#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১৯.
বইঘরের এককোনের শেলফটার সামনে একটা খোলা জানালা। কাঠের জানালাটায় কোনোপ্রকার গ্রিল নেই। তবে বাইরের দিকে পাটাতনের মতো করে কাঠ বাড়িয়ে রাখা। আর তাতে ছোটছোট টবে কিছু গাছ, পানিভরা একটা গোলাকার পেয়ালায় ছোটছোট কচুরিপানা। রোদ সে পেয়ালার পানিতে প্রতিফলিত হয়ে সাঁঝের মুখচোখে পরছে। গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল সাঁঝ। কলেজ থেকে ফেরার পর হুট করেই ওর মনে পরে গিয়েছিল, বেশ ক দিন ও বইঘরে যায়নি। কর্মচারী তার নয়টা থেকে ছয়টার বাধাধরা সময়ে লাইব্রেরীর দেখভাল করলেও, নিসন্দেহে গাছগুলোর যত্ন করেনি। তাই বিকেল হতে না হতেই সুজিকে নিয়ে বইঘরে চলে এসেছে ও। পানি দেওয়া শেষে সাঁঝ বোতলটা নিচে রেখে দিলো। ওড়নায় হাত মুছে, সামনের শেলফটায় তাকাতেই সাঁঝের চোখ যায় শেলফে থাকা নড়বড়ে বাধনের একটা মোটা বইয়ে। আগ্রহ হয় ওর। গোড়ালি উচিয়ে সাঁঝ হাত বাড়ালো সেদিকে। একেবারে কোনঠাসা মোটা বইটা বের করতে ভালোই বেগ পেতে হলো ওকে। তবুও ও বইটা বের করলো। খুশিমনে কভারটা দেখে, বই খুলে, তাতে নাক ঠেকালো সাঁঝ। ঠিক তখনই কানে আসে,
– I think she likes me.
চমকে উঠে সাঁঝ পাশে তাকালো। এই স্বরকে ও চেনে। চিনবে না কেন? একদম শুরুর দিন থেকে এই স্বরই তো ওকে চমকাচ্ছে, থমকাচ্ছে। আর কারো নয়, এ স্বর সেই বেপরোয়া পুরুষের! এ স্বর, সায়াহ্ন হামিদের!
সায়াহ্ন বরাবর সামনে দাড়িয়ে ছিল। সুজিকে কোলে নিয়ে, বেশ আহ্লাদ করে ওর গায়ে হাত বুলাচ্ছিল সে। নিজের ধারণাকে বাস্তবে দেখে সাঁঝের নড়চড় বন্ধ হয়ে যায়। বই হাতেকরে সায়াহ্নর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ও। সায়াহ্ন সুজির থেকে দৃষ্টি তুলে সামনে তাকালো। দুষ্টুমিভরা হাসির সাথে, ভ্রু নাচিয়ে সাঁঝকে শুধালো,
– What about you ma’am?
ধুপ করে হাতের বইটা বন্ধ করে ফেলল সাঁঝ। এটা যে খুব সুখভরা জবাব ছিল না, তা সহজেই টের পেল সায়াহ্ন। সাঁঝ কঠোর চেহারার সাথে আঙুল সুজিকে ইশারা করলো সায়াহ্নর কোল থেকে নামার জন্য। কিন্তু সুজির হেলদোল নেই। চোখ বন্ধ করে ও বেশ আয়েশে মাথায় সায়াহ্নর হাত বুলানো উপভোগ করছিল। সায়াহ্ন শেলফে হেলান দিয়ে দাড়ালো। সুজির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
– আজ চুড়ি পরো নি কেন?
