সে আমার শরৎফুল পর্ব-২৪+২৫

0
264

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২৪

#আরশিয়া_জান্নাত

ওয়াসির সঙ্গে রিপার দেখা হয়েছে ঠিক অনুষ্ঠান শুরু হবার একটু আগে। যদিও তাকে বহুবার বলা হয়েছিল আগে আগে আসতে, কিন্তু ওয়াসী নানান ছলছুতোয় আসেনি। জুম্মার নামাযের একটু আগে বিবাড়িয়ায় এসেই নামাযে গেছে, অনুষ্ঠানের কাজকর্মে বাইরে বাইরেই কাটিয়েছে। রিপার সঙ্গে কথা তো দূর দেখাও করেনি। তাই রেডি হবার জন্য বেডরুমে ঢুকতে দেখেই রিপা দৌড়ে ঢুকে দরজায় খিল দেয়।

কি ব্যাপার আমাকে এভয়েড করছো কেন? আমি কল দিলে কল ধরো না, এর মধ্যে একটাবার বাসায় আসোনি। এসে দেখা পর্যন্ত করলেনা। আমি কি হালে আছি, বেঁচে আছি কিনা তার খোঁজ নেওয়ারো প্রয়োজন মনে হলোনা তোমার!

ওয়াসি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো, আমি তোমাকে জাহান্নামে রেখে যাই নি রিপা! এই বাড়িটা আমার জন্য জান্নাতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তোমার জন্য ও এটা সুরক্ষিত আমি জানি!

রিপা ওর গলা জড়িয়ে মান ভাঙানোর মতো করে বলল, ওয়াসি সেদিন কি হয়েছিল বলবা? সেই থেকেই তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ বুঝতে পারছি আমি। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম আমার ফ্যামিলি অন্যরকম।

ঐদিনের কথা বাদ দাও রিপা। আমি ঐসব বলে এখন পরিস্থিতি খারাপ করতে চাই না। আজকে অনেক আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী উপস্থিত হবেন। জানিনা কেউ কিছু বলে বসে কি না!

রিপা একটু সরে বললো, তুমি এই বিয়েতে খুশি হওনি তাই না?আমি জোর করে তোমার গলায় ঝুলে পড়েছি!

দেখো রিপা আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা মিথ্যা নয়। দীর্ঘদিন আমরা একে অপরের সঙ্গে কমিটেড ছিলাম। হ্যাঁ বিয়েটা এভাবে করার প্ল্যান ছিল না, কিন্তু সিচুয়েশনটা এমন হয়েছে এছাড়া আর কোনো ওয়ে তখন মাথায় আসেনি।

আমার বাবা সেদিন তোমাদের সবাইকে অপমান করেছে নিশ্চয়ই, তার শাস্তি দিচ্ছ আমাকে?

শাস্তি দেওয়ার মতো মনমানসিকতা থাকলে তোমায় সেদিনই ফিরিয়ে দিয়ে আসতাম। আমার বাবা, বড় মামা, সেজ চাচ্চু উনারা এখানে কত গণ্যমান্য ব্যক্তি তোমরা হয়তো জানোনা। মানুষ তাদের সম্মান করেন বিপদে আপদে সবসময় পাশে পায় বলেই। এনারা কেউ তাদের কাছে টাকার জন্য সম্মানীয় নয়। অথচ তোমার বাবা কি বললো জানো…….না থাক ওসব শুনে কাজ নেই। রেডি হতে দাও মেহমানরা এসেই গেছে,

রিপা আর কথা বাড়ালোনা, বেলকনীতে গিয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো।

তৃণা বেশ সুন্দর একটা কাঞ্জিভরম শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো খোঁপা করে তাতে বেলিফুলের মালা জড়িয়েছে। ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল,সেসব তো পূরণ হলোনা। তাই যা হচ্ছে ওতেই মন ভরে আনন্দ করার প্রচেষ্টা। গতকাল ঘরোয়াভাবে ছোটখাটো একটা হলুদের আয়েজন ও করা হয়েছিল।
তৃণা স্টেজের ডেকোরেশন দেখে বললো,ওয়াও দারুণ হয়েছে!
তামজিদের বন্ধু রাতুল বললো, আপু আমরা সবাই মিলে স্টেজ সাজিয়েছি। পছন্দ হয়েছে যখন ট্রিট কিন্তু চাই।

