সাহেবা পর্ব-৩৪

0
38

#সাহেবা
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
____________

৩৪.
রাতের আঁধারে সাহিত্য আর তামজীদ বেড়িয়েছে। আজ তাদের শেষ শিকারের শেষ পরিণতির পালা। দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাঁটা লাগাল প্রধানের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে মাঝ রাস্তাতেই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেল প্রধান আর তার কিছু চ্যালাপ্যালা। প্রধান তাদের দুজনকে আসতে দেখে কুটিল হাসি হাসলেন। দাঁত খুঁচিয়ে বললেন,

‘আমি জানতাম তোমরা আইবা। না আইলে কি আর হইবো! সবাইরে মা’রছো, আমারে কি ছাইড়া দিবা!’

সাহিত্য আর তামজীদ একে অপরের দিকে তাকাল তবে কোনো জবাব দিল না। প্রধান এগিয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। সাহিত্যের গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘নিজেগোরে অনেক চালাক মনে করো? এই গেরামে এত সাহস কার আছে যে প্রধানের গায়ো হাত দিবো! এত বড় কলিজাডা কেবল তোমার, তোমার বাপ আর এই বন্ধুডারই থাকতে পারে।’

সাহিত্য এবার হাসল। নিজের গাল থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে প্রধানের হাতই শক্ত করে চেপে ধরল। সাহিত্যের মুখে অদ্ভুত এক রাগ ফুটে উঠল। চোয়াল শক্ত করে বলল,

‘আমরাও খুব ভালো করে জানি আপনি কি জিনিস! কেউ বুঝুক আর না বুঝুক আপনি যে বুঝে ফেলবেন এটা আমরা বেশ ভালোভাবেই জানতাম।’

প্রধান আর্তনাদ করে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। প্রধানের গায়ে হাত দেওয়ায় তার চ্যালাপ্যালাগুলো তেড়ে আসে। সে সময়ই আশ পাশ থেকে সাহিত্যর লোকজন চেঁচিয়ে উঠে এগিয়ে আসল। দু পক্ষের মধ্যে মুহূর্তেই একটা লড়াই শুরু হয়ে গেল। তামজীদও অন্যদের সাথে প্রধানের চ্যালাপ্যালাগুলোকে ধরেছে। প্রধান এই সুযোগে সাহিত্যের বুকে লাথি দিল। সাহিত্য ছিটকে পড়ল দূরে। প্রধান একটা দা তুলে নিয়ে এগোল সাহিত্যের দিকে। সাহিত্য কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রধান কো”প দিল। তবে ভাগ্যক্রমে তামজীদ প্রধানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার ফলে কো’পটা গিয়ে পড়ল অন্যদিকে। তামজীদ সাহিত্যের হাত ধরে তুলে ব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,

‘ঠিক আছিস? তোর লাগেনি তো?’

সাহিত্য দু’দিকে মাথা নাড়াল। প্রধান বুঝল এদের দুজনকে হারাতে হলে যেকোনো একজনকে আগে অকেজো করে ফেলতে হবে। এবার সে ঠিক সেদিকেই মনোযোগ দিল। এত হাতাহাতির মধ্যে কার কিভাবে লাগছে বোঝা যাচ্ছিলো না। তার ওপর শুধু মশালের আলো তাই আরো বেশি সমস্যা হচ্ছিল। সাহিত্য আর তামজীদ একসাথে এগোতে গেলে প্রধানের একটা চ্যালা এসে তামজীদের মাথায় বা’রি মা’রল। অপরদিক থেকে একজন এসে সাহিত্যের বাহুতে ছু’ড়ি চালিয়ে দিল। দুজনেই খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়ল তবে এর মধ্যেই সেই দুজনকে সাহিত্যের পক্ষের লোকজন এসে মে’রে সরিয়েছে। প্রধান সুযোগ বুঝে সাহিত্যের পেটে দা দিয়ে কো’প দিতে গেলে তা লেগে যায় তামজীদের। তামজীদ পেটের একাংশ কে’টে গিয়ে গলগল করে পড়তে শুরু করে র’ক্ত। সাহিত্যের যেন মাথা ঘুরিয়ে উঠল। সব ভুলে সে আগে এগিয়ে গেল প্রাণপ্রিয় বন্ধুর দিকে। ততক্ষণে প্রধান এগিয়ে আসতে গেলে পেছন থেকে কেউ তার গলায় এক কো’পে মাথা নামিয়ে ফেলে। সাহিত্য শব্দ পেয়ে পিছে তাকাতেই দেখে শেখর সাহেব। বাবার চোখে মুখে তখন আগুন ঝরছে। বাকিরা এ দৃশ্য দেখে দিক বেদিক ছুটতে শুরু করল। সাহিত্য এক হাতে চেপে ধরল তামজীদের পেট, আরেক হাতে তামজীদের মাথা নিজের কোলের ওপর নিতেই তামজীদ ব্যাথায় আর্তনাদ শুরু করল। শেখর সাহেব ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,