সাঁঝও অবাক হয়েছিল। কেউ একজন ওর চুড়ি না পরাটা খেয়াল করবে, কখনো ভাবেনি ও। কিন্তু আজ সেটাই ঘটলো। সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য সাঁঝের চেহারায় বিস্ময় এসেছিল। পরপরই নিজেকে স্বাভাবিক করে হাতের বইটা শেলফে রেখে দিলো ও। সায়াহ্ন এবারেও বুঝল, সাঁঝ প্রথমটার মতো এ প্রশ্নটারও উত্তর দেবার প্রয়োজনবোধ করছে না। সায়াহ্নকে পাশ কাটিয়ে আসতে গিয়ে সাঁঝ শুনতে পেল,
– আচ্ছা তুমি এগোও, আমি সুজিকে নিয়ে আসছি তালুকদার নিবাস।
চলার ওপরেই ইউটার্ন নিলো সাঁঝ। যন্ত্রের মতো পুনরায় সায়াহ্নর সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। হাত বাড়ালো সুজিকে নেবে বলে। কিন্তু সায়াহ্ন সুজিকে সরিয়ে নেয়। অসহায়ের মতোকরে তাকিয়ে রইল সাঁঝ। সত্যিই অসহায় ও। কেননা ও জানে, সায়াহ্ন হামিদ একবার যখন বলেছে সে তালুকদার নিবাস যাবে, তারমানে সে এটাই করবে। আর এখন তার তালুকদার নিবাস যাওয়া মানে কেয়ামত হয়ে যাওয়া। আর এটাই সাঁঝ চায় না। যে পরিস্থিতি গত কয়েকদিনে রয়েসয়ে এসেছে, সেখানে আর কোনো তান্ডব চাই না ওর। সায়াহ্ন না ওর পরিস্থিতি টের পেলো, না কারণ। সাঁঝের অসহায় চাওনিকে অস্বস্তি ভেবে ও দোষীর মতোকরে বলল,
– আমি তালুকদার নিবাসেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোড়ে সুজিকে পেয়ে গেলাম। বুঝলাম ও যখন এখানে, তুমিও বইঘরেই আছো, তাই এখানেই চলে এসেছি। এখন তুমি যদি এখানে কথা বলতে কম্ফোর্টেবল না হও তাহলে আমি. . .
‘ আল্লাহর দোহাই লাগে! আপনি তালুকদার নিবাসে যাবেন না! আপনার জন্য আমি আমার পরিবারে আরকোনো ঝামেলা চাই না!’
এমনজাতীয় কিছু একটা টাইপ করার জন্য কাধের টোট ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে যাচ্ছিল সাঁঝ। কিন্তু ওকে তাড়ায় দেখে সায়াহ্ন আগের কথা শেষ না করেই বলল,
– টাইপ করতে হবে না। তুমি ইশারায় বলো, আমি বুঝব।
সাঁঝের হাত থামে। বিস্ময়ে আরেকবার তাকায় ও সায়াহ্নর দিকে। আজও সে ওকে বুঝে গেল। বলার আগেই, বোঝানোর আগেই। সায়াহ্ন এবার সুজিকে নিচে নামিয়ে প্যান্টের দু পকেটে হাত গুজলো। দু কাধ ঝাকিয়ে, বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
– তোমার ভাষা শিখে ফেলেছি৷ বিশ্বাস না হলে পরীক্ষা করে নিতে পারো।
