#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
_____
৬.
.
সাইরাহ্-র জ্বর ভালো হয় ৭ দিন পর। জ্বর কমলেও শরীর দুর্বল। ওইদিনের পর সাহিত্যর সাথে আর দেখা হয়নি সাইরাহ্-র। গ্রামে বেশ তোলপাড় চলছে এখনো। সাইরাহ্ বিকেল বেলা মা’কে সাহায্য করছিলো কাজে। সে সময় কাকলী আসে তাদের বাড়িতে। সাইরাহ্ কাকলীকে দেখে কাজ রেখে উঠে আসে। হাসিমুখে বলে,
‘কিরে! আমাদের বাড়িতে হঠাৎ?’
কাকলী রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে এসে মোড়া টেনে বসে। সাইরাহ্ নিজেও পেছনে এসে দাঁড়ায়। কাকলী হাসিমুখে তাহেরা’কে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘কাকি! কালকের পরের দিন আমার গায়ে হলুদ। আপনি, কাকা, সাইরাহ্, সোহেল, দাদী সবাই মিলে চইলা আইসেন। আম্মা সবাইরে যায়তে বলছে। যদিও সে নিজেই আসতো কিন্তু কাজের জন্য আসতে পারে নাই৷ আপনারা আসবেন তো?’
তাহেরা কাকলীর বিয়ের কথা শুনে খুশিই হলো। তবে সাইরাহ্ কে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে মুখটা মলিন হয়ে যায়। নিচু স্বরে বলে, ‘মা তুমি তো জানোই আমার মাইয়াডা বিধেবা৷ ওর যে সব জায়গায় যাওয়া মানা। ওরে নিয়া গেলে আবার তোমার বাড়ির লোক দুইডা কথা শুনায় দিবো তহন আমার মাইয়া কষ্ট পাইবো।’
‘কাকি! আম্মা বলছে নিয়ে যায়তে। যখন আমার বিয়েতে আমার আম্মারই ওরে নিয়া সমস্যা নাই তখন মানুষের কথায় কি যায় আসে? ওরে নিয়ে আসবেন আপনি। বাকিটা আমার আম্মা দেখবে কইসে। কোনো চিন্তা কইরেন না৷’
তাহেরা ভরসা পায়। সাইরাহ্ কে নিয়ে যেতে রাজি হয়৷ কাকলী আর কিছুক্ষণ কথা বলে বিদায় নেয়। কাকলীকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য সাইরাহ্-ও কাকলীর সাথে আসে। বাড়ির আঙিনা পার হতেই সাইরাহ্ নিচু স্বরে বলে,
‘তোকে একটা কথা বলি?’
‘বিয়েতে না আসার কথা বললে বলিস না। মুখ বন্ধ করে রাখ।’
‘দেখ! তোরা জিদ করছিস কেনো? আমার নিজের চাচাতো বইনের বিয়েতে গেছিলাম বলে আমারে যা তা কথা শোনায়ছে। তোর বিয়েতে গেলে গ্রামের সবাই আমাকে কথা শোনাবে। আমার ভালো লাগে না আর। ক্লান্তি চলে আসে। কত দিন একই কথা, খোঁটা সহ্য করা যায় বল!’
