সায়েবা আসক্তি পর্ব-৩৬+৩৭

0
745

#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_৩৬

ফরহাদের জন্য মেয়ে দেখতে এসেছে সবাই।ফারহান বেগম আর ফায়জা গম্ভীর চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সাথে সায়েবা ও যোগ দিয়েছে। ফরহাদ কাচুমাচু করে বসে আছে এক কোনায়। হাতের উল্টো পিঠে কপালের ঘাম মুছে অসহায় চোখে ফারহানের দিকে তাকালো সে।ফারহান নিজেও চোখ মুখ কুচকে তিন রমনীর দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের এই গাম্ভীর্যের কারণ তার নিজের ও অজানা। ফারহানা বেগম গম্ভীর গলায় পাত্রী কে প্রশ্ন করলো,

— নাম কি?

ফারহানা বেগমের প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো নীতি। অবাক চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,

— তাসনিয়া জান্নাত নীতি।

— রান্না পারো?

— হুম।

— গরুর ভুড়ি পরিস্কার করতে পারো?(তীক্ষ্ণ গলায়)

সায়েবার প্রশ্নে চোয়াল ঝুলে গেলো নীতির। ফায়জা ঠোঁট কামড়ে হাসি সামলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। ফারহানা বেগম সায়েবা কে সমর্থন করে বললো,

— গরুর পা রাধার ব্যাপার টা ভুললে চলবে না। এটা রাধতে পারো তো?

খুক খুক করে কেশে উঠলো ফরহাদ।ফরহাদের দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো ফারহান। মায়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,

— খাসির কথা বলতে ভুলে গেছো আম্মু। আমার বিফে এলার্জি আছে।

এবার আর হাসি সামলাতে পারলো না ফায়জা।ফিক করে হেসে এক হাতে জরিয়ে ধরলো নীতি কে।বেচারি প্রশ্নের তোপে পরে ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। সবাই কে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো ফরহাদ।সায়েবা তো পারলে খুশিতে কেদেই দেয়।প্রিয় বান্ধবি তার জা হয়ে আসছে।সাবা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ায় এখানে আসতে পারে নি। আজকেই নীতি কে রিং পড়িয়ে যাবে তারা।সপ্তাহ খানেক পরে আকদ করে নীতি কে নিয়ে যাবে একেবারে।ফায়জার বিয়ের ঘটনার পর থেকে তারা,সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন আর কোন অনুষ্ঠান করবে না। ফায়জার বিয়ের সময় মেয়ে আর বউ দের একসাথে বউ সাজিয়ে বড় করে অনুষ্ঠান করবে। নীতির বাবা মা ও এতে সম্মতি দিয়েছেন। আংটি পড়ানোর পর নীতি আর ফরহাদ কে একসাথে কথা বলতে দিয়ে ছাদে চলে গেলো সায়েবা।জিলবাব বোরকার সাথে হুডি নেকাব আর হাত মোজা পা মোজা পড়ে হাসফাস লাগছে কিছুটা। এখন গরম পড়ে গেছে চারিদিকে।চৈত্রের প্রখরতা এখন ই টের পাওয়া যাচ্ছে। সায়েবার পিছু পিছু ফারহান ও এসেছে ছাদে।সায়েবার সাথে অভিমানের পালা এখনো চলছে তার।তাই বলে বউয়ের সাথে ছাদে ঘোরা তো আর মিস করা যায় না! সায়েবার পাশাপাশি দাড়াতেই বাকা চোখে তাকালো সায়েবা। ফোস করে নিশ্বাস ফেলে ফারহানের এক হাত জরিয়ে ধরে বুকের কাছে মাথা এলিয়ে দিলো। ফারহান ও পরম মমতায় আগলে নিলো নিজের সহধর্মিণী কে।সায়েবা মুচকি হেসে ফারহানের পেটে খোচা দিয়ে বললো,

— আর কতো দিন এভাবে মুখ ফুলিয়ে রাখবেন?আপনি জানেন?আপনি একজন আস্তো সেয়ানা লোক!

ফারহান ভ্রু কুচকে তাকালো সায়েবার দিকে। গম্ভীর গলায় বললো,

— তাই?তা কি সেয়ানাগিরি করলাম তোমার সাথে?

সায়েবা অবাক হওয়ার ভান করে বললো,

— ওমা!আপনি জানেন না বুঝি?

