#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪২
দেখতে দেখতে ছয় বছর কেটে গেল। সেলিমের খুব বেশি কোনো ইম্প্রুভ হয়নি। এখন দেশের বাইরে চিকিৎসা চলছে। ডান হাতটা এখন কিছুটা নাড়াতে পারে। কিন্তু পায়ে আজ অবধি কোনো সেন্স আসেনি তার। হুইল চেয়ারই তার এখন নিত্য সঙ্গী । সেই বাঘের মত মানুষটা শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। আমি শুধু সেলিমের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবি, হায়রে মানুষের জীবন? কোথায় সেই অহংকার , কোথায় সেই মিথ্যা আভিজাত্য আর গৌরবের ঠাটবাট? মানুষটাকে দেখলে খুব কষ্ট হয় আমার। ব্যবসা বাণিজ্য কোনোকিছুর দিকেই আর তার কোনো খেয়াল নেই। নিজেকে সামলাতেই যে হিমশিম খায় সে কি করে এতবড় ব্যবসা বাণিজ্য সামলাবে? আমি শুরুর দিকে কিছুটা হাল ধরার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পরে বুঝতে পারি আমারও বয়স হয়েছে। তাছাড়া মানসিকভাবে আমি সম্পূর্ন বিধ্বস্ত। যার স্বামী প্যারালাইসড হয়ে পড়ে আছে , একমাত্র ছেলেটা দেশছাড়া তার কি স্বাভাবিক থাকার মতো অবস্থায় থাকা সম্ভব?
এখন সবকিছু আমার দেবর সজলের হাতে। যা করে করুক । আমার আর ও নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। কী হবে এত এত সম্পত্তি দিয়ে? খাওয়ার মানুষই তো নেই। ছেলেটাকে কতবার অনুরোধ করলাম দেশে আসবার জন্য কিন্তু কোনো রেস্পন্স নেই তার। সেলিম কোনো কথা বলে না প্রিয়র বিষয়ে। বাপ ছেলের সাথে কোনো কথা হয়নি এখনো পর্যন্ত। প্রিয় কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করলেও সেলিম মুখ ঘুরিয়ে রাখে। ছেলের যেমন বাবার উপর অভিমান জমে পাহাড়সম হয়েছে ঠিক একই রকম হয়েছে বাবারও। এদের মান অভিমানের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মরছি আমি।
মিথিলা একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করছে। বেতন বেশ ভালোই। মিথিলা ওর বাবার কাছে সম্পত্তির কিছু অংশ পেয়েছে। কিন্তু সে তা আনেনি। তার বাবা যতদিন বেঁচে আছে সে কিছুই চায় না। অবশ্য ওর দরকারও নেই ওই সম্পত্তির। আমার বাবার বাড়িটাকে আমরা ডেভেলপারকে দিয়েছিলাম। সেখানে মিথিলাও দুইটা ফ্লাট পেয়েছে। একটাতে মিথিলা থাকে বাকিটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
মেহরাব বিয়ে করেছে। বউ নিয়ে অফিসের কাছাকাছি সরকারি কোয়ার্টারে থাকে। মাঝেমাঝে আসলে মিথিলার ফ্লাটেই ওঠে। ওর ফ্লাটও ভাড়া দেওয়া হয়েছে। মিথিলাকে কত চেষ্টা করেছি আরেকবার বিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু সে কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। তার একটাই কথা , বিয়ে মানুষের একবারই হয়। তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এ জীবনে সে আর বিয়ে করতে পারবে না। যেভাবে চলছে চলুক!
কত ভালো ভালো জায়গা থেকে সম্মন্ধ আসছে কিন্তু মেয়েটার মাথায় কী ভূত চেপেছে কে জানে! সে কিছুতেই আর দ্বিতীয়বারের জন্য বিয়ে করতে রাজী নয়। মেহরাবের সাথে কথা হলেই সেও শুধু একটা কথাই বলে , মিথিলাকে বিয়ের জন্য রাজী করানো যাবে কীভাবে? আমিও শুধু ভাবি , যে করে হোক মিথিলার একটা কূল হলেই শান্তি। আর কত একা জীবন কাটাবে সে?
আজ সকাল থেকে সেলিমের খুব মন খারাপ। আমি বারবার জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর দিচ্ছে না। পরে যখন রাগ করে বললাম , ঠিক আছে , আমাকে বলার দরকার নেই। যা খুশি করো । আমাকে কোনো কথা বলার উপযুক্তই বা কবে ভেবেছ?
আমাকে রাগ করতে দেখে সেলিম বলল, বসো তবে বলছি। বলিনি কারণ তোমার মন খারাপ হবে তাই।
– কি হয়েছে তাই বলো! আমার মন ভালো আর খারাপের হিসেব করে লাভ কি! মনই আছে কি নাই সেটাই তো এখন আর বুঝতে পারি না।
– সেলিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সজল যা শুরু করেছে তাতে তো একে একে সবই দখল করে নিয়ে যাবে মনে হচ্ছে। আজও ম্যানেজার সাহেব ফোন দিয়েছিল। কিন্তু আমি কী বলব তাকে, বলো। আমার তো কিছু করার ক্ষমতাই নেই।
– তাতে কি হয়েছে? যা করে করুক।আমাদের দরকারই বা কী এত সহায় সম্পত্তির হিসাব নিকাশ রেখে ? এজন্যই তো আমিও আর যাই না অফিসে । এই বয়সে এতসব ঝামেলা নেবার কী দরকার!
– এসব কী বলছ ? আমাদের একটা ছেলে আছে। ওর কী কিছুই দরকার নেই?
– সে কি ফিরবে মনে হয়! কতবার বললাম , তুমি একটু ওর সাথে কথা বলো। তাতো বলো না। আবার ছেলের ফেরার আশা করো। এত জিদ করে কী লাভ বলো!
