সোনালী আলোর ঘ্রাণ পর্ব-০৩

0
774

“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৩
(নূর নাফিসা)
.
.
বাজার থেকে সন্ধ্যার পর ফিরেছে মোয়াজ্জেম আলী। সেলিনা বেগমের কাছে মাইরের ঘটনা শুনে এবং ছেলের মন খারাপ দেখে পড়ার টেবিলে এসে পাঁচ টাকার পয়সা রাখলেন। সিয়াম চোখ তুলে তাকাতেই তিনি বললেন,
“মনযোগ দিয়া পড়। আর কিন্তু যাইস না অসময়ে মাছ ধরতে। নদীতে ইয়া বড় কুমির থাকে। টান মাইরা নিয়া যাইবো। বুঝছোস?”
“আমি তো একলা যাই নাই। আজমাইন ভাইয়ের লগে গেছি।”
“কারো লগেই আর যাওয়ার দরকার নাই।”
“আইচ্ছা।”
এদিকে ভাইকে টাকা দিতে দেখে মমো এসে হাত বাড়ালো,
“আব্বা, টাকা?”
“তুই টাকা দিয়া কি করবি?”
“মজা খামু।”
“ঘরে মজা আনছি না? ভাই আবার আইনা দিবো নে।”
“না। আমার টাকা।”
মেয়ের হাতেও পাঁচ টাকা দিলেন। খুশি হয়ে মুঠোয় টাকা চেপে হাটতে লাগলো মমো। সেলিনা বেগম খ্যাচখ্যাচ করতে শুরু করলেন,
“বারেবারে না করি টাকা পয়সা হাতে দিয়া পোলাপাইনের অভ্যাস খারাপ করবেন না। শুনেই না আমার কথা। এই টাকাডা মাইয়ার হাতে দিছে, দুইডা মিনিটও তো রাখতো না। কই ফালাইবো কইতেও পারতো না।”
“থাক, খেলুক। একটু পরে নিয়া ফালাইছ।”
হাতমুখ ধুয়ে সারতেই বাইরে বড় ভাইয়ের ডাক পড়লো। মোয়াজ্জেম আলী বাইরে বেরিয়ে দেখলো উঠুনে দাঁড়িয়ে বড় ভাই আমজাদ আলী।
“জ্বি, ভাই?”
“ধান তো পাইকা গেছে। আব্বায় আজ গেছিলো ক্ষেতে। কইলো এখনই কাইটা ফালাইতে। লোক ডাকিস?”
“কাইটা ফালাইতাম? আচ্ছা, কালকা ঠিক করমু নে।”
“আরেকটা কথা।”
“কি?”
“আফরোজার বিয়ার কথা কয় আব্বায় মাহতাবের সাথে। কেমন হইবো?”
“হইলে তো ভালাই। মাহতাবের মতোন পোলা আছে নাকি সারা গ্রামে একটা? আফরোজার বিয়ার বয়সও তো পাড় হইয়া যাইতাছে। ব্যবস্থা করন লাগবো না একটা? আমাগো মাহতাবই ভালা।”
“হু, আমিও মন্দ কই না। তোরে জানাইলাম আরকি। মরিয়ম নাকি কাল আইবো আব্বা জানাইলো।”
“আসুক তাইলে। ভাবি কি কয়?”
“হু, তোর ভাবিও ভালাই কয়।”
“তাইলে আর কি। মরিয়মের লগে কথা কইয়া দিয়া দেন বিয়া।”
পড়া শেষে নিজেদের ঘরে যাওয়ার পথে বাবা জেঠুর অর্ধাংশ কথা শুনে ফেলেছে মৌসুমী বারান্দায় থেকে। সে আর উঠুনে নামেনি। দরজার সামনে থেকেই ফিরে গেছে ভেতরে। ছোটখাটো এক চিৎকার মেরে হুমড়ি খেয়ে রোজার টেবিলে দুইহাত রাখলো।
“আপু! মাহতাব ভাইয়ের সাথে তোমার বিয়া? আল্লাহ! তুমি আমারে কও নাই এই কথা!”
