“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৫
(নূর নাফিসা)
.
.
শহরের রাস্তা পেরিয়ে গ্রামের পথে নেমে এলেই যেন হৃদয়টা শীতল হয়ে যায়। ইটপাথর আর ধুলোবালির ব্যস্ত শহর মনটাকেও ব্যস্ত রাখে সারাক্ষণ। কিন্তু যখনই গ্রামের পথঘাটে প্রবেশ ঘটে, মনটা তাৎক্ষণিক উৎফুল্ল হয়ে উঠে। নিশ্বাস ভারি সতেজ হয়ে উঠে। চোখের ক্লান্তি, মনের ক্লান্তি সব দূর হয়ে যায় নিমেষে। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপে নিজেকে বিলিয়ে দেয় পরম আবেশে। শহরের রাতের পথ হয় আলোয় আলোয় উজ্জ্বল। গ্রামের রাত আঁধার কালো আর পূর্নিমার জ্যোছনায় স্নিগ্ধকর। আজ পূর্নিমার রাত। ফুটফুটে চাঁদ দেখা যাচ্ছে আকাশে। মাহতাব ভ্যানে চড়ে পথ পেরুতে পেরুতে দুহাত ভ্যানে ভর করে আকাশমুখী হয়ে আছে। গাছের পাতার সাথে চাঁদের আলো নিয়ে খেলছে লুকোচুরি খেলা। এই নজরে পড়ছে চাঁদের আলো, আবার সাথেই সাথেই পাতার আড়ালে চলে যাচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে না এক মুহুর্তের জন্যও। যেন চাঁদও তার সাথে বাড়ি যাচ্ছে। ছোটবেলায় মনে করতো, সে হাটলে চাঁদও তার সাথে হাটে। কারণ, সে চলতে থাকলে চাঁদকেও নড়তে চলতে দেখা যেতো। বড়রা এভাবেই বোকা বানাতো সময়টাতে। তবে খেলাটা দারুণ উপভোগ্য ছিলো। এখন সবটা জেনেও উপভোগ করে বিষয়টি। হোক বোকা বানানোর আযব প্রক্রিয়া। খেলা তো আনন্দ দেয় বটে। চাঁদ এখনো তার সাথেই হাটে। এইতো বাড়ি যাচ্ছে তারা একসাথে।
টুংটাং বাজনা বাজিয়ে ভ্যান এসে বাড়ির সামনে থামতেই নেমে পড়লো মাহতাব। ভাড়া প্রদানের আগেই ঘরের দরজা খুলে গেছে। অপেক্ষারত মা এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে। আলো পেয়ে মাহতাব সেদিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললো। ভ্যান ওয়ালাকে টাকা দিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলো ঘরের দিকে। ছেলের ছায়া দৃশ্যমান হতেই মরিয়মের অবসিত অপেক্ষার সুর,
“আইছোস, বাবা?”
“এইতো মা। এসে গেছি।”
দুয়ারে এসে মাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরতেই পিঠে, মাথায় ও মুখমণ্ডলে হাত বুলালেন মরিয়ম।
“আমি কতবার দরজা খুললাম। মনে হয় খালি তুই আইসা পড়ছোস।”
“এইতো এলাম। তোমার অপেক্ষার অবসান করলাম। আমি জানি, আমার মা যে অপেক্ষা করছে আমার জন্য।”
মৃদু হাসলেন মরিয়ম।
“ঘরে আয়। ঘরে আয়।”
হাতের ব্যাগটা তিনি নিয়ে নিলে জুতো খুলে ঘরে প্রবেশ করলো মাহতাব। ওদিকে খাবার দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মরিয়ম। কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে, ছেলের খুব ক্ষুধা আছে পেটে। তা এই মা জানে। সামনে ভাতের প্লেট নিয়ে বসে আছে ছেলে আসার অপেক্ষায়। পোশাক ছাড়িয়ে, হাতমুখ ধুয়ে খেতে এলো মাহতাব। দুই প্লেট দেখে বললো,
“এতো রাত হয়েছে, অথচ তুমি এখনো খাওনি?”
