#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২৬
#আরশিয়া_জান্নাত
“কবুল” শব্দটায় ৩টি মাত্র অক্ষর। অথচ এর ভার অনেক বেশি। এই একটা শব্দের মাধ্যমে সম্পর্ক বদলে যায়। বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দু’টি মানুষ একে অপরের অতি আপনজন হিসেবে পথ চলতে শুরু করে। প্রতিটি মেয়েকে আপনজনদের ছেড়ে ভিন্ন একটি পরিবারে নতুন করে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়।
তৃণা আর ইরহাম একে অপরকে কতোটা ভালোবাসে তার বহিঃপ্রকাশ একে অপরের নিকট কম ঘটলেও, দু’জনে ঠিকই এর তীব্রতা অনুধাবন করতে পারে। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা এই প্রণয়ের সন্ধিতে দুজনেই আজ পুলকিত।
তৃণা কাবিননামায় সাইন করার আগ অবদি পরিবারের সকলের মনের মধ্যে একটা শঙ্কা ছিল। তাই যখন সে আলহামদুলিল্লাহ কবুল বলে সাইনটা করে ওয়াজেদ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। তাহমিনার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। এতোদিন তিনি মেয়ের বিয়ে নিয়ে কত উথালপাতাল করেছেন। অথচ এখন বুকটা কেমন হুহু করে উঠছে অবর্ণনীয় যন্ত্রণায়।
হয়তো মেয়ের বিয়ের সময় প্রতিটা বাবা-মায়ের মনের অবস্থা এমনি হয়।
সকলের মাঝে মিষ্টি বিতরণ শেষে ওয়াজেদ সাহেব ও তাহমিনা বেগম অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
সাথী বলল, এই তৃণা এতো কাঁদিস না বোন। এখুনি তোকে নিয়ে যাচ্ছে না তো। কিছু কান্না বিদায়ের জন্য জমিয়ে রাখ না!
রুবিনা বলল, এতো কষ্ট করে সাজিয়েছি সব ঘেটে যাচ্ছে!
তৃণা হিঁচকি তুলে বলল, তোরা এই সময়েও মেকাপ নিয়ে পড়ে আছিস! আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে…
সাথী ওকে জড়িয়ে বলল, আমরা সবাই এই সময়টা পার করেছি ময়না। আমরা জানি এই সময়ে বুক ভেঙে শুধু কান্নাই পায়। তবুও বলছি শক্ত হ, নিজেকে সামলা। তুই কান্না করবি বলেই আঙ্কেল আন্টি ভাইয়া সবাই দূরে দূরে আছেন। কেউ এখানে থাকার সাহস করছেন না। ওনাদের মনের অবস্থাও বুঝ বোন!
হঠাৎ চম্পা এসে বললো, দুলাভাই এ ঘরে আসছেন।
তৃণা চোখের কোণে টিস্যু চেপে কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করলো।
ইরহাম রুমে ঢুকে সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বললো, আপনারা কি একটু সময় দিবেন আমি উনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
সবাই নিরবে প্রস্থান করলো। ইরহাম চেয়ে দেখলো কেঁদেকেটে তৃণার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। লাল রঙের শাড়িতে বধূবেশে থাকা বহুকাঙ্ক্ষিত নারীটা এখন থেকে একান্তই তার, এই সত্যিটা বুকের ভেতর যেমন আনন্দের ফোয়ারা ভাসাচ্ছে। তেমনি ক্রন্দনরত অবনত মুখ নীল ব্যথায় অস্থির করে তুলছে।
তৃণা?
হুম
মন খারাপ করবেন না প্লিজ। আমি জানি আপনার মনে এখন অনেককিছুই চলছে। হয়তো সেটা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই,কিন্তু আমি অনুভব করতে পারছি আপনি কষ্ট পাচ্ছেন।
হুম।
ইরহাম তার পাশে বসলো। পূর্ণ অধিকারবোধে তৃণার কোমল হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। তৃণা বিস্মিত চোখে ইরহামের দিকে তাকালো। ইরহাম তার অনামিকায় স্বর্ণের আংটি পড়িয়ে হাতের উল্টোপিঠে আলতো করে চুমু খেলো।
ঘটনার আকস্মিকতায় তৃণার কান্না একদম থেমে গেল। ইরহামের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে তনুমন লজ্জায় নুইয়ে পড়লো। বুকের মাঝে থাকা ছোট্ট মাংসপিন্ডটা তড়িৎগতিতে স্পন্দিত হচ্ছে। অদ্ভুত এক শিহরণে শরীরটা কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। ইরহাম স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তার নববধূর দিকে চেয়ে হাসলো। যাক কান্না থামলো অবশেষে!
