#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২২
#আরশিয়া_জান্নাত
কেমন আছেন?
ভালো, আপনি?
ভালো।
তারপর সাদা গোলাপের তোড়া এগিয়ে বললো, এটা আপনার জন্য।
ওয়াও, অনেক সুন্দর তো। থ্যাঙ্ক ইউ!
ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।
বললেন না তো হঠাৎ চট্টগ্রাম এলেন কেন?
কেন এমনি আসতে পারি না?
নাহ তা নয়, আপনি তো এখন খুব ব্যস্ত থাকেন। অকারণে আসার কথা নয়।
তেমন নয় আসলে, আপনার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছি।
তৃণা উচ্ছাসিত গলায় বললো, সত্যি! শুধুমাত্র আমার সঙ্গে দেখা করতে এতো দূর এলেন?
ইরহাম মাথা চুলকে হাসলো। তৃণা বললো, ভালোই হয়েছে আপনি এসেছেন। আমিও ভাবছিলাম অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই। বাড়ি গেলে বলবো আপনিও আসুন।
আপনি যাচ্ছেন নাকি?
হ্যাঁ। বিয়েতে আমি উপস্থিত না থাকলে হবে?
ইরহাম চমকে বললো, বিয়ে? এরমধ্যে আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল নাকি? কবে কার সঙ্গে! আমাকে বলেন নি তো!
আরেহ না না, আমার না। দাদাভাইয়ের।
ইরহাম হাঁফ ছেড়ে বলল, ওহ তাই বলুন।
আচ্ছা শুনুন আমি ২মিনিটে আসছি, একটু বসুন।
আচ্ছা।
তৃণা ঝটপট রুমে ফিরে উড়না আর স্যান্ডেল চেইঞ্জ করলো। মুখটা ধুয়ে ক্রিম মাখতে মাখতে বলল, তুই কেমন তানজু একটু বলবি না আমি ভুল জুতা পড়ে গেছি!
তানজিনা বললো, তোকে কতবার ডাকছি শুনছোস আমার কথা?
উফ পুরাই বেইজ্জতি। দোস্ত উনি যা হ্যান্ডসাম হয়ে গেছে রে, দেখে তো চেনাই যায় না! আর আমি কি না…. হাহ!
আরেহ তোকে এমনিতেও সবসময় সুন্দর লাগে। এতো প্যারা নিস না।
আরেহ ভালোই হলো, উনার গিফটগুলো দিয়ে দিতে পারবো এখন।
প্যাকেট গুলো নিয়ে তৃণা ফের বকুলতলায় গেল।
এইগুলো আপনার জন্য,,
কি হিসেবে দিচ্ছেন? আমি কে?
তৃণা বিড়ম্বনায় পড়ে গেল। একটু ভেবে বললো, এমনিই দিচ্ছি। কেন চেনা মানুষকে গিফট দেওয়া যায় না?
ইরহাম হাসলো হেসে বললো, তাই না?
আপনার জন্যও আমি কিছু এনেছি।
কি?
এই প্যাকেট টা রাখুন। আর তৃণা একটা জরুরি কথা বলার ছিল।
জ্বি বলেন?
আপনার আগামী ২/৩ মাসে কোনো এক্সাম বা ট্যুর আছে?
উমম ট্যুর আপাতত নেই। আর মিডটার্ম হয়ে গেছে। এক্সাম নেই আপাতত। কেন?
আপনার ইচ্ছে কি? কাবিন করে রাখবো নাকি সরাসরি বিয়ে করে বাসায় নিবো?
তৃণা চমকে তাকালো ইরহামের দিকে। ইরহাম ওদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলছে!
