“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৭
(নূর নাফিসা)
.
.
মোমবাতির আলোয় আলোকিত ঘরে বসে নানা নাতির গল্প চলছে। আহমদ আলী বললেন,
“আমার খুব ইচ্ছা, আফরোজার সাথে তোর বিয়া দেওয়ার। সত্যি কইরা বল তো, নানাভাই। তোর কি পছন্দ হয় না আফরোজারে?”
ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি রেখে মাহতাব হাত ঝেড়ে পানির গ্লাসটা হাতে নিলো। পানি পান করে গ্লাস রেখে পরিষ্কার গলায় জবাব দিলো,
“তোমার পছন্দ আর আমার পছন্দ না একইরকম হয় সবসময়? জিজ্ঞেস করার কি আছে? রোজাকে কখনোই অপছন্দের দিকে ফেলতে পারিনি আমি৷ একদম ছোট থেকেই না।”
আহমদ আলী খুশি হয়ে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। আমি গতকাল মরিয়মরে ঠিক এমনটাই কইছি। তোর অপছন্দ হইবো না। আরও একটা কথা মনযোগে ভাবতাছি নানাভাই।”
“কি?”
“আমি শীঘ্রই তোদের বিয়াটা দেখতে চাই। সাথে একই দিনে আজমাইন আর মৌসুমীর বিয়াটাও দিতে চাই।”
“আজমাইন আর মৌসুমী? বয়স তো দুজনেরই কম। তাছাড়া মৌসুমী নাহয় একটু মানসিকতা মানিয়ে নেওয়ার জন্য ঠিক আছে, কিন্তু আজমাইন তো একদমই বাড়েনি স্বভাবে। বিয়ে সংসারের দায়িত্ববোধ কি জন্মেছে তার মাঝে?”
“সেইটা বিয়ার পরে ঠিক হইয়া যাইবো। মানুষ কি আর সবসময় একরকম থাকে? তোর ছোট মামাও তো এমন এলোমেলো ছিলো সেই বয়সে। বিয়ার পর ঠিকই পরিবর্তন হইয়া গেছে। বউ সংসারের দায়দায়িত্ব বুঝে নিতে সময় লাগেনি। জানে, কাজ না করলে সংসার অনাহারে যাইবো। তাছাড়া মৌসুমীর মা তো মৌসুমীরে রাখবো না বেশিদিন। রোজার বিয়াটার জন্য মনে কর শুধু আটকায় আছে। নইলে শীঘ্রই ব্যবস্থা করতে লাগতো এতোদিনে। একাধারে বড় বউয়ের সাথে দেখি কুটুরমুটুর করে, মৌসুমীর বান্ধবীর বিয়া হইয়ে গেছে! তার ভাইঝি মৌসুমীর ছোট, তারেও বিয়া দিয়া দিছে! মানে, সব কথার এক কথা। তার মাইয়াও বিয়া দিতে হইবো।”
একগাল হেসে মাহতাব বললো,
“করো তোমার যা ভালো মনে হয়। তার আগে তোমার মেয়েকে একটু টাইট দাও।”
“ক্যা? আমার মাইয়া আবার কি করছে?”
“তোমার মেয়ের মেনে নিতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তিনি আমার জন্য সুন্দরী মেয়ের প্রত্যাশা করে। শহুরে মেয়ের প্রত্যাশা করে। কিন্তু বুঝতে চায় না, গ্রামের রূপটা যে প্রকৃত অর্থে অপরূপ সুন্দর। তোমাকে তো ছেলেমেয়েরা একটু ভয় পায়। দু একটা ধমক টমক দিয়ো মেয়েকে। হয়তো সিদ্ধান্ত পাল্টে নিবে। কাল রাতেই আমাকে বলছিলো, হুটহাট যেন রাজি না হয়ে যাই তোমার প্রস্তাবে। মা বোধহয় বারবার আমার চাচাতো ভাইয়ের বউটাকে দেখে আর মনে প্রতিহিংসা জাগায়, আমার বউ আরও বেশি সুন্দরী হবে। ছেলে আমি কম কিসে? একটা অহংকার তো আমি তোমার মেয়ের।”
“আগেই সতর্ক কইরা দিছে তোরে মরিয়ম? কাল তার ভাবভঙ্গি দেইখাই আমি বুঝতে পারছি।”
“তোমার মেয়েকে তুমি না বুঝলে আর কে বুঝবে? দেখো একটু, অন্যভাবে হয় কি না। তুমি কড়া নির্দেশ দিলে তা ফেরাতে পারবে না আমার বিশ্বাস। পরে বুঝিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা নাহয় আমি নিলাম। কি বলো?”