– তার কী একবারও মনে হয় না আমাদের প্রতি তার কোনো দায়িত্ব আছে। শ্বশুরের অঢেল পেয়েছে তাই তার জন্য ঢের। আমাদের কথা মনে করার ফুরসৎ তার না থাকলেও আমি তো তার হক নষ্ট করতে পারি না। দেখি আর কিছুদিন অপেক্ষা করে। কখন দু’চোখ বন্ধ হয়ে যায় তার আগেই একটা কুল করতে হবে।
– অপেক্ষার প্রহর যদি শেষ না হয়? কি করবে তবে?
– সেটাও ভেবেছি । উইল করে রেখে যাব। সে যদি ফিরে তো সে পাবে না হলে কোনো ট্রাস্টে দান করে যাব।
– আমি কিছুটা ইততস্ত করে ধীরে ধীরে বললাম, ট্রাস্টে কেন দিয়ে যাবে? তোমার আর কোনো ওয়ারিশও তো থাকতে পারে।
– এসব কী বলছ? আমার আর কে ওয়ারিশ হতে পারে?
– জীবনের এই প্রান্তে এসে তোমার কাছে লুকাবার আর কী দরকার বলো। তাই ভাবছি সত্যিটা যেমন তোমার সামনে আসা দরকার ঠিক তেমনি আমার সামনেও আসা দরকার।
– কোন সত্যির কথা বলছ তুমি?
– কিছুটা থেমে বললাম, তোমার আর হেলেনের সন্তান আসিফের কথা বলছি। সে তোমার সন্তান । তোমার কাছে তার পাওনা আছে । তাকে কেন ঠকাবে? ট্রাস্টে দান করার আগে তার কথাটা মাথায় রেখো। তুমি হয়ত ছেলেটাকে দেখনি কিন্তু আমি দেখেছি। দেখতে একদম তোমার আর প্রিয়র মতই লাগে।
– সেলিম চোর ধরা পড়ার মতো করে আস্তে বলল, তুমি কি করে জানো?
– আমি জানি অনেক আগে থেকেই। সেই যে সিলেটে গেলাম মাহাতাব নামের এক ভদ্রলোকের শাস্তি দিতে মনে পড়ে। সেই থেকেই জানি। আমি মাহাতাবের খোঁজখবর নিতে গিয়েই জেনেছি যে সে হেলেনের হাজবেন্ড। ওর সাথেও দেখা হয়েছিল । হেলেনই সব কথা বলেছে আমাকে।
– কত বড় বাটপার! এতদিন ধরে আমাকে বলেছে তোমাকে সব বলে দিবে। এটা বলে বলে ব্লাকমেইল করেছে আর এখন তুমি বলছ তুমি সব জানো। এতদিন তবে আমাকে বলোনি কেন?
– হেলেন দুজনের সাথেই বিট্রে করেছে। সে আমাকে বলেছে আমি যেন তোমার কাছে আসিফের কথা কিছু না জানাই। তার ছেলেকে তুমি যদি নিয়ে আসো সেই ভয়ে সে গোপন করতে বলেছে। চিন্তা করো কত বড় ধাপ্পাবাজ! আমাকে বলেছে তুমি নাকি কখনো ছেলেটাকে দেখোই নি।
– এটা অবশ্য মিথ্যা বলেনি। আমি ওর ছেলেকে আজও দেখিনি। দেখতে চাইও না। শুধুশুধু মায়ার বন্ধনে জড়ানোর কোনো মানে নেই। ছেলেটা মাহাতাবের পরিচয়ে বড় হয়েছে। সত্যটাকে প্রকাশ করে কী দরকার ওর কচি মনে আঘাত দেবার? ও যাকে বাবা বলে জেনে এসেছে তাকেই বাবা বলে জানুক। তাছাড়া মাহাতাবও নিজের ছেলের মতোই ওকে দেখে।
– কিন্তু তাই বলে ওর প্রতি তোমার কোনো দায়িত্ব নেই?
– আছে। আছে বলেই প্রতি মাসের এক তারিখে হেলেনের একাউন্টে এক লক্ষ টাকা ক্যাশ চলে যায়। আসিফের পঁচিশ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ওর খরচ বাবদ এভাবেই যাবে। তাছাড়া সিলেট শহরে স্থায়ী সম্পদ করে দিয়েছি। তাতে ওর সারাজীবন বেশ ভালোভাবেই চলে যাবে আশা করছি। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এর বেশি কিছু করতে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। যৌবনে যে ভুল করেছি সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে যেয়ে আমার মৃত্যুর পরে মানুষের কাছে আসিফের সাথে আমার সম্পর্কের কোনো প্রশ্নচিহ্ন রেখে যেতে চাই না।
– বুঝেছি। একটা অনুরোধ রাখবে?
– বলো!
