সাহেবা পর্ব-১০

0
34

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
____

১০.
পুরো গ্রামে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে মেয়েদের মৃ’ত্যু নিয়ে। অনেকে নিজের মেয়েকে বাড়ি থেকে বের-ই হতে দিচ্ছে না। এর মধ্যেই অনেক বলে কয়ে বেলী আর ছন্দ পড়তে বেড়িয়েছে। বেলী ভয়ে ভয়ে একা একা-ই চারপাশে তাকাচ্ছে আর এগোচ্ছে। আর একটু দুরেই মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি। বেলী ভয়ে ভয়ে এগোতেই পেছন থেকে ভেসে আসে তামজীদের কন্ঠস্বর,

‘এ্যাই বেলী!’

বেলী চমকে পিছে তাকায়। চোখ পিটপিট করে কয়েকবার তাকায় তামজীদের দিকে। সে জানে এখন তামজীদ তাকে হাজারটা প্রশ্ন করবে। উত্তর দেয়ার ভয়েই তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। তামজীদ এগিয়ে একদম কাছে আসে। কপালে ভাজ ফেলে শুধায়,

‘একা কোথায় যাচ্ছো? ছন্দ কোথায়?’

বেলীর কাশি উঠে যায়। তামজীদ ব্যস্ত ভাবে হাত এগোতে গিয়েও হাত এগোয় না। আশে পাশে তাকিয়ে দেখে পানি পাওয়া যাবে আরো দুরে। তামজীদ বেলীর হাত ধরে তার হাত-ই ঘুরিয়ে নিয়ে গিয়ে পিঠে হাত বুলায়। বেলী হা হয়ে তাকায়। যদিও তার হাতটা বাঁকা হয়ে পড়েছে কিন্তু তামজীদের কান্ডে তার কাশি যেনো উধাও হয়ে গেছে। তামজীদ হাত ছেড়ে দিয়ে বলে,

‘থেমে গেছে?’

বেলী মাথা নাড়ায়। তামজীদ হাঁটা শুরু করে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছিলে?’

‘মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি।’

‘একা কেনো? ছন্দ কোথায়?’

বেলী দৃষ্টি এদিক ওদিক করে। ছন্দ যে শাহিদের সাথে গেছে এটা যদি কোনোভাবে তামজীদ জেনে যায় তাহলে কথাটা সাহিত্য আর সীমান্তও জেনে যাবে। আর তারা জানা মানেই বাড়ির সকলে জানতে খুব দেড়ি হবে না। বেলীকে চুপ থাকতে দেখে তামজীদ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বলে,

‘কোথায় হারাইছো?’

বেলী গলা পরিষ্কার করে বলে, ‘হারাইনি। আসলে ছন্দ আজকে পড়তে যাবে না। ওর শরীর ভালো না।’

তামজীদ আর প্রশ্ন করে না। দুজনে পাশাপাশি হাঁটে। তামজীদ পকেট থেকে বেলী ফুল বেলীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘তোমার প্রিয় বেলী।’

বেলী চট করে তাকায়। হাত পেতে ফুল নিয়ে ভাবে তামজীদ তাকে বেলী বললো নাকি ফুলের নাম বললো! বুঝতে না পেরে আরো একবার সে তামজীদের দিকে তাকায়। তামজীদ তখনো বেলীর দিকে তাকিয়ে ছিলো। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই দুজনের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায়। সাথে সাথেই বেলী চোখ সরিয়ে নেয়। তামজীদ ঠোঁট কামড়ে হাসে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি থেকে খানিকটা দুরে দাঁড়িয়ে যায়। বেলী তাকাতেই তামজীদ বলে,

‘একা একা কোথাও যাবে না। সাবধানে যাও।’

বেলী মাথা নাড়িয়ে হাঁটতে থাকে। গতদিনের অভিমানগুলো বাষ্পের মতো উবে যায়। হঠাৎ ই মনের কোণে খুশিরা নাড়া দেয়। চোখ বন্ধ করে একবার পিছে তাকায়। তামজীদ তখনো দাঁড়িয়ে আছে। বেলী চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে ঢোকার আগে আরো একবার তাকায়। তামজীদও তখনো যায়নি। বেলী চোখ সরিয়ে নিঃশব্দে হাসে। বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলে তামজীদ হেঁসে আওড়ায়,

