#সুগন্ধি_ফুল
#পর্ব_৩৪
#জান্নাত_সুলতানা
আবরাজ আব্রাহাম দুই ভাই অফিস করবে। তাই সকাল সকাল মোহিতা বেগম দুই জামাইয়ের জন্য নাশতা তৈরী করছেন। সাথে রতন আর মেহরিন সাহায্য করছে। ফিজা রুমেই আছে। আবরাজ বউ কে যেতে দিচ্ছে না। ফিজাও তেমন জোর করে নি। কাল রাত থেকে অতিরিক্ত ব্লিডিং হচ্ছে। কারণ কি ফিজা বুঝতে পারছে না। আবরাজ বউ কে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মেয়ে টার চোখ মুখ শুঁকিয়ে খাদে চলে যাওয়া ফ্যাকাসে মুখ তাকে বড্ডো পীড়া দিচ্ছে। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা সে অস্থির। বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-“ডক্টর নিয়ে আসি? প্লিজ। কলিজা আমার না করো না।”
-“ঠিক আছি আমি।”
আবরাজ শুনে না। ফোন টা হাতের নাগালের মধ্যে ই ছিলো। সেটা নিয়ে কল দিলো সাব্বির কে। বেচারা মাত্র বেরিয়েছে ফ্ল্যাট থেকে। লিফট বন্ধ। সিঁড়ি বেয়ে সাত তলা থেকে নেমে এসছে। নিজের স্যার এর কল রিসিভ করে কানে তুলে ঝটপট। আবরাজ গম্ভীর স্বরে তাগাদা দিয়ে বলে,
-“এক ঘন্টার মধ্যে একজন ডক্টর নিয়ে এসো। ডক্টর অবশ্যই এবং অবশ্যই লেডি হবে।”
হাঁপাতে হাঁপাতে সাব্বির জবাব দিলো,
-“ওকে স্যার।”
আবরাজ কল কেটে বউয়ের গালে হাত ছুঁয়ে দিলো। শান্ত নিশ্চুপ শুয়ে আছে মেয়ে টা।
——
এক ঘন্টা হওয়ার আগে সাব্বির ডক্টর নিয়ে উপস্থিত হলো। ফিজা মা এ-সব দেখে হতভম্ব। মেয়ের কিছু হলো না-কি! কিছু ই জিজ্ঞেস করার মতো পরিস্থিতি নেই। আব্রাহাম বেরিয়ে গিয়েছে সকালে। আবরাজ রুমের বাহিরে এলো না। মেহরিন সাব্বির মোহিতা বেগম বাহিরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
ডক্টর ফিজা কে দেখলো। আবরাজ গম্ভীর চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে কোমরে এক হাত রেখে। চিন্তিত দেখাচ্ছে বড্ডো। মহিলা ডক্টর মাঝবয়সী। বেশ সুন্দর করে কথা বলছেন ফিজার সাথে। মেয়ে টা দুর্বলতায় চোখ খুলে ভালো করে তাকাতে পারছে না। আবরাজ এর বুকের ভেতর মোচড় দেয়। যন্ত্রণায় মুষড়ে পড়ে আত্মা। ডক্টর একটা ইনজেকশন আর কিছু ঔষধ দিলো। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
-“সরি মিস্টার খান। আমি কিছু করতে পারলাম না। সাধারণত এই ধরণের কেস গুলোতে রোগীকে হসপিটালাইজড করতে হয়। যেহেতু আপনার ওয়াইফ এর মাত্র দুই সপ্তাহ ছিলো। যার ফলে হসপিটাল নিতে হবে না। আমি ঔষধ দিয়ে দিচ্ছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ আপাতত কিছু দিন নিজেদের মধ্যে দুরত্ব রাখুন।”
প্রতি টা কথা বিস্ফোরণ ঘটালো আবরাজ এর কানে। বজ্রপাত হলো কি তার কানে? হ্যাঁ। কি শুনলো সে? এমনও হয়েছে সে নিজে হাতে মানুষের প্রাণ নিয়েছে। তার আজ কেনো এতো টা অসহায় বুকের ভেতর খালি খালি লাগছে। নিজের অস্বস্তি বলে? ডক্টর বিদায় নিলো। ফিজা অনুভূতিহীন পড়ে রইলো। আবরাজ ঠোঁট কামড়ে ধরে বউয়ের ওপর আধশোয়া হয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। কিভাবে হলো এটা? তারা টেরও পেলো না একটা প্রাণ এলো আবার চলেও গেলো? কেনো এমন হলো? আবরাজ এর চোখ দিয়ে আচমকাই এক ফোঁটা জল পড়লো টুপ করে। ঠিক ফিজার গলায়। ফিজা চোখ বন্ধ করে নিলো সাথে সাথে। গাল বেয়ে তার-ও অশ্রু গড়ালো।
আবরাজ ধরে আসা গলায় বউ কে ডাকলো,
-“সুগন্ধি ফুল!”