‘আমি বুঝি। তোর ভাগ্যে ছিলো হয়েছে এতে তো তোর দোষ নেই। তোর কষ্ট হয় লোকের কথায় তাও বুঝি কিন্তু তুই আমার বিয়েতে না আইলে আমি অনেক কষ্ট পাবো। আর আম্মাও অনেক রাগ করবে।’
সাইরাহ্ আর কিছু বলে না৷ কিছুটা দুর এগোতেই কাকলী উৎসাহ নিয়ে বলে, ‘তুই আমার বিয়েতে সাদা শাড়ি পড়বি না সাইরাহ্। তুই তোর ওই কালো শাড়িটা পড়বি৷ তোকে অনেক সুন্দর লাগে ওটাতে।’
সাইরাহ্ আঁতকে ওঠে। তার জন্য বিয়েতে যাওয়াটাই কত জটিল বিষয় তা সে হাড়ে হাড়ে টের পায়। আর এই মেয়ে তাকে বলছে সাদা শাড়ি ছেড়ে কালো শাড়ি পড়তে! মেয়েটা কি চায় সে লোকের কথা শুনে ম”রেই যাক! সাইরাহ্ আতঙ্কিত কন্ঠে বলে,
‘তুই কি চাস আমি ম’রে যাই রে কাকলী? জোড় করে বিয়েতে নিয়ে যেতে চাইছিস তাও মানা যায় কিন্তু রঙিন শাড়ি! আমার যে সাদা রঙের শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো রঙ নিষেধ তুই জানিস না? গ্রামের সকলে তো আমাকে কথার তীরেই মে’রে ফেলবে।’
কাকলী গাল ফোলায়। কিছু বলার আগেই সীমান্ত কোথা থেকে এসে হাজির হয়। সাইরাহ্ যত দ্রুত সম্ভব মুখ ঢাকে। সীমান্ত ব্যস্ত কন্ঠে বলে,
‘তোমার জ্বর ভালো হয়সে? চলো তো! কথা আছে।’
‘কি কথা? এখানেই বলুন!’
সাইরাহ্-র অস্বস্তি কাকলী এবং সীমান্ত দুজনেই টের পায়। একে অন্যের দিকে একবার তাকায়। কাকলী তাড়া দিয়ে বলে, ‘তোরা কথা বল। আমি যাই রে! দেড়ি হইলে আম্মা বকবে।’
কাকলী চলে যায়। সাইরাহ্ পিটপিট করে একবার সেদিকে তাকায়। সীমান্ত তখনো সাইরাহ্-র দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে মুখে শীতলতা বিরাজমান। ছেলেটার চোখে মুখে কখনো গম্ভীরতা দেখা যায় না। শীতল হয়ে থাকে সবসময়। কিন্তু এই শীতলতাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সাইরাহ্। কেমন যেনো লোম দাঁড়িয়ে যায়! সীমান্ত নিজ থেকেই ফের শুধায়,
‘জ্বর কমেছে?’
‘হুম।’
‘এ ক’দিন জ্বর অনেক বেশি ছিলো? একবারও বাইরে আসোনি!’
‘আম্মা বের হইতে দেয়নি।’
‘আচ্ছা আসো! ওদিকটায় যাবো।’
সাইরাহ্ দৃষ্টি এদিক ওদিক করে কোনোরকম বলে, ‘আপনি যান সীমান্ত ভাই। আমারে আম্মা খুঁজবে।’
সীমান্ত বারণ শোনে না৷ খপ করে হাত ধরে সাইরাহ্-র। সাইরাহ্ চমকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে, ‘কি করছেন সীমান্ত ভাই? কেউ দেখবে! হাত ছাড়ুন।’
‘হাত ধরেছি কি ছাড়ার জন্য? যখন নিজ থেকে আসতে বললাম তখন আসোনি। এখন আমি তোমার হাত ধরেই যাবো।’
‘ছাড়ুন সীমান্ত ভাই! লোকে দেখলে আমার নামে ক’লঙ্ক ছড়াবে।’
সীমান্ত হাত ছাড়ে না। তবে দ্বিগুণ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার নামের সাথে আমার নাম জোড়া হয়নি৷ তুমি তো আমার হলেই না বরং আমার নামেই তোমার নামের সাথে দু বাক্যের ক’লঙ্ক জুড়ে যাক৷ তবুও আমার নামে জুড়ুক।’
সাইরাহ্ থমকায়। সীমান্তের এমন বাক্যের পর মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হয় না। এই মানুষটা সত্যি তাকে ভালোবাসে। ভীষণ বেশিই বাসে। কিন্তু কেনো বাসে? কেনো বার বার তার সামনে আসে? মানুষটি কি জানে অনুভূতি সাইরাহ্-র হৃদয়েও দোল খেলে! কিন্তু বিধবা নারীর যে স্বপ্ন দেখা বারণ। ভালোবাসা পাপ, অন্যায়।
সীমান্ত সাইরাহ্-কে নিয়ে চলে আসে নদীর পাড়ে। আশ পাশটা ফাঁকা। লোকজন নেই। কেউ দেখেওনি৷ সীমান্ত হাত ছেড়ে দেয়। সাইরাহ্ নিজের হাত আগলে নিয়ে দুপা পিছিয়ে যায়৷ সীমান্ত নিঃশব্দে হাসে। সিড়ির ওপর বসতে বসতে বলে,
‘তুমি বড্ড ভীরু সাইরাহ্। ভীরুতা ছেড়ে, সব বাঁধা কাটিয়ে আমায় ভালোবাসবে কবে? তুমি কি বোঝো আমার ভেতরটা তোমার ভালোবাসা পাওয়ার তৃষ্ণায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। বোঝো তুমি? বোঝো না?’
