সোহাগি সাঁঝমল্লার পর্ব-০৭

0
1

#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৭.

দুপুরের রান্নার তোড়জোড় চলছে তালুকদার নিবাসে। মিসেস মোশাররফের রান্নাঘর থেকে ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, সাথে টুংটাং আওয়াজ বাসার সামনের রাস্তা অবদি চলে যাচ্ছে। বেলা বারোটার এ সময়টায় এ বাসা পুরুষশূণ্য থাকে। অভ্র চলে যায় কলেজে, মাশফিক রেডিও অফিসে, আসিফ তার বইয়ের দোকানে আর মোশাররফ তালুকদার থাকেন ভূমি অফিসে। দুপুরের খাবারটা একমাত্র আসিফই বাসায় এসে খেয়ে যায়। মিসেস মোশাররফ ব্যস্তহাতে সে রান্নার কাজেই ব্যস্ত। পিচরঙা থ্রিপিসের ওড়নাটা আড়াআড়িভাবে গিট দিয়ে, চুলগুলো উচুতে হাতখোঁপা করে সাঁঝও রান্নাঘরে মায়ের হাতেহাতে কাজ করে দিচ্ছে। এতক্ষণ এটাসেটা কেটে, ব্লেন্ড করে মাকে এগিয়ে দেওয়ার পর এবার সালাদের জন্য শশা কাটতে শুরু করেছে ও। মিসেস মোশাররফ খুন্তি নাড়তে নাড়তে একপলক মেয়ের দিকে তাকালেন। সাঁঝের কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম, চেহারার সামনে সরু একগোছা চুল দুলছে। ডানহাতের পিঠে গলার দিকে ডলা মারল ও। শশা কাটতে কাটতে হুট করেই সাঁঝ মায়ের দিকে তাকাল। মাথা উচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

– কি দেখছ?

– এটুকো আমি করে নিতে পারব। তুই গিয়ে গোসলটা কর।

– একেবারে শেষ করে দুজনেই কিচেন থেকে বেরিয়ে যাব। তুমি তোমার কাজ করো।

দুহাতের ইশারায় সবটা বুঝিয়ে দিলো সাঁঝ। মিষ্টি হেসে পুনরায় মনোযোগ দিলো নিজের কাজে। মেয়েকে দেখতে দেখতে মিসেস মোশাররফের হাতের গতি কমে আসে। বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরোতে চায়। সাঁঝ কখনো কোনো কাজে তাকে একা ছাড়ে না। শুধু তারই না, কারো কাজে লাগতে পারলে ও সেটা করে দেবার সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করে। ওরমতো যত্নশীল মেয়ে খুব কমই হয়। সব ভাবতে গিয়ে মিসেস মোশাররফকে আরো তাবৎ দুঃখ ঘিরে ধরে। তার এই গুণী মেয়েটাকে ওপরওয়ালা কেন আলাদা করে দুনিয়ায় পাঠাল? সবাইকে এতোএতো ভালোবাসতে জানা মেয়েটার জীবনে ভবিষ্যতের মানুষগুলো ওকে ভালোবাসবে তো? ওর এই মিষ্টিমিষ্টি ইশারায় বিলিয়ে দেওয়া ভালোবাসা বুঝবে তো?

– আপা?

ধ্যান ভাঙে মিসেস মোশাররফের। তাড়াহুড়ো করে চুলায় আঁচ কমিয়ে দিয়ে কিচেনের বাইরে তাকালেন তিনি। সাঁঝও বাইরে তাকাল। সেখানে আসিফের সাড়ে আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রুবি দাঁড়ানো। ওকে দেখতেই মিসেস মোশাররফ দ্রুতপদে বেরিয়ে আসলেন কিচেন থেকে। ব্যস্তভাবে বললেন,

– একি রুবি? তুই নিচে কেন? কিছু দরকার?

রুবি একপলক সাঁঝের দিকে তাকাল। পুনরায় মিসেস মোশাররফের দিক ফিরে জোরালো হেসে বলল,

– না আপা। কিছু লাগবে না। ওপরে একাএকা ভাল্লাগছিল না। তাই. . .

