সে আমার শরৎফুল পর্ব-১৮+১৯

0
277

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব১৮

#আরশিয়া_জান্নাত

তৃণার বড় ফুপী রাজিয়া বেগম বহুদিন যাবত অসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী হয়ে আছেন। বয়সের ভারে শরীরটা যতটা নেতিয়ে পড়ার কথা অসুস্থতার জন্য তা আরো বেশিই নরম হয়েছে। অবস্থা এখন বেশ নাজুক বলেই সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছেন, যেকোনো সময় রুহ চলে যাবে এমন অবস্থা। তাই আত্মিয় স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে। তৃণাও চট্টগ্রাম থেকে রওয়ানা হয়েছে। তার বড় ফুপীর শ্বশুড়বাড়ি ফেনীতে, তাই তার যেতে তুলনামূলক কম সময় লাগবে। বাসে উঠে কানে ইয়ারফোন গুজতেই চোখের সামনে বড় ফুপীর নানান স্মৃতি মানসপটে ভেসে বেড়াচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন ফুপী শক্তসামর্থ ছিলেন। তৃণাকে বেশ স্নেহ করতেন বটে! তার গাছের পেয়ারা তৃণার প্রিয় ছিল বলে প্রায় বছরই কাউকে না কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। সঙ্গে থাকতো তার নিজ হাতে বানানো মুড়ির মোয়া,নারকেল পিঠা,ডিমের পিঠা আর নানারকম আচার। মনটা কেমন যেন আদ্র হয়ে উঠে। বড় হবার অনেকগুলো সাইড এফেক্টের মধ্যে প্রিয়মুখগুলো বয়স্ক হয়ে যাওয়া অন্যতম। ছোটবেলায় যাদের কোলেপিঠে করে আমরা বড় হই, বড় হয়ে তাদের দেখি নেতিয়ে পড়তে। চেহারায় বাধ্যক্যের ছাপ পড়ে যায়, কেউ বা গত হয়ে যান। বেঁচে থাকেন কেবল রঙিন শৈশবের স্মৃতিতে!
দুপুরেই ফেনীতে পৌঁছে যায় সে, তাকে নিতে তার ফুফাতো ভাই কবির বাসস্ট্যান্ডেই থাকে।

আস্সালামু আলাইকুম ভাইয়া।

ওয়ালাইকুমুস্সালাম। ভালো আছিস তো? আসতে কোনো সমস্যা হয় নি তো?

নাহ ভাইয়া, কোনো সমস্যা হয়নি।

আচ্ছা এখন বাড়ির দিকে চল।

দু’পাশে সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে সরু পথটা দিয়ে মেম্বারবাড়ির দিকে চলছে গাড়ি। বাসে জার্নি করা তৃণার একদম সয় না। মনে হয় পেটের ভেতরে গাড়ির গ্যাস জমা হয়ে কুন্ডলি পাকিয়ে উঠে। যদিও বমি হয় না। তবে সেই বিদঘুটে পেট মোচড়ানো ভাবটা থাকে সারাটা দিন। বাড়িতে ঢুকতেই একদল মেয়ে এসে ঝেঁকে ধরে তাকে। সচরাচর সবাই একত্রিত হয়না, তবে বিয়ে আর মৃত্যু উপলক্ষে সবাইই কমবেশ জড় হয়। তাই কমবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে এ এক উৎসবমুখোর আমেজ। তৃণা এদের সবার মধ্যমণি। কেউ কলপাড়ে নিয়ে কল চেপে দেয়, কেউ গামছা এগিয়ে দেয়, কেউ বা খাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকে। ওরা সবসময় তৃণা আপু বলে বলে জান দিয়েই অভ্যস্ত। তৃণাও তাদের অনেক স্নেহ করে। রাত্রি বলল,তৃণাপু তোমার জন্য আমি তেঁতুলের শরবত করে রেখেছি, তোমার না বাস জার্নি করলে বমি বমি ভাব থাকে। এটা খেলে দেখবা সেই ভাব চলে যাবে। তুমি জানো আমি এখানে কত কষ্ট করে তেঁতুল যোগাড় করেছি তোমার জন্য!

তৃণা হেসে বলল,থ্যাংক ইউ পাখি!

