সুখের সন্ধানে পর্ব-৪৬+৪৭

0
432

#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪৬
মিথিলা পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে রূম্পা মায়ের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল । এখানে সে তাকে নিয়ে আগেও কয়েকবার এসেছে। সে এদিক সেদিক তাকাতেই খেয়াল করল একজন নার্স ওই রুম থেকে বেরিয়েছে। এই নার্সকে সে আগে থেকেই চিনে। মিথিলা সেদিকে দ্রুত এগিয়ে গেল।
নার্সকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, পেশেন্টের টেম্পারেচার প্রচণ্ড বেশি। এখনো সেন্সলেস। আমরা ট্রিট্মেন্ট শুরু করে দিয়েছি। ভয়ের কিছু নেই। ওনার ব্লাড স্যাম্পলও নেয়া হয়েছে অলরেডি। ডাক্তার আর কিছুক্ষণ অবজার্ভ করলেই বুঝতে পারবে আসলে কী হয়েছে।

মিথিলা তড়িঘড়ি করে কেবিনের ভেতর ঢুকল। রূম্পা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কান্না চলে আসছে। কেমন ফ্যাঁকাসে হয়ে আছে মুখখানা। আহারে! মায়ার বাঁধনে আঁকা মুখখানি যেন তার হৃদয়কে তোলপাড় করে দিচ্ছে।
কাছে গিয়ে একটা হাত চেপে ধরে বসে পড়ল। ডাক্তার কীসব ইঞ্জেকশান না স্যালাইন পুশ করছে তাকে। মিথিলা ঘাবড়ে যেয়ে ডাক্তারকে বলল, আমার মা সুস্থ হবেন তো!

– ভয় পাচ্ছেন কেন? সাহস রাখেন। আমরা চেষ্টা করছি। টেম্পারেচার একটু কমলেই জ্ঞান ফিরিবে , ইন শা আল্লাহ!

– ইন শা আল্লাহ!
ডাক্তার নার্স রুম থেকে বেরিয়ে গেলে মিথিলার হঠাৎ মাথায় আসলো , রূম্পা মাকে এখানে নিয়ে এল কে? নিশ্চয়ই বাসার কোনো সার্ভেন্ট বা ড্রাইভার এনে রেখে গেছে। হায়রে নিয়তি! যে সন্তানের মঙ্গলের কথা ভেবে সে নিজের সব অপমান সহ্য করে স্বামীর সংসারে এত বছর কাটিয়ে দিয়েছে সেই সন্তান আজ তার কথা মনে রেখেছে কিনা সন্দেহ! সে আজ থাকতেও নেই। এমন কুলাঙ্গার সন্তান থাকার চাইতে না থাকাই ভালো। মিথিলার মন চাচ্ছে একবারের জন্য যদি প্রিয়কে সামনাসামনি পেত তবে জিজ্ঞেস করত , “এত বড় অমানুষ হলি কী করে ? যে মা বাবা পেলেপুষে এত বড় করেছে তাদেরকে ছেড়ে বউ আর শ্বশুর শাশুড়ি এত প্রিয় হয়ে গেল?”
এমন হাজারো কথা ভাবতে ভাবতে রাগে ফেটে পড়ছে সে। ঠিক সেই সময়ে রুমে ঢুকল , প্রিয়। প্রিয় ঢুকেই খেয়াল করল কেউ একজন তার মায়ের পাশে বসা। একটু অবাক হলো। সে তো কাউকে খবর দেয়নি। কে এল? মাত্রই বিল কাউন্টারে যাবার সময়েও তো কেউ ছিল না। সে মিথিলার পেছন বরাবর দাঁড়িয়ে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, এক্সকিউস মি!

মিথিলা হুট করে পুরুষালি কণ্ঠে খানিকটা ঘাবড়ে যেয়ে পেছনে ফিরল। ফিরতেই সে চোখ নামাতে পারছে না আর! সে স্বপ্নে টপ্নে দেখছে না তো! নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না একদমই। সে ভাবল , এতক্ষণ ধরে প্রিয়কে গালাগাল করে গোষ্ঠী উদ্ধার করছিল বলে হয়ত সে জেগে জেগেই স্বপ্ন দেখছে। নাকি প্রিয়র ভূত দেখছে সে?

– মিথিলা তুমি! মনের অজান্তেই বলে ফেলল, প্রিয়!

– ভ…ভা…ভাইয়া… ত…তু…মি ?

– হুম, আমি। তুমি কখন এলে? কেমন আছ? কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, সে।

– ভ…ভালো! কিন্তু?

– আগে বসো। ভয় পাবার কিছু নেই । আমিই। আমার ভূত টুত না। বসো , সব বলছি।

মিথিলা আর কিছু না বলেই আজ্ঞাবহ ছাত্রীর মতো বসে পড়ল । কিন্তু তার চোখের নজর এখনো প্রিয়র ওপর থেকে সরেনি।

– আমি আজই এসেছি। আম্মু মনে হয় তোমাকে আমার কথা কিছুই বলার সুযোগ পায়নি। আর বলবেই বা কখন? আসতে না আসতেই আম্মুর কী হলো দেখো!

মিথিলার ঘোর আস্তে আস্তে কাটছে। সে বুঝতে পারছে সে স্বপ্নের দুনিয়াতে না বাস্তবেই আছে। আর তার সামনে দাঁড়ানো জলজ্যান্ত মানুষটি আর কেউ নয় প্রিয়ই।
– কেমন আছ, ভাইয়া? এই তোমার আসার সময় হলো? অভিমান ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, মিথিলা।

মিথিলার চোখের কানায় কানায় ঠাঁসা নোনাপানি। সে অবাক হলো আবার লজ্জাও পেল। এতক্ষণ যার উপরে রাগ করে পিণ্ডী চটকালো আর এখন কি না সব ভুলে বরফের মত গলতে শুরু করেছে! এর কারণটা সে বুঝতে পারছে না। প্রিয়কে নয়ন ভরে দেখছে সে।
কিন্তু পিছে প্রিয়র কাছে ধরা পরে না যায় তাই নিজেকে লুকাতে প্রাণপণ চেষ্টা তার। কিছুতেই স্বরূপে ফিরতে চায় না প্রিয়র সামনে। না হলে কী ভাববে তাকে নিয়ে প্রিয়!