– কি যে করিস না! কল করে দিতি! আমি সাঁঝকে পাঠিয়ে দিতাম! এখন আসিফ যদি এসে দেখে তুই সিড়ি ভেঙে নিচে নেমেছিস, আমি ওকে কি জবাবটা দেবো?

রুবি জবাব দিতে পারল না। আপাতত ওর তো সাঁঝের সাথে কথা নেই। ওর কথা তো মিসেস মোশাররফের সাথে। তাই নিচু স্বরে বলল,

– আপা, একটু কথা ছিল তোমার সাথে।

– কি কথা? আচ্ছা চল ওদিকে চল! ফ্যানের নিচে বসবি! সাঁঝ? তরকারীটা দেখিস তো!

এক সেকেন্ডের জন্য আটকে, রুবিকে নিয়ে মিসেস মোশাররফ ড্রইংরুমে সোফায় বসালেন। তারপর নিজেও বসে গেলেন ওর পাশে। মৃদ্যু হেসে টমেটো কাটায় মনোযোগ দিলো সাঁঝ। ও জানে ড্রয়িংরুমে মা-চাচীর মাঝে কি কথোপথন হচ্ছে। সম্পর্কে চাচী হলেও, রুবি বয়সে ওর খুবএকটা বড় না। আসিফের সাথে ওর বিয়েটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা ছিল। অনার্স শেষ করে আসিফ যখন কোনো চাকরি পাচ্ছিল না, মোশাররফ তালুকদারের কথামতো সে বইয়ের দোকান দেয়। জন্মগত মা-হারা রুবির বাবা ছিল আসিফের দোকানের পুরোনো বইয়ের খরিদদার। লোক একদিন অকস্মাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। তার জানাজায় শামিল হতে গিয়ে আসিফ রুবিকে প্রথমবার দেখেছিল। এরপর বাবার একমাত্র মেয়ে হিসেবে ওর দোকানের পুরোনো বইয়ের খদ্দের হয়ে যায় রুবি নিজেই। সেখান থেকেই দুজনার চেনাজানা, ভাব বন্ধুত্ব। এরপর একদিন মোশাররফ তালুকদারের অনুমতি নিয়ে আসিফ নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দেয় রুবিকে।

তালুকদার পরিবারের বিষয়ে সব জানাশোনা থাকায় অনাথ রুবি দ্বিমত করে নি। বিয়ের আগের ওর জীবন যতটা আয়েশহীন-যত্নহীন ছিল, তার সবটুকো বদলে গেছে আসিফকে বিয়ে করার পর। তালুকদার নিবাসের ওপরতলায় একেবারে সাজানো গোছানো একটা সংসার পেয়েছে ও। পেয়েছে সব আদরভরা সম্পর্ক। মিসেস মোশাররফের যত্নের মাঝে মাকে পেয়েছে, মোশাররফ তালুকদারের মাঝে পেয়েছে পিতৃতুল্য বটবৃক্ষের ছায়া। মাশফিক মাঝেমধ্যেই বৌমা ডেকে ওপরতলায় গিয়ে রুবির খোঁজখবর নেয়। অভ্র দিনে অন্তত একবার হলেও ওর রুমে গিয়ে কথা বলে আসবে। আর আছে এ বাড়ির সবচেয়ে আদরভরা মেয়েটা। সাঁঝ! সে সময়ে অসময়ে ছুট্টে দোতলায় চলে যাবে, রুবির মাথায় তেল দিয়ে দেবে, সদ্যপড়া বইয়ের সারসংক্ষেপ শোনাবে। এভাবেই রুবি তালুকদার নিবাসের মানুষগুলোর সাথে জড়িয়ে গেছে। বাবার মৃত্যুর পর সুতো কাটা ঘুড়ির মতো যার গন্তব্যহীন হয়ে ঘূর্নিপাক খাওয়ার কথা, সেই ও-টা কিকরে যেন এতগুলো মানুষের সাথে জড়িয়ে গেছে। তাই হয়তো সবরকমভাবে এই পরিবারের সুখ চায় ও। আর এই সবরকমের মধ্যে অন্যতম একটা কারণ হতে পারে, সাঁঝের বিয়ে।

– আপা? ছেলেটা যে সাঁঝকে কল করেছিল, ও কি তোমাকে কিছু বলেছে?

