#সোহাগি_সাঁঝমল্লার
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
অন্তিম পর্ব.
একপা ভাজ করে, দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে সায়াহ্ন। আর্ম স্লিংয়ের সাথে ওর বা হাতটা বুকের সামনে রাখা। আর ওর স্থির দৃষ্টি, কেবিনের দরজার দিকে। তৃপ্ত হাসির সাথে স্বচ্ছ চারকোনা অংশটা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে বেডে আধশোয়া হয়ে বসা রমণীকে দেখছে ও। রোগীর পোশাক পরিহিত সাঁঝ তখন আস্তেধীরে মাথা নাড়িয়ে, মৃদ্যু হাসিসমেত পরিবারের কথাবার্তায় সাড়া দিচ্ছে। অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে সবটা আলাদাই ছিল। যখন কিনা ও জানত না, এ যাত্রায় ও সাঁঝকে বাচাতে পারবে কিনা। হাতের ব্যথা ছাপিয়ে বুক ভার হয় সায়াহ্নর। কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে ও যখন জ্বলতে থাকা রেস্টুরেন্টের ভেতরে ছুটেছিল, আপাতদৃষ্টিতে পাগলামোই ছিল সেটা। কিন্তু এতে ওর কি দায়? আহির তোয়ালের সাথে আসা চুড়ির টুকরো দেখে হুঁশে ছিল না ওউ। নাইবা আগুনের লেলিহান শিখা পেরিয়ে দোতলায় পৌঁছানোর পর ও হুশে ছিল। কালো ধোঁয়ার মাঝে কাশতে কাশতে, ছুটতে ছুটতে সাঁঝের হাতটা দেখেছিল সায়াহ্ন। এক দেয়ালের আড়ালে অল্পখানি জ্বলে যাওয়া আর ভাঙা চুড়িতে সাথে রক্তাক্ত হয়ে পরে ছিল হাতটা। আরেকটা ব্লাস্টের শব্দ শুনতেই উন্মাদের মতো ছোটে সায়াহ্ন। এগিয়ে যাওয়ার পর ও টের পায়, সাঁঝ অজ্ঞান। ওর ওপর একটা টেম্পারড কাচ আর ধাতব শেলফ পরে ছিল। স্টিল টিউবের শেলফটার জন্য আগুন তখনো স্পর্শ করেনি সাঁঝকে। তবে কাচেই হয়তো কপালের কেটেছিল ওর। রক্ত বেরোচ্ছিল সাঁঝের কপাল থেকে। ছুটে গিয়ে শেলফ সরিয়ে অজ্ঞান সাঁঝকে কোলে তুলল সায়াহ্ন। এরপর ও কিভাবে বাইরে বেরিয়েছে, তা ও নিজেও জানেনা। ব্যস জানে, যেদিক দিয়ে ঢুকেছিল, সেদিক দিয়ে ফিরতে পারেনি। সাঁঝকে সরানোর পরপরই একাধারে অনেকগুলো বিস্ফোরণ আর ধ্বস ছিলো সেদিকের দেয়ালে।
– মৃত্যুর দিকে ছোটার আগে একবারও ভাবলে না।
সায়াহ্ন মুচকি হাসল। দেয়ালে ঠেকানো পা নামিয়ে মাশফিকের দিক ফিরল ও। বোনের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল এ ছেলেটাও। সায়াহ্ন বলল,
– আমাকে তুমি চেনেই নি মাশফিক তালুকদার। না ভেবে আর যাই করি, মরে যাওয়াকে চুজ করার মতো ছেলে আমি নই।
– কিন্তু করেছ তো সেটাই। জেনে বুঝে আগুনের ভেতর ছুটেছিলে। যা খুশি হয়ে যেতে পারত তোমার সাথে।
– ভেতরে গেলে মরে যেতাম, তখন তোমার পয়েন্ট অফ ভিউ হয়তো এমন ছিল। কিন্তু আমারটা এমন ছিল না। আমারটা এর উল্টোটা ছিল। চুড়ির টুকরো দেখার ওই মুহুর্তে রেস্টুরেন্টের বাইরের মুক্ত বাতাসই আমার কাছে অক্সিজেনশূণ্য লাগছিল। বিষাক্ত লাগছিল। আমি বরং আগুনের ভেতরে না ছুটলেই মরে যেতাম।