আরেহ ওসব তোদের ভাবতে হবে? তোদের সবার জন্য স্পেশাল গিফট আছে।

তাহমিনা বেগমের ছোটাছুটি চলছে সেই সকাল থেকেই। কেন যে এতো ছুটছেন তিনি নিজেও জানেন না। তৃণাকে বললেন,খুকি তোর ভাবি রেডি হয়েছে? ওয়াসিই বা কই? ওরা স্টেজে বসবে কখন?

ভাবি রেডি হয়েছে তো,চিন্তা করোনা। আমি ডেকে বলছি।আর মা তুমি এমন ছুটছো কেন বলোতো। এতো মানুষ থাকতেও এতো কিসের কাজ?

কত বছর পর সব আত্মীয় একত্রিত হয়েছে জাকসনিস? তাদের আপ্যায়নে যদি ঘাটতি পড়ে ইজ্জত থাকবে? তুই যা ওদের ডেকে স্টেজে বসা।

তৃণা খোঁজ করতেই দেখলো ওয়াসি রেডি হয়ে বের হয়েছে, দাদাভাই ভাবি কোথায়? মা বললেন তোদের স্টেজে নিতে। চল জলদি।
এ কি ভাবি বারান্দায় কি করছো চলো,,

রিপা নিজেকে সামলে হাসিমুখে বের হয়ে এলো।
নীল সাদা বাতিতে পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে, বাড়ির সামনের মাঠে প্যান্ডেল দিয়ে একদিকে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। অপরদিকে স্টেজ করা। দেখতে দেখতে অতিথিদের উপস্থিতিতে জায়গাটা বেশ গমগম করতে লাগলো। একেকজন এসে বরকনের সঙ্গে ছবি তুলছে, রিপাও ঠোঁটে মিথ্যে হাসি ঝুলিয়ে পোজ দিচ্ছে।
কেউ দেখলে টেরই পাবেনা মেয়েটার মন কি নিদারুণ ব্যথায় ব্যথিত!

তৃণা তার কাজিনদের সাথে বসে হাসাহাসি করছিল এমন সময় তামজিদ এসে বলল, আপ্পি আব্বু তোকে ডাকছে। বাসায় চল।

তৃণা উঠে বাড়ির দিকে যেতেই দেখে তার বাবা, চাচা-মামাসহ বেশ কয়েকজন অচেনা মানুষ বসার ঘরে বসে আছেন। তৃণা সবাইকে সালাম দিয়ে তার বাবার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। ওয়াজেদ সাহেব মেয়েকে পাশে বসতে বললেন। তৃণার ভেতরে ভেতরে কেমন অস্থির লাগছে। তার বাবা আবার কোন ছেলে ধরে আনলো! এমন তো কোনো কথা ছিল না? তৃণা আস্তে করে বলল,আব্বু উনাদের ঠিক চিনলাম না?

চিনিস না তো কি হয়েছে, এখন চিনবি। উনারা আমার বিশেষ মেহমান। তোর দায়িত্ব হলো আজকে উনাদের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া। তাদের যত্নে আপ্যায়নে যেন ত্রুটি না থাকে।

তৃণা হেসে বললো, আরেহ এইটা কোনো ব্যাপার হলো। আন্টি আপনারা আমার সঙ্গে চলেন। আপনাদের খাতিরযত্নে কোনো অভাব হবেনা।
আব্বু তুমিও চলো ছবি তুলবা না?

নাহ, পরে।

আচ্ছা আমি তাহলে উনাদের নিয়ে যাচ্ছি।

হুম যা।

তৃণা উনাদের নিয়ে প্যান্ডেলে গেল। ওয়াজেদ সাহেব বললেন, কি মনে হয় এখানে তৃণার মত হবে?

দেখি না আল্লাহ কি চায়।

আন্টি স্টেজে চলেন, ছবি তুলবেন?