কথার মাঝে কথাটা শুনে মিসেস মোশাররফ থামলেন। কিছুটা অবাকই হয়েছেন তিনি। কিচেনে তরকারী নামাতে থাকা মেয়ের দিকে একপলক তাকালেন তিনি। পুনরায় রুবির দিকে তাকিয়ে বললেন,

– তোকে কে বলল?

– কিছুক্ষণ আগে আমাকে কল করেছিল। ও সাঁঝের সাথে দেখা করতে চায়। আমাকে বারবার অনুরোধ করেছে, আমি যেন সাঁঝকে বোঝাই ওর সাথে কথা বলার জন্য।

. . .

– আমাকে তোমার দেবর ঘটনা সবই বলেছে আপা। তুমি একটু ভেবে দেখো, সেদিন যা বলার, তা তো ছেলের মা বলেছিল। ওসময় এমন ভয়ংকর কথা শুনলে কার মাথা ঠিক থাকবে বলো? ছেলেটা নাকি বলেছিল ধীরেস্থিরে বসে কথা বলবে। ওর তো দোষ দেখছি না আমি। ওর ব্যপারে আরেকবার চিন্তাভাবনা করে দেখা যায় না?

ড্রাইফ্রুটসের কৌটো ধরে রাখা একটা হাত রুবির চোখের সামনে আসে। ছোট্ট করে দম ফেলল রুবি। কৌটোটা ধরে মাথা নিচু করে নিলো। মিসেস মোশাররফ রুবির মাথায় হাত বুলিয়ে নিশব্দে হেসে কিচেনে চলে গেলেন। চাচীর গা ঘেষে বসে গেল সাঁঝ। হাটুতে কনুই ঠেকিয়ে, তাতে থুতনি গুজে হাসিমুখে চেয়ে রইল রুবির দিকে। রুবি কৌটোর মুখ খুলে দুইচারটে বাদাম মুখে পুরল। তারপর সাঁঝের দিক চেয়ে বলল,

– ছেলেটা অপরাধবোধে ভুগছে সাঁঝ।

সাঁঝ সোজা হয়ে বসলো। দু হাতের ইশারায় উত্তর বুঝাতে যাচ্ছিল ও। কিন্তু থেমে গেল। রুবি তালুকদার নিবাসে এসেছে সবে দুই বছর হলো। সাঁঝের সাংকেতিক ভাষা বুঝে উঠতে পারে না ও। তাই সেন্টার টেবিলে থাকা ফোন নিলো সাঁঝ। দ্রুততার সাথে কিছু একটা লিখে, সেটা বাড়িয়ে দিলো রুবির দিকে। রুবি হাত বাড়িয়ে ফোন নেয়। স্ক্রিনে লেখা,

– আমি বলে দিয়েছি, আমার ওনার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই।

– দেখা কেন করবে না?

– সবটা তো শেষ। কি দরকার দেখা করার?

– শেষ করে কেন দিচ্ছ? ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই সাঁঝ! যা বলার ওর মা বলেছে। ও তো বলেনি কিছু!

দমে গেল রুবি। সাঁঝ ওর কথা শেষ করার অপেক্ষায় নেই। মোবাইলে নিজের জবাব লিখতে শুরু করেছে ও। রুবি বুঝে গেল, সাঁঝ ওকে থামানোর জবাব লিখছে৷ আর সাঁঝের এ ব্যপারটাই ওর পছন্দ না। ওর ধারণা, একটা কথা বলতে না পারা মেয়ে কখনো আরপাঁচটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবনের অধিকারীনি হতে পারে না। কেউ মনে করুক বা না করুক, বিয়ে না হওয়া অবদি সাঁঝ এই পরিবারের জন্য বোঝা। স্বীকার করুক না করুক, ও তালুকদার নিবাসের প্রতিটা মানুষের গলার কাঁটা। ওর বিয়েটা হলে এই পরিবার অনেকটাই স্বস্তি পাবে। রুবি এই পরিবারের মানুষদের সেই স্বস্তিটুকো চায়। অথচসাঁঝ এদিক দিয়ে পুরোপুরি নির্বোধ হয়ে রয়। ওকে যেমন তালুকদার নিবাসের কেউ কখনো বিয়ে নিয়ে জোর করেনি, তেমনই ওউ সহজে কারো সামনে যেতে চায়নি। অনেক বুঝিয়েশুনিয়ে এবারের সমন্ধে রাজি করানো হয়েছিল সাঁঝকে। অবশ্য পরিচিত পাত্রপক্ষকে বুঝাতে গিয়ে রুবিকেও অনেক পোহাতে হয়েছিল। তাই সেসব চেষ্টার এমন পরিণতি মানতে পারছে না ও। লেখা শেষে সাঁঝ ফোন পুনরায় বাড়িয়ে দিলো রুবিকে। তাতে লেখা,

