#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
২০.
মাশফিককে দেখে, হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা নিচে ফেলে সেটাকে পায়ে পিষলো সায়াহ্ন। এমনিতেও ও কখনো ভাবনাচিন্তা করে না। কিন্তু ভুল করেও যদি আজ ও ভেবে দেখতো, নিজের কাজে নিজেই অবাক হতো ও। কেননা সায়াহ্ন হামিদ আজ প্রথমবারের মতো নিজের মা-বোন ছাড়া অন্যকারো সামনে সিগারেট নামিয়েছে। সবে ধরানো সিগারেটটার সাথে, ফোনের ওপাশে কথা বলতে থাকা তোফায়েলকেও তোয়াক্কা করেনি ও। কেটে দিয়েছে কলটা। মাশফিকের দিকে পা বাড়িয়ে, বর্ধিত হাসির সাথে সায়াহ্ন বলল,
– আরে মাশফিক তালুকদার? তুমি এখানে?
ফোন হাতে ধরে পাইচারী করতে থাকা মাশফিক থামে। গলার আওয়াজ শুনেই যাকে চেনা যায়, তাকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার প্রয়োজন ওর ছিল না। তবুও মাশফিক পাশে তাকিয়েছিল। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে, কিছুটা চকিত হয়ে। খাকি ট্রাউজার আর নেভি ব্লু শার্ট পরিহিত সায়াহ্ন হামিদ তখন কলার নাড়াচাড়া দিতে দিতে ওর দিকে এগোচ্ছিল। ওর হাসিটা দেখে মাশফিক শিরদাঁড়া সোজা করে দাড়ায়। এখানে কোনোরকম গ্যান্জাম চাইনা ওর। কিন্তু সুযোগ থাকলে, নিসন্দেহে এক ঘুষিতে ও সায়াহ্ন হামিদের এই হাসিভরা চেহারার নকশা বদলে দিতো। বইঘরের কর্মচারীর মারফতে দুদিন আগে সেখান থেকে সাঁঝের ছুটে বেরিয়ে যাওয়া, আর তার পেছনপেছন সায়াহ্ন হামিদের বেরিয়ে আসা, দুইয়ের খবরই পৌছেছিল মাশফিকের কাছে। আর স্বভাবতই, ঘটনা শোনার সাথেসাথে শরীরে আগুন ধরে গিয়েছিল ওর। কিছুদিন আগে ভালোবাসি বলা ছেলেটার কাছ থেকে ওর বোন কেন পালানোর মতো করে ছুটবে, তার কারণও মাশফিকের উষ্ণ মস্তিষ্ক খুব সহজে ধারণা করে নিয়েছিল। আর সেটা ছিল এটাই, কদিন ধারেকাছে না এসে বইঘরে গিয়ে সায়াহ্ন নির্ঘাত উত্ত্যক্ত করেছে সাঁঝকে!
কি ঘটেছিল, মাশফিক তা সাঁঝকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনই মনে করেনি। উল্টো লজ্জা হচ্ছিল ওর। ওরা থাকা সত্ত্বেও সাঁঝকে আবারো সায়াহ্নর মুখোমুখি হতে হলো। আর সেটাও এতদুর অবদি যে সাঁঝকে বইঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। মাশফিকের মাথায় ব্যস এটাই চলছিল, কিকরে সায়াহ্নকে দমানো যায়। ওর ইচ্ছে ছিল পুনরায় সায়াহ্নর মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু তার আগেই মোশাররফ তালুকদার ছেলেকে অন্য খবর দেন। এক পরিচিত অফিস কলিগের ছেলের তরফ থেকে সাঁঝের জন্য সম্বন্ধ এসেছিল তার কাছে। ছেলে আর তার পরিবারের বিষয়ে কোনো ত্রুটি না পেয়ে স্ত্রীর পরপরই বড় ছেলেকে বিষয়টা সম্পর্কে অবগত করেন তিনি। সাথে এটাও জানান, তালুকদার পরিবারের আপত্তি না থাকলে ছেলে সাঁঝের সাথে দেখা করতে চায়। বাবার কথায় একবাক্যে রাজি হয়ে যায় মাশফিক। সম্মতি জানায় ছেলের তালুকদার নিবাসে আসা নিয়ে। ওর মত শুনেই মোশাররফ তালুকদার সবার সামনে সাঁঝের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। অমত করেনি সাঁঁঝ। নিরবে মাথা হ্যাঁসূচক দুলিয়ে, ধীরপায়ে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল ও।