সাইরাহ্ জবাব দেয় না। চোখ মুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে থাকে। সীমান্ত ফের হাসে৷ সুদর্শন সেই চেহারাই হাসিটুকু যে ফুটে ওঠে। অথচ এ হাসি তার হৃদয় পোড়ার হাসি। এ হাসি তার হাহাকারের হাসি৷ মেয়েটা কি বোঝে? উহু৷ বোঝে না৷ বোঝে না বলেই তো তাকে ভালোবাসে না৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সীমান্ত। করুণ স্বরে বলে,
‘সাইরাহ্! বাসবে তো ভালো? ২য় বারের মতো মৃত্যুযন্ত্রণা দিয়ে চলে যাবে না তো?’
সাইরাহ্ নিশ্চুপ। সে জানে তাকে সীমান্ত ভালোবাসে৷ ভীষণ বেশি ভালোবাসে৷ শুধু সীমান্ত জানে না, বোঝে না তার সামনে দাঁড়ানো নারীটিও তাকে চায়৷ ভালোবাসার অনুভূতিটুকু পুরোপুরি অনুভব করতে চায়৷ এই যে এই উন্মাদ প্রেমিকের কথাগুলো তাকে দুর্বল করে দেয়। ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। কেনো এই মানুষটা তাকে এভাবে দুর্বল করে বারে বারে? জবাব নেই৷ শ্বাস আটকে আসে সাইরাহ্-র। সীমান্তর চোখে মুখে না পাওয়ার ব্যাথাটুকু স্পষ্ট। সাইরাহ্ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পেছনে ঘুরে ছুট লাগায়৷ সীমান্ত পেছন থেকে কয়েকবার ডাকে। সে ডাক উপেক্ষা করে সাইরাহ্ ছুটে চলে৷ কোনোমতেই তাকায় না পিছু।
—
কাকলীর আজ গায়ে হলুদ। সাইরাহ্ যাবে না যাবে না করেও যাওয়ার জন্য বের হয়। সাথে তাহেরা আর সোহেলও আছে। সাইরাহ্-র বেশ অস্বস্তি লাগে৷ মায়ের জোড়াজুড়ি আর কাকলী আর তার মায়ের কথা ভেবে যেতে রাজি হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মুখ ঢেকেই হাঁটতে থাকে। অর্ধেক রাস্তা যেতেই পিছন থেকে কারোর ডাক শুনা যায়,
‘কাকি!’
সাইরাহ্, তাহেরা, সোহেল পেছন ফিরে তাকায়৷ সীমান্ত ডেকেছে তাকে। সীমান্তকে দেখে হাসার চেষ্টা করে তাহেরা। সাহিত্য আর সীমান্ত এগিয়ে আসে। সাইরাহ্ দুজনের দিকেই তাকায় ঘোমটার আড়ালে। সীমান্তের মুখে হাসি বিদ্যমান থাকলেও সাহিত্যের মুখটা আজ গম্ভীর। এবং দৃষ্টি তার দিকেই। এতো প্রখর দৃষ্টিতে টিকতে পারে না সাইরাহ্। চোখ নামিয়ে নেয়। সীমান্ত হাসিমুখেই শুধায়,
‘সবাই মিলে কই যান কাকি?’
