সুখের সন্ধানে পর্ব-৪০+৪১

0
365

#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪০

প্রিয় আমার সাথে যাবার জন্য টিকেট করে ফেলল। আগামী পরশুর ফ্লাইটে যাচ্ছি আমরা। প্রিয় আমার সাথে যাচ্ছে ভেবে আমার যে কি পরিমাণ খুশি লাগছে! ছেলেটা বাবার সাথে অভিমান করে আর কোনোদিন বাংলাদেশেই যাবে না বলে স্থির করেছিল । কিন্তু বাবার উপর যতই রাগ থাকুক বাবার এমন বিপদের কথা শুনে কোনো ছেলের পক্ষেই রাগ পুষে রাখা সম্ভব না। আমি সেলিমের কাছে কিছুই বলিনি। আমি ওকে সারপ্রাইজ দিতে চাই। ছেলেকে কাছে পেয়ে হয়ত শারীরিক অবস্থার উন্নতিও হতে পারে। ছেলের উপর যতই রাগ অভিমান থাক না কেন এতদিন পরে ছেলেকে কাছে পেলে সবই ভুলে যাবে সে। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি কাউকেই এখন পর্যন্ত প্রিয় আসছে আমার সাথে এ কথা জানাই নি।

এদিকে প্রিয় আমার সাথে যাচ্ছে এ নিয়ে তুমুল হাঙ্গামা শুরু করেছে এনা এবং তার মা। তারা কিছুতেই প্রিয়কে এখন এনাকে এই অবস্থায় রেখে প্রিয়কে বাংলাদেশে যেতে দিবে না। এনার যেকোনো মুহূর্তে এখন ডেলিভারি পেইন শুরু হতে পারে। তাই তারা এ অবস্থায় প্রিয়র যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না। এনার বাবা চুপচাপ মানুষ। খুব সহজে কথা বলেন না। সেই তিনিও প্রিয়কে বাংলাদেশে কেন নিয়ে যাচ্ছি তা নিয়ে নানান ধরণের কথা শুনিয়েছেন আমাকে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে হজম করেছি। একটা কথাও বলিনি। কেন যেন কথা বলতে মন চায়নি। হজমশক্তি প্রচণ্ড উন্নতমানের যে আমার। সারাজীবন অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মতো কথা হজম করতে করতে মেরুদণ্ড যে সাথে আছে সেটাই ভুলে গেছি। তাই চুপ করেই ছিলাম আমি। উনি নানান কথার বাণে আমার ধৈর্য পরীক্ষা নিচ্ছেন আর আমি শুনেই যাচ্ছি।

আমার রুমে বসে ফেরার জন্য আমি ব্যাগ প্যাক করছি। প্রিয়র কিছু টুকটাক প্যাকিংও আমাকেই করতে হচ্ছে। এনা প্রিয়র সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা অবশ্য নতুন না। বাংলাদেশে বসেও দেখেছি পান থেকে চুন খসলেই এনা কথা বলা বন্ধ করে দেয় সবার সাথে। এনা অবশ্য এনার জায়গায় ঠিক আছে। সব স্ত্রীই চায় তার এমন মুহূর্তে তার স্বামী পাশে থাকুক। আমি হলেও তাই চাইতাম। কিন্তু কেন যেন আমি এখানে স্বার্থপরের মতো আচরণ করছি। এনাকে যদিও আমার কোনোকালেই পছন্দ না। আর পছন্দ হবার মতো কোনো গুণই আজ অবধি আমি খুঁজেও পাইনি। এখানে আসার পরেও দেখেছি ও সেই আগের মতোই অহংকারী আর বেয়াদবই রয়ে গেছে। চুল পরিমাণও পরিবর্তিত হয়নি বরং আগের চাইতে তেজ আরো বেড়েছে। চটাং চটাং করে কথা বলে আমার সাথে। বলবেই তো! সেই তো জিতেছে। আমার বুক খালি করে আমার একমাত্র ছেলেকে এই দূরদেশে নিয়ে চলে এসেছে। তাই পরোয়া কিসের আর তার। তাছাড়া বাচ্চা হচ্ছে। সে নিজেই আমাকে গতকাল বলেছে, “ আরেকটু অপেক্ষা ! এরপর আর ভয় কীসের? একবার বাচ্চা হয়ে গেলে প্রিয় আর কোনোদিনই মায়ার টানে বউ বাচ্চা রেখে ইতালি ছেড়ে বাংলাদেশে বাপ দাদার ব্যবসায় দেখাশোনা করতে যাবে না। এখানে আমাদেরও অঢেল আছে। একসময় তো সবকিছু তারই হবে । তাই প্রিয়র আর পিছুটান কীসের? “
আমি চুপচাপ শুধু শুনেছি। উত্তরই বা দিব কি? সারাজীবন শুধু উত্তর খুঁজতেই পার করে দিলাম। পুরো লাইফটাতে কম্প্রোমাইজ করতে করতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। একসময় শ্বশুরবাড়িতে এসে সবার কথা শুনেছি , এখন নিজে যখন শাশুড়ি হয়েছি তখনও আবার বউয়ের কথা শুনছি। আসলে যে বলতে পারে না সে কোনোকালেই পারে না। আমি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু তাতে কোনোকিছুই শোধরায়নি। সবকিছুই তালগোল পাকিয়ে গেছে আরো। সংসার বাঁচাতে , সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে কত কিছুই তো মুখ বুজে সহ্য করেছি, হজম করেছি। এখন জীবনের এই কালে এসেও সেই একইভাবে ঘুরছে আমার জীবনের চাকা। নিজের সন্তানকে কাছে পেতে অন্যের কথা শুনতে হয় আমার। জানিনা এটা আমার কোন জনমের পাপের শাস্তি?

সেলিমের জন্য খুব মায়া হয় এখন আমার। ছেলেটা চলে আসার পর থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সে। ব্যবসায় বাণিজ্যে আগের মতো মন নেই একদম। বিজনেসের একের পর এক লস তাকে আরো ভেঙ্গে ফেলেছে। একসময় যে হাতে শক্ত করে বৈঠা ধরেছিল সেই হাত এখন হাল ধরতেই ভয় পায়। এই সুযোগে ব্যবসায় বাণিজ্যের অধিকাংশই প্রিয়র ছোট চাচা সজলের দখলে। প্রিয়র ফুফু বছরান্তে এসে হিসেব নিকেশ করে নিজের অংশ নিয়ে চলে যায়। সেলিম এখন কোনোকিছু নিয়েই মাথা ঘামায় না আর। তার শুধু ভাবনা এত সম্পত্তি দিয়ে হবে কি? খাবে কে? যে ছেলে বাবার সাথে এই দুই বছর একটা কথা পর্যন্ত বলেনি, ব্যবসায়ের খোঁজখবরও নেয়নি। সেই ছেলেকে নিয়ে আর কি আশা! উলটো শ্বশুরের ব্যবসায়ে খুব মন লাগিয়ে কাজ করছে। সব খবরই রাখে সেলিম। প্রিয়র এমন আচরণ তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমাকে ইতালিতে সে আসতে পর্যন্ত দিতে চায়নি সে। প্রিয়র বাচ্চা হবে কি না হবে তা নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা নেই। এনার পেটের সন্তানকে সে নিজের নাতি হিসেবে ভাবতেও চায় না। আমি অনেক বুঝিয়ে পরে এসেছি।
এতদিন তবু মনে অশান্তি থাকলেও শরীরটা তো ভালো ছিল কিন্তু এখন যে অবস্থা জানিনা কোনোদিন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে কিনা। মিথিলা আমাকে যতই যাই বলুক না কেন আমার মনে হচ্ছে সেলিম ভীষণ অসুস্থ। তার এমন বিপদের দিনে একটা আপনজনও পাশে নেই। কী হলো সারাজীবন ধরে এই মিথ্যে অহংকার দেখিয়ে?
এমন হাজার কিছু ভাবতে ভাবতে মনে হলো মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গেল নামাজ পড়া দরকার। নামাজের জন্য উঠব মাত্র তখনই এনা আর ওর মা ঘরে ঢুকল। এই দু’জনকে দেখলেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন ঠাণ্ডা স্রোত নামতে শুরু করে। খুব ভয় করে এদের। সারাক্ষণ দেখলেই টেনশান হয়। না জানি কি থেকে কি বলা শুরু করে! এগুলো ফেস করতে হবে জেনেবুঝেই আমি এখানে এসেছিলাম। শুধুমাত্র ছেলেটার কাছে থাকতে পারব সেই লোভেই আসা।
ওদেরকে দেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম ।

