#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
______
৩২.
সারারাত যে বাড়িতে তারেক ছিল না তা জানা ছিল না তালিব উদ্দীনের। সকাল বেলা তামজীদের মা সারা বাড়ি খুঁজেও তারেককে পেলেন না। তিনি দ্রুত তার স্বামীকে জানালেন। তালিব উদ্দীন তা শুনে পুরো বাড়ি যখন খুঁজে পেলেন না তখন গ্রামে খুঁজতে বেড়োলেন। ছেলের যে মাঝে মধ্যে নেশা করার স্বভাব আছে বেশ জানা আছে উনার। তাই প্রথমেই গেলেন তারেকের বন্ধুদের কাছে। কিন্তু যখন সেখানেও পেলেন না তখন তার মধ্যে চিন্তার উদয় হল। বেশ ঘাবড়ে মনে করতে লাগলেন এর আগের দু’জন প্রধানের অবস্থা। তালিব উদ্দীন দৌড়ালেন প্রধানের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে মাঝ রাস্তাতেই একজন গ্রামবাসী তাকে ডাকলেন হন্তদন্ত হয়ে। তালিব উদ্দীনের কাছে এসে শোনালেন তার আত্মা কাঁপানোর মতো কথা,
‘আপনের ছুডু পোলা পিছের বাগানে গলায় ফাঁ’স নিছে। তাড়াতাড়ি আহেন।’
তালিব উদ্দীনের যেন দুনিয়াই নড়ে গেল। তিনি সেখানেই মাথা চাপড়ে কাঁদতে শুরু করলেন। সেই লোকটার পিছু পিছু গেলেন বাগানে। সেখানে আরও মানুষ জড়ো হয়েছে। তালিব উদ্দীন ছেলের এই অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কাঁদছেন মাটিতে বসে। বার বার আওড়াচ্ছেন,
‘এইডা তোর লগে কি হইল, আব্বা? তোরে কে এমনে কেডা মা’রল?’
ঘটনা শুনে সাহিত্য, তামজীদ, প্রধান, সীমান্ত সবাই এসেছে। ভাইকে এভাবে ঝুলতে দেখে তামজীদের বুকটা কেঁপে উঠল। সে জানে তার ভাই অনেক অ’ন্যায় করেছে তবে শত হলেও নিজের ভাই ছিল৷ এজন্যই বোধহয় তার বুকেও কষ্টটা বিঁধছে। কথায় কথায় তামজীদের মায়ের কানেও চলে গেছে কথাটা। তিনি বাড়ি থেকেই বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে আসলেন। কেউ তাকে তারেকের কাছে যাওয়া থেকে আটকাতে পারছিল না। তামজীদ এসে মা’কে জড়িয়ে ধরল। তার মা ছোট ছেলের দিকে ঈশারা করে দেখিয়ে বুক চাপড়াচ্ছিলেন। বদমাশ, খারাপ সন্তান হলেও তা সন্তান-ই হয়। প্রধানদের বাড়ির পিছনের বড় বাগান হওয়ায় বেলীও এসেছে। ছন্দের লা’শও এখানেই পাওয়া গেছিল। তারেককে এভাবে ঝুলতে দেখে বেলী তাকাল তামজীদের দিকে৷ তামজীদ তার মায়ের দিকে ঈশারা করে বুঝাল একটু সামলাতে। বেলী একটুও দেড়ি করল না। কাছে এসে মা’কে টেনে নিতে নিতে বলল,
‘আম্মা, আপনি এদিকে আসেন। শান্ত হোন, আম্মা।’
এত কষ্টের মাঝেও বেলী যে তামজীদের মা’কে নিজের মায়ের মত সামলাচ্ছে তা দেখেই তামজীদ শান্তি পেল। সাহিত্যের পাশে দাঁড়িয়ে শুধাল,
‘এ নিয়ে ৩ জন। এরপর তো তীরটা আমার বাবা আর তোর মামা সাহেবের দিকেই আসবে মনে হচ্ছে।’
সাহিত্য ভাবুক দৃষ্টিতে তারেকের লা’শের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দৃষ্টি না সরিয়েই বলল, ‘তোর ভাইয়ের পাপ মনে হয় সীমার বাহিরে চলে গেছিল তাই এই অবস্থা। পুলিশকে জানিয়েছিস?’
তামজীদ মাথা নাড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে শেষ একবার তাকাল। সে তো কোথাও না কোথাও ঠিকই জানতো এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে! তবুও এত কষ্ট হচ্ছে? অথচ তার এই ভাই না জানি কতগুলো মেয়ের জীবন নরক করে দিয়েছিল।
–
সাইরাহ্ বড় জা তাকে পাঠিয়েছে মাথা ব্যাথার মলম আনতে। সাইরাহ্ তা আনতেই বড় জা’য়ের ঘরে এসেছে। শেষ মাথার দু-তিনটে ঘরের আগেরটাই তাদের। সাইরাহ্ মলম খুঁজে নিয়ে যাওয়ার সময় অদ্ভুত একটা শব্দ পেল। আশে পাশে তাকিয়েও কাউকে না দেখে বেশ ভড়কাল সে। এমন শব্দ কোথা থেকে আসছে? সাইরাহ্-র মনে হল শব্দটা কারো গোঙানোর। সাইরাহ্ ভীত কণ্ঠে শুধাল,
‘কে? কে এখানে?’