‘ওরে ওঠা তাড়াতাড়ি। এখনি হাসপাতালে নিতে হবে।’

সাহিত্যের গলা কাঁপছিল। নিজের জন্য বন্ধুর এমন অবস্থা দেখে তার নিজেকে অপরাধী মনে হল। তামজীদ সাহিত্যের হাত চেপে ধরে কোনো মতে বলল,

‘আমার কিছু হয়ে গেলে আমার আম্মা আর বেলীর খেয়াল রাখিস, প্লিজ।’

সাহিত্যর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। কোনো মতে তামজীদের শরীরটা কোলে তুলে নিয়ে ছুট লাগাল। নিজের হাতের ক্ষতটাকে তার ক্ষত মনে হল না। তামজীদের কিছু হয়ে গেলে সে কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। চেচিয়ে শেখর সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘আব্বা, যেমনে পারেন গাড়ির ব্যবস্থা করেন। আপনি দৌড়ায়া যান!’

শেখর সাহেব শুনলেন। যত দ্রুত সম্ভব পরিচিত গাড়ির উদ্দেশ্যে দৌড় লাগালেন। গ্রাম থেকে একজন প্রতিদিন ট্রাক নিয়ে বের হয়, তার উদ্দেশ্যেই ছুটলেন তিনি। তামজীদের জ্ঞান হারানোর উপক্রম। সে কোনো মতে ব্যাথাতুর গলায় বলল,

‘এত কষ্ট করিস না, সাহিত্য। আমার হয়ত সময় শেষ।’

সাহিত্য ছলছল চোখে এক ধমক দিল। তামজীদ ব্যাথা গলাতেই হাসতে লাগল। সাহিত্য আরে জোরে ছুটতে থাকল। তামজীদকে বার বার বলল,

‘চোখ খোলা রাখ। বেলী আর কাকির কথা ভাব। ওদের তুই ছাড়া কেউ নাই, তামজীদ। তুই জ্ঞানে থাকার চেষ্টা কর।’

সাহিত্যরা তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় আসতেই সাইরাহ্ দুজনকে দেখতে পেল আবছা। সাহিত্য নেই দেখে সাইরাহ্ এসে ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। চিন্তায় তার পাগল হওয়ার অবস্থা। চাঁদের আলোয় তাদেরকে রাস্তায় এভাবে দেখে ছুট লাগাল। সেখান থেকেই চেঁচিয়ে ডাকল,

‘সাহিত্য, দাঁড়ান!’

সাহিত্য ডাক শুনলেও তার দাঁড়ানোর অবস্থা নেই। সাইরাহ্ এক ছুটে বের হয়ে আসল। সদর দরজা খোলা-ই ছিল। সাইরাহ্ ছুটে এসে সাহিত্যর পাশাপাশি আসল। তামজীদকে এভাবে দেখে অস্থির চিত্তে শুধাল,

‘কি হইছে তামজীদ ভাইয়ের? এই অবস্থা কেন?’

