#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৯.
বরাবরের মতো আজও দিবা নক না করেই ভাইয়ের ঘরে ঢুকল। সায়াহ্ন তখন বিছানায় বসা। পা টান করে, বালিশে হেলান দিয়ে বসেবসে ল্যাপটপ ঘাটছিল সে। মুলত শো এর জন্য থিম তৈরী করছিল। হাতের নাগালে বেডসাইড টেবিল থাকা সত্ত্বেও, ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা ও বিছানাতেই রেখেছে। ভাইয়ের এই কাজ পরিচিত দিবার। মনেমনে প্রতিবার ও চায়, উপচে পরা কফির মগের সবটুকো কফি পরে গিয়ে সায়াহ্নর বিছানা ভাসিয়ে দিক। কিন্তু কিকরে যেন কোনোবারই তা ঘটে না। ওর ঘরে প্রবেশ করা নিয়ে ভাইয়ের কোনো হেলদোল নেই দেখে এগিয়ে আসলো দিবা। বলল,
– অভ্রর সাথে কথা হয়েছে তোর?
সায়াহ্ন দৃষ্টি তুলল। গলায় ঝোলানো স্কার্ফের কোনা ধরে দিবা ওরদিকে চেয়ে আছে। একটা শয়তানী হাসি দিলো সায়াহ্ন। পুনরায় কিবোর্ডে হাত চালিয়ে বলল,
– এমন একটা ভাব করছিস যেন তুই কিছু জানিসই না?
দিবা থতমত খেয়ে যায়। কথা তো ওর হয়েছে অভ্রর সাথে। কিন্তু ভাইয়ের সাথেও কথা হওয়া জরুরি। কেননা দুজনের মাঝে কি কথা হয়েছে, অভ্র ওকে তা বলেনি। হাতের ওড়না ছেড়ে দিলো দিবা। একটু এদিকওদিক তাকিয়ে, গলা ঝেরে বলল,
– ত্ তো, কি কথা হলো তোদের?
– অভ্র বলেনি তোকে?
– না।
সায়াহ্ন আরো একপলক দেখে নিলো বোনকে। দিবা না বললেও ও জানে, অভ্র ওকে কিছুই বলেনি। বলবে না! ও আবারো ল্যাপটপ স্ক্রিনে দৃষ্টি জমাতেই দিবা অধৈর্য্য হয়ে পরল। আরো দুইপা এগিয়ে ভাইকে বলল,
– বলনা! কি কথা হলো তোদের? কি বলেছিস তুই অভ্রকে?
– যাই বলে থাকি, None of your business.
– তাহলে কার বিজনেস?
– বাবা না জানা অবদি আমার বিজনেস।
দিবার বলার কিছু ছিল না। সায়াহ্ন হামিদ একবার যখন না বলেছে, তাহলে দুনিয়া উল্টে গেলেও সেটা আর ওর মুখ দিয়ে বার করানো যাবে না। দিবা গাল ফুলিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে কিছু একটা ভেবে দাড়িয়ে গেল ও। পেছন ফিরে, সুক্ষ্ম চাওনিসমেত ভাইকে প্রশ্ন করলো,
– By the way! তোর বিজনেসে, সাঁঝ আপু কেন?
চোখ তুলল সায়াহ্ন। দু দন্ড নিরবে চেয়ে রইল বোনের দিকে। ও জানে আরকিছু না বললেও সাঁঝকে বলার বিষয়ে এটা অভ্র দিবাকে কেন বলেছে। কারণ দিবার এই প্রশ্নটা অভ্রর নিজেরও। সায়াহ্নকে চুপ দেখে ভ্রু কুচকায় দিবা। ভাইকে চেনে ও। সোজাসাপ্টা জবাব দিতে সেকেন্ডও লাগে না তার। এই প্রথমবার ওর মনে হলো, ওর ভাই জবাব দিতে সময় নিচ্ছে। তাই পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
– কিছু জিজ্ঞেস করলাম তোকে! অভ্রকে সাঁঝ আপুকে সবটা বলতে বলেছিস কেন? আপুকে এসব জানানোর কি দরকার ছিল?
