সাহেবা পর্ব-০৭

0
32

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
____

৭.
আজ কাকলীর বিয়ে। সাইরাহ্ গতকালের সব ঘটনা মনে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিছানার নিচে বড় একটা ট্রাঙ্ক রাখা। সাইরাহ্ নিচু হয়ে ট্রাঙ্কটা বের করে তার মাঝে থেকে শাড়ি গুলো নেড়েচেড়ে দেখে। এখানে তার বিভিন্ন রঙের শাড়ি। কিছু ছাপা শাড়ি আর কিছু দু রঙে মিশানো শাড়ি। সাইরাহ্ হাত দিয়ে ছুয়ে দিয়ে ভাবে বিয়ের আগের কথা। আগাগোড়াই সে শাড়ি পড়তো। মূলত বয়সটা ১০ পেরোনোর পর থেকেই তাহেরা তাকে শাড়ি পড়াতো। এঝন সবই স্মৃতি। সে চাইলেই শাড়িগুলো থেকে একটা বেছে নিয়ে পড়তে পারবে কিন্তু এটাও সত্যি তার তো স্বামী মা’রা গেছে। নিজেকে রংহীন দেখতে দেখতে এখন আর তার গায়ে রং টা ঠিক মানানসই মনে হয় না। রং বেরঙের শাড়িগুলো সরিয়ে নতুন একটা সাদা শাড়ি বের করে সাইরাহ্। তারপর পড়ে নেয়। মুখে কোনোরকম প্রসাধনী না মেখেই চুলগুলো বেনুনী করে নেয়। কেবল মাথায় কাপড় দিয়ে ঘর থেকে বের হয়। বর আসবে জুম্মার নামাজের পর। মেয়ে পক্ষ থেকে যাদের দাওয়াত করা হয়েছে সবাইকে আগে যেতে বলেছে কাকলীর বাড়ি থেকে। সাইরাহ্ বের হয়ে মায়ের কাছে যায়। তাহেরা তাড়া দিয়ে বলে,

‘হইছে তোগো? তাড়াতাড়ি চল।’

দাদী গতদিন গায়ে হলুদে না গেলেও আজ বিয়েতে যাবে। সাইরাহ্-কে মুখ না ঢেকেই আসতে দেখে তিনি চোখ মুখ কুঁচকান। মুখ ঝামটা মে’রে বলে,

‘এ্যাই অ’পয়া মাইয়া! মুখ ঢাকোস নাই ক্যান? নিজের অ’পয়া মুখডা কী লোকরে দেখাইতে দেখাইতে যাইবি নাকি? মুখ ঢাক।’

সাইরাহ্ যেনো শুনেও শুনলো না। আপাতত সে দাদীর সাথে তর্কে যেতে চাচ্ছে না। বাড়িতে সবুর মিয়া নেই। তিনি সকাল থেকেই কাকলীদের বাড়িতে। সেখানে অনেক কাজে তিনিও হাত লাগিয়েছে। সাইরাহ্ ব্যস্ত কন্ঠে তাহেরাকে বলে,

‘আম্মা, তাড়াতাড়ি করেন। বরপক্ষ চলে আসলে ঝামেলা হবে কাকিদের। চলেন!’

তাহেরা এক পলক মেয়ের দিকে তাকান। অন্য দিনের মতো মেয়ের মুখে আজ ভয়, কুঁকড়ে যাওয়া অনুভূতিগুলো নাই। মুখ ফুটে কিছু বললেন না তিনি। গতদিন কাকলীর মায়ের করা প্রতিবাদে তার নিজেরও শিক্ষা হয়েছে। মা হয়ে মেয়ের পাশে না থাকতে পারলে কিসের মা সে? তাই চুপচাপ সোহেলকে তৈরী করানো শেষে হাঁটা শুরু করতে করতে নিজের শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন,

‘আম্মা উডেন। যাইবেন না?’