রাত্রিকে টক্কর দিতে সুমি বলল, তৃণাপু তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে না? চলো তাড়াতাড়ি আমাদের ঘরে। আম্মু তোমার জন্য ভাত রেডি করেছে।

এমনি প্রতিযোগিতা লেগে থাকে সবার। তৃণা তাদের থামিয়ে বলল,তোরা একটু বস আমি আগে ফুফুকে দেখে আসি।

আচ্ছা।

তৃণা ধীর পায়ে ফুফুর ঘরে গেল। উনার চারপাশে সবাই বসে কুরআন শরীফ পাঠ করছে। ফুফুর ছোট মেয়ে ফারিয়া তসবীহ পাঠ করে একটু পরপর তার মায়ের গায়ে ফুঁ দিচ্ছে। তৃণা বিছানায় তাকিয়ে দেখলো তাঁর রুগ্ন ফুফুটার দিকে। ফারিয়া তৃণাকে কাছে ডেকে ধীর গলায় বলল, মা দেখো কে এসেছে। তোমার আদরেয ভাইজি আসছে মা। একটু তাকিয়ে দেখো…

তৃণা তার ফুফুর হাত চেপে ধরে বসে পড়লো। ভেজা চোখে কাতর স্বরে বলল,ফুফু!

রাজিয়ে বেগম নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেন কিন্তু তার বোধশক্তি এখন শেষ প্রান্তে। চিনতে পেরেছেন কি না তাও বোঝা গেল না। তৃণা নিজেই ফুফু্র হাত টেনে মাথায় হাত পুছলো। মনতো জেনেই গেছে ইনি আর অল্পক্ষণের অতিথি। চোখে দেখে বিশ্বাস করতে আর বাদ রইলো না। তাই শেষবারের মতোন ফুফুর আদর পেতেই মরিয়া হয়ে উঠলো যেন!

ধানক্ষেতের আইল ধরে বেশখানিকটা পথ পার হলেই একটা উঁচু ঢিবির মতো জায়গা আছে। এখানে বসে চাষীরা একটু জিরোয়, দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে। তৃণা পিছু পিছু তার বাহিনীও এসেছে। আসার পথে চানাচুর, মুড়ি,পেঁয়াজ মরিচ তেল সহ নানা রকম খাবার সঙ্গে এনেছে। ওরা ঐ ঢিবিতে বসে ঝালমুড়ি, আর পেঁপের ভর্তা খাবে। সবুজ ধানের উপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায় দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। নীল আকাশের নীচে সবুজ প্রান্তর যেন বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি! তৃণার মনে হয় একজন মহৎ ব্যক্তি ঠিক বলেছেন। সবুজ রং চোখের জন্য আরামদায়ক। দেখলেই প্রশান্তি লাগে। সুমি, রাত্রি, মুনতি, ইতোমধ্যেই দক্ষ হাতে ঝালমুড়ি তৈরি করে, ভর্তার ব্যবস্থা করছে।
হাফিজ,প্রান্ত আর হৃদয় ঝালমুড়ি খেতে খেতে বলল, তৃণা আপু তুমি আমাদের বাড়িতে আসো না কেন? আমার কত ইচ্ছা তোমাকে আমাদের পুকুরটা দেখানোর। বড় আব্বা যা সুন্দর করে ঘাট বাঁধাইছে।

পড়ালেখা শেষ হলে তোদের সবার বাড়িতে ১সপ্তাহ করে থাকবো।

এখন বলতেছ আর কি। তোমার পড়া শেষ হলে পরে আমাদের বাড়ি যাওয়ার আর টাইম পাবা?তখন তো শ্বশুড়বাড়ি চলে যাবা…

আরেহ না। বললেই কি আর শ্বশুড়বাড়ি যাওয়া যায়?

রাত্রি বলল, ছোট মামি থেকে শুনছিলাম কোন ডাক্তারের সাথে তোমার বিয়ের কথা চলছিল। রাজী হলে না ক্যান? ডাক্তার দুলাভাই পাইলে আমরা ফ্রিতে চিকিৎসা নিতে পারতাম!

