
#সাহেবা
#অন্তিম_পর্ব
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
_______
৭ দিন কাটল খুব কঠিনভাবে। সাহিত্য সুস্থ হয়ে গেলেও তামজীদ এখনো সুস্থ হয়নি। আঘাত বেশি হওয়ায় তামজীদের সুস্থ হতে সময় লাগবে। আপাতত সে কিছুটা সুস্থ। বেলী ২৪ ঘন্টা হাসপাতালেই থেকেছে। সাইরাহ্ তামজীদের মা’কে বুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে গেছিল। সাহিত্যও থেকেছে হাসপাতালে। সাইরাহ্ আর শেখর সাহেব প্রতিদিন তাদের জন্য খাবার এনেছে, সাথে থেকেছে। অবশেষে তামজীদকে খানিকটা সুস্থ দেখে সবারই যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। বেলী তামজীদের শিয়রে বসেছিল। তামজীদ তার দিকে তাকিয়ে দূর্বল গলায় বলল,
‘তোমার চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। রাতে ঘুমাও না?’
বেলী তামজীদের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘উহু, না।’
‘কেন?’
‘ভয় হয়। যদি আপনাকে হারিয়ে ফেলি!’
তামজীদ দূর্বল চিত্তেই হাসল। বেলীর এই ভালোবাসাতেই সে সুখী। এত যন্ত্রণার মধ্যেও তার কষ্টের চেয়ে বেশি আনন্দ হচ্ছে। দূর্বল হাত দিয়ে বেলীর হাতটাও আগলে ধরতে চাইল। তা বুঝে বেলী নিজেই ধরল। তামজীদ হেসে বলল,
‘এত ভয় পাও?’
‘হু, একবার তো ফেলে চলেই যাচ্ছিলেন। আল্লাহ বোধহয় আমার ওপর দয়া করেই আপনাকে রেখে গেল।’
তামজীদের বুকে মাথা রাখল বেলী। মানুষটা তাকে ছেড়ে গেলে সে ম’রে হয়তো যাবে না তবে ভালো থাকাগুলো তো চলে যাবে। তামজীদ নামক মানুষটাতেই তো তার সুখ। তামজীদ হাত রাখল বেলীর মাথায়। আশ্বস্ত করে বলল,
‘কোথাও যাবো না, তুমি ঘুমাও।’
বেলী আর তামজীদের কথার মধ্যে বাহির থেকে সাহিত্য ডাকল, ‘আসবো?’
বেলী চট করে মাথা সরাল। নিজেই অনুমতি দিল। সাহিত্যের সাথে সাইরাহ্-ও এসেছে। সাইরাহ্ এসে বেলীকে আগে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু খেয়েছো?’
বেলী না-বোধক মাথা নাড়ল। সাহিত্য তামজীদের বেডের পাশে বসল। তামজীদ তাকে দেখে সুন্দর করে হাসল। জিজ্ঞাসা করল, ‘কি অবস্থা, সাহিত্য ভাই? শরীর ঠিকঠাক?’
সাহিত্য গম্ভীর চোখে তাকাল। কণ্ঠস্বরে গম্ভীরতা রেখেই জবাব দিল, ‘নিজের কথা ভাব। নায়কের মতো আমার কো’পটা নিজের ওপর নিতে কে বলেছিল?’
‘আরে আমি ইচ্ছে করে নেইনি। শুধু তোকে সরিয়ে দিয়েছি আর এসে লেগে গেছে আমার। তোর মামা সাহেবের কি অবস্থা? গলাকাটা ভূত হয়ে যায়নি তো আবার?’
সাহিত্য চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। তামজীদ এই অবস্থাতেও মজা নিচ্ছে! ছেলেটা কি দিয়ে গড়া? সাইরাহ্ বেলীকে নিয়ে গেছে কিছু খাওয়াতে। এ ফাঁকে তামজীদ বেশ কষ্টে জিজ্ঞাসা করল,
‘প্রধান কাকার লোকজন পুলিশকে সাক্ষ্য দেয়নি?’
‘না। আব্বা ওদেরকে সামলেছে।’
‘সাকিব ভাইকে তো এবার চিকিৎসা করাতে হবে!’
