সাহেবা পর্ব-০৯

0
30

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
____

৯.
সোহাগী নামের মেয়েটির লা’শ তোলা হয় কাঁদা থেকে। কাঁদায় জর্জরিত হওয়া সত্বেও বোঝা যাচ্ছে মেয়েটির ছিন্ন ভিন্ন শরীরটা। সাইরাহ্ দেখেই ভয় পায়। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। দু পা পিছিয়ে যায়। সোহাগীর বাবা মায়ের আহাজারিতে চারপাশ ভরে উঠেছে। তাদের এই একটাই মেয়ে। সোহাগী হওয়ার পর সমস্যার কারণে সোহাগীর মা আর বাচ্চা জন্ম দিতে পারেন নাই। একটা মেয়ে থাকা-ই তাদের আফসোস ছিলো না। কিন্তু এই সন্তানকেও কারা যেনো কে’ড়ে নিলো আজ। সাইরাহ্ করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সোহাগীর মায়ের দিকে। পুলিশ এসেছে। কথা বলছে গ্রামের সকলের সাথে। সাহিত্য, সীমান্ত, তামজিদ সবাই উপস্থিত। সাহিত্য সোহাগীর লা’শের দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নেয়। বিড়বিড় করে আওড়ায়,

‘কোন অ’মানুষ যে এই বাচ্চা মেয়েরে মা’রছে! ওরে একবার পাইলে আমি আজন্ম আফসোস করাবো।’

নিজের রাগ দমন করার চেষ্টা করে। দুরে তাকিয়ে দেখে সাইরাহ্ দাঁড়িয়ে। মুখ ঢাকা নেই শুধু মাথায় কাপড় দেওয়া। সাহিত্য সেই স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়েই রাগ কমানোর চেষ্টা করে। রাগ নিয়ন্ত্রণে এসে গেলে সাহিত্য এগোয় সাইরাহ্-র দিকে। সাইরাহ্-র পাশে দাঁড়াতেই সাইরাহ্ চোখ তুলে তাকায়। সাহিত্য শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধায়,

‘ভয় পাচ্ছিস?’

সাইরাহ্ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় ঢোক গিলে বলে, ‘না। খারাপ লাগছে।’

‘তোর নিজের জন্যই তো খারাপ লাগা শেষ হওয়ার কথা না, অন্যের ন্য কোথায় খারাপ লাগে?’

সাইরাহ্ অদ্ভুত ভাবে হাসে। বলে, ‘নিজের জন্য তো আমার খারাপ লাগে না সাহিত্য ভাই। নিজের জন্য আমার করুণা আসে। আমার ভাগ্যের ওপর মায়া লাগে।’

‘আর আমার তোর সবকিছুর ওপরেই মায়া লাগে।’

সাইরাহ্ চমকে তাকায়। কথাগুলো সাহিত্য আস্তেই বলছিলো কিন্তু সে আধো আধো শুনেছে। সাইরাহ্-কে এভাবে তাকাতে দেখে সাহিত্য থতমত খায়। সাইরাহ্ চাপা স্বরে বলে, ‘কি বললেন?’

সাহিত্য চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। তার মতোই চাপা স্বরে বলে, ‘তুই মাঝে মাঝে এমন ভাবে তাকাস! কবে মনে হয় আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে সাহেবা।’

‘আমি কিভাবে তাকালাম? আশ্চর্য!’

