#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২০
#আরশিয়া_জান্নাত
আকাশে আজ ভরা পূর্ণিমা। বৃত্তাকার রূপালী চাঁদটা তার সৌন্দর্যের কিরণ ছড়াচ্ছে মনপ্রাণ উজাড় করেই। কফির মগ হাতে তেতলার করিডরের রেলিং ঘেষে সেই দৃশ্যই অবলোকন করছে তৃণা। একটু পরপর ইলেকট্রিক ব্যাটটা দিয়ে মশা নিধন করতে বিরক্ত লাগলেও এই মুহূর্তে জোছনাবিলাস ত্যাগ করতে মন চাইছে না। তৃণা এই সময় কেবল চাঁদ দেখে না, মনে মনে কাল্পনিক কথোপকথন সাজায়। সেই কল্পনায় ইরহাম থাকে ঠিক তার পাশে। যা সে কখনোই বলেনা বা ইরহামও বলেনি তাই বেশ সাজিয়েগুছিয়ে বলতে থাকে একে অপরকে।
যেমন এই মুহূর্তে সে খুব রোমান্টিক একটা দৃশ্য কল্পনা করছে। এমনি এক চাঁদনীপসর রাতে ইরহাম আর সে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট বেলকনীতে। শহরের বেলকনী যেমনটা হয় আর কি! তৃণা তখন কফি করবে না, কেননা জনাবের আবার কফি পছন্দ না। কড়া লিকারের দুধ চা-ই তার পছন্দ। তৃণা চায়ের কাপটা বাড়িয়ে বলবে, নিন আপনার চা! দেখুন তো চিনি ঠিকঠাক আছে কি না?
ইরহাম এক চুমুক দিয়ে বলবে, এটা কি করলেন তৃণা? চা এমন হয়?
ভালো হয়নি? কি কম হয়েছে?
নিজেই দেখুন।
তৃণা চিন্তিত ভঙ্গিতে ইরহামের চায়ের কাপ থেকে চা পান করে বোঝার চেষ্টা করবে ঘাটতি কিসের।
কই সব তো ঠিকঠাক?
ইরহাম তখন বেশ আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলবে, এখন ঠিক আছে। এতোক্ষণ ঠিক ছিল না।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তৃণা ঈষৎ রাগ দেখিয়ে বলবে, আপনিও না একদম বেশি! আমি আরো ভাবলাম….
ইরহাম চাঁদের দিকে চেয়ে বলবে, তৃণা আপনি কি জানেন চাঁদ ছেলে নাকি মেয়ে?
মেয়ে হয়তো,, সবাই তো মেয়ের উপমাই দেয়।
ছোটদের আমরা ছড়া শুনাই কি বলে? “আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা,,,, তবে মেয়ে হলো কিভাবে?
তৃণা ভাবনার সাগরে পড়ে যাবে, আসলেই তো! ইরহাম হেসে বলবে, অল্পতেই আপনি ভাবুক হয়ে যান। শুনুন চাঁদ হচ্ছে Masculine gender। অর্থাৎ পুরুষ। আর সূর্য হচ্ছে Feminine Gender। যদিও আমরা ভাবি সূর্য বুঝি পুরুষ, আসলে তা নয়।
চাঁদ সূর্যেও নারী পুরুষ আছে! মজার তো,,,
হ্যাঁ সবকিছুতেই এটা আছে। সবাই প্রিয়তমাকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করলেও আমি আপনাকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করি। আপনার আলোয় আমার ভুবন আলোকিত হয়। আপনিই আমার জীবনীশক্তির মূল উৎস।
দুপুরের জ্বালাময়ী রোদে ঘন্টাখানেক দাঁড়ানোর পরও এমন কথা বলতে পারবেন?
কেন পারবো না? যার গুরত্ব বেশি তার তেজ একটু থাকবেই, এটাই স্বাভাবিক।
তাই না?
