সোনালী আলোর ঘ্রাণ পর্ব-০২

0
938

“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ২
(নূর নাফিসা)
.
.
হালিমা খাতুন হাতের কাজ সেড়ে মাথায় আঁচল তুলে দ্রুত পায়ে শ্বশুরের ঘরে এলো আমজাদ আলীর সাথে।
“জ্বি, আব্বা? ডাকছিলেন?”
“হু। কথা আছে। বসো দেখি।”
চেয়ার টেনে বসে পড়লো হালিমা খাতুন। বাবার পাশেই বসলেন আমজাদ আলী। আহমদ আলী গলা খাঁকারি দিয়ে ধীর গলায় বলতে লাগলো,
“মেয়েবেটি বড় হইলে তো অনেক মানুষই ধইরা বসে। আমারেও আরও আগে থেকেই জিগাইতো অনেকে। আমি নিষেধ কইরা দিতাম। আফরোজারে নিয়া তো তোমাগোও চিন্তা আছে। থাকারই কথা। আমি চাইছিলাম মাহতাবের সাথেই আফরোজার বিয়া দিতে। মাহতাব শিক্ষিত পোলা, চাকরি আছে। বাপদাদার জমিজমাও ঢের আছে। তার বাপের পুরাটাই তো তার। কোনো ভাই নাই, বোন নাই। অংশীদারও নাই। সুযোগ্য পোলা নিজের ঘরে থাকতে বাইরের লোক ডাকবা ক্যা?”
“না, আব্বা। ডাকা হয় নাই। বাহার উদ্দিন ভাই নিজ থেকেই আইছে।”
“হু, বুঝলাম। এখন তুমি কি কও?”
হালিমা খাতুন একটু হেসে বললো,
“আমি আর কি কমু, আব্বা। মরিয়ম আফা কি কইছে কিছু আফরোজার ব্যাপারে?”
“সে কি কইবো? ভাইয়ের মাইয়া, বোন নিবো না?”
“তবুও প্রস্তাবের একটা ব্যাপার আছে না?”
“সেই নিয়া ভাবার দরকার নাই তোমার। তোমার শ্বাশুড়ি বাইচা থাকতেই মরিয়মের কানে কইছে। মরিয়ম কোনোই আপত্তি করে নাই। বরং খুশি হইছে। তোমারটা তুমি কও। কোনো আপত্তি আছে?”
হালিমা খাতুন জিজ্ঞাসু চোখে আমজাদ আলীর দিকে তাকালেন। তার তাকানোর ভিত্তিতে আহমদ আলীও ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি রে? কি কস?”
“আমার ভাগিনারে জামাই আপ্যায়ন করতে আমার কিসের আপত্তি। আফরোজার মা বলুক। আর আফরোজার মতামতটাও জানা দরকার।”
হালিমা খাতুন হাসিমাখা মুখে বললেন,
“আব্বা, মরিয়ম আফা চাইলে আমারও কোনো আপত্তি নাই। আপনি যা ভালো মনে করেন, তা-ই।”
“ঠিক আছে। আমি মরিয়মের সাথে কথা কমু। আফরোজার মতামতেও অমতের কিছু দেখি নাই।”
“ঠিক আছে, আব্বা।”
“আচ্ছা, যাও তাইলে। এজন্যেই ডাকছিলাম।”
“জ্বি, আব্বা।”
হালিমা খাতুন চলে গেলো। এদিকে বাবা ছেলে আরও কিছুক্ষণ কথা বললেন বসে বসে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে। উঠুনে মুরগির ঝাপাঝাপি চলছে৷ খোয়ারে যাওয়ার সময় হয়েছে তাদের। পেট পুরে খাবার চাই রাতের জন্য। হালিমা খাতুন দুই খাবলা গম ছিটিয়ে গেলেন এক কোণে। ওদিকে মৌসুমীও বেরিয়েছে বাটি ভর্তি গম নিয়ে তাদের মুরগির জন্য। জমিজমা ও হাড়ি আলাদা হলেও দুই পরিবারের মধ্যে বেশ মিল। আহমদ আলীর খাবার দুই হাড়িতেই রান্না হয়। একদিন বড় ঘরে হলে একদিন ছোট ঘরে হয়। ভালো রান্নাবান্না হলে আর দিন গণতে হয় না, সবসময়ই দেওয়া