দেখুন এমনিতে আমার কোনো সমস্যা নেই, আপনি যেটা বলবেন সেটাই হবে। আকদ হোক বা অনুষ্ঠান করে বিয়ে আপনি ফাইনাল দেওয়া অবদি আপনি চিটাগংই থাকবেন। আপনার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটবেনা ইনশাআল্লাহ।
তৃণা একটু ভেবে বলল, আকদটা করে রাখলেই ভালো হয়। পরে রিল্যাক্সে অনুষ্ঠান হলো!
আচ্ছা বেশ! আমি উঠি তাহলে, সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
আপনি কি আজই চলে যাবেন?
হ্যাঁ, সকালে আবার অফিস আছে।
ইশ অনেক জার্নি হচ্ছে!
মোটেই না, আপনাকে দেখে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। সাবধানে থাকবেন কেমন? শীঘ্রই দেখা হচ্ছে…
তৃণার ভীষণ মন খারাপ হলো, প্রিয় মানুষকে বিদায় জানাতে কারোই ভালো লাগেনা। তাও এতো অল্প সময়ের জন্য কাছে পাওয়াটা বড্ড যাতনাময়!
।
আজকের রোদটা বেশ তেজি রূপেই কাঠ ফাটাচ্ছে। এমন রোদের দিনে তাহমিনা বেগম ভারি কাপড়গুলো ধুয়ে রোদে শুকাতে পছন্দ করেন। কলির মা এসে কাপড়ধুয়ে ছাদে মেলে দিয়ে গেছে, তাহমিনা তাকে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রি দিতে লাগলেন। তখন কলির মা বলল, আম্মাজী বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন কবে?
এই তো সামনেই, তোর তখন কাজ বাড়বে বুঝলি!
আমারে কিন্তু বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে একটা শাড়ি দিতে হইবো।
সেটা তোকে বলে দিতে হবে? আমার মাথায় আছেই। শোন কলির জন্য সন্দেশ দিচ্ছি। ওর তো অনেক পছন্দ এটা। খবর দিলে ওরে নিয়ে চলে আসিস।
আচ্ছা।
কলির মাকে বিদায় দিয়ে তাহমিনা বেগম রান্নায় মন দিলেন। রিপা এসে বললো, মা আমিও সাহায্য করি?
বেশ তো আয় হাতে হাতে সাহায্য কর।
রিপা আনাড়ি হাতে তরকারি কুটতে লাগলো, তাহমিনা সেটা খেয়াল করে তাকে কৌশল শিখিয়ে দিতে লাগলেন।
ওয়াজেদ সাহেব রিপার বাবার সঙ্গে আলাপ করার সিদ্ধান্ত নেন। যা হবার হয়ে গেছে, এখন মেনে নেওয়াটাই সন্তানদের জন্য ভালো। সেই উদ্দেশ্যেই ওয়াসির সেজ চাচা আর বড় মামাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকায় যান। ওখান থেকে ফলমিষ্টি কিনে ওয়াসিকে নিয়ে রিপার বাসায় যান। তাদেরকে দেখে পলি বেগম প্রথমে না চিনলেও যখন তারা পরিচয় দেন তিনি তাদের বসার ঘরে বসিয়ে আমজাদ সাহেবকে খবর দেন। আমজাদ সাহেব তার ভাগিনাদের নিয়ে বাসায় আসেন। পুরো ঘটনা শুনে তিনি বলেন, দেখেন যেই মেয়ে তার বাপের মানসম্মানের কথা চিন্তা না করে দুইদিনের ভালোবাসার জন্য বাসা থেকে পালাইছে, ঐ মেয়ে তো আমার জন্য মৃত।আমি মরা মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করবো কেন? আপনারা আসছেন ভালো কথা। চা নাস্তা করে যান। কিন্তু অন্য কিছুর আশা করবেন না।
দেখেন ভাই সাহেব ওরা ছোট মানুষ, আবেগের বশে ভুল করে ফেলছে। এখানে আমাদেরো দোষ ছিল। আমরা সচেতন থাকলে আরো আগেই আপনাদের কাছে সম্বন্ধ নিয়ে আসতাম। এখন যা হবার হয়ে গেছে, আপনি ওদের ক্ষমা করে দেন। বিয়েটা মেনে নেন। আমাদের ছেলে খারাপ না, ভালো চাকরি করে, বংশ ভালো। বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। আমার বিশ্বাস আপনি নিরাশ হবেন না। নিজের ভাগিনা বলে বলতেছি না ও সত্যিই অনেক ভালো ছেলে।
কত ভালো ছেলে নমুনা তো দেখলামই! কাপুরুষের মতো মেয়ে নিয়ে ভাগছে, বেডার বেডা হইলে আমার ঘরে আসতো!