– যাতে ছোটভাইয়ের কীর্তি মাশফিক তালুকদারের কানে গেলে তালুকদার নিবাসের কেউ একজন ওকে বাঁচিয়ে নিতে পারে।
সায়াহ্নর প্রতিত্তোর নিশানা বরাবর ছিল। দিবার এবারে সাঁঝকে সবট জানানোর কারন বুঝে আসে। ভাইয়ের দূরদর্শিতা সম্পর্কে আগে থেকেই আন্দাজ ছিল ওর। কিন্তু ও কখনোই সায়াহ্নর প্রশংসা করেনি। আজও প্রশংসা ওর মুখ দিয়ে বেরোলো না৷ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলল,
– যতটা ভেবেছিলাম, ততোটাও গাধা তুই নস।
– কিন্তু আমি তোকে যতটা ভাবি, তুই তার চেয়েও বড় গাধী। দুনিয়ার একমাত্র মাইনাস আইকিউয়ের প্রাণী, please get out and favour me. ডিস্টার্ব হচ্ছি আমি!
মুখ ভেঙচিয়ে চলে গেল দিবা। নিরাগ্রহে বোনের চলে যাওয়া দেখল সায়াহ্ন। ও চোখের আড়াল হলে আবারো ল্যাপটপে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করলো। কিন্তু চারপাঁচটা অক্ষরে ট্যাপ করার পরপরই ওর আঙুলের গতি কমে যায়। সায়াহ্ন পুনরায় চেষ্টা করে দ্রুত টাইপ করার। কিন্তু পারে না। ধপ করে ও এবার ল্যাপটপটাই বন্ধ করে ফেলল। বুঝে গেল, ওর মনোযোগ শেষ। ওর দ্বারা এমুহূর্তে আর কাজ করা হবে না। হুবহু দিবার বলা কথাটাই ফলছে এখানে। সত্যিই সায়াহ্নর বিজনেসে, সাঁঝ চলে এসেছে।
•
জ্ঞান ফেরার পর সবার আগে আসিফকে চোখে পরে রুবির। সাদা তোয়ালেতে মোড়ানো কোনো এক পুতুল কোলে নিয়ে সে একদম ওর সামনেই দাড়িয়ে। ওকে চোখ মেলতে দেখে আসিফ হাসি দিলো একটা। নরম স্বরে বলল,
– এখন কেমন আছো?
– বেটার।
ঘাড় ঘুরিয়ে রুবি কেবিনে উপস্থিত সাঁঝকে দেখল।কিছুটা দুরে দাড়ানো সাঁঝের পরনে হালকা বেগুনী রঙের লম্বা কামিজ, সাদা স্কার্ট, সাদা ওড়না। উঁকিঝুঁকি দিয়ে বাচ্চাকে দেখছে সে। ওর চোখের তারারা এতবেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে যেন দুনিয়ার সব আগ্রহ, উল্লাস ওই দুই চোখে জমা। হবেই বা না কেন? গত সাড়ে আটমাসে এই সুখের জন্যই তো কতো জল্পনা কল্পনা করেছে ও! সাঁঝ ইশারায় রুবিকে বুঝাল,
– ভয় পেও না বৌমা। সব ঠিক আছে।
রুবি বুঝল না সাঁঝের ইশারা। তবে ও ভয় পেয়েছিল। প্রাণভয়। এবং সেটা নিজের না। ওর ভেতরে পরিপক্ব হওয়া ছোট্ট প্রাণটার ভয়। গতরাতে ওয়াশরুমের সামনের পাপোশে পিছলে পরে গিয়েছিল ও। তীব্র ব্যথা নিয়ে সেসময় রুবির ব্যস এটাই মনে হচ্ছিল, ও মারা গেলে যাক। কিন্তু ওর বাচ্চাটার যেন কিছু না হয়। ওপরওয়ালা বরাবরের মতো এবারেও ওর দুয়া শুনেছে। অশেষ রহমত ঢেলে দিয়ে বাচিয়ে নিয়েছে দুজনকেই। সাঁঝ বাচ্চার দিকে এগোচ্ছিল। তখনই রুবি কোনোরকমের আড়ষ্টতা ছাড়াই বলে উঠল,
– সাঁঝ? সুজিকে ধরে আসছো না তুমি?
সাঁঝ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চাচীর দিকে তাকাল। আসিফ মেয়েকে কোলে দুলাতে দুলাতে আগে একপলক সাঁঝকে দেখল। তারপর স্ত্রীকে বলল,
– তোমাকে হসপিটালাইজড করার পর সাঁঝ এখান থেকে একচুলও নড়েনি। ও সুজিকে পাবে কোথায়?
