সোনালী আলোর ঘ্রাণ পর্ব-০৪

0
732

“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৪
(নূর নাফিসা)
.
.
আহমদ আলী কপালের উপর হাতের পিঠ রেখে শুয়ে আছেন। ভাবছেন সঙ্গিনীকে নিয়ে। এই পিচ্চি একটা বউ নিয়ে এলো সেদিন তার আম্মা। স্বামী বুঝে না, সংসার বুঝে না। শ্বাশুড়ি বুঝে না, শ্বশুর বুঝে না। সমবয়সীদের সাথে খেলতে হয়, ঘুরেবেড়াতে হয়, শুধু এইটুকুই ভালো বুঝতো। ঘরের কাজও গুছাতে পারতো না সেই ছোট ছোট হাতে। আম্মা কখনো আদরে, কখনো ধমকের উপর রেখে কাজ শেখাতেন। শ্বাশুড়ি আম্মাও একই প্রকৃতির। যখনই বেড়াতে আসতেন, মেয়েকে একইভাবে কাজ শিখিয়ে দিয়ে যেতেন। আবার বাবার বাড়ি বেড়াতে গেলেও শেখাতেন। স্বামী, শ্বশুরের সামনে সেকালে বিবাহিত নারীদের মাথায় কাপড় দিয়ে হাটতে হতো, সেটা বুঝতো না। আম্মা ধমকে বুঝিয়ে দিতেন। আম্মার ধমক শুনে বারবার আঁচল তুলে মাথায় দিলেও বেশিক্ষণ থাকতো না। বাচ্চামন বিরক্ত হয়ে মাঝে মাঝে লম্বা ঘোমটা টেনে দিতো। ঘোমটা এতোটাই লম্বা হতো যে, সামনে দেখে চলার সুযোগ নেই। শুধু পায়ের জায়গায়টুকুই দেখে চলতে হতো। ঘরের মধ্যে এভাবে চলতে গিয়ে কতবার ধাক্কা খেয়েছে আহমদ আলীর সাথে! মনে পড়লে এখনো হাসেন তিনি। তখন তিনি তাকে বুঝিয়ে বলতেন, ঘরের মধ্যে তার সামনে মাথায় ঘোমটা দেওয়ার দরকার নেই। পাশের বাড়িতে তার বয়সী ছেলেমেয়েদের খেলতে দেখে মাঝে মাঝে ছুটে চলে যেতো। আহমদ আলী ঘরে ফিরলে আম্মা বিচার দিতো তার স্ত্রীর নামে, শ্বাশুড়ি এলে তার কাছেও বিচার দিতো মেয়ের নামে। আম্মার বকাবকির কারণে খেলতে যেতে নিষেধ করতেন আহমদ আলী। কাজ থেকে ঘরে ফিরে নিজেই ছোটাছুটি বিহীন বিভিন্ন খেলা বসে বসে খেলতেন স্ত্রীর সঙ্গে। কারণ তিনি জানতেন, খেলতে ভারি মজা পায় তার সঙ্গিনী। বয়সটাও তখন তার খেলা করার। ভারি সুন্দর ছিলো সেই সোনালী দিন। সেই দিনের খুব অভাব অনুভব হয় এই শেষ সময়ে। সারাদিন ঘরেই তো বসে থাকে। এসময়ে সেভাবে খেলতে পারলে দারুণ সময় কেটে যেতো।
এরইমধ্যে ঘরে প্রবেশ করলো মরিয়ম।
“আব্বা, ঘুমায় আছেন?”
ছায়া উপলব্ধি করেই কপালের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছেন আহমদ আলী। ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে মেয়ের কথায় সাড়া দিলেন,
“না, আয়।”
“শুইয়া রইছেন যে? শরীরটা ভালো না নাকি?”
“এই ভালো খারাপ যেমন যায়।”
ধীরে ধীরে উঠে বসলেন তিনি। মরিয়ম এসে প্রথমে বাবার মাথায় ও পিঠে হাত বুলালো।
“শরীরটা তো একটু গরমই মনে হয়। জ্বর জ্বর লাগে?”
“না। তেমন কিছু না। বস। ভালোই না মা, তোর শরীরটা?”
আরাম করে বসাতে আহমদ আলীর পিঠের পেছনে বালিশ রাখলো মরিয়ম। তারপর পায়ের দিকে বসে জবাব দিলো,
“আল্লাহ রাখছে ভালোই। খাওয়া দাওয়া করছেন?”
“হু।”
“কি খাইছেন?”