– কি ব্যাপার? হঠাৎ মা মেয়ে একসাথে আমার রুমে? কিছু কি বলবেন ,আপা?

– ব্যাপার তো সব আপনার কাছেই। তাই আপনার কাছে আসা ছাড়া আর উপায় আছে বলুন! আমার মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। ওর এ সময়ে কত হাসিখুশি থাকতে হবে আর সেখানে এমন আপসেট হয়ে থাকলে ওর এবং বেবির কী পরিমাণ ক্ষতি হবে আপনি বুঝতে পারছেন? এমনিতেই বেবির ওয়েট কম আর সেখানে যদি ওর সাথে এমন সিচুয়েশান তৈরি হয় তবে বেবির গ্রোথ কী করে হবে বলুন তো! যেতেহু একটা বাচ্চা আপনারও হয়েছে তাই নিশ্চয়ই এই মুহূর্তটার গুরুত্ব আপনি বুঝতে পারছেন! আমি অবাক হই ভেবে কেমন অবিবেচক মা আপনি? আর তেমনি হয়েছে আপনার ছেলে।

– আপা, প্রিয় মাত্র সাতদিনের জন্য যাচ্ছে। ভয় পাবেন না আপনার জামাইকে আমরা আটকে রাখছি না। ফিরতি টিকেট করেই সে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রিয় চলে গেলেই বা কি আপনি ভাইসাহেব সবাইতো আছেন।
আমি একটু হেসে বললাম, আমরা যতই অবিবেচক হই আপনাদের মতো না!

– আমরা অবিবেচকের মতো কী করেছি? ক্ষেপে যেয়ে বলল, এনার মা। এনা পাশে দাঁড়িয়ে শুধু ফুলছে।

– কিছু করেন নি? এক মায়ের কোল খালি করে তার সন্তানকে নিয়ে এসেছেন। আবার বলছেন কী করেছি!

– আমরা তাকে মোটেও নিয়ে আসিনি। আপনারা তাকে ঘরছাড়া করেছেন। আমার মেয়ে নিশ্চয়ই পথে পথে ঘুরবে না ফকিরের মতো!

– মেয়ে বিয়ে দেবার পর আসল ঠিকানা শ্বশুরবাড়ি। সেখানে মান অভিমান কত কিছুই হতে পারে। সেলিম বের করে দিয়েছে আর অমনি পরের দিনই তাদের ইতালি চলে আসতে হবে? প্রিয়র তো টাকা পয়সার অভাব নেই যে থাকবার জায়গা হবে না। ঢাকাতে প্রিয়র থাকার জায়গার অভাব হবার কথা না। বাংলাদেশে আরো কিছুদিন থেকে বাবার কাছে ক্ষমা চাইলে বা তার সাথে কথা বললে হয়ত সে ক্ষমা করেও দিতে পারত! তাছাড়া আমিও সেলিমকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম! সেলিমের মন নরম হতো হয়ত ওদের আবার বাসায় উঠতে দিত। সেই অপেক্ষা কি করেছে আপনার মেয়ে? সেলিমের সাথে এতো এতো বেয়াদবি করেছে অথচ একবারও সরি বলার প্রয়োজন মনে করেনি। একটার পর একটা অন্যায় করেছে এই নাটক সাজানোর জন্যই। যাতে আমার ছেলেটা বাবার সাথে মিসবিহেভ করে আর আপনারা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেন।

– বাহ! কী চমৎকার ব্লেম দিচ্ছেন আমার মেয়েটার উপর! আপনার ছেলে কি ফিডার খায় যে আমার মেয়ে বলল অমনি সে তার হাত ধরে ঘর জামাই হতে চলে আসলো ? আর ওদেরকে কতক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলতে চাচ্ছেন যতক্ষণ না আমার মেয়েকে প্রিয় ডিভোর্স না দেয়? কী চিপ মেন্টালিটিরে বাবা! বাপ হয়ে ডিসাইড করে ছেলে বউকে ডিভোর্স দিবে কি দিবে না!

– রাগের মাথায় সে যেটা করেছে ঠিক করেনি এটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু তাই বলে বাবার থেকে ছেলেকে এভাবে আলাদা করেও আপনার মেয়ে খুব ভালো কিছু করেনি। আচ্ছা, আমরা এসব পুরানো কথা নিয়ে বর্তমানকে আর কত খারাপ করব , বলুন তো! এসব কথা এখন বাদ দিন, প্লিজ। আসার পর থেকে তো এই একই কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। আমি আপনার এখানে শখ করে আসিনি। প্রিয় খুব করে ধরেছে তাই আসতে বাধ্য হয়েছি। না হলে আসতাম না। তাছাড়া অনেকদিন ধরে দেখতেও মন চাইছিল যে আমার আদরের ছেলেটা কোন দোজখের আগুনে পুড়ছে একটু দেখে আসি!

– আমার বাসাকে আপনার বাসাকে আপনার দোজখ মনে হচ্ছে? হাউ ফানি! কি আর বলব? আমার মেয়েটাকে তো জান্নাতে রেখেছিলেন আপনারা! তাই আপনার ছেলেকেও ভাবছেন একই ট্রিট দিচ্ছি কি না তাইতো! ভয় নেই । আমরা আপনাদের মতো অমানুষের মতো ব্যবহার করছি না।

– বলতে বলতে কী বলেই যাচ্ছেন হুশ নেই। যাদেরকে অমানুষ বলছেন সেই অমানুষের বাচ্চার ভ্রূণই আপনার আদরের মেয়ের গর্ভে বড় হচ্ছে। তাই একটু সাবধানী হয়ে কথা বলবেন ,প্লিজ!

– আচ্ছা, আচ্ছা! যা বলতে এসেছি সেটা বলি!

– এখনো কিছু বলতে বাকি তবে!