‘তুই নিজেই দেখ কিভাবে তাকিয়ে আছিস! এভাবে তাকাবি না সাহেবা। আমার ভয় লাগে।’

সাইরাহ্-র চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না সে কি এমন ভাবে তাকিয়েছে! তারপরেই ভাবে এই লোকের মাথার কয়টা তা’র তো এমনেই কা’টা। আর আ’ধা’পা’গ’ল লোকজন কখন কি বলে তারা নিজেরাও জানে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকায়। ইচ্ছে করে সাহিত্যকে কিছু শুনিয়ে দিতে পরক্ষণেই সোহাগীর জন্য মনটা বি’ষিয়ে ওঠে। সাহিত্যও আর ঘাটায় না। সাইরাহ্ আর সাহিত্যকে একসাথে দেখে সীমান্ত এগিয়ে আসে। সীমান্তকে দেখেই সাইরাহ্ দু কদম পিছিয়ে যায়। ব্যাপারটা দুজনেই খেয়াল করে। সাইরাহ্ এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সীমান্ত হেঁসে বলে,

‘আমি যখন ই দু পা এগোতে যাই তুমি তখনই দু পা পিছিয়ে যাও সাইরাহ্। অথচ এমনটা না হয়ে উল্টোটাও হতে পারতো। আমার মতো তুমিও দু পা এগোতে পারতে।’

সাহিত্যর হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়। সে বড় বড় দুটো শ্বাস নিয়ে নিজের মনকে বোঝায়। কিন্তু মন উল্টো জবাব দেয়, ‘যার ঠায় মনের গহীনে তাকে অন্য কেউ ভালোবাসার বাণী শোনালে তোমার মন ক্ষ’ত বি’ক্ষ’ত হবেই৷ অতএব হয় সহ্য করো নয়তো প্রতিবাদ করো।’

সাহিত্য ১ম টাই মেনে নিলো। তবে সহ্য করতে না পারলে সে যে উল্টো কিছু বলে বসবে না তার কোনো মানে নেই। তাই ভাবে এখান থেকে সরে যাবে। তার ভাবনার মাঝেই সাইরাহ্ বলে,

‘আপনার কিংবা আমার কারোর জন্যই দু পা এগোনো উচিত না সীমান্ত ভাই। দুজনের জন্য এটাই মঙ্গলের যে আমরা একে অপরের থেকে শুধু পিছিয়েই যাবো।’

সাহিত্য ফিরে তাকায় সাইরাহ্-র চোখের দিকে। সে চোখে স্পষ্ট অনুভূতিরা নাড়া দেয়। হৃদয়ের ব্যাথা যেনো বেড়ে আরো দ্বিগুণ হলো। সরে যাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো। ধাম করে চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবে,

‘আমি সাহেবাকে নিজের করতে পারবো না তাই আমার এগুলা মানতে হবে। কষ্ট হওয়া যাবে না।’

মনে মনে জপতে থাকে ‘কষ্ট হওয়া যাবে না’ কিন্তু মন কি এই কথা জপলেই কষ্ট হওয়া কমিয়ে দেবে! চোখ মেলে আবার সাইরাহ্-র মুখের দিকে তাকায়। সীমান্ত ব্যাথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘কেনো? একবার তোমাকে হারিয়ে আবার যখন পাওয়ার আশা করছি তখন আমি পেছোবো কেনো?’

‘কারণ আমি বিধবা। আমার জন্য কাউকে ভালোবাসা নিষেধ।’

এবার সীমান্ত কিছু বলার আগেই সাহিত্য শান্ত তবে গম্ভীর ভাবে শুধায়, ‘কেনো? তোকে কে মানা করছে সাহেবা? তোর মৃ’ত স্বামী নাকি তোর মন?’

‘আপনাদের এই সমাজ।’

‘তুই সমাজের কথা আর কতদিন ভাববি? আর কতদিন এই সমাজ সমাজ করে নিজের সুখগুলো বিসর্জন দিতে চাইবি? আর কতদিন? আর কতদিন শুধু এদেরটাই ভাববি? এদের এসব কু’সং’স্কারকে আর কতদিন প্রাধান্য দিবি?’

সাইরাহ্ হেঁসে বলে, ‘আচ্ছা ধরে নেন আমি সব ভাবা বন্ধ করে দিলাম। তাতে কি হবে? উনাকে ভালোবেসে আমার কি হবে? উনি বিয়ে করবে আমাকে? করতে দিবে উনার পরিবার? মানবে আমাকে? এখন যেভাবে দেখলে কা’টার মতো আ’ঘাত করে তখন হুট করেই বুকে টেনে নিবে?’