“খাইলাম তো ভালোই। বড় বউ মুরগি রান্না করছে, বাসমতী চালের ভাত, গুঁড়া চিংড়ি দিয়া চাল কুমড়া পাকাইছে। আরও শাকটাক কি যেন করলো। আমি সব নেই নাই।”
“আচ্ছা। ভাবিরা আপনের যত্নআত্তি ভালো করে তো আব্বা?”
আহমদ আলী হাসিমুখে বললেন,
“এমন ভালো বউ এলাকার কারো ঘরে খুঁজে বাইর করতে পারবি?”
“তা ঠিক কইছেন। এমন বউ খুব কমই দেখা যায়। যাক, ভালো হইলেই ভালো। আমার তো আপনারে নিয়াই চিন্তা হয় ভারি।”
“আমি ভালোই আছি। তোর আসার অপেক্ষাই করতাছিলাম সকাল থেকে।”
“ক্যা, আব্বা? কি হইছে?”
“মাহতাবের ব্যাপারে কথা কইতাম।”
“কি কথা, আব্বা?”
“পোলা বড় হইছে। বিয়ার বয়স হইছে। এইবার আয়োজন কর। বাইচা থাকতে দেইখা যাই।”
“এইসব কি কন, আব্বা! বিয়া নাহয় করাইলাম। তার পিছনে বাঁচা মরা টানেন ক্যা? এইসব কইবেন না আর। আল্লাহ আপনারে অনেক বছর বাঁচায় রাখুক।”
“সে আল্লাহর ইচ্ছা। বিয়ার আয়োজন কবে করবি, সেইটা বল দেখি।”
“পোলা আসুক, পাত্রী দেখি।”
“পাত্রী দেখবি কি আবার? বিয়া আফরোজার সাথে করাবি।”
“আফরোজার সাথে?”
কেমন একটা চিন্তিত সুর টানলো মরিয়ম। আহমদ আলী বললেন,
“ক্যা? আফরোজার কথা না তোরে আগেই জানাইছি?”
“তা জানাইছেন। কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু টিন্তু নাই। কথা পরিষ্কার। মাহতাবের বিয়া আফরোজার সাথেই হইবো আমার ইচ্ছা। তোর আম্মারও ইচ্ছা ছিলো এইটা।”
“হইলেই কি, আব্বা। ছেলেপুলে বড় হইছে। বুঝার বয়স হইছে। নিজের জীবন নিয়া নিজে একটু চিন্তাভাবনা করবো। পছন্দ হইলে না সিদ্ধান্ত নিবো। আমরা জোরজারি কইরা বিয়া দিলেই তো খালি হইয়া যাইবো না।”
“মাহতাবের পছন্দের বাইরে যাইবো না। প্যাচ তোর কথার মাঝে।”
“আমার কথায় আবার কি প্যাচ?”
“তুই পছন্দ করতাছোস না মনে হইতাছে।”
“কি যে কন, আব্বা।”
“যাক, ওইদিকে আমি আর কিছু কইতে চাই না। বিয়া তুই আফরোজারেই করায় নিবি। ব্যাস।”
“আচ্ছা, মাহতাব বাড়ি আসুক। তারপর জিগাই। মতামত দেক।”
“মতামত দিতে বাড়ি আসা লাগবো না। তোর হাতে ফোন আছে। মাহতাবের হাতেও ফোন আছে। আমজাদ আমারেও ফোন কিনা দিছে। কল দিয়াই মতামত জানা যায়। কল দে দেখি। কল দে।”
“আরে, ফোনের কথা একটা। সামনাসামনি বলা আরেকটা। আপনে সবুর করেন। কইছে তো এই সপ্তাহেই আইবো।”
“কি বারে আইবো?”
“বারের কথা কয় নাই।”
“তুই কল দে দেখি, আমি জিগাই।”
আহমদ আলীর জোরাজুরিতে মরিয়ম ফোনের বাটন চেপে চেপে ছেলের নম্বর বের করলো। তারপর ডায়াল করে বসে রইলো রিসিভ করার অপেক্ষায়। মাহতাব কল কেটে দিয়েছে। পরপরই আবার কলব্যাক করেছে,
“আসসালামু আলাইকুম, মা।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। মাহতাব?”
“জ্বি, মা?”
“এই তোর নানায় কথা কইবো তোর সাথে। নে তো, বাবা। কথা বল।”
“নানাজানের কাছে গেছো তুমি?”
“হো, হো। নে, কথা বল।”
আহমদ আলী ফোন হাতে নিয়ে বললো,
“নানাভাই?”
“আসসালামু আলাইকুম, নানাজান।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কি খবর তোর?”