‘কাকলীর বাড়ি যাইতাসি ছুডু সাহেব।’
‘কাকলীর গায়ে হলুদে?’
তাহেরা মাথা নাড়ায়৷ সীমান্ত অবাক কন্ঠে বলে, ‘সাইরাহ্-ও যাচ্ছে? ওর না বিয়ে বাড়িতে যাওয়া নিষেধ! লোকে তো কথা শুনাবে।’
তাহেরা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়৷ তবে জবাব দেওয়ার আগেই পাশ থেকে সাহিত্য ভ্রু কুঁচকে শুধায়, ‘কেন? ও বিয়েতে গেলে কি হইছে? গ্রাম অশুদ্ধ হয়ে যাবে? ওর স্বামী মা’রা গেছে দেখে ‘ও’ কোনো বিয়েতে যেতে পারবে না?’
সাহিত্য বিরক্তসূচক শব্দ করে চোখ মুখে ভীষণ রকম বিরক্তি ফুটিয়ে তোলে। গলার স্বর খানিকটা নিচু করে বলে,
‘অন্তত তুই যাকে ভালোবাসিস তাকে তো নিজে এই কথাগুলো মনে করাইস না।’
সীমান্ত চুপ হয়ে যায়। সাহিত্য সাইরাহ্-র দিকে না তাকিয়ে কপাল কুঁচকে তাহেরার দিকে তাকিয়ে কন্ঠস্বর উচু করে বলে, ‘শোনেন কাকি! আপনার মেয়ে নিজে নিজের স্বামীরে মা’ইরা ফেলেনি যে তার সব কিছু তে মানা থাকবে৷ এটা করা মানা, ওটা করা মানা! আপনিই এতো অ’প’রা’ধ’বোধ নিয়ে থাকছেন কেন? কাকলী ওর সই আর সে তার সইয়ের বিয়েতে যাচ্ছে এখানে মাথা নিচু করে যাওয়ার কোনো মানে নাই। যান!’
সীমান্ত মাথা নিচু করে বলে, ‘আমি ওভাবে বলিনি সাহিত্য।’
‘কোনোভাবেই বলার দরকার নাই। আমরাও সব জিনিস মানতে শুরু করলে একদিন সবাই ওর বেঁচে থাকাটাও নি’ষিদ্ধ করে দিবে।’
সাহিত্য দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগটুকু গিলে নেওয়ার চেষ্টা করে। সাইরাহ্ হাসে। সত্যিই বোধহয় তাদের বাঁচতেও মানা। কথাগুলো সেখানেই শেষ হয়ে যায়। সবাই এক সাথে হাঁটা লাগায়। কাকলীর বিয়েতে কম বেশি অনেককেই দাওয়াত করা হয়েছে। গ্রাম প্রধানের সকল সদস্য আর তাদের পরিবারকে নিমন্ত্রণ করাটা গ্রামের নিয়ম। নয়তো বিয়েতে ঝামেলা করতে তারা দু বার ভাবেও না।
কাকলীদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সাইরাহ্। সাহিত্য আর সীমান্ত পুরুষরা যেদিকে সেদিকটায় চলে গেছে। সাইরাহ্ বড় বড় শ্বাস নেয়। তাহেরা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
‘খারাপ লাগতাসে মা? বাড়ি যাইবি গা?’
‘কাকলী রাগ করবে আম্মা। কি করবো বুঝতেছি না। এখানে ঢোকা মানে নিজের সাথে হাজারটা কথা জোড়া। আমার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে আম্মা। আমি নিতে পারি না। বিধবারা সমাজের অভিশাপ কেন হয় আম্মা? কেন তাদের স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে দেওয়া হয় না?’