ফিসফিসে গলায় বললো মাহতাব। আহমদ আলী নাতির প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি বিছানা ছেড়ে নামতে লাগলেন বাইরে হাটার জন্য। নানা নাতি দুজনে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে চলে এলো জ্যোছনার আলো মাখাতে। কথা হচ্ছে ধান কাটার ব্যাপারে। উঠুনে হাটতে গিয়ে দেখা হলো মৌসুমীর সাথে। রোজার কাছেই যাচ্ছিলো সে বই বুকে চেপে। মাহতাবকে সালাম দিয়ে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে দ্রুতই চলে গেলো রোজার কাছে। তারও লজ্জা হয় এখন মাহতাবকে। আগে যখন একাধারে আসাযাওয়া চলতো, তখন এমন লজ্জার কিছু ছিলো না। কয়েক বছর যাবত মাহতাবের আসাযাওয়া কমে যাওয়ায় এখন অন্যরকম লজ্জা পায়। খুব বড় বড় একটা ভাব আসে ভাইয়ের মাঝে। তারউপর মাহতাব দুষ্টু প্রকৃতির নয়। এমনসব নম্রমুখের সামনে পড়লে অতি দুষ্টু মনেরও লজ্জাবোধ হবে। বারবার ভাবতে হবে এক লাইন কথা বলার আগে যে, ঠিক বলছে তো? আবার না কিছু মনে করে বসে!
তবে রোজার কাছে এসে মিটিমিটি হাসছে মৌসুমী। সে জেনেছে যে, মাহতাব আর রোজার বিয়ে হবে। তাই তার এখন একটু লাজুক লাজুক হাসি পায়। তার চেহারা দেখে রোজা বললো,
“কি ব্যাপার? হাসছিস কেন?”
“মাহতাব ভাইয়া এসেছে।”
“তো?”
“তো আবার কি? আমার দুলাভাই না?”
“শাট আপ। এখানে কেন এসেছিস? সেটা বল।”
পাশের চেয়ারটাতে বসে মৌসুমী হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,
“ইশ! হবু বর বাড়িতে এলে কেউ পড়তে বসে?”
তার অতিরিক্ত পাকামোর কারণে রোজা মুখমণ্ডলে কিঞ্চিৎ রাগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় বললো,
“কি জন্য এসেছিস, সেটা বলবি?”
“অংকটা একটু দেখো।”
রোজা বুঝিয়ে দিতে লাগলেও মৌসুমীর ধ্যান ভঙ্গুরতার পথে। তার মনে সেই লাজুক লাজুক হাসিই দৌড়াচ্ছে। আর তাই বুঝানোর মাঝখানে হঠাৎ আবার বলে ফেললো,
“ইশ! দুলাভাইকে যা লাগছে না দেখতে! এতো সুন্দর দেখাইতাছে যে, তোমার আঁধার ঘরে লাইট লাগবো না।”
রোজা মুখে চাপা হাসি রেখে তার মাথায় ঠুসি দিলো।
“আমি কি বলছি, সেগুলো মাথায় যাচ্ছে?”
মৌসুমীর ধ্যান যেন তাতেও ভাঙলো না। সে সরল জবাবে দুদিকে মাথা নেড়ে বললো,
“না মানে, মোমবাতি লাগলেও লাগতে পারে। যদি তোমার চোখের জ্যোতি কম থাকে আরকি।”
রোজা বই খাতা বন্ধ করে তার সামনে দিয়ে বললো,
“যা তুই। যা এখান থেকে। দিনদিন বড় হচ্ছিস আর ফাজিল হচ্ছিস। দাঁড়া, ছোট মা’র কাছে বিচার দিয়ে নেই।”
“যাও, দাও বিচার। আমিও দুলাভাইকে পাঠাইতাছি যে, তুমি ডাকতাছো।”
“মৌসুমী!”
“না, আমি কানে শুনি না।”
“এই, এদিকে আয়। মৌসুমী! কিছু বলবি না খবরদার!”
মৌসুমী চেয়ার ছেড়ে উঠে বই খাতা নিয়ে বেরিয়ে গেছে। যদিও বলে এসেছে এমন কথা। তবে তা বাস্তবায়ন করার বোধটুকু তার মাঝে আসেনি। সে মিটিমিটি হাসতে হাসতেই তাদের ঘরে চলে গেছে। ইশার আজান পড়লে আহমদ আলী মাহতাবের সাথে মসজিদে চলে গেলেন নামাজ আদায় করতে। এমনিতে তিনি ঘরেই নামাজ আদায় করে থাকেন। প্রতিবেলা ধরে ধরে মসজিদে নিয়ে যাওয়া আবার নিয়ে আসার লোক থাকেনা বাড়িতে। অসুস্থ শরীরে চলাফেরাটা একটা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার। পথে হঠাৎ পড়ে গেলেই বিপত্তি। তাই ইচ্ছে থাকলেও মসজিদে যাওয়া হয় না তার সবসময়। আজ মাহতাব নিয়ে যাচ্ছে ধরে ধরে। নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে নানাজানকে ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিলো মাহতাব। তারপর বারান্দা দিয়ে হেটে হেটে এসে থামলো রোজার ঘরের জানালার পাশে। রোজা টেবিলে হাত ভর করে আনমনে বাইরে তাকিয়ে চাঁদ দেখছে। ঠিক চাঁদ নয়, চাঁদের আলো দেখছে। উপভোগ করছে চাঁদের বিলাসিতাকে। কল্পনায় ভাসছে চাঁদের ন্যায় স্নিগ্ধ স্বপ্ন। মাহতাব হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতেই হাতের ভর নামিয়ে সোজা হয়ে বসলো। তার আনমনা পরিস্থিতির কারণে লজ্জা পেয়ে গেছে রোজা। মাহতাব মুচকি হেসে হাতদুটো ভাজ করে জানালায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।
“কি ভাবছো?”