গোপণে চোখের কোণ মুছলেও প্রিয়র সেটা নজর এড়াল না। সে নিজেও এতবছর পর মিথিলাকে দেখে খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মিথিলাকে সেটা বুঝতে দেয়নি কোনোভাবেই। তার চোখজোড়াও যেন এই মুখখানি দেখার জন্য বছরের পর বছর বড় তৃষ্ণার্ত ছিল।

– তুমি কখন এলে বললে না তো!
– এই তো মিনিট দশেক হবে! কী হয়েছিল রূম্পা মায়ের?
– আমি নিজেও জানি না। দুপুরে আমার জন্য কত কী করল! বিকেলে দাদীকে নিয়ে হসপিটালেও গিয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই কিচেনে যেয়ে সেন্সলেস হয়ে পড়ে যায়। আমি ঘুম ছিলাম। শাউটিং শুনে লাফিয়ে উঠি। য়াম্মুর এই অবস্থা দেখে তো আমার হাত পা কাঁপা শুরু হয়। খুব ভয় পেয়ে যাই। আম্মুর গায়ে হাত দিতেই দেখি আগুনের তাপে গা পুড়ে যাচ্ছে যেন! এরপর তো দেখছই। ডাক্তার বলেছে খুব তাড়াতাড়িই তারা বুঝতে পারবে আসলে কী হয়েছে। আম্মুর সাথে কথা বলতে পারলে ওনাদের জন্য সহজ হতো! আব্বুর কাছে যতটুকু জেনেছি তাতে মেবি আরো দু’চারদিন আগে হতেই আম্মু মাথা ব্যথা , জ্বর জ্বর এমনটা বলছিল। ডাক্তারকে সেটা বলেছি। সবকিছু দেখে আর শুনে প্রাইমারিভাবে তারা ডেঙ্গুর সন্দেহ করছে! বলছে প্লেটলেট হয়ত কমে গিয়েছে খুব। ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে গেছে আগেই। তাছাড়া আম্মুর দাঁতের গোড়া থেকে ব্লিডিং হচ্ছে হালকা। রিপোর্ট আসলেই জানা যাবে সবকিছু।
– ওহ আল্লাহ! এত খারাপ অবস্থা এতদিন ধরে অথচ একটা বারের জন্য আমাকে বলল না। আমি জানলে তখনই এসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসতাম। মানুষটা এত বেখেয়ালি নিজের ব্যাপারে। সবার সবকিছু নিয়ে তার মাথাব্যাথার শেষ নেই অথচ নিজের বেলায় অবহেলার অভাব নেই। আমি বলেছি , কতবার বলেছি, তুমি মরবে , এমন করতে করতে ঠিক একদিন কিচ্ছু না বলেই উড়াল দিবে! একটা কথা শোনে না আমার। সময়মত প্রেসারের ওষুধটা পর্যন্ত খায় না। বিপি এত ফ্লাকচুয়েট করে। অথচ তার কোনো মাথাব্যাথা নেই এসব নিয়ে । বলে আমি এমনিই সুস্থ হয়ে যাব। যা মন চায় করুক , আমার কী! কী আর হবে ? বড়জোর মরেই তো যাবে? ওটা সহ্য করার মতো ক্ষমতা আমার আছে। রাগের সাথে কথাগুলি বলতে বলতে কেঁদে ফেলল , মিথিলা। সে দু’ হাতে রূম্পা মায়ের মুখখানা চেপে ধরে মাথাটা ঝুঁকে বাচ্চাদের মতো আদর করছে ।

মিথিলার কথাগুলি প্রচণ্ডভাবে লাগে প্রিয়র বুকে! সে শুধু ভাবছে , “তার জন্মদাত্রী মা! অথচ সে এভাবে কখনোই ভাবেনি মায়ের জন্য। দূরদেশে চলে গিয়েছে অভিমান করে। একবারের জন্যও ভাবেনি এই মানুষ দু’টির কী হবে? কে তাদের ভালো মন্দের খেয়াল রাখবে? শুধু কাড়িকাড়ি টাকা থাকলেই চলে না। আপনজনের পরশের উপরে আর কিছুই নেই। তাদের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় সে তাদের ফেলে দূরে চলে গেছে । অথচ এই মানুষ দুটি না থাকলে এই পৃথিবীর আলো বাতাস সে কী করে দেখত! মিথিলা পেটের সন্তান না হয়েও কত ভাবে আর সে কি না এমন কুলাঙ্গার সন্তান যে দিন শেষে একটা কল করে হাই হ্যালো করেই দায়িত্ব শেষ করেছে বলে মনে করেছে। কখনো তাঁদের মনের গহীনে যেয়ে স্পর্শ করার সাহস করেনি ।

সে মিথিলাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এসে মিথিলার মাথায় হাত রাখল। তার নিজের চোখ জোড়াও যেন নোনাবাণের ঢেউয়ে উপচে পড়ছে।

– আম্মু , ঠিক হয়ে যাবে, দেখো! আল্লাহ আমার প্রতি এতটা নির্দয় নিশ্চয়ই হবেন না। এত বছর পরে আম্মুর বুকে ফিরে এসেছি । সেই ঠাই তিনি এভাবে পাওয়ার আগেই কেড়ে নিতে পারেন না।

রাত বারোটার দিকে হুশ এলো রূম্পা্র। জ্বরও কিছুটা কমেছে। মিথিলা এক নাগাড়ে পাশে বসে দোয়া দুরুদ মনে মনে আওড়াতেই আছে। একটু সুস্থ বোধ করলে ধীরে ধীরে টুকটাক কথা বার্তা হলো দু’জনের। এরপর কিছুক্ষণের মাঝেই আবার ঘুমিয়ে যায় সে।

– খুবই দুর্বল লাগছে , আম্মুকে তাই না!
মিথিলা বাইরের চেয়ারে বসে আছে। এ কথা শুনে ফিরে তাকাল সে। প্রিয় বেশ কিছুক্ষণের জন্য কই যেন গিয়েছিল। হয়ত কোনো বিল সংক্রান্ত ঝামেলা মেটাতে । মিথিলা কিছু বলার আগেই পাশের চেয়ারটিতে বসল, প্রিয়।

মিথিলা মাথা নেড়ে বলল, হুম! ডাক্তার বলেছে ভয় কেটে গেছে। সেন্স যখন ফিরেছে আর কোনো ভয় নেই। প্রপার ট্রিট্মেন্ট পেলে দ্রুতই সুস্থ হয়ে যাবেন , ইন শা আল্লাহ!