অতি স্বাচ্ছন্দে জবাব দিলো সায়াহ্ন। মাশফিক ভাষাহীন হয়ে চেয়ে রইল ওর দিকে। ওই ভয়াবহ আগুনে তরতাজা বারোটি প্রাণ শেষ হয়ে গেলেও সাঁঝের আঘাত অনেকবেশি ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল শেলফ পরে গোড়ালিতে একটা ফ্র্যাকচার, কাচে কপালে একটু গভীর আর শরীরে কিছু ছোটখাটো জখম, কাচের চুড়িতে হাতে কাটাছেড়া আর আহিকে ভেন্টিলেটর দিয়ে বের করানোর সময় হাতের কবজির ওপরদিকে কিছুটা জ্বলে যাওয়া। সে তুলনায় বেশি পুড়েছিল সায়াহ্ন৷ ওর কাধের শার্ট ইতিমধ্যে পোড়া ছিল। সাঁঝকে আনতে যাবার সময়ও আরো বেশকিছু জায়গায় আগুনে জ্বলে গিয়েছিল। হাতের আঘাতটা সায়াহ্ন কখন পেয়েছে, তা ও নিজেও জানেনা। অথচ তবুও এই ছেলেটা এতোগুলো ঘন্টা হলো এখান থেকে সরেনি। ডাক্তার দাড়ানোর ওপরেই ব্যান্ডেজ করিয়ে দিয়ে গেছে ওকে। হামিদ পরিবার এসেছিল জায়গাটায়। কিন্তু সায়াহ্ন রাতে থাকতে দেয়নি তাদের। সবটা ভেবে মাশফিকের গলা ধরে আসে। ভারী আওয়াজেও বলল,
– ভেতরে যাও সায়াহ্ন। দেখা করে আসো সাঁঝের সাথে।
– ও হয়তো কম্ফোর্টেবল হবে না।
একদন্ড আটকে থেকে, মাথা নিচু করে হেসে ফেলল মাশফিক। একটু সময় নিয়ে হাসি কমিয়ে, পুনরায় মাথা তুলে বলল,
– সাঁঝকে রিলিজ করে দেবে আজই। আঙ্কেল-আন্টিকে নিয়ে তাহলে একেবারে তালুকদার নিবাস চলে এসো।
– গার্ডিয়ান ডেকে সাঁঝকে বাচানোর পুরস্কার দিতে চাইছ নাকি?
– উহু। আমাদের চেয়েও বেশি আগলে রাখবে, সাঁঝকে এমন একটা মানুষ উপহার দিতে চাইছি।
সায়াহ্নই এবার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে হেসে ফেলল। মাশফিকের থেকে এই প্রথমবার দৃষ্টিনত করলো ও। অবাক হয়ে ওকে চোখ নামতে দেখল মাশফিক। যে ছেলেটাকে এতদিন ও কেবল অপছন্দই করে গেছে, সে ছেলে আজ ওর বোনকে পাওয়ার সুখে কাদতে চলেছিল। ওর সামনে প্রথমবারের মতো দৃষ্টি নামিয়ে, মুলত সেই সুখের অশ্রুকেই আড়াল করলো সে।
•
ঘোমটার নিচ থেকেও চোরা চোখে সামনেরজনকে দেখছে সাঁঝ। ওর সামনে বসা সায়াহ্ন তখন সুক্ষ্ম চোখে ওর হাতের মেহেদীতে নিজের নাম খুঁজতে ব্যস্ত। তার পরণে সাদা পান্জাবি, পায়জামা। ওপরের কালচে খয়েরী কটিটা খুলে বিছানায় রেখেছে সে। মানব ওর হাত থেকে চোখ তুলছেই না। যারফলে তাকে দেখতে আপাতত লজ্জা লাগার কথা না সাঁঝের। তবুও আড়স্টতায় পুরোদমে জড়ানো ছিল ওর চোখ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সাঁঝের দু হাতের দুই তালুর মেহেদী দেখার পর পরাজিত সৈন্যের মতো হাল ছাড়ল সায়াহ্ন। হাত নামিয়ে, হতাশা নিয়ে বলল,
– এখানে তো নেই আমার নাম!