ফিজা জবাব দিলো না। সেভাবে পড়ে রইলো। বাহির থেকে ততক্ষণে মেহরিন মোহিতা বেগম এসে উপস্থিত হয়েছে। আবরাজ মোহিতা বেগম উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
-“আম্মু বাড়ি নিতে চাই ওকে।”
-“কিন্তু বাবা ওর শরীর? আরো একটু সুস্থ হোক। কাল যাও।”
আবরাজ বউয়ের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকালো। এখন জার্নি করা কতোটা ঠিক? তার বউ সহ্য করতে পারবে না। আবরাজ এব্যাপারে আর কিছু বললো না। মোহিতা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে রান্না ঘরে গেলো। তার কিছু সময় পর মেহরিন ফিজার জন্য খাবার নিয়ে এলো। কিন্তু এই ঘরে ওয়াশ রুম নেই। মেহরিন ফিজা কে তাদের রুমে নিতে বললো। অবশ্য ওই রুম টা ফিজার। মেহরিন এর রুম মোহিতা বেগম এর পাশের রুম টা। মেহরিন থাকে না সেখানে। জানালা নেই ওই রুমে। আবরাজ বউ কে কোলে তুলে ওই রুমে নিয়ে গেলো। মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেললো। এটা কি হওয়ারই ছিলো? কেনো এমন হলো? ভিন্ন রকম হলে খুব কি ক্ষতি হতো? ইশ তার-ও যে বড্ড কান্না পাচ্ছে।
——–
সাব্বির জানিয়েছে তৃণা চলে যাবে আজ রাতে। ইলা বেগম আসতে যাচ্ছিলো। কিন্তু যতোই হোক ভাইয়ের মেয়ে চলে যাবে। বাড়ির অতিথি মেয়ে টা। তাই আসে নি। সকালে চলে আসবেন জানিয়েছেন তিনি। জুনায়েদ সিলেট রয়েছে বর্তমানে। নিজের কোনো এক ফ্রেন্ড এর বাড়ি। আবরাজ মোটামুটি নিশ্চিন্তে রয়েছে। কিন্তু আপাতত বউ কে নিয়ে সে চিন্তিত। বউয়ের অবস্থায় সে মর্মাহত।
ফিজা ঘুমিয়ে আছে। খাবার খাওয়ার পর ঔষধ খেয়ে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে গিয়েছে। আবরাজ জানে। বউ তার রাতে ঘুমায় নি। সারারাত নিশ্চয়ই মেয়ে টা ছটফট করেছে। কিন্তু সে পাশে থেকে-ও কিছু অনুমান করতে পারলো না। নিজেও তো জেগে ছিলো। তাহলে কেনো একটু খুঁটি দেখলো না বিষয় টা? নিজের ওপর রাগ হয় পুরুষ টার। ফিজার পাশে চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যায় অথচ একটু ওঠে দাড়াঁবার মতো শক্তি মেয়ে টার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। খেতে হবে এখন। না খেয়ে থাকলে আরো দুর্বল অসুস্থ হবে। আবরাজ মোলায়েম স্বরে বউ কে ডাকলো,
-“খেতে হবে সুগন্ধি ফুল। একটু ওঠো।”
-“আবরাজ ভালো লাগছে না আমার। আপনি খেয়ে আসুন।”
ফিজা চোখ বন্ধ করে বলে উঠলো। আবরাজ নাছোরবান্দা। যাবে না। ফিজা কে তুলে বসালো। ফ্রেশ করিয়ে শাশুড়ির থেকে নিজে গিয়ে খাবার নিয়ে এলো। মোহিতা বেগম মেহরিন পেছন পেছন এলো। দাঁড়িয়ে থেকে খাবার খাওয়ালেন মেয়ে জামাই কে। আবরাজ খেলো। খুবই সামন্য।
ফিজা এনিয়ে কিছু বলে না। সে খেয়ে আবার শুয়ে পড়লো। আবরাজ পাশে বসে রইলো। ফিজা আবরাজ এর একটা হাত নিজের উদর এর ওপর নিয়ে রাখলো।
চোখ বন্ধ করে বললো,
-“ও এখানে ছিলো আবরাজ।”
আবরাজ এর বুকের ভেতর ছেদ করে উঠলো। আচমকাই চোখ গুলো ঝাপসা হলো। নিজে কে সামলে নিলো। বললো,
-“আবার আসবে।”