এবার ওয়াসির চাচা চটে গেলেন। তিনি তেঁতে উঠে বললেন, ঘটনা পুরোটা না জেনে কথা বলবেন না। আমাদের ছেলে বলেনাই পালাইয়া বিয়ে করতে। আপনাদের মেয়ে নিজে ওর অফিসে এসে বাধ্য করছে বিয়ে করতে। নয়তো আমাদের বংশের ছেলেরা ছোট বোনরে বাদ দিয়ে নিজে বিয়ে করে না।যদি দোষ ধরার থাকতো আমরাও আপনার মেয়ের দোষ ধরতে পারি। আমরা চাচ্ছি সমঝোতা কিন্তু আপনি তো আমাদের বিনয় কে দূর্বলতা ভেবে বসে আছেন!
ওয়াজেদ সাহেব ভাইকে থামিয়ে বললেন, দেখেন ভাই ঘটনা যাই হোক আমি বলছিনা ওরা অন্যায় করেনাই। অবশ্যই করেছে। কোনো বাপ মাই চায় না তাদের সন্তান এমন কান্ড ঘটাক। আমাদের বড়দের কাজ হচ্ছে সন্তানদের ভুল শুধরে দেওয়া।
আমজাদ সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, ছেলের বাপ হয়ে এমন মিনমিন করছেন কেন? আপনাদের মিষ্টি কথার মানে আমি বুঝিনা ভাবছেন? মনে করছেন ছেলে তো ভালোই করছে, বড় ঘরের মেয়ে বিয়ে করে আনছে সমস্যা কি? এখন মেনে নিলে আপনাদেরই সবদিকে লাভ। তাই বিয়ের অনুষ্ঠানেও তড়িঘড়ি। মেয়ের বাপের ঢাকায় যতোটা বাড়ি আছে তার মধ্যে একটা পেলেও মন্দ কি?ওতেই আপনাদের সাত পুরুষের জীবন কেটে যাবে।কি বলিস শাকিল?
বলেই দাম্ভিকতার হাসি হাসলেন।
শাকিল বলল, একদম ঠিক কথা মামা। নয়তো কেউ এমন বিয়ে এতো তাড়াতাড়ি মেনে নেয়? রিপা তো স্বর্ণ গয়না কিছুই নেয়নাই, তাই মন ভরে নাই। এখন আপনি মেনে নিতে দেরি তাদের চাহিদার লিস্ট ধরাইতে দেরী হবেনা। ভালো জানা আছে আমার।
এবার আর কারোই কথার জবাব দেওয়ার রুচি হলোনা। পলি বেগম নাস্তা নিয়ে প্রবেশ করলেও কেউ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করেই নিরবে উঠে বের হয়ে গেলেন।
কি হয়েছে উনারা নাস্তা না করেই চলে যাচ্ছে কেন?
চলে যেতে মন চাইছে চলে যাচ্ছে। যাও গিয়ে ওদের আনা ফলমিষ্টি কাজের লোকদের দিয়ে দাও।
বড়মামা বরাবরই শান্তমেজাজের মানুষ। কিন্তু সেজ চাচা ভীষণ রাগী তিনি ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, বেয়াদব ছেলে খুঁজে খুঁজে এমন ঘরের মেয়েকেই আনতে হলো এ মেয়ে কেমন ভালো হবে বোঝা হয়ে গেছে আমার।
ওয়াজেদ সাহেব নিরব হয়ে রইলেন। তার নিজ শহরের সবাই তাকে সমীহ করে চলে, আজ পর্যন্ত কেউ উঁচু গলায় কথা বলার সাহস করেনি। অথচ ছেলের জন্য তাকে কেমন সব কথা শুনতে হচ্ছে!
