“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ১
(নূর নাফিসা)
.
.
হেমন্তের বিকেল। দিগন্তে সোনালী আলোর ঝলক। মাঠ ছেয়ে আছে পাকা ধানের অপরূপ সৌন্দর্য্যের মায়ায়। সোনালী আলোর রূপে খাঁটি সোনায় পরিণত হয়েছে ছোপা ছোপা ধান। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। শুকলে ঘ্রাণে বুক ভরে যায়। মাঠের কোনো কোনো অংশে ধান কাটা হয়েছে। মাঝে মাঝে সিদ্ধ ধানের ঘ্রাণ ভেসে আসে বাতাসের সাথে। হেমন্তের বাতাস এবার খুব আমেজ এনেছে স্থানীয় কৃষকের বুকে। ফসল ভালো জন্মেছে প্রত্যেকেরই। আহমদ আলী ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে চোখ বুলাচ্ছেন মাঠ জুড়ে। কি সুন্দর রূপে সেজে আছে পরিচিত এই মাঠ। মৃদু বাতাসের স্পর্শে শান্ত ঢেউ খেলে যাচ্ছে ধানের শীষে। যুগের পর যুগ কত ছুটেছে এই মাঠে, খেটেছে দিনভর। আজ বার্ধক্যে নত হয়ে পড়ছে মাটির তরে। মিশে যাবে হয়তো কোনো ক্ষণে। মৃত্যুকে ইদানীং খুব নিকটে মনে হয়। সঙ্গিনী চলে গেছেন সেই কবে। তার সময়ও ফুরাবার পথে। হাত বাড়িয়ে শীষ থেকে চারটে ধান হাতের তালুতে নিলেন আহমদ আলী। বয়স বাড়লেও চোখের জ্যোতি যথেষ্ট পরিষ্কার রেখেছেন সৃষ্টিকর্তা। একটু আধটু সমস্যা থাকলেও তা গুরুতর নয়। ধান দেখতে চশমা লাগে না। ধানের রূপ দেখেই বুঝতে পারেন, কাটার সময় হয়েছে। একসময় নিজে এই জমিতে শ্রম দিতেন, আজ ছেলেরা খেটে যায়। দুদিন যাবত ছেলেদের মুখে শুনছিলেন ধান কাটার গান। আজ নিজেই একটু দেখতে এলেন। সাথে এসেছে দুই নাতনি। বড় ছেলের বড় মেয়ে, রোজা। পুরো নাম আফরোজা আহমেদ। এবং ছোট ছেলের বড় মেয়ে, মৌসুমী আহমেদ। ধান দেখার পর রোজা বললো,
“দাদাজান, চলো এবার বাড়ি যাই? তোমার শরীর তো ভালো না। বেশিক্ষণ হাটাহাটি করে আবার পড়ে গেলে কেমন হবে?”
“হু। ধান কাটতে হইবো রে ভাই। তোর আব্বা তো কইলো আগামী সপ্তাহে। আমি দেখি এখনই উপযুক্ত সময়।”
“ঠিক আছে। বাড়ি গিয়ে আব্বাকে বলো। এখন চলো। তোমাকে নিয়ে ভয় হয়।”
মৃদু হেসে আহমদ আলী বললেন,
“কিছু হইবো না। আল্লাহ না চাইলে একটা পাতাও ঝইরা পড়ে না।”
ছোট নাতনি, মৌসুমী বললো,
“আরে আপু, দাদাজানের শরীরে অনেক শক্তি। দাদাজান এখনো ঘাড় সোজা রাইখা সুপারম্যান হইয়া চলে। ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তাই না, দাদাজান?”
আহমদ আলী হাসলেন শুধু। তারপর বাড়ির দিকে হাটতে লাগলেন। সামনে ছোট নাতনি, মাঝখানে দাদাজানকে রেখে পেছনে বড় নাতনি। মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে দেখলেন তাদের গ্রামেরই এক লোক এসেছেন। পেশায় ঘটক বলেই চেনাজানা। চেয়ার পেতে উঠুনে বসে বড় ছেলে, আমজাদ আলীর সাথে কথা বলছে। আহমদ আলীকে দেখে লোকটি সালাম দিলো।
“আসসালামু আলাইকুম, কাকা। আপনার শরীরটা ভালা আছে?”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। হ্যাঁ, আল্লাহর রহমতে আছি ভালোই৷ ভালো আছো তুমি?”
“হু, আল্লাহ রাখছে।”
“কি মনে কইরা হঠাৎ?”