জবাব আসল না। গোঙানোর শব্দ যেন আরও বেড়ে গেল। সাইরাহ্-র মনে হল শব্দটা সামনের দিক থেকে আসছে তাই সে ভীত পায়েই একটু একটু করে এগোল। পরের দু’টো ঘর সম্পূর্ণ ফাঁকা দেখে তাকাল সামনের ঘরে। সেখানে তালা লাগানো। সাইরাহ্ কান পেতে বোঝার চেষ্টা করছিল শব্দটা আদৌও সেখান থেকেই আসছে কি না! তবে ঘরের দিকে এগোতে নিলেই পেছন থেকে কেউ তার ঘাড়ে হাত রাখে। সাইরাহ্ ভয়ে ছিটকে গেল। পেছনে তাকিয়ে দেখল সাহিত্য দাঁড়িয়ে। সাহিত্য ব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,
‘কি হয়েছে? ভয় পেয়েছিস?’
সাইরাহ্ ভয়ে ছিল তাই কিছু না ভেবে এসেই সাহিত্যকে জাপ্টে ধরল। সাহিত্য এতে বেশ অবাক হল। দু’হাতে আগলে নিয়ে শুধাল, ‘কি হয়েছে?’
‘আপনি পেছন থেকে এভাবে আসলেন কেন? কত ভয় পেয়েছি জানেন!’
‘আমি কিভাবে বুঝব তুই এত ভীতু? কথা তো বলিস বড় বড় কিন্তু কলিজা মুরগীর বাচ্চার থেকেও ছোট।’
সাইরাহ্ মাথা তুলে তাকাল। চোখ মুখ কুঁচকে সাহিত্যকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আমার কলিজা দেখেছেন আপনি?’
‘দেখাইছিস তুই?’
‘বুক চিড়ে দেখাব?’
সাহিত্য সাইরাহ্-র হাত টেনে সামনে যেতে যেতে বলল, ‘না, দরকার নাই। আপাতত তোর রূপ দেখা ওতেই আমি সন্তুষ্ট।’
সাইরাহ্ সাহিত্যকে থামাতে থামাতে বেশ ব্যস্ত গলায় বলল, ‘আরে যাবেন না। এখান থেকে কারো গোঙানোর শব্দ আসছিল। দেখি তো আগে!’
সাহিত্য ভ্রু কুঁচকাল। হাঁটা থামিয়ে বেশ সন্দিহান গলায় শুধাল, ‘আমাকে লুকিয়ে আবার বিয়ে টিয়ে করেছিস?’
‘এটা কোন ধরণের প্রশ্ন, গোয়েন্দা সাহেব?’
‘তাইলে কি উল্টা পাল্টা কিছু খেয়েছিস?’
সাইরাহ্ বিরক্তি নিয়ে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আপনার মাথাটা কি উল্টা পাল্টার চেয়ে কোন অংশে কম?’
‘দেখ, স্বীকার করলি। তুই যে আমার মাথাটা খাস তা স্বীকার করলি!’
সাইরাহ্ আরও রেগে গেল। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাগী গলায় বলল, ‘এটা মজা করার সময়? আমি আপনাকে কি বলছি!’
‘এখানে তুই আর আমি ছাড়া কেউ আছে?’
‘না।’
‘তাহলে তুই তোর কোন জামাইয়ের কণ্ঠ শুনছিস? আচ্ছা—তুহিন কি ভুত হয়ে আসল নাকি?’
সাইরাহ্ রাগে হাত থাকা মলমটাই সাহিত্যর দিকে ছুড়ে মা’রল। সাহিত্য তা ধরে নিয়েছে দেখে রেগে আগে আগে হাঁটা লাগাল। সাহিত্য একবার শেষ ঘরটার দিকে তাকিয়ে নিজেও ছুটল সাইরাহ্-র পিছু পিছু। সিড়ি দিয়ে নামার আগেই সাইরাহ্-র হাত ধরে আটকে দিল। সাইরাহ্ হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
‘ছাড়েন, কথা বলবেন না একদম।’
সাহিত্য বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা আর বলবো না। শোন তো! রাগ করছিস কেন?’
সাইরাহ্ তবুও হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিচে নামল। সাহিত্য পেছন থেকে জোড়ে ডাকল, ‘মলমটা তো নিয়ে যা, সাহেবা।’
সাইরাহ্ শুনলই না। সাহিত্য ঠোঁট কামড়ে হেসে নিজেই নিচে বড় ভাবীর কাছে মলম দিয়ে আসল। এরপর নিজের ঘরে গেল। দরজা আটকে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করল।
–
বিকেলের রান্না চলছে বাড়িতে। সাইরাহ্ সবার সাথে কাজ করছে। সাহিত্য কোথা থেকে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে আসল। কোনো কথা ছাড়া-ই তাড়া দিয়ে বলল,
‘সাহেবা, তাড়াতাড়ি আয়। তোর বোনের শ্বশুরবাড়ি যাব।’
সাইরাহ্ এমন হঠাৎ আর সাহিত্যের ব্যস্ত গলা শুনে বেশ চমকাল, ভয় পেল। নিজেও সব ছেড়ে ছুড়ে এগিয়ে এসে শুধাল, ‘কেন? কী হইছে?’
