সুগন্ধি ফুল পর্ব-৩৩

0
507

#সুগন্ধি_ফুল
#পর্ব_৩৩
#জান্নাত_সুলতানা

-“আবরাজ তোমার কি মতামত?”

মিলন খান এর প্রশ্নের উত্তরে আবরাজ ভাই আব্রাহাম এর দিকে তাকালো। বেচারার বিয়ের জন্য একপায়ে রাজী। আজই হউক এটাই তার কথা। আবরাজ ভাইয়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাবা-র দিকে তাকালো। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,

-“আব্বু বিয়ে টা আজ পড়িয়ে দাও। মেহরিন কে না-হয় পরে নিয়ে যাব আমরা।”

-“হ্যাঁ। কিন্তু মেহরিন এর মায়ের বিষয় টাও বুঝতে হবে।”

আবরাজ এর কথার বিপরীতে মিলন খান চিন্তিত স্বরে বললো। আবরাজ বুঝতে পারে বাবা তার কোন টা বলতে চাইছে। তাই নিজেই খোলামেলা করে কথা বললো,

-“আব্বু আমি বুঝতে পারছি তুমি কোন টা বলছো। আমি চাইবো বিয়ের সবটা ব্যায় আমরা বহন করি।”

-“আমিও সেটাই বলতে চাইছিলাম। কিন্তু এতে আবার তাদের আত্মসম্মানে লাগবে না তো?”

মিলন খান গম্ভীর ভাবুক হয়ে বলেন। আবরাজ বাবা কে আশ্বস্ত করলো। বললো,

-“আমি ফিজার সাথে কথা বলবো। বাকিটা আপনি পরে আন্টির সাথে কথা বলে নিয়েন।”

আবরাজ কথা টা শেষ করার সাথে সাথে ইলা বেগম কিছু টা রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,

-“আবরাজ এটা কেমন কথা? আন্টি কিসের? ফিজা আমাকে আম্মু বলে। তাহলে তুমি কেনো এসব বলো?”

আবরাজ মায়ের কথা শুনে থতমত খেলো। ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা চুলকে বললো,

-“আর হবে না।”

আব্রাহাম ভাইয়ের অবস্থা দেখে ফিক করে হেঁসে উঠলো। আবরাজ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

-“একটু লজ্জা কর। বিয়ে করতে এসছিস তো।”

সাথে সাথে আব্রাহাম এর মুখ চুপসে গেলো। এরমধ্যে ফিজা এসে কথা টা শুনলো। আবরাজ এর উপদেশ শুনে মুখ বাঁকাল। মনে মনে বললো “উম আগে নিজে ভালো হোন। পরে অন্য কে উপদেশ দিয়েন।” ইলা বেগম ফিজা কে দেখে বসা ছেড়ে ওঠে দাঁড়ালো। ফিজার মুখ টা শুঁকিয়ে আছে। তিনি চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

-“শরীর ভালো তো তোমার? এমন দেখাচ্ছে কেনো? খাবার খাও নি?”

-“না আম্মু খেয়েছি তো। তুমি শুধু শুধু চিন্তা করছো।”

ফিজা মৃদু হেঁসে বললো। আবরাজ বউয়ের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ইলা বেগম ফিজা কে আবার বললো,

-“তবুও। আচ্ছা বিয়ে টা আজ হলে কি খুব বেশি ঝামেলা হবে?”

-“আম্মু!”

আবরাজ এসে ফিজার পাশে দাঁড়ালো। ফিজার পক্ষ নিয়ে বললো,

-“না না আম্মু কোনো ঝামেলা হবে না। আমরা সব সামলে নেবো।”

ফিজা বিস্ময় নিয়ে তাকালো আবরাজ এর দিকে। আবরাজ স্বাভাবিক ভাবে টেনে ফিজা কে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলো। আব্রাহাম স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে ধপ করে চেয়ারে বসে গেলো। মিলন খান বেশ কয়েকজন কে কল করে দ্রুত চলে আসার জন্য বললো। ইলা বেগম সাব্বির এর সাথে কিছু নিয়ে ডিসকাস করছে৷

মোহিতা বেগম রান্না ঘরে। আবরাজ সোজা সেখানে গেলো। আবরাজ উনাকে ডেকে গেস্ট রুমে নিয়ে এলো। মোহিতা বেগম সব ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। ফিজা বসে আছে বিছানায়। ক্লান্ত চোখে তাকায়। আবরাজ মোহিতা বেগম কে বলে,

-“আম্মু বিয়ে টা আজ পড়িয়ে রাখি?”

