সুগন্ধি ফুল পর্ব-৩২

0
374

#সুগন্ধি_ফুল
#পর্ব_৩২
#জান্নাত_সুলতানা

-“আবরাজ উঠুন। আমায় ছাড়ুন।”

আবরাজ শুনে না। সে বেঘোরে ঘুমচ্ছে। ফিজা আবরাজ এর কানে কাতুকুতু লাগালো। আবরাজ এর শরীর কাঁপলো। কিন্তু তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া মানুষ টার মধ্যে দেখা গেলো না। ফিজা এবার জোরে ধাক্কা দিলো। আবরাজ ঘুমঘুম চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,

-“কি হয়েছে তোমার? ঘুম শেষ?”

-“আবরাজ বাহিরে দেখুন। সকাল হয়ে যাচ্ছে। গোসল দেওয়ার জন্য বাহিরে যেতে হবে এখন। মেহরিন ওই রুমে ঘুমচ্ছে।”

আবরাজ বিছানার ডান পাশের জানালার বাহিরে তাকায়। অন্ধকার এখনো। ফিজাদের এই রুমে এডজাস্ট ওয়াশ রুম নেই। আবরাজ দ্রুত শোয়া থেকে ওঠে বসলো। আবরাজ জিজ্ঞেস করলো,

-“আজান হয়েছে?”

-“না। হয়ে যাবে।”

ফিজা বলতে বলতে আবরাজ এর হাতের তলা থেকে শার্ট টা বের করলো টেনে। কম্ফর্টার এর নিচে থেকেই শার্ট টা পরে নিলো। আবরাজ উদোম শরীর। শুধু প্যান্ট পরে। সে গিয়ে দরজা খুলে এলো আগে। এরপর এসে ফিজা কে কোলে তুলে বেরিয়ে এলো। ফিজা অবশ্য না করলো। তবে আবরাজ শুনলো না। কলপাড়ে এসে ফিজা কে নামিয়ে পানি চেপে বালতি ভরে দিলো৷ এরপর বললো,

-“আমি তোমার ড্রেস নিয়ে আসছে।”

-“লাগবে না।”

আবরাজ অবাক হয়ে চাইলো। অন্ধকারে কেউ কাউ কে দেখার জো নেই। ফিজা আবরাজ চোখের ওপর তা-ও নিজের হাত রেখে বলে উঠলো,

-“টাওয়াল আছে না। দু’জন এক সাথে করে নেবো। আম্মু ওঠে যাবে একটু পর।”

আবরাজ বউয়ের আবদার ফেলো দিলো না। বউ যে তার থেকে-ও বেশি বেহায়া হচ্ছে এটাই তার প্রমাণ।

——

আবরাজ ফিজার সাথে আজ নামাজে দাঁড়ালো পারে না সে কিছু। ফিজা গম্ভীর। আবরাজ টুকটাক এটা-সেটা পারে। তবে অনেক কিছু ভুল হয়। দীর্ঘ দিন বিদেশের মাটিতে থাকার ফল। ফিজা আবরাজ কে সাথে নিয়ে নামাজ পড়লো। কিভাবে কি করতে হবে সব বলে দিলো। আবরাজ এর মেধা খুব ভালো। সেইজন্য আগে পড়ায় তারপর এখন ফিজার গাইড লাইনে নামাজ পড়লো। ভোরেই আবরাজ আবার শুয়ে পরলো। ফিজা আবরাজ এর কাছে এসে বসলো। মিনমিন করে বললো,

-“রান্না ঘরে একটু যাই? না ইয়ে মানে আম্মু একা। বুয়া সকাল আটটা বাজে আসবে।”

আবরাজ চিত হয়ে শুয়ে। বউয়ের একটা হাতে টেনে নিয়ে নিজের বুকের ওপর রাখলো। মোলায়েম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

-“শরীর ভালো লাগে?”

-“উম।”

-“আচ্ছা চলো।”

আবরাজ নিজেও শোয়া থেকে ওঠে বসে বললো। পড়নে তার অনেক আগের একটা লুঙ্গি। ফিজা সকালে মায়ের থেকে নিয়ে এসছে এটা৷ আর গেঞ্জি প্যান্ট সে আসার সময় এনেছিলো। তবে আবরাজ প্যান্ট পড়ে নি। লুঙ্গি পরে হাঁটতে গিয়ে আবরাজ বারকয়েক হুঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে নিজে কে সামলে নিলে। দরজার কাছে গিয়ে বললো,

-“যদি খুলে যায় বউ?”

ফিজার আবরাজ এর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে হাসি পেয়ে গেলো। তবে আবরাজ বেশ সিরিয়াস। ফিজা বললো,

-“কিছু হবে না। আসুন। নয়তো প্যান্ট পড়ুন।”

-“না এটা পড়ে ভালো লাগছে তো।”

আবরাজ ঘোরে ফিরে দেখে দেখে জবাব দিলো। ফিজা হাসতে লাগলো আবরাজ এর কান্ড দেখে। আবরাজ ওর মুখ চেপে ধরে বললো,

-“নিজের ভালো চাইলে মুখ টা বন্ধ রাখো। আর আম্মু কে সাহায্য করতে চলো। নয়তো!”