হয়। মাগরিবের আজান পড়ছে তাই রোজাও উঠুনে নেমেছে কাপড়চোপড় নিয়ে যেতে। দেখলো ছোট চাচার তিন বছর বয়সী মেয়ে, মমো তুরতুর করে হাটছে মুরগির পিছু পিছু। মৌসুমী ধমকাচ্ছে মুরগিকে শান্তিতে খেতে দিচ্ছে না বলে। এতে যেন মমোর আরও আনন্দ হচ্ছে বড় বোনের অবাধ্য হয়ে চলতে। বাচ্চাদের মনই এমন দুষ্ট। রোজা দেখে হাসছে। এমন সময় বুক পর্যন্ত কাদামাখা অবস্থায় বাড়িতে এলো আমজাদ আলীর ছেলে আজমাইন এবং মোয়াজ্জেম আলীর ছেলে সিয়াম। আজমাইনের বুক পর্যন্ত কাদা হলেও সিয়ামের মাথা পর্যন্তই উঠেছে। মাথার কালো চুল সাদা সাদা হয়ে আছে। হাতে একটা পলিথিন। পরনে নীল রঙের শর্টপ্যান্ট ছিলো। কাদার রঙে নীল হারিয়ে গেছে। আজমাইনের আড়ালে আড়ালে হেটে যেন বাড়িতে প্রবেশ করে বড় চাচীর রান্নাঘরের সামনে চলে গেলো। ভয়ে ভয়ে বারবার ফিরে তাকাচ্ছে নিজেদের ঘরের দিকে। রোজা বললো,
“এ কি অবস্থা!”
ওদিকে মৌসুমী মায়ের উদ্দেশ্যে গলা ছেড়ে দিলো,
“মা, গো… দেখে যাও তাড়াতাড়ি! তোমার পোলার অবস্থা যে কি।”
এদিকে হালিমা খাতুন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলে বারান্দার মেঝেতে হাতের পলিথিন রাখলো সিয়াম।
“এইসব কি অবস্থা তোগো! কোত্থেকে আইছোস?”
সিয়ামের মুখে কোনো জবাব নেই। এই সন্ধ্যাবেলা সে এই বেশে বাড়ি ফিরেছে, সেই ভয়ই কাটাতে পারছে না মন থেকে। আজমাইন নির্ভয়ে মায়ের জবাব দিলো,
“ভাটার টানে নদীর মাছ উপরে উঠছে মা। তোমার চারদিনের মাছের ব্যবস্থা করলাম। খালি তো কইতেই থাকো, বড় হইতাছি কিন্তু কাজের কাজ করতাছি না।”
“আহারে, বাপজান আমার! কি কাজটাই না কইরা আইছে। চারদিনের জায়গায় চার বেলা যায় কি-না এই মাছে দেখমু। জলদি কইরা গোসলে যা। লুঙ্গি কাইচ্চা পরিষ্কার কইরা বের হবি। পারতাম না আমি এগুলা করতে।”
“এহ! খাবারও আমি আইনা দিমু আবার ধোয়ার কাজও আমি করমু। সব ঠ্যাকা আমার নাকি! আমিও পারতাম না। আপু ধুইয়া দিবো নে।”
রোজা মাছ দেখতে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
“আপুর ঠ্যাকা তো।”
“ঠ্যাকা না হইলে মাছ খাইবা না।”
“না খাইলাম তোর মাছ।”
গমের বাটি হাতে মৌসুমীও মাছ দেখতে এগিয়ে এসেছে বারান্দায়। আবার দাঁত কিড়মিড়িয়ে সিয়ামকে ভয়ও দেখাচ্ছে মায়ের হাতে মাইর খাওয়ার। বোনের প্রতি রাগ হলেও সিয়াম বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছে। সাহস হচ্ছে না ঘরের দিকে যাওয়ার। এদিকে উঠুনে মুরগি খাবার খাচ্ছে আর চালের কোণে টংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার কবুতর গুলো অসহায়ের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে লক্ষ্য করে আজমাইন বললো,
“মা, তোমার মুরগিরে খাইতে দিছো। আমার কবুতরগুলোরে দাও নাই?”