ওয়াসি বললো, আমি ভাবিনি আব্বু উনারা এমন অপমান করবে। তাহলে তোমাকে কখনো যেতে দিতাম না। আমাকে ক্ষমা করো আব্বু।
ওয়াজেদ সাহেব কিছু বললেন না। গাড়িতে উঠে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। পথে কারো সঙ্গেই কথা বললেন না।
ওয়াসির চোখে পানি চলে আসে।আজ তার জন্যই এতো কিছু হয়েছে। না সে রিপাকে বিয়ে করতো,না আজ তার বাবাকে এতো অপমান সহ্য করতে হতো। রিপা সবসময় বলতো ওর বাবা রাগী। ও ভেবেছে রাগী বলতে ওর বাবার মতোই। ওর বাবাও রাগ দেখায় আবার নরম হয়ে যায়। অথচ রাগী বলতে যে নির্দয়, অহঙ্কারী অভদ্র ও বুঝায় এ তার ধারণা ছিল না। কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের অপমান সহ্য করতে পারেনা। আর কারণটা যদি হয় সে নিজে তবে তো প্রশ্নই নেই!
চলবে,,,
#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২৩
#আরশিয়া_জান্নাত
হ্যাঁ গো উনারা কি বললেন? আসবেন অনুষ্ঠানে?
তাহমিনার কথা এড়িয়ে ওয়াজেদ সাহেব বললেন, আমার জন্য কড়া করে এক কাপ চা করো তো। শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে।
তাহমিনা আর কথা বাড়ালেন না, স্বামীর গম্ভীর মুখ দেখে বুঝলেন ভালো কিছু ঘটেনি। ওয়াজেদ সাহেব কাপড় পাল্টে মেয়েকে কল দিলেন। এই সময়ে একমাত্র মেয়েই পারবে তার বাবার মনটা ভালো করতে।
হ্যালো আস্সালামু আলাইকুম আব্বু, কেমন আছ?
ওয়ালাইকুমুস্সালাম ভালো আছি মা, তুই কেমন আছিস?
ভালো আছি।
কবে আসবি?
ট্রেনের টিকিট পাচ্ছিনা আব্বু, মনে হচ্ছে বাসে করে যেতে হবে।
এসি বাসে করে চলে আয় তাহলে। তোর তো বাস জার্নি সহ্য হয়না।
হ্যাঁ সেটাই করবো। ডেট ঠিক করলে আব্বু? ভাবিদের ওখানে গিয়েছিলে?
এই শুক্রবার অনুষ্ঠান। গিয়েছিলাম, কিন্তু উনারা আমাদের মতোন না রে। খুব বড়লোক কি না!
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বলল, আব্বু? উনারা তোমাকে অপমান করেছে তাই না?
নাহ রে তেমন নয়, মেয়ে পালিয়ে গেলে বাবাদের যেমন রাগ হয় আর কি!