জ্বি, ঠিক তাই।
তৃণা তখনো এমনি মন দিয়ে চাঁদের পানে মন দিয়ে চেয়ে থাকবে, ইরহাম বলবে, এই তৃণা এমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাবেন না ওর দিকে। আমার হিংসে হয়!
তৃণা ওর কথা শুনে হাসতে শুরু করবে, বলবে আপনি তো বেশ হিংসুটে। আগে তো বুঝিনি,,
বুঝবেন কিভাবে? আমি কি বুঝতে দিয়েছি কখনো?
সেটাও ঠিক। কখনো বুঝতেই দেন নি আপনার মনে কি ঘটে…
তৃণার কাল্পনিক কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটে তানজিনার ডাকে,
তৃণা তোর ফোন সেই কখন থেকে বাজছে, তোর জন্য আমার ঘুমটাই ভেঙে গেল। ধর তোর ফোন।
তানজিনা গজগজ করতে করতে ভেতরে গেল। বেচারির কাঁচা ঘুম ভাঙলে মেজাজ ঠিক থাকেনা। তৃণা ফোনটা চার্জে বসিয়ে এসেই ভুল করেছে। ফোনটা হাতে নিতেই দেখে তার মা কল করেছে। রাত ১টায় তার মা সচরাচর কল করেনা। আজ হঠাৎ এতো রাতে কল করায় সে খানিকটা চিন্তায় পড়ে যায়। কল ব্যাক করতেই তাহমিনা বেগম বললেন, তৃণা একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে। তোর ভাই বিয়ে করে বৌ ঘরে নিয়ে এসেছে।
কি বলো!
হ্যাঁ রে। একটু আগেই এলো। তোর বাবা তো রেগে ফায়ার।
ওরা কোথায় এখন? ঘরে ঢুকাও নি?
তো ঢোকাবো না? বাইরে দাঁড় করিয়ে লোক হাসাবো নাকি! ঠিকই আছে কতবার বলেছি ছেলেকে বিয়ে করাও। শোনেনি তো আমার কথা। বেশ হয়েছে, এখন বুঝো ঠেলা।
আম্মু তুমি এই অবস্থায়ও আব্বুকে বকছো!
তো বকবো না? ছেলে আমার শুরু থেকেই সব জানিয়েছে। তোর বাবার এক জেদ বংশের পরম্পরা নষ্ট করবেন না। এখন হলো তো, বংশ পরম্পরার আচার দাও বসে বসে। যাই হোক খুকি ছুটি নিয়ে চলে আয়, ওরা যেমন করেই বিয়ে করুক আমাদের অনুষ্ঠান তো করতে হবে। বড় ছেলের বিয়ে বলে কথা! যা হয় ভালোই হয় বুঝলি। আমার যে কি খুশি লাগছে, ঘরে ছেলের বৌ এসেছে….
তৃণা বুঝলো না সে কি হাসবে নাকি কাঁদবে। এমন পরিস্থিতিতে তার মা ই বা এতো আনন্দিত হতে পারছেন কিভাবে? তার কি চিন্তা হচ্ছেনা রিপার ফ্যামিলি গন্ডগোল করতে পারে? বা কেইস মামলা ঠুকে হাজতবাসী করানোর চিন্তা করে!
কি একটা অবস্থা!!!
।
ওয়াজেদ সাহেব সকালে নাস্তা না করেই দোকানে চলে গেছেন। সকালে ছেলের মুখ দেখারো ইচ্ছে করলো না তার। কেমন অপদার্থ ছেলে বাবা-মা কে না জানিয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে বিয়ে করে বৌ নিয়ে হাজির হয়েছে। একটা বার তার মানসম্মানের কথা ভাবলো না। মনমেজাজ তাই বেশ চটেই আছে। অযথাই স্টাফদের একটু পরপর বকাঝকা করছেন, নানান কাজ দিয়ে বিরক্ত করছেন। তখনই তৃণার কল আসলো তার ফোনে। গলা ঠিকঠাক করে মেয়ের কল রিসিভ করলেন।
হ্যালো আব্বু?