সাহিত্য অসহায় গলায় বলল, ‘পরে বলব সব। তুই আসলি কেন? বাড়ি যা।’

সাইরাহ্ শুনল না। সাহিত্যের বাহুতে র’ক্ত গড়িয়ে পড়তে দেখে সে হাত দিয়ে সেখানে চেপে ধরল। সাহিত্য দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা সহ্য করল। এর মধ্যেই তারা মোড়ে এসে পৌঁছাল। শেখর সাহেব ততক্ষণে ট্রাক নিয়ে হাজির হয়েছেন। ট্রাক ছুটল দ্বিগুণ গতিতে। আধাঘন্টার রাস্তা পেড়িয়ে যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল ততক্ষণে তামজীদের জ্ঞান হারিয়েছে। সাহিত্য সাহস পাচ্ছিল না তাকে ধরতে তাই শেখর সাহেব আর ট্রাক ড্রাইভার মিলে তামজীদকে হাসপাতালের ভেতরে নিল। কোনো মতে শরীরটা টেনে নিয়ে সাহিত্য হাসপাতালে পা রাখল। তামজীদের এমন অবস্থা দেখে ডাক্তাররা আগে পুলিশকে জানাতে বলল। সাহিত্য নিজের পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের টেলিফোন থেকেই উপর মহলে কল দিল। তারা ডাক্তারকে জানিয়ে দিল এবং চিকিৎসার কাজ শুরু করতে বলল। সাহিত্যের হাতেরও বেশ ক্ষত হয়েছে। সাহিত্য ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল। সাইরাহ্ তার পাশে বসে বাহুতে চেপে ধরল। কোনোমতে বলল,

‘আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন। আমি ডাকি ওদের?’

সাহিত্য অসহায় চোখে তার দিকে তাকাল। প্রশ্নের জবাব না দিয়েই সবার মধ্যে সাইরাহ্-কে জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠল। অস্বস্তি হলেও সাহিত্যর অবস্থা দেখে সাইরাহ্ তাকে সরাল না। মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল,

‘কিচ্ছু হয়নি, তামজীদ ভাই ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না।’

সাহিত্য কান্নারত গলাতেই বলল, ‘আমার জন্য তামজীদের এই অবস্থা। আমি কাকিকে কী জবাব দিব? বেলীকে কী বলব? ওদের বিয়ের তো বেশিদিন হয়নি।’

সাইরাহ্ পিছনে ফিরে শেখর সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আব্বা, ডাক্তার অথবা অন্য কাউকে একটু ডেকে আনেন। আপনার ছেলের হাত থেকে র’ক্ত পড়ছে এখনো। বন্ধ হচ্ছে না।’

শেখর সাহেব ব্যস্ত পায়ে গিয়ে একজন নার্সকে ডেকে আনল। সে এসে সাহিত্যকে ভেতরে নিয়ে গেল৷ পেছন পেছন অবশ্য সাইরাহ্-ও গেছে। সাহিত্যের হাতের কাটাটা গভীর হওয়ায় সেখানে সেলাই পড়বে। র’ক্তও বেশ গড়িয়ে গেছে তাই দ্রুত তাদের কাজ শুরু করল। ওদিকে তামজীদের র’ক্তক্ষ’রণ বেশি হওয়ায় তার জন্য র’ক্তের প্রয়োজন। র’ক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। রাত হওয়ায় হাসপাতালের ইমারজেন্সি র’ক্ত শেষ হয়ে গেছিল। বাকি ছিল কেবল ১টি ব্যাগ অথচ তামজীদের প্রয়োজন ২ ব্যাগ র’ক্ত। আরো এক ব্যাগ জোগাড় করতে বলা হল। এ কথা শুনে সাহিত্য তখনই বের হতে যাচ্ছিল তবে নার্সরা তাকে আটকাল। শেখর সাহেব, সাইরাহ্ আর ট্রাক ড্রাইভারের র’ক্ত পরীক্ষা করতে দিয়ে তারা ছুটল র’ক্তের খোঁজে। ভাগ্য ভালো থাকায় একজন র’ক্ত দিতে রাজি হয় এবং তামজীদের চিকিৎসা চলতে থাকে।