দাদী তেতে উঠলেন। কটমট করে বলেন, ‘তোর এই অ’পয়া মাইয়ারে ক মুখ ঢাকতো নাইলে বাইরে যাইয়া কথা শুনোন লাগবো আমাগো। এমনেই তো বিধেবা হইয়াও যাইতেছে তারওপর ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা তো মুখ খুইলাই হাঁটা ধরসে।’

সাইরাহ্ নিজের মতো বাড়ি থেকে বের হতে হতে বলে, ‘আমি এভাবেই যাবো দাদী। আপনার ইচ্ছে হইলে আসেন আর নাহলে বাড়িতে থাকতে পারেন। ওইটা আমার সইয়ের বিয়ে৷ আর আমার অ’পয়া মুখ দেখে মানুষের সমস্যা হইলে তারা চোখ বন্ধ রাখুক।’

দাদী পেছন থেকে চেঁচাতে শুরু করেন। সাইরাহ্ এবারও পাত্তা দেয় না। তাহেরা মেয়ের বদলে অবাক হওয়ার পাশাপাশি খুশিও হয়। কিন্তু শাশুড়ির সামনে তেমন কিছু বলেন না। বরং শাশুড়িকে অনুরোধ করে,

‘আম্মা থাউক! আপনে আর চিল্লাইয়া নিজের শরীলডা খারাপ কইরেন না৷ ওরে পরে কইয়েন যা কইবেন।’

দাদী পারে না শুধু সাইরাহ্-কে কথাতেই মে’রে ফেলতে। বকতে বকতে এগোতে থাকে। তাহেরা প্রচন্ড বিরক্ত হয়। সাইরাহ্ সোহেলের হাত ধরে আগে আগে হাঁটছে। সোহেল বার বার সাইরাহ্-র মুখের দিকে তাকাচ্ছে দেখে সাইরাহ্ শুধায়,

‘কি হইছে ভাই?’

সোহেল গাল ভর্তি হেঁসে উৎসাহ নিয়ে বলে, ‘তোমারে আজ খুব সুন্দর লাগতেছে বুবু।’

সাইরাহ্ হাসে। রাস্তায় অনেকেই কাকলীর বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। সাইরাহ্-কে এভাবে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে৷ সাধারণত সে মুখ ঢেকে বের হয় না। পথে দেখা হয়ে যায় গ্রাম প্রধানের পরিবার আর সাহিত্যের বাড়ির লোকদের সাথে। নাজিরা দুর থেকে সাইরাহ্-কে আসতে দেখে দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সীমান্তের দিকে। সীমান্ত মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাইরাহ্-র দিকে। নাজিরা ফের তাকায় সাইরাহ্-র দিকে। অপলক তার দিকে তাকিয়ে নিজ মনেই আওড়ায়,

‘তোমার মধ্যে কি আছে সাইরাহ্ বুবু? যা আমার মধ্যে নাই! তোমার দিকে মানুষটা এতো মুগ্ধতা নিয়ে তাকায় অথচ আমার দিকে তাকায়-ই না। আর আমি তার জন্য নিজেকে সাজাই। কে বলে তুমি অ’পয়া? অ’পয়ারা কি এতো ভালোবাসা পায়?’

তার ভাবনার মাঝেই প্রধান গিন্নি নাক সিটকে বলে ওঠে, ‘দেখসো কামগুলা! একটা শুভ অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগেই কালা বিলাই রাস্তা কা’টলো।’

কথাগুলো যে তিনি সাইরাহ্-র উদ্দেশ্যে বললেন এটা কারোরই বুঝতে বাকি নেই। সাইরাহ্-র কানেও কথাগুলো গেছে। সে সরাসরি মাথা তুলে তাকায় সীমান্তের দিকে। সীমান্ত নিজের মায়ের দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে বিরক্ত। সাহিত্যের মা সুফিয়া বলে,

‘আহা ভাবী! থাউক এহন। চলেন!’

সাইরাহ্ হাসি মুখে সালাম দেয়। তারপর কারোর দিকে না তাকিয়ে প্রধান গিন্নিকে বলেন, ‘কাকি এই রাস্তা তো কালো বিলাই কা’টছে। আপনি এই রাস্তা দিয়ে গেলে বিপদে পড়তে পারেন। ঘুরে বাগানের রাস্তা দিয়ে যান নাহলে বাড়ির দিকে যান। অযথা বিপদ বাড়াবেন না কাকি।’