সাহিত্য সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। এখনো তার অনেক দায়িত্ব। সীমান্তকে সামলে দেওয়া, সাকিব ভাইকে সুস্থ করে তোলা, পরিবার সামলানো, সাহেবাকে এসব থেকে দূরে রেখে সুখে রাখা—সবই তার দায়িত্ব। সাহিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তামজীদের হাত ধরে কৃতজ্ঞ গলায় বলল,
‘তোর মতো বন্ধু পেয়েছিলাম বলেই আমি জীবনে সফল। ধন্যবাদ, আমার জীবনে বন্ধু হয়ে আসার জন্য।’
–
এরপর সময় কাটল। তামজীদকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে বেলী। এখন থেকে সে তামজীদের বাড়িতেই থাকবে। এ বিষয়ে অবশ্য শেখর সাহেব কথা বলেছেন তাই বেলীর বাবাও আপত্তি করেনি। সাহিত্য নিজের কাজ আর পরিবার সামলানোর পাশাপাশি তামজীদের খেয়ালও রেখেছে। সবার আড়ালেই সাকিবকেও চিকিৎসার জন্য শহরে পাঠিয়েছে। সে প্রায়-ই গিয়ে দেখা করে আসে। নাজিরার বিয়ের তারিখ পড়েছে কিছুদিন পরই। সাইমা যেহেতু আত্মরক্ষায় তার স্বামীকে মে’রেছিল তাই প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে মুক্ত করা হয়েছে। সাইরাহ্ সাইমাকে দেখতে তাদের বাড়িতে এসেছে। বাড়ির বাহির থেকেই শুনল সবুর মিয়া সাইমার ওপর চেঁচাচ্ছে। সাইরাহ্-র মনে পড়ল নিজের সেই দিনগুলোর কথা। দাঁতে দাঁত চেপে সে বাড়িতে প্রবেশ করল। তাকে দেখে সবুর মিয়া বললেন,
‘আইছে আরেকজন। আমার জীবনডা অর্ধেক খাইছোস তুই, বাকি অর্ধেক খাইবো তোর বইন। অপ’য়ার দল!’
সাইরাহ্-র প্রচন্ড রাগ হল। নিজের ওপর হওয়া সব অত্যাচার সে মুখ বন্ধ করে মেনে নিয়েছিল কিন্তু তার বোনের প্রতি অন্যায় সে মানবে না। তাই সরাসরি মুখের ওপরই বলল,
‘আপনি কার সাথে বিয়ে দিচ্ছেন তা না দেখে মেয়ে তাড়াইলে আর পরে মেয়ে বিধবা হইলে দোষটা আমাদের না, আপনার। মেয়ে শুধু জন্ম দিলেই হয় না, বাপ হওয়ার জন্য সব দায়িত্বই ঠিকভাবে পালন করতে হয়।’
কথাটা শুনে সবুর মিয়া ক্ষেপে গেলেন। বি’শ্রী ভাষায় দু’টো গালি দিয়ে তেড়ে গেলেন সাইরাহ্-র দিকে। সাইরাহ্ জায়গা থেকে সরে বারান্দায় গেল। সেখানে মাটির কলস আজও ছিল। সে সেই কলস তুলে এক আছাড় মারল মাটিতে। তাহেরা পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সব দেখছে। সাইরাহ্-র দাদী তখন বিলাপ শুরু করেছেন। সাইরাহ্ রাগে তাকে ধমক লাগাল,
‘আপনার এই নাটক বন্ধ করেন। আপনার জন্যই আজ আমাদের এই অবস্থা। আমরা অপয়া হইলে আপনি নিজেও অপয়া। আপনার স্বামীও ম’রছে। আর আব্বা, মেয়ে যখন মা’র খেয়েছে তখন খোঁজ নিতে যাননি তাই এখনও ওকে কিছু বলার অধিকার আর আপনার নাই। বুবুকে নিয়ে এতো সমস্যা হইলে আমি বুবুকে নিয়ে চলে যাবো।’
সাইরাহ্ এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সাইমার হাত ধরে এগোল সাহিত্যদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইমা মানা করল তবে সাইরাহ্ সে মানা শুনল না। সাইমা লজ্জিত গলায় শুধাল,
‘বোনের শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকবো? এটা কেমন লাগে, সাইরাহ্? আমি ওখানেই মানিয়ে নিবো।’
সাইরাহ্ এক হাতে বোনকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। আশ্বস্ত করে বলল, ‘তোমাকে আমার শ্বশুরবাড়ি থাকতে হবে না। তোমাকে আমি অন্য জায়গায় নিয়ে যাবো।’
‘কোথায়?’