“না, তুই আইলে একসাথে খামু। তাই বইসা রইছি। চিন্তা লাগতাছিলো, একা একা আসবি দেইখা।”
“অযথা চিন্তা করো। আল্লাহ আছেন তো সাথে।”
“জানি রে, বাবা। তাও গাড়িঘোড়ার পথঘাট, গ্রামের রাস্তাও খুব সুবিধার না। ভয় লাগে।”
মা ছেলে দুজনেই খেতে শুরু করলো। খেতে খেতে মরিয়ম বললেন,
“কাজকর্ম হয় ঠিকমতো?”
“হুম।”
“বেতন টেতন তো ঘুরায় না, না?”
“না, না। সরকারি চাকরি তো। বেতন ঘুরানোর কায়দা নেই।”
“যাক। ভালো হইলেই আলহামদুলিল্লাহ। তোর বন্ধুবান্ধব নাই শহরে?”
“আছে তো। কেন?”
“ভালোই নাকি?”
“হুম। ভালোই তো। কেন?”
“না, কিছু না। শহরে তো ভালো বংশমর্যাদার মানুষ থাকে জানি। তাই জিগাই।”
মাহতাব মৃদু হেসে বললো,
“ভালো খারাপ সব জায়গাতেই আছে। সবার বংশমর্যাদা একরকম না।”
“হু, তা তো আছেই। মাইয়া বন্ধু টন্ধু আছে?”
“মেয়ে বন্ধু? নাহ, মেয়ে বন্ধু নেই। ওই যাদের সাথে থাকি, আর যাদের সাথে কাজ করি, তাদের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। সবাই ছেলে।”
“ও। যাক। ভালোই। পোলাগো মাইয়া বন্ধু না থাকাই ভালো। তবে আশেপাশে তো আছে, দেখা যায় না মাঝে মাঝে বাড়ির পাশে নইলে অফিসের পাশে?”
মাহতাব মায়ের কথাবার্তার ধরণের ভিত্তিতে ঠোঁটের ধারে বিস্ময়কর হাসি রেখে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার কি হয়েছে বলো তো, মা? কথার ভঙ্গিমা তো সন্দেহজনক কিছু প্রকাশ করছে।”
মরিয়ম হাসিমাখা মুখে বললেন,
“সে আর কি? এমনি। তোর তো বিয়ার বয়স হইছে। একটা ভালো মাইয়া দেইখা বিয়া কইরা ফেল।”
“দেখো তবে, মেয়ে।”
“হু, ওইটাই ভাবতাছি। শহরে ভালো মাইয়া আছে না আশেপাশে? পছন্দ হয় না কাউরে?”
“শহরের মেয়ে বিয়ে করবো?”
“হো, পাইলে করতি। ভালো বংশ দেইখা একটা সুন্দরী মাইয়া খোঁজ কর, বন্ধুবান্ধব যখন আছে।”
মায়ের কথায় মৃদু হাসলো মাহতাব। মুখে ভাতের লোকমা তুলে নিরবে চিবিয়ে গিলে তারপর বললো,
“ভালো বংশের শহুরে মেয়ে কখনো গ্রামে আসবে না, মা। তুমি যেমন বংশমর্যাদার প্রত্যাশা করছো, তাদেরও তেমন উচ্চ বংশেরই প্রত্যাশা থাকবে।”
“ক্যা, আমার বুঝি কম আছে? ধনসম্পদের অভাব আমার?”
“ধনসম্পদ থাকলেই কি হবে, মা? গ্রামে সুযোগসুবিধার খুব অভাব। তেমন উচ্চবংশীয় মেয়ে আসবে না কখনো চুলোয় আগুন ধরিয়ে ভাত রেঁধে খেতে। আসবে না তোমার ধানে পা ফেলে পায়ের সৌন্দর্য নষ্ট করতে। আর যারা আসবে, তারা উচ্চ বংশীয় সুন্দরী কন্যা হবে না।”
“ক্যা, তোর চাচাতো ভাই সাইদুর আনছে না শহরের মাইয়া বিয়া কইরা?”
“সাইদুরের সাথে তুলনা দিচ্ছো?”