শেষের কথাটা এমনভাবে বলে যেনো সে খুবই চিন্তিত বিষয়টা নিয়ে। সবাই বোঝে কথাগুলো উত্তর ছিলো। প্রধান গিন্নি রাগে কিছু বলতে গেলে সুফিয়া থামিয়ে দেয়। সাইরাহ্ না থেমে চলে যায়। সীমান্ত হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। নাজিরা আবারও দু বার দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসে।


সাইরাহ্ এসে ঘরের মাঝে কাকলীর কাছে বসেছিলো। তার কাঁধেই ভার পড়েছে কাকলীকে সাজানোর। সাইরাহ্ মানা করলেও কাকলীর মা শোনেননি। আশে পাশের মহিলারা তখনও ক’টুক্তি করেই চলেছে। তবে আজ কোনো কথা-ই কানে তোলেনি সে। নিজমনে কাকলীকে সাজানো শেষ করতেই প্লেট হাতে ঘরে আসে কাকলীর মা। ব্যস্ত গলায় বলেন,

‘তুমি এইহানেই বইসাই খাও।’

সাইরাহ্ আমতা আমতা করে বলে, ‘আমি তো ওখানেই খেতে পারতাম কাকি। এতো কিছু করার দরকার ছিলো না।’

কাকলীর মা চলে যেতে গিয়েও গেলেন না। একবার আশপাশটায় চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘দেহো মা! দরকার হয়তো আছিলো না কিন্তু এইডা আমি করছি। খাওয়ার সময় কেউ দুইডা কটু কথা কইলে তহন আর খাওয়াডা ভেতরে যাইবার চায় না। আমি চাই নাই তুমি খাওয়ার সময়ও ওইসব সহ্য করো! তাই ঘরেই খাও।’

সাইরাহ্ মাথা নিচু করে মাথা নাড়ায়। কাকলীর মা সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তাকে খেতে বলে। পাশ থেকে কাকলীও সাইরাহ্-কে খেতে বলে। সাইরাহ্ খাওয়া শুরু করে। কাকলী হেঁসে বলে, ‘আমার আম্মা আমার থেইকা তোরে বেশি ভালোবাসে দেখি।’

সাইরাহ্ শুধু হাসে। তার খাওয়া শেষ হতেই বাহির থেকে শব্দ ভেসে আসে ‘বর এসেছে, বর এসেছে’। সাইরাহ্ ভাবে এখন তার এই ঘরে থাকা উচিত হবে না। সে নিজের গ্রামের মানুষের সাথে লড়াই করে নিবে কিন্তু কাকলীর বিয়েটা তার জন্য ভেঙে গেলে এটা তার জন্য খুব কষ্টের বিষয় হবে। তাই দ্রুত পায়ে থালা হাতে নিয়ে কাকলীর উদ্দেশ্যে বলে,

‘আমি আসছি।’

পেছন থেকে কাকলী ডাকলেও সাইরাহ্ শোনে না। ব্যস্ত পায়ে ঘর থেকে বের হতে গেলে এঁটো থালার সাথে ধাক্কা লাগতে লাগতেও লাগে না। সাইরাহ্ চঞ্চল চোখে দৃষ্টি উচু করতেই নজরে আসে সাহিত্যের মুখ। সাহিত্য দু পা পিছিয়ে গিয়ে ক্লান্ত গলায় বলে,

‘সাবধানে হাঁটতে পারিস না সাহেবা? এখনই ধাক্কা লাগলে কি হতো? তোর কোমড়টাও যেতো আর আমার পাঞ্জাবিটাও সাদা থেকে হলুদ হয়ে যেতো।’

সাইরাহ্ পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে, ‘কথা কম বলতে পারেন না?’

সাহিত্য জবাব দেওয়ার আগেই সাইরাহ্ চলে গেছে। সাহিত্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের বাহিরে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিয়ে ডাকে কেউ আছে কি না! কিন্তু কাকলী বলে কেউ নেই সে ছাড়া। সাহিত্য বিরক্তিকর কন্ঠে বলে,

‘বউরে রেখে সব কই হারাইছে ভাই? আশ্চর্য বিয়ে বাড়ি।’

সকাল থেকে বিয়ে বাড়িতে তারা ছুটে বেড়াচ্ছে। যার দরুণ প্রচন্ড ক্লান্তি এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাহিত্য ফিরে গিয়ে কাকলীর মা’কে খুঁজে জানিয়ে দেয়। এরপর যা বলতে এসেছিলো তা বলে দ্রুত ফিরে যেতে নেয় খাবারের জায়গায়। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে সাইরাহ্-কে বাগানের দিকে যেতে দেখে সে একবার খাবারের জায়গার দিকে তাকিয়ে তার পিছেই ছুট লাগায়। ডাকে, ‘এ্যাই সাহেবা, দাঁড়া!’