‘তোমার সুখের বাড়ি।’
সাইমা বুঝল না, তবে প্রশ্নও করল না। দু’বোন একসাথে এগোতে লাগল। রাস্তায় দেখা হলো সীমান্তের সাথে। সাইরাহ্-কে দেখে সে কেবল তাকিয়ে থাকল। তা দেখে সাইরাহ্ সিদ্ধান্ত নিলো আজ সরাসরি সীমান্তের সাথে কথা বলবে। সাইমাকে বলল,
‘তুমি একটু দাঁড়াও, বুবু। আমি আসছি।’
সাইমা মাথা নাড়ল। সাইরাহ্ দাঁড়াল সীমান্তের সামনে। শুধাল, ‘ভালো আছেন, সীমান্ত ভাই?’
সীমান্ত অদ্ভুত ভাবে হাসল। কণ্ঠে বিষাদ নিয়ে জবাব দিল, ‘যাকে নিয়ে ভালো থাকতে চেয়েছিলাম সে নেই, আদরের বোন নেই, ভাইয়া নেই, আব্বাও চলে গেছেন। এতকিছুর পর ভালো থাকি কিভাবে?’
‘কষ্ট পাবেন না। আল্লাহ যা করেন তা ভালোর জন্য করেন।’
সীমান্ত মাথা নাড়ল। কণ্ঠনালী থেকে যেন আপনাআপনি বেরিয়ে এল, ‘সব ভালো আমার সাথেই কেন হয়, সাইরাহ্?’
‘অভিযোগ করবেন না। খারাপ সময় আসলে, ভালো সময়ও আসে। প্রকৃতি এবং নিয়তি মানুষকে সারাজীবন সুখী কিংবা দুঃখী রাখে না। দুইয়ের সংমিশ্রণেই রাখে।’
‘তোমাকে পাওয়াটা আমার নিয়তিতে কেন ছিল না?’
‘হয়তো আপনার কিংবা আমার চাওয়াতে ফারাক ছিল তাই। সত্যি একটা কথা বলি, সীমান্ত ভাই?’
সীমান্ত মাথা নাড়ল। সাইরাহ্ এক পলক তার চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামাল। বলল, ‘আপনি আমার কিশোরী জীবনের প্রথম অনুভূতি ছিলেন তা অস্বীকার করার জো নেই। তবে ভালোবাসতে আমি শিখেছি সাহিত্য ভাইয়ের কাছে। কতটা যত্নে ভালোবাসার মানুষকে আগলে রাখা যায় তা আমি জেনেছি উনার কাছে। আমার অস্তিত্ব মিশে গেছে উনার সাথে। আমি সম্পূর্ণ ডুবে গেছি উনাতে।’
সীমান্ত হয়তো বুঝল সাইরাহ্ কেন তাকে এ কথা বলল। সে মুচকি হাসল। সাইরাহ্ ফের নিজেই বলল, ‘অতীতকে অতীতেই থাকতে দিন, সীমান্ত ভাই। সামনে এগোন। আপনার সুন্দর একটা জীবন পড়ে আছে।’
‘আমি পারি না, সাইরাহ্। তোমার অভাব আমি কাকে দিয়ে পূরণ করব?’
‘প্রকৃতি ফাঁকা স্থান পছন্দ করে না, সীমান্ত ভাই। এটা এক না একসময় পূরণ করে ফেলে। হয়তো একটু সময় লাগবে তবে দেখবেন কেউ না কেউ আপনার জীবনের ফাঁকা স্থান পূরণ করে ফেলেছে। যেমন আমারটা সাহিত্য ভাই আর নাজিরারটা ওর হবু বর করেছে, তেমনই আপনারটাও হয়ে যাবে। অপেক্ষা করেন।’
সীমান্ত জবাব দিল না। হেসে মাথা নাড়ল। সাইরাহ্ বিদায় নিয়ে আবার সাইমার কাছে আসল। দু’বোন পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটছে। সাইমা শুধাল,
‘তোর সীমান্তের জন্য খারাপ লাগে?’