সুমি বলল, আচ্ছা আপু তোমার বয়ফ্রেন্ড নাই? আমি যদি তোমার মতো সুন্দর হইতাম আমার পিছনে তো লাইন লেগে যাইতো। তোমাদের ভার্সিটিতে অনেক ছেলে তোমার জন্য পাগল তাই না?

তোরা তো বেশ বড় হয়ে গেছিস। কিসব প্রশ্ন নিয়ে বসলি!

হাফিজ বলল, আপু আমি বলি তোমার বিয়ে করার দরকার নাই। তুমি এমনি থাকো। আমাদের সাথে গল্প করবা, মজা করে ভর্তা বানাবা। আমরা খাবো ঘুরবো। এটাই বেশি মজা!

ওর কথায় সবাই ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। শুধু প্রান্ত বলল, না না ঐরকম করা যাবেনা। আমার অনেক শখ তৃণা আপুর জামাই থেকে লাল সাইকেল নিবো। ঐটা পূরণ হবে না তো বিয়ে না করলে!

তৃণা হাসতে হাসতে বললো, ঐটা নাহয় আমিই কিনে দেবো তোকে। তাহলে হবে না?

নাহ! বললে তো আব্বুও কিনে দিবে। কিন্তু আমার শখ দুলাভাই থেকে নিবো।

সুমি বলল, এহহ শখ কত! উনাকে লাল সাইকেল কিনে দিতে যেন দুলাভাইয়ের ঠেকা!

আহা সুমি থাক না! বেচারার শখ কে অবহেলা করিস না।

হাসি ঠাট্টায় বিকেলটা বেশ ভালোই কাটলো।

ইরহামের দিন কাটছে বেশ ব্যস্ততায়। রিসেন্ট সে একটা প্রজেক্ট ডিজাইন দা কথাকরছে। ঐটার জন্যই দিনরাত এক করে খাটতে হচ্ছে। এই ডিজাইনটা যদি ক্লায়েন্টের মনমতো হয় তবে তার প্রমোশন আলাহতে সময় লাগবে না। কেননা এই কোম্পানীর বেশ কিছু কাজ হাতে আছে। যদি ইরহামের ডিজাইন তাদের পছন্দ হয় পরবর্তীগুলোতে তাকে এপয়েন্ট করা হবে। এতে ইরহামের আর পিছু ফিরে চাইতে হবে না। সময়ের চাকা বেশ দ্রুতই আগাচ্ছে যেন। এই তো সেদিন ঢাকায় এসেছিল দেখতে দেখতে ১ বছর হয়ে গেছে। তৃণার সঙ্গে এর মাঝে ১বার দেখা হয়েছে বটে, তাও দূর থেকে। বিবাড়িয়ায় ছুটিতে এসেছিল, সঙ্গে ওর দুই ভাই থাকায় আর সরাসরি কথা হয় নি। তবে চোখের দেখা দেখেছে এই ঢের! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত প্রায় ২টা বাজে। এই সময়ে তৃণা নিশ্চয়ই এক ঘুম দিয়ে ফেলেছে। ইরহাম ল্যাপটপ টা বন্ধ করে বেলকনীতে দাঁড়ায়। আকাশে চাঁদ না থাকলেও তারাদের মেলা বসেছে বেশ। ইরহাম আপন মনে বলে উঠে, আপনাকে ভীষণ মিস করছি তৃণা!

তাহমিনা সকাল থেকেই বেশ রেগে আছেন। রান্নাঘরে তার হাড়িপাতিলের ঝনঝনাঝন শব্দই জানান দিচ্ছে কর্তী আজ বেশ‌ চটেছেন!
ওয়াজেদ সাহেব মানে মানে কেটে পড়ার সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু নাস্তা না খেয়ে বের হওয়া মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা। তাই চুপচাপ খবরের কাগজটা নিয়ে বসার ঘরে বসে আছেন। তানজিম সকালের ব্যাচে কোচিং এ যায় বলে বেঁচে গেছে। নয়তো সব ঝাঁজ তার উপর গিয়ে পড়তো। ওয়াজেদ সাহেবের এই মুহূর্তে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে।
তাহমিনা টেবিলে রুটি, ডিম ভাজি আর তরকারি দিয়ে বললো, খেতে আসো।

ওয়াজেদ সাহেব ডিম ভাজার চেয়ে সেদ্ধ ডিমটাই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু এখন এই ডিমের কথা বলে ম্যাডামের রাগ নড়চড় করা ঠিক হবেনা।

তাহু তুমি খাবে না?