আকাশে আজ নবমীর চাঁদ। এখন গভীর রাত। চারদিকে সুনশান নিরবতা, মাঝেসাজে কিছু কুকুর ডেকে উঠছে তীব্রস্বরে। তৃণা বেলকনীর চৌকাঠে বসে ভাবছে তার জীবনের সুন্দর এই দিনটার কথা। হাতের আংটিটার দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে মনের অজান্তেই। ইরহাম আজ প্রথমবার তাকে স্পর্শ করেছে। সেই স্পর্শের অনুভূতি এখনো যেন বুকের মাঝে শিরশির অনুভব করাচ্ছে।ভাইব্রেশনের শব্দে তৃণার মনোযোগ গিয়ে পৌছায় ফোনের স্ক্রিনে। জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে তার প্রিয় পুরুষটির নাম,
হ্যালো,
কি করছেন?
বসে আছি
চাঁদ দেখছেন?
হুম। কিভাবে বুঝলেন?
মনে হলো ঘুমান নি, আর আকাশেও এমন মোহনীয় সৌন্দর্য বিরাজ করছে। অনুমান করাই যায়।
আপনি নিষ্ঠুর ইঞ্জিনিয়ার সাহেব! আপনার মন ইট সিমেন্ট আর কংক্রিটের মতো।
এই কথা বললেন কেন?
বলতে ইচ্ছে হলো বলেছি।
এমন উপমা দেওয়ার কারণ কি জানতে পারি না তৃণা?
তৃণা আকাশের দিকে চেয়ে বললো, আজকে আমাদের খুব বিশেষ রাত ছিল, একটা দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ছিল। আমি ভেবেছিলাম আপনি আজ অন্তত থাকবেন! সবাই তো বলেছিল থাকতে…
ইরহাম নিঃশব্দে হাসলো। স্বাভাবিক গলায় বলল, দূরত্ব ঘুচে গেলে পরবর্তীতে দূরত্ব সহ্য করা কঠিন হয়। সত্যি বলতে আমি ইচ্ছে করেই থাকিনি।
সবকিছুতে আপনার বাড়াবাড়ি!
তেমন নয় তৃণা। আমি চাই আমাদের প্রথম রাতটা খুব বিশেষ হোক। সেখানে তো কাউকে বলতে পারতাম না ফুল দিয়ে বাসর টা অন্তত সাজাও! তাছাড়া আপনার ও রেস্ট দরকার ছিল। সারাদিন কেঁদেকেটে চোখমুখ যেভাবে ফুলিয়েছেন!
তৃণা ভেংচি কেটে বললো, সে যাই বলেন।আপনার নিষ্ঠুরতা মার্জনা হবেনা। আমি সব পইপই করে হিসাব রাখছি মাথায় রাখবেন।
শাস্তি দিবেন বুঝি?
সেটা সময়েই বোঝা যাবে।
তৃণা??
জ্বি
একটা কথা বলেছি আগে?
কি কথা?
না থাক কিছু না..
তৃণা খানিকটা রেগে বললো, আজ কথাটা গিলে ফেলবেন না প্লিজ!! নয়তো আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবেনা
ইরহাম মাথা চুলকে হাসলো। শান্তস্বরে বললো, ভালোবাসি,,
তৃণা চোখ বন্ধ করে বললো, কি বললেন শুনিনি আবার বলুন।
ভালোবাসি।
কি ভালোবাসেন?
আপনাকে ভালোবাসি!