– প্রিয়কে তুমি একবার ডেকেই দেখো! তোমার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারবে না।
– জীবনে যত পাপ করেছি তার প্রায়শ্চিত্ত এখনো শেষ হয়নি। শেষ হতে দাও। ভাগ্যে থাকলে হয়ত মরার আগে ছেলের সাথে দেখা হতেও পারে। আমি অপেক্ষায় আছি যে আমার ছেলে আর কতবছর তার বাবার কাছে না এসে পারে! অভিমানি সুরে কথাগুলি বলতে বলতে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে সেখান থেকে সামনের দিকে চলে গেল সেলিম।
আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ভাবছি , হায়রে অভিমান! লোকটা ভাঙ্গবে তবু মচকাবে না। যেমন বাপ ঠিক তেমনি ছেলে।
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে প্রতিদিনের মতোই একটু নেটে ঢুকলাম । সেলিম ঘুমিয়ে গেছে বেশ আগেই। নিঃসঙ্গ জীবনে করারই বা আছে কি! একটু মোবাইল ঘাটাঘাটি করি ঘুমাবার আগে।
মেইল বক্সে একটা মেইল দেখে একটু চমকে উঠলাম। বহুবছর পরে পরিচিত একজনের মেইল। কত বছর ধরে সিদ্ধার্থের সাথে আমার যোগাযোগ নেই। ভুলেই গিয়েছিলাম আমার বন্ধুটিকে। যোগাযোগের অভাবে কাছের মানুষও কত দূরে চলে যায় ।
মেইলে জানিয়েছে সিদ্ধার্থ কথা বলতে চায় আমার সাথে । ওর হোয়াটস অ্যাপ নাম্বার দিয়েছে। আমার সাথে এত বছর পরে কী কথা বলতে চায় ভেবে আমি অবাক হলাম। আমি সাথে সাথেই ওকে নক করলাম।
নক করতেই সিদ্ধার্থকে পেয়ে গেলাম।
– হ্যা… হ্যালো! সিদ্ধার্থ বলছ কি?
– হুম , সিদ্ধার্থই বলছি! গলার স্বর কিন্তু একদমই বদলায়নি তোমার! কেমন আছো?
– ভালো আছি। এতদিনে মনে পড়ল তবে!
– তুমিও তো মনে করতে পারতে!
– আসলে আমরা এতটা ব্যস্ত আর যান্ত্রিক হয়ে গেছি যে বন্ধু পরিজনের খোঁজখবর নেবার মতো সময় হারিয়ে ফেলেছি। এবার বলো তোমার বউ বাচ্চারা কেমন আছে?
– ভালো আছে সবাই। সেলিম সাহেবের কী অবস্থা? ভালো আছে ?
– একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম , হুম ভালোই আছে।
– কি হয়েছে ? এত বড় দীর্ঘশ্বাস?
– নাহ , এমনিতেই।
– কোথায় উনি ? এখনো অফিসে ? বউকে সময় টময় কিছু দেয় নাকি আগের মতোই ব্যবসায় নিয়েই পড়ে থাকে?
– কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম , তুমি বোধ হয় জান না। আর জানবেই বা কী করে? এত বছর ধরে তো আমাদের কন্ট্যাক্টই ছিল না।
– কী হয়েছে? কোনো খারাপ সংবাদ তো না?
– সেরকমই! সেলিম এই ছয় বছর ধরে বিছানায়। একটা স্ট্রোক করে প্যারালাইসড হয়ে আছে।
– কী বলছ? সো স্যাড! ভেরি সরি , রূম্পা! এত বছর তোমার এমন দুঃসময়ে খোঁজখবর নিতে পারিনি। কথাবার্তা তো বলতে পারে?
– হুম তা পারে। তবে সেই আগের সেলিম আর নেই। একদম চুপচাপ।
– বুঝতে পারছি। তোমার উপর কী চলছে বুঝতে পারছি। আচ্ছা, তোমাদের ছেলে প্রিয় কোথায়? ও কি এখন ব্যবসায় বাণিজ্যের হাল ধরেছে নাকি? বিয়ে শাদী করেছে?
– আমি আবারও খানিকটা থেমে বললাম, নাহ! সেই ভাগ্য আমাদের নেই। তবে ছেলে বিয়ে করেছে। একটা ফুটফুটে ছেলেও আছে প্রিয়র। কিন্তু আমাদের সাথে তারা থাকে না।
– মানে? তবে কোথায় তোমাদের ছেলে?
– ইতালিতে থাকে।
– সিদ্ধার্থ কিছুটা সময় নিয়ে বলল, কোন শহরে থাকে ও ?
– মিলানে!
– কী করে সেখানে?
আমি শুরু থেকে সবকিছু খুলে বললাম সিদ্ধার্থের কাছে। কিছুই গোপণ করলাম না। এতদিন পর মনে হলো কারো সাথে মনের কষ্টের কথা শেয়ার করতে পেরে একটু স্বস্তি মিলল। সিদ্ধার্থের কাছে কোনোকিছু গোপন করবার মতো সম্পর্ক তো আমার না।
সিদ্ধার্থ খুব মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনল। আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সিদ্ধার্থ আবার যোগাযোগ করবে বলে কল কেটে দিলো।
আজ মিথিলার ছুটির দিন। প্রতি ছুটির দিনেই সে চেষ্টা করে আমাদের এখানে আসার। গত সপ্তাহে ওর বাবাকে দেখতে গিয়েছিল বলে আসতে পারেনি। এসেই রান্নাঘরে ঢুকেছে আজ। সেলিম ওর হাতের ক্ষীর খুব পছন্দ করে। আজ আসতেই সেলিম মিথিলার কাছে বাচ্চাদের মতো আবদার করে বসল ক্ষীর খাবার। মিথিলাও আর দেরি করল না।
ঘন্টাখানেক বাদেই মিথিলা বাটি ভর্তি করে ক্ষীর নিয়ে হাজির। সেলিমের বাটি রেখে আরেকবাটি নিয়ে রওয়ানা হলো আমার শাশুড়ির রুমে।
– দাদী, আসতে পারি? ঘুমিয়ে গেছেন নাকি?
– কে মিথিলা নাকি? আসছিস কখন? মনে মনে তোকে মিস করছিলাম খুব। কেমন আছিস রে, দাদু?
– এই তো ! আল্লাহ যেমন রাখে। আপনার শরীরের কী অবস্থা?
– আর থাকা! এই বয়সে যা আছি তাইই আলহামদুলিল্লাহ! কখন চলে যাই সেই অপেক্ষায়। আমার সাথের কেউই তো নেই আর। আমিই যে কী করতে এখনো আছি বুঝি না। সারাদিন এই একটা খাটের উপর কতক্ষণ আর মন টিকে?