নিশব্দে হেসে ফেলল সাঁঝ। টের পেয়ে সায়াহ্ন ওর মুখের দিকে তাকাল। “সায়াহ্নর সাঁঝ” লেখা সীমানাবিশিষ্ট টকটকে লাল বউ ওড়নার নিচে এক নির্মল, স্নিগ্ধ হাসিমুখ। সায়াহ্নর চেহারার সব হতাশা গায়েব হয়ে ভর করে রাজ্যের মুগ্ধতা। বাঙাল ভাজে পরা লাল বেনারসিতে ওর সামনে বসা রমনী, নিসন্দেহে ওর দেখা সবচেয়ে সুন্দরী রমনী। একটা দম নিলো সায়াহ্ন। বলল,
– কি চাইছ সাঁঝ? এই মেহেদীতে নিজের নাম খুঁজতে খু্ঁজতেই আমি আজকের রাতটা কাবার করে দেই?
সাঁঝ হাটুতে থুঁতনি ঠেকাল। যেন কিছু শোনেই নি ও। মাথা দুলিয়ে সায়াহ্ন আবারো মেহেদীতে নিজের নাম খোঁজায় মনোযোগী হলো। বিরবিরিয়ে বলল,
– এই মেহেদীতে নাম খোঁজার নিয়ম বানিয়েছে কে? কাল সকালে আমার প্রথম কাজ হবে তার ওই মেহেদী আর্টিস্টের এগেইনিস্টে কেইস করা! ফাউল!
সাঁঝ এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। সায়াহ্ন আবারো একপলক ওকে দেখে নিজের মতো ব্যস্ত হয়ে গেল। বেশ অনেকটা সময় খোজাখুজির পর সা্ঝের বা হাতের অনামিকা আঙুলের পাশে নিজের নামকে খুঁজে পেল ও। আংটির কিছুটা ওপরেই বাকানো হরফে Shayanno লেখা। সায়াহ্নর চোখ খুশিতে চকচক করে উঠতে দেখে সাঁঝও শিরদাঁড়া সোজা করে বসলো। কিন্তু নামটার ওপর সায়াহ্ন ঠোঁট ছোঁয়াতেই চোখ বন্ধ করে নিলো ও। কানে আসে,
– নাম তো পেয়ে গেলাম। এবার ঘোমটা তোলার অনুমতি আছে?