নাহ মা আমার ওসব ভালো লাগেনা, ওরা তুলছে তুলুক। তুমি আমার পাশে বসো তো একটু।

তৃণা উনার পাশে বসলো। ভদ্রমহিলা তাকে বেশ মন দিয়ে পরোখ করলেন। হাসিমুখে বললেন, তুমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো তাই না?

জ্বি।

“আম্মা আপনি এখানে? ফোন করছি কখন থেকে ধরেন না কেন?”

চেনা গলা শুনে তৃণা চমকে পেছনে তাকায়। ইরহামকে দেখে সে যতোটা না অবাক হয় তার চেয়ে বেশি অবাক হয় সে এতক্ষণ যার সঙ্গে কথা বলছিল সে ইরহামের মা এই ভেবে!

ইরহাম তার মাকে কিসব বলে চলে গেল, তৃণা যেন ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল সেসব কিছুই মাথায় ঢুকলো না। ইরহাম সরে যেতেই সে বললো, আন্টি আপনি একটু বসুন আমি আসছি। তৃণা ছুটে ইরহামের পিছু গেল,আপনি এখানে? উনি আপনার আম্মু!! ওনারা আপনার পরিবার আমাকে আগে বলেন নি কেন?

ইরহাম হেসে বলল, আপনার এই রিয়েকশন দেখার জন্য বলিনি।

ধুর আপনিও না,, আমাকে আগে বললে কি হয়? আমি আরো কত বকবক করছিলাম উনাদের সবার সাথে!

তোহ কি হয়েছে? কথা বলা খারাপ নাকি?

তা নয়, তবুও লাজুক ভাব তো রাখা উচিত ছিল। উনারা কি ভাববেন বলুন তো!

কিছুই ভাববেন না। অচেনা মানুষদের সঙ্গে যে মেয়ে অল্পতে মিশে যেতে পারে, তাকে মানুষ সচরাচর খারাপ ভাবেনা।

বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন? কি বললো?

ধৈর্য ধরুন না। নিজেই জানতে পারবেন।

তৃণাকে গোলকধাঁধায় ফেলে ইরহাম চলে গেল তার দুলাভাইয়ের কাছে। তৃণা মনে মনে ভাবতে লাগলো এইটুকু সময়ে সে তার দুই বোনকে কি কি বলেছিল। নাহ, খারাপ কিছু বলেনাই। যাক বাঁচা গেল,,,

হেই মিস তৃণা! কেমন আছেন?

ভালো। আপনি?

ভালোই। অনেকদিন পর দেখা,,

হুম।

পরিচয় করিয়ে দেই, আমার ওয়াইফ কাজল। আর কাজল ও হচ্ছে তৃণা বরের ছোটবোন।

তৃণা হাসিমুখে বলল, খাওয়া হয়েছে আপনাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?

আরেহ না। তেমন কিছুই নয়। তা বিয়ে করেন নি এখনো? এখনো কনফিউশন আছে নাকী?বুঝলে কাজল মিস তৃণা গল্প উপন্যাসের পোঁকা। বাস্তব জীবন যে ভিন্ন এটা তিনি জেনেও জানেন না।

কাজল প্রসঙ্গ পাল্টে বললো, আপনাদের এখানে এসে ভীষণ ভালো লাগছে। আপনার মা দারুণ মানুষ। এমনভাবে আপন করে কথা বলেন মনেই হয়না এই প্রথম সাক্ষাৎ। আমি এতো আপনভাব কোথাও পাই নি।

আসবেন মাঝেমধ্যে আমাদের বাসায়। আজ তো তাও অনেক মানুষ আছে। তাই ঠিকঠাক কথাই হয়নি।

আসবো ভাই, অবশ্যই আসবো।

আচ্ছা চলো যাওয়া যাক। যাই তৃণা, ভালো থাকবেন। আর বিয়ের দাওয়াত দিতে ভুলবেন না কিন্তু।

মৃদুল চলে যেতেই তৃণা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তবে তার স্ত্রী ভীষণ মিষ্টি বলতেই হয়!

পরদিন‌ বিকেলে ওয়াসি বললো, তৃণা তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে, ছাদে আয়।

তৃণা ভাইয়ের থমথমে মুখ দেখে দ্রুত ছাদে গেল।

দাদাভাই কি হয়েছে?