“হেই, চুপ! কে বললো তোকে এসব?”
“ওই যে, জেঠু কইলো আব্বার কাছে।”
“ওহ্!”
স্বাভাবিকতার নিশ্বাস ফেলে রোজা নরম গলায় বললো,
“দাদাজান ঠিক করছে সবে। এখনো পাকাপাকি না।”
“আরে, দাদাজান একবার বলা মানেই পাকাপাকি। ইশ! আমার যে কি খুশি লাগতাছে! ওই বুড়ার তো আজ খবর আছে!”
“এই, মৌসুমী। এই…”
কে শুনে কার কথা! খুশিতে আপ্লূত মৌসুমী ধেইধেই করে ছুটে চলে এলো দাদাজানের কাছে। আহমদ আলী ইশার নামাজ আদায় করে জায়নামাজ রেখেছে মাত্র। দরজা ঠেলে মৌসুমী ভেতরে প্রবেশ করে বললো,
“দাদাজান!”
“কি রে দাদাভাই? কি হইছে?”
“কি হয় নাই, সেইটা কও আমারে!”
“কি হয় নাই?”
“ধুর! এইটা কইছি দেইখা এইটাই জিগাইবা তুমি।”
“তুই ই তো কইলি জিগাইতে।”
“যাক, গে! বাদ দাও। আপুর সাথে মাহতাব ভাইয়ের থুক্কু! মাহতাব ভাইয়ের সাথে আপুর বিয়া ঠিক করছো, এইটা তুমি আমারে জানাও নাই ক্যা? আমার মনে কি কোনো আনন্দের টুকরা নাই?”
“ও, আচ্ছা। এই কথা?”
“জ্বি, এই কথা। তোমার সাথে তো আমার অনেক হিসেবনিকেশ জমছে এখন।”
“আবার কি?”
মৌসুমী কথায় দুষ্টুমি জুড়ে বললো,
“মাহতাব ভাইয়ের সাথে আপুর বিয়া দিবা ঠিক আছে। কিন্তু আমার বিয়াটা তুমি কার সাথে দিবা? খালি কি রোজা আপুরেই নিয়া ভাববা? আমার কথা তোমার মনে আসে না? আমিও তো তোমারই নাতনি।”
আহমদ আলী হেসে বললেন,
“ভাবতাম না ক্যা? তোরে নিয়া আমি আরও বেশি ভাবি। তাইতো তোরে বাড়িতেই রাইখা দিমু সারাজীবন।”
“মানে! বুইড়া! আমারে নিয়া এই তোমার ভাবনা? সারাজীবন বাড়িতেই রাখবা। বিয়া দিবা না তাইলে?”
“হু, দিমু। তোর বিয়া দিমু আজমাইনের সাথে। বাড়ির মাইয়া বাড়িতেই থাকবি।”
“কি…!”
মুহুর্তেই বিষম খেয়েছে মৌসুমী! কাশতে কাশতে মাথার তালুতে থাপড়াচ্ছে এক হাতে। বাড়িতে রাখার এই কৌশল তবে বুড়ার মাথায়! বুড়া দেখি তার থেকেও এগিয়ে। সে তো এমনি এমনি দুষ্টুমিতে মেতেছিলো। ভেবেছে, দাদাজানও তার সাথে দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে। এ যে ঘন্টা বাজিয়ে দিলো! আহমদ আলী তার কাশি দেখে পানির জগ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো,
“নে, পানি খা। পানি খা।”
কাশি থামিয়ে মৌসুমী বললো,
“তোমার পানি তুমি খাও। তোমার এই আটখোট্টা নাতিরে আমি বিয়া করতাম না কোনোদিন।”
“ক্যা, আমার নাতির আবার কি দোষ?”
“তোমার নাতির একটা গুণ খুঁইজ্যা বের করো আগে। হের পরে আমার সাথে বিয়ার কথা কইয়ো। এমন নির্গুণ বদের হাড্ডিরে কোন মাইয়া বিয়া করবো? আইছে, বিয়া দিতে!”