আবরাজ রুমের দিকে ইশারা করে বললো। ফিজা সাথে সাথে আবরাজ এর হাত ছাড়িয়ে নিলো। পুরো রাত তাকে জাগিয়ে রেখেছে। এখন আবার মতলব ভালো না। ফিজা বিড়বিড় করে আওড়াল,

-“অসভ্য পুরুষ।”

মোহিতা বেগম চুলায় প্যানে কোনো এক পিঠা ভাঁজছেন। ফিজা দেখলো আরো অনেক গুলো বাকি বানানো। ডিম দিয়ে বানিয়েছে সেগুলো। ফিজা লক্ষ্য করে দেখলো আরও কয়েক পদের পিঠার ময়দা নিয়ে রেখেছে। ফিজা বললে,

-“আম্মু আমি বানিয়ে দিচ্ছি। তুমি ভেজে নাও।”

-“আন্টি একা পারবে না। তুমি বানিয়ে নাও সাথে। আমি চুলার কাছে থাকবো।”

একে-তো আবরাজ কে রান্না ঘরে দেখে মোহিতা বেগম অবাক হয়েছে তারউপর আবরাজ এর কথা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। তড়িঘড়ি করে বললো,

-“আল্লাহ রে। কাউ কে কিছু করতে হবে না। রতন এখনই চলে আসবে। ফিজা তুই যা। জামাই কে নিয়ে রুমে যা। আমি দু’টো কে এখানে আর এক মিনিট পর দেখলে খুব খারাপ হবে।”

ফিজা মায়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে বসতেই যাচ্ছিলো। তখন রান্না ঘরে উপস্থিত হলো মেহরিন। ওর পেছনে কাজের মেয়ে টা। আবরাজ ওদের দেখে বেরিয়ে গেলো। পেছন পেছন ফিজাও চলে এলো। মোহিতা বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। কি অদ্ভুত কথা। জামাই শ্বশুর বাড়ি এসে শাশুড়ির সাথে কাজ করতে এসছে। মোহিতা বেগম জিহ্বা কাটলেন। তবে মেয়ের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে বেশ খুশি হলেন।
মেহরিন কেও কাজ করতে দিলেন না তিনি। ঠেলেঠুলে রুমে পাঠিয়ে দিলো। মেহরিন থতমত খেলো। আজব। তার-ও কি জামাই আছে না-কি যে বউ কাজ করতে গেলে পেছন পেছন জামাই ও চলে যাবে রান্না ঘরে।

—–

ফিজা রুমে এসেই উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। পেটে দুই হাতে চেপে ধরে বালিশে মুখ গুঁজে দিলো। আবরাজ বউয়ের এমনতর অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গেলো। দরজা টা বন্ধ করে এসে বউয়ের কাছে বসলো। বিচলিত হয়ে অশান্ত স্বরে বললো,

-“কি হয়েছে জান? শরীর খারাপ লাগছে?”

-“পেটে পেইন হচ্ছে হঠাৎ করে।”

কণ্ঠ অসুস্থ শোনালো। আবরাজ চট করে ওঠে বসলো। পানি এনে বউ কে খেতে দিলো। ফিজা পানি খাবে না। আবরাজ জোর করে তুলে বসালো। পুরো এক গ্লাস পানি খেতে ই খালি পেটে গুলিয়ে এলো। জানলার পাশে বসে বমি করে দিলো সবটা। আবরাজ জগ থেকে বউয়ের চোখে-মুখে পানি দিলো। বিছানায় শুইয়ে শাশুড়ির কাছ থেকে গিয়ে বলে খাবার নিয়ে এলো। ফিজা তাজ্জব বনে গেলো। অবাক হয়ে শুধালো,

-“আপনার লজ্জা লাগে নি?”

-“কেনো? তুমি খালি পেটে কষ্ট পাচ্ছো। আর আমি লজ্জা পাবো?”

বলতে বলতে আবরাজ ফিজার মুখে ভাত তুলে দিলো। ঠান্ডা ভাত। গরম করে দিয়েছে মোহিতা বেগম। আবরাজ শাশুড়ির ব্যাস্ততা বুঝতে পারে। তিনি অন্য খাবার দিলেও আবরাজ আনে নি। সকাল সকাল ভাজাপোড়া খেয়ে বউ তার আবার গ্যাসের সমস্যায় ভুগে আবরাজ চায় না।
ফিজা মুগ্ধ হয়ে আবরাজ কে দেখে। এই মানুষ টা তার এতোটাই যত্ন করে। তার কেয়ার কিংবা হাবভাব বলে না এতো টা বছর সে বউ কে অনাদরে অবহেলায় রেখেছে। কেউ দেখলে বিশ্বাস ও করবে না।