রোজা মৌসুমীকে সাথে নিয়ে ঘরের দিকে চলে গেলো। আমজাদ আলী বসা থেকে উঠে চেয়ার এগিয়ে দিলেন বাবার দিকে। আহমদ আলী বসতেই লোকটা বললো,
“আপনার নাতনির জন্যে একটা সমন্ধের আলাপ করতে আইলাম। পোলার খান্দানী বংশ। শিক্ষিত পোলা, ভালা চাকরি আছে। বাপের জমিজমাও আছে ব্যাপক। দেখতে লম্বা, চওড়া নায়কের মতো।”
“আরেকটু কম কইরা কও, শুনি।”
আহমদ আলী বিশ্বাস করলেন না বুঝতে পেরে লোকটা হাসলেন। আমজাদ আলী সুর দিলো,
“না, আব্বা। ভাইয়ের মুখে পরিচয় শুইনাই আমি পোলার বাপেরে চিনছি। ভালোই। ভদ্রলোক নিজেও লম্বাচওড়া। পোলা তো তেমন হইবোই। এ যুগের পোলা। বাপে ভালো বেশ ধইরাই চলাফেরা করে।”
“আচ্ছা। তাইলে কি বিয়া দিয়া ফেলতাছোস?”
মৃদু হাসির সাথে আমজাদ আলী বললেন,
“আরে, না। মাত্র কইলো বাহার ভাই। জিগাইতে আইছে বিয়া দিমু কি না। সবার সাথে বুঝ পরামর্শ কইরা না মতামত দিমু। দেখাসাক্ষাৎ হইবো। মাইয়া বড় হইছে। বিবেচনা তো করা লাগবোই।”
“হু, বিয়া তো দিতে হইবোই। আমার মতামত নিবি না?”
“কি কন, আব্বা! আপনার অনুমতি ছাড়া মেহমান বাড়িতে আনমু?”
“ঠিক আছে, বাহার। তাইলে তুমি এখন যাও। বুঝ পরামর্শ কইরা সম্মত হইলে তোমারে জানাইবো।”
“আচ্ছা, কাকা। আসসালামু আলাইকুম। আমি অপেক্ষায় থাকলাম।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
চলে গেলেন বাহার উদ্দিন। বসা থেকে উঠেও গেলেন আহমদ আলী। আমজাদ আলী বোধহয় কিছু বলতে চাইছিলো, বাবাকে উঠে যেতে দেখে আর বললো না কিছুই। কিন্তু আহমদ আলী বলে গেলেন,
“আমজাদ।”
“জ্বি, আব্বা?”
“ধান কাটার সময় হইছে। দু-এক দিনের ভিতর কাটার ব্যবস্থা কর। সপ্তাহ অপেক্ষা করলে দেরি হইয়া যাইবো।”
“আচ্ছা, আব্বা।”
“মোয়াজ্জেমরেও কইস৷ তারটাও কাটতে হইবো।”
“আচ্ছা, বলমু। এক লোক দিয়াই কাটা যাইবো। একদিন আগে আর পরে।”
“হু। অবসরে থাকলে বড় বউরে ডাইকা ঘরে আয়। কথা আছে।”
“আচ্ছা, আব্বা।”
আহমদ আলী ঘরের দিকে চলে গেলেন। আমজাদ আলী চেয়ার গুটিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে নিজ ঘরে। ওদিকে ঘর থেকে বের হয়ে আসছে রোজা আর মৌসুমী। মৌসুমীর হাতে চিরুনি আর হেয়ার ব্যান। বড় ছেলের ঘরের সিড়িতে একধাপ উপর-নিচে করে বসে গেলো দুই বোন। মৌসুমীর চুল বিনুনিতে বেঁধে দিচ্ছে রোজা। আশেপাশে উচ্চশিক্ষার খুব একটা ছড়াছড়ি না থাকলেও মেয়েটা স্বেচ্ছায় পড়া চলমান রেখেছে। সাংসারিক অভাব নেই, তাই বাবামায়েরও কোনো সমস্যা নেই ছেলেমেয়ের ইচ্ছা পূরণে। ডিগ্রি শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত রোজা। বাবা-মা বিয়ের জন্য ভাবতে শুরু করেছে সবে। এক মেয়ে ও এক ছেলের পিতা আমজাদ আলী, প্রবাসে থাকেন মালয়েশিয়াতে। ছুটিতে বাড়ি এসে ভাবছেন মেয়ের বিয়েটা দিয়ে যাবেন। মেয়েটা পড়াশোনা করছে, ভালো একটা শিক্ষিত ছেলের হাতে তুলে দেওয়ার প্রত্যাশা রাখছেন তিনি। ঘটকের সাথেও আলাপসালাপের কথা ভাবছিলেন৷ এরই মধ্যে বাহার উদ্দিনের আগমন। ভালো সমন্ধ নিয়েই হাজির হয়েছেন।