– আপনি প্রিয়কে আজ আসলে বলবেন, তাকে আপনার সাথে নিচ্ছেন না।

– হা হা! কেন আপনার মেয়ে আর আপনি প্রিয়কে আটকাতে পারছেন না?

– আমরা কি পারছি আর কি না পারছি সেটা দেখতে না চাওয়াই আপনার জন্য মঙ্গল । তাই হেয়ালিপনা বাদ দিয়ে যা বলছি সেটা করবেন। কিছুটা হুকুমের স্বরে বলল, এনার মা ।

– আমি অবাক হবার শেষ পর্যায়ে চলে গেলাম। বললাম, আমি কি আপনার হুকুমের দাস? এমনটা ভুলেও ভাববেন না। আপনারা আমার ছেলেটাকে হুকুমের দাস বানাতে পারেন কিন্তু আমাকে না। আপনারা কি খুব ভয় পাচ্ছেন যে প্রিয়কে আর আসতে দেই কি না! ভয় নেই সেটা করব না। বাপের থেকে সন্তানকে আলাদা করার কষ্ট কতটা ভয়ানক আমি দেখেছি। তাই সেম কষ্ট আমার ছেলেকে আমি দেবার মতো নির্দয় না। এনার নয় মাস পূর্ণ হতে এখনো সপ্তাহ পড়ে আছে। ডেট আরো ক’দিন পরেই। তাই আল্লাহ না করুক কোনো অঘটন না ঘটলে প্রিয় আসার পরেই ওর ডেলিভারি হবে। এক অসুস্থ বাবাকে তার সন্তান দেখতে যাবে সেটাতে এত বাঁধা দিচ্ছেন কেন আপনারা ?

– প্রিয় গেলেই কি আপনার স্বামী ভালো হয়ে যাবে? উনি সারাজীবনের জন্য ল্যাংড়া হয়ে গেছে। গিয়ে একটা হুইল চেয়ার ধরিয়ে দিন। শুধুশুধু আমার মেয়ের জীবনটা নরক বানাতে ইতালিতে কেন এসেছেন?

আমার এত অপমান আর সহ্য হচ্ছিল না। মন চাচ্ছিল মহিলার গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারি। আরো একটা দিন এই অমানুষগুলির সাথে থাকতে হবে ভেবে বুক ধড়পড় করছে। আমি চাইলেই অন্য জায়গায় যেয়ে থাকতে পারি কিন্তু সেটা করছি না যাতে প্রিয়কে আবার আমার বিরুদ্ধে ভড়কে না দেয়। আমার এই একটু আশা ছেলেটাকে তার বাবার সামনে দাঁড় করলে বাপ ছেলের মান অভিমান পর্ব হয়ত শেষ হবে। আমার ছেলেটা আমার শূণ্য বুকে ফিরে আসবে। এনাও ওর ছেলেকে নিয়ে আমাদের সাথেই থাকবে । আমি সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি শুধুমাত্র আমার আদরের ধনকে কাছে পাবার আশায়।
ছেলেটা এখানে শ্বশুর , শাশুড়ি আর বউয়ের হুকুমের গোলাম! সারাদিন অফিস সামলে এসে আবার এনার ফাই ফরমায়েশ আর নখরা দেখতে দেখতেই ওর যে একটা পার্সোনাল লাইফ আছে সেটা ভুলেই গেছে। খুব ক্লান্ত থাকে সবসময়। সেই আগের মতো শরীরটাও আর নেই। কেমন মুটিয়ে গেছে। নিজের দিকে একদমই খেয়াল নেই ওর। আগে কত মেইন্টেইন করত! এখন কোথায় কী!

আমি আর কোনো কথা বলছি না দেখে মা মেয়ে গজগজ করতে করতে চলে গেল।

আজ সকালে সেলিমকে ডিসচার্জ করে দিয়েছে। হাত পা অবশ ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই আপাতত। প্রেসারও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে। সকালে প্রিয়র চাচ্চু সজল এসে ডিসচার্জ করে বাসায় দিয়ে গেছে।

মিথিলার এ বাড়িতে ঢুকতেই মন চাচ্ছে না। তাছাড়া এখানে রূম্পা মা নেই। তাই একদমই মন চাচ্ছে না বাড়ির ভেতর আসতে তবুও বাধ্য হয়ে সে এসেছে। তার খালুকে দেখবার মতো অনেক অনেক সার্ভেন্ট থাকলেও কোনো আপনজন নেই। উনার যে অবস্থা তাতে সারাক্ষণ কারো থাকাটা খুব জরুরী। সেলিমকে তার রুমে নিয়ে একজন সার্ভেন্টের সাহায্য নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। সেলিম ওর ডান হাত আর পা একদমই নাড়াতে পারছে না। কথা বলতেও খুব কষ্ট হচ্ছে তার। তারপরেও বলছে টুকটাক।

সেলিমের মা এসে ছেলের এ অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করল।
মিথিলা তাকে তাড়াতাড়ি রুমের বাইরে নিয়ে যেয়ে নানাভাবে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে । কিন্তু মায়ের মন। মানতে কি চায়?

– আমার ছেলেটা কি আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারবে না আগের মতো? আমার সিংহের মতো ছেলেটার একি হলো? ওকে সুস্থ না করে কেন নিয়ে এলিরে তোরা? কাঁদতে কাঁদতে বলল, সে।

– দাদি, আংকেল এখন মোটামুটি সুস্থ। হাসপাতালের থেকে বাসায়ই থাকা তার জন্য ভালো। ওখানের পরিবেশ কেমন তা তো জানেনই। বাসায় এসে ডাক্তার প্রতিদিন চেক আপ করে যাবে। আর ফিজিওথেরাপিস্ট এসে তাকে থেরাপি দিয়ে যাবেন। আশা করা যায় দ্রুতই হাত পায়ের সেন্স ঠিক হয়ে যাবে। শুধু দোয়া করেন। এভাবে আংকেলের সামনে কান্নাকাটি করলে সে আরো বেশি সিক হয়ে পড়বে। ডাক্তার বলেছে তাকে মানসিকভাবে খুব সাপোর্ট দিতে হবে । এতে তার মনোবল বৃদ্ধি পাবে যা তার ট্রিটমেন্টের জন্য খুবই কার্যকরী।

– তুই কত কি করছিস রে, বোন! কি দিয়ে এই ঋণ শোধ করব, বল!

– কিছুই করতে হবে না দাদি। আংকেলের জন্য করছি আমার দায়িত্ব থেকে। সে আমার বাবার মতো। তার জন্য কিছু করতে পারাটা আমার সৌভাগ্য। আমার জন্য শুধু দোয়া করবেন দাদি যেন আগামী দিনগুলি একটু স্বস্তির সাথে কাটাতে পারি আর একটা শান্তির মৃত্যুকে বরণ করতে পারি।

– আরে পাগলি! এসব কেন বলছিস ? আল্লাহ তোকে আমার হায়াত দিক! অনেক বছর বেঁচে থাকবি এই আলোবাতাসের দুনিয়ায়।

– এই দোয়া দিবেন না , প্লিজ! বেঁচে থাকার একদমই সাধ নেই। কার জন্য বাঁচব ? কী করতে বাঁচব ?

