সোনালী আলোর ঘ্রাণ পর্ব-০৬

0
711

“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৬
(নূর নাফিসা)
.
.
আজমাইন চালে থাকাকালীনই বাজার থেকে ফিরে আমজাদ আলী তাড়া দিলেন তাকে ক্ষেতে যাওয়ার জন্য। লোক লাগানো হয়েছে ক্ষেতে ধান কাটতে। ক্ষেতে কর্মরত কৃষকের সকালের নাস্তা হবে পাউরুটি আর কলা। সেগুলোই নিয়ে ফিরেছেন বাজার থেকে। ছেলেকে তাড়া দিলেন দিয়ে আসার জন্য। বাবার তাড়া দেওয়া দেখে কলসি ভরে পানি প্রস্তুত রাখলো রোজা। আজমাইন নেমে এসে প্যাকেট থেকে কলা নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে এক কামড় দিয়ে বসলো। ভরো মুখে গাল ফুলিয়ে চিবানোর সাথে বললো,
“খাইয়া দেখছো কেনার আগে, মিষ্টি কি না?”
আমজাদ আলী কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলেন ছেলের কাণ্ড দেখে। রোজা মুখ চেপে হাসলো। তিনি জবাব দিলেন,
“কলা মিষ্টি না টক, খাইয়া দেখন লাগবো না আমার। জলদি নিয়া যা।”
“একটা রুটিও খাই। রাগ কইরো না। ক্ষুধা তো আমারও লাগছে। ক্ষেত পর্যন্ত হেটে যামু, শক্তি লাগবো না?”
বলতে বলতে প্যাকেট তুলে পানির কলসি নিয়ে যেতে শুরু করেছে আজমাইন। মিনিট দুয়েক পরেই মৌসুমী পাটা পুতো নিয়ে উঠুনে নেমেছে। বাড়ির এক কোণে মেহেদী পাতার গাছ আছে। বাটি দিয়ে পাতা তুলে এনে পিড়ি পেতে আরাম করে বসেছে মেহেদী পাতা পিষতে। রোজাকে বারান্দায় দেখে বললো,
“আপু, আমার চুলে মেহেদী লাগায় দিবা।”
“এই সকাল সকাল তোর মাথা গরম হলো কেন, শুনি?”
“তোমার একটা খচ্চর ভাই আছে না? মাথায় কবুতরের আণ্ডা মারছে। ভাবলাম একটু চুলের যত্ন নেওয়া দরকার। একবারেই আয়োজন করি।”
“বেশি করে বেটে নে। আমি হাতে দিবো।”
“ঠিক আছে, দিয়ো।”
ঘর থেকে সেলিনা বেগম বললো,
“আমার জন্যে একমুঠ পাতা বেশি নে রে মৌসুমী। মাথাটা চুলকায় কয়দিন ধইরা। খুশকি হইছে মনে হয়।”
মৌসুমী রোজাকে শুনিয়ে বললো,
“দেখো, দেখো খালি অবস্থা! পাটা তোলার সময় আমারে বকে রাখে নাই। এখন আবার এক মুঠ বেশি নিতে কয় নিজের লাভে। দিতাম না তো। বকা ফেরত দাও আগে। আর নইলে বকশিস দাও।”
সেলিনা কাজে থেকেই মেয়ের জবাব দিলো,
“খাড়া মাইয়া, আইতাছি বকা ফেরত দিতে। মায়ের কাজ করবি, আবার বকশিস চাস?”
“হো।”
“আমার পাটা পুতা দিয়া যা।”
“তোমার? নাম লেখা থাকলে তবে দিয়া যামু। ও বড় মা, তুমিও দিবা? আরেক মুঠ বেশি নিমু?”