‘গেলেই দেখতে পাবি। যা বলছি তা কর।’
সাহিত্য যে এখন বলবে না তা বেশ ভালো মত বুঝল সাইরাহ্। কথা না বাড়িয়ে দ্রুত কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে গিয়ে শাড়ি পাল্টে আসল। এরপর ছুটল সাহিত্যের পিছু পিছু। সাহিত্যকে বেশ অনেক বার শুধালেও সে কোনো জবাব-ই দেয়নি। দুজন একসাথে পৌঁছাল যখন তখন বাড়ির সামনে পুলিশ আর মানুষ দিয়ে ভর্তি। সাইরাহ্ ভয়ে সাহিত্যের হাত চেপে ধরল। যেদিন তুহিন মা’রা গেছিল সেদিনও চারপাশে এমন ভীড় জমেছিল। কোথাও তার বোনের কিছু হয়নি তো? কাঁপা কাঁপা বুকে ভীড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখল ঘরের দুয়ারে সাইমা মাথা নিচু করে বসে আছে। সাইরাহ্ এতক্ষণের আটকে রাখা শ্বাস যেন বের হয়ে আসল। সাইরাহ্ এগিয়ে গিয়ে বোনের পাশে বসে ডাকল,
‘আপা!’
সাইমা তাকাল। সাইরাহ্-কে দেখেই সে শব্দ করে কেঁদে উঠল। দু’হাতে বোনকে জাপ্টে ধরে বলতে থাকল, ‘আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি মা’রতে চাইনি ওকে। আমি সত্যি বলতেছি।’
সাইরাহ্ কিছু বুঝে উঠছিল না। কাকে মে’রেছে? কে মে’রেছে? সাইরাহ্ সাইমাকে ধরেই ভেতরে উঁকি দিল। রান্নাঘরের মেঝেতে শুধু র’ক্ত দেখতে পেল। সাইরাহ্ সাইমাকে সোজা করে ধরে শুধাল,
‘কি হইছে, আপা? আমারে বল।’
সাইমা কান্না-ই থামাতে পারছিল না। পাশ থেকে একজন আগ বাড়িয়ে জোড়ে বলে উঠল, ‘নিজের স্বামীরে মা’ইরা ফালাইছে। কেউ তার সোহাগরে এমনে মা’রতো পারে?’
সাইরাহ্ এত বেশি চমকাল যে বিশ্বাস-ই করতে পারল না তার দুলাভাই মা’রা গেছে। লোকটা বেশি সুবিধার ছিল না কোনো কালেই কিন্তু তার বোন নিজের স্বামীকে মে’রে ফেলবে এটাও হজম করার মত কোনো কথা নয়। সাহিত্য গিয়ে পুলিশের সাথে কথা বলল। পুলিশ এসে সাইমার সামনে দাঁড়িয়ে জানাল,
‘আমাদের উনাকে নিয়ে যেতে হবে। উনি উনার স্বামী অর্থাৎ রাজীব সাহেবকে খু’ন করেছে।’
সাইমা সাথে সাথেই বলে উঠল, ‘আমি ইচ্ছে করে করিনি। সাইরাহ্, বিশ্বাস কর! আমি ইচ্ছে করে করিনি। ও আমাকে মা’রতে আসছিল, তাই আমি কিছু না বুঝে ব’টি দিয়ে মে’রে দিছি। আমি না মা’রলে ও আমাকে মে’রে ফেলতো।’
সাইরাহ্ বিশ্বাস করল। বোনকে আঁকড়ে ধরে বলল, ‘নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাউকে মা’রলে তার কিসের শা’স্তি? আমি নিয়ে যেতে দেব না।’
পুলিশ কিছু বলার আগেই পাশ থেকে একজন মহিলা ছি ছি করে বলে উঠলেন, ‘স্বামী মা’রতে আইলেই তারে খু’ন করবা? কি অলক্ষী মাইয়া তুমি! স্বামীর জায়গা কই বুঝো?’
মহিলার সাথে বাকি মহিলাগুলো তাল মেলালেন। সাইরাহ্-র ভীষণ রাগ হল। সে নিজ চোখে তার বোনের গায়ে শত শত মা’রের দাগ দেখেছে। কই তখন তো কেউ কোনো কথা বলেনি! তাহলে আজ কেন? সাইমা নিঃশব্দে কাঁদছে। সাইরাহ্ রাগে নিজেই জবাব দিল,
‘না বুঝি না। এখন আপনাদের স্বামীর জায়গা কই এইটা চোখে পড়তেছে? যখন দিনের পর দিন ওরা মা-ছেলে মিলে আমার বোনরে মা’রতো তখন কই হারাইছিল চোখগুলা? বিয়ে করা বউ দেখে যা মন চায় তা করতে পারবে? আর মেয়েটা নিজেকে বাঁচাতে মে’রে দিলেই সে অলক্ষী? এত যুক্তি কোথা থেকে আসে আপনাদের? মেয়ে হয়ে এমন অসভ্যতামো সহ্য করার জন্যই আমাদের সাথে এসব হয়।’
মহিলাগুলো আরও ক্ষেপলেন। পুলিশ অফিসার সবাইকে থামিয়ে দিল। সাইমাকে তাদের নিয়ে যেতে হবে কারণ কোনো প্রমাণ নেই যা বোঝায় সাইমা নিজেকে বাঁচাতেই কাজটা করেছে৷ তবুও যা হয় তা হবে আদালতে। পুলিশ সাইমাকে নিয়ে যেতে নিলে তার বয়সী এক বউ এগিয়ে আসল। তার স্বামী আর শাশুড়ি মানা করলেও সে মানা শুনল না। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
‘আমি নিজে চোখে সব দেখেছি। আমার স্বামী আর শাশুড়ি এগোতে দিচ্ছিল না তাই বলতে পারিনি।’
‘কী জানেন, বলুন!’