সারারাত সবার নির্ঘুমে কাটে। তামজীদের জ্ঞান এখনো ফেরেনি। পেটের এবং মাথার ক্ষত গভীর হওয়ায় তার অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক ছিল। সাহিত্য এই অবস্থাতেও ঘুমাচ্ছিল না দেখে তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। বেশ পরে সে ঘুমিয়েছে। সাইরাহ্ সারারাত তার পাশেই ছিল। শেখর সাহেব আর ট্রাক ড্রাইভারও বাহিরে বসে থেকেছে। লোকটা বেশ ভালো এবং বিশ্বস্ত। সকাল সকাল শেখর সাহেব গেছিলেন গ্রামে। সেখানে তামজীদের মা আর বেলীকে কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এনেছে। তারা জানে না তামজীদের অবস্থা সম্পর্কে তবে পুরো গ্রামে প্রধানের গলা কা’টা লা’শের কথা তারা শুনেছে। এই অবস্থাতে বেলীকে আনা সম্ভব ছিল না, তামজীদের মায়ের জন্যই আনা গেছে। হাসপাতালে পা রাখতেই বেলী আর তামজীদের মা একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের দুজনের মন-ই ইঙ্গিত দিল খারাপ কিছুর। সামনেই সাইরাহ্-কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেলী তার কাছে দাঁড়াল। নিচু গলায় শুধাল,

‘তোমরা হাসপাতালে কেন, সাইরাহ্ বুবু? কি হইছে? ফুফা সাহেব আমাদেরকে এখানে আনল কেন?’

সাইরাহ্ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেলীর হাত ধরল। শক্ত গলায় বলল, ‘শক্ত থেকো।’

বেলী বুঝল না। তার মন মানছে না। তামজীদের মা আর বেলীকে আইসিইউ-র সামনে এনে দাঁড় করানো হল। প্রথমে সমস্যা হলেও চিনতে অসুবিধা হল না কারোরই। তামজীদের মা সাথে সাথেই বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করলেন। কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে আর্তনাদ করতে থাকলেন,

‘আমার পোলা ওইহানে ক্যান? তামজীদরে! বাবা, তোর কী হইলো!’

বেলী স্তব্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকল তামজীদের পানে। সে এত বেশি শক পেয়েছে যে তার চোখের কোণে জল আসল না। শুধু চোখ দু’টো অসম্ভব জ্বলতে থাকল। বেলী মাথা ফিরিয়ে শেখর সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

‘ফুফা সাহেব, আমি কি ভেতরে যেতে পারব?’

শেখর সাহেব বেলীর নিষ্পাপ, মায়াবী মুখটা দেখে মাথা নিচু করে নিল। তাদের জন্যই ছেলেটা আজ এই পরিস্থিতিতে। নিজেকে সামলে বললেন,

‘দু মিনিট দাঁড়াও, আমি কথা বলে আসতেছি।’

বেলী মাথা নাড়ল। তামজীদের মা বেলীর এমন নিস্তব্ধতা দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। বেলীকে কাছে টেনে বললেন, ‘তুই কানদোস না কেন? বেলী!’

বেলী তামজীদের মা’কে উল্টো বুকে টেনে নিল। মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘আপনি কাঁদবেন না, আম্মা। আপনার ছেলের কিছু হবে না।’

তামজীদের মা আরও হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন। বেলীকে এমন দেখে সাইরাহ্ নিজেও ভয় পেল। কাঁপা কাঁপা হাতে বেলীর কাঁধ স্পর্শ করতেই সে বলে উঠল,

‘ভয় পেও না, সাইরাহ্ বুবু। ঠিক আছি আমি। উনি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না।’

বিড়বিড় করে ক’বার বেলী শুধু এই একটা কথা-ই আওড়াল। সাইরাহ্ এবার আরও ভয় পেল। বেলীর মানসিক অবস্থা ঠিক নেই। শেখর সাহেব অনুমতি এনে বেলীকে একা-ই ভেতরে যেতে বলল। তামজীদের জ্ঞান নেই। সে শুধু কতক্ষণ তামজীদের মুখের দিকে তাকিয়েই থাকল। কোনো কথা বলল না। এরপর তামজীদের আঙুলের ভাজে নিজের একটা আঙুল দিয়ে দিল। থম মে’রে থেকে আওড়াল,

‘আমি আপনাকে ছেড়ে চলে গেলে আপনি বাঁচতে পারতেন না, এখন আমাকে একা করে দিচ্ছেন?’

অপর পাশ থেকে তো আর জবাব আসে না। বেলী তামজীদের হাতের কাছে মাথা রাখল। হাতে খুব সাবধানে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকে বলল,

‘আমি অপেক্ষা করব আপনার। আপনি সুস্থ হয়ে আসবেন তো?’