হালিমা খাতুন এপাশে কাজ করতে করতে জবাব দিলেন,
“না রে, মা। ধান আইসা পড়তাছে। আমার ধান মাথায় দিয়াই ঘুরতে হইবো।”
মমো এসে আগেই পাটার সামনে বসেছে ভাগ নিতে। মৌসুমী একটুখানি বাটা মেহেদী তার হাতে দিয়ে দিলে রোজা ডাকলো তার কাছে। নিজ হাতে সুন্দর করে বৃত্ত এঁকে দিলো মমোর ছোট্ট হাত দুটোর তালুতে। মমো ভীষণ খুশি। মেহেদী বাটা শেষ হতেই মায়ের জন্য আলাদা করে রেখে মেহেদীর বাটি নিয়ে রোজার কাছে এলো মৌসুমী। রোজা হাতে পলিথিন বেঁধে নিয়েছে, মেহেদীর রঙে পুরো হাত রঙিন হয়ে যাবে বলে। মৌসুমীর চুলে মেহেদী দেওয়ার পর দুজনেই হাতের তালু আর আঙুলের ডগায় রঙ ফুটাতে মেহেদী লাগালো। মধ্যদুপুরে ধান এসেছে উঠুনে। বাড়ির সবাই প্রায় ব্যস্ত ধানের কাজে। আহমদ আলী বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে বসে কার্যক্রম দেখছেন। কৃষক ধান মাড়াই করে চলে গেলে ধান সিদ্ধ করার ব্যবস্থা চলছে তাদের। কেউ ধানের ময়লা পরিষ্কার করছে, কেউ ছড়ানো ছিটানো ধানের স্তুপ তৈরি করছে, কেউবা মাথায় ধান তুলে রেখে আসছে খাঁদায়। গেইটের দিকে উঠুনের একপাশে গড়ে তোলা বড় মাটির চুলার পাশে লাকড়ি সংরক্ষণ করছে হালিমা খাতুন ও মৌসুমী। আজ সারারাত ধান সিদ্ধে পাড় হবে। আহমদ আলী চোখের সামনের দৃশ্যপটে স্মরণ করছে সেযুগের কত স্মৃতি। একসময় আম্মাকে দেখতো, বড় বড় ধানের হাড়ি একাই ধাক্কিয়ে নামিয়ে আনতো উঠুনের মাঝখানে। হাফপ্যান্ট আর হাফ হাতার শার্ট পরে ছোট্ট আহমদ আলী তখন চুলোর পিঠে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো মায়ের কাজ। আম্মা বারবার সাবধান করতো, সামনে যেন না যায়। গরম ধানে পা পড়লে পা জ্বলে যাবে। আব্বা সাহেবের মতো বসে বসে হুকুম করতেন, এটা কর! সেটা কর! তারপর এলো আহমদ আলীর সময়। বেগম আগেপিছে কাজ করতে করতে শিখে ফেলেছে আম্মার হাড়ি নামানোর কাজ। একাই সাহস দেখাতো এতো বড় হাড়ি চুলো থেকে গড়িয়ে নামিয়ে উঠুনে ফেলার। কিন্তু আহমদ আলী বসে বসে হুকুম করার অভ্যাস পায়নি আব্বার কাছ থেকে। যখন পাশে ছিলো, নিজে এগিয়ে সহযোগিতা করতো আম্মাকে কিংবা বেগমকে। উঠুনে ধান টেনে ফেলতো। বেলা শেষে উঠিয়ে নিতো। ঝড়বৃষ্টির তাড়া পড়লে ছোটাছুটি করে ধান নিয়ে গোলায় ফেলতো। প্রাথমিক পর্যায়ে বেগমকে দুই পায়ে ঘনঘন কদম ফেলে এলোমেলো ধান নাড়তে দেখে হাসতো। যখন কাজে পরিপক্বতা এলো, তখন থেকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতো ওই দুই পায়ের ছমছম ধান আওড়ানোতে। রোদের কড়া হাসিতে নিজেকে লুকাতে দুহাতে আঁচল তুলে ধরতো মাথার উপর। কি যে সুন্দর দেখাতো ছোট্ট বউটাকে। এখনো মাঝে মাঝে নাতনিদেরকে সেই অবস্থায় দেখলে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, কি সুন্দর দিন! কি মাধুর্য ঘ্রাণ এই সোনালী দিনের। অথচ এইসবই ফেলে যেতে হবে প্রভুর ডাকের সাথে সাথে। ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।
সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সাথে সাথে উঠুনের কাজ শেষ করে রাতের রান্নার আয়োজন করা হচ্ছে। মাগরিবের নামাজ আদায় করেই মাহতাব নানাবাড়ি এসে পৌঁছেছে। আজমাইন বাদে বাড়ির সকল পড়ুয়া ছেলেমেয়েই তখন পড়তে বসেছে ঘরে। আর আজমাইন সারাদিন বাড়িতে কাজ করার অযুহাতে এখন গেছে বাইরের হাওয়া খেতে। মাহতাবের প্রথমে দেখা হলো বাড়ির বাইরে ছোট মামার সাথে। কথা বলতে বলতে বাড়িতে প্রবেশ করলেই দেখা হলো হালিমা খাতুনের সাথে। সৌজন্যতার খাতিরে ভাব বিনিময় করে সে চলে গেছে নানাজানের কাছে। উঠুন পেরিয়ে যেতে যেতে দেখে গেছে জানালার সামনে পড়ার টেবিলে আছে রোজা। একসময় নানাবাড়িতে এলে সবাই একত্রে বসে গল্পগুজব করতো, কতো রকমের খেলাধুলা করতো, হৈ-হুল্লোড়ে মেতে থাকতো। এখন সবাই বড় হয়েছে, বাচ্চামো স্বভাব হারিয়ে গেছে। লজ্জাবোধ করতে শিখেছে। কেউই আর একত্রে বসে বসে দীর্ঘসময় গল্প করতে প্রস্তুত নয়। বড়ই অস্বস্তি কাজ করবে বয়সের দোষে। ভাবতে ভাবতে মৃদু হেসে মাহতাব নানাজানের ঘরে পা রাখলো। নানাজান বসে আছেন জানালার বাইরে তাকিয়ে।
“আসসালামু আলাইকুম, নানাজান।”
“আরে, নানাভাই! ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আয় আয়।”
“কেমন আছো তুমি?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই। আমি তো ভাবছি আজ আসবি না। সারাদিন পাড় হইলো যে।”
“কথা যখন দিয়েছি, না এসে থাকতে পারি?”
“তোর মা আসে নাই?”
“না। মায়ের আসার কথা ছিলো? কাল না এসে গেলো।”
“হু, কথা তো তেমন হয় নাই। তাড়াহুড়া কইরা চলে গেলো। কইছিলাম আজ আইতে।”
“কি জানি। মা বললো না তো এমন কিছু।”
“তোর কাজকর্ম কেমন চলতাছে?”
“জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ।”
“সুযোগসুবিধা ভালোই পাস?”
“যতটুকু পাই যথেষ্ট আমার জন্য।”
এরইমধ্যে হালিমা খাতুন এলো প্লেট ভরে মুড়ির মোয়া আর পাঁকা পেঁপে কেটে নিয়ে। মাহতাব দেখে বললো,
“মামী, এসবের আবার কি প্রয়োজন ছিলো।”
হালিমা খাতুন হেসে বললেন,
“এ আর তেমন কি? খাও, বাবা। রাতের খাবার কিন্তু খাইয়া যাইবা। কোনো অযুহাত দিয়া তাড়াহুড়া কইরো না। বহুদিন পরে আইছো।”
মাহতাব নম্রতার সাথে মৃদু হেসে বললো,
“আচ্ছা।”
হালিমা খাতুন যেতেই আহমদ আলী বললেন,
“খা, ভাই।”
“তুমি নাও।”
“এইগুলা চিবানোর সময় কি আমার আছে? দিনদিন শিকড়হীন হইয়া যাইতাছে সব।”
“পেঁপেঁ খাও তুমি। দাতে সমস্যা হবে না।”
খেতে খেতে মাহতাব বললো,
“কি এতো জরুরী তলব করছিলে শুনি?”