– আমি একটু ব্যাকডেটেড মানুষ বৌমা। আমি মানি বিয়ে মানে আমার সম্পর্ক হবে ওই সম্পুর্ন পরিবারের সাথে। কিন্তু তারা এমন একটা পরিবার, যারা মনেকরে আমি বলতে জানিনা বলে আমার কাছে শোনারই প্রয়োজন নেই। জেনেবুঝে এমন পরিবারে আমি কিকরে জড়াই বলো? আর রইল বাকি ওনার দোষ থাকা না থাকা। আমি বলছি না উনি দোষী। কিন্তু উনি তখন কেন কিছু বললেন না? আমি তো বলতে জানিনা। এখন আমার জীবনে আসতে চলা মানুষটাও যদি বলতে না জানে, আমি কিকরে তাকে অবলম্বন বানাব বলতে পারো?

রুবি আর একটা শব্দ বলার মতো অবস্থাতে ছিল না। পড়া শেষ করে ফোনটা সাঁঝকে নতমস্তিষ্কে এগিয়ে দিলো ও। সাঁঝ ওটা সরিয়ে রেখে রুবির হাত দুহাতের মাঝে নিলো। চোখ দিয়ে ইশারায় বুঝালো, ‘ এসব নিয়ে এতো ভেব না।’
এই সহজ ইশারাটা বুঝল রুবি। কিন্তু মানলো না। চেহারায় একটা নকল টেনে রাখলেও, মনেমনে এসবই ভাবতে লাগল ও।

বিকেলের শেষভাগ। বড় রাস্তাটার মোড়ে অফিসের গাড়ি থেকে নামলো সায়াহ্ন। সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যায় শো থাকে ওর। বাকি তিনদিন সকালে। আর এই তিনদিনে বিকেল চারটার মধ্যে ওর কাজ শেষ হয়। আজও তেমনটাই হয়েছে। সায়াহ্ন কানে এয়ারবাড কানে গুজে পা বাড়ালো বাসার দিকে। কিন্তু কিছুদুর আগানোর পর পা থামে ওর। এই রাস্তাটা দুইদিকে গেছে। হাতের ডানে এগোলে ওর নিজের বাড়ি, বামে গেলে তালুকদার নিবাস। দু সেকেন্ডে গন্তব্য ঠিক করে নিলো সায়াহ্ন। অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে মোবাইল পকেটে পুরলো। তারপর হেলেদুলে হাটা লাগালো বামদিকে। হুইস্টলিং করতে করতে, আশপাশের বাড়িগুলো দেখতে দেখতে হাটছিল সায়াহ্ন। হুট করে একটা ক্রিকেট বল দ্রুতগতিতে উড়ে আসে ওরদিকে। বলটা সোজা সায়াহ্নর চেহারায় এসে লাগতে যাচ্ছিল। প্রস্তুত না থাকলেও, কিকরে যেন সেটা ক্যাচ করে নিলো ও। হাত নামিয়ে দৃষ্টিতাক করলো সামনেই ক্রিকেট খেলতে থাকা অল্পবয়সী ছেলেগুলোর দিকে।