কথা ছিল সাঁঝকে দেখতে ছেলেপক্ষ তালুকদার নিবাসে আসবে। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রুবি এতে দ্বিমত করে বসে। ওর যুক্তি ছিল, যে সায়াহ্ন সাঁঝকে ভালো না বেসেই ইতিমধ্যে বাড়ি বয়ে এসে ওর বিয়ে ভেঙে দিয়ে গেছে; তালুকদার নিবাসে সাঁঝের আবারো কোনো সম্বন্ধ আসলে সে এবারে আরো বড়সর ঝামেলা করার সাহস রাখে। তারচেয়ে ছেলেকে তালুকদার নিবাসের বাইরে কোথাও সাঁঝের সাথে দেখা করালেই হয়। এ কথাটা রুবি আলাদাকরে ব্যস মাশফিককেই বলেছিল। আর ওর যুক্তিকে নজরান্দাজ করতে পারেনি মাশফিক। আমলে নিয়েছিল সবটাই। সাঁঝের সাথে পাত্রের বাসার বাইরে রেস্টুরেন্টে দেখা করানোর জন্য তালুকদার পরিবারকে ওই রাজি করিয়েছিল। এবং এ কারণেই আজ মাশফিকের এখানে আসা। দোতলার রেস্ট্রুরেন্টটায় রুবি, আহি, আসিফ আর সাঁঝ ছেলেপক্ষের জন্য অপেক্ষা করছে, আর ও নিচে এসে দাড়িয়েছে ছেলেপক্ষকে রিসিভ করার জন্য। আর এর মাঝেই সায়াহ্ন হামিদের আগমন! মাশফিকের হাত মুঠো হয়। সায়াহ্ন হেলেদুলে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। আশপাশ দেখে হাসিমুখে বলল,
– একা এসেছ?
দাঁতে দাঁত চেপে রইল মাশফিক। নিজেকে সংবরণ করা ক্রমশ দায় হয়ে যাচ্ছে ওর! কতোবড় কলিজা হলে এই ছেলে ওরকাছে সাঁঝ এসেছে কিনা সেটা জানতে চায়? ওর এমন মুখচেহারা দেখেই সায়াহ্ন বুঝে গেল, সাঁঝ এসেছে ওরসাথে। এজন্যই এতো ক্ষেপছে সে। আশেপাশেই সাঁঝ আছে ভেবে খুশি হয়ে যায় সায়াহ্ন। মনেমনে ভেবেও নিলো, সাঁঝের সাথে যে করেই হোক দেখা করবে একবার। মাশফিকের সামনেই বলবে, ‘সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি এ কদিনে। আরকোনো অভিযোগ থাকলে বলো।’
ভাবনার মাঝেই মাশফিকের পেছনে হাত উচিয়ে হাই দিতে থাকা রমনীর দিকে চোখ পরে সায়াহ্নর। ও নিজেও হাত উচালো। মাশফিক দেখলো মেয়েটা কাছাকাছি পৌছালে সায়াহ্ন বেশ সানন্দে তার সাথের লোকটার সাথে হাত মেলাল। হাইহ্যালো বলার পর ওকে দেখিয়ে বলল,
– Meet Mashfique Talukder. সাঁঝের বড়ভাই ও।
– ও! আপনি মাশফিক? Nice to meet you!
মাশফিকের চেহারার রাগ কিঞ্চিৎ কমে সেখানে বিস্ময় জায়গা করে নেয়। মেয়েটার চেহারাতেও আনন্দ ছিল। তার কাছে সায়াহ্ন যে ওর নাম আগেই নিয়েছে, তা বোঝাই যায়। সায়াহ্ন এবার নরম হাসি সমেত মেয়েটার পরিচয় দিলো,
– ও মানহা, আমার এক্স। আর উনি ওর ফিয়ন্সে।
মাশফিকের আবারো রাগ হয়। ওর একদফায় ইচ্ছে করছিল সায়াহ্নর গালে একটা বনচটকনা দিয়ে ওকে বলতে, ‘কোনো ভদ্র ছেলে কখনো তার পছন্দের মানুষের বড়ভাইয়ের সাথে এক্সের পরিচয় করিয়ে দেয় না!’