‘আমার ঘরের জানালা থেকে ওদের রান্নাঘর দেখা যায়। দুপুরে খাবারে ঝাল কিংবা লবণ একটু বেশি হয়েছিল এ নিয়ে দুপুর থেকে ওরা মা ছেলে চিল্লাচ্ছিল। আমি ঘর থেকেই শুনছিলাম। দু একটা থা’প্পড়ও বোধহয় খেয়েছে তবুও সাইমা সব কিছু এড়িয়ে রাতের রান্নার জোগাড় করছিল। তখন ওর স্বামী শাশুড়ির উস্কানিতে রেগে রাম দা হাতে রান্নাঘরে ঢোকে। সাইমা তখন এসব দেখে ভয় পেয়ে নিজেকে বাঁচানোর আকুতি মিনুতি করছিল। কিন্তু জা’নো’য়া’রটার মনে একটু দয়া হয়নি। উল্টো ওকে একটা মে’রেও দেয়। সাইমা কোনোমতে সরে জীবন বাঁচিয়েছে। আমি ওর চেঁচানো শুনে জানালায় এসে দাঁড়িয়েছি। ওর শাশুড়ি ওখানেই ছিল কিন্তু কিচ্ছু বলছিল না। এই দেখে আমি যখন বের হতে যাবো তখনই দেখি রাজীব ভাই সাইমাকে আরেকটা কো’প দিতে গেছে। সাইমা হয়তো দিশেহারা হয়ে পাশে থাকা ব’টি দিয়ে তখনই কো’প দিয়েছে। আজ ‘ও’ না মা’রলে এতক্ষণ ওর লা’শ পাইতেন। এটা শুধু আজকের ঘটনা না। এটা রোজকার ঘটনা। এই এলাকার কেউ জানে না এমন কেউ নাই। সবাই জানে। বিশ্বাস না হলে মহিলা পুলিশ দিয়ে ওর হাত, পিঠ দেখেন। সব প্রমাণ পাবেন।’
এ পর্যায়ে মেয়েটার স্বামী এসে তার হাত ধরে রাগী কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে এসবে পড়তে হবে না। ঘরে চল! আর অফিসার সাহেব আমার বউ কিছু দেখে নাই। এগুলা ওর মনগড়া কাহিনি। সাইমার সাথে ভালো বন্ধুত্ব তাই বাঁচানোর চেষ্টা করতেছে।’
মেয়েটা এক পাও নড়ল না। তার স্বামী টানলে সে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। রেগে চেঁচিয়ে সবার সামনেই বলল, ‘আমরা চুপ থাকি বলেই তোমাদের মত জা’নো’য়া’রগুলো আমাদের ওপর কাপুরুষত্ব দেখায়। যেগুলো করো এগুলো কোনো পুরুষের কাজ না, কাপুরুষের কাজ। কথায় কথায় বউকে মা’রলেই পুরুষ হওয়া যায় না। আজকে যে রাজীব ভাইয়ের অবস্থা দেখলে না? সময়ে না শুধরালে এই অবস্থা আমি জেনে বুঝে করব তোমার। আর অফিসার, আমি কোনো কাহিনি বলিনি। যেখানে সাক্ষ্য দেওয়া লাগবে আমি দিব।’
অবশেষে ঠিক হল সাইমাকে এখন নিয়ে যাওয়া হবে। তবে আদালতে সাক্ষ্যর ওপর ভিত্তি করে এর ফলাফল আসবে। যেহেতু এটা খু’নের ব্যাপার তাই বেশ গম্ভীর। সাইরাহ্ শেষ একবার নিজের বোনকে জড়িয়ে ধরল। আশ্বাস দিল কিচ্ছু হবে না। যে মেয়েটা পুলিশকে সাক্ষ্য দিল সে মেয়েটার দিকে তাকাল। ঠিক তার বোনের মতই চোখের নিচের কালি। হাতের দিকে খেয়াল করে দেখল তাতে আঘাতও আছে। এ সমাজে না জানি কত মেয়ে আছে যারা চুপচাপ স্বামীর অ’ত্যা’চা’র সহ্য করে। পুরুষ মানুষ কেবল শক্তি খাটিয়েই নিজেকে পুরুষ মনে করে। সাইরাহ্-র ভাবনার মাঝেই সাহিত্য এসে তার হাত ধরল। মলিন কণ্ঠে বলল,
‘শক্তি খাটিয়ে নয়, সম্মান করতে পারার মাঝেই সত্যিকারের পুরুষত্ব লুকিয়ে থাকে।’
চলবে..
#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
________
৩৩.
