#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
____
৮.
কাকলীর বিদায় শেষ করে সাইরাহ্সহ সবাই বাড়ি ফিরে আসে। প্রিয় বান্ধবীকে বিদায় দিয়ে তার মনটা ভারী হয়ে আছে। বিয়ের পর মানুষের জীবন বদলে যায়। অনেক বদলে যায়। আর চাইলেও সহজে দেখা হবে না তাদের। তবে ফিরে আসার সময় অনেক দোয়া সে দিয়ে এসেছে। এই মেয়েটা কখনো তাকে পর করে দেয়নি। তাদের এতো ভালোর বিনিনয়ে যেনো তাদের ভালোটাই হয়। আল্লাহ তার মতো ভাগ্য আর কোনো মেয়েকে দেয়নি। তার ভাবনার মাঝেই বাহির থেকে চেঁচানোর শব্দ ভেসে আসে। সবুর মিয়া চেচাচ্ছে। সাইরাহ্ ব্যস্ত পায়ে বেড়িয়ে আসে। সামনাসামনি এসে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তার গালে থা’প্প’ড় পড়ে। ছিটকে পড়ে উঠানে। তাহেরা ছুটে আসে। মেয়েকে আগলে নিতে গেলে সবুর মিয়া বি’শ্রী কয়েকটা গা’লি দিয়ে এগিয়ে এসে ওভাবেই একটা লা’থি মা’রে। ব্যাথায় সাইরাহ্-র রীতিমতো চোখ উল্টে যায়। লা’থিটা তার পেটে পড়েছে। পেট চেপে ধরে আর্তনাদ করে। আর কোনো লা’থি মা’রার আগেই তাহেরা পা চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
‘দোহায় লাগে মাইয়াডারে আর মা’ই’রেন না। আপনার পায়ে ধরি ওরে ছাইড়া দেন।’
সবুর মিয়া রেগে বলেন, ‘পা ছাড় কইতাছি তাহেরা। ওরে আজ আমি মা’ইরা ফা’লামু।’.
সাইরাহ্ ততক্ষণে কোনো রকমে সরে গেছে। পেটে হাত চাপা দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বসে। নিজেকে সামলে চোখ মেলে শান্ত স্বরে শুধায়, ‘আমার দোষ কি আব্বা?’
কথাটা শোনা মাত্রই সবুর মিয়া আরো ক্ষে’পে যায়। তাহেরার পা ধরা অবস্থাতেই এগোতে চায়। তাহেরা চেঁচিয়ে বলে, ‘তুই ঘরের মধ্যো যা সাইরা। যা তুই!’
বারান্দার চৌকিতে বসে সবই দেখছেন দাদী। তবে কোনো কথা বলছেন না। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছেন গায়ে। সাইরাহ্ সত্যি সত্যি ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। সবুর মিয়া তখনো গা’লি গা’লা’জ করছেই। সাইরাহ্ ঘরের মাঝে না গিয়ে বারান্দায় থাকা মাটির কলসি এনে সোজা উঠানে মা’রে এক আছাড়। সবাই হা হয়ে যায়। সবুর মিয়ার মুখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। বারান্দার ওপর থেকে দাদী হায় হায় করে ওঠেন,
‘হায় হায়! আমার সোয়ামীর পয়সায় কেনা শেষ কলসীডাও এই অ’লক্ষী ভাইঙ্গা ফালাইলো রে! সবুর বাপ রে! এই পো’ড়ামু’খী রে তুই এহনো কিছু কইবি না?’
