“সোনালী আলোর ঘ্রাণ”
পর্ব- ৯
(নূর নাফিসা)
.
.
আজ সকালের ঘুম ভাঙলো কান্নাকাটি শুনে। আজমাইন ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে কান্নার দিকে মনযোগ দিলে হইচইও শুনতে পাচ্ছে। ঘটনা বুঝতে বিছানা ছেড়ে চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এলো বারান্দায়। ছোট মাকে ছুটে যেতে দেখা গেলো বাড়ির বাইরে। বাড়িতে আর কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। ওদিকে দাদাজানও দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু নজরে পড়েনি আজমাইনের৷ বিরতিহীন ঘনঘন পা ফেলে আজমাইনও গেলো গেইটের দিকে। বাইরে বেরিয়ে দেখলো পাশের বাড়িতে গণ্ডগোল। আরেকটু এগিয়ে দেখলো পাশের বাড়ির কাশেম মোল্লা আর তার বউ ঝগড়া লেগেছে। ক্ষণে তার বউ কাশেম মোল্লার চুল ধরে টানছে আর গালিগালাজ করছে। ক্ষণে কাশেম মোল্লা বউকে মাটিতে ফেলে লাথি মারছে। লোকজন টেনেও থামাতে পারছে না কাউকে। তাদের বাড়ির সব দর্শকই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখছে। একেবারে পিচ্চি মমোটা সহ। আর মৌসুমী? সে তো যেকোনো গোলযোগেই সবার আগে থাকে। আজমাইন বেশ বিরক্ত বোধ করলো। এই ফালতু সিনেমার জন্য তার ঘুমটাকে ভাঙতে হলো? এরা তো দুদিন পরপরই কারণে অকারণে মাথা ফাটাফাটিও লাগে। রাগের ঝাঝ মেটাতে শব্দযোগে করতালি দিতে লাগলো আজমাইন।
“বাহ! বাহ! সাবাশ ব্যাটা! একদম ফার্স্ট প্রাইজ দেওয়া দরকার। দে মাইর। দে ইচ্ছেমতো।”
ভীড়ের কেউ কেউ হাসছে তার কাণ্ড দেখে। হালিমা খাতুন সরে এসে চোখ রাঙিয়ে তাকে হাত তুলে মাইর দেখালো। ঠেলে দিলো বাড়ির দিকে। আজমাইন মায়ের সাথে যেতে যেতে বললো,
“তুমি এখানে কি করো? এই সিনেমা দেইখা কোনো লাভ আছে?”
“কিছু না। যা। ভাবছি রাস্তায় বুঝি কিছু হইছে। বউটারে ক্যামনে মারতাছে পোলাটায়।”
“উচিত করে। দেখছো কেমন গালাগালি করতাছে?”
“চুপ! যা। মানুষের দুঃখ দেইখা হাসতে নাই। সমবেদনা জানাইতে হয়।”
“সমবেদনা? এইখানে কার পক্ষে বেদনা দেখামু, সেইটা কও।”
“হইছে, কইতে হইবো না। যা। নামাজের জন্যে ডাইকা তোলা যায় না। ঝগড়া শুইনা কাঁথা বালিশ ফালাইয়া দৌড় দিছে।”
তাদের মা ছেলের পিছু পিছু রোজা, সেলিনা বেগম ও মমোও চলে এসেছে। রয়ে গেছে শুধু মৌসুমী আর সিয়াম। তাদের বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে ঘরের দরজায় দাঁড়ানো আহমদ আলী জিজ্ঞেস করলো,
“কি হইছে?”
আজমাইন বাথরুমের দিকে যেতে যেতে জবাব দিলো,
“তেমন কিছু না। কাশেম মোল্লার শুটিং চলতাছে। দেখতে যাইতে পারো। টিকেট লাগবো না।”
বাকিরা হাসলেও হালিমা খাতুন তাকে চোখ রাঙিয়ে শ্বশুরের জবাবে বললেন,
“কাশেম আর তার বউ ঝগড়া লাগছে, আব্বা। কি যে হয় তাগো দুদিন পরপর! আপনারে নাস্তা দিমু আব্বা?”
“দাও।”
চাপকল চেপে ছোট বালতিতে পানি নিলো আজমাইন। মগ দিয়ে ঢেলে ঢেলে কুলকুচি করলো এক মগ পানিতে, হাতমুখ ধুয়ে নিলো এক মগে, আরেক মগ ঢাললো পায়ে। বালতির প্রায় পুরো পানিই শেষ। এরইমধ্যে হালিমা খাতুন থালাবাটি নিয়ে এলে আরেক বালতি ভরে দিয়ে এলো কল চেপে। বের হওয়ার সময় দেখলো মৌসুমী আর সিয়াম এসেছে গেইটের ভেতর। ওদিকের হইচইও থেমে গেছে। তাই সে জিজ্ঞেস করলো,
“কিরে, তোরা সিনেমা শেষ করে আইছোস?”