‘না, সাহিত্য এমন একটা মানুষ যে কখনো সীমান্ত ভাইকে মনেই পড়তে দেয়না। এত ভালো যখন সে আমাকে বাসে তবে আমি আমার অতীত নিয়ে মন কেন খারাপ করবো?’
সাইমা আর প্রশ্ন করল না। সে বুঝল তার বোন সুখী। সে সুখ পায়নি তাতে কী! তার বোন সুখী হলেই যথেষ্ট। সে সুখী নজরে বোনকে দেখল।
–
সাহিত্য রাতে ফিরল। সাইরাহ্ তার অপেক্ষাতেই ছিল। বাড়িতে ফিরে সাহিত্য ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সাইরাহ্ তা দেখে এগিয়ে আসল। মাথায় হাত রেখে শুধাল,
‘শরীর খারাপ লাগছে?’
সাহিত্য সাইরাহ্-র হাতের ওপর হাত রাখল। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলল, ‘উহু, ভালো লাগছে না। মাথা হাত বুলিয়ে দে।’
সাইরাহ্ তা-ই করলো। বেশ অনেকক্ষণ পর বলল, ‘আজ দাদীমার বাড়িতে যাই? রাতটা সেখানে থাকি আমরা?’
সাহিত্য চোখ মেলল। চট করে উঠে বসে বলল, ‘আজ হঠাৎ দাদীমার বাড়ি!’
সাইরাহ্ সাহিত্যকে টেনে গোসলখানায় পাঠাল। জোর গলায় বলল, ‘আমার ইচ্ছে। তাড়াতাড়ি এসে খেয়ে নেন।’
সাহিত্য একবারে গোসল করল। তারপর খেয়ে দু’জন একসাথে বের হলো দাদীমার বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। রাস্তায় সাইরাহ্ নিজ থেকেই সাহিত্যের হাত ধরল। দু’জন-ই জানে তারা একে অপরকে ভালোবাসে তবে মুখে এখনো আদান-প্রদান বাকি। সাহিত্য সাইরাহ্-র দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শুধাল,
‘আজ চাঁদ কোনদিকে উঠেছে?’
সাইরাহ্ আকাশের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওদিকে।’
‘তোর ব্যাপার স্যাপার বেশি সুবিধার লাগছে না, সাহেবা। এভাবে একা একা রাতের বেলাতে তোর সাথে যেতে এখন কিন্তু আমার ভয় লাগছে।’
সাইরাহ্ কপাল কুঁচকাল। শুধাল, ‘কেন? আপনার ইজ্জত লুটে নিবো না-কি?’
‘নিতেই পারিস। মহিলা মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই।’
‘আমি মহিলা নই, মেয়ে।’
‘একই ব্যাপার।’
সাইরাহ্ সাহিত্যের হাত টেনে কামড় বসাল। সাহিত্য আর্তনাদ করতে করতে জোর গলায় বলল, ‘ডা’ইনী, আমার র’ক্ত চুষে খেতে বাহিরে টেনে এনেছিস!’
‘আপনার র’ক্ত চোষার জন্য বাহিরে আনতে হবে না, গোয়েন্দা সাহেব। যখন তখন ওটা খেতে পারা যাবে।’
দু’জন খুনসুটি করতে করতেই দাদীমার বাড়ি আসল। দাদীমা বোধহয় শুয়ে পড়েছিলেন তবে সাহিত্যের কণ্ঠ শুনে তিনি বেরিয়ে আসলেন। ঝাপসা চোখে সাহিত্যকে দেখে খুশি হয়ে ভেতরে ডাকলেন। সাইরাহ্-কে দেখার পর তার খুশি যেন আরও দ্বিগুণ হলো। দাদীমার সাথে কথা বলেই সাহিত্য আর সাইরাহ্ উপরের ঘরে আসল। আজও আকাশে চাঁদ রয়েছে, যার প্রতিবিম্ব নদীর পানিতে দেখা যাচ্ছে। সাইরাহ্ মুচকি হাসল সেদিকে তাকিয়ে। সাহিত্য তা দেখে শুধাল,
‘হাসছিস কেন?’
