্ট না করে সরাসরি উত্তর দিলে তাড়াতাড়ি চলে যাবো। এবার বলতে থাক!’

সাইরাহ্ বোঝে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ঘা’ড়’ত্যা’ড়া লোকরা কখনো সহজে মানে না। এখানেও বেশিক্ষণ সাহিত্যের সাথে থাকা মানে তার নামে আরেকটি ক’ল’ঙ্ক। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইরাহ্ নিচু স্বরে বলে দেয়,

‘রাতে জ্বরের তোপে ঘুমাতে পারছিলাম না। তখন মেয়েলী কন্ঠের আর্ত’নাদে ঘুম ভে’ঙে যায়। আমি জানালার একটা কপাট খুলে বাহিরে তাকিয়ে দেখি একটা মেয়ে গাছের সাথে ঝু’ল’ছে। ভয়ে তখনই জানালা আটকে দিয়েছিলাম। এর বেশি কিছু জানি না।’

‘তুই বাইরে গেলে হয়তো মেয়েটা বাইচা যাইতো।’

‘অথবা আমার অবস্থাও তার মতো হইতে পারতো।’

সাইরাহ্-র শীতল কন্ঠে সাহিত্য চমকে তাকায়। চোখ মুখ দেখতে না পেলেও সাহিত্য অনুভব করে সাইরাহ্ তার দিকে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা ওই দৃষ্টিতে প্রাণ আছে কি? নাকি অভিযোগ আছে? জানা নেই। সাহিত্য নিজেকে সামলে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ফের শুধায়,

‘সেদিন কি দেখে বেহুশ হইছিলি?’

প্রশ্নটাতে যেনো গায়ে কাটা লাগে সাইরাহ্-র। কেঁপে ওঠে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে সেই মৃ’ত লা’শ আর র’ক্ত মাখা মুখ। দু হাতে শক্ত করে নিজের শাড়ি চেপে ধরে। সাহিত্য পর্যবেক্ষণ করে সবটা। ঘোরের মাঝেই সাইরাহ্ বলে দেয়,

”আ-আমি কাল ওখানে-ওখানে একটা রক্তে ভেসে যাওয়া লা-লাশ দেখেছি। কাছে যেতে নিতেই ওই র’ক্তে মাখা মুখটা! আমি জানি না৷ কিচ্ছু জানি না আর।’

সাহিত্য একবার হাত এগিয়ে দিয়েও পিছিয়ে নেয়। সাইরাহ্ ততক্ষণে কাঁপছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে তার জ্বরটাও বেড়েছে। সাহিত্য নিজের জায়গা ছেড়ে উঠতে উঠতে বলে,

‘জ্বরে যে কাঁপা কাঁপি শুরু করেছিস তাতে নদীতে উল্টে পড়তে তোর বেশি সময় লাগবে না। চল ওঠ!’

সাইরাহ্ কোনোরকমে বলে, ‘কোথায়?’

‘তোকে বিক্রি করে আমি দুইটা বাড়ি বানাবো। সেখানেই নিয়ে যাবো চল!’

সাইরাহ্ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। কথা বলার ইচ্ছা না থাকা সত্বেও মুখ থেকে বের হয়ে যায়, ‘কেন? আমি কি আপনার সম্পত্তি নাকি যে বিক্রি করে দিবেন?’

সাহিত্য সিড়ি ডিঙিয়ে উঠতে উঠতে বলে, ‘তুমি আমার সম্পত্তি নও, তুমি আমার সম্পদ।’

সাইরাহ্ পেছন থেকে অবাক হয়ে শুধায়, ‘কি বললেন?’

সাহিত্য চোখ মুখ কুঁচকে জবাব দেয়, ‘তোকে কি বলেছি? এই লাইন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তোর সম্পত্তি থেকে মনে পড়েছে তাই বলেছি।’

সাইরাহ্ আর কিছু বলে না। আধা’পা’গল লোকজন কখন কি বলে তা আমলে না নেওয়ায় ভালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কতক্ষণ থম মে’রে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর সোহেল আসে। বোনকে নানান গল্প শোনায়। সাইরাহ্ একবার ভাইয়ের দিকে তাকায়, একবার নদীর জলে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়।

গ্রামের এক পাশে বিশাল বেলীফুলের গাছ। গাছটা প্রধানের বাড়ির প্রায় পাশেই। গ্রাম প্রধানের ছোট ভাইয়ের ছোট মেয়ে বেলী। সে এসেছে বেলীফুল কুড়োতে। গাছের ওপর তার সই এবং বোন গ্রাম প্রধানের ছোট মেয়ে ছন্দ বসে বসে গাছের ডাল নাড়া দিচ্ছে আর নিচ থেকে সে ফুল কুড়োচ্ছে। উপর থেকে ছন্দের ডাল নাড়তে দেড়ি হলে বেলী হাক ছাড়ে,

‘এই ছন্দ! জলদি ডাল নাড়। গাছওয়ালা কাকা এসে যদি দেখে তুই গাছের ওপরে তবে তোকে সহ গাছ উপ্রে নিবে।’

উপর থেকে ছন্দ খিলখিলিয়ে হেঁসে ওঠে। বেলী ধমকায়। ছন্দ হাসি থামিয়ে বলে, ‘সে দিক! তার গাছ সে উপ্রোলে তোর আমার কী?’