“না, দেই নাই। গম শেষ। মুরগির ই হয় নাই।”
“তাই বইলা কিছু খাইতে দিবা না? কেমন অসহায়ের মতো তাকায় রইছে।”
বলতে বলতে এসে মৌসুমীর বাটি থেকে খপ করে গম নিয়ে নিলো। তাও এক নয়, দুই হাতে দুই খাবলা! সাথে সাথেই মুখে শব্দ করে ডেকে বারান্দার চালে গম ছুড়ে ফেললো। ক্ষুধার্ত কবুতর ঝনঝনে শব্দে চালে ঝাপাঝাপি করে খেতে লেগেছে। এদিকে চিৎকার মেরে বসে আছে মৌসুমী। আজমাইন ভ্রু টানটান করে তাকিয়ে বললো,
“কান্দস ক্যা?”
“আ..আহা..শয়তান! আমার মুরগির গম নিছো ক্যা?”
“খাইতে নিছি। যেমন করতাছোস, যেন তোর মুখের খাবার নিয়া গেছি!”
“গেছোই তো! আমার মুরগির খাওয়া মানেই আমার খাওয়া। আমি কি তোমার কবুতরের জন্যে আব্বাকে বারবার বলে বলে গম কিনা আনাইছি?”
“মুরগির খাওয়া মানে তোর খাওয়া? খাড়া, গ্লু নিয়া আইতাছি। আজ থেকে তোর মুখ বন্ধ থাকবো আর তোর মুরগির মুখ খোলা।”
মৌসুমী রেগেমেগে বললো,
“তোর মুখে গিয়া গ্লু লাগা।”
তুইতোকারি করায় আজমাইন আবার গেলো গম নিতে। মৌসুমী বাটি হাতে ছোটখাটো চিৎকার দিয়ে বড় চাচীর পেছনে চলে গেছে। হালিমা খাতুন মাছ তুলে নিতে নিতে আজমাইনকে ধমক দিয়ে গোসলে পাঠিয়েছে। সিয়ামকেও ধমক দিয়ে পাঠিয়েছে তাদের ঘরে। সাত বছর বয়সী সিয়াম ভয়ে শক্ত হয়ে ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো কাপড়চোপড় নিতে। বাথরুমে যাওয়ার একটু পরই লাঠি হাতে গেলো সেলিনা বেগম। কয়েক ঘা লাগাতেই হামাগুড়ি দিয়ে সিয়ামের সে কি চিৎকার। হালিমা খাতুন ধরার জন্য ছুটে যেতেই সেলিনা বেগমের অভিযোগ, স্কুল থেকে ফিরেছে সেই দুপুরে। গোসল করে ভাত না খেয়েই চলে গেছে খেলতে। আর খেলা শেষে এই সন্ধ্যায় মাছ ধরে ফিরেছে বাড়ি। অসুস্থ হলে টানাটানিটা করবে কে? হালিমা খাতুন মাইর থেকে রক্ষা করে নিজেই ঘঁষে মেজে গোসল করিয়ে দিয়ে এলেন। ভাইয়ের কান্নার সুরে মমো এসে বাথরুমের দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। গোসল শেষে বের হতেই মায়ের উত্তমমধ্যম দেওয়ার প্রেক্ষিতে মৌসুমী কুটিকুটি হাসলে সিয়াম ফোঁপাতে ফোপাঁতে চোখ রাঙিয়ে তাকালো। যেন চোখেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলছে তাকে রাগের বশে।
হালিমা খাতুন মাছ কাটতে বসেছে বারান্দার এক কোণে। নয়তো মরে পঁচে যাবে তাজা মাছগুলো। সেলিনার মেজাজ এখন গরম হয়ে আছে, তাই কিছু মাছ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও দিতে গেলো না। কেটেকুটেই দিয়ে আসবে। আজমাইন সত্যিই গোসল করে লুঙ্গি ফেলে রেখে এসেছে বাথরুমে। খালি হাতে বের হতে দেখে হালিমার মন্তব্য,
“সত্যি কইরাই ধুইলি না লুঙ্গি।”
আজমাইন মুচকি হেসে মাথা মুছতে মুছতে এসে মাছ দেখতে দাঁড়ালো।
“সিয়ামরে দিলা না কিছু। আমার সাথে ধরলো।”
“দিমু নে। এই সন্ধ্যা বেলা নদীর তীরে গেলি ক্যা?”
“মাছে ডাক দিছে আমারে।”
“পোলাটায় মাইর খাইলো তোর লাইগা।”
“একটু মাইর খাওন দরকার আছে। এখন না খাইলে আর কবে?”