জ্বি আব্বু, কেমন আছে আমার মা?
ভালো আছি। তুমি নাকি সকালে নাস্তা না করেই বের হয়েছ? বাইরের খাবার তো খাও না, এতোক্ষণ না খেয়ে থাকা কি ঠিক হবে?
তোর ভাই কি করেছিস খবর পেয়েছিস?এমতাবস্থায় আমার রাগ করা কি জায়েজ নয়?
অবশ্যই জায়েজ। তুমি রাগ করবে আলবাৎ করবে, রাগ করে দরকার হলে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিবে। কিন্তু রাগ দেখানোর জন্য খাওয়া বাদ দেওয়া তো যাবে না! তুমি না সবসময় আমাকে বলতে খাওয়ার উপর রাগ দেখাতে নেই এতে নিজেরই সবচেয়ে বেশি লস হয়?
শোন মা রাগ দেখিয়ে না খেলে সবচেয়ে বেশি লস নিজেরই হয় এটা আমি এখনো মানি। কিন্তু এও সত্যি রাগ দেখানোর সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হলো না খেয়ে থাকা। এতে অপরজন বোঝে রাগটা গুরুতর। নয়তো দাম দেয় না। তোর ভাই যা করেছে এরপরো তোর মা তাকে গদগদ করছে, এখন আবার মতলব আটছে অনুষ্ঠান করার। দেখ কত বড় স্পর্ধা, আমার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা পর্যন্ত করছেনা!
রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করছে না এখনি বলো না। সবে তো এলো, তার উপর তুমি সকালেই চলে গেছ। ওরা তোমার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলো কখন?
সেটাও কথা!
আচ্ছা আব্বু শুনো, তানজিম কে দিয়ে আম্মু খাবার পাঠাচ্ছে। তুমি খেয়ে নিও কেমন? আমি এখন ক্লাসে যাবো, ক্লাস শেষ হলেই কিন্তু খবর নিবো। যদি শুনি খাও নি তবে খারাপ হবে কিন্তু বলে রাখলাম।
ওয়াজেদ সাহেব মিনমিনে গলায় বললেন, তোর জন্য আমি রাগটাও দেখাতে পারিনা ঠিকঠাক। এতেই ওরা লাই পেয়েছে। নয়তো এমন বলদ ছোকরা আমার বড় ছেলে হয়? উপযুক্ত ছোটবোনকে বাদ দিয়ে নিজের বিয়ে নিয়ে নাচে! ছিঃ আমার চৌদ্দ পুরুষ এই কাজ করেনি,,
আব্বু এসব রেওয়াজ ছাড়ো তো। যার যখন ইচ্ছে তাকে তখন বিয়ে করানো উচিত। এখানে সিকোয়েন্স মেনে লাভ নাই। তোমাকে যা বলছি করো,রাখছি।
আচ্ছা, সাবধানে থাকিস।
রিপা চুপচাপ ঘরে বসে আছে। গতকাল হঠাৎ করেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে ওয়াসির অফিসের সামনে এসে বলেছে কাজী অফিস চলো, এখুনি বিয়ে করবো। যদি তুমি এখন আমার কথামতো বিয়ে না করো তবে আমি এখান থেকে সোজা রেললাইনে যাবো। ফিরে যাওয়ার পথ রেখে আসিনি!
ওয়াসি জানে রিপা খুব জেদি মেয়ে। ও যা বলে তা করেই ছাড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সাক্ষী যোগাড় করে বিয়েটা করে নেয়। ঢাকায় সে ব্যাচেলর বাসায় রিপাকে তুলতে চায়নি, তাই সরাসরি বাসায় নিয়ে এসেছে। তার বাবা ছাড়া সবাই মোটামুটি রিপার সম্পর্কে জানে। তাই এখানে আনার সিদ্ধান্ত নিতে বেশিক্ষণ ভাবতে হয়নি তাকে। কিন্তু তার বাবা যে এতো রেগে যাবেন কল্পনা করেনি। বেচারা পড়েছে উভসংকটে। এ যেন জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘের মতো পরিস্থিতি।
বৌমা বৌমা? দরজা খোলো।
রিপা দরজা খুলতেই তাহমিনা বেগম হেসে বললেন, একি বৌমা মনমরা করে বসে আছো কেন?