ড্যাংড্যাং করে চলে গেলো মৌসুমী। আহমদ আলী মৃদু হেসে নিজের কাজে ব্যস্ত হলেন। তবে কথা ভুল বলেননি। তিনি এটাও ভেবে রেখেছেন। শুধু ভাবতে বসেননি সিয়াম আর মমোকে নিয়ে। কারণ বিয়ে দেওয়ার মতো আর কোনো নাতি, নাতনি নেই তার। তাছাড়া আশপাশ দেখে বাইরেই যে তাদের জন্য চিন্তা করবে, সেই দুরাশাও রাখছেন না। কারণ তারা বড় হতে হতে হয়তো দুনিয়া ছাড়তে হবে তাকে। যদিও এক সেকেন্ডেরও ভরসা নেই, তবু আশা রাখছেন মাহতাব আর আজমাইনের বিয়ে সামনে থেকে সম্পন্ন করার।
মৌসুমী বই খাতা হাতে নিজেদের ঘরে আসতেই মমো হাতের পাঁচ টাকার পয়সা দেখিয়ে আনন্দের সাথে বললো,
“আমার টাকা।”
“টাকা কই পাইছোস?”
“আব্বা দিছে।”
“ও আচ্ছা।”
“ভাইকেও দিছে।”
“ভাইকেও দিছে? আমারে দেয় নাই?”
“না।”
“তোরা পাঁচ টাকা নিছোস, আমি দশ টাকা নিমু। খাড়া!”
মমো তো আর পাঁচ টাকা, দশ টাকার পার্থক্য বুঝে না। তাই বোনের কথার বিপরীতে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া করেনি। মৌসুমী বইপত্র টেবিলে গুছিয়ে রাখতেই মাথায় কূটবুদ্ধি এলো। সে তার মাটির ব্যাংক বের করে ঝাকিয়ে মমোকে শব্দ শোনালো।
“মমো, শুন। দেখছিস কত পয়সা এটার ভিতর? তোরটাও তাড়াতাড়ি রেখে দে এটার ভিতর। আমরা দুজন মিলে ভইরা ফেলমু এটা। বুঝছিস?”
মমো দেখেছে মাটির ব্যাংকের একপাশে পয়সা রাখার ছিদ্র। তার ভালোই লাগে এইদিকে পয়সা ফেলতে। তাই ফেলার জন্য হাত বাড়াচ্ছিলো। এমনি সিয়াম চেয়ারে থেকে চেঁচিয়ে বাঁধা দিয়ে বললো,
“না রে, মমো। তুই রাখিস না। মিছা কথা কইয়া আপু তোর টাকা নিতাছে। আর দিতো না।”
“তুই চুপ থাক! আমরা দুইজন এইটা ভইরা ফেলমু তাড়াতাড়ি। মমো তুই রাখ। নইলে তুই ঘুমায় গেলেই সিয়াম তোর টাকা নিয়া যাইবো।”
অবুঝ বাচ্চা পড়েছে বিপদে! একবার বোনের মুখে, একবার ভাইয়ের মুখে তাকাচ্ছে সে। কিন্তু তার বড়ই ইচ্ছে করছে এইদিকে পয়সা ঠেলে দিতে। তাই দিয়েই ফেললো। ব্যাস, পড়ে গেলো। আর সে খুশিতে হাত তালি দিতে লাগলো। মৌসুমীও খুশি। খুশি হতে পারেনি শুধুমাত্র সিয়ামটা।
“শাবাশ! প্রত্যেকদিন আব্বার কাছ থেকে পয়সা নিয়া এইটার মধ্যে রাখবি। বুঝছোস?”
“আচ্ছা।”
পরদিন দুপুরের দিকে মরিয়ম এসেছে বাড়িতে। প্রতি শুক্রবারই আসে বাবাকে দেখতে, ভাইয়ের পরিবারকে দেখতে। বাড়ি খুব দূরে নয়। পাশের গ্রামই। হাটতে হাটতেই চলে আসতে পারে। হালিমা খাতুন দেখেই মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো,
“আফা, ভালো আছেন?”