স্বামীর কাছ থেকে সাঁঝের পক্ষে কথা আশা করেছিল রুবি। তাই কিছু বলল না ও। সাঁঝ এসব কানেই তুলল না। ওর চোখ ছিল বাচ্চাটার দিকে। তাকে নড়চড় করতে দেখে ইশারায় চাচাকে শান্ত হতে বলল ও। সকালবেলা ওই বাবা-মাকে ঠেলেঠুলে বাসায় পাঠিয়েছে। রুবি আর ওর বাচ্চাকে নিয়ে আতঙ্কে ছিল প্রত্যেকে। চিন্তায় চিন্তায় সারারাত জাগার পর তাদের একটু বিশ্রামের দরকার ছিল। মাশফিকও গেছে তাদের সাথেই। ফ্রেশ হয়ে একেবারে অফিসের জন্য বেরোবে ও। আপাতত হাসপাতালে শুধু ও আর আসিফই ছিল। রুবি ক্লান্ত তবে স্বস্তিভরা চোখে ও কেবল স্বামী-সন্তানকে দেখছিল। এক পর্যায়ে বলল,
– নাম কি রেখেছ আসিফ?
– নাম? আমি তো নাম রাখিনি কোনো। কিরে সাঁঝ? বোনের নাম কি রেখেছিস?
আসিফের সাঁঝকে ডাক লাগাতে দেখে রুবির মনটা আবারো বিষিয়ে ওঠে। সাঁঝ হাসিখুশি মনোভাব রেখে ইশারায় বোঝাল,
– আমিও রাখিনি। বৌমার জ্ঞান ফেরার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
– তো এখন তো তোর বৌমার জ্ঞান ফিরেছে। দুজনে আলোচনা একটা নাম দে আমার মেয়েকে?
– সাঁঝকে এতো দায়িত্ব দিতে হবে কেন? তোমার মেয়ের নামটা নাহয় তুমিই রাখো?
রুবির কথা শুনে দমে গেল সাঁঝ। ও বেশকিছু মেয়ের নাম মোবাইলে তুলে রেখেছিল। জ্ঞান ফেরার পর রুবিকে দেখাবে বলে, ওই নামে বাচ্চাকে ডাকবে বলে। কিন্তু রুবি এখন যা বলল, তাতে ওর মনেহলো ওর দেওয়া নাম মেয়ের জন্য চাইছে না সে। মেয়েকে দেখতে ব্যস্ত থাকায় সাঁঝের চেহারার উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাওয়াটা আসিফ লক্ষ্য করলো না। দুলতেদুলতে বলল,
– আমি আবার কি নাম রাখব? সাঁঝই রাখুক!
– না! তুমিই রাখো! যা খুশি নাম রাখো, কিন্তু তুমিই রাখো!
আসিফ এবারে কিছুটা চমকে চোখ তুলে তাকাল। রুবির গলায় এবার বাড়তি জোর ছিল। ভ্র কুঁচকে আসে আসিফের। সাঁঝকে দেখে নিয়ে পুনরায় স্ত্রীকে কিছুএকটা জবাব দিতে যাচ্ছিল ও। কিন্তু তার আগেই সাঁঝ চুড়ির আওয়াজ তুলে থামিয়ে দিলো চাচাকে। ইশারায় বুঝাল,
– মেয়ের নাম বাবারাই রাখে চাচ্চু। মেয়েরা এজন্য বেশি বাবাভক্ত হয়। তোমার এই সুযোগ! তালুকদার নিবাসের নিজের দলভারী করতে চাইলে এক্ষুণি মেয়ের নামটা রাখো! তা নাহলে পরে কিন্তু পস্তাবে হুম!
আসিফ চিন্তায় পরে যায়। ঠোঁট কামড়ে কিছুটা সময় ভেবেচিন্তে বলল,
– তালুকদার নিবাসে দুইমাত্র মেয়ে এটা। ও বাসায় সাঁঝ তো আছে। তাহলে ওর নাম দিন রাখি? দিবা?
– না!
রীতিমতো আঁতকে উঠে কেবিনের দরজায় তাকাল সব। ব্যাগ কাধে করে সেখানে অভ্র দাড়ানো। ঘর কাঁপিয়ে এই ‘না’ টা ওই বলেছে। অবশ্য বলবেই বা না কেন? যেই দিবা নামের মেয়েকে বউ বানাবে বলে এতসবকিছু, সেই নামকে কিকরে বোনের নাম হয়ে যেতে দেবে ও? সাঁঝ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে মাথা দুলাল। আরকেউ না বুঝলেও, ও তো জানে, চাচাতো বোনের নাম দিবা হলে অভ্রর ঠিক কোথায় সমস্যা। রুবি কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
– কি ব্যপার অভ্র? কি সমস্যা?