ফারহান না বোঝার অভিনয় করে সায়েবা কে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কপালে ঠোঁট ছুয়িয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বললো,

— উহু।একদম জানি না। তুমিই বরং জানিয়ে দাও।

সায়েবা হালকা চেচিয়ে বললো,

— দেখলেন,দেখলেন।এখনো চুমু খেলেন! কেউ রাগ করলে এভাবে বউ কে চুমু খায়?

ফারহান সায়েবার গালে শব্দ করে চুমু দিয়ে বললো,

— তাহলে এভাবে খায়?

সায়েবা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো। ফারহানের কাছ থেকে ছোটার জন্য ছটফট করতে করতে বললো,

— ছাড়ুন তো।মানুষ দেখলে কি বলবে?আপনার এই রাগের আগা মাথা কিছু বুঝি না আমি।রাতে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে সকালে উঠে বলেন আমি কিন্তু এখনো রেগে আছি।আশ্চর্য! এটা কেমন রাগ হলো?

— তাহলে কি তুমি চাও আমি তোমাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখি?ভালোবাসা বন্ধ করে দেই?ভালোবাসাময় আদরে তোমাকে সিক্ত না করি?যদি এমন ভেবে থাকো তাহলে ভুলে যাও।আমি তোমাকে নিজের বুকে বন্দী করেই রাগ দেখাবো।ভালোবাসার সময় ভালোবাসা।আর রাগের সময় রাগ।আর আদরের সময় আদর।

শেষের কথাটা বাকা হেসে বলতেই সায়েবা মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। এই লোক দিন দিন লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টি দিয়েই তাকে ঘায়েল করে দেয় প্রতিমুহূর্তে। তার দুষ্ট হাতের আনাগোনায় কাপন ধরে সর্বাঙ্গে।

ফারহান সায়েবার লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সায়েবা কে বুকে টেনে নিয়ে আকাশ দেখায় মন দিলো। ভালোবাসার মানুষের সাথে রাগ করা যায়,অভিমান ও করা যায়।কিন্তু তাকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না।

🌸

ফরহাদের বিয়ের জন্য ফরিদ সাহেবের বাড়িতে দাওয়াত করতে এসেছে ফারহানা বেগম আর সানোয়ার সাহেব। ভাইয়ের সাথে হালকা পাতলা কথা বললেও আফরিন বেগম কে পুরো পুরি এড়িয়ে গেছেন ফারহানা বেগম। আফরিন বেগম অবশ্য কয়েকবার চেষ্টা করেছে কথা বলার।কিন্তু ফারহানা বেগম তাকে কোন সুযোগ ই দেন নি।ফরিদ সাহেব বোনের শক্ত মুখভঙ্গি দেখে আমতা আমতা করে বললো,

— দেখ ফারু,আমি তোর বড় ভাই।খুব আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি তোকে।আজ সেই ভাইয়ের দাবি নিয়ে একটা আবদার করবো তোর কাছে। আশা করবো আমাকে ফিরিয়ে দিবি না তুই।

ফরিদ সাহেবের কথা শুনে মুখ বর্ণ পাঙসুটে হয়ে গেলো ফারহানা বেগমের। স্বামীর দিকে অসহায় চোখে তাকাতেই চোখ দিয়ে তাকে আস্বস্ত করলেন সানোয়ার সাহেব।

ফরিদ সাহেব মলিন হাসলো। ফারহানা বেগমের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললো,

— ভয় পাস না।আমি এখনো এতটা দুর্বল হয়ে যাই নি।হয়তো সংসারে অশান্তি হবে ভেবে অনেক সময় চুপ করে থাকি।কিন্তু তোর মেয়ের আর কোন অসম্মান আমার বাড়িতে হবে না। তোর বড় ভাই হয়ে কমি তোকে কথা দিচ্ছি। ফায়জা আদিব থেকে বড় না ছোট তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ওরা একে অপরের সঙ্গে ভালো থাকবে এটাই হলো মুখ্য বিষয়। আমার ছেলেটার এমন ছন্নছাড়া ভাব আমি আর সহ্য করতে পারছি না। সেই যে চট্টগ্রাম গেছে আর আসেনি। আমার তো একটাই ছেলে।সে ও যদি এভাবে দূরে থাকে তাহলে আমরা কিভাবে থাকবো বল?আমাকে ফিরিয়ে দিস না বোন।তোর মেয়েটা কে আমাকে দিয়ে দে।

শেষের কথা টা ফারহানা বেগমের হাত ধরে বললো ফরিদ সাহেব। ফারহানা বেগমের চোখ ছলছল করছে। ফরিদ সাহেব সানোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের স্বরে বললো,

— আপত্তি করো না ভাই।ফায়জা আমার মেয়ের মতো করে থাকবে।আমি একটু ও অযত্ন হতে দিবো না ওর।একবার বিশ্বাস করো। আমার ছেলেটা ওকে খুব ভালোবাসে। মাথায় করে রাখবে।

সানোয়ার সাহেব স্বাভাবিক গলায় বললো,

— আমি ফায়জার সাথে কথা বলে আপনাকে জানাবো ভাইজান।আমার এতে কোন আপত্তি নেই। মেয়ে সুখে থাকলেই হলো। একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় আর কোন চাওয়া নেই।তুমি কি বলো ফারু?