———

দুপুর হতে বাড়ির আদল পরিবর্তন হয়ে গেলো। পুরো বাড়ি ঝকঝকা চকচকা পরিষ্কার। বাহারি রান্নার ঘ্রাণে মেহরিন রুম থেকে বেরিয়ে এসে থম মেরে রইলো। কত-শত আয়োজন। ডাইনিং টেবিলে বাহারি খাবারের
আয়োজন। মেহরিন এদিক-ওদিক তাকিয়ে বোন কে খুঁজে তখন ফিজা হন্তদন্ত হয়ে গেস্ট রুম থেকে বেরিয়ে এলো। গায়ে একটা জামদানী শাড়ি। হাতে একটা শপিং ব্যাগ। বাহিরে মানুষের শোরগোল। ফিজা বোন কে কিছু না বলে টেনে নিয়ে রুমে চলে গেলো। মেহরিন মাত্র গোসল শেষ করে এসছিলো। ফিজা বোনের হাতে শাড়ির সাথে সব প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো দিয়ে বললো,

-“এগুলো পড়ে আয়।”

-“কিন্তু আপু? এগুলো?”

-“তোকে দেখতে এসছে ছেলে পক্ষ। তোর দুলাভাই এনেছে পাত্র।”

মেহরিন স্তব্ধ হয়ে গেলো। বুকের ভেতর ঝড় বইতে লাগলো। তবে কি তার প্রথম অনুভূতি হেরে গেলো? আব্রাহাম এর প্রতি এই অনুভূতির নাম দেওয়ার আগেই তাতে ফিকে হয়ে গেলো? মেহরিন মা আর বোনের কথা ভেবে সব মেনে নিলো। তারচেয়ে বড়ো কথা ভাগ্যে যা আছে তাই হবে।

——

পাত্রের বাবা হিসেবে মিলন খান কে দেখে মেহরিন এর ভ্রু কুঁচকে আসে। বাহিরের কোনো লোক নেই। সব মুখ পরিচিত। মেহরিন চুপটি করে সোফায় বসে মাথা নিচু করে সবার পায়ের দিকে তাকায়। বেছে বেছে সিঙ্গেল সোফা টার সামনে গিয়ে দৃষ্টি স্থির হলো। সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক পুরুষ। মেহরিন চট করে মাথা তুলে একঝলক দেখে নিলো। নিজের দেখার ভুল বৈ আর কিছু মনে হলো না। ইলা বেগম মোহিতা বেগম এর সাথে দাঁড়িয়ে। তিনি বললো,

-“আব্রাহাম আর মেহরিন একবার নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিলো ভালো হতো ভাবি।”

মোহিতা বেগম না করতে যাচ্ছিলো তবে মিলন খান ও সায় দিলো বিধায় কিছু বললেন না আর। ফিজা বড়ো বোন। আর মোহিতা বেগম শাশুড়ী। সাব্বির কে সাথে দেওয়া হলো ওদের কথা বলতে দেওয়ার জন্য। বাহিরে উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আব্রাহাম মেহরিন এর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে তাকিয়ে রইলো। মেহরিন প্রথমে জিজ্ঞেস করলো,

-“সবাই রাজি হলো কি করে?”

আব্রাহাম বাঁকা হাসলো। এমনি এমনি কোনো কিছু হয় না-কি? সব কিছুর পেছনে একটা কারণ থাকে। আব্রাহাম বললো,

-“সব কিছু জানতে হয় না। কিছু কথা না জানা ভালো।”

বলেই থামলো। মেহরিন বুঝলো আব্রাহাম বলবে না। তাই এব্যাপারে কথা না বাড়ানো ঠিক হবে। চুপচাপ স্বভাবের মেহরিন এরপর আবারও চুপ করে রইলো। পড়নের জাম কালার শাড়ির আঁচল টা মাথায় টানা। চুল গুলো খোঁপা বাঁধা। কিছু এলোমেলো চুল ঘোমটার ফাঁকফোকড় দিয়ে বেরিয়ে আছে। নাদুসনুদুস শরীরে শাড়ী ভালোই লাগছে। আব্রাহাম আচমকাই জিজ্ঞেস করলো,

-“বিয়ে করবে আজ? তুমি একবার হ্যাঁ বলো শুধু। বাকিটা আমি সামলে নেবো।”

মেহরিন একবার শুধু চোখ তুলে আব্রাহাম এর দিকে তাকালো। আব্রাহাম সাথে সাথে সাব্বির কে ডেকে বললো,

-“সাব্বির ভাইয়া কে বলো। আমি আজই বউ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।”

সাব্বির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আজই বিয়ে? এটা কেমন কথা? মেয়ের সাথে কথা বলতে এসে সোজা বিয়ে ফাইনাল? ইন্টারেস্টিং। সাব্বির কিছু বলবে তার আগেই পেছন থেকে আবরাজ রাশভারী কণ্ঠে বলে উঠলো,

-“এতো তাড়া কিসের? মেয়ে কি পালিয়ে যাচ্ছে?”

আব্রাহাম ভাই কে দেখে মাথা নিচু করে নিলো। মেহরিন গুটিগুটি পায়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলো। মেহরিন যাওয়া মাত্র আব্রাহাম বললো,

-“না কিন্তু আজকের দিন টা চলে যাচ্ছে।”

#চলবে…..

[আব্রাহাম এর বিয়ের অনেক তাড়া দেখি।😒 ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]