– প্রিয়র দাদি নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, আমার পাপের শাস্তিই বোধ হয় আমার ছেলেটা পাচ্ছে। আমি যদি সেদিন সেলিমকে বোঝাতে সক্ষম হতাম তবে হয়ত আমাদের সংসারটা হতে পারত হাসি খুশির বাগিচা । এভাবে ধু ধু মরুভূমিতে পরিণত হতো না। সোশ্যাল স্টাটাস ঠিক রাখতে যেয়ে তোর মতো একটা লক্ষী মেয়ের সাথে কতবড় অন্যায় করেছি। আর সেই তুইই আমাদের চরম বিপদের সময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিস ! কোথায় আমাদের সেই দাম্ভিকতা আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস? আমার আদরের ধন , আমার কলিজা প্রিয়কে মনে হয় না আর মরার আগে এক নজর দেখার সৌভাগ্য হবে! সবই আমার পাপের ফল। এখন শুধু চোখটা বোজার অপেক্ষা।
আমাকে মাফ করে দিস রে ,বোন! মাফ করে দিস! বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল প্রিয়র দাদি।

– এসব কী বলছেন দাদী ? আমি সেসব কবেই ভুলেই গেছি। আল্লাহর ইশারায়ই সবকিছু হয়। তিনি আমার জন্য যা ভালো বুঝেছেন সেটাই করছেন। আমার কারো প্রতি এক ফোঁটা অভিযোগ নেই। আমার ভাগ্যটাই এমন। এখানে কারো কোনো হাত নেই। বলতে বলতে চোখের পানি মুছল মিথিলা।

সেলিমের খুকখুক কাশির শব্দ শুনে মিথিলা দৌড়ে রুমের ভেতরে গেল। তাড়াতাড়ি একহাতে সেলিমের মাথা তুলে অন্যহাতে সে তাকে পানি খাইয়ে দিলো। আবার খুব যত্নের সাথে তাকে শুইয়ে দিয়ে বলল, আমি আপনার স্যুপ নিয়ে আসি । খাবারের সময় হয়ে এল।

সেলিমের মাকে হুইল চেয়ারে ঠেলে তার কাজের মেয়েটা ছেলের রুমের ভেতরে নিয়ে আসলো। ছেলের এমন অবস্থা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। না চাইতেও চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়েই যাচ্ছে। আঁচলে গোপনে চোখ মুছে বলল, এখন কেমন লাগছে , বাবা?

– সেলিম অনেক কষ্টে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, খুব ভালো , মা! তুমি কাঁদছ কেন? আমার তো ভালোই লাগছে। আগে তুমি একা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে এখন তোমার সঙ্গ দিতে পারব। মা ছেলে মিলে পাশাপাশি হুইল চেয়ারে সারাঘরে ঘুটঘুট করে ঘুরে বেড়াব। ভালোই তো হয়েছে।

– এবার আর সেলিমের মা নিজেকে সামলাতে পারল না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে ছেলের বিছানার কাছে যেয়ে তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।

মা ছেলের এই দৃশ্য দেখে মিথিলাও এবার চোখের পানি আটকাতে পারল না। তারপরেও নিজেকে কোনোভাবে সামলে সে দাদিকে সামলাতে চেষ্টা করল। সে নিজেই সেলিমের এমন অবস্থা মেনে নিতে পারছে না। বাঘের মতো গর্জন করা মানুষটিকে এভাবে অপারগ দেখে সেও সহ্য করতে পারছে না। এ ক’দিন হাসপাতালে একটা বাচ্চাকে যেভাবে সামলাতে হয় সেভাবেই সামলেছে তাকে সে। এমন একজন মানুষের এমন অপারগতা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সে শুধু রূম্পা মায়ের কথা ভাবছে। সে এলে কী করে সহ্য করবে। নিজের চোখে যখন সরাসরি সে এই দৃশ্য দেখবে কী করে নিজেকে সামলাবে? রূম্পা মাকে মিথ্যা মিথ্যা করে সে বলেছে আগের থেকে অনেকটাই বেটার ! ডাক্তার বলেছে খুব তাড়াতাড়ি সে আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে তো জানে ডাক্তার কী বলেছে। সেলিমের বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। এই বয়সে তার যে অবস্থা হয়েছে তাতে এখান থেকে ওভারকাম করে সেই আগের অবস্থায় যাওয়াটা কিছুটা অসাধ্য সাধনের মতোই। কিন্তু এসব কথা সে রূম্পা মা বা সেলিম আংকেল কাউকেই বলেনি। তবে সেলিমের ছোটভাই সজল সবই জানে। সেও মিথিলার পরামর্শে এ কথা কাউকে জানায়নি। ধীরে ধীরে সময় হলে সবই একসময় জানবে। এখনই বলার দরকার নেই। তাছাড়া রূম্পা মা এসব জানলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। সে নিজেও হাজারটা রোগে জর্জরিত। মিথিলা তার সব খবরই তো জানে। তাই সাহস পায়নি সবকিছু জানাতে। তার শুধু চিন্তা হচ্ছে রূম্পা মা নিজেই তো নানান সমস্যায় ভুগছে , এই পেশেন্ট সে কী করে সামলাবে? তাছাড়া ব্যবসায় বাণিজ্য বা কে সামলাবে? সেলিম আংকেলের ছোট ভাইকে দেখে কেন যেন মিথিলার মনে হয়েছে আংকেলের এই অবস্থায় সে হয়ত মনে মনে খুশি হয়েছে। পুরো ব্যবসায় বাণিজ্য সব একার দখলে। এমনিতেই ব্যবসায়ে রূম্পা মাদের অংশ বেশি বলে কত কত তামাশা করেছে সে আর তার বউ। মিথিলার কোনো কিছুই অজানা নয়। কিন্তু কিছুই করার নেই তার । সবই উপরওয়ালার ইশারায় ঘটছে। প্রিয়র উপর জমানো অভিমানটা তার আরো বেড়েছে। এই দুই বছরে মাত্র একবার তার সাথে কথা হয়েছে প্রিয়র। সাজিদের দুর্ঘটনার পরে প্রিয়ই রূম্পা মায়ের ফোনে কল দিয়েছিল ওর সাথে কথা বলার জন্য। মিথিলা মিনিট দুয়েক কথা বলেছিল মাত্র। এরপর সাজিদের মৃত্যুর পরে তার ফোনে কল দিলেও মিথিলা ফোন তোলেনি কখনো ।
কারো সান্ত্বনা তার ভালো লাগে না। নিজেকে নিজের মাঝে গুটিয়ে একটা গড়পড়তা জীবনকে বেছে নিয়েছে সে।

সাজিদের ছোট ভাই সাব্বির অফিস থেকে ফিরে ল্যাপটপের ব্যাগটা রাখার সাথে সাথেই তার স্ত্রী লিসাকে বলল, এক গ্লাস পানি দাও। আমি আবার বেরুব।

– ওর বউ লিসা দৌড়ে এল। এক গ্লাস পানি দিতে দিতে সাব্বিরকে বলল, শান্তা আপা কল দিয়েছিল নাকি তোমাকে?

– হ্যা, দিয়েছে। কেন?