তৃণা বিজয়ের হাসি দিয়ে বললো, আমিও আপনাকে অনেক ভালোবাসি,,,,
।
চায়ের দোকানে বসে ইরহাম তার পাড়ার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। এমন সময় বাদল বললো, একটা জব্বর খেল খেলছে আমাদের তাহের। কি সুন্দর কইরা ইরহামের ব্যাপারটা সলভ করছে। আমি পুরাই ইমপ্রেসড মামা।
নিষাদ বললো, আসলেই। ওয় যদি বুদ্ধি কইরা ফারদিন ভাইরে তৃণা ভাবির খোঁজ না দিতো এতো সহজে সবটা মিটমাট হতো না।
তাহের বললো, শোন অনেকসময় দেখছি পছন্দের বিয়েতে দুই পরিবারের অনেক কাহিনী থাকে। কিন্তু নিজেদের পছন্দসই সম্বন্ধ হলে এতো গড়িমসি করে না। তাছাড়া ফারদিন ভাই ওয়াজেদ আঙ্কেলের পরিচিত মানুষ। তার মাধ্যমে প্রপোজাল গেলে এখানে অস্বাভাবিক কিছুই মনে হবেনা। এই ভেবেই এই ফন্দি আটছি।
বাদল বলল, ইরহামের লাইন তো ক্লিয়ার করলি আমাগোটাও একটু মাথায় রাখিস।
তোরা আগে একটায় স্থির তো হ!
ইরহাম বলল, আমি আসলেই কৃতজ্ঞ দোস্ত। তুই না থাকলে আমি কি যে করতাম!
আরেহ মামা চিল। তুই আমার জানের দোস্ত। আমার লগে ফর্মালিটিস মারাইস না তো। নসীবে যা ছিল তাই ঘটছে। আমি উছিলা মাত্র।
ইরহাম হেসে বন্ধুর দিকে তাকালো। তাদের আড্ডা চলতে লাগলো দীর্ঘক্ষণ…
তৃণা ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। কাল সকালের ট্রেনে ভার্সিটিতে ফিরবে। রিপা দরজায় নক করে বললো, আপু আসবো?
হ্যাঁ ভাবি এসো।
গোছগাছ সব শেষ?
এইতো প্রায় শেষ। কিছু বলবে?
নাহ তেমন কিছু নয়। এমনিই দেখতে এলাম।
ভাবি তোমার কি মন খারাপ? কেউ কিছু বলেছে?
রিপা ম্লান হেসে বললো, আম্মুকে কল করেছিলাম।
কি বললেন তিনি? ভালো আছেন উনারা?
আছেন।
দেখো ভাবি সময়টা যেতে দাও। উনারি এখন রেগে আছেন হয়তো কটু কথাও শোনাচ্ছে ওসব গায়ে মেখোনা। উনাদের রাগ পড়লে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তোমরা খুব ভালো আপু, আমাকে কত সহজে আপন করে নিয়েছ। কখনো কটু কথা পর্যন্ত বলোনি। অথচ সেদিন বাবা সবাইকে কত অপমান করলো। ভাবতেই আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করে..
ছি ভাবি কি বলো এসব? এসব মাথায়ও রেখোনা। তুমি শুধু আমার মা-বাবার খেয়াল রেখো ভাবি। আমাদের ভাইবোনের আর কিছু চাওয়া নেই।
তাহমিনা এসে বলল, বৌমা ফোন ফেলে এলে যে? ধরো ওয়াসি কল করেছে।
রিপা ফোনটা নিয়ে চলে গেল। তাহমিনা মেয়ের পাশে বসে বলল, হ্যাঁ রে আবার কবে আসবি?
আগে আগে তো বলতে পারছি না মা। তবে দেরি হবে এবার।
তাহমিনা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,ও বাড়িতে নিয়মিত ফোন করিস, খোঁজখবর নিস।
হুম।
পড়াশোনা ঠিকঠাক করবি।
আচ্ছা।
খুকি তুই এখন শুধু আমাদের মেয়ে না, পরের বাড়ির বৌ ও। সাবধানে চলিস মা। ওরা ভরসা করে তোকে পড়তে দিচ্ছে সেটা বজায় রাখিস।
আমি জানি আমার মেয়ে মর্যাদা হানি করবেনা। কথার কথা বলছি আর কি।
বুঝছি। আম্মু আব্বুর দিকে খেয়াল রাখবা। অযথা বকবা না। উনি এখন নরম হয়ে গেছেন। একটু চোখে চোখে রাখবা। আর ভাবিদের ওখানে আপাতত আর পাঠাইও না। ভাইয়াকেও বুঝাবা। ভাবির সঙ্গে সেসব নিয়ে মনোমালিন্য না করতে। আমি তো বলিই তুমিও বলিও।
হুম। কাল তোকে তুলে দিতে জামাই আসবে?