“তোরও খাওন দরকার।”
“হাহাহা.. অনেক মাইর দিছে?”
“দিছে কয়টা। তারে পাইলি কই?”
“মাঠেই খেলতাছে দেখলাম৷ আমি গেলাম নদীর পাড়ে হাটতে। দেখলাম এই কাণ্ড। তারপর ডাক দিয়া নিলাম৷ আমার আগে আরও কত মানুষ নামছে হুরহুর কইরা। তারা অনেক মাছ পাইছে।”
“সামনে পরীক্ষা। একটু ভালা কইরা পড় এইবার। সারাদিন ঘুরাঘুরি, টইটই করলে জীবন চলবো রে বাপ? এই যে বুঝাইতে থাকি, কথা তো কানে নেস না। মানুষ বড় ভাইবোন থাকলে দেইখা অনুপ্রাণিত হয়। নিজের ইচ্ছায় যায় বই নিয়া, আপু বুঝায় দাও। ভাই, বুঝায় দাও পড়াটা। আর তোরে পায়ে ধইরাও বই হাতে টাইনা নেওয়া যায় না। কি পড়স আর কি পরীক্ষা দেস, আল্লাহ জানে। ইন্টার পরীক্ষার পড়াশোনা মানুষ এমনে করে? বলি, এইসব পরীক্ষায় ফেল করলে চলবো?”
“আরে, পড়মুনে। এতো চিন্তার দরকার কি তোমার? পাস করলেই হইলো।”
“পাস করবি টা ক্যামনে, ওইটাই তো আমার চিন্তা!”
“ধুর! বুঝো না কিছু না। খালি ঘ্যানঘ্যান!”
মাথা মুছতে মুছতে ভারি বুঝদার লোক চলে গেলো নিজের ঘরে। মুহুর্তেই শার্ট-প্যান্ট পরে আবার বেরিয়ে গেলো বাইরে। পেছন থেকে মায়ের জিজ্ঞাসা, “কই যাস আবার?”
কিন্তু ছেলের মুখে আর জবাব নেই। তার যাওয়া সে যাচ্ছেই। রোজাই লুঙ্গি ধুয়ে বারান্দায় নেড়ে দিয়েছে। মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“মা, কোনো কাজ আছে? না থাকলে পড়তে বসি গিয়ে।”
“না, আমার কোনো কাজ নাই। যা, পড় গিয়া।”
ওপাশ থেকে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে মৌসুমী গলা ছাড়লো,
“রোজা, আপু…”
“কি রে?”
“ফ্রি আছো?”
“কেন?”
“একটা অংক দেখাইতাম।”
“নিয়ে আয়।”
মৈসুমীকে আসতে বলে রোজা চলে গেছে নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে। হেলতে দুলতে মৌসুমী হাজির হয়েছে। ওই ঘর থেকে এই ঘরে সিয়ামের উচ্চকণ্ঠে পড়া শোনা যাচ্ছে। রোজা বললো,
“আজ সিয়াম খুব পড়ছে মনে হয়?”
মৌসুমী কুটিকুটি হেসে জবাব দিলো,
“ধোলাই পড়ছে যে আচ্ছামত!”
“ইশ! ভাইকে মারতে দেখলে খুব খুশি। এমন হলে আপু বলে ডাকবে তোকে?”
“না ডাকলে চাপায় ঠাসঠাস লাগামু।”
“আদর পেতে হলে আদর দিতে হয়। মারামারি করলে সে-ও মারতে সাহস পাবে। তোর টেস্ট পরীক্ষা কবে?”
“এই মাসেই তো।”
“ঠিকমতো পড়িস। রেজাল্ট যেন ভালো হয়।”
“দোয়া কইরো।”
“শুধু দোয়া করলে তো হবে না। বরং যথাযথ চেষ্টা থাকলেই দোয়া কাজে লাগবে।”
“করছিই তো চেষ্টা।”
“আরও বেশি করতে হবে। তোকে সারাদিন ঘুরাঘুরিই করতে দেখি আমি।”
“দেখবাই তো! আমি পড়ি সময় যে তুমি ঘুমায় থাকো!”
“চাপাটা কম ছাড়িস। রেজাল্টই তো বলে দেয় পড়াশোনা কেমন চলে। স্কুল থেকে এসে তো আমার কাছেও বসতে পারিস দুয়েক ঘন্টা।”
“আচ্ছা, আসমু নে।”