‘আপনার মনে আছে আমাদের বিয়ের রাতের কথা? আমাদের নতুন জীবন শুরু হয়েছিল এই ঘর থেকে।’
সাহিত্য মনে করল সেদিনের কথা। তার ঠোঁটের কোণেও হাসি। সাইরাহ্ জানালার পাশে হেলান দিয়ে সাহিত্যের দিকে তাকাল। পাশে ডাকল তাকে। সাহিত্য বিনাবাক্যে তার পাশে এসে দাঁড়াল। সাইরাহ্ নিজেদের মধ্যের দূরত্ব মিটিয়ে দিয়ে সাহিত্যের পায়ের ওপর পা রাখল। দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
‘আপনার মনে আছে আপনি বলেছিলেন আমি থেকে গেলে আপনি রেখে দিবেন!’
সাহিত্য সাইরাহ্-র এত কাছে আসায় অবাক হয়েছে। নিজের অবাকতা দমিয়ে রেখেই সে উপর-নীচ মাথা নাড়ল। সাইরাহ্ এবার করে বসল অবাক কান্ড। নিজের মুখ এগিয়ে নিয়ে প্রথমে সাহিত্যের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। এরপর হুট করেই ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো সাহিত্যের ঠোঁটে। সাহিত্য চোখ বড় বড় করে তাকাল। সাইরাহ্ দু’হাতে তাকে আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘আমি থেকে যেতে চাই, গোয়েন্দা সাহেব।’
সাহিত্য বুঝল এভাবেই সাইরাহ্ তার নিজের ভালোবাসাটুকু প্রকাশ করতে চাচ্ছে। তার এতদিনের ভালোবাসা আজ যেন পরিপূর্ণ পেল। খুশিতে সাহিত্যের ভিজে আসল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার সাহেবাকে। ভেজা গলায় বলল,
‘আমি তোকে যত্ন করে রাখবো, সাহেবা। ভীষণ যত্ন করে। আমার অনেক সাধনার পর পাওয়া তুই। আজীবন এভাবেই এই বক্ষে আগলে রাখবো। কথা দিলাম।’
সাইরাহ্-র ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। তার জীবনে অনেক কিছুর পর সুখ এসেছে। সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা পেয়েছে। সাইরাহ্ সাহিত্যের বুকে মুখ লুকিয়ে চোখ মুখ খিঁচে জিজ্ঞাসা করল,
‘আমরা বাবা-মা কবে হবো, গোয়েন্দা সাহেব?’
সাহিত্য বুঝে গেল। তার ঠোঁটের কোণে আজ সব প্রাপ্তির হাসি। সাহেবা তাকে সম্পূর্ণ নিজের মেনেছে। আজ তার জন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বের সুখ যেনো।
_
আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখে বেলী জানালা দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তামজীদ তা দেখে তার পিছে এসে দাঁড়াল। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে শুধাল,
‘মনে খারাপ?’
‘উহু।’
‘তাহলে?’
বেলী ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল তামজীদের দিকে। রিনঝিন কণ্ঠে আওড়াল, ‘চাঁদটা সুন্দর না?’
‘হ্যাঁ।’
বেলী মাথা এলিয়ে দিল তামজীদের বুকে। তামজীদ বুকপকেট থেকে বেলীফুল বের করে বেলীর হাতে দিল। বেলী খুশি মনে তা নিয়ে শুধাল, ‘কোথায় পেলেন?’