বল ক্যাচ ধরা মানুষটাকে দেখে, ব্যাট হাতে ধরে রাখা অভ্র তালুকদার ঢোক গিলল একটা। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না। সেকেন্ডের ব্যবধানে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া অভ্রর গলা সেই শুকনো ঢোকে ভিজল না। এতোক্ষণ একের পর এক ছয় মেরে যাওয়া ছেলেটার এবার যেন নড়চড় করতেও কষ্ট হচ্ছিল। সায়াহ্ন যে ওর আর দিবার প্রেমের বিষয়ে সবটা জেনে গেছে, দিবা আগেরদিনই ম্যাসেজে বলে দিয়েছিল ওকে। এটাও বলেছিল যে এ বিষয়ে সায়াহ্নর আপত্তি নেই। সে হয়তো দেখা করতে পারে ওরসাথে, অভ্র যেন মানসিকভাবে তৈরী থাকে। যতই আপত্তি না থাকুক, সায়াহ্ন হামিদের স্বভাব সম্পর্কে আন্দাজ হয়ে যাওয়ায় চিন্তা অভ্রর পিছু ছাড়েনি। দিবা আরজে সায়াহ্ন হামিদের বোন, ওকে প্রোপোজ করার আগে অভ্র এটা তো জানতো। কিন্তু জানতো না সায়াহ্ন আসলে কেমন। আর প্রোপোজ এক্সেপ্ট করার পর দিবা ভাইয়ের সম্পর্কে যতটুকো বলেছিল, অভ্র তাতেই বুঝে গিয়েছিল, রেডিও মস্তির যে হাসোজ্জ্বল মুখ হিসেবে ও সায়াহ্নকে চেনে, লোকটা আসলে ততটা সুবিধার না। পেশাগত জীবনে হাসিমুখে পাব্লিকের কল নিলেও, ব্যক্তিগত জীবনে যে সে মূলত পাব্লিকের কল বাজায়।

দিবার সাথে যোগাযোগ যত বাড়ছিল, ভয় ততই অভ্রকে অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরছিল। আগে যদি ওর এসবের আন্দাজটুকোও থাকত, তাহলে হয়তো ও দিবার পা তো দূর, চোখও বাড়াত না। কেননা শুরুতে ওর একমাত্র ভয় ছিল মাশফিক। এইবয়সে প্রেমের কথা মাশফিক জানলে ওর গর্দান যাবে, এই ভয়ে ও কেবল মাশফিকের বিষয়ে সতর্ক থাকত। আর হিসেব করতো ভার্সিটিতে যাবার পর দিবার বিষয়ে সাঁঝকে বলে, ওকে দিয়ে বাবাকে বলাবে। ছোটচাচা আসিফের মতো মোশাররফ তালুকদার হয়তো ওর প্রেমও বিবেচনা করবেন, মাশফিক তখন আরকিছু বলতে পারবে না। কিন্তু সায়াহ্নর স্বভাব মাথায় বসে যাবার পর অভ্রর হিসেব সব উল্টেপাল্টে যায়। এতদিন যাও ছিল দিবার মুখে শোনা। কিন্তু সাঁঝের বিয়েভাঙা কান্ডের পর ওর ঘুমই উড়ে গেছে। বারবার মাথায় এসেছে, সায়াহ্ন হামিদ সুবিধার লোক না। আর সে লোকটা জেনে গেছে, ও তারই বোনের সাথে লুকিয়ে প্রেম করছে।
দুশ্চিন্তায় আজ কলেজে গিয়েও ঠিকমতো মনোযোগ ছিল না অভ্রর। দিবা হয়তো লক্ষ্য করেছিল সেটা, ব্রেকের সময় অনেককিছু বলে ওকে বুঝিয়েছে। অভ্র কোনোরকমে আশ্বস্ত হয়ে বাসায় ফিরেছিল। একটু মন ভালো করতে বেরিয়েছিল পাড়ার ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলতে।
কিন্তু মন আর ভালো হলো কই? নীলাভ ছাইরঙা শার্ট, কালো প্যান্ট পরিহিত লম্বাচওড়া যে মানব ওর সামনে বল হাতে দাড়ানো, সদ্য মুখস্ত করা দেহের দুইশ চারটা হাড় যেন তার হাতেই গুড়োগুড়ো হতে দেখছিল অভ্র। সায়াহ্ন ওকে শূণ্যে তুলে পেটাচ্ছে। এই গেল হাতের হিউমেরাস! খটাশ শব্দে ভেঙে গেল রেডিয়াস, আলনা। তারপর তিনটুকরা হলো অভ্রর পায়ের ফিমার। টিবিয়া, ফিবুলারও শেষ রক্ষা হলো না। আরেকটা ঢোক গেলে অভ্র। সামনে দাড়ানো সায়াহ্ন ওরদিক চেয়ে হাতের বল অন্য এক ছেলেকে ছুঁড়ে মারল। বল ক্যাচ করে নেয় সে ছেলেটা। সায়াহ্ন আয়েশী কন্ঠে বলল,