ছেলের শোকে তালিব উদ্দীনের অবস্থা খারাপ। নিজের করা পাপগুলো এখন তাকে পীড়া দিচ্ছে। ছেলের মৃ’ত্যুকে তিনি মানতে পারছেন না। তার জন্যই আজ তার ছেলের এই দশা। বার বার নিজেকে দোষারোপ করতে থাকলেন। এই পাপ থেকে তার বের হওয়া দরকার তা মাথায় খুব বাজে ভাবে কড়া নাড়ছে। দেরি না করে প্রধানের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলেন তিনি। প্রধান ঘরেই ছিলেন। তালিব উদ্দীন সেখানে এসে প্রথমেই বললেন,
‘আমাগো পাপের লাইগাই আজ সবাই ম’রতাছে। আমি আর এগুলাতে থাকমু না প্রধান সাহেব।’
প্রধান কপাল কুঁচকালেন। মুখটা গম্ভীর রেখে বললেন, ‘এইহানে নিজ ইচ্ছায় আওন যায় কিন্তু যাওন যায় না, তালিব উদ্দীন। তাই এগুলা চিন্তা ছাইড়া কামে মন দাও।’
‘কামে মন দিমু? কেমনে? আমার লাইগা আমার পোলাডা আইজ আর দুনিয়ার বুকো নাই। আমি যদি আমার পোলাডারে এগুলাত না জড়াইতাম তাইলে বুঝি ওয়-ও বাঁচতো। আমার তামজীদটাই ভালা আছে। আপনে কি এতকিছুর পরও বুঝতাছেন না যে আমাগো পাপের শা’স্তি সবাই পাইতাছি? শাহীন শেখ, তুহিন আমাগো দলের সবাই শ্যাষ খালি আপনে আর আমিই বাঁইচা আছি। আমাগো উচিত পুলিশরে গিয়া সব বলা নাইলে আমরাও বাঁচমু না।’
এ-পর্যায়ে প্রধান চমকালেন। কোনোভাবেই তিনি হার মানবেন না। যারা মা’রা গেছে তাদের নিয়ে তার কোনো শোক নেই। তিনি জানেন এই কাজের পেছনে কে আছে। তিনি তো কেবল সুসময়ের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি তালিব উদ্দীনের হাত ধরে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন,
‘দেহো তালিব উদ্দীন, পুলিশের কাছে গেলে আমাগোরেই বিপদ। সব ধান্দা তো শ্যাষ হইবোই সাথে আমাগোরে জেল হইবো।’
‘আর বাইরে বইয়া থাকলে আমরা ম’রমু। আপনে যান আর না যান আমি যামুই। আমার পাপের শা’স্তি আমি এমনেই পাইয়া গেছি। এমনে বাঁচতে পারমু না আমি।’
প্রধান আটকাতে থাকলেন তবে তালিব উদ্দীন মানতে চাইলেন না। তিনি ছেলের শোকে সব ভুলে গেছেন। তালিব উদ্দীন যখন প্রধানের কথা না মেনেই চলে যেতে লাগলেন তখনই প্রধান পাশে থাকা পিতলের ফুলের টব দিয়ে তালিব উদ্দীনের মাথায় আ’ঘাত করলেন। কেবল একবার নয়, একসাথেই বেশ কয়েকবার তিনি আ’ঘাত করতেই থাকেন ফলে তালিব উদ্দীনের মাথা ফেটে র’ক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তালিব উদ্দীন চিৎকার করে পড়ে গেলেন মেঝেতে। প্রধান সাহেব দ্রুত ঘরের দরজা লাগিয়ে দিলেন। মেঝেতে পড়ে থাকা তালিব উদ্দীনের দিকে তাকিয়ে পা’ষাণ কণ্ঠে বললেন,
‘আমি নিজের স্বার্থের লাইগা সব করতো পারি, তালিব উদ্দীন। তোমার উচিত হয় নাই আমার কাছো আসা। এতদিন এক লগে কাম করছি তাই একটু খারাপ লাগতাছে তবে এগুলা আমার কাছো কিছুই না।’
তালিব উদ্দীনের চিৎকার শুনেছিল সীমান্ত। সে এসে ঘরের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করল, ‘আব্বা, তালিব কাকা কই? উনার চিৎকার শুনলাম যে! উনি কই?’
প্রধান চমকালেন তবে নিজেকে শান্ত করে বেশ ব্যস্ত ভাবে বললেন, ‘বাইরে দেহো তো, সীমান্ত। আমি আইতাছি।’
সীমান্ত সত্যি ভেবে নিচে চলে গেল। সে সুযোগে প্রধান তালিব উদ্দীনের নিথর দেহটা ঘরে থাকা এক বস্তায় ভরে নিলেন। এখন এটা তার বাইরে নিতে হবে তবে কিভাবে নিবে তা ভেবে পেলেন না। মেঝে ভেসে আছে র’ক্তের ফোয়ারায় এগুলোও পরিষ্কার করতে হবে। প্রধান হাক ছাড়লেন নিজের গিন্নির উদ্দেশ্যে। আশে পাশে তাকিয়ে কাউকে না দেখে জোর গলায় ডাকতে থাকেন। প্রধান গিন্নি উদাস ভঙ্গিতে আসলেন তবে মেঝেতে র’ক্ত দেখে তিনি যারপরনাই অবাক হলেন। অস্থির গলায় শুধালেন,
‘এগুলান কী? এতো র’ক্ত আইলো কই থেইকা?’
‘তোমারে এগুলা জিগানির লাইগা ডাকছি? পরিষ্কার করো তাড়াতাড়ি। আমি এহনি আইতাছি। নিচে কেউ আছে? সীমান্তরে ডাইকা ঘরে আইনা কোনো কাম দেও, যেন বাইরে না বাড়াইতো পারে।’
গিন্নি অবাক হলেও স্বামীর ওপর কথা বলা তার রক্তে নেই। তাই চুপচাপ আদেশ মেনে নিলেন। সীমান্তকে ঘরে এনে তিনি নিজেও দাঁড়িয়ে রইলেন। এ ফাঁকে প্রধান তালিব উদ্দীনের লা’শের ব্যবস্থা করে ফেললেন।
–
তালিব উদ্দীনের লা’শ পাওয়ার পর থেকে তামজীদের মায়ের অবস্থা খারাপ। সদ্য ছেলে হারানোর শোক কাটানোর আগেই স্বামীকে হারিয়ে ফেললেন। আহাজারি করে কাঁদছেন। তামজীদ মা’কে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বসে আছে। অপরপাশে বেলী অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। তামজীদ এক পলক বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘মা’কে নিয়ে বাড়ি যেতে পারবে?’