“এইতো, নানাজান। সবই ভালো আলহামদুলিল্লাহ। তোমার শরীরটা ভালো আছে?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই।”
“বাসার সবাই ভালো আছে?”
“জ্বি, আছে। তুই বাড়ি আসবি কবে?”
“কেন, নানাজান?”
“কথা আছে। একটু দেখতেও তো মন চায়। তুই দেখবি না আমারে?”
“তুমি অপেক্ষা করো, নানাজান। ইনশাআল্লাহ, আগামীকালই আমি তোমার সাথে দেখা করছি। আজ রাতে বাড়ি ফিরবো।”
“আজই?”
“জ্বি, ইনশাআল্লাহ। রওনা দিচ্ছি এখন।”
“যাক, তবে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম। সাবধানে আয়।”
“জ্বি, দোয়া রেখো।”
ফোন নিয়ে মরিয়ম বললো,
“তুই সত্যিই আজকে আইবি?”
“জ্বি, মা। তোমাকে এখনই কল দিয়ে জানাতাম। এরই মধ্যে তুমি কল করেছো।”
“আচ্ছা, বাপ। আয়। রাস্তাঘাটে দেইখা শুইনা সাবধানে আয়।”
“জ্বি, আচ্ছা। রাখি তবে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা।”
কল কেটে দিয়ে মরিয়ম ব্যস্ত হয়ে পড়লো বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য।
“আব্বা, আমি তাইলে আর এখানে থাকতাম না বেশিক্ষণ। বাড়ি গিয়া রান্নাটান্না বসাইতে হইবো। পোলা আমার আইসা পড়বো, ঠিকমতো খাবার দিতে পারতাম না নইলে।”
“দরকার হইলে যা। আগামীকাল আইছ তবে?”
“দেখি।”
মরিয়ম বাবার ঘর থেকে বের হতেই হালিমা খাতুন ডাকলো,
“আফা, খাবার দিছি। আসেন, খাইয়া লন।”
“না, ভাবি। আমি খাইয়াই আইছি। আমার বাড়ি যাইতে হইবো। মৌসুমীর মায়ের সাথে একটু দেখা কইরা যাই।”
“সে কি কথা! এখনই চইলা যাইবেন?”
“হো। মাহতাব আইবো। গিয়া রান্নাবান্না করন লাগবো না?”
“মাহতাব আইবো? বলেন, এইখানেই আইতে।”
“না, না। সরাসরি এইখানে আইতো না।”
“না খাইয়া গেলে কেমন হইবো। অন্তত খাইয়া যান কয়টা।”
“আরে, মাত্রই খাইয়া আইছি।”
“অল্প খান। তবুও খাইয়া যান। খালি মুখে যাইবেন না।”
“দেখ তো কারবার! আচ্ছা, দাও। দাও। আইতাছি। ছোট ভাবির সাথে দেখা করি আগে।”
সেলিনা বেগমের সাথে দেখা করতে সেই ঘরে গেলে সেলিনা বেগমও খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করতে লাগলেন। আজ শুক্রবার, তাই তাদের ঘরেও মাছ মাংসের ভালো আয়োজন। কিন্তু ওদিকে বড় ভাবি যে আগে সেধেছে, আবার ছোট ভাবিকেও মন খারাপ করতে দিতে ইচ্ছুক না। তাই এ ঘর থেকে বাটিতে করে মাছের তরকারি নিয়ে বড় ঘরে গিয়েই খেলো। সাথে নিয়ে গেলো মমোকে। হালিমা খাতুন মরিয়মের সাথে ভালোমন্দের আলাপসালাপ করতে করতে মমোকে ভাত মেখে খায়িয়ে দিচ্ছেন নিজ হাতে। আফরোজাও দেখা করলো ফুপুর সাথে। যাওয়ার আগে ভাইদের সাথেও দেখা হলো ক্ষণিকের জন্য। তবে কথা তেমন হলো না তাড়া থাকার কারণে। শুধু দেখা হলো না বাড়ির দুইটা বাঁদড় ভাইপোদের সাথে! কখন কোথায় যায়, সেই তালিকা কেউ দিতে পারবে না। তাদের কোনো স্টেশন নেই। আজমাইনের তো পা দুটো লম্বা হয়েছে। তাই তার নাগাল পাওয়া যায় না। আর ওই ছোকরাটা যে গত সন্ধ্যায় মাইর খেলো, তবুও আজ সকালেই নির্লজ্জের মতো আবার অসময়ে খেলার পিছু ছুটলো। বাড়ি ফিরলেই শুধু মাইরের কথা মনে হয়। বের হওয়ার সময় এতোসব মনে থাকে না তার।