-“ভাই ভাবি কি বলে?”

-“তারা কিছু বলে নি। আপনার অনুমতি আগে।”

আবরাজ নমনীয় ভাষায় বলে। মোহিতা বেগম মলিন হেঁসে বললো,

-“দেখো বাবা যা ভালো বুঝো। আমি আর কি বলবো।”

আবরাজ মাথা নাড়ে। ফিজা চুপচাপ শুধু দেখলো। মায়ের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বিধায় বেশ শোকে আছে। আবরাজ ফিজার কাছে গিয়ে বসলো। বললো,

-“কাজী নিয়ে আসতে বলবো?”

-“মেহরিন এখানে থাকবে আজ?”

-“হ্যাঁ।”

-“কাজী আনতে বলুন।”

আবরাজ মুচকি হেঁসে বেরিয়ে গেলো। সাব্বির কে ডেকে কাজী নিয়ে আসতে বললো। সাব্বির গেলো। মোহিতা বেগম কে রান্নাবান্নার ব্যাপার টা এড়িয়ে যেতে বলা হলো। দুপুরে যা খেয়েছে তারা আর কিছু খাবে না জানালো। তবুও বেশ জমকালো নাশতার আয়োজন করলো মোহিতা বেগম। মেহরিন এমনিতেই চুপচাপ স্বভাবের তারউপর হুট করে বিয়ে তা-ও আবার যাকে সে সর্বদাই এড়িয়ে চলতো। কিন্তু কেনো চলতো সে নিজেও জানে না। দুপুরের সেই শাড়ী পড়ে আছে এখনো। মোহিতা বেগম নিজের বিয়ের দোপাট্টা টা নিয়ে এলো। ফিজা বোনের মাথায় সেটা পড়িয়ে দিয়ে লিভিং রুমে নিয়ে এলো। আছরের আযানের আগেই বিয়ে সম্পূর্ণ হলো। বিয়ের পর পুরুষ সব নামাজে চলে গেলো। বাড়িতে আশেপাশের মানুষ জন দিয়ে ভর্তি। এতো বড়ো পরিবারে থেকে এমন নিম্ন পরিবারে বিয়ের ব্যাপার টা অনেকে আঁড়চোখে খোঁচাখোঁচি করে৷ ফিজার শরীর জ্বলে যায়। বোন কে রুমে ইলা বেগম বেগম এর কাছে রেখে সে নিজের রুমে চলে গেলো। তার ঠিক দুই মিনিট পর আবরাজ এলো। ফিজা শুয়ে ছিলো। শরীর টা বড্ড খারাপ লাগছে। আবরাজ কে দেখেই তড়িঘড়ি করে ওঠে গেলো। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো

-“নামাজে যাবেন না আপনি?”

আবরাজ সারা বিকেল বউ কে চোখে চোখে রেখেছে। বিয়ের জন্য ব্যাস্ত ছিলো বিধায় কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সময় সুযোগ কোনো টাই করে উঠতে পারে নি। আবরাজ ফিজার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলো।
নিজে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে,

-“তোমার শরীর ভালো?”

-“আপনি যান। ঠিক আছি আমি।”

ফিজা আবরাজ কে আশ্বাস দিয়ে বলে। অথচ কণ্ঠস্বর মলিন। অসুস্থ শোনায়। আবরাজ বউয়ের পাশে বসে আচমকাই মেয়ে টাকে জড়িয়ে ধরলো। ধরে আসা গলায় বললো,

-“তুমি ভালো নেই। কি হয়েছে জান? আমাকে বলো না।”

ফিজা চুপ করে থাকে। আবরাজ বউয়ের মুখ টা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। গালে হাত ছুঁয়ে বললো,

-“বলবে না? আমার তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগছে না।”