‘তোর কিছু না হলেও আমার অনেক কিছু৷ প্রতিদিন বেলীফুল কই পাবো?’

ছন্দ আর বেলীর কথার মাঝে ভেসে আসে পুরুষালী কন্ঠ। দুর থেকে হাক ছেড়ে গম্ভীর গলায় শুধায়, ‘এই তোমরা কী করো ওখানে?’

বেলী ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। আঁচলে রাখা বেলী’ফুলগুলো পড়তে পড়তেও বেলী আঁকড়ে ধরে। দ্রুত গাছের পিছনে লুকিয়ে বলে, ‘লোকটার আর আসার সময় হলো না!’

দুর থেকে পুরুষটি এগিয়ে আসে। লম্বা চওড়া, তাগড়া এক পুরুষ। গাছের থেকে একটু দুরে আসতেই ছন্দ নিভে যাওয়া স্বরে বলে, ‘বেলী রে! এ তো তামজীদ ভাই।’

‘তামজীদ ভাই’ নামটা শুনেই বেলী গাছের সাথে মিশে দাঁড়ায়। লোকটা সাহিত্য ভাইয়ের সাথেই চলাফেরা করে। সাহিত্য ভাইয়ের দরুণ তামজিদকে সে বহুবার তাদের বাড়িতে দেখেছে। নেহাৎ ই সীমান্তর সাথে তাদের খুব সখ্যতা তাই বাড়িতে তাদের যাওয়া আসাও বেশ ভালোই। এই সময় তাদের গাছতলায় দেখলে নিশ্চিত একটা ধমক দিয়ে বসবে। তামজীদ গাছের কাছাকাছি এসে গাছের ডালের দিকে তাকায়। উপরে ছন্দকে দেখে বেশ গম্ভীর আওয়াজে আদেশ করে,

‘গাছে কি করো তুমি? নিচে আসো!’

ছন্দ ফাঁকা ঢোক গিলে দাঁত বের করে হাসে। তামজীদ নজর সরিয়ে গাছের আড়ালে থাকা বেলীর দিকে দৃষ্টি দেয়। কন্ঠস্বর আগের মতো করেই বলে,

‘বেড়িয়ে আসো।’

বেলী কপাল চাপড়ায়। আপনাআপনি মাথা নিচু করে বেড়িয়ে আসে। আঁচলে থাকা বেলীফুল গুলো শক্ত করে চেপে ধরে। তামজীদের সামনে দাঁড়িয়ে বার বার নখ দিয়ে মাটিতে খোঁটে। ততক্ষণে ছন্দও নেমে এসেছে। তামজীদ হাত বগলদাবা করে শুধায়,

‘কি করছো দুজনে এখানে? আর ছন্দ! তুমি যে গাছে উঠেছো পড়ে গেলে কি হতো?’

ছন্দ ফটাফট বলে দেয়, ‘আরেহ পড়তাম না তো। আমার অভ্যাস আছে। আম…’

বেলী হাত ধরে থামিয়ে দেয়। চোখ রাঙিয়ে বোঝায় চুপ থাকতে। ছন্দও চুপ হয়ে যায়। তামজীদ বেলীর আঁচলের দিকে ঈশারা করে শুধায়, ‘বেলীফুল?’

বেলী মাথা নিচু করে মাথা নাড়ায়। তামজীদ ফের বলে, ‘দুজনকে আমি কিছু বলেছি? তাহলে এতো ভয় পাচ্ছো কেনো?’

এবারও বেলী কোনো কথা বলে না। ছন্দই ব্যস্ত গলায় বলতে শুরু করে, ‘আমিও তো এটাই..’