– না বাইরে যাবার কথা বললে যে, তাই! ভাবিকে আনতে যাচ্ছ?

– হুম! আজ নাকি ওনার খালুকে ডিসচার্জ করেছে। তাই আপা ফোন দিয়ে বলল, ভাবিকে বাসায় নিয়ে আসতে।

লিসা মেজাজ দেখিয়ে বলল, ওনাকে নিয়ে আসার কী দরকার? শান্তা আপার সব কিছুতে বেশি বেশি। এত দরদ তো ভাবিকে নিজের কাছে রাখলে পারে।

– কেন, কেন? ভাবি নিজের বাড়ি থাকতে আপার বাসায় থাকবে কেন? রাগের সাথে বলল, সাব্বির।

– শোনো, এত আদিখ্যেতা করতে পারো তোমরা দুই ভাই বোন! উনি এ বাড়ির কে? এ বাড়ির ওনার সাথে যার সম্পর্ক ছিল সে এখন নেই। আর ভাবির কোনো বাচ্চাকাচ্চাও নেই । সে এ বাড়িতে কিসের অধিকারে থাকতে চাইছে? তোমরা ওনাকে যেভাবে মাথায় করে নিয়ে নাচো তাতে না কবে তোমাদের মাথায় ওঠে নাচা শুরু করে?

– মুখ সামলে কথা বলো! ভাবি সারজীবন এ বাড়িতে থাকবে। ভাইয়ার যা কিছু সব ভাবিরই। এসব কথা আজ বলেছ কিন্তু আর বলবে না। ভাইয়া ভাবির সব দায়িত্ব আমার হাতে দিয়ে গিয়েছে। আমি যতদিন বেঁচে আছি ভাবিকে আমি দেখে রাখব। সে আমার চোখে আমার মায়ের স্থানে। তুমি এ নিয়ে আর একটা কথা বলারও আর দুঃসাহস দেখাবে না।

– বাহ! আমি তো অপরাধ করার মতো কিছু বললাম না। আইন সঙ্গত কথা বলেছি। তাছাড়া ওনার বয়স কম। দায়িত্ব যেহেতু নিয়েছ তবে ওনাকে বিয়ে দিয়ে দাও। একটা সংসারও পাবে জীবনটাও গোছাতে পারবে।

-সেসব নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না। আপা আছেন। উনি যেটা ভালো বোঝেন করবেন। তাছাড়া ভাবির বাবাও আছেন।

– হ্যা , হ্যা ! আপার বাসায় তো বসে পড়ে খায় না । সারাদিন আমি রান্না বাড়া করব আর উনি ঘরের দরজা দিয়ে ধ্যান করবে। তিনবেলা দাওয়াত দিয়ে দিয়ে খাওয়াতে হবে নইলে তো আবার ওয়াক্তের সময় হলে তোমরা দু’ভাইবোন মিলে ফোন করে করে আমার কান ঝালাপালা করে ফেল। সে কীসের অস্বাভাবিক? এই যে খালুর সেবাযত্ন করতে ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে চলে গেল। অথচ বাসায় প্লেটটা পর্যন্ত ধুয়ে খায় না। অসহ্য!

– লিসা! চিৎকার করে উঠল সাব্বির! এই এক কথা প্রতিদিন শুনতে ভালো লাগে না। কাজ তো করো শুধু রান্নাবান্নাই। সব তো আখির মা করে। রান্নাটুকুও যদি না পারো করো না তবে। আখির মাকে বলে দাও সে করবে। বেতন একটু বাড়িয়ে দিলেই সারবে।

লিসাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে বেরিয়ে গেল।

চলবে…

#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪১

– তোমার মা এসে তোমাকে যাওয়ার জন্য বলবে আর তুমি লাফাতে লাফাতে দেশে যাওয়ার জন্য রাজী হয়ে যাবে? হাউ ফানি! সব কিছু ভুলে গিয়েছ এত তাড়াতাড়ি? তুমি ভুলে যেতে পারো বাট আই কান্ট! কীভাবে আমাদের কুকুরের মতো মাঝরাতে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল এটা ভুলে গেলে কীভাবে ?
– – হ্যা , ভুলে গিয়েছি। বিকজ , দে আর মাই পেরেন্টস।

– – সো হোয়াট? পেরেন্টস বলে কি তারা তোমার সাথে যা খুশি তাই করতে পারবে? নেভার! তুমি এটা টলারেট করলেও আমি করব না। আমার সেলফ রেস্পেক্ট আছে। তোমার না থাকতে পারে! আমি আমার হাজবেন্ডকে এভাবে তাদের কাছে নিচু হতে দিতে পারি না।

– তোমার হাজবেন্ড হবার আগে আমি আমার আম্মু আব্বুর সন্তান এ কথা ভুলে যাও কেন? আমার আব্বুর আমাকে দরকার। তার এতবড় বিপদের সময়ে আমি যদি পাশে না থাকতে পারি তবে কিসের সন্তান ? এমনিতেই রাগের বশে যে অন্যায় করেছি সেই অন্যায়ের ক্ষমা পাব কিনা সেটাই তো জানিনা। এতকিছুর পরেও আম্মু আমার কাছে এসেছেন। প্লিজ, আর কোনো সিনক্রিয়েট করবে না। আমাকে নির্বিঘ্নে যেতে দাও।

– ওহ! এই কথা! আমি সিনক্রিয়েট করি? চিৎকার করে উঠল এনা। তুমি কি মায়ের আঁচল ধরে তবে সত্যিই চলে যেতে চাচ্ছ? আমার এই অবস্থা দেখেও তোমার মনে কোনো সিম্প্যাদি কাজ করছে না? তোমার নিজের সন্তান আসছে ! আর তুমি আমাকে ফেলে , আমার সন্তানকে ফেলে আবার ওনাদের কাছে যেতে চাচ্ছ! বাহ!

– প্লিজ, আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। আমার আব্বুর পাশে এখন আমাকে দরকার! আর আমি তো আবার ফিরে আসছি। সন্তানের জন্য কি আমার মায়া হচ্ছে না। আমিও ওর আসার অপেক্ষায় আছি।

– সে তো দেখতেই পাচ্ছি। একটা সত্যি কথা বলোতো! তুমি তোমার ওই কাজিনের জন্য যাচ্ছ , তাই না! তোমার মায়েরও মনে মনে এটাই ধান্ধা ! তোমার আব্বুর অসুস্থতার ব্যাপারটা আমার কাছে টোটালি ফেক মনে হচ্ছে। আমার তো মনে হচ্ছে তোমার মা ওই মেয়েকে তোমার গলায় ঝোলানোর উদ্দ্যেশ্যেই এখানে এসেছেন। উনি এসব নাটক সাজিয়ে তোমাকে দেশে নিতে পারলেই তো কেল্লা ফতে। আর তাছাড়া তোমার তো সিম্প্যাদি আছেই ওই বেশরম মেয়ের জন্য! স্বামী মরেছে এখন যার তার গলায় ঝুলতে পারলেই বাঁচে ।

– কী বলছ এসব? মাথা ঠিক আছে?