আল্লাহর অশেষ রহমত! রিপোর্ট হাতে পেলেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে । আচ্ছা, তুমি তো কিছু খেলেই না। চলো হালকা পাতলা কিছু খেয়ে আসি। তাছাড়া এক কাপ চা খাওয়াও দরকার।

– আমার ক্ষিধে নেই , ভাইয়া। তুমি খাও।

– বললেই হলো। সাজগোজ দেখে তো মনে হচ্ছে কোনো দাওয়াত এটেন্ড করতে যেতে চেয়েছিলে। বহু সময় পেটে কিছু পড়েনি নিশ্চয়ই। চলো কিছু খাই। আম্মুর পাশে এখন তো আমাদের যেতে দিবে না। আম্মু সুস্থ হয়ে যদি জানতে পারে তার আদরের মেয়েকে আমি এত সময় অবধি না খাইয়ে রেখেছি তবে আমাকে কি আস্ত রাখবে ভেবেছ!

– আচ্ছা, চলো ! এক কাপ চা খাব শুধু। যাতে ঝিমুনির ভাব না আসে।

– ওকে!

চা খেতে খেতে প্রিয় বারবার মিথিলার অগোচরেই তার দিকে তাকাচ্ছে আর ভাবছে সেই আগের মতই সুন্দর আছে মিথিলা। অথচ এই বয়সেই কত বড় তুফান সামলেছে । জীবনটা যেন থমকে আছে মেয়েটার।
– কোথায় গিয়েছিলে নাকি যেতে চেয়েছিলে বললে না যে? অবশ্য আপত্তি থাকলে জোরাজুরি নেই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, প্রিয়।

– এক ফ্রেন্ডের সাথে ডিনার পার্টিতে যাবার প্লান ছিল।

– ওহ! বয় ফ্রেণ্ড ?

– আরেহ না, জাস্ট ফ্রেন্ড! তুমি তাকে চিনবে! আইমান! আমার কাজিন! ওই যে ভার্সিটিতে বড় ভাই ছিল । তুমি একদিন ঝগড়া বাঁধিয়েছিলে মনে পড়ে?

– কিছুক্ষণ চেষ্টা করতেই মনে পড়ল প্রিয়র। সে বলল, হুম। মনে পড়েছে। আইমান তো ভালো মানুষ না। ওর সাথে কেন?

– এই দুনিয়ায় কে ভালো আর কে মন্দ এটা বোঝাই তো দায়! ওপরের চেহারা দেখে আমরা কখনো কী বুঝি ভেতরে কার কী চলছে?ওপর থেকে দেখে কাউকে ফেরেশতা মনে করে ভুল করে ফেলি আবার কাউকে মনস্টার!
আইমান অনেক বদলে গেছে । এখন বেশ গোছানো স্বভাবের একজন মানুষ। দেখলেই বুঝবে। মোটেই আগের মতো নেই।

– প্রিয় নিশ্চুপ। কী বলবে বুঝতে পারছে না। কথাগুলি যে তাকে খোঁচা মেরেই বলেছে এটা সে নিশ্চিত।

– আচ্ছা, একটা ব্যাপার অনেক সময় ধরে খেয়াল করেছি , তুমি আমাকে ‘তুমি’ করে বলছ সেই সন্ধ্যা থেকেই। ব্যাপার কী বলো তো! আগে তো তুই বলতেই অভ্যস্ত ছিলে। নাকি তোমার বউ কোনো নির্দেশনা জারি করেছে?

– এতক্ষণে প্রিয়রও ব্যাপারটা মাথায় এলো। এতদিনের ব্যবধানে একদম ভুলতেই বসেছিল! সে বলল, অনেকদিন পরে দেখা তো! তাই হুট করে তোমাকে তুই বলতে খুব শাই ফিল করছিলাম। আর কিছুই না।

– বাই দ্যা ওয়ে! আমার সুন্দরী ভাবি কোথায়? বাসাতে নিশ্চয়ই?

– হুম! বাসাতে।

মিথিলার মনের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু কেন এটা সে জানে না।

– ভাবির অসুবিধা হচ্ছে না তো বাসাতে? তুমিও এখানে , রূম্পা মাও এখানে। ওদের টেইক কেয়ার হচ্ছে তো ?ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিও আর খেয়াল রেখো। নইলে আবার তোমার বারোটা বাজিয়ে দিবে দেখো।

– আরে না! ওরা তো আসেনি।

– বললে যে বাসায়?

– আরে সে তো ইতালির বাসায়।

– ওহ!

– গতকাল এলো না যে?

– আসবে নেক্সট টাইম। আচ্ছা , ওসব বাদ দাও। এবার বলো কেমন কাটছে সারাক্ষণ? এরপরে কিছুক্ষণ থেমে প্রিয় বলল, আমি সরি , মিথিলা! তোমার এমন দুর্ঘটনার সময়ে আমি আসতে পারিনি। জানো ,আজও সাজিদের মুখখানা স্পষ্ট হয়ে আমার চোখের সামনে ভাসছে। উফ!

– ওসব কথা বাদ দাও , প্লিজ! আমি সেই দুঃসহ স্মৃতি মনে করতে পারছি না।

– সো সরি! আমি একটু ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। প্লিজ, মাফ করো!

– ইটস ওকে! কতদিন থাকছ এবার?