ছন্দের কথা ফুরোনোর আগেই বেলী ফের ছন্দের হাতে চি’ম’টি কা’টে। ছন্দ অসহায় চোখে তাকায়। তামজীদ পুরোটাই খেয়াল করে। তাই কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলে,

‘দুজনে সোজা বাড়ি যাও। একা একা আর এতো নির্জন জায়গায় খবরদার আসবে না। আমি যেনো না দেখি! যাও।’

বেলী আর ছন্দ সোজা হাঁটা লাগায়। তামজীদ পিছু পিছু ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বেলীর দিকে তাকায়। এই মেয়ে প্রধানের বাড়ির সবচেয়ে দুষ্টু, চঞ্চল। অথচ তার সামনে আসলেই কেমন চুপসে যায়। কেনো? সে কি বাঘ নাকি ভাল্লুক! বেলী একবার ঘাড় ফিরিয়ে পিছে তাকায়। সাথে সাথেই দুজনের চোখে চোখে পড়ে যায়। বেলী দ্রুত চোখ ফিরিয়ে বুকে হাত রাখে। হৃদপিন্ডের গতি বেড়ে মনে হচ্ছে দৌড়াতে শুরু করে। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তামজীদ হেঁসে নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

‘বেলী যদি নিজেই বেলীফুল খোঁজে তবে কোন বেলীতে মুগ্ধ হবো?’

সীমান্ত সাহিত্যকে খুঁজতে খুঁজতে তাদের বাড়িতে গিয়েছে। বিকেল হয়ে গেছে কিন্তু সাহিত্যের খবর নেই। তাই নিজেই গেছে তাকে খুঁজতে। ফুপির বাড়ির আঙিনায় পা রাখতেই সে ডাকে ফুপিকে। সীমান্তের আওয়াজে সাহিত্যের মা সুফিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। হাসি মুখে সীমান্তের দিকে এগিয়ে বলে,

‘সীমান্ত বাবা! আয় আয়। কি মনে কইরা আসলি? ফুপির বাড়ির দিকে তো তোরে পাওয়ায় যায় না।’

সীমান্তও হাসে। এর মাঝেই নাজিরা সীমান্তের কন্ঠ শুনে ছুটে এসেছে। মাথায় ওড়নার আঁচল টেনে সিড়ির পাশটায় দাঁড়িয়ে থাকে। সুফিয়া বেগম তাকে দেখেই হাক ছাড়ে। জোড় গলায় বলেন,

‘সীমান্তের লাইগা একটু নাশতা নিয়া আয় তো নাজিরা।’

নাজিরা শুধু মাথা নাড়ায়। সীমান্ত ব্যস্ত কণ্ঠে বলে, ‘তার দরকার নাই ফুপি আম্মা। সাহিত্য কই? আজ সারাদিন ওর পাত্তা পাইনি। কথাও হয়নি।’

‘সে সারাদিন কোন জায়গায় ঘুরে তার ঠিক ঠিকেনা আছে বাবা! তুই বইসা থাক কিছুক্ষণ।’

সীমান্ত একটু চিন্তায় পড়ে যায়। এর মাঝে নাজিরা নাস্তা নিয়ে চলেও আসছে। নাজিরা সীমান্তের দিকে তাকাতেই সীমান্তও তাকায়। একে অন্যের দৃষ্টি দৃষ্টিতে পড়ে গেলে নাজিরা লজ্জা পায়। সীমান্তেরও একটু অস্বস্তি হয়। কোনোরকম চোখ সরিয়ে চায়ে চুমুক দেয়। বাড়িতে তখন লুবনাও ছিলো। সীমান্তকে দেখে সেও এগিয়ে আসে৷ নাজিরাকে লজ্জা মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাঁধে ধাক্কা দেয়। নাজিরা চমকে লুবনার দিকে তাকায়। লুবনা হেঁসে চোখ মা’রলে নাজিরা আরো লজ্জা পায়। এই মানুষটাকে দেখলেই তার লজ্জা লাগে। কি অদ্ভুত! লুবনা সীমান্তর সাথে কথা বলা শুরু করে। কথায় কথায় সুফিয়া বেগম লুবনা আর সাহিত্যের বিয়ের কথা তোলে। সীমান্ত অবাক হয়ে বলে,

‘বিয়ে! সাহিত্য আর লুবনার?’

সুফিয়া বেগম হেঁসে সম্মতি জানায়। সীমান্ত কিছু বলার আগেই সাহিত্য প্রবেশ করে। ক্লান্ত, ঘেমে যাওয়া মুখ মুছতে মুছতে মায়ের উদ্দেশ্যে বলে,

‘কিসের বিয়ে?’

উত্তরটা নাজিরা-ই দেয়। উৎফুল্ল স্বরে বলে, ‘আপনার আর লুবনা আপার বিয়ে।’

সাহিত্য চকিতে তাকায়৷ একবার লুবনার মুখের দিকে তাকিয়ে আরেকবার বাকিদের দিকে তাকায়। তারপর নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে যেতে যেতে স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়,

‘আমি এখন বিয়ে করছি না আম্মা। তাই আমার বিয়ে নিয়ে না ভেবে বাড়ির বাকি মেয়েগুলোর কথা ভাবুন।’

চলবে..