সাইরাহ্ পিছে ফিরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সাহিত্য কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে যায়। একটু হাপিয়ে যাওয়া স্বরে শুধায়, ‘কই যাস? সবাই বিয়ে বাড়িতে, তুই একা একা ওদিকে কই যাস?’

‘বাগানে যাই। গরম লাগছে, ওদিকটায় ভালো বাতাস।’

‘বাড়িতেও তো গরম নেই। বিয়ে উপলক্ষে ফ্যান লাগানো হয়েছে। তাহলে? সত্যি করে বল তো মাথার তার কে’টে গেছে নাকি?’

সাইরাহ্ জানে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তাই উল্টো ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘ওখানে আপাতত আমার কাজ নেই। বরং বরপক্ষ আমাকে দেখলে ঝামেলা করবে। অযথা কাকলীর বিয়েতে ঝামেলা বাড়িয়ে কাজ নেই।’

সাহিত্যও হাঁটা শুরু করে। কাল রাতেও তারা বিয়ে বাড়িতে ছিলো। কাকলীর কোনো ভাই নেই। কাকলীর বাবা, কাকার পাশাপাশি তারা গ্রামের ছেলেরা মিলেই হাতে হাতে সব এগিয়ে দিচ্ছে। কাল রাতে সব গুছিয়ে বাড়ি যেতে যেতে অনেক রাত হয়ে গেছিলো। আজ আবার ভোর ভোর উঠতে হয়েছে। ঘুম কম, কাজ বেশি হওয়ায় শরীর আর চলছে না। সাহিত্য হেলেদুলে সাইরাহ্-র পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত গলায় বলে,

‘কাল না এত্তো কথা বললি আজই সব শেষ?’

সাইরাহ্ জবাব না দিয়ে শুধায়, ‘আপনাকে দেখে বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছে সাহিত্য ভাই। আপনি বাড়ি চলে যান। গিয়ে একটু ঘুমিয়ে আসেন।’

সাহিত্য ঠাট্টার স্বরে বলে, ‘কাজগুলো কি তুই করে দিবি সাহেবা? তুই তো আগেই পালিয়ে যাচ্ছিস তাহলে কিভাবে করবি?’

‘থাক! আপনার আর যেতে হবে না। আপনি ফিরে কাজেই যান।’

‘আচ্ছা।’

মুখে ‘আচ্ছা’ বললেও সাহিত্য গেলো না। বরং পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতেই থাকে। সাইরাহ্ কপাল কুঁচকায়। সাহিত্য তাড়া দিয়ে বলে, ‘জোড়ে হাঁটা লাগা সাহেবা। তোকে বাড়িতে দিয়ে এসে আমি আবার বিয়ে বাড়িতে ফিরে যাবো। বাড়িতে কেউ আছে?’

সাইরাহ্ দাঁড়িয়ে যায়। অবাক হয়ে বলে, ‘বাড়ি যাবো কে বললো? আপনি ফিরে যান। আমি বাড়ি যাবো না।’

‘এই অসময়ে বাহিরে থাকা ঠিক হবে না।’

সাহিত্যের কন্ঠে খানিকটা গম্ভীরতা টের পাওয়া যায়। সাইরাহ্ তা পাত্তা না দিয়ে বলে, ‘আপনার কথা শুনতে হবে আমার? শুনবো না। আমি এখন বাড়ি যাবো না।’

‘দেখ সাহেবা! এটা জিদ করার সময় না। তুই নিজেই ভেবে দেখ এইসময় বাহিরে থাকা ঠিক হবে কি না! এমনিতেই একদিন কি না কি দেখেছিলি তারওপর আবার পরেরদিন ফিরোজ তাঁতির মেয়ে মা’রা গেলো! বাড়ি যা।’

সাইরাহ্ কথা বাড়ায় না৷ সেদিনের সেই র’ক্ত মাখা মুখটার কথা মনে পড়লে তার আত্মা শুকিয়ে আসে। কি ভ’য়ং’কর এক দৃশ্য! সাইরাহ্ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ব্যস্ত গলায় বলে,

‘বাড়ি ফাঁকা। আমি বাড়ি যাবো না। চলেন ফিরে যাই!’