আব্বু শুনো কে কি বলছে একদম মাথায় রাখবেনা, ওনাদের মুখের কথায় দিন রাত হয়ে যাবেনা। এসব মনে বিরূপ প্রভাব ফেলা ছাড়া কিছুই করতে পারেনা।
তুই চলে আয় না মা, তোকে চোখে দেখলেও আমার মনটা শান্ত হয়ে যাবে। আজকে উনারা আমাকে যেসব বলেছেন,,,, বলতেই ওয়াজেদ সাহেবের চোখ ভিজে আসে, ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করেন। দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিলেন ঠিকই। কিন্তু তৃণার বুঝতে বাকি রইলোনা তার বাবা কাঁদছে। তৃণা সান্ত্বনার স্বরে বলে, আব্বু ও আব্বু শোনো, আমি জানি আমার আব্বু খুব স্ট্রং মানুষ। সে এসব আজেবাজে লোকের কথা গায়ে মাখেনা। আমি কাল সকালেই রওয়ানা হবো। তুমি এখন ভালোভাবে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমাবে কেমন? একদম চিন্তা করো না, আমরা সবাই জানি তুমি বেস্ট। তুমি না বলো সবসময়, লোকে কি বলে তা সাময়িক। নিজের বিবেকের কাছে যতদিন শুদ্ধ থাকতে পারবি ততদিন বাইরের কেউ তোকে পরাজয় করতে পারবেনা। মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দূর্বলতা প্রকাশ হয় তার বিবেকের কাঠগড়ায়।
হুম।
আমাকে প্রমিজ করো আব্বু তুমি নিশ্চিন্ত মনে থাকবে, আমি যেন এসে আমার আব্বুকে আগের মতোই পাই?
প্রমিজ। তুই সাবধানে চলে আয় মা। আব্বু তোকে খুব মিস করছি….
তৃণা ফোন রেখে ঘড়ির দিকে তাকালো। রাতটা বেশি না হলে সে এখুনি বের হয়ে যেত। তার বাবার গলা শুনে মনটা কেমন যেন করছে, আল্লাহ আমার আব্বুর বুকে বল দাও আল্লাহ। তিনি যেন সহীহ সালামত থাকেন।
।
রিপা সেই কখন থেকে ওয়াসিকে কল করছে, কিন্তু তার কোনো পাত্তাই নেই। রিপা অস্থিরচিত্তে বারবার কল করেই যাচ্ছে। ওখানে কি হয়েছে খবরটাও জানা যাচ্ছে না। তার শ্বশুড় সেই যে রুমে ঢুকেছেন রাতে খেতেও বের হন নি। না শাশুড়ি কিছু বলেছে এই বিষয়ে।এখন ওয়াসিই একমাত্র ভরসা। কিন্তু ওয়াসির যে কি হলো, কল ধরছে না কেন! পুরো রাত এক প্রকার নির্ঘুমই কাটলো তার। ওদিকে ওয়াসি ইচ্ছে করেই ফোন রিসিভ করেনি। মনমেজাজ যেমন হয়ে আছে রিপার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আবার ঝগড়া হবে। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়।
ওয়াজেদ সাহেব নাস্তা করে পত্রিকায় খবর পড়ছেন। একটু পরপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছেন সময়টা। নাহ ঘরে বসে থাকলে সময় আর যাবেনা। তাই দোকানের উদ্দেশ্যে বের হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। রিপার সঙ্গে সে এই পর্যন্ত কথা বলেননি, না রিপা চেষ্টা করেছে। ঐ যে বিয়ে করে ঢুকেছিল তখনই যা দেখা, এরপর আর চোখের সামনেও পড়েনি সে। ওয়াজেদ সাহেব এতোদিন বিষয়টা নিয়ে মাথা না ঘামালেও এখন মনে হচ্ছে অহঙ্কারবশতই বুঝি সে তার সামনে আসেনা। নয়তো এক বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও কেউ এমন করে? তার পরিবারের অল্প সদস্যদের মন যুগিয়ে চলার চেষ্টাটুকুও এই মেয়ের নেই! এইযে এমন হুট করে বিয়ে করে চলে এসেছে, একবারও তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে? মান ভাঙানোর চেষ্টা করেছে? একটা দিন এক কাপ চা নিয়ে বলেছে বাবা আপনার জন্য চা করেছি? কই এসব নিয়ে তো তিনি কোনো অভিযোগ করেননি। সে তো বলেনি কেমন পরিবারের মেয়ে ও এভাবে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। এইসব ছাড় দেওয়ার অর্থ তার বাবা ভাইয়েরা কি বের করলো? তাহু তার ছেলের বৌকে নিয়ে যে আদিখ্যেতা দেখাচ্ছে, ঐসব দেখলে যে আরো কি বলতো ভাবলেই গা শিরশির করে। ভাগ্যিস তাকে নেওয়া হয়নি সাথে।