– সবাই মনে হচ্ছে আমাকে তাড়াতে পারলেই বাঁচো ! আব্বুও সেম প্রশ্ন করল আসতে না আসতেই।

– সেটা কখন বললাম? আংকেলও তুমি যা ভাবছ তা বলতে চায়নি হয়ত।

– হুউম, মেই বি। আছি, বেশ কিছুদিন থাকব ভাবছি। আসতে না আসতে আম্মুর যে অবস্থা হলো! ঘরে আগে থেকেই দু’জন পেশেন্ট আছে তার মধ্যে এবার আম্মুও। কে কাকে দেখবে আমার মাথায় আসে না।

– দেখার কথা তো তোমার। দেশে ফিরলেই পারো! মানুষগুলিকে আর কষ্ট না দিয়ে পারা যায় কি না দেখো। অবশ্য তোমার বউ যদি পারমিশান দেয় তবে!

– কথায় কথায় এত বউ বউ করছ কেন? বাদ দাও তো! চলো, আম্মুর কাছে ফিরে যাই। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল!

– হুউম, চলো। দেখি রিপোর্ট সব এলো কি না!
কেবিনে পৌঁছাতেই নার্স জানাল ডাক্তার তার কেবিনে তাদের ইমিডিয়েট দেখা করতে বলেছে। প্রিয় আর মিথিলা বেশ ভয় পেয়ে গেল, খারাপ কিছু না তো!

ডাক্তারের রুমে বসতেই ডাক্তার ফাইলটা হাতে নিয়ে বলল, দেখুন ! আপনার আম্মুর কিছু রিপোর্ট চলে এসেছে। সমস্যা বেশ গুরুতরই । তবে ভয় পাবার কিছু নেই। আমাদের কাছে যখন এসেছেন সুস্থ হয়ে যাবে , ইন শা আল্লাহ! তবে আগেই এডমিট করতে পারলে ভালো হতো! এত সিরিয়াস পর্যায়ে পৌঁছাত না। উনার ডেঙ্গু পজিটিভ। আমরা যেটা ভেবেছিলাম! প্রথম তিনদিনের মধ্যে টেস্ট করলে রোগ আইডেন্টিফাই করতে এত জটিলতা হতো না। উনি বেশ ক্রিটিকাল স্টেজ মানে শক ফিভারে চলে গেছেন। ব্লিডিং তো হচ্ছেই , শরীরের কয়েক জায়গায় কালো ছোপ ছোপ রক্তজমাট বেঁধেছে। পালস আর প্রেসারও ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। প্লেটলেট ফরটি থাউজ্যান্ডের মতো যেটা থাকার কথা দেড় লাখের উপর। বুঝতেই পারছেন ওনার সিচুয়েশান! এটা আরো নেমে যেতে মুহুর্তও সময় লাগবে না। এটাই ভয় পাচ্ছি। তবে উঠতেও বেশি সময় লাগে না যদি ইম্প্রুভমেন্ট শুরু হয় একবার। উনার আরো কিছু জটিলতা আছে। ভয় পাচ্ছি কিছুটা যাতে কোনো অঘটন ঘটে না যায়! তবে আমরা চেষ্টা করছি এবং আমরা খুব আশাবাদী।
প্রিয় আর মিথিলা দু’জনেরই মুখ ফ্যাঁকাসে হয়ে গেছে ডাক্তারের কথাবার্তা শুনে। কী বলছে এসব? প্রিয় থরথর করে কাঁপছে মনে হলো। মিথিলারও একই অবস্থা। সে প্রিয়কে দেখে ঘাবড়ে গেল। নিজেকে নিয়ে ভাবাভাবির সময় নেই। সে প্রিয়র হাতখানা চেপে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে নাকি নিচ্ছে নিজেও জানে না।
প্রিয় কোনোরকম নিজেকে সামলে করে বলল,আম্মু ঠিক হয়ে যাবে তো ?
– ইন শা আল্লাহ! তবে ব্লাড ডোনার রেডি করেন। ওনার গ্রুপ ‘ বি পজিটিভ’। আপনারা ম্যানেজ করতে না পারলে আমরা আমাদের ব্লাড ব্যাংক থেকে দিব। তিন চার ব্যাগ ব্লাড রেডী রাখতে হবে। প্লাজমাও দিতে হতে পারে।

– আমার সেম গ্রুপ। আমার থেকে নিন, প্লিজ! বলল, মিথিলা।

– আরো ডোনার লাগবে তবে!

– আমি ম্যানেজ করে দিচ্ছি এখনই। আমার পরিচিত কয়েক জনেরই আছে। ওরা এখনই আসতে না পারলে তবে ব্লাড ব্যাংক থেকে নিতে হবে। আপনি শুধু আমার রূম্পা মাকে বাঁচান , প্লিজ! বলতে বলতে চোখের পানি আর সামলাতে পারল না , মিথিলা।

প্রিয়র খুব অসহায় লাগছে। তার ব্লাড গ্রুপ ‘এ পজিটিভ’ । তার বাবার সাথে ম্যাচ করেছে। মায়ের জন্য কিছুই করতে পারছে না ! কেমন অধম সন্তান সে!