সাঁঝ কেবল চোখ মেলল। তবে সায়াহ্নর দিকে তাকাল না। হ্যাঁসূচক জবাবে মাথা ওপরনিচ করলো ও। সায়াহ্ন ওর মাথা থেকে বউ ওড়না নামায়। চুড়ি, দুল, নথ আর গলায় আটকানো হার। সাঁঝের সাজগোজে এর বাইরে কোনো বাড়তি গয়না ছিল না। বেনারসি শাড়ীটাও ভাঙা ভাজে পরানো হয়েছিল ওকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ সাঁঝকে দেখার পর বিছানায় রাখা একটা গয়নার বাক্স হাতে নিলো সায়াহ্ন। সামনে তুলে ধরলে সাঁঝও ওরদিক তাকায়। সায়াহ্ন বলল,
– কখনো তোমার হাত খালি থাকলেও আমি যেন তোমাকে শুনতে পারি, এটা তার জন্য৷ দেখোতো পছন্দ হয় কিনা।
সাঁঝ বাক্সটা হাতে নিলো। ভেতরে নুপুর ছিল একজোড়া। সরু, তবে শৌখিন ডিজাইনের। সায়াহ্নকে দেখল, সে মাথা নাড়িয়ে আবারো শুধাচ্ছে, পছন্দ হয়েছে কিনা। মাথা নেড়ে হ্যাঁসূচক জবাব দেয় সাঁঝ। সায়াহ্ন খুশিমনে ওর হাত থেকে নিয়ে নিলো বক্সটা। একটু পিছিয়ে বসে নুপুরজোড়া বের করলো। অতঃপর হাত বাড়ালো সাঁঝের পায়ের দিকে। কিছুটা চমকে উঠে সাঁঝ পা জড়িয়ে ধরে গুটিয়ে গেল। থেমে গিয়ে ওর মুখের দিক চেয়ে সায়াহ্ন বলল,
– কি হলো?
– আমাকে দিন। আমি পরছি।
– আমি পরালে কি সমস্যা?
– কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু. . .
সাঁঝের ইশারা শেষ হয় না। তার আগেই ওর পা ধরলো সায়াহ্ন। নিজের উরুর ওপর তুলে, তাতে পরিয়ে দিলো নুপুরটা। নির্বাক হয়ে ওর কর্মকান্ড দেখল সাঁঝ৷ সায়াহ্ন হাসিমুখে বলল,
– অনেক খুঁজে এই ডিজাইনটা পছন্দ করেছিলাম। সুন্দর মানিয়েছে তোমার পায়ে।
সাঁঝের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা শ্বাস বেরোয়। বলার আর কিছুই ছিল না ওর। কেননা ও বুঝে গেছে, ওর আড়স্টতা বরাবরের মতো আজও সামনেরজনের কাছে গুরুত্ব পাবে না। হুট করেই ফুলের ঝালড়ের একটা গোলাপ টান মেরে ছিড়ে ফেলল সায়াহ্ন। গোলাপটা সাঁঝকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– I love you.
সায়াহ্ন সাঁঝের দিক চেয়ে ছিল। তবে সাঁঝের চোখ যায় ওর পেছনে। মাঝখানের ফুল ছিড়ে ফেলায় বিছানার প্রান্ত অবদি আটকানো ঝালড়ের একপাশের ফুল এবার বিছানায় ঝুলছিল। এই লোকটা কি একটু ঠিকঠাকভাবে ভালোবাসি বলতে পারে না? পুনরায় সায়াহ্নর দিক তাকালে সে বলল,
– সেদিন কিছু বলোনি, মেনেছি। আজকে আর দেরি কোরো না প্লিজ। গোলাপটা নিয়ে আমাকে একটু গ্রিন সিগনাল দাও। একটু আদর করি তোমাকে। তোমাকে চুমু খাব বলে সারাদিনে একটা সিগারেটও খাইনি।
কি স্বীকারোক্তি ছিল! সততার শতভাগ দিয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল সায়াহ্ন হামিদ! কিন্তু ওর সে স্বীকারোক্তিতে সাঁঝ খুশি হলো না। সেকেন্ড পাঁচেক শক্তপোক্ত চোখে চেয়ে থেকে, অকস্মাৎ পাশ থেকে বালিশ তুলে সায়াহ্নকে বারি লাগাল ও। কোনোমতে সেটাকে ধরে ফেলে সায়াহ্ন। সাঁঝ ক্ষিপ্ত ভঙিতে বুঝাল,
– তারমানে আপনি সিগারেট ছাড়েননি!
– কি বলেছিলাম? সকালবিকাল তোমার চুমু পেলে সিগারেট ছেড়ে দেবো। এতদিন চুমু দিয়েছ তুমি, যে আমি সিগারেট ছাড়ব?