আমার আর খাওয়া! বিয়ে করে এসেছি তো খাটবার জন্যই। রান্না করবো, তোমাদের ফুট ফরমায়েশ খাটবো এটাই তো আমার জীবন। এখন আমি খাই বা না খাই কার কি?

এভাবে বলছো কেন?

তো কিভাবে বলবো? তোমাকে এখন চা না দিয়ে যদি খেতে বসি তোমার সকাল হবে? তোমাদের বাপ-মেয়ের তো আবার চা ছাড়া সকাল জমে না।

আচ্ছা তাহু ঘরে আছিই মোটে তুমি আমি আর তানজিম। তুমি এখন কার উপর রাগ করছো বলো তো?

শোনো আমার বয়সী মহিলারা এখন বসে বসে নাতি নাতনি সামলায়। সংসার সামলায় না! তুমি না মেয়েকে বিয়ে দিবে, না ছেলের বৌ আনবে। আমি অবলা এই বুড়ো বয়সেও রান্না করবো, বাসন মাজবো। ওর সাথের গুলোর বিয়ে হয়ে ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। আর ওকে বিয়েই দিচ্ছো না! এ বাড়ির আবার রেওয়াজ মেয়ের আগে ছেলের বিয়ে করানো যাবে না! কেন যাবেনা হ্যাঁ? এসব রেওয়াজ আসছে কোত্থেকে। বয়স হলে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দেওয়া ফরজ। এখন একজনের জন্য আরেকজনকে বসিয়ে রাখার মানে কি?

তুমি বলছো ওয়াসিকে বিয়ে করাতে?

তুমি যখন তোমার মেয়েকে জোর গলায় বিয়ের কথা বলতে পারবে না তবে বেশ ছেলেকেই করাও। সিদ্ধান্ত তোমার কাকে আগে করাবে। তবে আমি চাই এই বছরেই সমাধান করো। লোকের কথা শুনতে শুনতে আমার কান গেলো। আর পারি না!

ওয়াজেদ সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলেন। নাহ তৃণার বিয়ের ব্যাপারে এবার ভাবতেই হচ্ছে। বয়স তো থেমে থাকছেনা!

চলবে,,,

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব১৯

#আরশিয়া_জান্নাত

ক্লাস শেষে তৃণা তানজিনা, ঊর্মি, শেফা হিজলতলায় বসে আড্ডা দিতে বসেছে। দেখতে দেখতে ভার্সিটি লাইফে ৬টা বছর কেটেছে।এই দীর্ঘ সময়ে অনেক ক্লাসমেটদের বিয়ে হয়ে বাচ্চারাও স্কুলগামী হয়েছে। রূপা বিয়ের পর আর হলে আসে নি। পরীক্ষার সময় আসে তাও না আসারই মতো। কনসিভ করার পর আর এদিকে পা মাড়ায়নি। পড়াশোনার পাট অসমাপ্ত রেখে এখন সংসার নিয়েই ব্যস্ত। বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে ওদের গল্প বেশ জমে উঠেছে। মেয়েদের গল্প মানেই এর ওর সমালোচনা করা, কে কি করেছে, কোথায় কি হচ্ছে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা। এরই মাঝে তৃণা ফোনে তার বাবার কল আসে। তৃণা ওখান থেকে একটু সরে আসে।
আস্সালামু আলাইকুম আব্বু!

ওয়ালাইকুমুস্সালাম। কেমন আছিস?

ভালো তুমি?

ভালো আলহামদুলিল্লাহ। খাওয়াদাওয়া হয়েছে?

হুম তোমার?

হ্যাঁ।

মা,ছোটু ভালো আছে?

আছে।

কি হয়েছে আব্বু তোমার গলা অন্যরকম শোনাচ্ছে?

বাঘিনী ক্ষেপেছেন।

হঠাৎ?

কাল দেখলাম তোর মায়ের দূর সম্পর্কের বোন কতগুলি এসেছিল। ওরা হয়তো তোর বিয়ে নিয়ে কিছু বলেছে। সেই থেকেই মুখ ভার।

ওহ এই ব্যাপার!