চলবে…

#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪৭

ব্লাড দেওয়ার কারণে কিছুটা দুর্বল লাগছে মিথিলার। বারবার করে প্রিয় তাকে বাসায় যেতে অনুরোধ করেছে কিন্তু মিথিলার একটাই কথা , “রূম্পা মাকে এখানে রেখে আমি বাসায় যেয়ে শান্তিতে থাকতে পারব না। তার চেয়ে বরং এখানেই থাকি। মনে তো শান্তি মিলবে। “
রুম্পাকে আইসিউতে শিফট করা হয়েছে। অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল । মেহরাব বারবার ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে। মাত্র ক’দিন আগেই ছুটি কাটিয়ে গেছে তাই কিছুতেই আর ছুটি ম্যানেজ করতে পারেনি সে। কিন্তু তার স্ত্রী আশা বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকা আসছে। সেলিমও এসে একবার দেখে গেছে। প্রিয়কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে রুম্পার এমন অবস্থা দেখে। সবাই যে যার মতো দোয়া করে যাচ্ছে। সকাল থেকে কতজন এসেছে রুম্পাকে দেখতে । সেলিমের দিকের , রুম্পার দিকের আত্মীয় স্বজন অনেকেই আসছেন। যেই আসছে সেই প্রিয়কে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ছে। প্রিয়কে যে যার মতো জ্ঞান দেয়ার বাহানায় দু’চারটা বেশি কথা শুনিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। প্রিয়ও মাথা নিচু করে সবার কথা শুনছে। প্রিয়র চাচা চাচী প্রিয়কে দেখে সব চাইতে বেশি অবাক হয়েছে । তবে অবাক হয়েছে নাকি দুশ্চিন্তায় পড়েছে এটা অবশ্য বুঝতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে প্রিয়র।
প্রিয়র এখন এওসব পারিবারিক পলিটিক্স নিয়ে ভাববার সময় নেই সে ভুগছে বিশাল অপরাধবোধে। তার শুধু মনে হচ্ছে সবাই তো ঠিকই বলছে তার মায়ের এমন অবস্থার পেছনে সেই দায়ী। সময়মতো যদি ডাক্তারের কাছে আনতে পারত তবে হয়ত এত সিরিয়াস পর্যায়ে পৌঁছাত না। কিন্তু কী করে আনবে? সে তো অভিমানের রাজ্য গড়ে দূর দেশে বছরের পর বছর রাজত্ব করে গিয়েছে। এই মানুষটি যে তার জন্য সারাজীবন কত কত স্যাক্রিফাইস করেছে তার কথা ভাববার কথা একটাবারের জন্য মনে আসেনি তার। জীবনে কত চাওয়া পাওয়া থাকবে। কোনোটা পূর্ণ হবে , কোনোটা পূর্ণ হবে না তাই বলে আপন মানুষের উপর অভিমান করে বছরের পর বছর দূরে থেকে তাদের কষ্ট দেবার মানে নেই। এত দেরীতে হলেও যে তার হুশ ফিরেছে এজন্য উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ দেয় মনে মনে। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করল , যত যাই হোক এই মানুষ দুটিকে ছেড়ে সে আর কোথাও যাবে না। জীবনের বাকীটা সময় এদের কাছেই কাটিয়ে দিবে। ভালোবাসায় আগলে রাখবে প্রতিটি মুহূর্ত। “

প্রিয়র চোখজোড়া ছলছল করছে। সে যে কতটা অন্তর্জালায় জ্বলছে প্রিয় কিছু মুখে প্রকাশ না করলেও সেটা বুঝতে পারছে মিথিলা। সে প্রিয়র পাশে এসে বসে। তাকে সান্ত্বনা দেবার মতো রুচি তার নেই তবুও প্রিয়র মুখের দিকে তাকালে নিজের ভেতরের কাঠিন্যভাবটাকে আর ধরে রাখতে পারে না। কেমন যেন এক মায়া মাখা ওই মুখখানাতে। কিছুতেই ভেতরের জমে থাকা রাগটাকে ঝাড়তে পারে না সে। আস্তে করে সে বলল,

– চিন্তা করো না, ভাইয়া। রূম্পা মা সুস্থ হয়ে যাবেন , ইন শা আল্লাহ! ডাক্তার কী বলেছেন শোননি! আর আমরা সবাই খুব দোয়া করছি। মায়ের জন্য আমরা সন্তানেরা আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছি। রূম্পা মায়ের মা সমতুল্য শাশুড়ি চোখের পানি ঝড়াচ্ছেন, আংকেল কত এতিম মিসকিন খাওয়াচ্ছে্ন, দান খয়রাত করছেন। আল্লাহ আমাদের ডাক না শুনে পারবেন না। বান্দা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উপরওয়ালাকে স্মরণ করলে সে ডাক না শুনে পারবেই না। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

– সেটাই যেন হয়। আমার ভুলের শাস্তি আমি এভাবে চাই না। আল্লাহ আমাকে শেষবারের মতো আর একটা সুযোগ দিক। আমি আর কোনো ভুল করতে চাই না। এতদিন পরে আম্মুকে পেয়েও আবার হারানোর কষ্ট আমি নিতে পারব না। বলতে বলতে মিথিলার হাতজোড়া চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল ,প্রিয়।

– কেঁদে আর কী হবে বলো। শান্ত হও। ভুল থেকেই মানুষ শিখে। তুমি ভুল করেছ এটা যখন বুঝতে পেরেছ তবে একই ভুল আর করবে না আমার বিশ্বাস। এই মানুষ তিনটা তুমি ছাড়া কত যে অসহায় সে তুমি নিজের চোখে না দেখলে বুঝতে পারবে না। আজকের কথাই ভাবো! আজ তুমি ছিলে বলে রূম্পা মাকে নিয়ে এসেছ সময়মত! তুমি না থাকলে বাসার কোনো সার্ভেন্ট হয়ত নিয়ে আসত! তারা কী তোমার মতো করে সবকিছু ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারত? কখনোই না। টাকা থাকলেই সব হয় না , ভাই। এই অসহায় মানুষ তিনটার তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন, ভীষণ । জানো, আমি যখন তোমাদের বাসাতে যাই কী যে খুশির ঝলক দেখি মানুষগুলির মুখে ,তুমি যদি দেখতে! অসহায়ের মতো পড়ে থাকে তিনটা মানুষ। কারো জন্য তাদের অপেক্ষা নেই। যথানিয়মে রাত হয় ভোর হয়, এই তো তাদের রুটিন। নিরানন্দ আর একটা পানসে জীবন চলছে জীবনের নিয়মে। তিনজন মানুষের মধ্যে দু’জন মানুষই অসুস্থ। চয়াফেরা করতে তাদের সারাক্ষণ কারো না কারো হেল্প প্রয়োজন। রূম্পা মাও ডায়াবেটিকস, হাই প্রেসার , বাতের ব্যাথা আরো কত সমস্যায় ভুগছে! তোমাকে হয়ত এর কিছুই জানায় না। মা কতটা চাপা স্বভাবের তা তো তোমার অজানা নয়। কারণ তুমি যদি অভিমানের সাগর জমিয়ে দেশ ছেড়ে থাকো তবে তাদের অভিমানের পরিমাণ মহাসাগরকেও হার মানাবে!