কি করার ছিল, কি বলার ছিল, যেন ভুলে গেল সাঁঝ। তালুকদার পরিবারের সদস্য ছাড়া ওর ভাষা আজোবদি কেউ বোঝেনি। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের বন্ধুবান্ধব, সবার সাথেই টাইপ করে কথা বলতো ও। কেউ কখনো ওর কথা বোঝার জন্য আলাদা প্রয়াস চালায় নি। এমনকি কয়েকবছর আগে তালুকদার নিবাসে আসা রুবিও এখনো অবদি ওর ভাষা রপ্ত করতে পারেনি৷ অথচ মাত্র কিছুদিনের পরিচয়ে ওর জীবনে জুড়ে যাওয়া মানুষটা আজ ওকে বলছে, ওর ভাষা নাকি সে শিখে ফেলেছে! ও নাকি পরখ করে নিতে পারে! সাঁঝ নিজের অজান্তেই ওর কথাটা আমলে নিয়ে ফেলল। ব্যাগ ছেড়ে গুরুতর ভঙ্গিতে দাঁড়ালো ও। ইশারায় বুঝাল কিছু একটা। সায়াহ্ন ওর হাত নাড়ানো দেখে হতবাক হয়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। অতঃপর ডানকাতে কপাল ধরে, হেসে ফেলল। শাহাদত আঙুলের পিঠ দিয়ে শেলফে দুবার টোকা দিলো সাঁঝ। রিমাইন্ডার পেয়ে সায়াহ্ন কপাল থেকে হাত নামালো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, হাসি কমানোর চেষ্টা করে জবাব দিলো,
– একি রণ বাজা বাজে ঘনঘন।
থ হয়ে দাড়িয়ে রইল সাঁঝ। ওর ধারণা ছিল সায়াহ্ন মিথ্যে বলছে। ওর ভাষা না শিখে অহেতুক ওর সামনে গর্ব করছে। আলোচনার কাছাকাছি কিছু বললে সে আন্দাজেই হয়তো সঠিকটা বলে ফেলতে পারে। আর এজন্য আলোচনার বাইরে থেকে ইশারা করেছিল ও। অথচ এ লোক সেটাও বুঝে গেল! সায়াহ্ন মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
– সিরিয়াসলি সাঁঝ? তোমার এটাকে আমার সিলেবাসের বাইরের কোনো লাইন বলে মনে হলো?
সাঁঝ দৃষ্টি সরায়। পুরোদমে অস্বস্তিতে পরে গেছে ও। ও সায়াহ্নর কাছে জবাবই আশা করেনি। কিন্তু এই লোক ওকে জবাবের সাথে কারণও বলে দিচ্ছে। নিচে বসে সুজি তখন পা পরিস্কার করছিল। নিচু হয়ে খপ করে ওকে কোলে তুলে নিলো সাঁঝ। চলে আসতে যাবে, সায়াহ্ন একপা সরে এসে পথ আগলে দিলো ওর। সাঁঝ কোনোরুপ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগেই সোজাসাপ্টা বলল,
– বিয়ে করবে আমাকে?
সাঁঝ টের পেল, ওর চারপাশ ধাধিয়ে গেছে। প্রসারিত চোখে সায়াহ্নর চেহারা দেখতে থাকে ও। সে দৃঢ় পুরুষের চেহারায় একচুল ভণিতা নেই। মানে সে যা বলেছে, তা ভেবেচিন্তেই বলেছে। কোনো ছেলের তরফ থেকে আর যাই হোক, ‘ভালোবাসি’ আর সে থেকে ‘বিয়ে করবে?’, এপর্যন্ত কখনো কল্পনা করেনি সাঁঝ। ওর মতো একটা বাক-প্রতিবন্ধী মেয়ের এমন কল্পনা সাজেই না! কিন্তু ঘটছে তো সেটাই। কদিন আগে এই লোকটারই ‘ভালোবাসি’ বলাটা ওরজন্য ভয়ের ছিল, বিস্ময়ের ছিল। কিন্তু আজ আরজে সায়াহ্ন হামিদের এই বিয়ের প্রস্তাব সাঁঝের জন্য ঠিক কোন অনুভূতির সৃষ্টি করলো, তা ও মোটেও বুঝে উঠতে পারল না। সায়াহ্ন প্যান্টের পকেটে ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল বাঝালো। আগের মতোই স্বাভাবিক ভঙিতে বলল,
– মা-বাবা বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করতে তোমাদের বাসায় যেতে চাইছে। আমিও আর তোমাকে দূরে রাখতে চাইছি না। একেবারে বউ হয়ে আমার কাছে আসতে তোমার আপত্তি আছে কোনো?