কল আসে মাশফিকের ফোনে। সায়াহ্নর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাক করে, ফোন কানে ধরে সরে গেল ও। ও যতক্ষণ সায়াহ্নকে দেখছিল, সায়াহ্নও ততক্ষণ ওরদিক চেয়ে ছিল। পরে মাশফিক ফোনে মশগুল হলে সায়াহ্নও মানহার সাথে কথায় ব্যস্ত হয়ে যায়। দেশের বাইরে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের প্লান করছিল মানহারা। যেহেতু সায়াহ্ন বাইরে যাওয়ায় বিষয়ে সপাটে না জানিয়েছিল, তাই ওরাই এসেছে বিয়ের আগে একবার সায়াহ্নর সাথে দেখা করে নিতে। তিনতলার কফিশপের জন্য বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢোকার আগে আরো একপলক মাশফিকের দিকে তাকালো সায়াহ্ন। ওর সাথে ততক্ষনে আরো তিনজন এসে দাঁড়িয়েছে। দুজন যুবক, এক রমনী। রমনী যে তার স্বামীর সাথে এসেছে, তা তাদের পোশাকের মিল দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সায়াহ্নর চোখ ঠেকলো ফর্মাল গেটআপে আসা মাঝের হেংলাপাতলা যুবকের দিকে। যে কিনা অকারণেই লাজুক হাসছিল আর তারসাথে মাশফিকের অতিরিক্ত হাসোজ্জল ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল। সে অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখে কেবল ভ্রু কুচকেছিল সায়াহ্ন। মাশফিকের এমন গদগদে ভান আর ছেলেটার ওমন হাসার কারণ কি হতে পারে, তা যদি একবারের জন্যও ওর খেয়ালে আসতো, কখনোই এতোটা হেয়ালীতে মানহাদের সাথে পা বাড়াতো না ও।
•
রেলিংয়ের বেশ কাছাকাছি দাড়িয়ে আছে সাঁঝ। ওর দৃষ্টি বিল্ডিংয়ের নিচে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়েদুটোর দিকে। ছোটছোট দুটো খেলনা হাতে ধরে রাখা চার-পাঁচ বছরের বাচ্চাদুটোকে জমজ বলে মনে হচ্ছিল ওর। ওদের মা-বাবা দুজনের হাত ধরে ছিল। বাচ্চার মা শপিংব্যাগের কিছু একটা নিয়ে কথা বলছিল তার স্বামীর সাথে। কথার মাঝেই লোকটা একদফা স্ত্রীর কপালে আসা চুল তার কানে গুজে দিলো৷ সুন্দর, সাজানো, ছোট্ট পরিবারটা দেখে হাসি ফোটে সাঁঝের চেহারায়। আর মনে দুয়া আসে, গোটা পৃথিবীটা এমন সুন্দর হোক! সবাই এমন আদরে, এমন সোহাগে বাঁচুক!