– ওর নাম দিবা রাখা যাবে না বৌমা!
আসিফ ভ্রুকুটি করে চেয়ে ছিল ভাতিজার দিকে। অভ্রের গলার জোরটা বেশি দেখে অবাক হয়েছিল সেও। বলল,
– কেন? দিবা তো সুন্দর নাম!
– ন্ না। ও নাম মানাবে না ওকে! অন্য নাম রাখো তো চাচ্চু!
– কিন্তু এই নামে কি সমস্যা?
অভ্র দুরে দাড়িয়েই অসহায়ের মতো করে চাচীর দিকে চেয়ে রইল। আর রুবির হয়তো ওর অসহায়ত্ব সহ্য হলো না। নিজেকে সামলে ও বলল,
– আ্ আচ্ছা বেশ বেশ! তুমি নাম সাজেস্ট করো বেবির, তোমার চাচ্চু চুজ করে নেবে। ওকে?
মাথা দুলাল অভ্র। তারপর বোনের দিকে তাকাল আড়চোখে। ওর ভঙি দেখে ঠোঁট টিপে হাসি আটকালো সাঁঝ। চুপিসারে হাতের ফোনটা পেছনে ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলো। অভ্র দেখল সেখানে বেশ কয়েকটা নাম। রুবির থেকে লুকিয়ে সেইই নামগুলো আসিফকে পড়ে শোনালো ও। আসিফ সবগুলো নাম শুনে মেয়ের কপালে চুমু দিলো একটা। নাকে নাক ঘষে দিয়ে বলল,
– আহি।
চোখ বন্ধ করে একটা বড়সর দম নিলো অভ্র। অল্পের জন্য কেলো থেকে বেঁচে গেছে ও। দিবারা এ এলাকায় আসার পর থেকে, উল্লেখ করে বলতে গেলে, সায়াহ্ন হামিদের এই এলাকায় পা পরার পর থেকে একের পর এক কেলো ঘটেছে ওর জীবনে। যতবারই ওর মনে হচ্ছে, আর নেওয়া যাচ্ছে না, ঠিক তার পরেরবারই নতুন নাটক হাজির হচ্ছে ওদের জীবনে। অভ্রর ভাবনার মাঝে মিসেস মোশাররফ আর মাশফিক কেবিনে ঢোকে। রুবি দেখেই বুঝল, মিসেস মোশাররফের হাতে খাবারের ব্যাগ। তিনি এসে আলতোহাতে রুবির মাথায় হাত বুলালেন। বুঝাতে লাগলেন, সব ঠিক আছে। মাশফিক এগিয়ে আগে বাচ্চাকে দেখে নিলো, তারপর রুবির খোঁজ নিলো। সাঁঝ গিয়ে ইশারায় অভ্রকে শুধাল,
– সুজিকে এখানে কেন এনেছিস?
– আমরা সব এখানে, বাবা অফিসে। তালুকদার নিবাস খালি একদম। তোর এটাকে ওখানে একা রেখে আসলে কেয়ামত ঘটিয়ে ফেলত না?