“হো, আইছি।”
মৌসুমীর জবাবের পরপর সিয়াম আফসোসের সুর টেনে বললো,
“ভাই, জানো? কাশেম কাকায় ঘুষি মাইরা মুখের রক্ত বাইর কইরা ফেলছে কাকীর।”
“ভালা করছে।”
“এহ! তোমারে একটা দিলে কেমন লাগবো?”
“তোর মুখে দিয়া দ্যাখ কেমন লাগে। আমারও তেমনই লাগবো।”
“ধুর! তুমি আসলেই বেদ্দপ!”
রাতে মাহতাব ঘরে ফিরলেও বিয়ের ব্যাপারে আর কোনো কথা হয়নি মা ছেলের মধ্যে। সকালে মরিয়ম বললো,
“তোর যখন পছন্দ, তাইলে কই তোর নানারে বিয়ার দিন তারিখ নির্ধারণ করতে।”
“আমার পছন্দের জন্য বলবে শুধু? তোমার পছন্দ না হলে তো আমি বিয়ে করছি না।”
“হো, সবারই পছন্দ।”
“তবে বলতেই পারো।”
“কাল তো চইলা যাবি, আবার কবে আসবি?”
“ছুটি তো আর নেই এদিকে।”
“তবে ক্যামনে বিয়ার আয়োজন হইবো?”
“আয়োজন বড়সড় করবে?”
“করতাম না তবে? আমার একটা মাত্র পোলার বিয়া, আমি চুপিচুপি করাইতাম? ভাইঝিরে পালাইয়া বিয়া করাইছি কইতো লোকে? পাড়াপড়শি সব দাওয়াত করমু। কারো পোলার মতো মাইয়া নিয়া পালাইতাম না।”
শেষ বাক্যটা যেন মাহতাবের চাচীকে ইঙ্গিত করলেন মরিয়ম, যা বুঝতে পারছে মাহতাব। যদিও মায়ের এই অন্যের বিষয়াদি টানাটানির স্বভাবটা তার ভালো লাগে না। তবুও এই ব্যাপারে আপাতত কিছু বললো না সে। সে বললো তার ছুটির ব্যাপারে,
“তবে দিন তারিখ নির্ধারণ করো, আমাকে ছুটি নিয়ে আসতে হবে আলাদাভাবে।”
“আচ্ছা। দেখি তোর নানাজানের সাথে কথা বইলা।”
দুপুরের দিকে মাহতাব এলো নানাবাড়ির দিকে। রোজা তখন ধান দেখতে বসে আছে গাছের ছায়ায় মোটা শিকড়ে। মৌসুমী লুডু বই নিয়ে এসেছে খেলতে খেলতে সময় কাটানোর জন্য। সাথে এনেছে একমুঠ কচি তেঁতুল। বাড়ির গেইটের কাছেই বড় তেঁতুল গাছ। সিয়ামকে গাছে তুলে তেঁতুল সংগ্রহ করেছে। বাটিতে লবণ নিয়ে চলে গেছে রোজার কাছে। মাহতাব রাস্তা থেকে বাড়ির দিকে নামলেও গেইটের ভেতরে প্রবেশ করেনি। বিপরীতে চলে গেছে ধান শুকানোর জমিতে। রোজা ও মৌসুমীকে দেখতে পেয়েছে সেখানে। মৌসুমী প্রথমে দেখতে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উচ্চারণ করলো,
“দুলাভাই!”
বলার পরপর নিজেই দ্বিধান্বিত হয়ে জ্বিভ কাটলো। মাহতাব মুচকি হাসলেও রোজা বেশ লজ্জায় পড়লো। ইচ্ছে করছিলো মৌসুমীকে ঠাসঠাস দুইটা লাগাতে! এতো বেশি বকবক কেন করবে সে?
“কি অবস্থা? কি করছো তোমরা?”
মাহতাবের জিজ্ঞাসায় মৌসুমী জবাব দিলো,
“ধান দেখি।”
“লুডুর দিকে চোখ রেখে ধান দেখো? সব তো হাঁসমুরগির পেটেই যাবে।”
“আরে না, তারা জানে এখানে আমি আছি। একদম হুশিয়ার। বসো, ভাইয়া। তেঁতুল খাইবা?”
“তেঁতুল তো বড়ও হয়নি৷ এখনই খাওয়া ধরেছো?”
“এগুলোই বেশি মজা।”
মাহতাব তাদের থেকে সামান্য দূরত্বে অন্য শিকড়ে বসলো। মৌসুমী তিনটা তেঁতুল এগিয়ে দিলে সে ছোট থেকে একটা নিলো। বাকিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে এক চিমটি লবণ মাখালো। রোজার কাছে প্রশ্ন করলো,
“বড় মামা বাসায় আছে?”