আসার কি দরকার?
কি যে বলিস তুই! সে আসবেনা? তার দায়িত্ব আছে না তোর প্রতি?
কার দায়িত্ব কি আমি কি করে বলবো?
তাহমিনা হেসে বললো, রেগে আছিস?
নাহ তো! রাগ করবো কেন?
তোর নাকের ডগা দেখে বোঝা যায়।
শোনো মা নেহাতই আমি বাধ্য মেয়ে বলে এই লোককে বিয়ে করেছি। নয়তো এমন নির্দয় লোককে কোনো মেয়ে বিয়ে করতো না।
নির্দয় বলছিস কেন? অনেক ছেলে আছে শ্বশুড়বাড়ি আসতে লজ্জা পায়, অস্বস্তিবোধ করে। হয়তো তাই সে আসেনা..
উনার পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতে আসবেনা। নিজেদের পছন্দ তো তাই দোষ খুঁজে পাও না আর কি! একটা দিন বেড়াতে পর্যন্ত নিয়ে গেল না। এতো হাড়কিপ্টে! এর সঙ্গে বাকিজীবন সংসার করবো কি করে?
হাহাহা…তার সংসারে গিয়ে আগে বস তারপর নাহয় ঝগড়া করিস। তবে আমিতো তার প্রতি অসন্তোষ হতে পারছিনা মা। সে তোকে সময় দিচ্ছে নিজেকে সংযত রেখে। তুই না বলিস বিয়ের পর মেয়েদের পড়াশোনা হয় না। বছর না ঘুরতে বাচ্চা হয়ে যায়। এখন যখন সে দূরত্ব রেখে তোকে স্পেস দিচ্ছে রাগ করছিস কেন?
তৃণা মনেমনে বলল, রাগ করবো না মা? আমাকে কি অনুভূতিহীন রোবট ভাবো? তার সান্নিধ্য পেতে কত বছর অপেক্ষা করছি! অথচ সে একটু ছুয়েও দেখলো না। কি আমার সাধুবাবা রে! ধ্যানে বসেছে,কঠোর তপস্যা করবেন তিনি!
সব আমি তুলে রাখছি তো সুদেআসলে শোধ করতে হবে তার। যদি আগে জানতাম সে এমন পালাই পালাই করবে ভুলেও কাবিন করতাম না। সোজা বিয়ে করে তার ঘরে উঠতাম। তারপর দেখতাম কিভাবে দূরে দূরে থাকতো,,,,,
চলবে…
#সে_আমার_শরৎফুল #পর্ব২৭
#আরশিয়া_জান্নাত
ট্রেন আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তৃণা আশা করেছিল ইরহাম স্টেশনে আসবে। এমন নয় সে একা যাতায়াতে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু সম্পর্কের অধিকারবোধ বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি? ইরহাম তো বেখেয়ালী পুরুষ নয়। সে বরাবরই দায়িত্ববান। তবে আজ কেন এভাবে মন ভাঙছে তার? অভিমানে তৃণার মন খারাপ হয়ে যায়। বাবার থেকে বিদায় জানিয়ে ট্রেনে উঠে। বিবাড়িয়ায় ট্রেন বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না, তাই দ্রুতই বগীতে উঠতে হয়। তৃণা নিজের সিটে বসে বাবার দিকে হাত নাড়ে। ওয়াজেদ সাহেব জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, সাবধানে থাকিস। আর মন দিয়ে পড়বি কেমন? আব্বু ফোন দিবো।
আচ্ছা আব্বু। টেনশন করিও না কেমন?
হুম।
ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে, তৃণা বাবার দিকে চেয়ে থাকে যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়। হঠাৎ খেয়াল করে তার বাবা ট্রেনের দরজার দিকে চেয়ে হাসিমুখে কি যেন বলছে। কৌতুহলী দৃষ্টিতে সে পেছনে ফিরে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু চেনা কাউকেই নজরে পড়েনা। তৃণা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে মনোনিবেশ করে, হঠাৎ পাশের সিটে একজন বসতেই তৃণা ফিরে চায়। চমকে বলে উঠে, আপনি!