ফারহানা বেগম ও সায় জানালো স্বামীর কথায়। আফরিন বেগম এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন।সবার সম্মতি শুনে খুশিতে মিষ্টি আনতে ছুটলো।আদিব কে ও খবর টা জানতে হবে। তাহলে হয়তো ছেলেটা ঘরে ফিরবে।

🌸

কিছুক্ষণ আগেই কল করেছিলো আফরিন বেগম। আদিব কথা বলে না তার সাথে। তবে যত বার কল দেয় ততবারই রিসিভ করে আদিব।ফোন কানে ধরে চুপ করে থাকে।আফরিন বেগম নিজে নিজে কথা বলে ফোন রেখে দেয়।ছেলের রাগ সহজে কমবে না সে বোঝে।তবুও প্রতি দিন রাগ ভাঙানোর প্রয়াস চালায়।আজ ও ফোন দিয়ে তার আর ফায়জার বিয়ের কথা জানায় তাকে।তখনও আদিব চুপ করে ছিলো। বিস্ময়ে তার মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিলো না।ফায়জা কি রাজি হবে বিয়েতে।নাকি বরাবরের মতো এবারো তার মন ভেঙে দিবে।আদিব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে,এবার ফায়জা বিয়েতে বাগড়া দিলে তাকে খু*ন করে নিজেও ম*রে যাবে।এভাবে বউ ছাড়া শুকিয়ে ম*রার চেয়ে একেবারে ম*রে যাওয়া ভালো।

চলবে,,

#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_৩৭

ইদানীং সায়েবার শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সব সময় ক্লান্তি লেগেই থাকে।কিছুদিন পরেই মাস্টার্সের ফাইনাল এক্সাম শুরু হবে। ফরহাদের আকদের অনুষ্ঠান কাল।অল্প আয়োজন বলে ও প্রায় চার’শ মানুষের আয়োজন করা হয়েছে। শাহানা বেগম আজ সকালেই এসেছে। লিজা কে আসতে নিষেধ করেছে ফারহান। সানোয়ার সাহেব বোন কে বুঝিয়েছে লিজার এখানে আসা এখন ঠিক হবে না। কাল একবারে কমিউনিটি সেন্টারে চলে যাবে।তাহলে আর কোন সমস্যা হবে না আশা করা যায়।শাহানা বেগম ও অমত করেন নি। মেয়ের কীর্তিকলাপের কারনে কিছু বলার মুখ নেই তার।সকাল থেকে ব্যস্ত ছিলো সায়েবা।সবটাই ফারহানের আড়ালে। ফারহান তাকে কোন কাজ করতে সাফ সাফ নিষেধ করে দিয়েছে।সাথে হু*মকি ও দিয়েছে, যদি কোন কাজ করতে দেখে তাহলে তার কপালে খারাপি আছে।ফারহান রুম থেকে যেতেই ফারহানের কথা কে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে সায়েবা।কোমড় বেধে নেমে পড়েছে শাশুড়ী কে সাহায্য করতে।কিন্তু এখন আর তার পা চলছে না।ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে আসছে।কিচেনে সবার জন্য নাস্তা সাজাচ্ছিল সায়েবা।সায়েবার কম্পনরত হাতের দিকে তাকিয়ে সুমি এগিয়ে এসে বললো,

— আফনের কি বেশি খারাপ লাগতাছে ভাবি?দেন আমার কাছে দেন।আমি কইরা দেই।

— তোমাকে করতে হবে না সুমি।তুমি আঙুর গুলো ধুয়ে দাও আর নুডলস গুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দাও ট্রে তে।

সায়েবার ঘর্মাক্ত মুখের দিকে অসহায় চোখে তাকালো সুমি।কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে লেগে গেলো।

