সুগন্ধি ফুল পর্ব-২৯

0
268

#সুগন্ধি_ফুল
#পর্ব_২৯
#জান্নাত_সুলতানা

ফিজা তখন থেকে থম মেরে বসে আছে। আবরাজ জড়িয়ে ধরা অবস্থায় ফিজা কে যে নিজের অনুভূতি ব্যাক্ত করেছে সে এব্যাপারে সুনিশ্চিত। কিন্তু এই আবরাজ খান এর মুখে হৃদয়বিদারক কথা? স্বপ্ন নয়তো? ফিজা বিশ্বাস করতে পারে না। তবে কি সে জায়গায় করতে সক্ষম হলো আবরাজ খান এর হৃদয়ে? সব প্রশ্নের জবাব তো একটু আগের ঘটনা কথা থেকে সত্যি প্রমাণিত হয়।
আবরাজ ফিজা কে নিয়ে নিজের বাড়ির রাস্তা ধরলো। ফিজা কিছু বললো না। বিশেষ কারণে সে এসছিলো আব্রাহাম এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। কথা হয়েছে। এখন বাকি কথা সে নিজের মায়ের সাথে বলবে। গাড়ি হঠাৎ থেমে গেলো। ফিজা আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো একটা পাঁচ তারকা রেস্টুরেন্টের এর সামনে গাড়ি থামিয়েছে আবরাজ। ফিজা তাও প্রশ্ন করলো,

-“গাড়ি থামালেন যে?”

-“দুপুরে খেয়েছিলে? বাড়িতে রান্না হয় নি শুনলাম।”

ফিহা থতমত খেলো। আবরাজ এটা কি করে জানলো? সে বাড়িতে যাওয়ার পর-ই জানতে পেরে ছিল মেহরিন কে আব্রাহাম বিয়ের প্রপোজাল দিয়েছে। কিন্তু এটা কেমন প্রপোজাল! ভাবির বোন কে ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাব! তা-ও আবার পরিবারে কারোর সাথে এব্যাপারে কথা বলে নি। বাবা-মা আছে। এভাবে কিছু হয় না-কি! মেহরিন বাড়িতে ছিলো না। তাই মেহরিন এর সাথে কথা হয় নি। তবে রাতে এব্যাপারে কথা বলবে মনস্থির করেছিলো। মেহরিন নিজেই অফিস থেকে ফোন করে বোন কে রাতে থাকতে বলেছিলো। তবে এরমধ্যে আব্রাহাম নিজে থেকে কল করেছিলো বিধায় দেখা করতে এসেছিলো।
মায়ের সাথে কথা কাটাকাটির ফলে মোহিতা বেগম এর প্রেশার বেড়ে গিয়েছে। বুয়া ছুটিতে আছে। ফিজা মা কে খাবার তৈরী করে খাওয়ালেও নিজে কিছু খায় নি। আবরাজ তিন তলা গিয়ে দেখে দেখে একটা কেবিনে ঢুকলো। দু’টো টেবিল। কোণায় বসলো সে বউ কে নিয়ে। ওয়েটার এলো সাথে সাথে। মেনু কার্ডে দেখে আব্রাহাম ভাত আর হাঁসের মাংস অর্ডার করলো। রাতে অন্য কোনো অয়েলি খাবার শরীর এর জন্য ভালো হবে না। এরমধ্যে ফিজা ফ্রেশ হয়ে এলো গিয়ে। কথা হয় না তাদের মাঝে। খাবার এলো পনেরো মিনিট এর মধ্যে। শুধু একটা। ফিজা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

-“আপনি খেয়েছিলেন দুপুরে?”

-“হ্যাঁ।”

-“খাইয়ে দেই আমি?”

আবরাজ বাহিরের খাবার খায় না। বিদেশ থাকাকালীন ও সে কখনোই বাহিরে খেতো না। নিজে যা পারতো রান্না করে খেতো। এরপর তো নিজের নিজস্ব সার্ভেন্ট হলো আঙুলে গোনবার মতো। ফিজা এমন কথা বলেও তাজ্জব বনে গেলো। কারণ আবরাজ খাবে না এই খাবার। ফিজা কোনো রকম খেলো। আবরাজ বসে বসে বউ কে দেখলো।
ফিজার খাবার শেষ হতে হাত ধুয়ে এলো। আবরাজ ততক্ষণে বউয়ের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এসছে। ফিজা আর সেটা নিলো না। আবরাজ গাড়িতে বসে ব্যাগ পেছনের সিটে রেখে দিলো। ফিজার মন টা আপাতত ভালো হয়েছে। মন ফুরফুরে আছে। গাড়িতে বসামাত্র কথা বললো আবরাজ এর সাথে। আবরাজ গম্ভীর। ফিজাই বকবক করলো।
গলির ভেতর ঢুকেছে গাড়ি। তেমন মানুষজন নেই। বাড়ি থেকে একটু দূর নির্জন পরিবেশ। গাড়ি থামালো আবরাজ ফিজা প্রশ্নবোধক চাহনিতে তাকায় আবরাজ এর দিকে। সাথে প্রশ্ন করলো,

-“এখানে কেনো?”