আমার কিছু হয়নি। তোর বিষয়ে কথা বলতেই ডাকা।

হুম বলো?

গতকাল বাবা তোকে যাদের দায়িত্ব দিলেন উনারা কে জানিস?

কে?

আমার স্কুল টিচারের পরিবার।‌ ফয়েজ স্যার আমার জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। উনার কথা আমি আজও ভুলতে পারি না। কাল যখন শুনলাম তিনি গত হয়েছেন আরো আগেই খুব খারাপ লেগেছে। যাই হোক কথা হচ্ছে ঐ স্যারের ছেলে ইরহামের জন্য তোর সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে আর্কিটেক্ট, ঢাকায় ভালো কোম্পানীতেই জব করছে। দুই বোন এক ভাই। বড় বোনের হাজবেন্ড ব্যবসা সূত্রে বাবার পরিচিত। মূলত উনিই এই আলাপ এনেছেন। মা বললেন তোর সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে। তুই সম্মতি দিলে উনারা পাকা কথা বলতে আসবেন। আমি জানি তুই পড়া শেষ না করে বিয়ে করতে ইচ্ছুক না, উনাদেরো ইচ্ছে আপাতত কাবিন করে রাখা। তোর ফাইনাল হলে তারপর অনুষ্ঠান হবে।।

তৃণা কিছুক্ষণ চিন্তা করার ভান করে বলল, আচ্ছা আসতে বলো।

গতবারের মতো আলাদা কথা বলতে গিয়ে বিয়ে ভাঙ্গিস না। মত না থাকলে এখনি বলে দে। কাল তো দেখলি না ছেলেকে? পছন্দ হয়?

তৃণা মনে মনে হেসে বলল, দাদাভাই এই ছেলেকে অপছন্দ হবে কেন? সে যে আমার শরৎফুল….

চলবে,,,

#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২৫

#আরশিয়া_জান্নাত

বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে, সূর্য নিস্তেজ রক্তিম বর্ণে পশ্চিম আকাশে গোধুলী ছড়িয়ে বিদায় দেওয়ার আয়োজন করছে। তৃণা ছাদে বসে সেই দৃশ্যই অবলোকন করছিল। গতকাল ইরহামদের বাসার লোকজন এসেছিল। মুরুব্বিরা মিলে কাবিনের ডেট ফিক্সড করে গেল। তৃণাও এবার সম্মতি দিয়েছে। অবশ্য দিবেনা কেন? তার বহু কাঙ্ক্ষিত মানুষটাই যখন পরিবারের পছন্দ হয়ে সিলেক্ট হয়েছে; মানা করার প্রশ্নই উঠেনা। যদিও সবার কাছে এটা এরেঞ্জ ম্যারেজ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তৃণার নিরবতা ভাঙতে রিপা, রুবিনা, সাথী, চম্পা সহ আরো অনেকেই একসঙ্গে ছাদে এলো।

চম্পা বলল, কিরে সন্ন্যাসী অবশেষে তোর ব্রত ভাঙলো? এবার ফাইনালি তোর বিয়ে হবে!

রুবিনা বলল, এখুনি কিছু বলিস না ভাই। ম্যাডামের মতিগতি বোঝা দায়। কখন যে পগাড়পাড় হয়ে যায় বলা যাচ্ছে না।

সাথী বলল, এবার মনে হয় না ভাঙন দিবে। আমাদের আর্কিটেক্ট সাহেব গজফিতায় মেপেই মাঠে নেমেছেন। তার চোখ ফাঁকি দেওয়া যাবেনা।

চম্পা- আমার কিন্তু ভাই ডাক্তারটাই পছন্দ ছিল রে।ফ্রিতে চিকিৎসা করাতে পারতাম।

সাথী–আগে বলতি তার সঙ্গে তোর বিয়েটা দিতাম।

চম্পা– এমন রূপবতী ললনা ছেড়ে আমার দিকে তাকাতো ভাবছিস!

রুবিনা– তোর রূপ কম বলছিস? পাড়ার কত ছেলেদের মন ভেঙে যে রবিনদা তোকে বিয়ে করে নিয়ে গেল!সে খবর জানিনা ভাবছিস?