হুম। তোর আর কত বছর লাগবে?

এই তো আর ২সেমিস্টার। কিন্তু সময় তো নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না।

আচ্ছা! তোর মা বলছিল এ বছর তোর অথবা ওয়াসির যে কারো বিয়ে সমাধা করতে। তুই কি বলিস?

আমারটার এখন চিন্তা করো না আব্বু। বিয়ের পর পড়াশোনা কঠিন হয়ে যায়। আমার কত ফ্রেন্ড পড়বে বলেও আর পড়তে পারেনি। আমি শেষ মুহূর্তে এসে আটকাতে পারবোনা।

তাহলে কি ওয়াসিকে…

হ্যাঁ ভাইয়াকে করাও ভালো হবে।

তৃণা এটা যে হয় না মা! আমরা মেয়েকে বাদ দিয়ে ছেলেকে বিয়ে করাই না জানোস তো।
আমি বলি কি শোন, আকদ করে রাখি। তুই পড়াশোনা শেষ করার পর অনুষ্ঠান করে নাহয় তুলে নিবে? তাছাড়া ছেলে খুঁজতেও তো সময় লাগবে। তুই অনুমতি দিলে খোঁজ করি?

তৃণা কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল, আব্বু আমি তোমাকে ভেবে জানাচ্ছি। তবে শোনো এখনি কিছু করো না। আমি বলার অপেক্ষা করো প্লিজ।

আচ্ছা বেশ! তাহলে রাখি মা। পরে কথা হবে। সাবধানে থাকিস।

আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ

ফোন রেখে তৃণার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। কি করবে সে এখন?

কি রে মুখ এমন বাংলার পাঁচ করে রেখেছিস কেন? কি হয়েছে?

নাহ কিছু না। চল ক্লাসে যাই।

চল।

“ফ্রি হলে নক করবেন, একটু আর্জেন্ট!”

টেক্সটা দেখতেই ইরহাম ডেস্ক থেকে বেরিয়ে ওয়েটিং স্পেসে গেল। সরাসরি কল ই করলো তৃণা কে। তৃণা ফোন রিসিভ করতেই সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলো।

তৃণা কি হয়েছে?

তৃণা একটু দম নিয়ে বলল, আপনাকে প্রেশার দিতে চাই না, কিন্তু আসলে পরিস্থিতিটা এমন হয়েছে না বলে থাকতে পারছি না।

বলুন সমস্যা নেই।

আব্বু আমার বিয়ের ব্যাপারে ভাবছেন…

ছেলে দেখেছেন নাকি?

নাহ এখনো তেমন দেখেনি। আমার মতামত চাইছে, তাই বলা যায় তার হাতে বেশ কিছু বায়োডাটা আছে।

আচ্ছা!

আমি এখন কি বলবো?

আমি দেখছি, আপনি এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না।

আপনি কি করবেন? আর আমিই বা আব্বুকে কি বলবো?

বলুন যেটা আপনার প্রায়ই বলতে ইচ্ছে হয়!

মানে?!

ইরহাম দুষ্টুমি করে বললো, বলুন যে আব্বু একটা ছেলে আছে, রোগামতোন। অনেকে তাকে তালগাছ বলে ক্ষেপায়। তাকে দেখলেই আমার ইচ্ছে হয় ভাত মেখে খাইয়ে দিতে। এখন তুমি সেই ব্যবস্থা করে দেও তো,,,,

বলেই ইরহাম হোহো করে হাসতে লাগলো। তৃণা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, মজা নিচ্ছেন আপনি? আমি এভাবে বলবো আব্বুকে!

তবে কিভাবে বলবেন?

জানি না,জানলে কি আপনাকে জিজ্ঞাসা করতাম?

আমার উপর ভরসা নেই?

আছে তো

তবে ভয় পাচ্ছেন কেন? আমি আছি তো।

তৃণা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কথাটা মনে মনে আওড়ালো। নিরবতা কাটাতে ইরহাম নরমস্বরে ডাকলো, তৃণা!