ওগো শুনছো, মেহমানের লিস্ট করেছি দেখো তো কেউ বাদ পড়লো কিনা? সবাইকে দাওয়াত দিতে হবে তো। হাতে সময় বেশি নেই।
তোমার যা খুশি করো না, আমাকে টানছো কেন? আত্মীয় স্বজন কম পড়লে বিবাড়িয়া শহরের সবাইকে ডাকো। সবাই এসে দেখে যাক তোমার ছেলে অস্কার পাওয়ার মতো কি গর্বের কাজ করেছে! তোমার লাফালাফি দেখে মনে হচ্ছে ও কোনো ভুল করেনাই। এভাবেই মাথায় করে নাচো। এসব দেখে পরের দুটোও সেই রকম করে পালিয়ে যাক, আর তুমি প্রতিবার তা ধিন ধিন করে নেচে নেচে ওদের অনুষ্ঠান করবে,,,
তুমি আমাকে এতো কথা শোনাতে পারলে? যেন আমি বলেছিলাম ওকে যা বাবা বিয়ে করে আয়?
তোমার ভাবভঙ্গি দেখে কেবল আমি না যে কেউ এটাই মনে করবে। শোনো অল্পতে মেনে নিলে এর পেছনে কেউই পজিটিভ ধারণা রাখেনা। মানুষ নেগেটিভ ভাবনাই রাখে। যাকে মাথায় করে নাচছো দেখো গিয়ে সেও মনে মনে ভাবছে তুমি তাদের টাকাপয়সার জন্য এতো আদরযত্ন করছো।
তাহমিনা থমথমে গলায় বললেন, গতকাল ওর বাবা তোমাকে টাকার খোটা দিয়েছে তাই না?
ওয়াজেদ সাহেব বললেন,আমার বাবা সবসময় একটা কথা বলতেন জানো? মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত লোকদের সবসময় সালাম দিবি, কুশল বিনিময় করবি, খোঁজখবর নিবি। কিন্তু ধনীদের সেটা বেশি করবি না। ওদেরকে ১দিনের বেশি ২দিন সালাম দিলে ওরা ভাবে তাদের টাকার জন্য বুঝি সখ্যতা করতে চাইছিস। সেদিন বাবার কথা সম্পূর্ণ না বুঝলেও এখন বুঝি বাবা ঠিকই বলতেন। ধনীদের আল্লাহ টাকাপয়সা দিলেও মনটা খুব কম দেন। ওরা সবকিছুতে নিজের অর্থের হিসাবে বিচার করে।
ওদের সম্মান দিলে ভাবে টাকার জন্য সম্মান দিচ্ছ। ওদের পাশে হেঁটে গেলেও ভাববে টাকার জন্য হেঁটে যাচ্ছ! ওদের সবকিছু ঐ টাকা কেন্দ্রীক। বড়টার বেলা তো খোঁজ খবর নেওয়ার সুযোগ দেয়নি। তবে মনে রেখো আমার বাকি সন্তানদের আমি এমন ঘরে দিবো না যাদের প্রয়োজনের অধিক কিছু আছে।
বলেই তিনি বের হয়ে গেলেন।
তৃণা স্টেশন থেকে বাসায় না ফিরে দোকানেই আগে নামলো। বাবাকে চোখে না দেখা অবদি তার মন শান্ত হবেনা। গতকাল রাতে বাবার চিন্তায় সে একটুও ঘুমাতে পারেনি। তার বাবা ভীষণ আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ। বলা তো যায় না অঘটন কিছু ঘটে যায় যদি! আজকাল মনটা কেমন যেন ভীত থাকে। মা-বাবার বয়স হলে বোধহয় সব সন্তানের মনটা অল্পতেই মুষড়ে পড়ে তাদেরকে হারানোর ভয়ে।
তৃণাকে দেখে ওয়াজেদ সাহেবের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো। তৃণা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে বলল, আব্বু তুমি ঠিক আছ তো? জানো আমি কাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি তোমার টেনশনে। উফ কি যে শান্তি লাগছে এখন!