– এসব বলছেন কেন? আরো অনেক বছর আমাদের মাঝে থাকেন সেই দোয়া করি আল্লাহর কাছে। ফুপি আসবে শুনলাম!
– আর ওদের কথা বলিস না। আসব আসব করে তো এই একবছর কাটিয়ে দিলো। আসলে আসলো না আসলে না আসুক। এখন আর কারো জন্য মায়া কাজ করে না। নিজের জীবনই চলে না। শুধু মরার আগে একটাই আশা আল্লাহর কাছে । একবারের জন্য হলেও আমার নাতীর মুখটা যেন দেখে মরতে পারি। বলতে বলতে কেঁদে উঠল, প্রিয়র দাদী।
– আহা, দাদী ! আপনার এই এক সমস্যা ! ছলে ছুতায় নাতীর কথা মনে করে চোখের পানি ঝড়ান। যে আপনাদের ভুলে গেছে, আপনাদের জন্য যার মন কাঁদে না তার জন্য আর কত কাঁদবেন ? এসব বাদ দিন তো! দেখেন , আমি আপনার জন্য কী মজা করে ক্ষীর রান্না করেছি।
– আমি তো খেতে পারব নারে, দাদু। ডায়াবেটিকস যে বাড়া বেড়েছে।
– কোনো সমস্যা নেই। আমি হালকা একটু চিনি দিয়ে করেছি। সমস্যা হবে না। আংকেলের জন্য করেছি। সেখান থেকে চিনি দেবার আগে আপনার জন্য খানিকটা তুলে রেখেছি । অল্প একটু খান । সমস্যা হবে না। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
– প্রিয়র দাদী ছলছল চোখে মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলল, কত খেয়াল তোর? অথচ আমরা এই হীরার টুকরাকে চিনতে পারিনি। সেদিন যদি তোকে ওভাবে না বলতাম তাহলে হয়ত এই বাড়িটার এমন হালত হতো না। হাসিখুশিতে ভরে থাকত এ বাড়ির আঙ্গিনা । সেলিমও খুব আফসোস করে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য। তোর কথা প্রায়ই বলে । তুই কিছুদিন না এলেই রুম্পাকে জিজ্ঞেস করে। আমার কাছে অনেক কথাই বলে। কিন্তু রুম্পার সামনে ধরা দেয় না। ছেলেটা এত চাপা স্বভাবের! তোর এই কষ্টের জীবনটার জন্যও নিজেকে বড় অপরাধী মনে করে সেলিম।
– আহ, দাদী! এসব বললে কিন্তু আমি আর আসব না এখানে। আমি কতবার বলেছি এসব মানুষের ভাগ্যের হাতে। ভাগ্য বদলানোর দুঃসাহস আমাদের কারো নেই। আমার ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে। এখানে আপনার বা আংকেল কারোরই হাত নেই। অযথা নিজেদের ব্লেম দেওয়া বন্ধ করবেন কবে বলেন তো।
– এখন ভাগ্যের দোহাই দেওয়া ছাড়া আর আছেই বা কী বল!
– আমার শুধু ভেবে অবাক লাগে , ভাইয়াই বা কেমন মানুষ! ওর বউ ওকে নিশ্চয়ই শেকল দিয়ে আটকে রাখেনি। একবারের জন্যও কি দেশে আসতে পারে না? আংকেলের এই অবস্থা জেনেও একবারের জন্য কোনো মায়া হলো না। হায়রে পাষাণ! বউয়ের আঁচল ধরে ঘুরতে ঘুরতে মায়ের আঁচলের গন্ধ এভাবে ভুলে গেলি! এত অভিমান কিসের?
চলবে…
#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪৩
সিদ্ধার্থ আর প্রিয় মুখোমুখি বসে আছে। প্রিয়র কাছে বেশ চেনা চেনা লাগছে সিদ্ধার্থকে। কিন্তু কোথায় দেখেছে সে মনেই করতে পারছে না। সিদ্ধার্থের রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হিসেবে ইন্টার্ভিউ দেবার জন্য এসেছে । সিদ্ধার্থ ব্যাংকক থেকে মিলানে শিফট হয়েছে বছর পাঁচেক হলো। এখানেই ব্যবসা শুরু করেছে । বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট আছে মিলান শহরে। স্কুল এরিয়ার এই রেস্টুরেন্টটি মাত্র শুরু করেছে। কয়েকমাস হলো চালু হয়েছে। চালু হতেই বেশ ভালো ব্যবসায় করছে এখান থেকে সে। এতবড় একটা স্কুল খুব কাছাকাছি থাকার কারণে রেস্টুরেন্টটি আশার থেকেও বেশ ভালো চলছে। একজন ম্যানেজারের জন্য অনলাইনে সে সার্কুলার দিয়েছিল দিন দশেক আগে। বেশ কিছু ক্যান্ডিডেট সাড়া দিয়েছে। বেতনও বেশ ভালো।