– তুমি কিন্তু কিছুই বললে না সাঁঝ।
নিচের বাবা-মা দুজনে তাদের বাচ্চাসমেত বিল্ডিংয়ের ভেতরে চলে এসেছিল। ওরা চোখের আড়াল হলে সাঁঝের হুশ হয়, ও ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আছে। পারিবারিক সিদ্ধান্তের ওপরে কিছু বলতে পারেনি বা বলার মতো কিছু পায়নি বলে এ মুহুর্তে সাঁঝ পাত্রের সাথে দাড়ানো ছিল। কথাবার্তা বলার জন্য আলাদা ছাড়া হয়েছিল ওদের। অনেকটা সময় অন্যমনস্ক ভাবে কাটানোর পর পুরুষালি আওয়াজ কর্ণগোচর হওয়ায় কিছুটা চকিত হয়েই সাঁঝ সামনে তাকালো। একদমই সামনে দাড়ানো হালকাপাতলা দৈহিক গঠনের লোকটা তখন ওরদিকেই আগ্রহী। তার পরনের সাদা শার্টটা বিভিন্ন অংশে একরকম ফুলে-ফেঁপে আছে। ওপরের ছাইরঙা কোটটাও চোখে পরার মতো ঢিলেঢালা। জুসের গ্লাস ধরে রাখা হাতের কনুইটা সে এমনভাবে রেলিংয়ে ঠেকিয়েছে, সাঁঝের মনেহলো যেন ওই গ্লাসটার ভার বহন করাও লোকের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। মানুষটা প্রশ্নসূচক চাইলে দ্রুত পলক ফেলে চোখ নামিয়ে নিলো সাঁঝ। হাতে থাকা মোবাইলে টাইপ করলো,
– কি-ই বা বলব? বলতে তো পারি না।
– এতে স্যাড হওয়ার কিছু নেই। মেয়েদের না বলাটা যে একটা গুন, কেউ বলেনি তোমাকে?
সাঁঝ প্রসারিত চাইলো। বুঝলো না এই ‘না বলার গুন’ বলতে সামনেরজন ঠিক কি বুঝালো। নিজের সব কষ্টকে চেপে যাওয়া বা আরেকজনের দোষকে খোলাশা না করা? নাকি অন্যকিছু? যদি প্রথমটা হয়, তবে এই না বলা তো সাঁঝের জন্য অভিশাপ! সেটার আন্দাজ কি সামনেরজনের আছে? নাকি নেই? সাঁঝ অপ্রস্তুত হেসে লিখলো,
– না। বলতে না পারাকে আমার পরিবার কখনো গুণ বোঝায়নি। বুঝিয়েছে এটা আমার শক্তি। না বলেও এই কঠিন পৃথিবীতে একটা গোটা জনম পার করে দেওয়া যায়। বলতে না পেরেও সবার মুখেমুখি হওয়া যায়, সব মোকাবেলা করা যায়। বলতে না পারাটা কখনো কোথাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
স্ক্রিনের লেখাটুকো পড়া শেষ করতেই লোক খপ করে সাঁঝের ফোনটা কেড়ে নিলো। সাঁঝ চমকায়। সামনেরজন এবার বাকা হেসে বলল,
– আমি তাহলে গিয়ে বলি তুমি বিয়েতে রাজি? দেখিতো তুমি ওভাররিয়্যাক্ট না করে আমাকে বাধা দিতে পারো কিনা?
সাঁঝ হতবাক। কিন্তু ওর সে বিস্ময়ভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই ওদের কানে আসে একটা বিকট আওয়াজ। একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ! বিস্ফোরিত চোখে সাঁঝ পাশে তাকিয়ে দেখল গোটা রেস্টুরেন্টটায় কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পরেছে। লোকজনের হাসি-আড্ডা এক নিমিষে চিৎকার আর আর্তনাদে পরিণত হয়ে গেছে। কেউ টেবিল উল্টে ফেলে দৌড়াচ্ছে, কেউ বেরোনোর পথ খুঁজে হুড়োহুড়ি করছে। ভেতরের দিকে ছোট ছোট বিস্ফোরণ হচ্ছে। কাচের জানালা ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে পরছে। সাঁঝের টের পেতে অসুবিধা হয়না, রান্নাঘরের গ্যাস লাইনে আগুন লেগেছে। আর তা এদিকের টেবিলের কাপড় আর দেয়ালের সাজসজ্জায় অবদি ধরে গেছে।
জলভরা চোখে, অবিশ্বাসে জ্বলতে থাকা আগুনের দিক চেয়ে রইল সাঁঝ। খেয়ালও করেনি, ওর পাশেরজন ‘আরে!’ বলে গায়েব হয়ে গেছে বেশ আগেই। ধোয়ায় কাশি আর শ্বাসকষ্ট শুরু হতেই কোত্থেকে মাশফিক ছুটে এসে হাত ধরলো সাঁঝের। বোনকে নিয়ে বাইরে ছুট লাগিয়ে বলল,
– সাঁঝ চল এখান থেকে!