পাশ থেকে সীমান্ত বলে, ‘আমি মানাবো। প্রয়োজনে তোমাকে নিয়ে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো।’

সাইরাহ্ শুধু তাকায়। তারপর মাথার কাপড় ভালো করে টেনে নিয়ে সীমান্তকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলে, ‘বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন।’

সীমান্ত বা সাহিত্য কাউকেই কিছু বলার সুযোগ দেয় না। চলে যায়। সীমান্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকে ব্যাথিত দৃষ্টিতে। সাহিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে সীমান্তের কাঁধে হাত রাখে। ফাঁকা ঢোক গিলে বলে, ‘চিন্তা করিস না। সাহেবা তোর-ই হবে দেখিস!’

সীমান্ত তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কবে?’

সাহিত্য ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘তোর দেখছি আর তর সয় না। সময় হলেই হবে। সময় টা তো আসতে দে ভাই।’

সীমান্ত মাথা চুলকাতে চুলকাতে হাসে। দুজন একসাথে এগোতে শুরু করে। সীমান্ত কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে, ‘আচ্ছা তোকে একটা প্রশ্ন করি?’

‘কর।’

‘তুই সাইরাহ্-কে সাহেবা ডাকিস কেন?’

সাহিত্য দাঁড়িয়ে যায়। চোখে মুখে গম্ভীরতা এনে বলে, ‘ভালোবাসার মানুষকে মানুষ পছন্দের নামে ডাকতেই ভালোবাসে।’

সীমান্ত চমকে ওঠে। ফট করে তাকায় সাহিত্যের মুখের দিকে। হতবাক হয়ে শুধায়, ‘তুই সাইরাহ্-কে ভালোবাসিস?’

সাহিত্য কতক্ষণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থেকে হেঁসে ওঠে। সীমান্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বোকা কন্ঠে বলে, ‘হাসছিস কেনো? হাসার মতো কিছু বলেছি নাকি!’

সাহিত্য হাসি থামিয়ে বলে, ‘তোর মুখের অবস্থা দেখে না হেসে পারলাম না। আরেহ ভাই আমাকে দিয়ে ওসব ভালোবাসা টালোবাসা হবে না। আমি তো দেখছিলাম তোর প্রতিক্রিয়া কি হয়!’

সীমান্ত স্বস্তির শ্বাস ফেলে। পিঠের ওপর দুম করে একটা কিল বসিয়ে বলে, ‘আমার জা’ন-ই বের করে দিচ্ছিলি এখনই।’

‘আমি ওকে সাহেবা ডাকি অনেক আগে থেকে। আমার মনে আছে ‘ও’ একবার ওর মায়ের সাথে আমাদের বাড়ি গেছিলো। নাজিরা, বুবু ওদের সাথে খেলছিলো। ওর পুরো নাম ধরে ডাকতে ভাল্লাগতো না। জানি না তখন মাথায় কেন আসছিলো নামটা! তখন থেকেই এটা ডাকি।’

সীমান্ত বিশ্বাস করে। সাহিত্য অবশ্য মিথ্যা বলেনি। তবে আগের কথাটাও মিথ্যা ছিলো না। ছোট থেকে সে সাহেবা ডেকে যেমন অভ্যস্ত হয়েছে তেমন বড় হওয়ার পর প্রিয় মানুষকে সবার থেকে আলাদা করার জন্যই সাহেবা ডেকেছে। সাহেবার যেদিন বিয়ে হয়ে যায় সেদিন একা সীমান্তের বুক পোড়েনি। খুব গোপনে আরো একটি পুরুষের হৃদয়ও পু’ড়েছিলো। সাহেবার বিয়ের পরেরদিন সে জেনেছিলো সাহেবার বিয়ে হয়ে গেছে। পাশাপাশি সেদিনই জেনেছিলো সাহেবা বিধবাও হয়ে গেছে। সাহিত্য গোপনে বিষাদ নিয়ে হাসে। মনে মনে আওড়ায়,