– ঠিক না থাকার তো কোনো যুক্তি নেই। বিয়ের আগে এত এত ফষ্টিনষ্টি করেছ দু’জন মিলে! সেসব কথা কারো অজানা তো নয় , তাই না! ওর সাথে যা ঘটেছে একদম পারফেক্ট হয়েছে। চিৎকার করে বলে উঠল , এনা।

এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না , প্রিয় । এনার গালে ঠাস করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
এনাও আর চুপ বসে নেই। সাপের মতো ফোঁসফোঁস করতে করতে পুরো রুম তছনছ শুরু করে । প্রিয় থামাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে প্রিয়কে তার কাছেই ঘিষতে দেয় না। প্রিয় খুব ভয় গেল। নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার। এমনটা সে না করলেই পারত! এনা যে পাগল! এখন কী যে করবে! নিজের কোনো ক্ষতি করে না ফেলে!

এত রাতে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে এনার মা , বাবাসহ আমি দৌড়ে ওদের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি তুমুল খারাপ অবস্থা ! রুমের জিনিসপত্র একটার পর একটা তছনছ করে ভাঙ্গছে। প্রিয় তাকে থামানোর জন্য পিছুপিছু হাঁটছে আর বারবার সরি , সরি করছে ।
এনার বাবা দৌড়ে যেয়ে পেছন থেকে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। বাবাকে পেয়ে হাউমাউ করে সে চিৎকার করে ওঠে। এনার এই অবস্থায় এত হাইপার হতে দেখে আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। প্রিয়র মুখের দিকে তাকিয়ে গলা শুকিয়ে আসছে । ছেলেটা কী যে মানসিক টর্চারের মধ্যে থাকে! হায়রে জীবন!
বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি এই মেয়ে পান থেকে চুন খসলেই তিলকে তাল গাছ করে তোলে।

প্রিয়র শাশুড়ির দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম সে প্রিয়র দিকে যেভাবে কটমট করে তাকাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এখনই না জানি আমার ছেলেটার সাথে কী করে ফেলে। এমনটা যে আজ নতুন না সেটাও বুঝতে পারছি। এতকিছুর পরেও ছেলেটা কেন থাকে আমার মাথায় আসে না। আমি না হয় মেয়ে মানুষ বলে বাধ্য হয়ে সব অনাচার , অবিচার সহ্য করে স্বামীর সংসারে পড়ে থেকেছি । কিন্তু ও তো ছেলে মানুষ! ওর কিসের পিছু টান? বাবার প্রতি অভিমানই কি এসবের জন্য তবে দায়ী? নাকি আমার ছেলেটা আমার মতই হয়েছে?

– এনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর বাবা বলে, কী হয়েছে , মা? আমাকে বল! না বললে বুঝব কী করে! এসব কী করছিস তুই? প্রিয় কিছু বলেছে?

– ওই অমানুষটার নাম আমার সামনে নিবে না। ওকে বলো এখনি আমার আমনে থেকে চলে যেতে! ওর মায়ের সাথে চলে যেতে বলো। আমার ওর মতো একটা জানোয়ারকে একদমই প্রয়োজন নেই। চিৎকার করে বলতে থাকে এনা। আমার সন্তানকে আমি আমার পরিচয়ে মানুষ করব। ওর মত একটা বাস্টার্ড বাবার পরিচয় না হলেও চলবে।

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কি এমন হলো ? মেয়েটা যেভাবে ফোঁপাচ্ছে আর চিৎকার করছে না জানি কোন অঘটন ঘটে যায়!

– কি করেছে প্রিয় তোর সাথে , জিজ্ঞেস করল এনার মা!

– ও আমার গায়ে হাত তুলেছে।

– ওর এতবড় সাহস! কি বললি!

মুহূর্তেই এনার মা বাবার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে গেল! এনার বাবা প্রিয়কে কিছু বলতে যাবে তখনই এনা কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে পড়ে গেল। এনার মা বাবা চিৎকার করে উঠল এনার এ অবস্থা দেখে। আমি দৌড়ে যেয়ে এনাকে উঠাতে গেলে এনার মা আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। এনা সেন্সলেস হয়ে পড়েছে। দ্রুত এ্যাম্বুলেন্স এর জন্য কল করল, প্রিয়।

আমি পানি এনে ওদের নিষেধ সত্ত্বেও এনার নাকমুখে অনবরত ছিটিয়ে যাচ্ছি আর দোয়া দুরুদ পড়ছি।

রাত দুইটা ! হাসপাতালের করিডোর ধরে পায়চারী করে যাচ্ছি সবাই। প্রিয় দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এনাকে এমার্জেন্সী সিজার করাতে হবে। বাচ্চার হার্টবিট ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ওর ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই সেটা করতেও ডাক্তাররা সাহস পাচ্ছেন না। তাই ইঞ্জেকশান দিয়ে অপেক্ষা করছে ওর প্রেসার নিয়ন্ত্রণে আসার। এর মাঝে প্রিয়কে একটা থাপ্পড়ও মেরেছে ওর শ্বশুর। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তারও মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এনার মা বাবা দু’জনে মিলে মুখে যা আসছে তা তো বলেই যাচ্ছে! প্রিয় মুখ বন্ধ করে শুনছেই সেই থেকে । ছেলেটা অনুশোচনায় ভুগছে খুব। আমি ওর মনের অবস্থা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।

আমি যেয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম ।

– বাবা, মন খারাপ করো না । যা ভাগ্যে আছে হবে। আল্লাহ নিশ্চয়ই ভালো করবেন আমাদের সাথে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।

– হুম, আল্লাহর উপর ভরসা করেই আছি, আম্মু। দেখতেই তো পাচ্ছ ভরসার ফল। আম্মু , সকালের ফ্লাইটেই তুমি চলে যেও। আমি আর যাচ্ছি না। আব্বুকে বলো আমি কত সুখে আছি। সে স্টাটাস বজায় রেখেছে। আমার কোনো কথাই সে শোনেনি। আমার চাওয়া পাওয়ার মূল্যায়ন করেনি। বেশ তো! আমি তার কথা রেখেছি। এনাকে বিয়ে করতে বলেছে করেছি। ঘর থেকে বের করে দিয়েছে বেরিয়েছি। আমার মুখ দেখাতে নিষেধ করেছে ,দেখায়নি। আর দেখাবোও না কোনোদিন। তোমরা পারলে আমার বাচ্চাটার জন্য দোয়া করো। আমার বাচ্চাটার যদি কিছু হয়ে যায় তবে আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, প্রিয়।

– আমি নিজেকে শক্ত করে বললাম, তুমি যে আমার চেয়েও দুর্বল এটা আমি ভাবিনি কোনোদিন। দোয়া করি আমার নাতী বা নাত্নী যেই আসুক তাকে আল্লাহ যেন হেফাজত করেন। একটা কথা বলবে , বাবা! একদম সত্য বলবে!