সাইরাহ্ শান্ত দৃষ্টি নিয়ে ফিরে তাকায় দাদীর দিকে। নিচ থেকে ভাঙা এক টুকরো উঠিয়ে নিয়ে দাদীকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আ’গুনে ঘি ঢালা হয়ে গেলে নিজের মুখটা বন্ধ করেন।’
সবুর মিয়া তেতে এগোতে নিলে সাইরাহ্ টুকরোটা সামনে ধরে। আগের মতো করেই বলে, ‘এক পা-ও আগাবেন না আব্বা। আমারে বিনা দোষে আপনি মারতে পারেন না। কি করছি আমি? আপনি আমার সাথে এমন অ’মানবিক ব্যবহার কেনো করতেছেন? কি করেছি?’
‘একে তো অ’ন্যায় করছোস তারওপর আবার আমারেই ভয় দেখাস! সাইরা তোরে কিন্তু আমি মা’ইরা ফা’লামু।’
‘ফালায়েন। আগে আমার প্রশ্নের জবাব দেন। কি দোষ করছি?’
‘কি করস নাই তুই? বাড়িত্তে বের হওয়ার সময় আমার আম্মার লগে ব্যাকা কথা কইছোস, আবার মুখ না ঢাইকা ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা নিজের অ’পয়া মুখ নিয়া ঘুইরা বেড়াইছোস, প্রধান গিন্নির লগে বে’য়া’দ’বি করছোস৷ এহন আমার লগে করতাছোস! তোর কলিজা বড় হইয়া গেছে তাই না?’
সাইরাহ্ হেঁসে ফেলে। পাগলের মতো শব্দ করে হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে। চোখের কোণা বেয়ে পানি গড়াতে শুরু করে। তাহেরা মেয়ের কষ্ট পাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ সাইরাহ্ শ্বাস টেনে হাতে থাকা টুকরা সজোরে নিচে ছুড়ে মা’রে। ওটাও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সবুর মিয়ার চোখে চোখ রেখে বলে,
‘আমার বড্ড আফসোস লাগে আব্বা। কেন আমি মেয়ে হয়ে জন্মাইলাম? কেন আমি আপনার মতো বাপের মাইয়া হইলাম? কেন? আল্লাহ আমারে কেন আপনার ঘরে পাঠাইলো? শুনছিলাম মাইয়ারা তার বাপের রাজকন্যা হয় আর আমি! আজীবন বোঝা হয়ে থাকলাম। আপনি আমার আব্বা লাগেন এইটা ভাবলেও আমার ঘৃ’ণা লাগে। নিচের এই কলসী যতগুলো টুকরো হয়েছে, আমাকেও আপনি ততগুলো টুকরো করে ছেড়েছেন। গায়ে হাত দিয়ে যতটা আঘাত করেছেন তার থেকেও বেশি আঘাত করেছেন জিভ দিয়ে। আব্বা আমি ম’ইরা গেলে সেই হিসাবটা তো আপনি দিবেন না তাই দাঁতে দাঁত চাইপা বাঁইচা আছি। কিন্তু আমি আপনারে কিছু বলবো না। আমি আমার বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।’
সাইরাহ্ এলোমেলো পায়ে ফিরে ঘরের দরজার দিকে যায়। উঠানে বসে তাহেরা কাঁদছে। সবুর মিয়া মুখ দিয়ে গা’লি বের করতে চেয়েও পারলেন না। দাদী মুখ ঝাপটা দিয়ে অন্যদিকে চেয়ে রইলেন। সাইরাহ্ ঘরের ভেতর ঢোকার আগে বলে দেয়,
‘আপনারে কিছু বলি নাই মানে ভাইবেন আমি আবার আগের মতো চুপ করে যাওয়া সাইরাহ্ হয়ে যাবো। না! আমি আর চুপ থাকবো না। এবার থেকে লড়াই করে বাঁচবো। যুদ্ধে যেমন মানুষ আ’ঘাতপ্রাপ্ত হয় তেমনই আমি ধরে নিবো এই সমাজের সাথে যুদ্ধের বিপরীতে আপনার এইগুলো আমাকে করা আ’ঘাত। কিন্তু সৈনিক যেমন পরাজয় মানে না আমিও মানবো না। এবার থেকে নিজের বেঁচে থাকার জন্য লড়বো। বাঁচার মতো বাঁচার জন্য লড়বো। আর না হয় আপনার হাতেই ম’রবো।’