“হু, ভাবি। আলহামদুলিল্লাহ। ভালোই না তোমরা?”
“আল্লাহ রাখছে।”
“ছোট ভাবি কই?”
“গোসল করতে গেছে বোধহয়।”
“যাই, আব্বার সাথে দেখা কইরা আসি।”
“আচ্ছা, যান।”
মৌসুমী ঘরে থেকে কথা শুনে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছে। ফুপুকে দেখে ছুটে বেরিয়ে এলো,
“আরে ফুপু! তুমি আইছো?”
“হু, কেমন আছোস তুই?”
“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?”
“এইতো, আলহামদুলিল্লাহ। ভালো দেইখাই তো আইতে পারি। তোরা তো যাস না ফুপুকে দেখতে। ভাইবোন মিলা মিলা সব চলে যাইতে পারোস না?”
“যামু। যামু। চিন্তা কইরো না। তোমার রান্নাবান্নার কষ্ট হইবো দেখেই তো যাইতে চাই না।”
“এহ! শুনছো, ভাবি? শুনছো? কেমন পাকামি করে মাইয়ারা?”
হালিমা খাতুন হেসে মৌসুমীকে বললেন,
“তোরা গিয়া রান্নাবান্না কইরা খাইলেই তো ফুপুর কষ্ট হয় না। ফুপুও আরামে বইসা দুইবেলা খাইলো।”
“আচ্ছা, যামু নে। তোমারে রান্নাবান্না কইরাই খাওয়ায় আসমু।”
“আচ্ছা, দেখা যাইবো। আজই চল। দুদিন থাইকা আসিস।”
“এহ, আজ না। পরীক্ষা সামনে। পরীক্ষা শেষ হইলেই যামু। যাও। মাহতাব ভাইয়ারে নিয়া আইলা না?”
“মাহতাব তো বাড়ি আসে নাই। ছুটি পাইলে আসবো।”
“ও আচ্ছা।”
“আয়, তোর দাদাজানের সাথে দেখা করতে যাই।”
“যাও তুমি। আইতাছি।”
মরিয়ম বাবার ঘরের দিকে গেলে হালিমা খাতুনও হাসিমুখে নিজের ঘরের দিকে গেলেন খাবারের ব্যবস্থা করতে। হালিমা খাতুন বরাবরই হাসিখুশি মানুষ। সবার সাথেই কথার আগে মুখে হাসি ফুটায়। কথা বলে শান্তশিষ্টভাবে। কোনো প্রকার তাড়াহুড়ো কিংবা হৈচৈ নেই। রাগারাগি, ঝগড়াবিবাদও এড়িয়ে চলে। কাঠখোট্টা জবাবে সচরাচর তাকে পাল্টা জবাব দিতে কিংবা অভিমান করতে দেখা যায় না। হাসিমুখের সহজ কথাতেই যেন বিদ্রুপকে পরাজিত করে ফেলতে পারে। ধৈর্য্যশক্তিও বেশি। এক কথায় বলা যায়, বড়দের বড় গুণ। বাড়ির সব বাচ্চাদেরই যথাসম্ভব নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে। সেলিনা বেগম যদিও একটু অন্যরকম, চতুর প্রকৃতির। তবে হালিমা খাতুনের এই বৈশিষ্ট্যের কারণে দুজনের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি নেই বললেই চলে। একা একা তো আর লড়তে পারে না কেউ। তবে বাইরের কেউ আকারে ইঙ্গিতে কিংবা সরাসরি কটু কথা প্রকাশ করলে, সেলিনা বেগম পাল্টা জবাব দিয়ে দেয় মুখের উপর। বড় জনের মতো তার এতো হজমশক্তি কিংবা ধৈর্য্য শক্তি নেই। একজন চুপচাপ আছে থাকুক, দুজনেরই তেমন থাকার প্রয়োজন নেই। তবে বাইরের শত্রু সহজেই ঘরে ঢুকবে ঠিক। পার্শ্ব শত্রু মোকাবেলায় উভয় গুণেরই প্রয়োজন আছে।