লজ্জিত মুখখানা নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে মাথা নাড়লো সে। ঠোঁটের দুই ধারে ফুঠে আছে লজ্জারশ্মি। মৃদুস্বরে মুখে উচ্চারণ করলো,
“কিছু না।”
“কাউকে দেখছিলে তবে?”
“উহুম। কাকে দেখবো?”
“এই ধরো আমাকেই।”
মুখের হাসি আরও প্রশস্ত হলো তার। মাহতাব জিজ্ঞেস করলো,
“পরীক্ষা কবে?”
“আগামী সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট। দু-তিন মাস পরে ফাইনাল। রুটিন দেয়নি এখনো।”
“আচ্ছা। পরীক্ষা সামনে রেখে এতো আনমনে বসে থাকলে কেমন হবে? মনযোগ নষ্ট হচ্ছে, সাথে মোমবাতিও।”
এরইমধ্যে বিদ্যুৎ চলে এলো আবার। মাহতাব সাথে সাথেই বললো,
“যাক, বিদ্যুৎ অফিসের লোক বুঝতে পেরেছে মোমবাতি ফুরিয়ে যাবার দুঃখটা।”
রোজা মৃদু হেসে এবার চোখ উপরে তুলে বললো,
“ভাইয়া, ঘরে এসে বসো।”
মাহতাব হেলান ছেড়ে দাঁড়িয়ে বললো,
“নাহ। আসবো। যখন সময় হবে তখন আসবো। পড়ো।”
মাহতাব মুচকি হেসে চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে। রোজা যেন তার শেষ কথায় আরও লজ্জা পেলো। যেন ঠিক ঘরে তো নয়, মনের ঘরে যেতে আহ্বান করেছিলো এমন জবাব দিয়ে গেলো মাহতাব। লাজুক হেসে মোমবাতিতে ফুঁ দিলো রোজা। হাত বাড়িয়ে আঙুল স্পর্শ করলো সদ্য নিভে যাওয়া মোমের গলিত অংশে। আঙুলের ডগায় টোপর হয়ে লেগে রইলো মোম। মাহতাব রান্নাঘরে এসে মামীর রান্না দেখলো। আজমাইনের কথা জিজ্ঞেস করলো। তারউপর এখানে আসার মূল কারণ মমো। নানাজানকে ঘরে এগিয়ে দিতে যাওয়ার সময় মমোকে দেখে গেছে এখানে। তাই এলো একটু দুষ্টুমি করতে। কাজিনদের মধ্যে সবার ছোট সে। আর মাহতাব এতো বড় যে, মমো চিনেই না তাকে। বারবার হালিমা খাতুনের কাছে চলে যায়। মাহতাব আবার টেনে এনে কথা বলে ভাব মেলায়। হালিমা খাতুনও বারবারই পরিচয় করিয়ে দেয়, সে ভাইয়া হয়। মাহতাব যখন বললো তাদের ঘরে যাবে, তখন আবার ভালোভাবেই যেতে লাগলো তার সাথে। মমোর হাত ধরে হেটে ছোট মামীর সাথে দেখা করতে গেলো মাহতাব। পরবর্তীতে বড় মামা ও নানাজানের সাথে খাওয়াদাওয়া হলো আজমাইনের ঘরে। রোজাই সব গুছিয়ে আনানেওয়া করলো। সাথে হালিমা খাতুনও। সারা সন্ধ্যা পেরিয়ে খাওয়ার সময় আজমাইন বাড়ি ফিরেছে। আবার মাহতাব চলে যাওয়ার সময় এগিয়ে দিতে বাইরে বেরিয়েছে। আজ আর ধান সিদ্ধ বসায়নি হালিমা খাতুন। মাহতাব আসায় আলাদা রান্নাবান্নার আয়োজন করতেই রাত হয়ে গেছে। এখন আর নির্ঘুম রাত কাটানোর ইচ্ছে নেই। একেবারে ফজরের দিকে উঠেই আগুন জ্বালাবে চুলায়।
চলবে।