সবুর মিয়া আবার চেঁচিয়ে ওঠে। সাইরাহ্ ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা আটকে দেয়। দরজার সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। বুকে হাত চেপে কাঁদতে শুরু করে। ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে হাঁটার স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আপন মানুষগুলাই মানুষকে বেশি আ’ঘাত করে। সাইরাহ্ মুখে আঁচল চেপে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট ভাষায় আওড়ায়,
‘আমারে দুর্বল করে দিয়েন না আল্লাহ। আমারে লড়াই করার শক্তি দেন। এই অ’সুস্থ সমাজের সাথে আমারে লড়ার শক্তি দেন। আপনি যেমন আমার ভাগ্যে কষ্ট লিখে দিছেন তেমন এই কষ্টের সাথে লড়াই করার শক্তিটাও দেন। ইয়া আল্লাহ! আমি সহ্য করতে পারি না, আমার বুকের ভেতর ক্ষ’ত হয়ে যায়, আপনি সব ক্ষ’তর ঔষধ হিসেবে আপনার রহমত দেন। আমারে বেঁচে থাকার শক্তি দেন।’
—
সাইরাহ্ সন্ধ্যার আগে আগে সময়ে বের হয়েছে৷ তাহেরা রান্না করছিলো, সবুর মিয়া দোকানে, দাদী নিজের ঘরে। সোহেল হয়তো খেলতে গেছে। গতদিনের ঘটনায় তার মনটা এখনো বি’ক্ষিপ্ত। চোখ মুখ ভাঙা ভাঙা হয়ে আছে৷ গতকাল সন্ধ্যায় সেই যে ঘরের ভেতর গিয়েছিলো আর বের হয়নি। তাহেরা কাল থেকে খাওয়ার জন্য কতবার ডেকেছে কিন্তু সে বের হয়নি। সেই বের হওয়া সে দুপুরে বের হয়েছিলো। গোসল করে ঘরে ঢোকার আগেই তাহেরা টেনে জোড় করে দু বার খাইয়ে দিয়েছিলো। গালে স্পষ্ট দাগ ফুটে উঠেছে। তাহেরার বুকের ভেতর লাগে দাগটা দেখে। সাইরাহ্ এলোমেলো পায়ে হেঁটে নদীর পাড়ে আসে। এই জায়গাটা তার একমাত্র দুঃখ বিসর্জনের জায়গা। নদীর পাড়ে বসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকে৷ মিনিট খানেক বাদেই ছুটে আসে সাহিত্য। অন্যদিনের মতো মজা না করে ধীরে সুস্থে এসে সাইরাহ্-র পাশে বসে৷ মাঝে খানিকটা দূরত্ব রেখেই বসেছে। বেশ শান্ত স্বরে শুধায়,
‘কাল কি হইছে?’
সাইরাহ্ ফিরে তাকায়। চোখ মুখের এই অবস্থা দেখে সাহিত্য নড়েচড়ে বসে। হৃদপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়। সাইরাহ্ জবাব দেয়, ‘যা হয় আমার সাথে তাই হয়েছে।’
‘কাকা তোর গায়ে হাত তুলেছে?’
‘আপনাকে কে বললো?’
‘তোর গাল স্পষ্ট বলছে।’
‘অতো স্পষ্ট ভাবে সব দেখতে হয় না সাহিত্য ভাই।’
সাহিত্য হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বড় বড় শ্বাস নেয়। চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। নীরবতা ভাঙিয়ে সাইরাহ্-ই বলে, ‘চলে যান সাহিত্য ভাই। একটু একা থাকতে চাই।’
‘একা থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে? তুই তো প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলি তাহলে পিছিয়ে যাচ্ছিস কেনো?’