বেলী মাথা নাড়াল। তামজীদের মা’কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল, ‘আম্মা, চলেন বাড়ি যাই।’
তামজীদের মা মানলেন না। আরো জোরে জোরে কাঁদতে থাকলেন। সাহিত্য এগিয়ে এসে তামজীদকে চোখের ঈশারা করল। তামজীদ বুঝতে পেরে নিজেকে ছাড়িয়ে বেলীকে খেয়াল রাখতে বলে উঠে আসল। একটু দুরে দাঁড়িয়ে উদাস গলায় বলল,
‘বল।’
সাহিত্য তালিব উদ্দীনের নিথর দেহের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। সেদিকে মনোযোগ রেখেই বলল, ‘আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে এটা মামা সাহেবের কাজ।’
তামজীদ যে এটা ভাবেনি তা নয়। তাদের গোয়েন্দা ব্রেইন তাই অনেক কিছু বুঝতে পারা শুধু সময়ের ব্যাপার। গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোর মামা সাহেব ছাড়া দিনে দুপুরে এই কাজ অন্য কেউ করবেও না। এটাকে আমার হাতে ছাড়বি। বিশ্বাস’ঘা’তক লোক কোথাকার!’
‘ধরতে গেলে আমাদের কাজটা সহজই করে দিয়েছে৷ তুই নিশ্চয় সব ভুলে যাসনি?’
তামজীদ জবাব দিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার মায়ের দিকে তাকাল। দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে জানান দিল সে কিছুই ভুলে যায়নি। দু বন্ধু কতক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকল। এক পর্যায়ে সাহিত্য গম্ভীর, চিন্তিত গলায় বলল,
‘সাহেবা সেদিন ওই ঘরের দিকে গেছিল। ‘ও’ হয়তো কোনো শব্দ শুনেছিল। এত বছর হচ্ছে সে সেখানে আছে কেউ কিছু জানতে পারেনি কিন্তু গিয়ে সেই সাহেবার সামনেই শব্দ করে বসেছে।’
তামজীদ চমকাল, অস্থির কণ্ঠে শুধাল, ‘সাইরাহ্ কিছু বুঝতে পেরেছে?’
‘না, আমি ওকে সামলে নিয়েছি। কিন্তু কতদিনই বা লুকাবো? আবার বলবো কিভাবে তাও বুঝতে পারছি না।’
‘আমার মনে হয় তোর সব বলে দেওয়া উচিত। ‘ও’ নিজে থেকে জানতে পারলে তোকে ভুল বুঝবে তার থেকে ভালো তুই সবটা বলে দে। সাইরাহ্ অনেক বুঝদার, আশা করা যায় ‘ও’ সবটা বুঝবে।’
সাহিত্য মাথা নাড়ল। হয়তো সত্যিই তার সাহেবাকে সবটা বলে দেওয়া উচিত কিন্তু সাহেবা যদি তাকেই ভুল বোঝে? যদি তার পক্ষটা না বুঝে তাকেই দোষী করে? তখন কি হবে? সাহেবা ছেড়ে যাবে তাকে? সাহিত্যর বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠল। বার কয়েক পলক ঝাপ্টে বড় বড় শ্বাস নিল। সাহেবাকে সে পেয়েও হারিয়ে ফেললে ভেতর থেকে একদম ভেঙে যাবে।
–
সাহিত্য যখন বাড়ি ফিরল তখন সাইরাহ্ নিজের ঘরে থম মে’রে বসে আছে মেঝেতে। সাহিত্য তা দেখে আগে সাইরাহ্-র কাছে আসল। পাশে বসে হাত রাখল কপালে। নরম গলায় শুধাল,
‘কি হয়েছে, সাহেবা? এভাবে বসে আছিস কেন? শরীর খারাপ?’
সাইরাহ্ চোখ তুলে তাকাল। অদ্ভুত অবিশ্বাস ছিল সেই চোখ দুটোতে। সাহিত্য চমকাল তবে নিজেকে সামলে হাত দু’টো এগিয়ে দিল সাইরাহ্-র গালের দিকে। সাইরাহ্ আটকাল, শুধাল,
‘সাকিব ভাই তো ম’রে গেছিল তাই না? তাহলে আপনাদের বাড়িতে উনাকে কে রাখল?’
সাহিত্য এই ভয়টাই পাচ্ছিল। সে তো চেয়েছিল-ই সাইরাহ্-কে সব বলবে তবে সময় তার বিপরীতে গিয়ে আগেই কেন জানান দিল? সাহিত্য ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
‘তুই ওই ঘরে গেছিলি?’
‘যাওয়াতে খুব সমস্যা হয়ে গেল?’
‘আমি এটা বলিনি, সাহেবা। আমার কথা শোন!’