এতকিছু সহ্য করে তুমি এখানে পড়ে আছ কেন? শুধুমাত্র আব্বুর উপর অভিমান করে? এক বর্ণও মিথ্যে বলবে না,প্লিজ ! আর কবে দেখা হবে জানি না। হায়াত মউতের কী গ্যারান্টি! হয়ত এটাই শেষ দেখা আমাদের। তাই , এতটুকু আশা করছি যে কথাগুলি সত্যি বলবে।

– প্রিয় কিছু সময় চুপ করে থেকে বলে, আব্বুর উপর অভিমান থেকেই এই জীবনকে স্বেচ্ছায় বরণ করেছি এটা সত্যি। বিন্দু বিন্দু অভিমান জমে জমে পাহাড়সম হয়েছে। আব্বু একটা বারের জন্য আমার সাথে আর কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করেনি। আমি বেঁচে আছি কি মরে গেছি সেটাও জানার দরকার নেই তার। হয়তো আমাকে ছাড়াই তার খুব ভালো চলছে।

– আব্বুর উপর তোমার এত অভিমান? তোমার আব্বু তো এমনই! তুমি তো সেই জন্ম থেকেই দেখছ। আমাকেই তো তুমি একসময় বোঝাতে। কত কষ্ট করে আমি এতটা বছর তোমার আব্বুর সাথে সংসারটা টিকিয়ে রেখেছি আর তুমি তো তার ঔরসজাত সন্তান। তুমি তাকে বুঝতে পারলে না। সে তোমাকে কতটা মিস করে তুমি কি বোঝ না। বাবার দেয়া এতটুকু আঘাত সহ্য করতে পারলে না ?

– একটা সত্য কথা বলি আম্মু। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল প্রিয়।

– সত্যটা শোনার জন্যই তো দাঁড়িয়ে আছি। তুমিতো বলছো না।

– আব্বু আর দাদীর কারণে আমি যেদিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আর সুন্দর প্রাপ্তিটুকুকে হেলায় হারিয়েছিলাম সেদিন থেকেই আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম হারানোর কষ্ট কতটা গভীর সেটা তারা যেন বুঝতে পারে। কায়মনোবাক্যে আমি আল্লাহর কাছে এটাই চেয়েছি। প্রিয়জন দূরে সরে গেলে কতটা কষ্ট লাগে সেটা আমি আব্বুকে বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু এমন কোনো সুযোগ আমার সামনে আসছিলোই না। বুকের কষ্ট গভীরে চাপা দিয়ে এনাকে বিয়ে করেছি। ওকে আমি কোনদিনই ভালোবাসিনি। ভালোবাসার চেষ্টাও করিনি। কিন্তু পাশাপাশি থাকতে থাকতে একজন মানুষের প্রতি মায়াতো কিছুটা জন্মেই যায়।
ধীরে ধীরে এনার প্রতি যখন কিছুটা অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হলো ঠিক সেসময় আব্বু তার সিদ্ধান্ত আমার উপর আবার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। ভুলে যাওয়া ক্ষতটা আবার তাজা হল। রক্তক্ষরণ শুরু হল সেখান থেকে। পুরানো কষ্টটা আমাকে আবার খোঁচাতে শুরু করল। তখনই মনে হলো এই তো সুযোগ। এই মানুষটাকে কষ্ট দেওয়ার এটাই মোক্ষম সময়। সারা জীবন দেখেছি তোমার উপরে তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অভ্যাস। তুমিও কখনো কখনো প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছ। কখনো হেরেছ আবার কখনো জিতেছ। তবে জ্ঞান হবার পর থেকে যতটুকু দেখেছি সারা জীবন একটা কম্প্রোমাইজিং লাইফ লিড করেছ তুমি। আমিও তোমার মতো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ভেবেছিলাম এনাকে বিয়ে করে একটা গড়পড়তা জীবন চালিয়ে নিব। কারণ মনে একজনকে নিয়ে অন্যজনের সাথে জোর করে সংসার হয় না। তাই ভেবেছিলাম যেভাবে চলছে চলুক। এনা এনার মতো চলুক আমি আমার মত চলি। কিন্তু সেখানেও ছন্দ পতন ঘটাতে শুরু করেছিল আব্বু। তাই এবার আর সহ্য করতে পারিনি। আব্বুকে শাস্তি দেবার জন্যই আমি এই নরক যন্ত্রণায় ভুগছি।
কিন্তু বিশ্বাস করো আম্মু! আমি তোমাদের জন্য চোখের পানি ফেলিনি এমন একটা রাত আমার জীবন থেকে যায়নি। পুড়তে পুড়তে মনে হয় কলিজা অংগার হয়ে গিয়েছে । খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করে মরছি। একটু সুযোগ পেলেই মনে হতো ছুটে যাই তোমাদের কাছে। পরক্ষণেই আব্বুর দেওয়া আঘাতের কথা মনে এসে যায়।
আব্বুর কষ্টের কথা শুনে এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারিনি তাই তো তোমার সাথে ছুটে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা বোধহয় আর নসিবে নেই। তুমি চলে যাও। না হলে এদের কথার বানে তুমিও রক্তাক্ত হবে প্রতিমুহূর্ত। শুধু আমার অপরাধগুলো ক্ষমা করে দিয়ে আমার সন্তানের জন্য একটু দোয়া করো। কারণ ওর মাঝেই আমি আমার আগামীর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেতে চাই যেমন করে পেয়েছিলে তুমি আমার মাঝে।

প্রিয়র কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার গলাটা বাষ্পরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমি কোন কথা বলতে পারছি না। ছেলেটা এতো অভিমানী! কী বলব ওকে আমি? ওর কথার ফাঁকে বলার মতো আর কোনো কথা আমি খুঁজে পাই না। ওর চোখের ভাষাই আমাকে আরো বুঝিয়ে দিচ্ছে ওর মনের কথা! কিন্তু আমার মনে একটা প্রশ্ন শুধু ঘুরপাকই খাচ্ছে। একবার মন চায় ওকে জিজ্ঞেস করি আবার সাহস পাচ্ছি না। কিন্তু , অনেক সাহস করে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম ,

– বাবা, একটা সত্য কথা বলবে ?

– চোখ মুছতে মুছতে প্রিয় বলল, আর কিছু জানতে বাকী আছে তোমার?

– তুমি কি এখনো মিথিলাকে ভুলতে পারোনি?

– প্রিয় কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলল, আম্মু, এসব কথা কেন আসছে? বাদ দাও এসব কথা, প্লিজ। পাস্ট ইজ পাস্ট।

– তোমার কথা শুনে কেন যেন মনে হচ্ছে এমনটা আমার !

– আমি এসব কথা আলোচনায় যেতে চাই না, প্লিইজ!

– আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ঠিক আছে। একটা কিউরিসিটি থেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ক্ষমা করো ,বাবা। এসব কথা জিজ্ঞেস করার সময় এখন আর নেই আমি ভুলে গিয়েছিলাম। তুমি এখন বিপর্যস্ত আমি বুঝতে পারছি। ভালো থেকো খুব। ভাগ্যে থাকলে হয়ত দেখা হবে আবার । আমার এখন যেতে হবে।

প্রিয়র সামনে আর দাঁড়ানোর সাহস নেই আমার। নইলে ছেলেটাকে রেখে আসার জন্য বুকে যতটুকু শক্তি সঞ্চার করেছিলাম সেটা ওর চোখের নোনাপানির বাণে কখন না ধুয়েমুছে যায়!