ইরহাম হেসে বললো, কি ভেবেছেন আমার একমাত্র বৌকে একা একা এতোদূর পাঠাবো?
আপনি না ঢাকায় ছিলেন! অফিসে বিজি?
হু, ঢাকা থেকেই তো এসেছি। আপনি বোধহয় টিকেট টা খেয়াল করেন নি।
তৃণা মনে মনে আনন্দিত হলেও মুখে বলল, কি জানি অতোকিছু খেয়াল করার সময় আছে নাকি!
ইরহাম ১টা প্যাকেট ধরিয়ে বললো, গলা ব্যথা কমেছে?
হুম। কি এগুলো?
প্যাকেট খুলে তৃণা এবার হেসেই ফেলল। চিপস, বিস্কুট, ওয়েফার, চকলেট আচার সহ টুকটাক অনেক কিছুই ইরহাম কিনে রেখেছে।
আমি খুব স্যরি তৃণা, আসলে ওভাবে সবাইকে বলিনি তো বিয়ের কথা, বিয়ের জন্য বিশেষ ছুটিও নেওয়া হয়নি। তাই আপনাকে সময় দিতে পারিনি। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না। জানেন আপা আর মা অনেক বকেছে আমাকে!
তৃণা বললো, এসব বুঝি রাগ ভাঙানোর জন্য ঘুষ?
নাহ নাহ, আপনি জার্নিতে খেতে ভালোবাসেন সেই উদ্দেশ্যেই নেওয়া অন্য কিছু নয়। আপনার রাগ আমার কাছে এতো তুচ্ছ নয় ম্যাম। ওটা আমি কেবল দায়িত্ব পালন করে ভাঙাবোনা। ওটা হবে বিশেষ পদ্ধতিতে।
তৃণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ইরহামের দিকে তাকালো। ইরহাম বললো,আপনি এখনি হলে যাচ্ছেন না। আমরা আজ কক্সবাজার যাচ্ছি!
সত্যি বলছেন! আমাকে আগে বলেন নি কেন?
আপনি সবসময় এমন করেন, হুটহাট কিসব যে করে বসেন। আমি একটাও শাড়ি আনিনি,কাপল ফটো তুলবো কিভাবে।
ইরহাম বললো, আমার শাশুড়ি মা ভীষণ ফ্রেন্ডলী বুঝলেন। তিনি সুযোগমতো আপনার ব্যাগে সব গুছিয়ে দিয়েছেন। ইনফ্যাক্ট এই প্ল্যানটা উনিই দিলেন।
তৃণা বললো, এরই মধ্যে আম্মুকে হাত করে ফেলেছেন!!
ইরহাম মাথা চুলকে বললো, কি করবে মেয়ে যে তার রাগীনি। জামাইকে একটু আধটু বুদ্ধি না দিলে উনার মেয়ে যে সংসার করবেনা! এমনিই হাড়কিপ্টে, যন্ত্রমানব সহ কত নাম রটে গেছে আমার শ্বশুড়বাড়িতে!!!
তৃণা ভেংচি কেটে বলল, যা সত্যি তাই বলেছি। একটাও কি ভুল বলেছি?
ইরহাম তার হাতটা মুঠোয় নিয়ে বলল, নাহ। আপাতদৃষ্টিতে কোনোটাই ভুল বলেন নি। তবে পরবর্তীতে বুঝবেন ভাবনা ভুলই ছিল।
তৃণা তার হাতটা শক্ত করে ধরে বাহুতে মাথা রেখে বলল, এই ট্রেনেই আমাদের প্রথম দেখা। এই ট্রেনেই আমরা কাপল হয়ে বেড়াতে যাচ্ছি। লাভিং জার্নি তাই না?
একটা সিক্রেট বলবো?
কি?
এই ট্রেনেই আমি আপনার প্রেমে পড়েছিলাম,,, মনে আছে আমাদের সেকেন্ড জার্নিতে আপনি কেমন আদুরে বিড়ালছানার মতো গুটিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন! এত্ত কিউট লাগছিল আপনাকে।
তৃণা ইরহামের গলায় দৃশ্যমান কন্ঠমণি পয়েন্ট করে বলল, এটা মনের সব কথা আটকে ফেলে তাই না?