‘আমার প্রিয় বেলী। ফুল কিংবা স্বয়ং বেলী।’


নাজিরা ছাঁদে বসে আছে আনমনে। সে জানে সীমান্ত সাইরাহ্-কে পছন্দ করে। তারপর থেকেই তাকে সবসময় উদাস দেখা যায়। নাজিরা কথাটা কাউকে বলেনি। লুবনা তার ব্যাপারে বেশ অনেক কিছু জানে কিন্তু এই ব্যাপারটা সে জানায়নি। ছাঁদে বসে চুল ছেড়ে হাঁটুতে মাথা দিয়ে দুরে তাকিয়ে ছিলো নাজিরা। সে সময় ছাদের দরজা দিয়ে সীমান্ত ভেতরে যেতে যেতে বলে,

‘এভাবে বিকেল বেলা ছাঁদে চুল মেলে বসে আছো কেনো? যদি ভুতে ধরে!’

নাজিরা চমকায়৷ প্রথমে নিজের মনের ভুল ভাবলেও পরে ভাবে না। পিছে তাকিয়ে দেখে সত্যিই সীমান্ত দাঁড়িয়ে আছে। নাজিরা হাসার চেষ্টা করে বলে, ‘ভুতে আমার ভয় নাই সীমান্ত ভাই।’

সীমান্ত তার দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘কি বলো! মেয়েরা তো ভুতে ভয়-ই বেশি পায়। আর তুমি পাও না! বাহ!’

নাজিরা সামান্য হাসে। সীমান্ত জিজ্ঞেস করে, ‘সাহিত্য কোথায়? জানো কিছু!’

‘ভাইজান তো বাড়িতে নাই।’

‘আজকে তুমি পড়তে যাওনি? এ সময় তো পড়তে যাও!’

‘না। আজকে শরীরটা ভালো লাগছিলো না।’

‘তাহলে ছাঁদে আসছো কেন? ঘরে যাও। ঔষধ আনিয়েছো?’

নাজিরা জবাব দেয় না। কতক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে সীমান্তের মুখপানে। এই কথাগুলো, এই যত্নগুলোর মায়াতেই সে পড়েছিলো। সামান্য কথাগুলোকে অসামান্য ভেবে নিজের হৃদয়ে ঠায় দিয়েছিলো। অথচ এগুলো শুধুই সাধারণ কিছু কথা ছিলো। সীমান্ত নাজিরাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

‘কি হলো? কি দেখো?’

নাজিরা চোখ নামিয়ে উঠে দাঁড়ায়। অন্য দিকে তাকিয়ে বলে, ‘কিছু না। আপনাকে একটা কথা বলি সীমান্ত ভাই?’

‘বলো।’

‘আপনি আর কখনো আমার কোনো বিষয়ে যত্ন নিবেন না। হয়তো আপনি খুব সাধারণ ভাবেই কথাগুলো বলেন কিন্তু আমি তা অসাধারণ ভেবে ভুল করি।’

সীমান্ত অবাক হয়ে তাকায়। না বুঝে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজিরার দিকে। নাজিরা এগিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি দাঁড়ায়। চোখে চোখ রেখে বলে, ‘আপনি বুঝবেন না সীমান্ত ভাই। আপনি মানুষের চোখের ভাষা বোঝেন না। আপনি না আমাকে বোঝেন আর না সাইরাহ্ বুবুকে বোঝেন!’

সীমান্ত অবাকের ওপর অবাক হয়। নাজিরা পিছিয়ে যায়। পিছু ফিরে সরাসরি নেমে যায় ছাঁদ থেকে। সীমান্ত তখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নাজিরা তাকে কি বোঝালো? সে চোখের ভাষা বোঝে না? সাইরাহ্-কেও বোঝে না? আসলেই বোঝে না? সীমান্তের মাথা যেনো ঘুরিয়ে আসে। নিজেও দ্রুত পায়ে ছাঁদ থেকে নেমে দৌড় দেয়। বাড়ি থেকে বের হতেই নাজিরা জানালা দিয়ে তার যাওয়ার পথে তাকায়। ছলছল চোখে ভাঙা ভাঙা ভাবে বলে,

‘আপনি আমার কথা ভাবলেনও না সীমান্ত ভাই। ছুটছেন সেথায় যেথায় আপনার মনের মানুষের ঠায়। অথচ আপনি আমার কাছেও আসতে পারতেন। আমি খুব কাছে থাকা সত্বেও আপনি বেছে নিয়েছেন বহু দুরে থাকা নারীকে। এ বিষাদ আমি ঠায় দিই কোথায়?’