লুডুর চাল দিতে দিতে রোজা বললো,
“হুম।”
এরইমধ্যে ধানের পাশে মুরগি উঠে এলে মৌসুমী চলে গেলো মুরগি তাড়িয়ে ধান নাড়তে। মাহতাব জিজ্ঞেস করলো,
“ভার্সিটিতে যাওনি?”
“যাইনি আজ। পরীক্ষার দিনই যাবো।”
“পরীক্ষা শেষ কবে?”
“একদিনে দুইটা করে পরীক্ষা তো, এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।”
“আগামী সপ্তাহের শুক্রবারের আগেই তবে শেষ?”
“হুম। বাসায় চলো?”
“হুম, যাবো।”
“আব্বার সাথে প্রয়োজন? আব্বা তো আজ যাবে বোধহয় ফুপির সাথে দেখা করতে?”
“কেন?”
“জানি না। কথা বলতে হয়তো।”
“কি কথা?”
মাহতাব যেন ইচ্ছাকৃত জিজ্ঞাসা করলো সবটা খুটিয়ে তার মুখে শুনতে। রোজা লুডুর গুটি নাড়তে নাড়তে লাজুক হেসে বললো,
“জানি না।”
“বিয়ের ব্যাপারে?”
“বললাম তো, জানি না। দাদাজান কি প্রয়োজনে যেন পাঠাচ্ছেন।”
“আমি জানি, বিয়ের ব্যাপারেই। তোমার কোনো কথা আছে?”
“আমার আবার কি কথা?”
“বিয়ের ব্যাপারেই যদি বলতে ইচ্ছে হয় কোনো কিছু?”
রোজার লজ্জা যেন ভয়াবহরকম বাড়তে লাগলো। সে কোনো জবাব দিচ্ছে না।
“হুম?”
মাহতাব আবারও জানতে চাইলে সে দৃষ্টি নত রেখেই মাথা দুদিকে নাড়লো। এরইমধ্যে ধপাস করে কিছু পড়ার শব্দ হলে রোজা হঠাৎ আৎকে কেঁপে উঠেছে। দুজনেই পেছনে ফিরে দেখলো সিয়াম আর পাশের বাড়ির চাচাতো ভাই একত্রে ঝাপ দিয়েছে পুকুরে। পানিতে পড়ার শব্দই ধপাস করে উঠেছে। রোজা সিয়ামকে বললো,
“এখন নেমেছিস, আবার না গোসল করতেই হবে?”
সিয়াম সাঁতার কাটতে কাটতে হেসে জবাব দিলো,
“আরও দুইবার করমু।”
দুজনেই পিছন থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পূর্বাবস্থায় বসলে মাহতাব মৃদু হেসে বললো,
“ভয় পেয়েছো?”
জবাবে হাসলো রোজা।
“পুকুরে গোসলের মজা অন্যরকম হয়। বারবারই করতে মন চায়। কতদিন হয় এমন মজায় মিশতে পারি না।”
“কেন, তোমাদের না পুকুর আছেই? তোমাদের পুকুর তো আরও সুন্দর, বাঁধাই করা।”
“হলেই কি, সময় কোথায়? সুযোগেরও অভাব। চাচী, বোন কিংবা ভাইয়ের বউয়েরা ঘাটে থাকলে কি যাওয়া যায় সেভাবে? তুমি ওবাড়িতে যাওয়ার পর সুযোগ হবে হয়তো।”
“কিভাবে?”
“এই ধরো কাপড়চোপড় ধোয়ার অজুহাতে তুমি ঘাট দখল করলে। তখন গিয়ে নামতে পারবো আমি।”
রোজা লাজুকলতার মতো মিটিমিটি হাসলো। মাহতাব উঠে যেতে যেতে বললো,
“আচ্ছা, যাই। নানাজানের সাথে দেখা করি।”
“এদিকে কোথাও গিয়েছিলে নাকি আমাদের বাড়িতেই?”
“না, যাইনি কোথাও। তোমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যেই আসা। কাল চলে যাবো তাই এসেছিলাম সবার সাথে দেখা করতে। আচ্ছা, থাকো।”
চলে গেলো মাহতাব। মৌসুমী ধান নেড়ে ফিরে এসে ফিসফিস করে বললো,
“ভাইয়া কি বলে গেছে, আপু?”
“কি বলবে?”
“প্রেমের কবিতা সবিতা কিছু শুনিয়ে যায় নাই?”
“বেশি পাকামো করবি, মাইর খাবি।”
“ইশ! শুনাইছে, শুনাইছে। তুমি বলবা না, সেইটা হইলো আসল কথা।”
রোজা লুডু বই উল্টে দিয়ে বললো,
“আজ সত্যি সত্যি বিচার দিবো ছোট মা’র কাছে।”
মৌসুমী হাসতে হাসতে তেঁতুল নিয়ে সরে গিয়ে বললো,
“আচ্ছা, দিয়ো। দিয়ো।”
চলবে।