আবরাজ নিজের সিট বেল্ট খুলতে খুলতে ব্যাস্ত কণ্ঠে বললো,

-“চলো রাত্রির বিলাস করবো আজ আমরা।”

ফিজা ভ্রু কুঁচকে নিলো। রাত সাড়ে দশ টার কোঠা ছাড়িয়েছে। বাড়ি যেতে হবে। আবরাজ সিট বেল্ট খোলার পরপরই নিজের ফোন টা বাজতে লাগলো। সাব্বির কল করেছে। আবরাজ বিরক্ত হলো। ছেলে টা সর্বক্ষণ তার রোমাঞ্চে বাগড়া দিতে প্রস্তুত। কল রিসিভ করে আবরাজ কানে ধরলো৷ ওপাশ থেকে কিছু বললো সাব্বির। ফিজা শুনতে পেলো না। তবে আবরাজ বিরক্তিকর স্বরে কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

-“জাহান্নামে যাক ওই মেয়ে। ডিজগাস্টিং মেয়ে মানুষ।”

বলে কল কেটে দিলো। ফিজা বুঝতে পারে না কিছু। আবরাজ ফিজা কে বললো,

-“আজকের রাত তোলা থাক।”

ফিজা শুধু ঘাড় নাড়লো। আবরাজ এর রাগের কারণ কি কিছু টা হলে-ও অনুমান করতে সক্ষম সে।
তাই কথা না বাড়ানোই উচিৎ মনে করলো।

——-

-“এসেছো ঘুরেফিরো। এনজয় করো। শুধু শুধু আমার সাথে রাগ দেখিয়ে চলে যাওয়ার তো কোনো মানেই হয় না। আমি তোমার প্রেমিক নই। এ-সব করে সবার কাছে তুমি হাসির পাত্রী হচ্ছো। নিজের জন্য হলে-ও এ-সব ড্রামা অফ করো৷ নেক্সট টাইম আমি এব্যাপারে কথা বলতে চাই না।”

লিভিং রুমের সবাই আবরাজ এর কথা গুলো মন দিয়ে শোনে। তৃণা লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে। রাতের ফ্লাইট রয়েছে তার। রেগে চলে যাচ্ছে সে৷ এটা কোনো কথা না-কি? আবরাজ না আগে ওর প্রেমিক ছিলো আর না স্বামী হবে এমন কোনো কথা ছিলো তাদের মধ্যে। অসুস্থ সে। আবরাজ হসপিটালর ভর্তির জন্য তার বিয়ে করা সদ্য বউ ফেলে সে সাত সমুদ্র পাড়ি জমিয়েছিলো। এতে তার লাইফে কথা টা ক্রিটিকাল কন্ডিশনে এসে পৌঁছেছিল সে-সব ভাবলেই তো নিজে কে অপরাধী লাগে। একটা মেয়ে কে বিয়ে করে সে ফেলে চলে গিয়েছিল। মেয়ে টা কিভাবে সামলেছে নিজে কে? আবরাজ নিজে কে সাধু প্রমাণ করে না। তার-ও দোষ রয়েছে। দোষ নয় অপরাধী সে। পাপ কাজ করতো সে। মানুষ খুন করার মতো জঘন্য অপরাধ রয়েছে তার। এরজন্য তো নিজের জীবন সাফার করতে হলো। গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘ দিন কোমায় এবং পেটে ধারালো অস্ত্রের জখম। এসবের জন্য সে কাউ কে দোষ দেয় না। নিজের কাজের জন্যেই তার শত্রুর সংখ্যা হয়েছে প্রায়।
তবে তৃণার জেদ তাকে মেয়ে টাকে দোষী ভাবতে বাধ্য করে। সে যদি জেদ ধরে বসে না থাকতো তবে আবরাজ হয়তো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে বিপদের মুখে পরতো না। সব কিছু বাধ। তার বিয়ে হয়েছে। এটা জানার পরে-ও এমন করার কি মানে? আবরাজ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো।
এরমধ্যে তৃণা আবরাজ শরীররে হাত রাখলো। জড়িয়ে ধরার প্রয়াস চালালো। আবরাজ তৃণা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলো। তৃণা পাগলের প্রলাপ করতে লাগলো,