সাইরাহ্-র যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। একটা বান্ধবী ছিলো তাও সে এখন শ্বশুরবাড়িতে। সাইরাহ্ আপনমনে বসে ছিলো নদীর পাড়ে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সীমান্ত। হাঁপাতে হাঁপাতে সাইরাহ্-র দিকে এগোতে এগোতে প্রশ্ন করে,

‘আমি তোমার চোখের ভাষা বুঝি না সাইরাহ্?’

সাইরাহ্ কথাটা হঠাৎ শুনে চমকে ওঠে সাইরাহ্। পিছনে তাকিয়ে সীমান্তকে এভাবে দেখে অবাক চোখে তাকায়। সীমান্ত কাছাকাছি এসে ধপাস করে বসে পড়ে ফের শুধায়, ‘বলো না! আমি তোমার চোখের ভাষা বুঝি না?’

সাইরাহ্ দাঁড়িয়ে যায়। এক সিড়ি উপরে উঠে বলে, ‘মাথা কি গেলো নাকি সীমান্ত ভাই? হঠাৎ কি হয়েছে? এসব হুটহাট পাগলের মতো কাজ তো সাহিত্য ভাই করে। আপনার আবার উনার বাতাস লাগলো কবে?’

সীমান্ত সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ৩য় বারের মতো ফের একই কথা শুধায়। সাইরাহ্ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘চোখের ভাষায় কোনো কথা থাকলে বুঝবেন না কেনো?’

‘তোমার চোখের ভাষায় আমার জন্য কোনো কথা নেই?’

সাইরাহ্ তাকিয়ে থাকে কতক্ষণ। নিজ মনে আওড়ায়, ‘আপনি বুঝলে এতোদিনে আমি আপনার হয়ে যেতাম।’ কিন্তু মুখে কিছু বলে না। সীমান্ত যেনো আজ জিদ নিয়ে বসেছে। সে কিছুতেই সাইরাহ্-র থেকে উত্তর না নিয়ে থামবে না। তাই আবারও একই প্রশ্ন করে। সাইরাহ্ সরাসরি বলে,

‘না। আমার চোখের ভাষায় কোনো কথা নেই। আপনার আজ হঠাৎ কি হয়েছে?’

‘সত্যিই নেই সাইরাহ্?’

সাইরাহ্ দৃষ্টি লুকিয়ে পিছু ফিরে চলে যায়। সীমান্তের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। সাইরাহ্ বুকে হাত চেপে ছুট লাগায়। এই লোকটা বুঝেও বুঝে না৷ আবার না বুঝেও বুঝে। আসলে কোনটা? সীমান্ত জোড়ে বলে ওঠে,

‘আমার সব প্রশ্নের জবাব আমি পেয়ে গেছি সাইরাহ্।’

সাইরাহ্ পেছনে ফিরে না। সাহিত্য আড়াল থেকে দুজনের সবটুকু কথা-ই শুনলো। সাহিত্যও হাসে৷ সাইরাহ্-র প্রশ্নের উত্তর সেও জানে৷ সীমান্ত আসলেই সাইরাহ্-র চোখে ভাষা বোঝে না। বুঝলে এতোদিনে অনেক কিছু হতো। সাইরাহ্-র যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সাহিত্য পিছু ফিরে হাঁটা লাগায়। ফাঁকা ঢোক গিলে এলোমেলো কন্ঠে আওড়ায়,

‘সাহেবার চোখে অন্যের জন্য প্রেম। আর আমার হৃদয় জুড়ে সাহেবার জন্য মায়া। সাহেবা তুই সুখী হ।’

সাইরাহ্ বাড়ি ফিরে আসতেই তাহেরা ছুটে আসে৷ হাত টেনে জলদি ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। সাইরাহ্ একটু অবাক হয়। কিছু বুঝতে না পেরে ব্যস্ত কন্ঠে বলে,

‘কি হয়ছে আম্মা? টানতেছেন ক্যান?’