“তুলনা কি আবার? তুই সাইদুরের চেয়ে বেশি এগিয়ে সব দিক দিয়া। তোর আরও সুন্দরী বউ হইবো।”
মাহতাব প্লেটে মনযোগ দিয়ে বললো,
“ওই সুন্দর আমার কাছে ভালো লাগে না মা। শহরের মেয়েদের চেয়ে গ্রামের মেয়েরাই আমার চোখে সৌন্দর্যের দিক থেকে বেশি এগিয়ে।”
“তুই ফিরা তাকাইলে না বুঝবি সৌন্দর্য কোনদিকে বেশি। কাজের জন্যে গেছোস, কাজেই শুধু ধ্যান দিয়া রাখছোস। বিয়াশাদী যে করতে হইবো, সেই চিন্তা নিয়া খোঁজ রাখোস নাই ডানেবামে। সবদিকই তো মাথায় রাখন লাগে।”
মৃদু হেসে মাহতাব বললো,
“আচ্ছা, তুমি খুঁজে দেখো।”
আর কথা হলো না খাওয়ার মাঝে। মনযোগে খাওয়া শেষ করে উঠার সময় মরিয়ম আবার জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই কি নানাবাড়ি যাবি কাল?”
“হুম, এসেছি আর নানাজানকে দেখবো না?”
“ঠিক আছে। যাইস। কখন যাবি?”
“এ…ই বিকেলের দিকে।”
“আচ্ছা। আর শোন।”
“হুম?”
“তোর নানাজান কিন্তু গেলেই বিয়ার কথা কইবো। তুই কিন্তু ফুড়ুৎ কইরাই রাজি হইয়া যাইস না। একটু ঘুরাফেরা কইরা মাইয়া দেখি আগে।”
“কেন, নানাজান পাত্রী ঠিক করে ফেলেছে নাকি?”
“হো, তোর নানাজানের একটা কথা! আফরোজার কথা কয় তোর নানা। আমার পোলা শহরে থাকে, সরকারি চাকরি আছে। তার পছন্দই হইবো অন্যরকম। বউ হইবো সুন্দরী। তাই বইলা আমি আমার ভাইজিরে খারাপ কইতাছি না। তারও একটা ভালো পোলা জুটুক। কিন্তু তারপরেও একটা খুটখুটে ভাব আছে। আমি চাই আমার একমাত্র পোলার বউ একদম দেখার মতো সবার নজরকাঁড়া হোক। তুই কিন্তু চিন্তাভাবনার সময় নিয়া নিস তোর নানাজানের কাছে। আমি বইলা আইছি, পোলার বিবেচনা করার বয়স হইছে। তুই আইলে তোর পছন্দের ব্যাপারে মতামত রাখবি। আমারে তো ধমক দিয়া বসায় রাখবো আব্বা। তুই মত না দিলেই কথা পাল্টাইবো। বুঝছোস? বিয়া জীবনের শেষটা পর্যন্ত ধইরা রাখার অধ্যায়। কারো কথায় খই হারাইয়া খালি রাজি হইলেই হইতো না। মাথায় রাখিস।”
রোজার কথা শুনে এবং মায়ের চাহিদার কথা জেনে কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়েই তাকিয়ে আছে মাহতাব। সে আর কিছুই বললো না এই ব্যাপারে। শোনার পর মরিয়ম থামতেই রুমের দিকে চলে গেলো চুপচাপ।
সকালে গাছ বেয়ে চালে উঠেছে আজমাইন। বারান্দার চালে বসে কবুতরের টংয়ের ভেতর উঁকিঝুঁকি দিয়ে চারটা ডিম সংগ্রহ করলো। এর মধ্যে একটা ফেটে গেছে কিঞ্চিৎ। সে আফসোসের সুর টেনে নিজের সাথেই বললো,
“আহারে! কোন মানিক ফাটা ডিম পাড়লি? কষ্ট লাগতাছে তোর জন্যে। থাক, সমস্যা নাই। খাওয়ার সময় ভাইঙ্গাই খামু।”
পরপরই হালিমা খাতুনের উদ্দেশ্যে গলা ছাড়লো। হালিমা খাতুন সাড়া দিতেই আজমাইন বললো,
“ডিমগুলো নিয়া যাও।”
“খাড়া, আইতাছি।”
“তাড়াতাড়ি আইয়ো।”
“আরে, খাড়া। ভাতের মারটা গাইলা আইতাছি।”
মৌসুমী উঠুনে মোটা কাঁথা মেলে দিতে এসেছে। সচরাচর বিছানায় প্রস্রাব করে না মমো। তবে আজ ভাসিয়ে দিয়েছে। কাঁথার এক অংশ ধুয়ে মৌসুমী রোদে শুকাতে দিতে এসে আজমাইকে দেখতে পেয়েছে চালে। ডিম নেওয়ার জন্য বড় মাকে ডাকতে শুনেই সে বললো,
“ভাইয়া, একটা ডিম দাও না। তুমি না পরশু আমার গম নিয়া খাওয়াইছো কবুতররে? তাইলে একটা ডিম দাও।”
“নিয়া যা।”
“সত্যি, দিবা?”