– মিস্টার তালুকদার? কথা আছে আপনার সাথে। চলুন কোথাও বসে কথা বলি।

কোনোমতে ঘাড় ঘুড়িয়ে সাথের ছেলেগুলোকে দেখল অভ্র। পাশেরজনকে হাতের ব্যাটটা অতিকষ্টে বাড়িয়ে দিয়ে, অসহায়ের স্বরে বলল,

– বাসার কেউ খোঁজ করতে আসলে বলিস চা খেতে গেছি।

‘ কিন্তু আমি মূলত মা*রা খেতে যাচ্ছি।’
শেষলাইনটা মুখে আনতে পারল না বলে বুকের ওপর পাথর অনুভব হলো অভ্রর। ঠোঁটে হাসি ফুটলেও ওর চোখে ফুটে ওঠে সীমাহীন বেদনা। ওর সাথের ছেলেটা ব্যাট হাতে নিয়ে মাথা দুলাল। সায়াহ্ন প্রসারিত হাসির সাথে হাত বাড়িয়ে এগোতে বলল অভ্রকে। ব্যর্থ সৈনিকের মতো অভ্র আগেআগে পা বাড়ায়। প্যান্টের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে সায়াহ্ন হেসে ওর পেছনে হাটা শুরু করলো। কিন্তু মোড় ঘুরে উঠতেই ওদের দুজনেরই পা থামে। সামনের গাঢ় নীল সালোয়ার-কামিজ পরিহিত রমণীকে দেখে অভ্রর চোখ চকচক করে ওঠে, আর সায়াহ্নর হাসি স্তিমিত হয়ে যায়।
হাসতে হাসতে সাথে হাটতে থাকা সুজির থেকে চোখ তুলে সামনে তাকালো সাঁঝ। সুজিকে নিয়ে বেরিয়েছিল ও। ফেরার পথে এভাবে থামতে হবে, তা তো ও ভাবেনি। সাঁঝের চঞ্চল চোখজোড়া একবার দেখল অভ্রকে, তো একবার পেছনে থাকা সায়াহ্নকে। কোনো কারণ ছাড়াই ওর মস্তিষ্ক ওকে জানান দিলো, অভ্র সায়াহ্নর সাথেই কোথাওএকটা যাচ্ছে। আর অবশ্যই, সেটা ও চাইবে না!

কাউকে কিছুই বলার সুযোগ না দিয়ে সাঁঝ ভাইয়ের হাত ধরল। আরেকহাতে ‘ চলো’ বুঝিয়ে, ভাইকে নিয়ে সায়াহ্নকে পাশ কাটিয়ে চলে আসছিল ও।
ব্যস পাশ কাটানোই হয় সাঁঝের। চলে আসা হয়না। দুইপা এগোতেই পুরুষালি হাতের মুঠোতে নিজের হাতকে আটক অনুভব করলো সাঁঝ। মৃদ্যু কেঁপে উঠে, দুচোখে একআকাশ বিস্ময় এটে পেছনে তাকাল ও। হয়ে রইল হতচকিত, বিমূর্ত। সায়াহ্ন হামিদ তখন তার চিরচেনা গা-ছাড়া ভঙিতে ওর হাত ধরে দাড়ানো। অভ্রও স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রয়। দুটো হাতের বিপরীতে তখন পশ্চিমে হেলতে থাকা গোলাকার সূর্য। বেলাশেষের ঘোষণা দিয়ে বিদায় নিচ্ছে সে। লালচে রঙের উজ্জ্বল আকাশের সাথে জানান দিচ্ছে, এ সময়টার নামই সাঁঝ; এ সময়টার নামই, সায়াহ্ন!

#চলবে…