আমি আসায় আপনাদের খুব সমস্যা হয়ে গেল না? আঙ্কেল রেগে আছেন,,,
আঙ্কেল কি হু? বাবা বলো। এখন থেকে আমরাও তো তোমার বাবা মা তাই না?আর শোনো উনার রাগ হতেও সময় লাগেনা যেতেও সময় লাগেনা। তাছাড়া এমন ঘটনা ঘটলে বাবা মা রাগ করবেই অস্বাভাবিক তো না।
জ্বি।
এরকম একা একা বসে থেকো না, আসো বসার ঘরে বসবে। বাসায় তো কেউ নেই এখন। তানজিম পড়তে গেছে,তোমার শ্বশুড় তো দোকানেই আর ওয়াসি কখন আসবে সিওর নেই। তাই চলো মা-মেয়ে মিলে গল্প করি।
রিপা তার পিছু পিছু বসার ঘরে গেলো।
তোমার বাসা থেকে কল এসেছিল?
নাহ, ফোন বন্ধ করে রেখেছি।
বোকা মেয়ে, ফোন বন্ধ করলে কেন? সবাই টেনশন করবে না!
আমার আব্বু অনেক রাগী মা, উনি আমাকে জানে মেরে ফেলবেন। তাই ভয়ে ফোন বন্ধ রেখেছি।
তাহমিনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। পরে বললেন, বৌ মা তোমাদের পথটা কিন্তু সহজ হবে না। একেঅপরের সঙ্গ ছেড়ো না কিন্তু। পালিয়ে বিয়ে করার অপশনটা যখন চুজ করেছ, এতে অটল থেকো। একটু চড়াই উৎড়াই হবেই, ধীরে ধীরে সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ।
চলবে,,
#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২১
#আরশিয়া_জান্নাত
আমজাদ আহমেদ চেয়ারে বসে আছেন। মেজাজ তার কতখানি গরম হয়ে আছে দেখে বোঝার উপায় নেই। তার স্ত্রী পলি খানিকটা দূরে বসে স্বামীর জন্য পান সাজাচ্ছেন। তখনই কিছু ছেলে এসে বলল, মামা সবজায়গায় খবর নেওয়া হয়ে গেছে। রিপা কোথাও নেই। আমার মনে হয় এখন থানায় যাওয়া উচিত।
আমজাদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, রুকনের মা তোমার কি মনে হয় তোমার মেয়ে হারাই গেছে? নাকি নিজে ইচ্ছে করে পলাইছে?
পলি পানটা বাড়িয়ে বললেন, চিঠিপত্র তো কিছু লিখে গেল না, না বলে গেছে কিছু। তবে হ্যাঁ ওর আলমারিতে টুকটাক অনেক কিছুই নাই। তাই মনে হয়…
কি রে শুনলি তো তোরা? তোদের বোন আমার মুখে চুনকালি মেখে ভাগছে। ওর জন্য থানাপুলিশ করে আমি এখন সারা দুনিয়ারে জানাইতাম এইডা?
কিন্তু মামা ও ঠিকঠাক আছে কি না এটা তো অন্তত জানা দরকার!
ও ঠিকঠাক থাকুক না থাকুক আমার কি? যাওয়ার আগে আমাগো কথা যখনভাবেনাই, ওর যাওয়ার পর আমরাও ভাবমু না। হিসাব বরাবর।
আমি বলি কি …
না কিছু বলতে আসিস না। তোগোরে অনেক খাটাইছি। আর খাটিস না। রুকনের মা ওগো লাইগা নাস্তাপানির ব্যবস্থা করো। তোরা ভাত খেয়ে যাইস।
বলেই তিনি প্রস্থান করলেন। পলি বললো, শাকিল তোর চেনা পরিচিত এমন কেউ নাই যে বাইর করতে পারবে ওয় কই আছে? সিআইডিতে দেখি ফোন দিয়া কেমনে বাইর করোন যায়। তুই পারবি না বাবা?