– সাঁঝ মামনি? কোনো হেল্প লাগলে ডাইকো। আমি আছি এখানেই!
ষাটোর্ধ্ব কর্মচারীর ডাকে হুঁশে ফেরে সাঁঝ। শেলফের শেষপ্রান্তের ফাঁকা জায়গায় তাকালো ও। হেল্প-এর দরকার তো ছিল। সায়াহ্ন ঘাড় বাকিয়ে একপলক পেছনে দেখে নিয়ে আবারো সামনে তাকালো। কর্মচারী এদিকটায় আসেনি। নিজের টেবিলে বসেই সে ডাক লাগিয়েছে সাঁঝকে। শরীরে মৃদ্যু কম্পন অনুভব করলো সাঁঝ। সেইসাথে এটাও অনুধাবন করলো, ওর চুপ থাকার সুযোগ নেই। জবাব না দিয়ে পাশ কাটানোর মতো কোনো মানুষ ওকে প্রশ্ন করেনি। একটা শুকনো ঢোক গিলে, জড়তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো ও। ইশারায় বোঝালো,
– আপনি অহেতুক বাড়াবাড়ি করছেন। এটা সম্ভব না।
– কেন?
সপাটে সোজা প্রশ্ন এসেছিল। সাঁঝ থমকালো। সবটা তো জানে এই লোক। তবুও ওরকাছে কেন সেসব শুনতে চাইছে সে? সায়াহ্ন গুরতরভাবে বলল,
– কারণ বলো সাঁঝ।
– কারণ আমার পরিবার আপনাকে পছন্দ করে না।
– তো তোমার পরিবারকে কে বিয়ে করতে চাইছে?
আমি তো তোমাকে বিয়ে করব। আমাকে তোমার পছন্দ কিনা, সেটা বলো ব্যস।
সাঁঝের ভ্রু কুচকে আসে। এটা কি মজা করার পরিস্থিতি? নাকি মজা করার মতো কোনো কথা? সায়াহ্ন হামিদের জন্য সবকিছুই যে রসিকতা, আরো একবার তা সাঁঝের মনে পরে গেল। ও এবার কিছুটা রাগ নিয়ে বুঝালো,
– কিন্তু আমার পরিবারের যাকে অপছন্দ, আমি তাকে কোনোদিনও বিয়ে করব না!
সায়াহ্হ ছোট্ট একটা দম ফেলল। গোটা কথোপকথনে কোথাও ও একচুলও অবাক হয়নি। সাঁঝের কাছ থেকে এমন জবাবই আশা করেছিল ও। সাথে এটাও আন্দাজ করোচিল, ওর বিষয়ে নিজের অভিব্যক্তি সাঁঝ স্বীকার করবে না। অন্তত যতোদিন না তালুকদার পরিবার সম্মত হচ্ছে, ততদিন তো নয়ই। সাঁঝ বুঝালো,
– এবার আমি যেতে পারি?
– হ্যাঁ তাহলে আর তোমার সাথে কথা বলে কি লাভ? আমি সোজা তোমার পরিবারের সাথেই কথা বলি। কেন তাদের আমাকে অপছন্দ।
– আপনি জানেন না তাদের কেন আপনাকে অপছন্দ? প্রথমদিনেই আপনি তালুকদার নিবাসে যা করে এসেছিলেন. . .