কিন্তু আহমদ আলী ভাবছেন অন্যকিছু। বাড়িটা বিশাল। মাঝখানে উঠুন রেখে একপ্রান্তে বড় ছেলের লম্বাটে বারান্দাওয়ালা টিনশেড ঘর। অপরপ্রান্তে একই আকৃতির একইরকম টিনশেড ঘর ছোট ছেলেরও। দুয়ের মাঝখানে উঠুনের এক প্রান্তে সংযুক্ত করে আরও একটা ঘর আহমদ আলীর৷ মূলত এক চালার একটা ঘরই ইংরেজি বর্ণ ইউ আকৃতি ধারণ করেছে সম্পূর্ণটা মিলে। দুইপাশে দুই ছেলে, মাঝখানে খুঁটি হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের বাবা। অপরপ্রান্তে বাড়ির প্রবেশপথ। টিনের বেড়া দিয়ে গেইট বাঁধানো হয়েছে সে পথে। বৃদ্ধ আহমদ আলীর বয়স বাড়লেও ক্ষমতা কমেনি। বাড়িতে কোনোকিছু ঘটার আগে এখনো তার অনুমতি লাগে। কোনো ছেলেই অবাধ্যতার সাথে কোনো কাজ করতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন ঠিকঠাক না হলেও ছেলেদের পারিবারিক শিক্ষাটা হয়েছে বেশ ভালো। এলাকায় মুরব্বি হিসেবেও আহমদ আলীর একটা নাম আছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বিধায় তার সম্মানটাও একটু অন্যরকম। দুই নাতনিকে দুয়ারে বসে থাকতে দেখে তিনি ঘরে থেকেই রোজাকে ডাকলেন,
“আফরোজা, আয় তো দাদাভাই।”
“আসছি, দাদাজান।”
বিনুনি শেষ পর্যায়ই ছিলো। ওদিকে মৌসুমীর মা, সেলিনা বেগম আরও মিনিট পাঁচেক আগে থেকেই ডেকে যাচ্ছেন মেয়েকে। মৌসুমী আসছি, আসছি বলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। শান্তিতে বিনুনিটা শেষ করতে দিচ্ছে না। এখন শেষ হতেই ব্যান পেঁচাতে পেঁচাতে চলে গেলো সে মায়ের কাছে। রোজা উঠে এলো দাদাজানের কাছে।
“জ্বি, দাদাজান?”
“বস দেখি আমার কাছে।”
“জ্বি, বলো।”
রোজা বসলে আহমদ আলী মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
“মাহতাবকে তোর কেমন লাগে?”
“মাহতাব, ভাইয়া? কেমন লাগবে আবার? ভালোই তো।”
মৃদু হাসির সাথেই টনকা জবাব দিলো রোজা। আহমদ আলী বললেন,
“মেয়েবেটি বড় হলেই বিয়ার একটা চিন্তা বাবামায়ের মাথায় জন্ম নেয়। এদিক ওদিক থেকে অনেক লোকজন ঘিরা ধরে। আমারে আরও আগে থেকেই অনেকে জিগাইতো বিয়াশাদী দিমু নাকি নাতনিরে৷ এখন তোর বাবায় দেশে ফিরছে, তোর বাবারেও ঘিরা ধরছে। কিন্তু আমার তো চিন্তা আরেকটা। আমার নাতিও আছে, নাতনিও আছে। বিয়া দেওয়ার সুব্যবস্থাও আছে। কি দরকার বাইরে দেখাফেরার? তুই যদি রাজি থাকোস, তোর বিয়া আমি মাহতাবের সাথেই দিমু। তোর দাদু থাকতেই আমি এই ইচ্ছা শুনাইছি তোর দাদুরে। মন থেকে কইস তো দাদুভাই, পছন্দ হয় মাহতাবরে?”