সাথী– ও ভাই এখনো স্বপনদা কত আফসোস করে জানিস! দেখা হলেই তোর খবর জিজ্ঞাসা করে।

চম্পা– হয়েছে ভাই ওসব পুরনো কাসুন্দি রাখো। বুঝলি তৃণা আন্টির ইচ্ছাতেই সব হচ্ছে। উনার ইচ্ছে ছিল এই বছরি ছেলে মেয়ে দুটোর নাল করবেন। বছর শেষ হবার আগেই দেখ পরপর দুটো বিয়ে লাগলো। রিপা ভাবি ভাগ্যিতা বলা চলে!

সাথী– হ্যাঁ আসলেই! আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।

মাগরিবের আজান পড়তেই সবাই ছাদ থেকে নেমে যারযার বাসায় চলে যায়। তখন তৃণা বলে, ভাবি একটা কথা বলি?

হুম আপু বলো?

আব্বুকে মাঝেমধ্যে চা করে দিয়ে সামনে বসে থেকো। টুকটাক কথা বলবে। উনি এসব পছন্দ করেন তাই বলছি, আমি তো সবসময় থাকিনা।তাই তোমাকে বলছি। এতে সম্পর্ক সহজ হবে, এই সংসার তো এখন তোমারই তাই না?

আচ্ছা আমি এই বিষয়টা মাথায় রাখবো। থ্যাঙ্কস

তৃণা মুচকি হেসে রুমে চলে গেল।

পরদিন সকালে,

আস্সালামু আলাইকুম আপু,

ওয়ালাইকুমুস্সালাম। কেমন আছ তৃণা?

জ্বি আপু ভালো। আপনি ভালো আছেন?

হ্যাঁ। তৃণা শোনো একটা জরুরি কথা বলতে ফোন করেছি।

জ্বি বলেন।

তোমাদের বিয়ের জন্য কেনাকাটা করতে যাবো আজকে, ভাইয়া বললো তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে আসবে কি না।
পাশ‌ থেকে রুমি বলল, ভাবি হ্যাঁ বলে দাও। ভাইয়া আসলে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।

কথাটা শুনে তৃণার লজ্জায় কান লাল হয়ে গেল। কি উত্তর দিবে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল।

মাঈশা রুমিকে বকে বলল, তুই চুপ থাক তো। ও বেচারিকে লজ্জায় ফেলিস না। আচ্ছা তৃণা তৈরি হয়ে থেকো তাহলে, ভাইয়া তোমাকে পিক করবে।

আচ্ছা আপু।

রাখছি, দেখা হচ্ছে।

আল্লাহ হাফেজ।

তৃণা মায়ের কাছে গিয়ে বললো, আম্মু মাঈশা আপু কল করেছিল।

কি বলেছে?

উনারা শপিং এ যাবেন। আমিও যেন সঙ্গে যাই।

বেশ তো যাবি। ওরা নিতে আসবে?

হুম উনি আসবেন বলল।

তাহমিনা টিপ্পনী কেঁটে বললো, উনি টা কে? মাঈশা?

নাহ, উনি আর কি….

তাহমিনা হেসে বললেন, বাব্বাহ আমার দস্যি মেয়ে লজ্জাও পেতে জানে! এক কাজ কর রিপাকেও সাথে নিয়ে যা। সারাদিন বাসায় থেকে বোর হচ্ছে।

আচ্ছা।

তৃণা আকাশী রঙের সালোয়ার কামিজ পড়েছে। চুলগুলো বেনী করা। ইরহামকে চা নাস্তা দিয়ে তাহমিনা মেয়ে আর ছেলের বৌকে তাড়া দিতে লাগলেন। ইরহাম বললো, আন্টি আপনার চায়ের প্রশংসা না করে পারছিনা। আপনি দারুণ চা বানান।

ধন্যবাদ বাবা, বহুদিন বাদে কেউ এটা বললো বুঝলে। আমার শাশুড়ি যতদিন বেঁচে ছিলেন রোজ একবার এটা বলতেন। মারা যাওয়ার আগেও বলছিলেন, বৌমা জান্নাতে তো সব থাকবো, তবুও আমি আল্লাহর কাছে তোর বাননো চা-ই চামু। অবশ্য আমার ছেলে মেয়ে সব কফির পাগল।

আমি কিন্তু চা-ই পছন্দ করি।

ভালো হয়েছে, আমি তোমায় চা-ই করে দিবো সবসময়।

তৃণা আর রিপাকে রিকশায় তুলে দিয়ে ইরহাম পেছন পেছন বাইক নিয়ে আসছে। বেচারা ভেবেছিল আজ অন্তত তৃণা তার বাইকে চড়বে। কিন্তু মনে হচ্ছে বিয়ের আগে সে ইচ্ছে পূরণ হবার নয়!