– ওই ঘটনার গিল্টফিল আছে আমার সাঁঝ। ওখানে তোমার আর কামরুলের পরিবার ছিল। তোমার পরিবার তোমাকে জানে। আর কামরুলের পরিবারকে আমি জানিয়েছি, কেন আমি ওইদিন ওই কথাটা বলেছিলাম। আমার মনে হয়না ওই শব্দ তোমাকে আরকোথাও, কখনো, দ্বিতীয়বার ফেইস করতে হয়েছে৷ অপরাধবোধ এতোবেশি ছিল যে আমি এক্সকিউজ করেছিলাম তোমার কাছে। বেশ কবার। তবুও যদি তোমার মনে হয় তা যথেষ্ট ছিল না, এখনো আমাকে ক্ষমা করা যায় না, তাহলে বলো কি করতে হবে আমাকে। আমি সবকিছু করতে রাজি আছি।
সায়াহ্নর জবাবে কোনোরুপ থামাথামি ছিল না। এমন সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তি হয়তো কেবল সেই দিতে জানে। আর এই জবাবটা সাঁঝও মনেমনে জানতো। অভিযোগ তো ও প্রথমদিনেই তুলে নিয়েছিল। যা ছিল, তা ছিল অনুরাগ। আর সায়াহ্ন হামিদের প্রতিবারের উপস্থিতি সেটাও ভেঙেচুরে দিয়েছিল। সাঁঝ ব্যস ভাইয়ের কথাকেই পুনরাবৃত্তি করছিল। এবারেও মাশফিকের অভিযোগকেই বুঝালো ও,
– যে সম্পর্কে ছিলেন, সিরিয়াস নন বলে সেটাকে আগাতে পারেননি। তাহলে আবার কেন?
– তোমার কি মনে হয়? আমি তোমার ব্যপারেও সিরিয়াস না? খামোখাই তোমাকে বিয়ে করতে চাইছি?
প্রশ্নাকারে একের পর এক জবাব সেভাবেই আসছিল, যেভাবে রুবি দিয়েছিল। মাশফিকের যেই প্রশ্নগুলো সাঁঝকে গত কদিনে স্থির হতে দেয়নি, রুবির প্রশ্নগুলো ওকে আরো অস্থির করেছিল। কয়েকমুহুর্ত পেরিয়ে যায়। সাঁঝের তরফ থেকে আরো কিছু শোনার আশা করছিল সায়াহ্ন। ওকে ইতস্তত করতে দেখে ও কিছুটা মাথা ঝুকিয়ে বলল,
– Yes ma’am? আরকোনো অভিযোগ?
– আপনি তো সিগারেটও খান।
শেষ অবদি এটার ইশারাও দিয়ে ফেলেছিল সাঁঝ। মাশফিকের সর্বশেষ যুক্তি বুঝানো শেষে তৎক্ষনাৎ চোখ নামিয়ে নিলো ও। পরপরই চোরের মতো চোখ তুলে দেখল, সায়াহ্ন হামিদ আটকেছে। এতোক্ষণের কথোপকথনে এই প্রথমবার বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে তাকে। প্রশ্নসূচক চেয়ে ছিল সে। ও কি বুঝালো, সায়াহ্ন যেন এইবারে বুঝে ওঠেনি। দুবার এদিকওদিক তাকিয়ে সায়াহ্ন আবারো সাঁঝের দিকে তাকালো। কিন্তু সাঁঝ তখন আর চোখ তুলছে না। মেঝের দিক তাকিয়ে ডানহাতে বাহাতের আঙুল মোচড়াচ্ছিল ও। সায়াহ্ন অবুঝের মতোকরে বলল,
– তারমানে এখন আমাকে সিগারেট ছাড়তে হবে?