“আছে কিছু কথা। বাইচা আছি আর ক’দিন? তোরা বড় হইছোস, বিয়া শাদি কর। দেখার সাধ তো আমারও আছে। আফরোজার…”
এরই মধ্যে বিদ্যু চলে গেলো! আহমদ আলী হেসে বললেন,
“দ্যাখ খালি কাণ্ড! আইছোস, দেখা সাক্ষাতে দুইটা কথা কমু। এরমধ্যে বিদ্যুতের হিংসুটে কারবার।”
নানাজানের কথায় মাহতাবও হাসলো। মাহতাব ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে নিয়েছে। আহমদ আলী আফরোজার উদ্দেশ্যে গলা ছাড়লেন,
“আফরোজা, মোমবাতি দিস তো দাদাভাই।”
এদিকে বিদ্যুৎ চলে যেতেই ঘরে ঘরে আঁধার হাতড়ে মোমবাতি আর দিয়াশলাই খুঁজতে ব্যস্ত সবাই। নানাজানের গলা শুনার আগেই রোজা টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি নিয়ে দিয়াশলাই নিতে দরজার বাইরে এসে রান্নাঘরের দিকে গেলো। হালিমা খাতুন রান্না করছেন। তিনি দিয়াশলাই এগিয়ে দিতেই তিনটা মোমবাতি জ্বেলে একটা মাকে দিয়ে গেলো। আরেকটা নিজের ঘরে পড়ার টেবিলে রেখে অন্যটা দাদাজানের ঘরের দিকে নিয়ে গেলো। একটু অস্বস্তি হচ্ছে সেদিকে অগ্রসর হতে। কেননা মাহতাব আছে সেখানে। হালিমা খাতুনের সাথে বাইরে কথা বলতে শুনে তখনই বুঝতে পেরেছে মাহতাব এসেছে বাড়িতে। চাঁদের আলো ফকফকে করে রেখেছে উঠুনের পরিবেশটা। মাথার উপর চাঁদ থাকায় ঘর কিংবা গাছের ছায়া খুব করে পড়ছে না। হালকা বাতাসও আছে বাইরে। বাতাসে আবার আগুন না নিভে যায়, সেই আশঙ্কায় হাত দিয়ে আগুন আড়াল করে বারান্দায় হেঁটে দাদাজানের ঘরে এলো সে। তার আগমনে মোমবাতির আলো পড়েছে ঘরে। আঁধার ঘরে আলোর ছোঁয়া পড়তেই মাহতাব দরজার দিকে তাকিয়ে মোমবাতির নিকটবর্তী আলোয় রোজার মুখটা দেখতে পেলো। সোনালী আলোতে অপূর্ব দেখাচ্ছে ওই মুখটা। হাতে আড়াল করা আগুন যেন নিজের জ্বলজ্বলিত রশ্মির সম্পূর্ণটা ঢেলে দিয়েছে তার চেহারায়। ঠোঁটে মিশে থাকা হাসিটা হৃদয় কাড়া। আগুন ঘিরে রাখা হাতের তালু মেহেদী রাঙা। মেহেদীর রঙটাও যেন সোনালী আলোর ঝলকে জ্বলজ্বল করছে। ঘরে প্রবেশ করে আগুনের পাশ থেকে হাত নামিয়ে চোখ উপরে তুলতেই আরেকবার হোঁচট খেলো মাহতাবের দৃষ্টি। চোখের পাতায় গজানো পাপড়িগুলো চিকচিক করছে। চোখের স্বচ্ছতা মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। মাহতাবকে দেখে রোজা সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া। কেমন আছো?”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এইতো আলহামদুলিল্লাহ।”
“কবে এসেছো গ্রামে?”
“গতরাতে। কেমন আছো তুমি?”
“জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ।”
“পড়াশোনা কেমন চলছে তোমার?”
“এইতো, ভালোই।”
কাঠের চেয়ারের কোণে মোমবাতি রাখলো রোজা। দাদাজানকে জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু লাগবে, দাদাজান?”
“না, এখন কিছু লাগবো না।”
“আচ্ছা।”
রোজা চলে যেতে লাগলে মাহতাব বললো,
“বসো, রোজা? গল্প করি।”
“না, ভাইয়া। করো তোমরা। পড়তে বসেছিলাম একটু। বই খুলে রেখে চলে এসেছি।”
“ঠিক আছে, যাও।”

চলবে