গত পরশু অনলাইনে সিভি বাছাই করতে করতে প্রিয়র সিভি চোখে পড়ে। প্রিয়র ফেস দেখে কিছু চিনতে না পারলেও প্রিয়র বায়োডাটা দেখে তার চোখ ছানাবড়া । প্রিয় নামটা তার কাছে আগে থেকেই পরিচিত। যখন প্রিয়র আইডেন্টিটিতে বাংলাদেশী দেখল তখন মনের মাঝে কেমন যেন একটু খোঁচাতে শুরু করল তার। কিন্তু অবাকও লাগল এমন ভাবনা মাথায় আসার পর। সে যে প্রিয়র কথা ভাবছে সে কী করে এই চাকরির জন্য এপ্লাই করতে পারে? ভাবল নিশ্চয়ই ভুল ভাবছে। তারপরেও কিছুটা কৌতূহলবশত তাড়াতাড়ি প্রিয়র ফুল বায়োডাটা চেক করল । পেরেন্টেসের নাম দেখে তার চোখ ছানাবড়া। সে যার কথা ভাবছে সেই না তো! এত মিল কী করে হয় ? প্রিয়র মা বাবার নামেও এত মিল? তবুও তার বিশ্বাস হয়ে না। ভাবে এটা হয়ত কোনো মিরাকল হবে। হয়ত কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে । এতবড় বিজনেস ম্যানের ছেলে আসবে তার কাছে এমন চাকরির জন্য ! এটা সিদ্ধার্থ মানতেই পারছে না। মনের খচখচানি দূর করার জন্য মনে হলো রুম্পার সাথে যোগাযোগ করা দরকার। অনেক বছর নানান ব্যস্ততায় এত প্রিয় মানুষটার কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। একটা অপরাধবোধে ভুগছিল সে এটা ভেবে। পরে ভাবল মনে যখন পড়েইছে এই সুযোগে না হয় একটু নক করে দেখা যায় রুম্পাকে। রুম্পার সাথে কন্ট্যাক্টের জন্য মেইলে নক করে। এরপরে কথা বলার সময় প্রিয়র ব্যাপারটা লুকিয়ে যায় বন্ধুর কাছে। তবে কথার ছলে অনেক কিছুই জেনেছে । এবং এখন পুরোপুরিই পরিষ্কার যে এই প্রিয়ই তার বন্ধুপুত্র । তারপরেও বাকিটুকু শিওর হবার জন্য প্রিয়কে ইন্টারররভিউ নেবার বাহানায় অন্য সবার সাথে না ডেকে একটু আলাদা করে সন্ধ্যার দিকে তার ফ্রী সময়ে আসতে বলেছে।
প্রিয় আসার পর থেকেই অবাক হচ্ছে সিদ্ধার্থের আচরণে। সিদ্ধার্থ তাকে বেশ আপ্যায়ন করেছে আসার পর থেকে। সচরাচর একজন চাকরি প্রার্থীর সাথে এমনটা করা হয় না তার জানা মতে। কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েও পারছে না। লোকটা বেশ অদ্ভুত স্বভাবের লাগছে তার কাছে। চাকরি বিষয়ক কথাবার্তা কিছু জিজ্ঞেস না করে কীসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
– তো , ইয়াংম্যান! কেমন লাগছে আমার রেস্টুরেন্ট তোমার? কি মনে হয় এখান থেকে আমার বিজনেস লং রানে আরো সাক্সেস করতে পারবে তো? তুমি বাংলাদেশি জেনে তাই খুব ভালো লাগছে আমার। আমি যদিও ইন্ডিয়ান তারপরেও বাংলাদেশের সাথে আমার নাড়ীর টান। কত কথা মনে পড়ে যায় জানো! কত বছর যাওয়া হয় না। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সিদ্ধার্থ।
– আপনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন কবে?
– অনেক বছর হয়েছে। ব্যস্ততাই পিছু ছাড়ে না। সেই ব্যাংকক থেকে ইতালিতে আসা পর্যন্ত কত গল্প কত কাহিনী। এত সহজ তো নয় সাক্সেসের মুখ দেখা।
– আপনি ব্যাংককে ছিলেন? খানিকটা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল প্রিয়।
– হ্যা , তোমার পরিচিত কেউ আছে কি ওখানে?
– আমার পরিচিত ঠিক না। আমার আম্মুর এক ফ্রেন্ড থাকে। ভালো করে তার চেহারা মনে নেই। আমি অবশ্য অনেকবছর আগে এক ঝলক দেখেছিলাম।
– তাই নাকি! আমি নয়ত আবার? ভালো করে দেখো তো! বলে হেসে উঠল সিদ্ধার্থ ।
– প্রিয় একটু নড়েচড়ে বসে বলল, আমি আসলে বললাম তো উনার ফেস আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে ওনার নাম ছিল সি… সিদ্ধার্থ না যেন শিহাব এমন কিছু হবে।
– সিদ্ধার্থ ব্যানার্জি না তো?
– মে বি এটাই নাম। আপনি জানলেন কী করে , স্যার? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল প্রিয়।
– কারণ সেই মানুষটিই তোমার সামনে বসা। নিজের নাম নিশ্চয়ই ভুল করার মতো বুড়ো এখনো হইনি।
প্রিয় এবার খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। এমনটা সে আশাই করেনি হয়ত।
– আপনিই সিদ্ধার্থ ব্যানার্জী? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল , প্রিয়।
– ইয়েস ,ইয়াং ম্যান! ভালো করে দেখো চিনতে পারো কি না! সেই যে আমার বিয়ের সময়ে আমাদের দেখা হয়েছিল। তুমি তখন বেশ ছোটো ছিলে । দাঁড়ি গোফ ভালো করে উঠেনি তখনও। আর এখন তো সময়ের পরিক্রমায় আমরা কত চেঞ্জ হয়েছি। আমার মাথায়ও চুল বলতে গেলে নেই। চামড়া কুচকে যাচ্ছে। আর তুমি তো এখন পুরাই ড্যাশিং ম্যান। আচ্ছা, এসব কথা পরে হবে । আগে চলো আমরা এখান থেকে বেরিয়ে একটু খোলামেলা পরিবেশে কোথাও বসি।
– না , মানে আংকেল!