“হো, নিয়া যা।”
মৌসুমী এপাশে আসতেই আজমাইন সেই ফাটা ডিমটা ছুড়ে মারলো তার মাথায়! মাথা ও ঘাড়ের একপাশ লেপ্টে বসেছে ডিম।
“এক মুঠ গম নেওয়ায় কেমন চিৎকারটা দিসিলি, মনে আছে? নে এইবার ডিম খা আরেক চিৎকার মাইরা।”
কান্না তো আসছে, কিন্তু চিৎকারটা সজোরে মারছে না মৌসুমী। নাকমুখ কাঁদোকাঁদো বানিয়ে মাথা থেকে ডিমের খোসা নিতে নিতে থ্রেট দিলো,
“শয়তান, তুই নাইমা আয় খালি। আগে তোরে জবাই করমু। তারপর জবাই করমু তোর কবুতররে।”
এমনি হালিমা খাতুন নেমে এলেন বারান্দা থেকে। মৌসুমীকে আর নালিশ দিতে হয়নি। তার অবস্থা দেখেই বুঝে গেছেন কি যে ঘটেছে। উঠুনে দাঁড়িয়ে চালের দিকে তাকিয়ে তিনি চোখ রাঙিয়ে শাসানো গলায় বললেন,
“এইডা কি করলি তুই?”
“ডিম চাইছে, দিলাম।”
“তোরে কইছে ডিল মাইরা দিতে?”
“কয় নাই। ভাবলাম একটা ডিম ভাজতে তেল লাগে, লবণ লাগে, মরিচ লাগে, পেঁয়াজ লাগে। এতোকিছু খরচ না কইরা সরাসরি খাইয়া নিলেই খরচ বাইচা যায়। তাই দিসিলাম খাইতে। বলদি হা করতে পারে নাই, তাই মাথায় গিয়া পড়ছে। ধরো দেখি, ধরো ডিমগুলো।”
হালিমা খাতুন আঁচল পাতলে আঁচলে ডিম ফেললো আজমাইন।
“তুই নাইমা আয়। ডিম ক্যামনে খায়, সেইটাও দেখাইতাছি। খরচও বুঝাইতাছি। পোলা, তুই কতো বড় বেদ্দপ হইছোস। এইডাই দেখমু।”
“তাইলে আর নিচে নামতাম না আজ। ভাত তরকারি পাঠায় দিয়ো। রাতে একটা বালিশও দিয়ো।”
“ভাত তোর কপালে জুটবোনি আজ? নে মৌসুমী, ধর। এগুলা তোর। নিয়া যা। মাথা ধুইয়া ফেল। কিছু হইবো না।”
বাকি তিনটা ডিমই মৌসুমীকে দিয়ে দিলেন হালিমা খাতুন। মৌসুমী ঘাড়ে পড়া ডিম তুলে মাথায় চুলে ঘঁষতে ঘঁষতে বললো,
“থাক, ধুইতাম না। চুলে ডিম দেওয়া ভালো। চুল মজবুত হয়।”
ঘরের দিকে যেতে যেতে আরেকটা ডিম সে নিজেই মাথায় ফাটিয়ে চুলের অন্যপাশে ঘঁষতে লাগলো পুরো মাথার চুলই মজবুত করার জন্য। বাকি দুইটা সিদ্ধ করে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তেল, মরিচ, লবণ, পেঁয়াজ কিছুই খরচ হবে না তবে। একটু পানি আর আগুন দিলেই হবে।
চলবে।