রিপা বলল, কাবাবে হাড্ডি হয়ে গেলাম যে আপু!

তৃণা বলল, আরেহ না ভাবি কি যে বলো! ভালোই হয়েছে তুমি সাথে আছ। নয়তো ওনাদের মাঝে একা ভয় লাগতো।

শপিংমলে ঢোকার পর সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে সুযোগে ইরহাম তৃণাকে বলল, আপনাকে একা পাওয়াই যাচ্ছে না! কি ঠিক করেছেন হুম দেখা দিবেন না?

আপনি কী ভেবেছেন সীমানার পরোয়ানা জারি করতে কেবল আপনিই পারেন?

আমার পরোয়ানা মেনে কি ক্ষতি হয়েছে? নাকি ভুক্তভোগী একা ছিলেন?

হুহ! ঐসব হিসেব নিকাশ কষবার জন্য আরো অনেক সময় পড়ে আছে জনাব।

আচ্ছা? তা কি নিবো আপনার জন্য? শাড়ি নাকি লেহেঙ্গা?

আপনার কি ইচ্ছে?

আমার তো শাড়ি পছন্দ, বিয়ের কনে লাল টুকটুকে শাড়ি ছাড়া হয়?

তবে সেটাই হবে।

আপনার ভিন্ন ইচ্ছে থাকলে বলুন সমস্যা নেই। আমার কথা এখনি মানতে হবে না।

তৃণা ঠোঁটের কোণে চমৎকার হাসি ফুটিয়ে বলল, আমরা বাঙালি মেয়েরা যাদের মন থেকে ভালোবাসি, তাদের আলাদা করে লোহার শেকলে আমাদের বদ্ধ করতে হয়না। আমরা নিজেরাই তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা খুশিমনে মেনে নিয়ে আনুগত্য স্বীকার করি। ওতেই আমরা সুখী অনুভব করি।

এই ত্যাগ স্বীকার করে কোনো একসময় নিজেকে বন্দী মনে হয় যদি? যদি মন বিদ্রোহ করে বসে?

বন্দিত্বের বিনিময়ে ভালোবাসা যতদিন অম্লান থাকবে বিদ্রোহ হবেনা।

ইরহাম হেসে বললো, তা কতখানি ভালোবাসলে বিদ্রোহ হবেনা?

যতখানি ভালোবাসা পরিমাপের যন্ত্র কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি।

এ তো বেশ চড়া হিসাব হয়ে গেল যে? যন্ত্র ছাড়া বুঝবো কিভাবে কমবেশ হচ্ছে কি না?

সে নিয়ে আপনিই ভাবতে থাকুন। সব আমি বললে হবে নাকি।

এ জুলুম তৃণা! এই অসহায় ছেলেটার উপর এমন নিষ্ঠুরতা করবেন না।

ইশ খুব অসহায় সে তাই না?

জ্বি আপনার সামনে বড্ড অসহায় বটে!

তৃণা ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে বলল, এসব মনভুলানো কথায় হবেনা। আমি কিন্তু হিসাবে বেশ পাকা।

বেশ তবে ও হিসাবনিকাশের ভার আপনার হাতেই থাকুক। আমার কাজ কেবল ভালোবেসে যাওয়া…

দু’হাত ভর্তি মেহেদি দিয়ে তৃণা বসে আছে, একটু পরেই তাকে বৌ সাজানো হবে। কাউকে বলবেনা বলবেনা করেও অনেক মানুষ এসেছে। ঘরোয়া ভাবে কাবিন হবার কথা হলেও এখন বাবুর্চি এনে রান্নার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তৃণা মেহেদি তুলতে তুলতে মনে মনে বললো, ভেবেছিলাম ভাইয়ার অনুষ্ঠানের পর নিজের বিয়ের প্রেশারটা বেশি হয়ে যাবে। তাই আকদ করার বুদ্ধি দিয়েছি।‌ এখন যে হাল মনে হচ্ছে বিয়ের চেয়ে কম খরচা হবেনা!