‘এনেছি।’
তামজীদ বেলীর মাথায় চুম্বন করল। মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘আমার বেলীর জন্য প্রকৃতির বেলী। দু’টোই আমাকে মুগ্ধ করে।’
বেলী হাসল কেবল। তাদের দুজনের সংসারও পরিপূর্ণ। তারা সুখী। এই সুখের আশাতেই তো তামজীদ অপেক্ষা করেছিল।
_____
পরিশিষ্ট:
সময় কেটেছে অনেক। সবার জীবন চলছে স্রোতের গতিতে। প্রধানের সব সদস্য মা’রা যাওয়ায় বেলীর বাবা, শেখর সাহেবসহ আরও কয়েকজন গুণী ব্যাক্তিকে প্রধান বানানো হয়েছে। সাহিত্য আর তামজীদ নিজেদের পেশাতেই আছে। সীমান্ত তার মা আর সংসার সামলাচ্ছে। আগের তুলনায় তার কষ্ট কমে গেছে। নাজিরার বিয়ে হয়েছে, সেও সুখে আছে। তামজীদ-বেলীর সংসার চলছে সুখেই। সীমান্তের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। সাইমা দাদীমার সাথে তার বাড়িতে থাকে। সাইরাহ্ ৯ মাসের গর্ভবতী। উঁচু পেট নিয়ে চলতে তার বেশ কষ্ট হয়। যখন তখন বাচ্চাটা পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে। সাহিত্য বেশিরভাগ সময় চেষ্টা করে সাইরাহ্-র কাছাকাছি থাকতে। সাইরাহ্-র ইদানীং বড্ড আজগুবি জিনিস মাথায় আসে। সে জের ধরেই সে পাশে থাকা সাহিত্যকে শুধাল,
‘আমার যদি কিছু হয়ে যায় তখন আপনি কী করবেন?’
সাহিত্য কপাল কুঁচকাল। প্রশ্নটা তার একটুও পছন্দ হয়নি। তাই গম্ভীর গলায় বলল, ‘আরেকটা বিয়ে করবো।’
কথাটা সাহিত্য রেগে বললেও এ সময় সাইরাহ্ ভেবেই নিল সাহিত্য বোধহয় সত্যি সত্যি বিয়ে করে নিবে। তার মুখটা কাঁদো কাঁদো হলো। সে পেটে থাকা সাহিত্যের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
‘আপনি আমার বাচ্চাতে ফেলে আরো একটা বিয়ে করে ফেলবেন? এই আবার বলেন ভালোবাসেন!’
সাহিত্য আবার হাত রাখল। ধমকে বলল, ‘বেশি কথা বললে আমার বাবুকে রেখে দিয়ে তোকে তোর বাপের বাড়ি দিয়ে আসবো।’
‘বাবু আপনার একা?’
‘না।’
‘তাহলে আপনি রাখবেন কেন?’
‘কারণ বাবুর আম্মুর মাথায় সমস্যা আছে। এই আম্মুর কাছে বড় হলে বাবুও তারছিঁড়া হবে।’
সাইরাহ্ চোখ মুখ কুঁচকাল। এ-কথাটাও তার পছন্দ হলো না। সাহিত্য তাকে এক হাতে টেনে নিল নিজের কাছে। কপালে চুমু দিয়ে বলল, ‘তোর কিচ্ছু হবে না।’
সাইরাহ্-ও তাকে জড়িয়ে ধরল। মানুষ যাকে ভালোবাসে তার জন্য ভালোবাসা চিরকাল একইরকম থাকে। যেমনটা তাদের। যে সুখ তাকে দেয়ার জন্য সাহিত্য ছুটেছিল, সে সুখ আজ সাইরাহ্-র হাতের মুঠোয়। আজ সে সত্যিকারের সুখী। ক’দিন পর মা হওয়ার সুখটুকুও সে পেয়ে যাবে। জীবনে আর কি লাগে? এবার জীবন যদি তার শেষও হয় তবুও সে সুখী। শুধু সাহিত্যও যেন এই সুখটা পায় এটাই তার প্রার্থনা।
সমাপ্ত..
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। অনেক অপেক্ষা করানোর পর অবশেষে শেষ করলাম। আর যারা বোঝেননি তাদের স্বার্থে একটা কথা খোলাসা করে দেই। গ্রামে যে মেয়েদের মৃ’ত্যু হয়েছিল যেমন ফিরোজ তাতীর মেয়ে, সোহাগী ওদেরকে তারেকই মে’রেছিল। এতে সাহায্য করেছিল প্রধান। তবে ছন্দর মৃ’ত্যুটা ছিল আ’ত্ম’হ’ত্যা।
ধৈর্য নিয়ে পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। পুরো গল্প কেমন লেগেছে তা অবশ্যই জানাতে ভুলবেন না।)