আরেকদফায় চোরা চোখে সায়াহ্নর দিকে তাকালো সাঁঝ। কয়েকমুহুর্ত বিমুঢ় হয়ে থেমে থাকার পর সায়াহ্নর ঠোঁটে অদ্ভুতভাবে হাসি ফোটে। সাঁঝ বুঝে উঠল না, এখানে এভাবে হাসার মতো কিছু আছে কিনা। প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করলো সায়াহ্ন। তারপর সেটা পায়ের পাশের ময়লার ঝুড়িটায় ফেলে, হাসিমুখে বলল,
– ব্যপার না! I’ll manage! সকালবিকাল তোমার চুমু পেলে এর নেশা আপনাআপনিই কেটে যাবে।
কান গরম হয়ে ওঠে সাঁঝের। ওখানে আর একটাসেকেন্ড দাড়ানো হলো না ওর। সায়াহ্ন আর শেলফের মাঝামাঝি অল্পবিস্তর যেটুক জায়গা ছিল, সেখান দিয়ে উবু হয়ে সায়াহ্নকে পাশ কাটালো সাঁঝ। সুজিকে কোলে করে, বইঘর থেকে রীতিমতো ছুটে বেরিয়ে গেল ও।
•
মাগরিবপর এ সময়টায় তালুকদার নিবাস শূণশান। বিছানায় সুজি চারপা চারদিকে দিয়ে আয়েশে শুয়ে আছে। সাঁঝ ফোন হাতেকরে বিছানায় বসা। আর ওর সামনে মৌ হতবাক হয়ে বসা। শশুড়বাড়ি থেকে আসার পরপরই সাঁঝকে ওদের বাসায় যেতে বলেছিল ও। কিন্তু সাঁঝ যায়নি। আজ তাই মৌ বরকে নিয়ে তালুকদার নিবাসে চলে এসেছে। কথাবার্তা শেষ করে ওর বর আসিফ-মাশফিকের সাথে বেরিয়েছে। বলেছে ঘন্টাখানেক পর এসে নিয়ে যাবে মৌকে। চায়ের কাপ নিয়ে সাঁঝের ঘরে এসে বসেছে মৌ। বান্ধবীকে অন্যমনস্ক দেখে বারবার কারণ জিজ্ঞেস করেছিল ও। সাঁঝ চুপ ছিল, চিন্তায় ছিল। চাইছিল না গোটা বিষয়টাকে মৌয়ের সামনে রাখতে। তবুও একসময় মৌয়ের জোরাজোরিতে সবটা বলে দেয় ও। বেশ অনেকটা সময় বিমূঢ় হয়ে বসে থাকার পর মুখ খুলল মৌ। বলল,
– তারমানে আরজে সায়াহ্ন হামিদ তোকে বিয়ের জন্য বলেছে?
সাঁঝ আস্তেকরে মাথা ওপরনিচ করলো। মৌ কপালে হাত দিলো। এদিকওদিক তাকিয়ে মুখ দিয়ে দম নিলো। আগের মতো বিস্ময় বহাল রেখেই বলল,
– আর তোর ফ্যামিলির তাকে পছন্দ না?
সাঁঝ এবারেও মাথা ওপরনিচ করে সম্মতি বুঝাল। মৌ মাথা দুলালো। যেন বুঝাল, এমনটা কিকরে হয়? ঠিক তখনই টুইং শব্দে নোটিফিকেশন আসে মৌয়ের ফোনে। ‘The Shayanno show’ is live now!– মৌয়ের ফোনের নোটিফিকেশন উইন্ডোর এ লেখাটা চোখে পরে সাঁঝেরও। সাঁঝ নিজের ফোনে টাইপ করলো,
– তুই এর শো শুনিস?
– Big fan of him! একটা শোও মিস দেই না!
সাঁঝ প্রসারিত চাইলো। ভ্রু নাচিয়ে ‘কি?’ বুঝালো মৌ। সাঁঝ দ্রুতহাতে টাইপ করলো,
– তাহলে বাসায় চলে যা। এখানে বসে তোর ওনার শো শোনা হবে না।
– কেন? কি সমস্যা এখানে?
– কোনো সমস্যা নেই! তুই বাসায় যা। আমি সময় করে যাব তোদের বাসায়।
কে শোনে কার কথা! মৌ লাইভ চালু করে দিলো ফোনে। সাঁঝ অস্বস্তিতে পরে যায়। কাপদুটো নিয়ে চলে আসতে যাচ্ছিল ও। মৌ ওর হাত ধরে ওকে বসিয়ে রেখে বলল,
– তুই কোথায় যাচ্ছিস?