ওয়াজেদ সাহেব দরজায় নক করতেই তৃণা বললো, এসো আব্বু

কি করছিস মা?

এইতো মেহেদি তুলছিলাম। দেখো তো রং কেমন হলো?

সুন্দর!

কিছু বলবে আব্বু?

বিশেষ কিছু না। তোর সঙ্গে কথা বলতে এলাম। একটু পর তোর বিয়ে হবে। যদিও এখনি তুলে দিচ্ছি না। তবুও পরের ছেলের অধীনস্থ হয়ে যাবি। স্বামীর আদেশের সামনে বাবা-মায়ের আদেশও গৌণ হয়ে যায়।

আব্বু এভাবে বলিও না, আমি তখনো তোমারই মেয়ে থাকবো। এখানে কেউ বাধা দিলে মানবোনা।

ওয়াজেদ সাহেব হেসে বললেন, তা জানি। তোকে সম্পর্কের মহত্ত্বটা বোঝাতে এটা বললাম। সবাই তো ভালো হয় না মা। এমন অনেকে আছে যারা বিয়ের পর স্ত্রীর বাপের বাড়িতে পাঠাতে চায় না, খোঁজখবর নেওয়াতেও হস্তক্ষেপ করে। সেক্ষেত্রে মেয়েগুলি বড় অসহায় হয়। চাইলেও মা-বাবার খিদমতে হাজির হতে পারেনা। তাদের কাছে অধিকারবোধ বিয়ের আগ অবধিই প্রযোজ্য ছিল। যাক সেসব কথা আশা করি ইরহাম তেমন হবেনা।

তারপর তৃণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, জানিস মা, সমাজের এই নিয়মটা বাবাদের জন্য ভীষণ কষ্টের। হয়তো কন্যারা স্বল্প দিনের আমানত বলেই আল্লাহ আমাদের অন্তরে তাদের প্রতি অঢেল মমতা দিয়েছেন। নয়তো কেউই কন্যাসন্তান লালন করতে চাইতো না। যাকে একসময় পরের ঘরে পাঠাতেই হবে তার জন্য জেনেশুনে মায়া পুষতে কয়জনই বা চাইতো? অথচ দেখ হলো ঠিক তার বিপরীত। দেখা গেল মেয়েদের জন্যই বাপেদের বুক বেশি জ্বলে! পরের ঘরের সম্পদ জেনেও কত আদর যত্নে লালন পালন করি।

আব্বু,,

জ্বি আব্বু

কান্না থামাবে! তুমি এমন কান্না করতে থাকলে বাদ দাও এই আয়োজন। আমি বিয়ে করছি না। সবাইকে মানা করে দাও। আমার সত্যিই ভালো লাগেনা আব্বু। অযথাই সমাজের দোহাই দিয়ে বিয়ে দিতে হবেনা। আমি তোমার কাছেই থাকবো সবসময়। বিয়েশাদী ক্যানসেল।

ওয়াজেদ সাহেব চোখের পানি মুছে হেসে বললেন,ধুর বোকা মেয়ে। তেমন হয় না। এই আমি কান্না থামিয়েছি। একটা সুপাত্রের হাতে মেয়েকে অর্পন করার মাঝে যে আনন্দ আছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ঐ সুখের সামনে এই দুঃখ কিছুই না।
তুই তৈরি হয়ে নে। ওরা চলে আসলো বলে!

ওয়াজেদ সাহেব একপ্রকার ছুটে পালালেন। মেয়ের সামনে থাকলে তার কান্না থামবেনা। আর তৃণার সত্যিই বিশ্বাস নেই, বিয়ে থামিয়ে দিতে ২মিনিট ভাববেনা।
তৃণা একলা বসেই কাঁদতে লাগলো।

চলবে,,,