অনিচ্ছায় ভাইয়ের সাথে দৌড় লাগিয়েছিল সাঁঝ। ওর দৃষ্টি ছিল ওই আগুনের দিকে, ছোটাছুটি করতে থাকা মানুষগুলোর দিকে। কয়েকপা যেতেই সাঁঝ টেনে ধরল ভাইকে। দাড়িয়ে গিয়ে, অস্থিরচিত্ত্বে বুঝালো,
– বৌমা? আহি? ছোটকা. . .
– ছোটকাকু আনছে ওদের! তুই চল!
সাঁঝকে সিড়ি অবদি আনে মাশফিক। তখনই আরেকপাশ থেকে আর্তনাদের আওয়াজ আসে ওদের। দু ভাইবোনই দাড়িয়ে যায়। আগুন গোটা ফ্লোরেই ছড়িয়েছে। ছোটবড় বিস্ফোরণের ফলে ওপরনিচ তলাতেও আগুন কমবেশি পৌছেছে, এমনটাও ধারণা করছিল ওরা। শপিংমলের কাচের দেয়ালের ওপারে আটক ছিল কয়েকজন। সেখানে বাচ্চা ছিল কিছু। সাঁঝ দেখল, কিছুক্ষণ আগে ওর দেখা সেই জমজ বাচ্চাদুটোও ছিল ওখানটায়। মাশফিকের পাশ দিয়ে একজন সেদিকেই এগোচ্ছিল। দৌড়ের ওপর সে মাশফিককে অনুরোধ করলো তারসাথে যেতে। একা সবাইকে আনা তারজন্য কঠিন। সাঁঝ ভাইয়ের হাত থেকে তৎক্ষনাৎ হাত ছাড়িয়ে নেয়। ইশারায় বুঝায় ওখানে যাবার জন্য। বন্দিদের বাঁচানোর জন্য। বাকিটুক ও একাই যেতে পারবে। আশপাশ তাকিয়ে আগে হিসেব করলো মাশফিক। সিড়ি বেয়ে নামলেই এদিকটা নিরাপদ। সাঁঝ আসলেও বেরিয়ে যেতে পারবে ওখান থেকে। গালে হাত রেখে, মাথা ওপরনিচ করে বোনকে আশ্বস্ত করলো ও। সাঁঝের চোখ থেকে জল গরায়। কিচ্ছুটি না বলে, ব্যস অসহায়ের মতো ভাইকে আগুনের মাঝে চলে যেতে দেখলো ও।
সাঁঝকে জোরপূর্বক ভবনের বাইরে বের করে আনা হয়েছিল। বাকিসবের মতো পাগলপারা হয়ে পরিবারের খুঁজছিল ওউ। তফাৎ শুধু এটুকোই, বাকিদের কান্না শোনা যাচ্ছিল। আর সাঁঝের কান্না ছিল শব্দহীন। জায়গাটায় তখনো ফায়ার সার্ভিস পৌছায় নি। ভবন থেকে একের পর এক কোনো না কোনঅংশে দগ্ধ মানুষজনকে বের করা হচ্ছিল। এরইমাঝে দুজন লোক ধরাধরি করে রুবিকে বের করে আনে। অজ্ঞান চাচীকে দেখতেই হুমড়ে পরলো সাঁঝ। গালে মৃদ্যু চড় মারতে মারতে অস্ফুট আওয়াজ করছিল ও। চেষ্টা করছিল রুবির জ্ঞান ফেরানোর। অসহায়ের মতো দেখছিল আশপাশের সবাইকে। বুঝাতে চাইছিল চাচীর সাথে থাকা ছোট চাচাতো বোনের কথা। কিন্তু সবাই যারযার মতো আহাজারি আর ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। সাঁঝ নিচে বসা অবস্থায় একজনের পা ধরে ফেলল। কাদতে কাদতে তার হাতে থাকা পানির বোতলটা চাইল ও। লোক সেটা দিলে, চাচীর চেহারায় দুবার পানি ছেটালো সাঁঝ। রুবির জ্ঞান ফেরে। দুবার কাশি দিয়ে, টালমাটাল শরীর নিয়ে উঠে বসতেই ওর হুশ হলো ও কোথায় আছে এবং সেখানে কি ঘটেছে। আশপাশ তাকিয়ে আহিকে না দেখতে পাওয়ায় রুবি তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
– আহি কোথায়? আমার মেয়ে কোথায়? আহি কোথায় সাঁঝ? আহি কোথায়?