জ্বি।

নিশ্চিন্তে থাকুন কেমন! অযথা টেনশন করবেন না।

আচ্ছা।

আর শুনুন

জ্বি?

নাথিং,,, রাখছি। আল্লাহ হাফেজ।

ইরহাম কল কেটে বললো, ভালোবাসি ভালোবাসি এত্তোগুলা ভালোবাসি!!!
অথচ তৃণাকে বলা হয়না,,,,

তৃণা ফোন রেখে বিরস মুখে বলল, গলায় থাকা হাড়টা মনের সব কথা আটকে দেয়। নিশ্চিত অনুভূতি বলতে গিয়েই থেমেছে। একবার বলা যায় না ভালোবাসি? কিংবা মিস ইউ!

তরকারিতে লবণ দিতে দিতে মাঈশা বলল, মা ইরহামকে বিয়ে করাবে না?

রুমানা বেগম ফ্রিজে সবজি রাখছিলেন মেয়ের কথা শুনে খানিকটা চমকে বললেন, হঠাৎ ওর বিয়ের কথা বলছিস!

বলবো না! বিয়ের বয়স তো হলো। পড়াশোনা শেষ করে জব করছে, ভালো ইনকাম করছে। এখন তো বিয়ের ব্যাপারে ভাবা উচিত।

তা ভাবা উচিত ই। হ্যাঁ রে তোর জানা কোনো মেয়ে আছে নাকি? এমনি এমনি তো কথা তুলিস নি। রহস্য তো আছেই।

কেমন মেয়ে পছন্দ তোমার বলো শুধু, দেখবে না লাইন ধরিয়ে দিবো আমার ভাইয়ের জন্য।

রুমানা চেয়ারে বসে বললেন, একটা নম্রভদ্র মার্জিত স্বভাবের মেয়ে, যে আমার মেয়ে দুটোকে আপন করে নিবে। কখনো পর ভাববে না। আর আমার ছেলেটাকে অনেক ভালোবাসবে। ব্যস এইটুকুই!

অনেক কম চাইলে মা! মেয়ের রূপগুণ পরিবার এসব নিয়ে তো বললেই না,,,

ওসব তোর ভাই আর তোরা দেখিস। আমার তো এইটুকুই চাওয়া।

বলি মা একটা মেয়ে আছে। তুমি কি দেখবে?

রুমানা জিজ্ঞাসু গলায় বললেন, কই দেখি?

মাঈশা ফোনের গ্যালারি থেকে ছবি বের করে মায়ের সামনে ধরলো। ছবিটা দেখেই বলে ফেললেন, মাশাআল্লাহ!

পছন্দ হয়?

বেশ সুন্দর তো মেয়েটা। কে ও? কোথায় থাকে?

মা এখানে বিয়ের আলাপ পাঠাই? কি বলো?

আগে ইরহাম কে জিজ্ঞাসা কর। ওর পছন্দের কেউ আছে কি না?

মাইশা রহস্যময়ী হাসি হেসে বললো, আমাদের পছন্দই ওর পছন্দ। ও কিছুই বলবে না।

তবুও, ওকে জিজ্ঞাসা কর। মেয়ের খোঁজখবর নে। সবদিকে ঠিকঠাক হলে পরে কথা আগাবো।

আচ্ছা আচ্ছা।

তৃণার মনের মাঝে নানান দুশ্চিন্তার উদয় হচ্ছে। ইরহাম যদিও তাকে বলেছে চিন্তার কিছু নেই। তবুও মন তো মানে না। কিসব হাবিজাবি কথা মাথায় ঘুরপাক খায়। মনে হয় যদি ওর বাবা ইরহামকে পছন্দ না করে? অথবা ইরহামের ফ্যামিলি ওকে পছন্দ না করে? ইরহামের প্রতি তার দীর্ঘদিনের জমানো অনুভূতি সময়ের পরিক্রমায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। এখন সে ব্যতিত অন্য কাউকেই সে নিজের পাশে কল্পনা করতে পারে না। তার মা-বাবা দুজনই বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। তাদের মনে কষ্ট দেওয়া তৃণার জন্য অসম্ভব। যেসব বাবা-মা সন্তানদের স্বাধীনতা দেন, সেইসব সন্তানদের মনে একটা সূক্ষ্ম ভয় থাকে। তাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করার ভয়। তৃণা সবসময় চেষ্টা করেছে এমনকিছু না করতে যাতে তার বাবা-মায়ের কখনো মনে হয় তারা মেয়েকে স্বাধীনতা দিয়ে ভুল করেছে। তৃণার একবার ইচ্ছে করছে ইরহামের ব্যাপারে মা-বাবাকে বলতে। কিন্তু ওনারা যদি ভুল বুঝেন? ভাবেন তাদের মেয়ে ফাঁকি দিয়ে দূরের শহরে প্রেম করে বেড়াচ্ছে? মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ঠিকই উনারা কষ্ট পাবেন। তৃণার ইচ্ছে করে নিজের চুল নিজে ছিড়তে। মানুষ যে কিভাবে প্রেম করে ফ্যামিলিকে কনভিন্স করে!!