বেলী বের হয়ে আসল। তার ভেতরটা কষ্টে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তার আপন মানুষগুলোই কেন হারিয়ে যায়? বাহিরে এসে কারো সাথে কথা না বলে চুপচাপ দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। দম আটকে রাখতে না পেরে বুক চেপে কান্না করতে থাকে। কেউ তাকে বাঁধা দিল না। তার স্বামী কাঁচের ওপাশে অর্ধ মৃতের মত পড়ে আছে, সে নিজেকে আটকাবে কিভাবে? একটু কাঁদুক। যদি হালকা হতে পারে তবে ক্ষতি কি!


সাহিত্যের ঘুম ভাঙল অনেক পরে। দেখল সাইরাহ্ পাশে নেই। হাতের স্যালাইনটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। সে কোনো রকমে ব্যাথা হাতটা নিয়ে বের হয়ে আসল। বারান্দাতেই সবাই বসে ছিল। সাহিত্যকে এভাবে বের হয়ে আসতে দেখে সাইরাহ্ ছুটে আসল। সাহিত্যকে ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,

‘উঠে এলেন কেন?’

সাহিত্য তামজীদের মা আর বেলীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওরা কখন এসেছে?’

‘সকালেই। আব্বা এনেছেন ওদের।’

সাহিত্য তামজীদের মায়ের দিকে এগোল। সাহিত্যের হাতের ব্যান্ডেজ দেখে তামজীদের মা কেঁদে ফেললেন। মাথা নিচু করে বললেন,

‘কি হইয়া গেল বাবা তোমাগো!’

সাহিত্য পাশে বসল। ডান হাতে তামজীদের মা’কে জড়িয়ে ধরল। তামজীদের মা তখনো কাঁদছেন। সাহিত্য আর তামজীদ বরাবরই তার কাছে একই ছিল। কখনোই তিনি কোনো ফারাক করে দেখেনি। আজ তারা দুজনই কি অবস্থায় পড়ে আছে! সাহিত্য শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

‘আমাকে মাফ করে দিয়েন, কাকি। আমি আপনার ছেলেরে এত কিছু থেকে বাঁচাতে পারিনি।’

‘নিজেরে দোষ দিও না, বাবা। আল্লাহ হয়তো আমার পোলাডার কপালে এইডাই লেইখাই রাখছিল। কিন্তু আমি তো আমার এক পোলা আর স্বামীরে হারায়া নিঃস্ব হইয়া গেছি। এই একটা পোলাই আমার বাঁইচা থাকার আশা। ওর কিছু হইয়া গেলে আমি কি নিয়া বাঁচমু? আল্লাহ আমার কোন পরীক্ষা নিতাছে?’

সাহিত্য তামজীদের মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা দেয়ালে ঠেকাল। দূরে বেলী বসে আছে। তার এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে নিজেকে আরও অপরাধী মনে হল। একবার চোখ ফিরিয়ে সাইরাহ্-র দিকে তাকাল। চিন্তায় মেয়েটার মুখটাও একটুখানি হয়ে আছে। কিছুক্ষণ বসে থেকে সাহিত্যকে নিয়ে সাইরাহ্ আবার ফিরে গেল কেবিনে। সাহিত্যর হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল,

‘কিচ্ছু হবে না তামজীদ ভাইয়ের। এভাবে ভেঙে পড়বেন না।’

সাহিত্য চোখ বন্ধ করে বলল, ‘আমাদের ঝামেলাতে ওকে জড়ানো ঠিক হয়নি। ‘ও’ এসবে না জড়ালে আজ সুস্থ থাকত।’

সাইরাহ্ কিছু বলার আগেই সাহিত্য করুণ গলায় শুধাল, ‘আমি খুব খারাপ, সাহেবা? আমি আমার বন্ধুকে নিজের স্বার্থের জন্য মৃ’ত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি? সীমান্ত কথা রাখেনি বলে আমরা ওর সাথে কতদিন কথা বলিনি অথচ আজ আমিও আমার কথা রাখতে পারলাম না।’

সাইরাহ্ সাহিত্যকে জড়িয়ে ধরল। মাথা তুলে দু’হাত রাখল তার গালে। সাহিত্যের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বন্ধু।’

চলবে..