এবার লাজুকলতা হয়ে উঠেছে রোজা। এই ভালোলাগার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন তবে দাদাজান! লাজুক দৃষ্টি নিচে নেমে আছে রোজার। মুখভঙ্গিতেও ফুটেছে একরাশ লাজুকতা। প্রথম জবাব যতটা স্বাভাবিকতার সাথে দিয়েছে। এখন সেই স্বাভাবিকতা তার মাঝে বিরাজ করছে না মোটেও। কি জবাব দিবে এর? মাহতাব ভাই? ভালোই তো। অপছন্দের কিছু না। দেখতে, আচার ব্যবহারে ও মেধার দিক থেকে খুবই সুন্দর একজন মানুষ। তাকে নিয়ে ভাবতে গেলে মন্দ লাগার কারণ ভেসে উঠার সম্ভাবনা খুব কম। জিজ্ঞাসার জবাব না পেয়ে দাদাজান আবার বললেন,
“কি ব্যাপার? বল শুনি? তোর মনে যা আছে, তা-ই বল। তুই নিষেধ করলেও আমি নারাজ হইতাম না।”
রোজা লাজুক ভঙ্গিতে নিচু গলায় বললো,
“তোমার যেটা ভালো মনে হয়, দাদাজান। আমার কোনো সমস্যা নেই।”
দাদাজান খুশি হয়ে গেছেন তার জবাবে। রোজা লাজুক হেসে উঠে চলে এলো। সে উঠুনে বের হওয়ার পরপরই তাদের ঘর থেকে বাবা ও মাকে বারান্দা দিয়ে দাদাজানের ঘরে যেতে দেখা গেলো। রোজার মনে অন্যরকম এক আবেগের সৃষ্টি হয়েছে। নিজের কাছেই খুব লজ্জা পাচ্ছে। মাহতাবকে অন্যরকম ভাবে ভাবতে ইচ্ছে করছে। যা কয়েক মিনিট আগেও ভাবতে শুরু করেনি একবারও। সে তো জানতো, বিয়ের বয়স হচ্ছে যখন হুট করেই হয়তো একদিন কারো ঘরের মেহমান ছুটে আসবে তাকে নিয়ে যেতে। কিন্তু ফুপির ঘরেই যে তার ডাক পড়বে, তা নিয়ে কখনো ভাবেনি। এখন ভাববে। না চাইলেও হয়তো ভাবতে হবে। সূত্র যখন ধরেছে, ভাবনারা পিছু ছাড়বে না যে আর!
একমাত্র ফুপি মরিয়মের একটাই ছেলে, মাহতাব। ফুপা বেঁচে নেই। মাহতাবের শৈশবকাল পাড় হওয়ার আগেই মারা গেছেন তিনি। শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ির ধনসম্পত্তির প্রাচুর্যের মাঝে অভাব শব্দটার সাথে খুব একটা লড়তে হয়নি মরিয়মকে। যথেষ্ট পরিশ্রমীও ছিলেন মরিয়ম। গৃহপালিত পশু ছিলো, চাষযোগ্য জমি ছিলো। যেটুকু সম্ভব নিজে করেছেন, অসম্ভব কাজগুলো পারিশ্রমিক দিয়ে লোক রেখে করিয়েছেন। জমির ধান, সরষে, শাকসবজিতে তার এমনিতেই দৈনন্দিন আহার ব্যবস্থা হয়ে যেতো। অতিরিক্ত বেচে দিয়ে সেই টাকায় মাছ মাংসের যোগান দিতে হতো বাজার থেকে। গোয়ালে গরু ছাগল ছিলো, খোয়ারে হাসমুরগি ও কবুতর ছিলো। নিজেদের দুধ ডিমের চাহিদা মিটিয়ে বাজারেও ছাড়তে পারতো। বাবার বাড়ি থেকেও সহযোগিতা পেতো সময়ে অসময়ে। আয়ের খুব একটা সংকট হয়নি তার। সেই আয় থেকেই ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আচার ব্যবহারে মাহতাব ছোট থেকেই শান্তশিষ্ট, নম্রভদ্র। এখন পড়াশোনা শেষ করে শহরে ভালো চাকরি করছে। মাকে আর আগের মতো পরিশ্রম করতে দিচ্ছে না। গরুছাগল বিক্রি করে সেই টাকা ও নানাবাড়ি থেকে সম্পদের বিপরীতে মায়ের পাওয়া অর্থ দিয়ে বাড়ির পরিবেশটাও সুন্দর করেছে। নকশাযুক্ত পাকা দালান গড়েছে বাড়িতে। জমিতে ফসল ফলাতে লোক রেখে দিয়েছে। সেসবেরই হিসেবনিকেশ রাখেন মরিয়ম ঘরে বসে বসে। আর শখের কাজ ধরে রাখতে কিছু হাঁসমুরগি এখনো পালন করেন বাড়ির এক কোণে।
চলবে