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মিথিলা কিছুটা থেমে আবার বলল, এই তো এদের এভাবেই চলছে। ডাক্তার আর মেডিসিন এই নিয়েই তাদের জীবন। রূম্পা মায়ের মাঝে কী যে এক অস্থিরতা কাজ করে সারাক্ষণ! আমি যখন চলে আসতাম সেই মুহূর্তে এদের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যেত আবার। আমি যতটুকু সময় থাকতাম চেষ্টা করতাম হাসি আনন্দে সময়টুকু কাটানোর। মাঝে মাঝে সময় সুযোগ হলে একটু বাইরে খোলা হাওয়ায় নিয়ে যেতাম । হুইল চেয়ারে বসেও আংকেল আর দাদীর চেহারার মাঝে যে উচ্ছ্বাসটুকু দেখতাম দেখে মনে হতো খাঁচায় ছটপট করতে থাকা বন্দী পাখি নীল আকাশের বুকে ডানা মেলে উড়ছে। আর রূম্পা মা তো যেন কিছু সময়ের জন্য হাফ ছেড়ে বাঁচত ! দায়িত্বের বেড়াজালে বন্দী হয়ে দম বন্ধ হয়ে ছটপট করতে থাকা ডানাভাঙা পাখি যেন।
– প্রিয় চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, ও বাড়ি থেকে তোমার সাথে এত অন্যায় হওয়ার পরেও তুমি এই মানুষগুলিকে কত যত্নে আগলে রেখেছ সাধ্যের সবটুকু দিয়ে। আর আমি আমার দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছি সারাক্ষণ। কী নীচ আমি! তোমাকে ধন্যবাদ দিতে গেলেও হয়ত অকৃতজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে যাব আমি। তবে তুমি আমার আম্মু আব্বু আর দাদীর জন্য যা করেছ সেটার ঋণের বোঝা আমি কোনোদিনই শোধ করতে পারব না। আর চাইও না। কিছু কিছু ঋণের বোঝা বয়ে চলাতেই বুঝি বেশি কৃতজ্ঞতা! চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল, প্রিয়।

– এসব বলে আমাকে পর করে দিচ্ছ, ভাইয়া। আমার কি কিছু হয় না তোমার আম্মু , আব্বু আর দাদী। আমি আসলে যা করেছি আমার ভালো থাকার জন্য করেছি। আমিও তো তাদের মতোই একটা জীবন পার করছি। সঙ্গিহীন , নিরানন্দ একটা জীবন চলছে গতিহীনভাবে। এই জীবনে এই মানুষ তিনটিই এখন আমার সবচেয়ে বড় আপনজন। সারা সপ্তাহ ছটপট করতে থাকি কখন উইকেন্ড আসবে আর আমি ছুটে যাব আমার সুখ খুঁজতে । এদের কাছে আসলে মনে হয় কিছু সময়ের জন্য জীবনের সব কষ্ট ভুলে গেছি। ভালোবাসায় জড়াজড়ি করে কাটিয়েছি কিছু মুহূর্ত! তুমি থাকলে হয়ত এভাবে যাওয়া হতো না আমার। তোমার বউ তো আমাকে একদমই সহ্য করতে পারত না। হয়ত ভুলেই যেতাম ও বাড়ির পথ আর ঠিকানা। সেই হিসেবে বলব , তোমার কাছেই বরং আমি কৃতজ্ঞ। তুমি ছিলে না বলেই হয়ত তোমার ভালোবাসা থেকে একটু ভাগ পেয়েছি । যে সেলিম আংকেল আমার সাথে কোনোদিন সোজামুখ করে কথা পর্যন্ত বলেনি সে আমাকে এখন মা ছাড়া ডাকে না, আমাকে কয়েকদিন না দেখতে পেলে নিজেই ফোন করে খোঁজখবর নেয়। দাদী তো আমাকে আগে থেকেই ভালোবাসত! আর এখন সেটার ঘনত্ব যেন কয়েকগুণ আরো বেড়েছে। তার মেয়ের কথা যতবার না মনে করে তার থেকে বেশি মনে করে আমার কথা। এই দোয়া আর ভালোবাসাই আমার শূণ্য ঝুলিতে কত বড় পাওয়া তোমাকে বোঝান যাবে না।
ভাবছ হয়ত স্বার্থপরের মতো অনেক কথাই বলে ফেলেছি। কিন্তু জানো ভাইয়া, আমার এই ভালোলাগাটুকুর থেকে এই মানুষগুলির ভালো থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর এদের ভালো থাকার চাবিকাঠি একমাত্র তুমি। যা হয়েছে সব ভুলে এবার এদের পাশে থাকো, প্লিজ। আর যেও না এদের ছেড়ে। ভাবিকে বোঝাও। তোমাকে, ভাবীকে আর আয়াতকে পেলে মানুষগুলি দেখবে অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছে। আয়াতের দুষ্টু মিষ্টি দুষ্টুমিতে ওই ভূতের বাড়ির মতো নিষ্প্রাণ বাড়িটাতেও ফের প্রাণ ফিরে আসবে ।

মিথিলা কথা শেষ করতে না করতেই কল আসল প্রিয়র ফোনে। মোবাইলের স্ক্রীণে তাকাতেই মিথিলাও দেখল স্ক্রীণে এনার নাম ভাসছে। মিথিলা সেখান থেকে উঠে যেতে চাইলে প্রিয় কল রিসিভ করতে করতে ওর হাতটা চেপে ধরল যাতে না উঠতে পারে। মিথিলা না চাইতেও সেখানে বসতে বাধ্য হয়।