প্রিয়কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর হাতখানা ধরে টেনে নিয়ে গেল বাইরে পার্কিং এরিয়ার দিকে। প্রিয় ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হত বিহ্বল যে কী বলবে বুঝতে পারছে না। চাকরির জন্য এসেছে তো এসেছে এই লোকের কাছেই আসতে হবে? এবার আর তার আম্মুর কাছে কিছুই অজানা থাকবে না আর এটা সে নিশ্চিত। ডিভোর্সের ব্যাপারটা এতদিন ধরে কত কায়দা করে চাপিয়ে রাখছে সে।
পার্কের যেদিকটায় মানুষজনের আনাগোণা কিছুটা কম ঠিক সেই দিকটায় একটা বেঞ্চে বসল দু’জন।
– আমাকে তোমার বন্ধু মনে করে সবকথা বলতে পারো , বাবা। আমি তোমার মায়ের বন্ধু মানে তোমারও বন্ধু। আমি আমার তিন মেয়ের সাথেও একদম বন্ধুর মতোই। ওর মায়ের থেকে ওরা আমাকে যেকোনো কথা শেয়ার করতে বেশি কম্ফোর্ট ফিল করে। আশা করছি তুমিও আমার সাথে কথা বলে আমাকে বুঝবে।
– না, মানে আংকেল , আসলে বুঝতে পারছি না । কী জানতে চাইছেন আপনি?
– প্রিয়, এতটুকু নিশ্চয়ই বোঝো যে আমি এতটা বোকা নই যে বিজনেস ম্যাগনেট সেলিম মালিকের ছেলে আমার রেস্টুরেন্টে সামান্য চাকরির জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে এটা সহজভাবে মেনে নিবো।
– আংকেল, ভাগ্যের চাকা কার কখন কোথায় ঘুরবে সেটা কে জানে বলেন! আচ্ছা , ওসব বাদ দিন তো ,প্লিজ!
– শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ তবে? বউ বাচ্চা কোথায়? তোমার সাথেই এসেছে নাকি ওখানেই রয়ে গেছে? অবশ্য এটা আজ হোক বা কাল হোক হবারই ছিল।
হুট করে এমন প্রশ্ন করায় প্রিয় একদম হতভম্ব। ইনি যে সবই তবে জানেন এটা আর তার বুঝতে বাকী রইল না। তাই ওনার কাছে আর লুকানোর কিছুই নেই।
– আম্মুর সাথে নিয়মিত কথা হয় আপনার?
– নিয়মিত হয় না , তবে মাঝেমাঝে হয়। আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু দাওনি।
– একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রিয় বলল, আমি একাই চলে এসেছি। ওরা ওখানেই থাকে।
– বউয়ের সাথে প্রবলেম নাকি শ্বশুর শ্বাশুড়ি?
– প্রিয় নিশ্চুপ।
– কথা বলছ না কেন? এবার ধমকের সুরে বলল , সিদ্ধার্থ। মনের কথা কারো শেয়ার করতে না পারলে দম ফেটে দেখবা কখন চিৎপটাং ! আমাকে বলো । আমি প্রমিজ করছি কারো কাছে বলব না। রুমপার কাছেও না।
– প্রিয় আস্তে করে বলল, ওর সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে।
– হোয়াট?
– জি।
– কিন্তু কবে আর কেন?
– আপনি তো সবই জানেন নিশ্চয়ই। যেহেতু আম্মুর সাথে কন্ট্যাক্ট হয় আপনার।
– কিছুটা জানি। বলো দেখি তোমার থেকেও শুনি।
– এনার সাথে এডজাস্ট হচ্ছিল না বেশ আগে থেকেই। চেষ্টা করেছিলাম সংসা্র টেকাতে। আমার ছয় বছরের ছেলে আয়াতের কথা ভেবে অনেক কম্প্রোমাইজ করার চেষ্টা করেছি। বাট ওর মধ্যে সংসার টেকানোর মতো কোনো মানসিকতাই ছিল না। একার চেষ্টায় আর কত পারা যায়, বলুন!
– হুউম! ডিভোর্স কি তুমি দিয়েছ? আর কেনই বা এমন একটা কাজ করেছ?
– নাহ, ওই দিয়েছে। আমিও সম্মানের সাথে ওর সিদ্ধান্তকে এক্সেপ্ট করেছি। ধরেবেধে সম্পর্ক রাখা যায় না। আমার সাথে সে থাকতে চায় না , কম্ফোর্ট ফিল করে না , দ্যাটস ইট! কী হয়েছে , কেন হয়েছে, প্লিজ! ওসবে আর না যাই। যার সাথে সম্পর্কই নেই তার খারাপ আর ভালো যে দিকই থাক সেটা নিয়ে চর্চা করাটা আসলে আমার পছন্দ না। তাছাড়া সে আমার সন্তান , আয়াতের মা। এই সত্যটা তো কোনোদিনই কোনো কিছু দিয়ে আমি মুছতে পারব না।
– বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তবে দেশে না যেয়ে এখানেই জব খুঁজছ কেন? তোমাদের এতবড় বিজনেস দেশে।
– আমি আয়াতকে ছেড়ে যেতে চাই না। আমি চলে গেলে ছেলেটাকে আর দেখতে পাব না। আপনার রেস্টুরেন্টে আমার ছেলে প্রায়ই আসে। এখানে আসা তার খুব পছন্দ । ক্লাস ছুটি হলে একবার এখানে ওর আসা চাইই চাই। ড্রাইভার নিয়ে আসে প্রতিদিন। আমি এখানে এসে ওর জন্য অপেক্ষা করি প্রতিদিন। সেদিন জানলাম আপনার লোক লাগবে তখন ভাবলাম আমি এখানেই কেন জয়েন করছি না। আমারও তো একটা জব দরকার ।
– কতদিন হলো ডিভোর্স হলো তোমাদের?
– দু’মাস।
– মা জানে?