তাহেরা মুখে কিছু বলতে পারে না। মেয়ের ভেতরের হাহাকার গুলো সে টের পায়। চোখ ভিজে আসে অজান্তেই। তাদের কথার মাঝেই কাকলীর মা ছুটে আসে। সাইরাহ্-কে এক হাতে আগলে নিয়ে হাসি মুখে বলে,
‘আইছো! ভিতরে আহো তাড়াতাড়ি। সেই কহন থেইকা তোমাগো অপেক্ষা করতাসি। কাকলীও বইসা আছে। ভাবি তাড়াতাড়ি আহেন।’
তাহেরা আর সাইরাহ্-কে কথা বলতে না দিয়েই তিনি টেনে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভেতরের দিকে। এদিকটায় পুরুষ মানুষ নেই বলে সাইরাহ্-র মাথার কাপড়টা সরিয়ে দেয়। সাইরাহ্-কে দেখামাত্রই গ্রামের মহিলারা হায় হায় শুরু করে। কাকলীর মা কোনো কথা কানে নেয় না। সরাসরি সাইরাহ্-কে কাকলীর পাশে বসিয়ে দিয়ে বলে,
‘ওর কাছে বইয়া থাহো। এহনই হলুদ মাখাইবো সবাই।’
কাকলীর মায়ের এই কাজ যেনো হজম হলো না কারোরই। একজন মহিলা ঠেস দিয়ে বলেই দিলেন, ‘কিগো কাকলীর মা! মাইয়ার অমঙ্গল করার এত্তো শখ হয়সে তোমার? বিধবা অপয়াডারে ক্যামনে ঢুকতে দিলা বাড়িত? নিজের স্বামীরে তো এক রাইতেই খা’য়সে দেইখো তোমার মাইয়ার জামাইরেও জানি না খা’ইয়া ফালায়!’
মহিলাসহ বাকি মহিলাগুলোও হো হো করে হেঁসে উঠলেন। সাইরাহ্ মাথা নত করে নেয়। কাকলীর মা এক পলক সাইরাহ্-র মুখের দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলে,
‘মাইয়া আমার। জন্ম দিসি আমি। আর তোমাগো এতো চিন্তা! দেহো আমি ভালা কইরাই জানি আমার মাইয়ার মঙ্গল আর অমঙ্গল কিসে! এইডা নিয়া তোমাগো তো অতো চিন্তা করা লাগবো না। সাইরার আওনের লাইগা যদি আমার মেয়ের অমঙ্গল হয় তাইলে হউক! ওইডা আমি বুঝমু। তোমাগো এতো সমেস্যা থাকলে তোমরা চইলা যাইতে পারো। আমি কিছু কমু না। সাইরা এই বিয়াতে থাকবোই। এতে আমার মাইয়ার বিয়া ভাইঙ্গা গেলেও আমি কিছু মনে করমু না। এক মাইয়ার লাইগা তো আর আরেক মাইয়ারে আমি পর কইরা দিমু না।’
‘এমন কইরা কইতাসো সাইরা মনে হয় তোমার পেটের মাইয়া?’
‘পেটের মাইয়া না হইলে কি হয়সে? ছুডু থেইকা আমার বাড়ির উঠানে ওরা খেলসে। আমার হাতেই বড় হয়সে। ছোট বেলায় কাকলী মা কইতো দেইখা সাইরাও মা-ই কইছে৷ মা যহন ডাকসে তহন মায়ের কতব্য পালন করমুই।’
মহিলারা মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলেন। সাইরাহ্ কেঁদে ফেলেছে ততক্ষণে। উহু কটু কথায় নয়। এই ভালোবাসাটুকু সে হজম করতে পারেনি। একটু খানি দুরে দাঁড়িয়ে তাহেরা আঁচলে চোখ মুছছে। কাকলী এক পাশ জড়িয়ে ধরে সাইরাহ্-কে। প্রশান্তির হাসি দেয়। ইসস! কাকলীর গায়ে প্রথম হলুদ লাগায় তার মা আর আব্বা। তারপরই কাকলীর মা সাইরাহ্-কে জোড় করে পাঠান হলুদ লাগাতে। সাইরাহ্ কাকলীর মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি মাথা নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘কী?’
সাইরাহ্ সাথে সাথেই তাকে জড়িয়ে ধরে। অদ্ভুত স্বরে বলে, ‘আমাকে এই সমাজের ভয়ে আমার মা-ও একঘরে করে রেখেছিলো। কখনো উচু গলায় কারো কথার জবাব দিতে পারেনি। কাকি আপনি আমাকে সাহস দিলেন। আমার এগিয়ে যাওয়ার ২য় ধাপ, ২য় পথ আপনি। আপনি আমাকে লড়াই করার যে সাহস দিলেন তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।’
কাকলীর মা হাসে। আরো শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘জীবন কহনো সহজ হয় না মা। সহজ কইরা নিতে হয়। সমাজ বার বার চাইবো তোমারে কোণঠেসা কইরা দিতে কিন্তু তুমি যদি তাগোরে মাইনা চলো তাইলে তুমি এক্কেরে একা হইয়া যাইবা আর যদি লড়াই কইরা বাঁচতে পারো তাইলে তুমি মাথা তুইলা তাকাইতে পারবা। তুমি বিধেবা এইডা তোমার দোষ না। এইডা তোমার ভাগ্য। মাইয়াগো সুখ, শান্তির আরেক নাম হয় স্বামী। যদি স্বামী স্বামীর মতো হয় তাইলে মাইয়ারা সুখী হয়। কেউ নিজ হাতে সেই সুখরে মা’ইরা ফেলতে চায় না। এইডা আমি বুঝি। আমি কহনো তোমারে কাকলীর থেইকা আলাদা কইরা দেখি নাই। তুমি আমার মাইয়া। সবসময় জানবা তোমার এক মা আছে তোমার পাশে।’
সাইরাহ্-র চোখ ভিজে আসে। কেউ কখনো তাকে এভাবে সাহস দেয়নি। কেউ কখনো বলেনি ‘আমি পাশে আছি’। নিজের বাবা-মা যেভাবে দুরে সরিয়ে দিয়েছে সেভাবেই সে ভেবেছিলো এই সমাজ এবং প্রত্যেকটা মানুষ তাকে দুরে সরিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র বি’ধবা হওয়ার দায়ে সে অনেক মাথা নিচু করে থেকেছে। আজ থেকে আর না। মনে মনে কঠিন প্রতিজ্ঞা করে সে। কাকলীর মা সাইরাহ্-কে থাকতে বলে নিজের কাজে চলে যায়। সাইরাহ্ নিজের মাথার ওপর রাখা শাড়ির আঁচলটা ভালো ভাবে টেনে নিয়ে আশে পাশে তাকায়। দুরে তাকাতেই চোখে পড়ে সাহিত্যের দিকে। সে এদিকেই তাকিয়ে আছে। তার মানে পুরো ঘটনা সেও শুনেছে। সাইরাহ্ মাথার কাপড় টেনে মুখের ওপর দিতে দিতেও দেয় না। শক্ত করে শাড়ির আঁচল হাতে চেপে এগিয়ে যায় সাহিত্যের দিকে। সাহিত্য অবাক চোখে তাকায়। আজ সাইরাহ্ নিজ থেকেই তার মুখ ঢাকেনি। চোখের পলক বার কয়েক ঝাপটিয়ে সাইরাহ্-র মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাইরাহ্ যত তার দিকে এগিয়ে আসে ততই তার হৃদয়ের ব্যাথা, ক্ষ’ত যেনো গভীর হয়। স্নিগ্ধ, শান্ত, কোমল নারী মুখটি তার হৃদয়ে কতটা গভীর ক্ষ”ত করে রেখেছে সে জানে? সাথে সাথেই সাহিত্যের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেনা এক অবয়ব। সাহিত্য দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। হাতের মুঠো শক্ত করে নিজে নিজেই আওড়ায়,
‘সাহেবা তুই আমার জন্য সর্বনাশের এক নাম। আবার উল্টো করে ধরতে গেলে তোর সর্বনাশের নাম সাহিত্য। আমি তাকাবো না তোর দিকে। তুই আসিস না সাহেবা। আর এগোস না।’