দোস্ত ঘটনা কি বলবি? তোর কি পেট খারাপ হইছে? এমন ছটফট করতেছস ক্যান?

ঊর্মির কথায় তৃণা নাক কুঁচকে বললো, পেট খারাপ হলে কেউ ওয়াশরুমে না গিয়ে রুমে ছটফট করে?

করে তো। তুই জানিস না? তখন এই মনে হয় পেট মোচড়াচ্ছে ওয়াশরুমে যেতে হবে। একটু এগোলেই মনে হয় নাহ সব ঠিকঠাক। এরকম কনফিউশন চলতেই থাকে।

তোর পেট খারাপ তোর মতোই আজাইরা।

হয়, তোর কাছে ঐরকমই লাগবে। এখন বল কি হইছে? তোর কি বিয়ে ঠিক হইছে নাকি?

নাহ!

তোর লক্ষণ তো বলতেছে বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। সেদিন আঙ্কেলের কল আসার পর থেকেই তুই এমন ডায়রিয়ার রুগির মতোন আচরণ করছিস। হ্যাঁ রে তো পেট ক্লিয়ার তো?

তোর নিজের বোধহয় ডায়রিয়া চলতেছে। তাই সব কিছুতে এটার মিল পাচ্ছিস।

শোন এই পৃথিবীতে সবচেয়ে আরামের কাজ দুইটা। একহলো খাদ্য গ্রহণ , আরেক হলো ত্যাগ করা। এই দুইটা যার ক্লিয়ার তার মতো সুখী আর কেউ নাই। বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিতে পারিস।

ঊর্মি তোর এইসব ফিলোসফি বাদ দিবি?

আচ্ছা দিলাম। তুই তো আবার শুচিবায়ু হা*গু*র‌ নাম নিলেই তোর মুখের ভাব বদলে যায়।

উফফ।

আচ্ছা আচ্ছা সরি।

তৃণা বিছানায় পিঠ এলিয়ে বললো,আমি মাইনকা চিপায় আইকাইছি রে মনু। এখন বুঝতেছি না পরিস্থিতি কোন হালে আছে,,,
তখনই ফোনের স্ক্রিনে দাদাভাই নামটা ভেসে উঠে। তৃণা কল রিসিভ করতেই ওয়াসি কাতর গলায় বলল, তৃণা তুই কি বাবাকে বলবি উনি যেন আমার বিয়ের ব্যাপারে ভাবেন?! রিপার যে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে… আমি কি করবো??

রিপার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে! হঠাৎ?

হঠাৎ না রে। অনেকদিন ধরেই দেখছে। মনমতো মিলছে বলে আগায় নি। তাছাড়া ও নিজেও নানান বাহানায় এড়িয়েছে। কিন্তু এবার বোধহয় আর সম্ভব হবে না রে। আমি কি করবো! বাবা তো তোর আগে আমার বিয়েতে মত দিবে না।। আমার কিছু ভালো লাগছে না। তুই কিছু কর।

দাদাভাই শান্ত হও। আমি দেখছি কি করা যায়।

দেখাদেখির সময় নাই। ওরা বিয়ের ডেট ফিক্সড করে ফেললে সব শেষ হয়ে যাবে।

তৃণা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো। কি হচ্ছে তার সাথে এসব! সব বিপদ কি একসঙ্গে উদয় হবার ছিল?

চলবে,,,