‘তোর মতো আমিও যদি সাহেবাকে এভাবে বলতে পারতাম তবে হৃদয়ের ব্যাথা হয়তো কিছুটা কমতো। আমাদের দুজনের চাওয়া কিভাবে এক হয়ে গেলো আমি আজও ভেবে পাই না সীমান্ত। তবে তোর চাওয়া পূরণ হবে। সাহেবাকে আমি তার ভালোবাসা, ভালো থাকা পাইয়ে দেবো। আমারটা না হয় থাক অপূর্ণ, থাক খুব গোপনে। তবে সাহেবার জন্য ভালোবাসা আমার এক আকাশ জুড়ে।’


সোহাগীর লা’শ দেখতে বেলী আর ছন্দও এসেছিলো। সীমান্ত আর সাহিত্য তখন পুলিশের সাথে কথা বলছে। সাইরাহ্ ততক্ষণে চলে গেছে। তামজীদ বেলী আর ছন্দকে দেখে এগিয়ে আসে। বেলী তামজীদকে দেখেই চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। বিড়বিড় করে আওড়ায়,

‘ইনি এখানেও হাজির!’

তামজীদ কাছে এসে একবার ছন্দ আর একবার বেলীর দিকে তাকায়। তারপর ছন্দের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা এখানে কি করো?’

ছন্দ জবাব দেয়, ‘সোহাগীরে দেখতে আসছি।’

তামজীদ ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘এখানে কি সোহাগীর বিয়ে হচ্ছে যে ওরে দেখতে আসছো! বাড়ি যাও এক্ষুণি। আর আমি আজই কাকির কাছে যাবো। তোমাদের পা খুব বড় হয়ে গেছে।’

ছন্দ ভয়ে জবাব দেয় না। বেলী একবার তামজীদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছন্দের হাত ধরে। তারপর বলে, ‘পা বড় হবে কেন তামজীদ ভাই? পা ঠিকই আছে। আর এখানে সোহাগীর বিয়ে হচ্ছে না বলেই তো দেখতে আসছি। এখানে আসলেও বকা খেতে হবে জানলে আর আসতাম না।’

তামজীদ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। বেলী আর তাকায় না। ছন্দের হাত ধরে ঘুরে চলে যায়। তামজীদ সেদিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে আওড়ায়,

‘বাচ্চারা বোঝে বেশি। এখানে থাকলে যে নিজেরা ভয় পেতো এটা এদের কে বোঝাবে!’

বেলীর মনে এতোগুলো অভিযোগের সৃষ্টি হয়। নাকি অভিমান! কি জানি! সে তো বোঝে না। তবে বেলীর মন খারাপ দেখে ছন্দ হাতের বাহু দিয়ে ধাক্কা দেয়। বেলী তাকাতেই ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

‘কি হইছে? ব্যাপার কী? তামজীদ ভাইয়ের বকা খেয়ে মনে হচ্ছে বাবুর অভিমান হয়েছে।’

বেলী ঠা’স করে একটা মে’রে দেয়। নাক মুখ কুঁচকে বলে, ‘অভিমান হবে কেনো? উনি কি আমার প্রেমিক নাকি?’

‘তাহলে মুখের এই অবস্থা কেন?’

‘অযথা বকেছে তাই রাগ হয়েছে। আর কিছু না।’

ছন্দ ঠাট্টা করে বলে, ‘রেগে গেলে যে মানুষ এভাবে কথা বলে আমি তো বাবা জানতাম না।’

‘তোর জেনে কাজ নেই। মুখ বন্ধ রাখ।’

ছন্দ ঠোঁট চেপে হাসে। এর মাঝেই পিছন থেকে কেউ ডেকে ওঠে, ‘ছন্দ!’