ফারহান কমিউনিটি সেন্টার থেকে মাত্রই বাসায় এসেছে।রুমে ঢুকে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে চারিদিকে চোখ বুলালো। সায়েবা কে রুমে না দেখে মুহুর্তেই মেজাজ খারাপ হলো তার।খুলে ফেলা বোতাম দুটো লাগাতে লাগাতে সায়েবাকে ডাকতে ডাকতে বেড়িয়ে এলো রুম থেকে। ফারহানের গলা শুনে ঘাবড়ে গেলো সায়েবা। ভয়ার্ত চোখে সিরির দিকে তাকালো। ফারহান এদিকেই আসছে।তরিঘরি করে বেরিয়ে আসতে নিতেই পা গুলো টলে গেলো। কম্পনমান দেহ মাটিতে পড়ার আগেই ঝড়ের গতিতে এসে তাকে আগলে নিলো ফারহান। আসে পাসে চোখ বুলিয়ে ততক্ষনাত কোলে তুলে নিলো সায়েবাকে।সুমি আর্তনাদ করে চিৎকার করে উঠলো,

— আল্লাহ গো,,,ভাবীর কি হইছে ছুডো ভাইজান। ও ভাবি কতা কন না কেন?

ফারহান কাপা কাপা গলায় সুমি কে বললো,,

— আম্মু কে ডেকে আন সুমি।আমি ওকে নিয়ে রুমে যাচ্ছি। একদম চেচামেচি করবি না। বাড়ি তে অনেক মানুষ আছে।

সুমি মাথা নাড়িয়ে তৎক্ষনাৎ ছুটেছে ফারহানা বেগমের কাছে।সিরির কাছটায় কেউ নেই তখন। ফারহান দ্রুত পায়ে সায়েবা কে নিয়ে রুমে পৌছালো। সায়েবা কে বেডে শুয়িয়ে দিয়ে লম্বা হিজাব টা খুলে দিলো। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে। অস্থির হয়ে সায়েবা কে ডাকতে লাগলো। এসির মধ্যে ও তরতর করে ঘামছে ফারহান। এখন নিজের উপর ই রাগ লাগছে।কেন আম্মুকে সায়েবার অসুস্থতার কথা জানালো না!সায়েবার চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই ফারহানা বেগম হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলেন। তার সাথেই সাহেরা বেগম। মেয়ের অবস্থা দেখে কেদেই দিলেন তিনি।ফারহানা বেগম কে দেখে সরে দাড়ালো ফারহান। আতংকিত গলায় বললো অস্থির হয়ে বললো,

— সায়েবা অজ্ঞান হয়ে গেছে আম্মু।কি হলো দেখো না। ও চোখ খুলছে না কেন?

ফারহানের চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। চোখের কোনে পানির আনাগোনা দেখে ছেলের অস্থিরতা বুঝতে পারলো ফারহান বেগম। সায়েবার পালস রেট চেক করে ফারহান কে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলল।
ফারহান নাছোড়বান্দার মতো দাড়িয়ে। সে কিছুতেই যাবে না। ফারহানা বেগম চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই ফারহান অসহায় গলায় বললো,

— ও আমার বউ আম্মু।একটু থাকি প্লিজ।

ফারহানা বেগম ক্লান্ত চোখে তাকালো ছেলের দিকে।তার এতো বুঝদার ছেলে বাচ্চাদের মতো কথা বলছে!সেও অসহায় গলায় বললো ,

— ও আমার বউ মা আব্বু তার সাথে পেসেন্ট ও।তুমি থাকতে পারবে না। আমাকে চেক করতে দাও প্লিজ।দুই মিনিটেই হয়ে যাবে।একটু অপেক্ষা করো বাবা।

সাহেরা বেগম সায়েবার মাথার কাছে বসে কেদেই যাচ্ছেন। ফারহান কে জেদ করতে দেখে রাগী চোখে তাকালো সে।ফারহান আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো। যাওয়ার আগে সুমি কেও নিয়ে গেছে সাথে করে।তার বউ সে যেহেতু থাকতে পারবে না তাহলে সুমি ও থাকতে পারবে না। বাইরে এসে সুমি জোর গলায় কয়েকবার ফারহান কে বলেছে,

— এইডা কিন্তু আমার ভাবি হয় ছুডো ভাইজান। আমি ও থাকমু।

— তোর ভাই যেহেতু থাকতে পারেনি তাহলে ননদ হয়ে তুই ও থাকতে পারবি না।

ফারহানের গম্ভীর গলা শুনে সুমি অসহায় হয়ে ফারহানের সাথেই দাঁড়িয়ে রইলো। এদিকে ফায়জা ও ছুটে এসেছে ডাক্তারি সরঞ্জাম নিয়ে।ফায়জা রুমে ঢুকতেই সুমি বাকা চোখে ফারহানের দিকে তাকালো। ফারহান সুমির দৃষ্টি বুঝতে পেরে অসহায় গলায় বললো,

— আপু ডাক্তার। চেকআপ করতে এসেছে।

মিনিট কয়েক পরেই রুমের ভিতর চিৎকার শুনে ফারহান হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পরলো।ফায়জা তার মায়ের গলা ধরে লাফিয়ে যাচ্ছে। সায়েবার জ্ঞান ফিরেনি এখনো। ফারহান আতংকিত গলায় বললো,

— কি হয়েছে আপু?সায়েবা ঠিক আছে তো?