– হুম , বলো! আয়াত কী করছে?
– এই তো আছে । গার্ডেনে খেলছে হয়ত! কেমন আছো ,তুমি?
– এই তো আছি। আয়াতকে বলো ,বাবা সরি! কাল থেকে একদমই কথা বলতে পারিনি। আম্মু অনেক অসুস্থ ,হসপিটালে এডমিট। খুব ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট পার করছে। মন চাইলে দোয়া করো । আর আয়াতকেও বলো দাদীর জন্য দোয়া করতে।
– ওহ মাই গড! কী বলো! কী হয়েছে ?
– ডেঙ্গু ! আচ্ছা, আর কিছু কী বলবে? একটু বিজি আছি?
– ও সো স্যাড! দোয়া করি সুস্থ হয়ে যাবে দ্রুত । টেনশান করো না। কিছুক্ষণ থেমে সে আবার বলল, আচ্ছা , ওখানে তো তবে তোমাদের সব রিলেটিভস আছে , তাই না! তোমার কাজিনও আছে নিশ্চয়ই !
– তো? কিছুটা বিরক্তির সাথে বলল, প্রিয়!
– না, এমনিতেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এনা। রাখছি তবে।
– ওকে! সেটাই বেটার আমার জন্য।
মিথিলা পাশের চেয়ারেই বসা থাকার কারণে সবই শুনছিল। খুব রাগ হচ্ছে প্রিয়র বউয়ের কথা শুনে। সে এখনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে সন্দেহ করে! এত বছর এই ভয়েই কখনো প্রিয়র সাথে যোগাযোগ করেনি। মাঝেমাঝে মন চাইলেও কল করেনি। প্রিয় কতবার তাকে নক করেছে সে মনের ভুলেও প্রিয়র সাথে কথা বলেনি। সে অযথা বিনা কারণে তাদের সংসারে অশান্তির কারণ হতে চায় না। সে চায়নি এনার সাথে প্রিয়র কোনো ঝামেলা হোক। যে ক্রিটিক্যাল মেন্টালিটির মানুষ এনা! ওকে কোনো বিশ্বাস নেই। কি থেকে কী বুঝবে! তার চেয়ে কন্ট্যাক্ট না থাকাটাই ভালো সবার জন্য।
প্রিয় মিথিলার দিকে তাকাতেই তার সামনে কিছু না শোনার ভাণ করল মিথিলা। সে স্বাভাবিক থাকতে চেষ্টা করে যাতে প্রিয় কিছু বুঝতে না পারে।

– রেখে দিলে কেন? দরকারি কিছু বলার জন্য হয়ত কল দিয়েছিল।

– সমস্যা নেই। ও এমনই । দরকার ছাড়াই কল দেয় যখন তখন।

– বিরক্ত হও কেনো? বেশি ভালোবাসে তাই হয়ত! মেয়েরা এমনই। তোমরা তো পাষাণ।

প্রিয় কিছু না বলে নিশ্চুপ থাকে আর মনে মনে ভাবে, “ভালোবাসা? ভালবাসা ইদানীং খুব উথলে উঠছে। এতদিন কই ছিল এই ন্যাকা কান্না। স্বেচ্ছায় ডিভোর্স নিয়ে এখন আবার পস্তাচ্ছে। সুযোগ পেলেই যখন তখন কল করে আয়াতের বাহানায়! কিছুই কী বুঝি না , আমি? যা করেছ ভালোই করেছ, এনা। আমিও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি । একটা দম বন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্ত হাওয়ায় বের হয়েছি। ছেলের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তুমি নিজেই আমাকে রাস্তা দেখিয়েছ! এবার শুধু আমার ছেলেটাকে কাছে পেলে জীবনের কাছে আর কোনো অভিযোগ থাকবে না , চাওয়ারও থাকবে না। ছেলেকে বুকে নিয়ে বাকী জীবন নিজের দেশেই কাটিয়ে দিব। এখানে যে মায়ার আঁচলে আর মমতা আছে সেখানে কেটে যাবে বেশ। ”

– প্রিয়কে চুপচাপ থাকতে দেখে মিথিলা বলল, কী ব্যাপার কোথায় হারিয়ে গেলে? ভাবীকে ভাবছ?

– প্রিয়র সম্বিত ফিরে পেল যেন! সে বলল, না, না ! সেসব কিছু না। এমনিতেই! ভাবী ছাড়াও পৃথিবীতে ভাবনার অনেক অধ্যায় আছে। এতদিন ভাবিনি এখন ভাবতে শিখতে হবে। লেইট ইট বি, প্লিজ!

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলল, তুমি না বললে আজ আরেকজন ডোনার আসবে। কই সে? এখনো তো এলো না। নার্স এসে অলরেডি জিজ্ঞেস করে গিয়েছে।

– এখনই এসে যাবে। অপেক্ষা করো। আমার কথা হয়েছে খানিক সময় আগেই।

কথা শেষ করতে না করতেই আইমান হাজির। আইমানের ব্লাড গ্রুপও বি পজিটিভ। তাকে মিথিলা অনুরোধ করেছে ব্লাড দেবার জন্য। আইমানকে দেখে মিথিলা এগিয়ে গেল!

– থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! মাত্র বলছিলাম তোমার কথা। বহু বছর বাঁচবে। এসো , পতিচয় করিয়ে দেই। আগেই চেন তবুও বেশ বছরের ব্যবধানে হয়ত ভুলে গেছ।
ভাইয়া, এই হলো আইমান! ওই ডোনার। আইমানকে তো আগেই চিনতে তুমি। আইমান , আমার কাজিন, প্রিয় ভাইয়া। গতকালই এসেছে ইতালি থেকে।

আইমান আর প্রিয় একে অপরের সাথে হ্যান্ডশেক করে হাই হ্যালো শেষ করল। নার্স এসে আবার তাড়া দেওয়ায় আইমানকে নিয়ে মিথিলা ভেতরে গেল। আইমান মিথিলার কথায় লাফাতে লাফাতে রাজী হয়ে ব্লাড দিতে এলেও এটাই তার ফার্স্ট টাইম। সে একটা ইঞ্জেকশান নিতেও যে ভয় পায়! ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে। ব্যাপারটা মিথিলা কিছুটা টের পেয়ে বলল, কী , ভয় হচ্ছে , ইয়াংম্যান! কোনো ভয় নেই। জাস্ট কয়েক সেকেন্ড। তুমি এরপর কিছুই টের পাবে না। আর আমি তো আছিই।

– শিওর?

– হুম!

– পাশ থেকে এক ফোঁটাও নড়বে না , প্রমিজ!

– প্রমিজ!