ছন্দ আর বেলী পিছে তাকায়। ছেলেটা শাহিদ। ছন্দের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। শাহিদ এগিয়ে আসে। বেলী মুখটা ছন্দের কানের কাছে নিয়ে বলে, ‘নে চলে এসেছে তোর মহামানব প্রেমিক। তুই গিয়ে ওরে তোর গপ্প শোনা।’

ছন্দ মুখ বাকায়। শাহিদ বেলীকে দেখে মজা করে বলে, ‘কি ব্যাপার বেলী? প্রেমিকের দেখা পাও নাই নাকি! মুখের এই অবস্থা কেন?’

ছন্দ হো হো করে হাসা শুরু করে। বেলী রেগে বলে, ‘এজন্যই আপনারা প্রেমিক-প্রেমিকা। দুইটাই এক। আপনি আপনার প্রেমিকাকে নিয়ে বিদায় হোন। আমি বাড়িতে যাবো।’

বলেই উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করে। ছন্দ হাসতেই থাকে৷ শাহিদ বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। ছন্দকে শুধায়, ‘কি হয়েছে বলো তো! বেলী ক্ষে’পেছে কেনো?’

‘আর বইলো না। তামজীদ ভাই বকছে। এটা নিয়ে উনার অভিমান হয়েছে কিন্তু উনি বুঝছেন না।’

বলা শেষে হাসতে হাসতেই শাহিদের হাত চেপে ধরে। বাহু আঁকড়ে ধরে হাঁটতে শুরু করে। ছন্দের হাসি মুখের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায়। ছন্দ চোখের ঈশারায় জিজ্ঞেস করে ‘কী?’ শাহিদ হাত বাড়িয়ে ছন্দের কপালে পড়া চুল কানের পৃষ্ঠে গুঁজে দেয়। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বোঝায়, ‘কিছু না। চলো!’

ছন্দ কথা বলতে শুরু করে। দুজনের সম্পর্ক শুরু হয়েছে প্রায় ৫ মাসের মতো। শাহিদ অনেক কষ্ট করে মানিয়েছিলো মেয়েটাকে। দুজনেই জানে তাদের মিল হওয়াটা কতটা কষ্টের কিন্তু তবুও একে অন্যের হাত ধরে আছে শক্ত করে।


সাহিত্য যখন বাড়ি আসে তখন রাত হয়ে গেছে। বাড়ির অনেকেই নিজেদের ঘরে শুয়ে পড়েছে। সাহিত্যের সাথে আজ সীমান্তও এসেছে। রাতে দুজন একসাথে ঘুমাবে। বাড়ির সদর দরজা খুলে ঢুকতেই চোখে পড়ে আঙিনায় আলো জ্বলছে। সাহিত্য ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে দেখে সুফিয়া বেগম আর লুবনা বসে আছে৷ গল্প করছে। সাহিত্যদের দেখে দুজনেই এগিয়ে আসে। সুফিয়া ব্যস্ত স্বরে বলে,

‘তোর কি আর আক্কেল জ্ঞান কিছু হইবো না বাপ? এতো রাত কইরা কেউ বাড়ি ফিরে? আর সীমান্ত, আইবি যখন দুই ভাই তাইলে আগে আগে আইবি না!’

সাহিত্য ক্লান্তি স্বরে বলে, ‘আম্মা, যা বকার কালকে বইকেন। আপাতত আমারে ঘরে যাইতে দেন। অনেক ক্লান্ত লাগতেছে।’

পাশ থেকে চট করেই লুবনা বলে বসে, ‘খাবেন না আপনারা?’

সীমান্ত হেঁসে ওঠে। লুবনা লজ্জা পায়। সুফিয়া লুবনাকে একহাতে জড়িয়ে নিজেও হাসেন। সীমান্ত সুফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘ফুপিআম্মা, আপনার ছেলেকে বিয়ে করানোর আগেই তো লুবনা বউয়ের মতো দায়িত্ব পালন করতেছে। তাইলে আর দেড়ি করে লাভ কী? বিয়ে কবে বলেন জলদি!’