– নাহ! জানলে আমাকে এখানে কিছুতেই থাকতে দিবে না সে। তাই বলিনি। এতদিন এনা আর আয়াতের দোহাই দিয়ে যাইনি। কিন্তু এখন কী বলব?
– আব্বু আম্মুর জন্য খারাপ লাগে না? তোমার আব্বু এত সিক! বিজনেস একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে তোমার এ নিয়ে কোনো হেডেক নেই? কেমন ছেলে তুমি?
– স্বীকার করছি ,ছেলে হিসেবে আমি খুব জঘন্য আমি জানি। এ জন্যই তাদের কাছে যাই না আমি। কী মুখ নিয়ে যাব ,বলুন!
– এটা কোনো কথা হলো? তারা কি বলেছে তুমি জঘণ্য? তারা তোমার অপেক্ষা করছে। তোমার মা কালকেও বলেছে , “এমন কোনো মিরাকল হতো যার ফলে আমার ছেলেটা আমার বুকে ফিরে আসত!” তুমি কি ভাবতে পারো তোমার মা বাবা কতটা ফিল করে তোমাকে?
– প্রিয় কোনো কথা বলছে না। তার চোখ ছলছল করছে।
– তুমি এতদিন কেনো যাওনি? তোমার ওয়াইফ চায়নি তাই? প্লিজ, লুকাবে না কিছুই। একবার মন খুলে কথা বলে দেখো তোমার ভালো লাগবে। সবকিছু সহজ মনে হবে।
– এমনিতেই যাওয়া হয়নি। কারো চাপে পড়ে যাইনি এটা বললে আসলে একটু বেশিই হয়ে যাবে! আমার নিজেরই যেতে মন চায়নি, তাই।
– বুঝেছি! মিথিলাকে হারানোর জন্য বাবাকে এখনো ক্ষমা করতে পারোনি , তাই তো!
এবার প্রিয় যেন কিছুটা হোঁচট খেলো। এসব কথাও তার আম্মু ইনার সাথে শেয়ার করেছে জেনে খুব রাগ হয় তার।
– না , তেমনটা নয়।
– আমার কাছে লুকানোর একদমই চেষ্টা করো না। আমি সবই জানি। মিথিলা কি তবে মনের কোণে এখনো কোথাও রয়ে গেছে তোমার?
– প্রিয় এবারও নিশ্চুপ।
– কথা না বলে এভাবে আর কতকাল? জীবন এত সহজ নয় , বাবা। একসময় দেখবে আর ভার বইতে পারছ না। তোমার মতো এমন একটা জীবন আমিও কাটাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমার জীবন সেট হবার পেছনে তোমার মায়ের অবশ্য অনেক অবদান । বাবা, একবারের জন্য মনের কথা বলে দেখো। দেখবা কত সমস্যা কত সহজ হয়ে গেছে!
– আংকেল, বলতে চাই কত কিছু। কিন্তু কাকে বলব ? কার বিরুদ্ধে বলব , বলুন! বুক ভরা চাপা কষ্ট নিয়ে এতটা বছর পার করেছি। দেখতে দেখতে বাকিটুকুও ফুরিয়ে যাবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, প্রিয়।
– সিদ্ধার্থ প্রিয়র হাত দুটি চেপে ধরে অশ্রুসজল চোখে প্রিয়কে বলল, বাবা! আমার কোনো ছেলে নেই। থাকলে হয়ত সেও আমার বন্ধু হতো! তার কষ্ট আমি ছুঁয়ে দেখতে পারতাম ! তোমার সাথে আমার এই ক্ষণিকের পরিচয় হলেও কেন যেন মনে হচ্ছে তোমার সাথে আমার কত জনমের পরিচয়। কেন এমন অনুভূতি হচ্ছে জানিনা। আমাকে তুমি মন খুলে তোমার মনের কথা শেয়ার করতে পারো । আমি তোমার অনুভূতির সাথে কোনো জোরাজুরি করব না, প্রমিজ!
– প্রিয় চোখের পানি মুছে বলল, আপনি তো সবই জানেন। আমার সাথে কত বড় ধোঁকা দেওয়া হয়েছিল আমারই পরিবার থেকে। পাগলের মতো একজনকে ভালোবেসেছিলাম আমি। না জেনে না বুঝে কখন এই ভালোবাসা হয়ে গেছে ভেবে নিজেই অবাক হয়েছি। অথচ মিথ্যা আভিজাত্যের দম্ভে আমার আব্বু আমাকে যেভাবে কষ্ট দিয়েছে আমি আজও সেটা সহজভাবে মেনে নিতে পারিনি। তাও শুরুর দিকে ভাবতাম সেটা আমার এক তরফা ভালোবাসা ছিল, মিল না হয়েছে বরং ভালোই হয়েছে। কিন্তু ধীরেধীরে আমি জানতে পারি মিথিলাও আমাকে পছন্দ করত! এবং এটা স্বয়ং আম্মুই বলেছে। সবকিছু যেদিন থেকে জেনেছি সেদিন থেকে কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম স্বাভাবিক হতে। আব্বুর পছন্দে বিয়ে করে সংসারী হতে চেয়েছি। সেখানেও সে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । এবার আর আমি মেনে নিতে পারিনি। এমন করে সারাজীবন তার একটার পর একটা অন্যায় আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমিও তো মানুষ! আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আব্বুর এত বেশি আধিপত্য আমি সহ্য করতে পারছিলাম না আর। নিজের কোনো স্বাধীনতা ছিল না, সেটা সংসারেই হোক বা ব্যবসায়।
– কিন্তু সে তো তোমার বাবা।
– তাতে কি হয়েছে? বাবা বলে কি সে আমার জীবনের নিয়ন্ত্রক! আমার সব সিদ্ধান্তে তাকে নাক গলাতে হবে? সারাজীবন এটাই করেছে আম্মুর সাথে! আম্মুকে আগে বোঝাতাম কিন্তু এখন বুঝতে পারি আম্মু কী করে এগুলি সহ্য করেছে।
– যা গেছে তো গেছে। তাই বলে সেই পেছনের কথা নিয়ে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার তো মানে নেই। বাবাকে মাফ করে দাও , বাবা। সে এখন অপারগ। তাকে তুমি দেখনি । দেখলে এই অভিমান পুষে রাখতে পারতে না।
– উনার এতই রাগ আমার প্রতি যে আজ অবধি আমার সাথে একটাবারের জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। আমি চাইলেও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। এই অসুস্থ অবস্থায়ও সে আগের মতোই রাগ পুষে বসে আছে। আমি তার অসুস্থতার খবর জেনে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম। সব ভুলে ছুটে যেতে চেয়েছিলাম তার পাশে। দুর্ভাগ্যবশত যেতে পারিনি। কিন্তু আমার মন পড়ে ছিল আব্বুর কাছে। অথচ আব্বু আমাকে একটাবারের জন্য বুঝল না। তাই বেশ তো! আমাকে যখন তার দরকার নেই , তবে সেখানে যেয়ে অযথা মায়া বাড়িয়ে আর লাভ কি!