ফিজার চোখ টলমল করে। ফ্যাকাসে মুখ। আবরাজ এর বুকের ভেতর দুমড়েমুচড়ে ঝড় বইতে লাগলো। ফিজা আবরাজ এর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। গতমাসে তার মান্থলি কোনো প্রবলেম হয় নি। ভেবেছিলো হয়তো কোনো সুখবর আসবে। সেদিন শাশুড়ির ইঙ্গিতে সে আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু তেমন কিছু ই হয় নি। নামাজ পড়ার আধঘন্টা পর-ই মান্থলি প্রবলেম শুরু। ফিজা আবরাজ কে জড়িয়ে ধরলো। আবরাজ শক্ত করে বউ কে বুকে আগলে রাখলো। অনেক সময় এভাবেই কাটলো। বেশ কিছু সময় পর ইলা বেগম ফিজা কে ডাকলো। ফিজা আবরাজ দুজনেই বেরিয়ে এলে রুম থেকে। বর বউ বাদে সবাই যাওয়ার জন্য রেডি। ফিজা নিজের শাশুড়ী কে জোর করলো। রাখতে চাইলো। কিন্তু তিনি থাকলো না। সবাই বিদায় নিতে নিতে সন্ধ্যা হলো।

——-

সময় টা সন্ধ্যার পর। মেহরিন গিয়ে মায়ের কাছে ঘাপটি মেরে রইলো। রান্না ঘরে মায়ের পেছন পেছন ঘুরঘুর করছে। বেচারা আব্রাহাম রুমে একা। ফিজা বোন কে ধমক টমক রুমে পাঠালো। মোহিতা বেগম ধমক দিয়েও লাভ হয় নি। মেহরিন গুটিগুটি পায়ে রুমে প্রবেশ করে নাক চেপে ধরলো। সিগারেটের গন্ধ মাথা ঘুরতে লাগলো। দরজা টা দ্রুত বন্ধ করে দিয়ে আব্রাহাম এর পেছনে এসে দাঁড়ালো। ভীতু মেহরিন আস্তে আস্তে বললো,

-“আজকেও সিগারেট খেতে হচ্ছে।”

-“আর কি করবো?”

আব্রাহাম এর ত্যাড়া প্রশ্ন। মেহরিন এর আর কিছু বলার সাহস হয় না। ফিরে চলে যেতে যাচ্ছিলো তখন আবার মিনমিন করে বললো,

-“এটা ফেলে দিন না। আমার ভালো লাগে না।”

-“ফেলো দেবো। শর্ত আছে।”

আব্রাহাম সিগারেট টা উলটে পালটে দেখতে দেখতে বললো। মেহরিন অস্ফুটে বলে,

-“শর্ত?”

-“হা।”

-“কি বলুন।”

স্বাভাবিক ভাবে জানতে চায় মেহরিন। মেয়ে টা কল্পনা ও করে না আব্রাহাম কেমন শর্ত দিতে পারে। সহজসরল এই সমর্থন যে আব্রাহাম কাজা লাগবে সে কি আর জানতো। আব্রাহাম মেহরিন এর দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হেঁসে বলে উঠলো,

-“তুমি চুমু খেতে দাও। তাহলে ফেলে দেবো।”

মেহরিন চমকালো। আব্রাহাম নিকট নরমাল হতে পারে এই কথন। কিন্তু মেহরিন? ভীতু সাধাসিধা মেহরিন এর কাছে কঠিন অস্বাভাবিক লজ্জার অস্বস্তিকর। কিছু না বলে মেহরিন চলে গেলো। পড়ার টেবিলে বসে গেলো। একটা নোট খুলে সামনে রাখলো। আব্রাহাম ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে আবার সিগারেট ফুঁকতে লাগলো। মেহরিন আঁড়চোখে তাকালো। তবে আর কিছু বললো না। আব্রাহাম হতাশ। বড়ই হতাশ। বউ তার এতো টা কেনো ভোলাভালা? একটু চালাকচতুর হতে পারতো৷ আব্রাহাম পরক্ষণেই নিজের ভাবনার ওপর অবাক। মেহরিন চুপচাপ ভীতু স্বভাবের সে তো সাক্ষাৎ এর প্রথম দিনই তা টের পেয়েছে। তারপরও এসব ভাবা নিছক বোকামি বৈ কিছু না। এই মেয়ে কে তো সে নিজের মতো করে গড়তে পারে।

-“আমি তোমাকে আমার মনমতো করে তৈরী করে নেবো মিসেস আব্রাহাম খান।”

#চলবে……

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]