কিন্তু সাহেবা কি শোনে? শোনে না। সাহিত্যর কাছাকাছি এসে সাইরাহ্ দাঁড়ায়। সাইরাহ্ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘মুখ ঢাকতে বললেন না? আপনারও তো অ’মঙ্গল হবে।’
‘এটা তোর কথা, আমার না।’
‘হ্যাঁ এজন্যই আর মুখ ঢাকিনি। এতোদিন তো সবার মঙ্গল করে আসলাম, ভাবছি এবার থেকে একটু অ’মঙ্গল করবো।’
সাহিত্য মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে হাসে৷ সে জানে এই কথার মানে। হৃদয়ে একটা শান্তির ঢেউ খেলে যায়। ফিরে তাকায় সাইরাহ্-র দিকে। তারপর ঠাট্টার সুরে বলে,
‘সর্বনাশ সাহেবা! তোরে কি ভুতে টুতে ভর করলো নাকি? চল চল কবিরাজ কাকার বাড়ি যাই।’
সাইরাহ্ চোখ গরম করে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘আপনি জীবনেও ভালো হবেন না সাহিত্য ভাই। আজীবনের শ’য়’তা’ন। আ’ধা’পা’গ’ল লোক।’
শেষের দুই শব্দ নিচু স্বরে বলে। সাহিত্য ঠোঁট কামড়ে হাসে। ফিসফিস করে আওড়ায়, ‘শুধু আ’ধা’পা’গ’ল না সাহেবা পুরো পাগল। একদম উ’ন্মাদ৷’
সাইরাহ্ শুনতে পায় না। ফিরে যাওয়ার আগে সাহিত্যের চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আমি আপনাকে যা-ই বলি আপনি কোনোদিনও আমাকে উল্টো কোনো ক’টু কথা শোনাননি। তবে মাঝে মাঝে মন খারাপে এমন খোঁচা দিয়েছেন কা’টার মতো বিঁধেছে। তবে আমি তবুও আপনার ওপর কৃতজ্ঞ। আপনিই আমার প্রথম প্রেরণা, সাহস। আপনিই প্রথম যে আমাকে লড়তে বলেছে।’
শেষের দু লাইন বলতে গিয়ে সাইরাহ্-র গলা কেঁপে ওঠে। চোখ ফিরিয়ে নেয়। হঠাৎ ই মনে হয় একটা কিছু তাকে ছুঁয়ে গেলো। কি যেনো এক অনুভূতি তার হৃদয়ে চিনচিনে ব্যাথা দিলো। না সে সাহিত্যকে ভালোবাসে না। কিন্তু সাহিত্যের চোখে তাকিয়ে সে ওই চোখের গভীরতা টের পেতে পেতেও যেনো পায় না। সাইরাহ্ বুকে হাত দিয়ে অবাক হয়। দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। সাহিত্য হাসে। বুকে হাত রেখে বলে,
‘চোখের গভীরতা নিয়ে কখনো ভাবিস না সাহেবা। তুই পু’ড়ে যাবি। আমি চাই না তুই আমার জন্য পু’ড়ে যা। আমি তোকে চাই না সাহেবা। একদম চাই না।’
শ্বাস আটকে কথাগুলো ঠিকই বলে। কিন্তু সত্যিই কি সে চায় না সাহেবাকে? হৃদয় তো ঠিকই যুদ্ধ ঘোষণা করে। সাহিত্য নিজের জায়গা ছাড়তে ছাড়তে বিষাদ হেঁসে বলে,
‘তুই বলিস আমার কথা তোকে কাঁটার মতো বিধায় অথচ ভালো খেয়াল করলে দেখতে পেতি আমার সব কথাতে তোর জন্য খোঁচা ছিলো কেবল তোকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জবাব দেওয়ানোর জন্য। আমার সাথে কথা কাটাকাটির পর্যায়ে তুই দুনিয়ার সব নিয়ম, নিষেধ ভুলে যাস সাহেবা। তুই বুঝিস না।’
চলবে..