ভাইয়ের যুক্তি শুনে মাথা দুলাল সাঁঝ। মিসেস মোশাররফ ওকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– সাঁঝ? অনেক থেকেছিস বৌমার কাছে। এবার বাসায় যা তুই। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নে গিয়ে। আমি আছি এখানে।
– হ্যাঁ। আমি গাড়িতে তুলে দিচ্ছি। অভ্রর সাথে বাসায় ফের তুই।
না সূচক ইশারার জন্য প্রস্তুত ছিল সাঁঝ। কিন্তু তার আগেই মাশফিক থামিয়ে দিয়েছিল ওকে। কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না সাঁঝ। বাচ্চাকে আরেকদফা আদর করে হাসপাতাল থেকে দুই ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে আসলো। বাইরে এসে অভ্রর ব্যাগ থেকে বের করে সাঁঝ সুজিকে কোলে নিলো। মাশফিক রিকশা খোঁজা বাদ দিয়ে বোনকে জিজ্ঞেস করলো,
– কফি খাবি? ফ্রেশ লাগবে।
সাঁঝ তাকিয়ে দেখল রাস্তার উল্টোপাশে একটা কফিশপ। একসাথে বাইরে বেরোলেই বোনকে এটাওটা খাওয়ার জন্য বলে মাশফিক। এটা সাঁঝের জন্য নতুন না। সেই ছোট্টবেলার স্বভাব আজও ধরে রেখেছে ওর ভাই। যদিও এখন কফির পরিবর্তে বাসায় যাওয়াটা সাঁঝের বেশি অনুকূলে বলে মনে হলো, তবুও অভ্রর মুখের দিক তাকিয়ে আর না করা হলো না ওর। মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বুঝালো সাঁঝ। মাশফিক বোনের হাত ধরে রাস্তা পার করালো ওকে। পেছনপেছন আসলো অভ্রও। মাশফিক ভেবেছিল ভাইবোনের সাথে কফি খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। কিন্তু কফিশপের সামনে আসতেই ফোন বাজে ওর। বস দ্রুত যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে। একসাথে বসে খাওয়ার উপায় ছিল না মাশফিকের। ওয়ালেট থেকে হাজারের দুটে নোট বের করে অভ্রকে দিলো ও। বলল কফি খেয়ে সাবধানে তালুকদার নিবাসে ফিরে যেতে।
অভ্র খুশি হয়ে যায়। কেননা এই টাকা থেকে যা বাঁচবে, তা সব ওর। অভ্রর খুশির কারণ টের পেয়েছিল সাঁঝ। তাই ও বড়ভাইকেও থামালো না, ছোটভাইকেও বারণ করলো না। মাশফিক বিদায় নিলে সুজিকে কোলে করে কফিশপে ঢুকে পরলো ও। অভ্র বাইরের ডিপ ফ্রিজে আইসক্রিম দেখছিল। দেখেশুনে এককোনের একটা খালি টেবিলে গিয়ে বসল সাঁঝ। সুজির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে আশপাশ দেখতে লাগল। ওয়েটার এসে বিনীতভাবে ওকে অর্ডারের কথা জিজ্ঞেস করলো। সাঁঝ ইশারায় বাইরের অভ্রকে দেখালে চলে যায় সে। কিন্তু তার পরের সেকেন্ডেই ওর সামনের চেয়ারে এসে বসে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ। তাকে চিনতে সাঁঝের সময় লাগল না। ক্লিন শেভ চেহারা আর মোটাসোটা মোচ বিশিষ্ট এই মানুষটার সাথেই তো কিছুদিন আগে আংটিবদলের কথা ছিল ওর৷ বিব্রত হয়ে দৃষ্টি সরালো সাঁঝ। কামরুল নামের লোকটা বড়সড় একটা হাসি দিয়ে বলল,
– আরে সাঁঝ তুমি এখানে?
সাঁঝ অস্বস্তিতে ছিল। যারফলে প্রতিত্তোর করতে পারলো না। তবে কামরুলও ওর অস্বস্তি বোঝার চেষ্টাও করলো না। বলল,
– তুমি কি এখনো আমার ওপর রাগ করে আছো? সেদিনের ঘটনা নিয়ে আমি কিন্তু সত্যিই প্রচুর গিল্টিফিল করছি সাঁঝ। এ কদিনে প্রচুর ভেবেছি আমি তোমার কথা। তবে ভাবিনি তোমার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে।
– আমি বলেছি তো, আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আর আপনার সাথে আমার কথা বলার ইচ্ছাও নেই। আমাকে একা ছাড়ুন প্লিজ।
থামতে না না বললে কথা বাড়বে। তাই মোবাইলে জবাব টাইপ করে সেটা কামরুলের সামনে তুলে ধরলো সাঁঝ। কিন্তু তা যেন কামরুলের গায়েই লাগল না। সে আবারো বলল,
– কিন্তু আমি তো চাই তোমার সাথে কথা বলতে!
সাঁঝ বাইরে অভ্রর দিকে তাকাল। ও এখন আইসক্রিম নেওয়া বাদ দিয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করেছে। মিষ্টিমিষ্টি হাসতে হাসতে কথা বলছে কারো সাথে। সাঁঝের মনে হলো ওর উচিত বেরিয়ে যাওয়া। এখানে বসে থাকলে কামরুল ওকে বলতেই থাকবে বলতেই থাকবে। আর ওর সেসব শোনার ইচ্ছা নেই। যে প্রয়োজনের সময় ওরজন্য বলেনি, আজ ওরও তার কোনো কথা শোনার প্রয়োজন নেই। সুজিকে কোলে করে উঠে দাড়ালো সাঁঝ। সাথেসাথে কামরুলও উঠে দাড়ালো। সাঁঝের একপ্রকার পথ আগলে দাড়িয়েছে ও। সাঁঝ বড়বড় চোখে চাইলো কামরুলের দিকে। কামরুল বলল,
– প্লিজ যেও না। কথা শেষ করতে দাও আমাকে।
– আরে আরে! জংলি বিল্লি! মিয়াও মিয়াও!