‘আস্তো কথা ক! ওই ঘরে তোর আব্বা আছে। আজকা তোরে দেখতে আইবো।’

সাইরাহ্ তব্দা খেয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকে দেখতে আসবে মানে? হঠাৎ করে এসব কী! কন্ঠে অবাকতা মিশিয়ে শুধায়, ‘কি কন আম্মা এগুলা? মাথা ঠিক আছে আপনার? হঠাৎ করে কিসের দেখতে আসা? কে এইটা?’

তাহেরা করুণ দৃষ্টিতে তাকায়। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ভাঙা কন্ঠে বলে, ‘আমরা কিছু কইতো পারি না আম্মা। তোর আব্বা আইসা কইলো আজকা তোরে দেখতে আইবো! তোরে আমি একবার খুইজা আইছি। পাত্রপক্ষ চইলা আসবো। তোরে পছন্দ হইলে আজকাও বিয়া হইয়া যাইতে পারে!’

সাইরাহ্-র মাথা ঘুরে যায়। সে কোনো মতেই বিয়ে করবে না। এটা কোনোভাবেই সম্ভব না। তাই তাহেরার কথার বিপরীতে বেশ জোড়েই বলে, ‘অসম্ভব আম্মা। আমি বিয়ে করতে চাই না।’

‘আস্তে কথা ক আম্মা। তোর আব্বা শুনতো পাইলে আবার একটা ঝামেলা হইবো।’

‘ঝামেলা হইলে হোক। আপনারা আমার জীবনটা কি খেলনা পাইছেন? যেভাবে মন চায় খেলতেছেন।’

তাহেরা মেয়ের হাত দুটো হাতের মাঝে নেয়। অনুরোধ করে বলে, ‘আমি জানি আমরা তোর লগে অনেক অ’ন্যায় করছি কিন্তু এই শেষবারের মতো আমার লাইগা পাত্রপক্ষের সামনে যা আম্মা। নাইলে তোর লগে লগে আমারও যে আর রক্ষা নাই৷’

তাহেরা বেড়িয়ে যায় ঘর ছেড়ে। সাইরাহ্ বসে পড়ে। তার বাবা যে এবার সব প্রস্তুতি নিয়েই বসেছে তা সে হাড়ে হাড়ে টের পায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সীমান্তের করুণ মুখ। ভেতরটা ধ্বক করে ওঠে। এবার কি হবে?

সাইরাহ্-কে দেখতে আসে সন্ধ্যার দিকে৷ যদিও আসার কথা ছিলো বিকালে কিন্তু তাদের জরুরী কি কাজ পড়ে যাওয়ায় আর আসা হয় না। সন্ধ্যায় প্রায় ৭ জনের মতো আসে৷ পাত্র, তার ছেলে-মেয়ে, পাত্রের বোন-বোন জামাই, বোনের ছেলে-মেয়ে। আর সাথে ঘটক। পাত্রের বয়স প্রায় ৪৫ বছর। সাইরাহ্-র বয়সী তার একটি মেয়ে এবং ১৮ বছর বয়সী একটা ছেলে আছে। পাত্রের বোনের বয়সও প্রায় ৩৫ ছাড়িয়েছে। তার ছেলের বয়স ১৬ আর মেয়ের ১৩। তাহেরা পাত্র দেখেই ঘরে গিয়ে হায় হায় করা শুরু করে। সাইরাহ্-র হাত ধরে বসে থাকে৷ সাইরাহ্ কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পরও কোনো জবাব দেয় না তাহেরা। সবুর মিয়া বেজায় খুশি৷ হোক পাত্রের বয়স বেশি। বিধবা মেয়ের আবার বিয়ে হবে এটাই তো অনেক বেশি। বিধবার বিয়ে আবার অতো বয়স দেখে কে! সবুর মিয়া পাত্রপক্ষের আপ্যায়ন করে ঘরের ভেতরে যায়৷ সেখানে সাইরাহ্-কে নিয়ে বসেছিলো তাহেরা। সাইরাহ্-কে নতুন শাড়িও পড়ায়নি তাহেরা। সবুর মিয়া তা দেখে যেনো জ্বলে উঠলেন। রেগে তবে নিচু স্বরে বললেন,

‘ওরে নতুন শাড়ি পড়াস নাই ক্যারে? পোলাপক্ষরা যে আইসা বইসা আছে ওইদিকে নজর নাই তোর?’