– আমি তোমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসব। তুমি রেডি হয়ে নাও। বাসা থেকে ব্যাগপত্র নিয়ে আসতে হবে আগে।

– না, বাবা। আমি ম্যানেজ করে নিব। তোমার এখানে থাকাটাই বেশি জরুরী। যেকোনো সময় এনার ডেলিভারি হতে পারে। তাছাড়া তোমার তো ওর পাশেই থাকাটা কর্তব্য। এনা এবং আমার নাতী নাত্নী যেই আসুক তার জন্য দোয়া রইল অশেষ। ইন শা আল্লাহ, সে সুস্থভাবেই এই পৃথিবীর বুকে আসবে। এ আমার বিশ্বাস। তুমি শুধু নিজেকে শক্ত রাখো। আর অপেক্ষা করো। আল্লাহ তোমার সাথে কিছু খারাপ করবেন না, ইন শা আল্লাহ । বিশ্বাস রাখো উপরওয়ালার প্রতি।

আমি আমার গলা থেকে চেইনটা খুলে প্রিয়র হাতটা টেনে নিয়ে দিয়ে বললাম , এটা আমার দাদুকে দিও। আমার সাথে তো দেখা হলো না। আমার তরফ থেকে এই ক্ষুদ্র ভালোবাসাটুকু পৌঁছে দেবার দায়িত্ব রইল তোমার উপর। বড় সাধ ছিল ওকে দেখার, কোলে নিবার। আমার ছোট প্রিয় আসছে । আমি সেই ছোট মুখটা দেখার লোভ কি করে সামলাই বলো। এই লোভেই ছুটে এসেছিলাম তোমার আব্বুর এত এত নিষেধ সত্ত্বেও। কিন্তু ভাগ্যে আর হলো না । তুমি এনাকে বুঝিয়ে ওদেরকে নিয়ে দেশে কিছুদিনের জন্য বেড়াতে এসো পারলে। আম্মু খুব অপেক্ষায় থাকব।

আমার আর কথা বেরুচ্ছে না মুখ থেকে। আর কিছুক্ষণ থাকলে হয়ত গলা থেকে আর কোনো শব্দই বের হবে না। তাই ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকালাম না। পেছনে ফিরলে আমার পক্ষে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব হবে না। নাড়িছেঁড়া ধনকে এভাবে নরক যন্ত্রণায় ফেলে যেতে মন একদমই সায় দিচ্ছিল না। কিন্তু আমি অপারগ । আমাকে খালি হাতেই ফিরতে হবে।

সময় যেন আমাকে সামনে যেতে দিচ্ছেই না। আমি যদি টাইম মেশিন পেতাম তবে সময়ের চাকাকে ঘুরিয়ে সেই সময়ে যেতাম যে সময়ে আমার কলিজার টুকরা ছেলে আমার বুকেই থাকত! এক এক পা করে সামনে যাচ্ছি আর মনে হচ্ছে আমার কলিজা ছিঁড়ে রেখে আসছি । সেখান থেকে গলগল করে রক্তক্ষরণ হয়েই যাচ্ছে।

মিথিলা সেলিমের পায়ে সরিষার তেল মালিশ করছে । সেলিম কিছুটা ঘুমের মতো এসেছে। মিথিলার চোখ ছলছল করছে। গতকাল তার দেবর সাব্বির এসেছিল তাকে নিতে । সে যায়নি। কার কাছে রেখে যাবে এই অসুস্থ মানুষটাকে। মানুষটা যতই খারাপ হোক এই মানুষটার নুন খেয়েছে সে আর তার ভাই কয়েক বছর ধরে। বাবা বেঁচে থাকতেও তার খালু তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল সেটা তার ইচ্ছাতেই হোক আর অনিচ্ছাতেই হোক! তাই উনার কাছে তার ঋণের শেষ নেই।
রুম্পা মা না ফেরা পর্যন্ত সে এমন অসুস্থ একজন মানুষকে কিছুতেই ফেলে রেখে যাবে না।

মিথিলার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই সে দেখল তার ছোট জা পলির ফোন।
হাতটা পরিষ্কার করে ফোন রিসিভ করল।

– হ্যালো ভাবি! কেমন আছেন?

– এই তো চলছে। তোমরা?

– আমরাও আলহামদুলিল্লাহ্‌ আছি একরকম! ভাবি, কাল আসলেন না যে সাব্বিরের সাথে তাই কল দিলাম! শরীর স্বাস্থ্য ভালো তো আপনার?

– হুম, ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ্‌ ! আসব। রূম্পা মা ফিরবে কাল । তারপরে আসব।

– ওহ! বাঁচালেন ! আমি আরো ভেবে বসে আছি আপনি হয়ত আর ফিরবেন না।

– কেনো? এমনটা মনে হল কেনো?

– না, সবাই বলাবলি করছিল এ বাড়িতে নাকি আপনার কোনো অধিকারই নেই। এবার নাকি ফিরবেন না। কী অধিকার নিয়ে আসবেন তাই! আমিও ওদের কড়া করে এর উত্তর দিয়ে দিয়েছি। আমিও বলে দিয়েছি, আমার জা যতদিন মন চায় আমাদের সাথে থাকবে । আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সাব্বির আর শান্তা আপার মতো আমিও অনেক ভালোবাসি আপনাকে । আপনি ছাড়া বাসাটা খা খা করছে। আপনার ফেরার অপেক্ষায় আমরা। সাব্বিরের সাথে আসেননি দেখে খুব ভয় গিয়েছিলাম। তাই ফোন করলাম।

মিথিলা ফোনটা রাখতে রাখতে কিঞ্চিৎ হাসি দিয়ে বলল, চিন্তা করো না এতবেশি। আমি দেখি কি করা যায়!

ফোন রেখে নিজের কাছে প্রশ্ন করল , তাই তো! সে কীসের অধিকারে ও বাড়িতে যাবে? পলি আসলে অন্যের দোহাই দিয়ে কী বোঝাতে চাইছে সে বোঝে। কিন্তু কি বলবে? পোড়াকপাল নিয়ে যার জন্ম তার আবার সুখ কীসে?

সাজিদের কারণে যে বাড়িটা একসময় তার সবকিছু হয়ে গিয়েছিল সেই সাজিদের কারণেই আবার বাড়িটা তার এত দূরে চলে গেছে! ওখানে সে একদমই অনাহুত এখন। সাব্বির হয়ত লজ্জায় পড়ে তাকে কোনোদিনই বলতে পারবে না এসব কথা যা অন্যের দোহাই দিয়ে পলি অবলীলায় বলে গেল ।

সে সবই বুঝতে পারছে। তাই ভাবছে কোথায় যাওয়া যায়! বাবার বাড়িতে সৎ মা আর তার দু’পক্ষের ছেলেদের অত্যাচারে থাকা সম্ভব না। তাই তাকে এমন কিছু করতে হবে যাতে নিজের দায়িত্ব নিজেই সামলাতেই পারে। পড়াশোনা শেষ। একটা চাকরি এখন তার খুব দরকার। ও বাড়িতে যে তার আর থাকা সম্ভব হবে না এটা সে আজকে পলির কথার টোন শুনেই বুঝতে পেরেছে। হায়রে জীবন!

ছলছল চোখে সেলিমের পায়ে তেল মালিশে ব্যস্ত মিথিলা।

চলবে…