সাঁঝ চমকে সামনে তাকায়। ওকে উদ্দেশ্য করেই কামরুলের পেছনের টেবিলে বসা ছেলে তিনটা হোহো করে হাসছে। সাঁঝের গা ঘিনঘিনয়ে উঠলো। চার তালুকদারের সাথে চলাফেরা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে আজোবদি পরতে হয়নি ওকে। কিন্তু আজ. . .সাঁঝ গুটিয়ে গেল। কফিশপের সেটআপটাই এমন যে বা হাত কিঞ্চিৎ বাড়িয়ে পথ আগলে রাখা কামরুলকে পাশ কাটানোটা সম্ভব না। আবার ওকে পাশ কাটানো মানে সামনের ছেলেগুলোর মুখোমুখি হওয়া। এবার অসহায়ত্ব নিয়ে কামরুলের দিকে তাকালো সাঁঝ। আর সে আশপাশের কথা পুরোদমে উপেক্ষা করে ধীরেসুস্থে বলল,
– আমি কিন্তু সত্যিই অনুতপ্ত!
সাঁঝ বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে নিলো। চোখ মেলে আবারো ঘাড় উচিয়ে দেখল অভ্রকে। কাচের দরজার ওপারে থাকা অভ্রর কানে ওর চুড়ির আওয়াজ পৌছাবে না। এদিকে ছেলেতিনটেরও ওরদিক তাকিয়ে সেই বিশ্রি হাসি থামছে না। কামরুল এতক্ষণে সাঁঝের বিব্রত দশা লক্ষ্য করলো হয়ত। বলল,
– ওদিকে কান দিও না। এসব উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেপেলে এমনই। দেখো সাঁঝ, আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে তুমি আরেকবার ভাব। আমার তোমার কোনোবিষয়ে কোনো আপত্তি নেই। আর. . .
হুট করে সুজি কোল থেকে নামার জন্য উতলা হয়ে পরে। সাঁঝ ওকে সামলাতেই পারল না। সুজি ওর কোল থেকে নেমে দরজার দিকে ছুট লাগাল। কিন্তু মাঝপথেই ওই ছেলেতিনটার একজন দাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেলল ওকে। ওর সাথের দুজনও দাড়িয়ে যায়। সুজিকে কোলে নিয়ে ওরা তিনজন দুলতে দুলতে বলল,
– আরে আরে, গুলুমুলু গুলুমুলু যে? এত তুলতুলে তুলতুলে! কার পুষি তুমি হ্যাঁ? কার. . .
চড়ের শব্দে থমকে যায় কফিশপটা। টেবিলে টেবিলে থাকা জোড়া জোড়া চোখ নিবদ্ধ হয় শব্দের উৎসের দিকে। সেখানে পাথরের মূর্তির মতো তিনটা ছেলে দাঁড়ানো। একজন গালে হাত নিয়ে; আর দুজন, বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে। আরো তিনজনও একআকাশ স্তব্ধতা নিয়ে থেমে আছে। আইসক্রিম হাতেকরে সদ্য ভেতরে ঢোকা অভ্র, সাঁঝ আর ওর সামনে দাড়ানো মানুষটা। ছাড় পেতেই সুজি ছুটে সাঁঝের কাছে চলে আসলো। ওর পাশের চেয়ারটায় উঠে বসে, সাঁঝের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলো যাতে ওকে পুনরায় কোলে নেওয়া হয়। ভয়ার্ত চোখে চড়দাতার দিকে চেয়ে সাঁঝ সুজিকে কোলে তুলে নিলো। পৃথিবী ধাধানো চড় দেওয়া এই পেশিবহুল হাতের মালিক ওর অপরিচিত নয়। জামরঙা শার্ট আর ধূসর প্যান্ট পরিহিত এ সুঠামদেহী মানবের নাম, সায়াহ্ন হামিদ।
#চলবে…