মামী ফোন দিয়ে লোকেশন তো বের করা যায়। কিন্তু রিপা তো ফোন বন্ধ করে রাখছে। আর শেষ লোকেশন এখানেই ছিল।
মেয়েটা কই যে গেল, কতবার বলছি মেয়ের মর্জির বাইরে পোলা দেইখো না। তোর মামা শুনেনাই আমার কথা। গেলো তো মানসম্মান ডুবাই!
অপেক্ষা করেন ও ঠিকই কল দিবে। কতদিন আর কল না দিয়ছ থাকবে?
হুম। আচ্ছা তোরা বস আমি নাস্তাপানি আনি।
ওয়াসি চুপিচুপি ঘরে উকি দিয়ে দেখলো বসার ঘর ফাঁকা, তাই নিশ্চিন্ত মনে ভেতরে ঢুকে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতেই ওয়াজেদ সাহেব বাজখাই গলায় বললেন, এমন চোরের মতো চেহারা করে ঘরে ঢুকোস কেন? আমি কি চোর পয়দা করছি?
ওয়াসি ভয়ে চুপসে গেল। ওয়াজেদ সাহেবের দিকে ফিরে বললো, আব্বু ঘুমাও নাই এখনো?
আর ঘুম! ছেলে যে কীর্তি করেছে এরপরো নাকি আমি ঘুমাবো। বদের হাড্ডি, অকর্মার ঢেকি তোর শরীরে আমার রক্ত আছে ভাবতেই আমার বিরক্ত লাগছে।
আব্বু আস্তে বকো, ও শুনলে কি ভাববে বলোতো।
যা সত্যি তাই ভাববে। অল্পতেই বুঝে নিক একটা অপদার্থকে বিয়ে করেছে। ঘরে বউ ফেলে রেখে রাস্তায় রাস্তায় চোরচামারদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিস। কোনো ভদ্রঘরের ছেলে রাত ১টা অবদি বাইরে ঘুরে?
তোমার ভয়েই তো…
ওরেহ বাবা আমারে ভয় পাস তুই! হোহোহোহো ভয়ের এই নমুনা! তোর চেয়ে ছাগলের ভয় বেশি দৃশ্যমান। যত্তসব।
তাহমিনা বললেন, আহহা তুমিও না এই রাতবিরেতে এতো চেঁচামেচি করছো। ঘরে ছেলের বউ আছে একটুও আক্কল নেই। বউয়ের সামনে ছেলেকে এভাবে কেউ বকে?
তোমার ছেলেকে বকবো না তো কি কোলে তুলে ধেঁই ধেঁই করে নাচবো? হারামজাদার পিঠে যে এখনো লাঠি ভাঙ্গছি না এই ওর সাত কপালের ভাগ্য! ফাজিলের ফাজিল একটা।
ওয়াসি এবার নিশ্চিন্তেই চেয়ারে বসলো। বাবা যখন বকা শুরু করেছে তার মানে রাগ পড়তে আর সময় লাগবেনা। নিরব থাকাই ভয়ের ব্যাপার, মুখে বকাঝকা বা রাগ দেখানো হয়ে গেলেই মানুষের মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়।
সে বেশ ফুরফুরে গলায় বললো, মা রিপা ভাত খেয়েছে?