প্রিয় ওদের পেছনে পেছনে এসে কেবিনে ঢুকল। নার্সও এসে পড়ল মিনিট দুইয়ের মধ্যে।

আইমানকে বেডে শুইয়ে দিতেই ভয়ে বাচ্চাদের মতো কুঁকড়ে উঠল। মিথিলা পাশের টুলে বসে অভয় দিচ্ছে। নার্স নিডল পুশ করতেই সে মিথিলার হাতখানা একহাতে বুকের উপর নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। মিথিলার কষ্টের মাঝেও খানিকটা হাসি পেল। সে আইমানকে অভয় দিতে তার মাথার উপরে আরেকটা হাত রাখল। আইমান কিছুতেই তার হাত ছাড়ে না । চোখ বন্ধ করেই শক্ত হাতে মিথিলার হাত ধরে আছে।

প্রিয়র এসব দেখে হঠাৎ করে বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠল। সে কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। আইমান যত জোরে মিথিলার হাত চেপে ধরছে তার কাছে মনে হচ্ছে ঠিক ততটা জোরে আইমান তার কলিজা খামচে ধরছে। কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। কিন্তু কেন? আইমান আর মিথিলার কথাপোকথন আর আচরণে সে এতটা তো এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে এদের মধ্যকার সম্পর্কের বনিবনা হয়ত অনেক দূরই এগিয়েছে। হতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক তো কিছুই না। মিথিলা এভাবে কেন বছরের পর বছর একটা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করবে? তার পূর্ণ অধিকার আছে কাউকে ভালোবেসে আপন করার, জীবনটাকে সামনে এগোবার । আইমানই হয়ত সেই ভাগ্যবান। কিন্তু এতে তার সমস্যা কোথায়? সে কেন এমন ছটপট করছে? তবে কী তার মনের কোণে এখন অবধি মিথিলার জন্য রেখে দেওয়া জায়গাটুকু সযতনেই পড়ে আছে নিভৃতে? দ্রুতপায়ে সে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এল। সহ্য করতে পারছে না আর।

চোখের কোনে জমে থাকা চিকচিক করা পানি মুছে প্রিয় ভাবছে, ” মানুষের মন কত বিচিত্র । মিথিলার প্রতি তার যে এখনো কতটা গভীর অনুরাগ সেটা আজ খুব ভালো করেই জানান দিয়েছে তার মন। এই অনুরাগই হয়ত বা তার দেশ ছেড়ে যাবার সবচেয়ে বড় কারণ!
মনের মাঝে উথাল পাতাল ঝড় বইছে। কিছুতেই কূলে নোঙ্গর ফেলতে পারছে না সে। একদিকে মাকে হারানোর ভয়ের তীব্রতা অন্যদিকে মিথিলাকে নিয়ে অনুভূত হওয়া সেই প্রচণ্ড কষ্টের সুনামি। নিজের বিক্ষিপ্ত মনটাকে শান্ত করতে পারছে না কোনভাবেই। এখন মনে হচ্ছে দেশে না আসাই বুঝি ভালো ছিল! স্বার্থপরের মতো কারো কথা না ভেবে ভবঘুরের মতো একটা জীবন কাটিয়ে দিত ভিনদেশে। পঁচে গলে মরে যেত তার মনটা। এত এত মানুষের মাঝে একটা অতৃপ্ত মন না হয় এভাবেই নিঃশেষ হয়ে যেত! তাতে কার কী!

রাত তিনটা।

পাশাপাশি দুইটা চেয়ারে বসে আছে মিথিলা আর প্রিয়। ব্লাড দেবার পর থেকেই শরীর খুব দুর্বল মিথিলার। ঝিমুনি আসছে না চাইতেও। কতবার মিথিলাকে বাসায় চলে যেতে বলেছে প্রিয় কিন্তু মিথিলা নাছোড়বান্দা।
সে কিছুতেই যাবে না।

মিথিলা একটু পরপরই শুধু ঘুমে ঢুলছে । প্রিয়র চোখে একফোঁটাও ঘুম নেই। মিথিলার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হচ্ছে তার।

প্রিয় এক হাতে মাথা চেপে ধরে একটু চোখটা কোনোরকম বুজেছে মাত্র তখনই মিথিলা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে হঠাৎ তার ঘাড়ের উপর এসে হেলান দিলো। প্রিয় দ্রুত সতর্ক হলো। সে কী করবে বুঝতে পারছে না। একবার মন চাইল ডাক দেয়। আবার ভাবে , ওর বিশ্রামের প্রয়োজন। না হলে অসুস্থ হয়ে যাবে । এমন সাত পাঁচ ভেবে মিথিলাকে ধরে চেয়ারে ঠেস দিয়ে রাখতে চেয়েও আবার কী মনে করে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বাম হাতে মিথিলাকে নিজের হাতের ওপর ভালো করে হেলান দিয়ে শুইয়ে দিলো। মিথিলার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল সে এবার পরম নিশ্চিন্তে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে খুব আরাম করে। এতক্ষণ খুব কষ্ট পাচ্ছিল বেচারি। প্রিয়র এটা দেখে খুব মায়া হচ্ছিল।

মিথিলার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। বুকের মাঝে তার হার্টবিট বেড়েই চলছে। তার মন বলছে এটা হয়ত অন্যায় হচ্ছে খুব । মিথিলা টের পেলে কী ভাববে? কিন্তু নিজেকে কেন যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি । স্বার্থপরের মতো আচরণ করে ফেলেছে একদমই। এতটা কাছাকাছি মিথিলার সে কখনো হবে কল্পনাতেও ভাবেনি। ভয় হচ্ছে মিথিলা যদি তার হার্টবিটের ঢিপঢিপ শব্দের তীব্রতায় উঠে যায়? আর উঠে যদি তাকে ভুল বোঝে? নাহ! ও ওঠার আগেই হাত সরিয়ে নিতে হবে! কিছুতেই ঘুম আসা যাবে না। পুরো সময়টুকু মিথিলার চাঁদমুখের দিকে তাকিয়েই সে পার করবে! তার এত বছরের ঘুমন্ত আত্মা আজ জাগ্রত হয়েছে । হোক না পাপ! হোক কোনো স্বার্থপরতা! যে যা ভাবে ভাবুক! কিছুতেই সে এই ক্ষণটুকুকে আবার হারিয়ে যেতে দিতে চায় না।

চলবে…