‘পিছিয়ে যাচ্ছি কোথায়?’
‘তাহলে প্রতিবাদ করছিস না কেনো? এতো অ’ন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ কেনো করছিস না?’
‘যতটা সহজ ভাবে বলছেন ততটাও সহজ সব না। নিজের আব্বার বিপক্ষে প্রতিবাদ করাটা কি এতো সহজ? আমি তবুও করেছি তো। যা করেছি অনেকটা করেছি৷ বাকিটাও করে নেবো।’
সাহিত্য হুট করেই প্রশ্ন করে, ‘সীমান্তকে ভালোবাসিস?’
সাইরাহ্ চমকে তাকায়। সাহিত্য চোখের দিকে তাকিয়ে শ্বাস আটকে বলে দেয়, ‘তুই চাস ওকে বিয়ে করতে?’
সাইরাহ্ চোখ ফিরিয়ে নেয়। কাঠকাঠ গলায় জবাব দেয়, ‘না। আমি উনার পরিবারের সাথে লড়তে পারবো না। এখন সাহস করতে পারছি তখন পারবো না।’
সাহিত্য উঠে ফিরে চলে যায়। সাইরাহ্ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। লোকটার মাথা কি ন’ষ্ট হয়ে গেলো! এমন একটা আজব প্রশ্ন করে আবার কোথায় চলে যাচ্ছে! সাহিত্য সাইরাহ্-র চোখের আড়াল হয়ে একবার পিছে তাকায়। চোখ বন্ধ করে শ্বাস আটকে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
‘তোর সুখ আমি কোথায় খুঁজবো সাহেবা! আমার কাছে তুই সুখী হবি না। সীমান্ত যতটা ভালোবাসে তাতে আমি বুঝতে পারি না তুই সুখী হবি কি না!’
কিন্তু হৃদয় বলে, ‘তুই আমার হয়ে যা সাহেবা। আমি তোর সুখের জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়ে যাবো।’
—
সোহাগীর মা গোধূলির আগের সময়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসলেন সাইরাহ্-দের বাড়িতে। সাইরাহ্ তখন মায়ের নিজের ঘরে। মহিলা গ্রামেরই একজন সদস্য। তিনি এসেই সাইরাহ্-কে জোড়ে জোড়ে ডাকতে শুরু করেন। সাইরাহ্ বাইরে আসতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
‘আমার সোহাগীরে দেখছোস রে সাইরা? আমার মাইয়ারে খুঁইজা পাইতাসি না রে।’
বলেই তিনি জোড়ে জোড়ে কাঁদতে শুরু করেন। সাইরাহ্ ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এসে মহিলাকে আগলে ধরে। ব্যস্ত কন্ঠেই শুধায়,
‘কি বলেন কাকি! পাইতেছেন না মানে! কোনো আত্মীয়ের বাড়ি যায় নাই তো?’
‘না রে! আমার মাইয়ারে সব জায়গায় খোঁজা শ্যাষ। তাও পাইলাম না রে। কই গেসে আমার সোহাগী?’
মহিলাকে কোনো মতে শান্ত করে বাড়ি পাঠায় সাইরাহ্। একেই নিজের জীবনে এতো সমস্যা তার মধ্যে সোহাগীর কথা শুনে সারা রাত চিন্তায় ঘুম হয় না। এপাশ ওপাশ করতে করতেই কেটে যায় পুরো রাত। পরের দিন সকালে গ্রামের শেষে কাঁদা মাখা এক জমিতে সোহাগীর কা’টা ছেঁ’ড়া এক লা’শ উদ্ধার করা হয়৷ দেখলেই ভয় পাবে যে কেউ৷ এতো নৃ”শং’সভাবে কেউ কেমন করে একটা ১৩ বছরের মেয়েকে মে’রে ফেলতে পারে তা ভেবেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় সাইরাহ্-র।
চলবে..