-“আবরাজ প্লিজ ডিভোর্স দাও মেয়ে টাকে। আমার বাবা-র সবকিছু আমার। তুমি সব পাবে। রাজারহালে থাকবে। আমার মতো সুন্দরী একটা মেয়ে পাবা। আমরা জার্মান সেটেল্ড হবো। প্লিজ আবরাজ।”

তৃণা হয়তো এবার অন্তত বুঝবে ভেবেছিলো আবরাজ। তবে তার কিছুই হলো না। উলটো এ-সব বলছে। আবরাজ চোয়াল শক্ত করে আওড়ালো,

-“স্টুপিট মেয়ে।”

রাগ হলে-ও সে নিজে কে সামলে নিলো। বললো,

-“তুমি সুন্দরী। হ্যাঁ সুন্দরী তুমি। তবে আমার চোখে না।”

এরপর ফিজার দিকে তাকিয়ে মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,

-“আমার চোখে আমার বিবাহিত স্ত্রী পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরীতম নারী। যার নামে আবরাজ খান নিজে কে উৎসর্গ করেছে।”

কে কি বলবে? এমন পরিস্থিতিতে কি বলা উচিৎ কার? তবে কোনো ভদ্র পরিবেশে এ-সব দৃষ্টিকটু। মিলন খান ছেলের ওপর ভরসা রেখে চুপ ছিলেন এতো সময়। ভেবেছিলো ব্যাপার টা ছেলে হ্যান্ডেল করে নিবে। ছেলের এখানে কিছু টা হলেও দুর্বলতা আছে ভেবে নিয়ে ছিলো। তিনি ছেলের স্পষ্ট উক্তি শুনে নিশ্চিত হলেন তৃণাকে সে কোনো দিনই কোনো আশ্বাস দেয় নি। তবে এবার মনে হচ্ছে মুখ না খুললেই নয়। তিনি গম্ভীর চিত্তে তৃণা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

-“জেদ ভালো নয়। নিজে সুস্থ হও। আশা করছি সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”

এরপর রুমের দিকে চলে গেলো। আব্রাহাম জুনায়েদ সদর দরজায় উপস্থিত তখন। কিছু একটা হয়েছে আন্দাজ করতে সক্ষম তারা। সবাই দাঁড়িয়ে থাকলে-ও আবরাজ নিজের পাশে দাঁড়ানো নিজের বউ কে কোলে তুলে নিলো আচমকাই। এরপর সোজা সিঁড়ি বেয়ে রুমে চলে গেলো। পেছনে কয়েক জোড়া চোখ বিস্ময়ে ফেলে গেলো।

———-

আবরাজ রুমে এসে ওয়াশ রুম গিয়েছে। আধঘন্টার বেশি সময় হলো কিন্তু এখনো ফিরার নাম নেই। ফিজা পানির শব্দ পাচ্ছে। আবরাজ শাওয়ার নিচ্ছে। সে দরজায় নক করলো। আবরাজ গম্ভীর স্বরে ভেতর থেকে জবাব দিলো,

-“ডিস্টার্ব করো না। তোমার জন্য ভালো।”

-“আবরাজ এ-সব কি পাগলামো? পানিতে ভিজে রাগ পড়বে? বেরিয়ে আসুন। আমি বলছি এক্ষুণি আসুন।”

সাথে সাথে দরজা খুলে ভেজা শরীরে বেরিয়ে এলো আবরাজ। গায়ে সাদা শার্ট টা লেপটে রয়েছে শরীর এর সঙ্গে। বলিষ্ঠ দেহের ভাঁজ স্পষ্ট। আবরাজ বেরিয়ে সাথে সাথে ফিজা কে কাঁধে তুলে নিলো৷ ফিজা হতভম্ব হয়ে গেলো। নিজের চুল গুলো মুখ থেকে সরাতে সরাতে বললো,

-“আবরাজ ভেজা কাপড় ছেড়ে আসুন। ঠান্ডা লাগবে।”

-“তোমার উষ্ণ আলিঙ্গনে আমার ঠান্ডা দূর করতে পারবে। সো সেটা নিয়ে টেনশন করো না সুইটহার্ট।”

বলতে বলতে আবরাজ বউ কে ধপাস করে বিছানায় ফেলে দিলো। ভেজা শার্ট এর অর্ধেক বোতাম খোলা। সেভাবেই বউয়ের ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরলো। ফিজার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। আবরাজ উন্মাদ। বউয়ের সংস্পর্শে এসে রাগ পরলেও নিজে কে কন্ট্রোল করতে পারলো না। ফিজা আবরাজ এর বাহুতে খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে নিলো। আবরাজ বউয়ের ঘাড়ে ঠোঁট বোলাতে বোলাতে নেশাক্ত কণ্ঠে বললো,

-“বলেছিলাম ডিস্টার্ব না করতে। এখন সহ্য করে নাও।”

#চলবে….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]