তাহমিনা প্লেটে ভাত দিতে দিতে বললো, তোর জন্য অপেক্ষা করছিল, পরে আমিই জোর করে খাইয়েছি। কতক্ষণ না খেয়ে থাকবে তোর ফেরার ঠিকঠিকানা আছে? কলও ধরিস না তুই।
তুমি আছ না? তোমার ভরসাতেই ওকে রেখে বাইরে বাইরে ছিলাম। কিন্তু লাভ কি হলো যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়।
হ্যাঁ রে ওর পরিবারকে কোনো খবর দিবি না? আজ ২দিন হলো তোরা এলি, ওর বাবা মা টেনশন করবেনা?
ওকে তো বলেছি কল দিতে। বেচারি ভয়ে রাজি হয় না।
ওর বাবা নাকি অনেক রাগি!
হুম। পুরান ঢাকায় সব বাপেরাই রাগি।
আমি বলি কি শোন, ওনাদের খবর দেই। আসতে বলি। কথাবার্তা বলে সব মিটমাট করি। অনুষ্ঠানের আয়োজন তো করা লাগবে, পাড়াপড়শীদের জানাতে হবে না?
হুম দেখি।
খাওয়া শেষে ওয়াসি নিজের ঘরে গেল। রিপার ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। ওকে যে সত্যিই তার ঘরে তার বিছানায় এই অবস্থায় পাবে আশাই ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা বরাবরই দুঃসাহসিক কাজ করে তাকে চমকে দেয়। ওয়াসি শার্ট প্যান্ট বদলে আলগোছে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো।
রিপার কপালে চুমু খেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেই রিপা বললো, ঘুমানোর পর চুমু খাও আদর দেখাও, অথচ জেগে থাকতে পাত্তাই দাও না।
কে বলেছে পাত্তা দেই না?
পাত্তা দিলে এতোক্ষণ বাইরে থাকতে?
একটু কাজ ছিল,,
বাহানা দিবে না। এখানে তোমার কিসের কাজ আড্ডা ছাড়া? মা সব বলেছে, তোমার বন্ধু বান্ধবের অভাব নেই। ওদের নিয়ে বসলে সব ভুলে যাও।
এরই মধ্যে মা সব বলে দিয়েছে?
হুহ।
এখানে খারাপ লাগছে থাকতে?
নাহ।
বাসায় কল করবে না?
জানি না…
এরকম করলে হয় ? উনারা টেনশন করবেন তো।
যদি আমাকে জোর করে নিয়ে যায়? এই বিয়ে মেনে না নেয়?
তেমন হবে কেন? বিয়ে হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে? অযথাই ভয় পাচ্ছ।
রিপা মনে মনে বলল,আমার পরিবারকে চিনোনা….
।
তৃণা অনেকদিন ধরেই ভাবছে ইরহামের জন্য গিফট কিনবে। কিন্তু কি কেনা যায় তা নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। যদিও নিজের ২ভাইয়ের জন্য নানান জিনিস কিনে অভ্যাস আছে তার। ওদের প্রয়োজন অনুযায়ী গিফট বাছাই করতে বিশেষ অসুবিধা না হলেও বিশেষ পুরুষটাকে কি দেওয়া যায় তা আসলেই কনফিউজিং। কোচিং এর স্যালারি হাতে পেয়েই তাই শপিং করতে বের হলো। নানান দোকান ঘুরে শেষে একটা পাঞ্জাবি পছন্দ করলো। ইরহামের পছন্দের পারফিউম, আর একটা ঘড়ি নিলো। বের হবার সময় একটা শাড়ি খুব পছন্দ হয়। ভাবলো কয়দিন পর তো বিবাড়িয়া যাবে, ভাবির জন্য শাড়িটা নেওয়াই যায়। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে চুড়ি, অর্নামেন্টস ও নিলো।
হলে ফিরে সব সুন্দর করে প্যাকেট করে রাখলো। তানজিনা বলল, কি ব্যাপার আজ হঠাৎ এতো শপিং করলি?
কয়দিন পর তো বাড়ি যাবো তাই ভাবলাম কিছু কেনাকাটা করে নি।
হুম এখন তো আবার ভাবিও এসেছে। একমাত্র
ননদী হিসেবে গিফট দেওয়া হচ্ছে!