ধুর বোকা মেয়ে আমার কি হবে আর? আমি ঠিক আছি। তোর আসতে অসুবিধা হয়নি তো?
নাহ।
বেশ তাহলে চল একসঙ্গে বাড়ি ফিরি, আমি এতক্ষণ তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
তৃণা একচুলও নড়লো না, চকোলেটের বয়ামটার দিকে চেয়ে বাবার দিকে তাকালো। ওয়াজেদ সাহেব হেসে বললেন, আমিতো ভুলেই গেছি ছোটবেলায় আম্মাজান দোকানে এলেই মিমি চকোলেট দেওয়া লাগতো।
বয়াম থেকে ডেইরি মিল্ক বের করে তৃণার হাতে দিতেই তৃণা হাসি দিয়ে বললো, আব্বু একটা বক্স আইসক্রিম নি?
নে,
তারপর সে নিজে ফ্রিজ থেকে পছন্দমতো আইসক্রিম নিয়ে বাবার সঙ্গে বাসায় ফিরতে লাগলো। সঙ্গে চলতে লাগলো নানান গল্প। ওয়াজেদ সাহেবের হঠাৎ পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। তৃণাকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে এভাবেই মেয়েটা কত গল্প করতো। আজ বহুদিন বাদে বাপ বেটি একই পথে আগের মতো গল্প করতে করতে ফিরছে। পার্থক্য এই তখন তৃণা তার ছোট্ট হাতের মুঠোয় বাবার একটা আঙুল কেবল ধরতে পারতো,আজ সে পুরো হাতটাই ধরতে পারে….
।
মাঈশা তড়িঘড়ি করে বললো, হ্যালো ভাই কখন রওয়ানা দিবি?
ইরহাম বললো, একটু পর বের হবো আপা। কিছু লাগবে?
নাহ কিছু লাগবে না। তুই সাবধানে চলে আয়। আমরা সবাই তো বলতে গেলে একদম রেডি।
এতো তাড়াতাড়ি রেডি হলি কেন! কয়টা বাজে এখন?
যতোটা বাজুক, তোর কি? আমার তো ইচ্ছে করছে এখুনি তোকে উড়িয়ে নিয়ে আসি আর ঝটপট ও বাড়িতে যাই।
আপা তুইও না, মাঝেমধ্যে মনে হয় তুই রুমির চেয়েও ছোট!
হয়েছে হয়েছে, বয়স হলেই যে আনন্দ ফূর্তির প্রকাশ কমে যাবে তা তো নয়। আমি এই দিকে সবসময় আগের মতোই। এখন চটজলদি রওয়ানা হয়ে আয়।আমরা অপেক্ষা করছি।
আচ্ছা।
ফোন রেখে বলল, আম্মা আপনি কখন রেডি হবেন বলেন তো, এখনো গোসল করলেন না?
ওদের অনুষ্ঠান তো রাতে। তুই এখনি এতো ছটফট করছিস কেন বলতো?
হুহ এখন তুমিও এই কথা বলো। রেডি হয়ে বের হতে হতে দেখবে সময় ঠিকই হয়ে যাবে।
রুমানা বেগম গোসলে চলে গেলেন। মাইশা রান্না শেষ করে সব টেবিলে রাখতে শুরু করলো।
চলবে,,,