সুফিয়া বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে, ‘এইডা এই পোলারে বোঝাও তো বাপ। আমি বুঝাইতে বুঝাইতে কেলান্ত।’

‘আম্মা আমারে আর বোঝানো লাগবে না। খাবারটা ঘরে দিয়ে দিয়েন। আমি গেলাম।’

সবাই বোঝে সাহিত্য এড়িয়ে যাচ্ছে। তাই আর কথা বাড়ে না। সাহিত্য আর সীমান্ত সাহিত্যের ঘরে চলে যায়। সীমান্ত ঘরে গিয়েই আগে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা তুই লুবনার সাথে বিয়েটা এড়িয়ে যাস কেন? কি সমস্যা?’

‘কোনো সমস্যা নাই। আমার বিয়ে করার ইচ্ছা নাই।’

‘আজীবন চিরকুমার থাকবি নাকি! কার জন্য হইলি দেবদাস?’

সাহিত্য জবাব দেয় না। সীমান্ত হাসতে শুরু করে। সাহিত্যের জন্য তার বাবা নতুন করে তার ঘরের সাথে লাগোয়া একটা বাথরুম তৈরী করিয়ে দিয়েছে। সাহিত্য নিজের শার্ট খুলে আলমারি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে সেখানেই ঢুকে যায়। দরজা আটকে দিয়ে চোখে পানি দেয়। হেঁসে বিড়বিড় করে বলে,

‘যার জন্য দেবদাস হয়েছি তার নাম শুনলে তোর হুশ উড়ে যাবে সীমান্ত।’

সাহিত্য বাথরুমে থাকা সময়েই লুবনা আসে। হাতে ট্রে করে দুটো খাবারের থালা। টেবিলের ওপর খাবার রাখতে রাখতে সীমান্তকে জিজ্ঞেস করে, ‘উনি কি গোসলে গেছে?’

সীমান্ত হেঁসে বলে, ‘এটারও খোঁজ রাখো! বাহ বাহ। ভালো তো।’

লুবনা মাথা নিচু করে হাসে। সাহিত্য বেশ সময় নিয়ে বের হয়। লুবনা ততক্ষণই দাঁড়িয়ে আছে। সাহিত্য বের হলে সীমান্ত ঢোকে। সাহিত্য লুবনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,

‘তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা।’

‘আপনারা খেয়ে নেন। আমি একবারে নিয়ে যাই।’

‘তোর নিতে হবে না। আমাদের খেতে দেড়ি হবে। আমি রেখে আসবো।’

সাহিত্যের মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না লুবনা। তবে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সাহিত্য না তাকিয়েই বলে, ‘‌যা।’

লুবনা মাথা নিচু করে চলে যেতে নেয়। দরজা অব্দি যেতেই সাহিত্য পিছু পিছু এগিয়ে আসে। ফের শুধায়, ‘তুই বাড়ি যাবি কবে?’

লুবনার বুক ধ্বক করে ওঠে। চোখ তুলে তাকায় সাহিত্যের দিকে। সাহিত্য স্বাভাবিক। লুবনার মনে হলো সাহিত্য তাকে অনেক ভারী একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে। সময় নিয়েই লুবনা জবাব দেয়,

‘আমি তো আজীবনের মতো থেকে যেতে চেয়েছিলাম সাহিত্য ভাই।’

‘কিন্তু আমি তোকে রাখতে চাই না। আমাকে নিয়ে আশা রেখে নিজের মন ভাঙিস না। নিজের জীবন নিয়ে ভাব।’

লুবনার মুখের ওপরই সাহিত্য দরজা আটকে দেয়। লুবনার চোখ ভিজে ওঠে। ঝাপসা চোখে দরজার দিকেই তাকিয়ে থাকে। ভাঙা কন্ঠে বলে, ‘আমি তো আপনাকে নিয়ে ভাবতে চেয়েছি সাহিত্য ভাই।’

চলবে..
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)