– যেখানেই যাই, এর ধারেকাছে তো থাকছি না।
– কেন? এখানে থাকলে কি হবে?
– জানিনা। কিন্তু আমার ভয় হয় উনি আমাকে বুঝে যান।
মৌ আটকে রইল। পরমুহূর্তেই ফিক করে হেসে দিয়ে লাইভের নম্বরে ডায়াল করল ও। ফোন লাউডস্পিকারে দিয়ে, সাঁঝকে ধরে বসিয়ে রেখে বলল,
– তাই নাকি? তাহলে তুই এখানেই বসে থাক! আমিও তো দেখি, আরজে সায়াহ্ন তোকে কতো বোঝে!
সাঁঝ অনবরত বারণ করছিল ওকে। কিন্তু ওর বারণ কানে তুলল না মৌ। রিং বাজতেই সাঁঝের বুক দুরুদুরু শুরু হয়ে যায়। সরে আসার চেষ্টা করছিল ও। সাথে মনেমনে এই দুয়াও করছিল, যাতে এই কল রিসিভ না হয়। কিন্তু ওর দুয়া কবুল হয়না। দুদন্ড পরেই রিসিভ হয় কলটা। ওপাশ থেকে ভেসে আসে সেই পরিচিত, হাসোজ্জল, পুরুষালি কন্ঠ,
– Hello our seventh caller! সায়াহ্ন শো’র অন এয়ারে আপনাকে সুস্বাগতম! May we know, আপনি কে বলছেন? কোথা থেকে বলছেন?
নড়চড় একেবারে বন্ধ করে জমাটবাধার মতো স্থির হয়ে বসে রইল সাঁঝ। নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশের মাঝেও শরীরে অদ্ভুতভাবে শীত অনুভব হচ্ছিল ওর। সায়াহ্ন হামিদকে জবাব দেওয়ার ক্ষমতা ওর নেই। তবুও সাঁঝের মনে হলো, বাক প্রতিবন্ধী না হলেও আজ সায়াহ্নকে কিছু বলার ক্ষমতা ওর থাকতো না। কোনো উত্তর না পেয়ে সায়াহ্ন ওপাশ থেকে আবারো বলল,
– হ্যালো? আপনি কি আমাদের সাথে আছেন? শুনতে পাচ্ছেন আমাকে? হ্যালো?
মৌ কান পেতে ছিল। আর সাঁঝ চুপচাপ ফোনের দিকে চেয়ে ছিল। মুখ দিয়ে আওয়াজ করা তো দূর, নড়চড় অবদি করল না ও।
কলে কোনো সাড়া না পেয়ে তোফায়েল বিরক্ত হলো। কলটা কাটার উদ্দেশ্যে ও বোর্ডে হাত বাড়িয়ে বলল,
– ধুর বাল! হুদাই. . .
ফট করে তোফায়েলের হাত ধরে ফেলল সায়াহ্ন। না বুঝে তোফায়েল ভ্রুকুচকে বন্ধুর দিকে তাকালো। সায়াহ্ন বোর্ডের বোতামগুলোর দিক পলকহীন চেয়ে ওর হাত সরিয়ে দিলো। তারপর কলের ভলিউম বাড়িয়ে, হেডসেটটাকে দুহাতে চেপে ধরলো কানে। দু সেকেন্ডের ব্যবধানেই হাসি ফোটে সায়াহ্ন চেহারায়। একটা বড় দম নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গেল ও। চোখ বন্ধ রেখে, সর্বোচ্চ নিশ্চিন্তভাবে বলল,
– চাওনি, চুড়ির শব্দ, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ অবদি ঠিক ছিলো। এখন কি নিশ্বাসের আওয়াজেও তোমাকে বুঝে যাওয়ার অভ্যাস করে ফেলতে হবে সাঁঝ?
#চলবে…