হাহাহা….. হতে পারে!
দুপুরে খাবার খেতে বসে ওয়াজেদ সাহেব বললেন, একটা দায়িত্ববান ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।
হঠাৎ এই কথা বললে কেন?
মেয়ে আমার যাওয়ার সময় মুখ ভার করেছিল। জামাই ওকে তুলে দিতে আসেনি বলে। সেই মন খারাপে খেয়ালই করেনি টিকিট কাটা হয়েছে দুজনের জন্য ঢাকা থেকে। ইরহাম ওকে নিজে গিয়ে চিটাগং পৌঁছে দিবে আমি ভাবিনি। আমার যে কি নিশ্চিন্ত লেগেছে ওকে ট্রেনে দেখে…
হ্যাঁ ঠিক বলেছ। আমিও বলেছি ক’টা দিন একটু বেড়িয়ে এসো। মেয়েটাকে একটুও সময় দিতে পারেনি। হুট করে বিয়ে হলো, একে অপরকে জানার সুযোগ ই হলোনা। ঠিক করেছি না বলো?
ঠিক করেছ।
তামজিদ বললো, আপুনী আর দুলাভাই কোথায় গেছে মা?
বললো তো কক্সবাজার যাবে।
ওহ, ভালোই হয়েছে।
কথাটা শুনে রিপার একটু খারাপই লাগলো। বিয়ে হয়ে এসেছে এতোদিন হলো ওয়াসি তাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে পর্যন্ত গেল না। আর তৃণার কি ভাগ্য, এরেঞ্জ ম্যারেজে কাবিন করেই হানিমুনে চলে গেছে! লাভ ম্যারেজ করে আর লাভটাই কি হলো? মেয়ের বেলা মায়ের বুদ্ধি হলেও ছেলের বৌয়ের বেলা এই বুদ্ধিটা এলো না! তার কি একবারো মনে হচ্ছেনা ছেলেও তো নতুন বিয়ে করেছে, তার মাথায় বুদ্ধি দেই বৌকে নিয়ে বেড়িয়ে আয়? আসলেই মা আর শাশুড়ি এক হয় না….. তিক্তমনে রিপা চুপচাপ খেয়ে রুমে চলে গেল।
।
কক্সবাজারে ইতোমধ্যে অনেকবার আসা হয়েছে তৃণার। তবে ক্লাসমেটদের সাথে আসা আর বরের সাথে আসার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। লম্বা জার্নি শেষে হোটেলে পৌঁছাতে তাদের প্রায় রাত হয়ে গেছে। তৃণা রুমে ঢুকেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। ট্রেন জার্নিটা মজার হলেও বাস জার্নি বিরক্তিকর। বয় এসে রাতের খাবার দিয়ে যেতেই ইরহাম ফ্রেশ হয়ে বললো, তৃণা আগে ডিনারটা করে নিন তারপর শান্তিমতো ঘুমাবেন।
তৃণা কাঁথার এককোণা দিয়ে মাথা বের করে বললো, আমি খুব টায়ার্ড। এই মুহূর্তে ভাত খাওয়ার মতো এনার্জি আমার নেই। আমি ঘুমিয়ে নি, পরে উঠে খাবোনে।
ইশ আপনিতো খুব অলস! এমনভাবে কথা বলছেন যেন আপনি হেঁটে হেঁটে এতোদূর এসেছেন? একটুও আগেও বলছিলেন খুব খিদে পেয়েছে এখন খাবেন না?
খিদে তো পেয়েছেই, কিন্ত এখন খাওয়ার মতো এনার্জি নেই বললাম।
ইরহাম বললো, বুঝেছি! তারপর প্লেটে খাবার নিয়ে বললো কষ্ট করে একটু উঠে বসুন, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
তৃণা গদগদ হয়ে বললো, এখন আসলেই আম্মুকে মিস করছিলাম। উনি থাকলে বলতাম খাইয়ে দাও। আপনি একদম মনের কথাটা বুঝে নিলেন। গুড হাজবেন্ড!