– আরে বোকা! সেলিম সাহেবকে চিনলে না? উনি রাগ পুষে রাখেন নি। উনিও তোমার মতোই অভিমানী । ছেলের উপর অভিমান পুষে বসে আছে। তুমি একবার সামনে যেয়েই দেখো। তোমাকে বুকে টেনে না নিয়ে পারবেন না। মানছি উনি সারাজীবন অনেক অন্যায় করেছেন ,তার শাস্তিও সে অনেক পেয়েছে। আর কত শাস্তি দিবে? আর তোমার আব্বুর সাথে কোনো অন্যায় না করেই শাস্তি পাচ্ছে আমার বেচারা বন্ধু, তোমার আম্মু। তাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ? সে তো তোমার সাথে কোনো অন্যায় করেনি। ওই মানুষটার কি সারাজীবন একভাবেই যাবে? তোমার আব্বুর তো অনেক বদনাম করলে যে সে নাকি তোমার আম্মুর সাথে অন্যায় করেছে। কিন্তু আমার কথা হলো তুমি তোমার আম্মুর সাথে অন্যায় করছ না? তার চোখের পানি ঝড়াচ্ছ না? আজ তোমার ছেলে যে মাত্র ছয়টা বছর হলো এই দুনিয়ায় এসেছে , সেই ছেলের মায়ায় রেস্টুরেন্টে জব করতে চাচ্ছ। একবার ভেবে দেখেছ , তাদের এত বছরের মায়ায় আগলে রাখা সন্তান তাদের থেকে দূরে, তাহলে তাদের কি মায়া হয়না তোমার জন্য? তোমার ছেলে যদি ঠিক এমন কাজটিই করে কী করবে তখন ? একটু ভেবে উত্তর দিও।
এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। সৃষ্টিকর্তা যা করেছেন নিশ্চয়ই ভালোর জন্য করেছেন। মাথা ঠান্ডা করে ভাবো। বাংলাদেশে ফিরে চলো। ব্যবসায়ের হাল ধরো। মা বাবার পাশে দাঁড়াও। তোমাকে খুব দরকার তাদের।
প্রিয় খুব ইমোশনাল হয়ে পড়ছে সিদ্ধার্থের কথা শুনে। সে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি অন্যায় করেই যাচ্ছি প্রতিনিয়ত আমার আম্মুর সাথে, আব্বুর সাথে। এজন্যই নিজের চেহারা তাদের দেখানোর মতো মুখ আর আমার নেই।
– এসব ঘুরানো প্যাঁচানো কথা বাদ দিয়ে বলো , তুমি বাংলাদেশে ফিরছ নাকি ফিরছ না? হ্যা এং না তে উত্তর দিবে।
– না মানে … যাবো মানে …তবে আমার আয়াতকে কী করে দেখব?
– কী স্বার্থপর তোমরা ! পারোও বটে। যে মা বাবা রক্ত পানি করে তোমাকে এত বড় করল তাদের জন্য না ভেবে ছয় বছরের ছেলের জন্য ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছ। তোমার ছেলে তোমাকে ক’দিন না পেলেই ভুলে যাবে। ওর বাবা পাশে না থাকলেও ওর কিছু আসবে যাবে না। বাবার আদর নিয়ে এই বয়সের বাচ্চাদের অত আদিখ্যেতা নেই। আর তোমার ওয়াইফ সরি এক্স ওয়াইফ তো আছেই ওর সাথে। তুমি দূরে বসে কী আর করতে পারবা। ওকে বরং স্বাধীনভাবে মানুষ হতে দাও। তোমার ছেলে সারাজীবন সে তোমারই থাকবে। কিন্তু এই মানুষ দু’জন কখন চলে যাবে তখন আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না তোমার। তাছাড়া তোমার দাদী যে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে সেও আজ মৃত্যুপথযাত্রী। বয়সের ভারে বিছানায় শয্যাশয়ী। অথচ তোমাকে এক নজর দেখার জন্য ছটপট করছে। তোমার অভিমানের পাল্লা কি এই মানুষগুলির ভালোবাসার থেকেও ভারী? জীবন তোমাকে একটা সুযোগ দিয়েছে সেটাকে হেলায় হারিও না। আর সুযোগ নাও দিতে পারে।
– প্রিয় নিশ্চুপ।
– বাবা, আজ সারারাত ধরে ভাবো। দেখো কি সিগ্ন্যাল দেয় তোমার ব্রেইন! আমার কথাগুলি শুধু মনোযোগ সহকারে ভাবনায় এনো আবার।
চলবে…