সাইরাহ্ ফিরে বসল। আজ সে আবার বড় ভাবীর ঘরে গেছিল তখনই পাশের ঘরের কথা মনে হলে সেখানে যায় সে। দরজায় তালা দেওয়া দেখে কান পাতে দরজায়। ওপাশ থেকে কারো গোঙানোর শব্দ পেয়ে বেশ অবাক হয়। দরজায় কোনো ফুটোও নজরে আসেনি বলেই সে ভাবে তালাটা খুলবে। তবে মাথায় আসে যদি ওপাশে বিপদ থাকে? তাই দরজা না খুলেই সে জানালা খুঁজতে থাকে। পুরোনো বাড়ি হওয়ায় জানালার একটা কপাটের সামান্য ভাঙা ছিল। সেখানে চোখ রেখেই সাইরাহ্ চমকে উঠেছিল। এটা সাকিব অর্থাৎ সীমান্তের বড় ভাই। প্রধানের বড় ছেলে। গ্রামে সবাই জানে এ ছেলে হারিয়ে গেছে নয়তো মা’রা গেছে। তাকে এমন জ্বলজ্যান্ত দেখে হজম হল না সাইরাহ্-র। সে নিজের চোখকে ভুল ভেবে আরও ভালো ভাবে নজর দিল। দু’পাশের শিকলে বাঁধা সাকিবকে দেখে বুঝে গেল এখানে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। উপরন্তু সেদিন সাহিত্যের ব্যবহারও তার দৃষ্টিগোচর হল না। বুঝে গেল সাহিত্য সবই জানে। সাইরাহ্ নাক টেনে চোখে চোখ রেখে শক্ত গলায় বলল,
‘শোনার জন্যই বসে আছি। বলুন, কি বলবেন!’
সাহিত্য বুঝল এবার সবটা সাইরাহ্-কে বলা প্রয়োজন। সে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে সোজা হয়ে বসল। সেসব দিনের স্মৃতি মনে করলেও তার ভেতরটা কাঁপে। তবুও মুখ খুলল,
‘আমার বুবুর কথা মনে আছে তোর?’
‘সামিয়া বুবু?’
‘হ্যাঁ। বুবু কিভাবে মা’রা গেছিল জানিস?’
সাইরাহ্ বুঝল না এখানে সামিয়া বুবু কোথা থেকে আসল! তবুও সে মাথা নাড়াল, বলল,
‘ছাদ থেকে পড়ে গেছিলেন।’
কথাটা শুনেই হিত্যের চোখে মুখে অদ্ভুত এক রাগ ফুটে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘মিথ্যা কথা। ওরা আমার বুবুকে মে’রে ফেলেছিল। ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছিল ইচ্ছা করে।’
সাইরাহ্ অবাক হল। ছোট বেলাতে সামিয়া বুবু তাকেও অনেক আদর করত। সাহিত্যের ১ বছরের বড়-ই ছিল সে। ৩-৪ বছর আগে উনি মা’রা গেছেন। সবাই জানতো এটা দূর্ঘটনা ছিল তবে এর পিছনেও যে এতকিছু থাকতে পারে তা বোধহয় তার কল্পনাতেও ছিল না। তার ভাবনার মাঝেই সাহিত্য বলতে শুরু করল পুরোটা ,
‘বুবু আমার বড় ছিল তবে ওর সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল মধুর। একে অন্যের জান ছিলাম আমরা। বড় ছিল সে আর বয়সও হয়েছিল বলেই বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল। তখন সাকিব ভাই জানাল সে বুবুকে পছন্দ করে। আত্মীয়ের মধ্যে আত্মীয়তা করতে আব্বা রাজি ছিলেন না কিন্তু সাকিব ভাইয়ের আকুতি মিনতি তিনি ফেলতে পারেননি। তাই খুব ধুমধাম আয়োজনেই বুবুর বিয়ে হয়ে গেল। সব ঠিকঠাক ছিল। ওদের সংসারও সুন্দর যাচ্ছিল। বিয়ের ৩ বছর পর বুবু জানতে পেরেছিল তার শ্বশুররা অনেক অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত। মামা সাহেবসহ প্রধানের ৫ সদস্যই এসবের সাথে যুক্ত। কাঠের ব্যবসার পিছে বিভিন্ন কালো ধান্দা ছিল সাথে ছিল ভয়ংকর এক ব্যবসায়। গ্রামের মানুষ না বুঝে প্রধানের সাহায্যে শহরে যেত চিকিৎসার জন্য। আর প্রধান তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ডাক্তারের সাথে হাত মিলিয়ে বাচ্চা থেকে বৃদ্ধদের অপারেশনের কথা বলে কিডনি নিয়ে নিত। বাহিরের দেশে এবং নিজেদের দেশেই তা অনেক দামে বিক্রি করা হতো। এসব যখন আমার বুবু জানতে পারে তখন সে ঠিক করে সবটা আমাকে জানাবে। কিন্তু তার আগেই মামা সাহেব ওকে দেখে ফেলে। তারেক ছোট হওয়া সত্বেও তখন থেকেই এসবের সাথে যুক্ত ছিল। ওরা আমার বুবুকে চুপ থাকতে বললেও বুবু চুপ থাকবে না জানায়। তখন সবাই মিলে আমার বুবুকে মে’রে ফেলেছে।’
সাহিত্যের গলা কাঁপছে। সাইরাহ্-র নিজেরই খারাপ লাগছিল। সাহিত্য নিজেকে সামলে বলে, ‘জানিস বুবু তখন ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। এটা ওরা জানতো তবুও আমার বোনটাকে আর বাঁচতে দেয়নি। শেষ মুহূর্তে বুবু বলেছিল কাউকে কিছু বলবে না কিন্তু ওরা বিশ্বাস করতে পারেনি। দেয়ালে বার বার মাথায় বা’রি দেওয়ায়, ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বুবু মা’রা যায়। সবাই মেনে নিয়েছিল এটা স্বাভাবিক মৃ’ত্যু তবে আমি মানতে পারিনি। যে বুবু বাচ্চার খুশিতে সাবধানে চলত সে ছাদ থেকে পড়ে গেছে? এটা আমি কিভাবে মানবো? আমার মত সাকিব ভাইও মানতে পারেনি। উনি আশ পাশ অনেক খুঁজেছে এবং বুবুর মত করেই সত্যিটা জেনে গেছিল। মামা সাহেব এত নি’ষ্ঠুর যে সাকিব ভাইকেও মা’রতে চেয়েছিল। তবে আমি আর আব্বা মিলে ভাইকে বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম। দূরে রেখে চিকিৎসা করছিলাম। মামা সাহেব জানতেন না তা। সবাই ভেবেছিল সাকিব ভাই মা’রা গেছে তবে আমি আর আব্বা-ই জানতাম উনি বেঁচে আছে। ভাগ্য ভালো থাকায় সবটা আমাদের বলে দিতে পেরেছিলেন তবে মাথায় আ’ঘাত লাগায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এদের একটাকেও বাঁচতে দিব না।’
সাইরাহ্ কোনরকমে জিজ্ঞাসা করল, ‘এদের মধ্যে তুহিন সরদারও একজন ছিল, তাই না?’