ইরহাম বললো, আমি কিন্তু খাইয়ে দেওয়াতে পরিপক্ক নই। তবুও সাহস দেখাচ্ছি। ভুল হলে মার্জনা করবেন।
তৃণা বললো, আরেহ সমস্যা নেই। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।
ইরহাম আনাড়ি হাতে এক লোকমা তুলে দিয়ে বলল, ধীরে ধীরে অভ্যাস হবে মানে? মতলব কি আপনার?
তৃণা দুষ্টুমিমার্কা হাসি দিয়ে বলল, আপনাকে খাটাবো আর কি! হেহে
তাই নাহ?
হুম। জানেন আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা, আমি আপনার হাতে ভাত খাচ্ছি, বা আমাদের বিয়ে হয়েছে। সবকিছুই কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছে!
খাওয়ানো শেষ করে ইরহাম বললো, মাঝেমধ্যে আমাদের জীবনে এমনকিছু ঘটে যা সুন্দর স্বপ্নকেও হার মানায়। সেসব সময় মনভরে উপভোগ করুন।
তৃণা উঠে বললো, হুম একদম ঠিক।
একি উঠলেন যে? ঘুম শেষ?
নাহ।
তাহলে উঠছেন কেন? ঘুমিয়ে পড়ুন।
আপনি কেবল আমাকে খাওয়ালেন নিজে তো খেলেন না। আমি থাকতে আপনি একা একা খাবেন বিষয়টা ভালো লাগবেনা। একটা হাতপাখা থাকলে দারুণ হতো, কি বলেন?
বাহ! মনে রেখেছেন দেখছি।
তৃণা তার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল, আমার কাছের মানুষদের কোনোকিছুই আমি সহজে ভুলি না। আর আপনিতো তার মধ্যে বিশেষ। আপনার বেলা তো আরো বেশি মনে থাকে..
ইরহাম প্রসন্নমনে খেতে শুরু করলো। এখন সত্যিই তৃণাকে বৌ মনে হচ্ছে!
খাওয়ার পর্ব সেরে তৃণা বেলকনীতে গিয়ে দাঁড়ালো। দূর থেকে সাগরের গর্জন শোনা যাচ্ছে,সঙ্গে জাহাজের বাঁশির শব্দও কানে আসছে। রাতে সমুদ্র দেখতে ভীষণ সুন্দর।
ইরহাম নিঃশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়ালো। তৃণা তার উপস্থিতি টের পেতেই ইরহামের বুকে পিঠ ঠেঁকিয়ে বলল, আপনি ভীষণ আনরোমান্টিক!
ইরহাম সংকোচে দু’হাত বাড়িয়ে তৃণার কোমড় জড়িয়ে ধরলো, কাঁধে ইরহামের তপ্ত নিঃশ্বাস পড়ছে। তৃণা পরম আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। অপার্থিব আবেগে দুজনের মন উতলা হয়ে উঠতে চাইছে ভরা যৌবনের উচ্ছাসে।
ইরহাম নিজেকে সামলে ধীর গলায় বললো,আচ্ছা তৃণা বললেন না তো আমাকে আপনি কি নামে ডাকেন?
তৃণা সোজা হয়ে পেছনে ফিরে বলল, বলা হয়নি না?
নাহ!
আপনাকে আমি শরৎফুল বলে ডাকি। আমার প্রিয় ঋতুতে আপনার আগমন ঘটেছিল বলে এই নামকরণ!
শরৎফুল? মজার তো,,,
ধন্যবাদ! আচ্ছা ইরহাম একটা কথা বলি?
জ্বি বলুন?
এই কঠিন সীমারেখা টেনে রাখা কি খুব দরকার? কি হয় অবাধ্য হলে?
ইরহাম কিছু বলবার আগেই তৃণা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, ব্যাকুল কন্ঠে বললো, আমি আপনার কঠিন তত্ত্ব শুনতে ইচ্ছুক নই। আজকে আমি আপনার কোনো কথা শুনবো না। প্লিজ ইরহাম পাথর হয়ে থাকবেন না!
ইরহাম তৃণার চিবুক তুলে বললো, আমাকে আপনি যতোটা পাথুরে ভাবেন আমি ততোটা কঠিন নই তৃণা!
তৃণা অধীর আগ্রহে তার মুখপানে চেয়ে রইলো, সেই আবেদনময়ী কাতর চাহনী অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা ইরহামের নেই, একদমই নেই!
চলবে,,,,