রুবি সাঁঝের শরীর ঝাকাচ্ছিলো। অনবরত কাদতে থাকা সাঁঝের চোখজোড়ায় অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। না ও বলতে পারতো, নাইবা ও বলতে পারলেও বলতো, ও জানে না আহি কোথায়। ইশারায় সাঁঝ ব্যস থামতে বলল চাচীকে। বুঝানোর চেষ্টা করলো, ‘শান্ত হও বৌমা। ছোটকাকু আনছে আহিকে।’
ঠিক সেসময়েই আসিফ তালুকদার কাশতে কাশতে বেরিয়ে আসে। রুবির কাছে এসে, ধপ করে মাটিতে বসে গেল সে। বোঝাই যায়, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তারও। সাঁঝ সরে বসলো। চাচার শরীরের ক্ষতগুলো বাদ দিয়ে ওর দুরন্ত চোখ ব্যস আহিকে খুজছিল। কিন্তু আহি ছিল না তার সাথে। রুবি অস্থিরচিত্ত্বে আসিফের গলায়, গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
– আসিফ? আসিফ, আহি কোথায়? আহি কোথায় আসিফ? আমার মেয়ে কোথায়?
– প্র্যামে নেই।
কথা শেষ করতে পারে না আসিফ। কপাল চাপড়ে, ফুপিয়ে কাদতে শুরু করে দেয় ও। স্বামীর কথা শুনে এক সেকেন্ডের জন্য যেন শূণ্য হয়ে যায় রুবি৷ পরমুহূর্তেই উন্মাদের মতো জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে উঠে ছুট লাগাতে যায়। আসিফ দুহাতে ওকে আঁকড়ে ধরলো। সবটুকো শক্তিতে রুবিকে জাপটে ধরলো বুকের মাঝে। রুবিও থামলো না। গায়ের সমগ্র শক্তিতে স্বামীকে কিল-ঘুষি লাগাতে থাকে ও। চেষ্টা করতে থাকে ছাড় পাওয়ার জন্য। ওখানকার বাকিসবের আহাজারিতে এবার যোগ হয় রুবির চিৎকারও। ও হাউমাউ করে কাদতে কাদতে বলতে লাগলো,
– ছাড়ো আমাকে! আহি ভেতরে আছে! আসিফ আমার মেয়েটার কষ্ট হচ্ছে! হয় আমাকে আমার মেয়ের কাছে যেতে দাও, নয়তো আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দাও! আসিফ প্লিজ ছাড়ো! যেতে দাও আমাকে! প্লিজ আসিফ! প্লিজ আমার মেয়েটাকে বাঁচাও! প্লিজ!
স্তব্ধ সাঁঝ জলভরা চোখে একবার দেখে চাচা-চাচীকে; আরেকবার অবিশ্বাস্য চোখে দেখে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনকে। শূণ্য মস্তিষ্কে হাটুর ওপর ভর করে বসে রয় ও। বিমূঢ়তা ধোয়ার সাথে মিলেমিশে ওর দৃষ্টিকে ক্রমশ আবছা করে দিতে থাকে। ওর বুঝে আসে না, নিয়তি কি করে এতোটা নিষ্ঠুর হয়? ওই দাবানল কি করে এমন হিংস্র হয়? কিকরে এতোগুলো প্রাণকে শেষ করে দিতে চাইতে পারে সেটা? এতোগুলো হাসিখুশিতে ভরপুর জীবনকে কিকরে গিলে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে?
– সাঁঝ কোথায়?