সাহিত্য তাকাল না তার দিকে। উপর-নীচ মাথা নাড়িয়ে জানাল, ‘হ্যাঁ। আমি গোয়েন্দাতে যুক্ত হওয়ার ৬ মাস পরই ঠিক করেছিলাম এবার প্রতিশোধের খেলা শুরু। তামজীদ সব জানত, পাশেও ছিল আমার। যেদিন আমরা সব সাজিয়ে নিয়ে তুহিন সরদারকে মা’রতে গেছিলাম সেদিন ওর বিয়ে ছিল এটা জানতাম কিন্তু কার সাথে ছিল তা জানতাম না। ওকে মে’রে ফেরার পর জানতে পারি আমি আমার সাহেবাকে হারিয়ে ফেলেছি, সাথে সাহেবাকে বিধবাও করে ফেলেছি। আমি জানতাম না তুহিন সরদারের সাথে তোর বিয়ে হয়েছিল আর জানলেও এই কাজটা আমি করতামই।’
সাইরাহ্-র চোখ দুটো ভেজা লাগল। সাহিত্য যা করেছে তা সে কর্তব্য ভেবেই করেছে। মাঝখানে সবার মাঝে চাপা পড়ে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছিল সাইরাহ্-র। সাহিত্য অসহায় চোখে সাইরাহ্-র দিকে তাকাল। সাইরাহ্-র গাল দু’টো আজলে নিয়ে করুণ কণ্ঠে বলল,
‘আমি তোর সুখ কেড়ে নিতে চাইনি, সাহেবা। আমি তোর সুখ হতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভাগ্য আমার থেকে তোকে কেড়ে নিল। এরপর জানলাম যাকে আমি মন দিয়ে বসে আছি তাকেই আমার ভাইও মন দিয়েছে। আমি দিশেহারা হয়ে গেছিলাম। কত রাত অপরাধবোধে আমি ঘুমাইনি। তুহিনকে মা’রার অপরাধবোধ আমার কখনো হয়নি, শুধু তোর সুখ কেড়ে নেওয়ার অপরাধবোধ ছিল। তোর সামনে দাঁড়ানোর বা তোকে চাওয়ার মতো মুখ আর সাহস কোনোটাই আমার ছিল না। সীমান্তকে তুইও পছন্দ করিস যেদিন বুঝলাম সেদিন আমি নিজেকে ভুলে গেছিলাম। তোর সুখ ফিরিয়ে দেব ভেবে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় অন্য কিছু চেয়েছিল তাই আজ তুই আমার হয়ে গেছিস।’
সাইরাহ্-র চোখে বেয়ে জল গড়াল। তুহিন অপরাধ করেছিল এটা সে মেনে নিয়েছে তবে সাহিত্য যে তার প্রথম স্বামীর খু’নী এটাও তার মেনে নিতে হবে। ৬ টা মাস বিধবা হওয়ার যন্ত্রণা, অপবাদ নিয়ে কাটিয়েছে। তবুও এসব তার কাছে তুচ্ছ মনে হল। কিছু না ভেবেই সাহিত্যের বুকে মাথা রাখল। ভেজা গলায় বলল,
‘আমার আপনার ওপর অভিযোগ নাই, গোয়েন্দা সাহেব। যা করেছেন তা ভাই হিসেবে করেছেন। আমার ভাগ্যে এটাই ছিল হয়তো।’
সাহিত্য সাইরাহ্-কে আঁকড়ে ধরল। তার ভেতরটা হালকা হয়ে গেছে। সাইরাহ্-র কপালের এক পাশে ঠোঁট ছুইয়ে বলল, ‘যখন জেনেছিলাম তুই সীমান্তকে পছন্দ করিস সেদিন আমার বুকের বাঁ’পাশের তীব্র য’ন্ত্রণায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। পরে ভেবেছিলাম যে অ’ন্যায় তোর সাথে আমি করেছি তার বিপরীতে তোর সুখটাও আমারই এনে দিতে হবে।’
সাইরাহ্ কাঁদতে কাঁদতেও হেসে ফেলল। সাহিত্যের বুকের কাছের শার্ট শক্ত করে ধরে বলল, ‘অথচ আমার সুখ ছিল আপনার বুকে।’
চলবে..
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)