-“ও আমাদের প্রথম অস্বস্তি ছিলো।”
-“যা হয় ভালোর জন্যে হয়।”
-“হ্যাঁ। আপনার এখান থেকে কিছু টা হলে-ও শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।”
আবরাজ বুঝলো। বউ তাকে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু সে তো সব ছেড়ে দিয়েছে তাহলে কেনো হলো এমন টা? না-কি আগের গুলোর ফল পাচ্ছে সে? আবরাজ ভাবতে পারে না। তার চারপাশ অন্ধকার লাগে। ঝাপটে জড়িয়ে ধরে রাখে বউ কে।
———
আব্রাহাম এসছে। মেহরিন এর মন খারাপ। আব্রাহাম জানে না কিছু। ভাই বাবা অফিস যায় নি। অনেক চাপ ছিলো আজ। সে বাইরের কলপাড় থেকে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এলো। মেহরিন সব সময় আব্রাহাম ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলে হাসি মুখে টাওয়াল এগিয়ে দেয়। কিন্তু আজ মলিন মুখে এগিয়ে দিলো। আব্রাহাম ভ্রু কুঁচকে ভাবুক হলো। মুখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলো,
-“কি হয়েছে ভীতু রানীর মুড অফ কেনো?”
-“আপু অসুস্থ।”
মেহরিন বললো। আব্রাহাম এর চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। ভাই তার অফিস না যাওয়ার কারণ কি তবে এটা? সে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-“কি হয়েছে ভাবির?”
মেহরিন সব বলে দিলো। আব্রাহাম এর মাথা ঘুরতে লাগলো। সে কলেজ লাইফ থেকে ফিজা কে চিনে৷ তখন থেকে তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্কে। ফ্রেন্ড। কিন্তু আব্রাহাম পছন্দ করতো ফিজা কে। যা এক সময় ভালোবাসায় রুপ নিলো। কিন্তু ভালোবাসা প্রেম-নিবেদন করার মতো সাহসিকতা তার তখন ছিলো না। সে অনার্স করার জন্য বিদেশ গেলো। আর তার ভাই তার যাওয়ার একবছর পরে এসে বিয়ে করে গেলো। সে জানতো না ফিজাই তার ভাইয়ের বউ। মেয়ে টার জন্য তার ভেতর থেকে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে। তবে কি গার দীর্ঘ শ্বাস কোনো ভাবে মন থেকে লেগে গেলো? কিন্তু এতে ফিজার তো কোনো দোষ নেই। সে-ও তো দোষ দিচ্ছে না। আব্রাহাম চুপচাপ টাওয়াল রাখলো। মেহরিন এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
-“আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যে করে। তবে ভাইয়া ভাবির আরো সতর্ক থাকা জরুরি ছিলো। যা-ই হোক। চলো খাবে। নিশ্চয়ই সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি।”
মেহরিন আব্রাহাম এর কথায় একটু শান্ত হলো। আলগোছে আব্রাহাম এর বুকে মাথা রাখলো। আব্রাহাম কিছু সময় থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা হাত মেহরিন এর পিঠের ওপর রাখলো। সে প্রথম অনুভূতি ভুলতে পারবে তো? মেহরিন কে কোনো ভাবে ঠকানো হচ্ছে না তো! না সে ঠকাবে না মেহরিন কে। তার অধিকার নেই মেয়ে টাকে ঠকানোর। আব্রাহাম মেহরিন এর পিঠের ওপর আলতো করে রাখা হাতের বাঁধন দৃঢ় গভীর করলো।
#চলবে….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
#জান্নাত_সুলতানা