ফারহানের আতংকিত চেহারা দেখে ফারহানা বেগম শব্দ করে হেসে জড়িয়ে ধরলো তাকে। কপালে চুমু খেয়ে বললো,

— ধন্যবাদ আব্বু।আমাকে দাদু হবার সৌভাগ্য এনে দেয়ার জন্য। বাবা হচ্ছো তুমি।

ফারহান ওইখানেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সায়েবার দিকে। ফায়জা এখনো লাফিয়ে যাচ্ছে বাচ্চাদের মতো। ফারহানা বেগম ছারতেই সে এসে ঝাপিয়ে পরলো ফারহানের উপর। ফারহানের গলা জড়িয়ে ধরেই বললো,

— কনগ্রেচুল্রশনস ভাই।আমি ফুপ্পি হয়ে যাচ্ছি।

সুমি তড়িঘড়ি করে মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো তৎক্ষনাৎ। সাহেরা বেগম মেয়ের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। তার চোখে এখনো পানি।তবে এই পানি আনন্দের। মুহুর্তের মধ্যেই পুরো বাড়ি তে সুখবর ছড়িয়ে পরলো।আপাতত সবাই রুম খালি করে চলে গেলেন। প্রচন্ড দুর্বলতা দরুন সায়েবা এখনো ঘুমাচ্ছে। ফারহান এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক ধ্যানে সায়েবা কে দেখে যাচ্ছে সে।এইটুকু মেয়েটা ও মা হবে!তার অস্তিত্ব নিজের ভিতর বহন করবে!ভাবতেই বুকের মাঝে প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায়।যার মাঝে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করেছে আজ সে তার অস্তিত্ব কে দুনিয়ার আলো দেখাবে!ধীর পায়ে সায়েবার দিকে এগিয়ে গেলো ফারহান। সায়েবার হাত টা আলতো করে ধরে সময় নিয়ে কপালে চুমু খেলো সে।চোখ থেকে দুই ফোটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পারল সায়েবার কপালে। বিরবির করে দোয়া পড়ে হাত বুলালো সায়েবার পেটে।খুশিতে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।সাথে সাথে দুই রাকাত শুকরিয়া নামাজ আদায় করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো। দ্রুত গতিতে ওজু করে এসে আল্লাহর পায়ে লুটিয়ে পড়লো।

🌸

অনেকক্ষণ আগেই এ বাড়িতে আগমন হয়েছে আদিবের।তার পাশেই গা ঘেঁষে বসে আছে এক সুন্দরী রমনী।ভাব দেখে মনে হচ্ছে দুজনেই প্রেমের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্ছে। আহ আদিক্ষেতা দেখলে বাচি না! মনে বার কয়েক এই বুলি আউড়ানো হয়ে গেছে ফায়জার। এতো ভালো মুডটা এই বদমাশ ছেলে এসে খারাপ করে দিয়েছে।সব কিছু তেতো লাগছে তার কাছে। সেই মুহুর্তে যায়গা ছেড়েছে সে।আদিব সেদিকে না তাকালে ও তার সমস্ত ধ্যান ফায়জার দিকেই ছিলো। বলা বাহুল্য ফায়জা আবার ও তাকে রিজেক্ট করেছে।তাই সে ঠিক করেছে এই মেয়েকে জ্বা*লিয়ে পু*ড়িয়ে মারবে।হিংসায় পুড়তে পুড়তে যখন কয়লা হয়ে তার কাছে আসবে তখন সেও তাকে রিজেক্ট করবে।বৈরাগী হয়ে জীবন কাটাবে।তবুও এই মেয়েকে মেনে নিবে না। না মানে না।কত বড় অমানবিক মেয়ে হলে তার মতো ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু কে রিজেক্ট করতে পারে! এমন নিষ্ঠুর মেয়ে নিয়ে সে সংসার করবে না। তাতে যতই সে শুকিয়ে ম*রুক।

চলবে,,