একই প্রশ্ন, দুজনের কাছ থেকে, একইসাথে এসেছিল। রুবি তখনো কাদছিলই। কিন্তু আসিফ থেমে, চমকে পাশে তাকায়। প্রশ্নকারী দুজনের একজন ছিল মাশফিক তালুকদার, আরেকজন সায়াহ্ন হামিদ। একইসময় একই প্রশ্ন শুনে মাশফিক-সায়াহ্নও একে অপরের দিকে তাকালো।
সায়াহ্নর শার্টের বা কাধের অনেকটুকো আগুনে পোড়া। চেহারা আর হাতেপায়ে কালি, কাটাছেড়া। একই অবস্থা মাশফিকেরও। বোঝাই যাচ্ছে, উভয়ই হয় নিজের প্রাণ নয় অন্যকারো প্রাণ বাঁচিয়ে উপস্থিত হয়েছে এখানটায়। আসিফ প্রসারিত চোখে ওদের দেখে আশপাশ দেখল। অতঃপর অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
– সাঁঝ? ও তো এখানেই ছিল! এ্ এখানেই বসে ছিল! কোথায় গেল? কোথায়. . .
সাঁঝকে খুজতে গিয়ে দুজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীকে বেরোতে দেখল আসিফ। রুবি ওর থেমে যাওয়া লক্ষ্য করে সামনে তাকাতেই দেখে, তাদের একজনের কোলে তোয়ালে মোড়ানো আহি। পাগলের মতো হামাগুড়ি দিয়ে এগোলো রুবি। শরীরটাকে টেনে দাড় করিয়ে, রীতিমতো ঝাপিয়ে পরলো মেয়ের ওপর। আহির গালেমুখে কালি। আঘাত না থাকলেও, ভয়ে গলা ফাটিয়ে কাদছিল ও। রুবি কাদতে কাদতে অসংখ্য চুমু খেলো মেয়েকে। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী বলল,
– হয়তো কিচেনসাইডে ছিল। এক আপু ভেন্টিলেটর দিয়ে পাস করিয়েছে। এর পরপরই ওপাশে সিলিন্ডার ব্লাস্ট আর কোলাপস্. . .
টুপ করে মাশফিকের ডানচোখ বেয়ে জল গরায়. ভেতর থেকে যে আহিকে পাস করিয়েছে সেটা সাঁঝ, এমনটা না ও কল্পনা করতে পারলো; নাইবা বিশ্বাস করে উঠতে পারলো সাঁঝের সাথে কিছু হয়েছে। ব্যস দিশেহারার মতো এদিকওদিক বোনকে খুজতে লাগলো মাশফিক। আর সায়াহ্ন দেখল রুবির ওমন বাধভাঙা আদরে আহির তোয়ালে থেকে কিছু একটা নিচে পরেছে। এক মুহুর্তের জন্য সায়াহ্ন যেন প্রাণহীন মূর্তি হয়ে যায়। তিনতলায় কয়েকজনকে বের করতে গিয়ে আগুনের মুখে পরেছিল ও। কিন্তু সে দাবানলকে ওর মৃত্যুখাদ বলে মনে হয়নি। অথচ আগুন থেকে দুরে দাড়িয়ে, ওই মুহুর্তে সায়াহ্নর নিজেকে মৃত্যুকুপে অনুভব হচ্ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীর মুখে ও কি শুনেছিল, তা ও জানে না। চারপাশে কি ঘটছিল, ও তাও জানে না। ও ব্যস অনুভব করেছিল। অনুভব করছিল, ও শ্বাস নিতে পারছে না। এমনভাবে, যেন ও মারা গেছে। অনুভব করছিল, ওর চারপাশ বদ্ধ, অক্সিজেনহীন। এমনভাবে, যেন ওকে দাফন করে কবরে রেখে যাওয়া হয়েছে। গোটা জনমে, এই প্রথমবার নিজেকে লাশ বলে মনে হলো সায়াহ্নর। আর ওকে জীবন্ত লাশ করে দেওয়ার দায় ছিল আহির তোয়ালে থেকে নিচে পরা চুড়ির টুকরোটার। কেননা সে টুকরো, সায়াহ্নর পছন্দের চুড়ির। সে টুকরো, সেই তিন নম্বর চুড়ির. . .
#চলবে…