তৃণা হাসলো। হঠাৎ ফোনে টেক্সট এলো, তৃণা আপনি কোথায় আছেন?
তৃণা রিপ্লাই করলো, হলে। কেন?
আমি বকুলতলায় আছি,
কথাটা শুনে তৃণার মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। ইরহাম এসেছে! এটা সত্যি নাকি কল্পনা? ও দ্রুত গায়ে উড়না জড়িয়ে নীচে দৌড় দিলো।
তানজিনা ডাকলো এই তৃণা দাঁড়া তুই ভুল স্যান্ডেল……
কথাটা শোনার আগেই মহারাণী হাওয়া। তানজিনা হেসে বলল, প্রেমে পড়লে মানুষ আসলেই পাগল হয়ে যায়।
তৃণা হাঁপাতে হাঁপাতে ইরহামের সামনে দাঁড়ালো। ইরহাম মন ভরে দেখলো তার ব্যক্তিগত রমণীকে। পায়ে দু’রকম স্যান্ডেল, ঘেমেনেয়ে লাল হওয়া ছোট্ট মুখ, চুলগুলো কোনোভাবে পেঁচিয়ে কাঠি দিয়ে আটকানো। ওড়নাটাও এই জামার সাথের নয়। এই অগোছালো হয়ে থাকা মেয়েটা ছুটে এসেছে তার একটি ডাকে, আগপিছ কিছু ভাবার সময় নেয় নি, নিজেকে দেখার ফুরসত পায়নি। কেবল তাকে চোখের দেখা দেখার তৃষ্ণা মেটাতে একছুটে এসেছে কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করেই! এই অপার্থিব অনুভূতির তীব্র কড়াঘাতে ভালোলাগায় মন ছুয়ে যায় তার, মনের গহীন থেকে একটাই কথা ভেসে আসে বারংবার, তৃণা তোর। ওর পুরোটা মন জুড়ে কেবল তোরই বসবাস! দূরত্ব তোদের ভালোবাসা একটুও কমায় নি…..
আপনি কখন এলেন? আমাকে বলেন নি কেন আপনি আসবেন?
বললে কি সারপ্রাইজ দিতে পারতাম?
তৃণা চোখ তুলে চায় ইরহামের দিকে, শরীরটা একটু ফিরেছে বোধহয়। পিচ কালারের ফুল হাতা শার্ট ইন করে ফর্মাল গেটাপে এসেছে সে। রোমশ হাতে সিলভার কালারের ব্র্যান্ডেড ঘড়িটা স্বগর্বে বসে আছে, চুলগুলোও বেশ সুন্দর করে সাজানো। গালে খোঁচা খোঁচা চাপ দাড়িগুলো অনেকটাই ঘন হয়েছে। এই টিপটপ নায়কের মতো আসা লোকটাকে পর্যবেক্ষণ শেষে নিজের পায়ের দিকে তাকাতেই তৃণার হুশ ফিরলো। আয়হায় সে শপিং থেকে ফিরে হাতমুখও ধোয়নি। এইরকম অগোছালো বিচ্ছরি অবস্থায় সে দৌড়ে এসেছে। অথচ ইরহাম কি সুন্দর করে এসেছে, আল্লাহ! ও কি ভাবছে তৃণাকে উফ উফ!!
ইরহাম তৃণার অস্বস্তি যেন বুঝতে পারলো। সে স্বাভাবিক গলায় বললো, আপনাকে এমন দেখতে আমার মোটেও খারাপ লাগছে না। ইনফ্যাক্ট ঘরোয়া ভাইব পাচ্ছি!
আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি…
এতো অস্থির হবেন না। শান্ত হয়ে বসুন তো।
তৃণা স্যান্ডেলজোড়া লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে। কি দরকার ছিল ওমন ছুটে আসার। একটু আয়না দেখা যেত না? এতো দিন পর মানুষটার সামনে এলো এমন অযত্নে! ছিঃ…
চলবে,,,