‘হ্যাহ? ফিরে যাবি?’

সাইরাহ্ মাথা নাড়ায়। সাহিত্য সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিরে হাঁটা লাগায়। জোড়েই বলে, ‘আমাকে বলিস আ’ধা’পা’গ’ল অথচ নিজের মাথার সবগুলো তার-ই কা’টা।


খাওয়া শেষে বেলী একা একা বসে আছে। সবাই বিয়ের ওদিকে গেছে। ছন্দ যে কোথায় তা সারা বাড়ি খুঁজেও পায় না। হতাশ হয়ে এক পাশ বসে মনে মনে বকতে থাকে ছন্দকে। বেলীকে একা একা বসে থাকতে দেখে তামজীদ কাজ ছেড়ে এগিয়ে আসে। গলা পরিষ্কার করে ডাকে, ‘বেলী!’

বেলী চমকায়। চমকে পেছনে তাকাতেই তামজীদের চোখে চোখ পড়ে যায়। দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তামজীদ গম্ভীর কন্ঠে শুধায়, ‘একা একা এখানে বসে আছো কেনো? কাকিরা সবাই কোথায়?’

বেলী মাথা নিচু করে নিচু স্বরে বলে, ‘ছন্দকে পাচ্ছি না। আর বাকি সবাই বিয়ের ওদিকে।’

‘তাহলে তুমিও যাও।’

‘আম্মা মানা করছে। ছোটদের নাকি বিয়ে দেখতে নেই।’

তামজীদ ঠোঁট কামড়ে হাসে। বেলী দেখে না। তার দৃষ্টি তো নিচের দিকে। বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দে নিজেই ভয় পায় বেলী। এই বে’য়াদব, দুর্বল হৃদয়টা তাকে কবে যেনো মে’রে ছাড়বে। তামজীদ ভাইকে দেখলে তার ভয় লাগে সাথে এক অজানা অনুভূতি গলায় চেপে বসে। এই অনুভূতির নাম সে জানে না। কিন্তু তার এই অনুভূতি ভালো লাগে৷ তার ভাবনার মাঝেই তামজীদ বলে ওঠে,

‘তুমি আর ছোট কই? ক’দিন পর তো তোমাকেও শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেবে।’

বেলী চট করে তামজীদের দিকে তাকায়। তামজীদের দৃষ্টি শান্ত। বেলী চোখ পিটপিটিয়ে শুধায়, ‘কোথায়?’

তামজীদ মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে হাসে। কেমন বোকা প্রশ্ন এটা! তার শ্বশুরবাড়ি কোথায় এটা সে জানবে কেমন করে? তামজীদ প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে শুধায়, ‘পড়ালেখা করছো মন দিয়ে?’

বেলী বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘করছি। কিন্তু মন দিয়ে না। ভালোই লাগে না। কবে যে এই পড়ালেখার ঝামেলা শেষ হবে!’

‘তুমি পড়ালেখাকে ঝামেলা মনে করছো আর অনেকে পড়ালেখা করতে না পেরে আফসোস করছে। তাই ঝামেলা ঝুমেলা না ভেবে মন দিয়ে পড়ো। আর এখানে একা না থেকে ওদিকটায় গিয়ে বসো।’

বেলী শুধু তাকিয়ে থাকে। তামজীদ চলে যেতে গিয়েও ফিরে আসে। অদ্ভুত কন্ঠে বলে, ‘বেলীফুল ছাড়া তোমাকে অসম্পূর্ণ লাগে বেলী।’

বলেই পকেট হাতড়ে একটা বেলীফুল বের করে বেলীর হাতে দিয়ে দেয়। বেলী হা করে তামজীদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তামজীদ ততক্ষণে চলেও গেছে। বেলী বেলীফুলটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে ক’বার কথাগুলো আওড়ায়। বিড়বিড় করে বলে,

‘বেলীকে বেলীফুল ছাড়া অসম্পূর্ণ লাগে? কেনো?’

চলবে..