তাহেরা মাথা তুলে স্বামীর দিকে তাকায়। অসহায় কন্ঠে বলে, ‘এই লোকটার লগে মাইয়ার বিয়া না দিলে অয় না সাইরার বাপ? লোকটার তো ম্যালা বয়স। সাইরার বয়সের একটা মাইয়া আছে তার।’

‘তাই কি হইছে? দেখ তাহেরা! তোরে ভালো মতো কইতাছি তোর মাইয়ার বিয়া এইহানেই হইবো। এই অলক্ষীরে আর ঘরে রাখমু না আমি। বিধবারে যে এই লোক বিয়া করবার রাজি হইছে এইডাই তো তোর মাইয়ার কপাল!’

‘মাইয়া কি আমার একার?’

সবুর মিয়া মারাত্মক ক্ষেপে গেলেন। তেড়ে গেলেন তাহেরাকে মারতে। সাইরাহ্ কোনো মতে আটকায়৷ সবুর মিয়া সাইরাহ্-কে সরিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বি’শ্রীভাবে গা’লি দিলেন। সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন সাইরাহ্-র বিয়ে তিনি এখানেই দিবেন। অতএব শাড়ি পড়িয়ে পাত্রপক্ষের সামনে নিয়ে যেতে। তাহেরা নিঃশব্দে কাঁদলেন। তার হাতে কিছুই নেই। সে যে মা। সে তো কিছু করতে পারবেন না৷ পরিবারের কর্তা যে পুরুষ মানুষ। সাইরাহ্-র বাবা। সাইরাহ্ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবুর মিয়ার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকে৷ তারপর তাহেরার চোখের জল মুছিয়ে হাসে। ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বলে,

‘আম্মা! আব্বা যা বলছে তা করেন। নয়তো আপনার সাথে অশান্তি করবে৷ আমি চাই না আমার জন্য আর এই সংসারটা-ই অশান্তি হোক। চলেন!’

তাহেরা অপলক কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে চেয়ে থাকে। হুট করেই জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চায়। সাইরাহ্-র দাদী বাহির থেকে তাড়া দেয়। অগত্যা তাহেরা সাইরাহ্-কে রঙিন শাড়ি পড়িয়ে দেয়। কতদিন পর নিজের গায়ে রঙিন শাড়ি দেখে বড্ড বেমানান মনে হয় সাইরাহ্-র। ছুঁয়ে দেয় লাল টকটকে শাড়িটা। চোখের কোণে জল জমা হয়৷ সাদা শাড়িতে সে এতোটাই অভ্যস্ত যে রঙিন শাড়িটাকে তার কাটার মতো মনে হয়। চুল বেঁধে মাথায় আঁচল টেনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় পাত্রপক্ষের সামনে। চোখ তুলে একবারও সামনে তাকায় না সাইরাহ্। চোখ মুখ খিঁচে বসে থাকে৷ পাত্রী পছন্দ হয় পাত্রপক্ষের। বিয়ের কথা পাঁকা হয় ৩ দিন পর। ঘরোয়া আয়োজনে ৩ দিন পর বিয়েটা হবে।

পাত্রপক্ষ চলে গেলে রঙিন শাড়ি ছেড়ে আবারও গায়ে জড়ায় সাদা শাড়ি। ঠায় বসে রয় মেঝেতে। জীবনের সমীকরণ মিলাতে মিলাতে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ে। বার বার মনে হয় নিজের সাথে হওয়া প্রত্যেকটা ঘটনা। চোখ বুজে বিড়বিড় করে বলে,

‘আমার যদি হেরেই যেতে হয় তবে কেনো এই পরিবর্তন আসলো জীবনে?’

চলবে..
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)