ফ্যালফ্যাল করে সায়াহ্নর মুখের দিকে চেয়ে রইল সাঁঝ। এমন সোজা, স্পষ্ট জবাবের বিপরীতে কি বলবে, ভেবে পেলো না। সায়াহ্ন ওর হাত থেকে বালিশটা ছাড়ালো। তারপর সেটাকে অতি যত্নে বিছানায় রাখল। কিঞ্চিৎ কুচকে যাওয়া বালিশটায় হাত বুলিয়ে, সেটাকে সমতল করলো। ভ্রু কুঁচকে ওর কাজকর্ম দেখল সাঁঝ। সায়াহ্ন বালিশ ঠিক করা শেষে আবারো গোলাপটা ওর সামনে ধরে বলল,
– হ্যাঁ? তো তুমি কি ফুলটা নেবে? নাকি আমি ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরাব?
রীতিমতো ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে গোলাপটা নিয়ে নিলো সাঁঝ। চোখ দিয়ে শাসানোর সাথে সবে আঙুল উচিয়ে শাসাতে যাবে, তার আগেই ও থামতে বাধ্য হয়। সায়াহ্ন হামিদের ঠোঁটের গাঢ় স্পর্শ অতি সহসাই ওর ঠোঁট দখলে নিয়েছিল। একচুড় নড়ার ক্ষমতা ছিল না সাঁঝের। চোখ খিঁচে বন্ধ করে, নিজের বাড়তি হৃৎস্পন্দন শুনছিল ও। সায়াহ্ন ওর দুগাল ধরে ছিল। সময় নিয়ে সরে এসে সাঁঝের বন্ধ চোখজোড়া দেখল ও। গাঢ় আওয়াজে বলল,
– ভালোবাসো সাঁঝ?
সাঁঝ চোখ মেলেনি। তবে মাথা ওপরনিচ করে হ্যাঁসূচক জবাব দিয়েছিল। সায়াহ্নর বুকজুড়ে যেন শান্তি বয়ে যায় সে জবাবে। স্বস্তিতে সাঁঝের কপালে কপাল ঠেকাল ও। নিজেও চোখ বন্ধ রেখে বলল,
– আজ তবে আমার ভালোবাসাকেও গ্রহণ করো সাঁঝ। মৃত্যুর আগোবদি তোমাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসায়, সর্বোচ্চ সোহাগে জড়িয়ে রাখব। কথা দিচ্ছি।
সাঁঝের শ্বাস ভারী হয়। আর সেখানে যোগ হয় এর বেপরোয়া পুরুষের প্রশ্বাস-নিশ্বাসবায়ু। ক্ষণে ক্ষণে ওদের দুজনার মাঝের দুরুত্ব ঘুচে যেতে থাকে। সবদিক মানিয়ে আসা সায়াহ্ন হামিদের দিগ্বিদিক ভোলানো সোহাগ সাঁঝকে অষ্টদিক থেকে ঘিরে ফেলে। আরকোনো দিক ছিল না সাঁঝের। সায়াহ্ন হামিদ, ওর জন্য আরকোনো দিক অবশিষ্ট রাখেনি।
পরেরদিন দুপুরের আগেই হামিদ পরিবারের এপার্টমেন্টটা তালুকদার পরিবারের কল্লোলে ভরে ওঠে। সোফায় বসে বড়রা কথা বলছিল, সায়াহ্ন বন্ধুদের সাথে আরেকপাশের চেয়ার টুলে বসে ছিল আর মেয়েরা ঘরে ছিল। রুবিকে একদফায় বেরিয়ে বেসিনের কাছে যেতে দেখল সায়াহ্ন। হাত ধুয়ে হাসিমুখে আবারো ঘরে যাচ্ছিল ও। সায়াহ্ন উঠে দাড়ালো। রুবির দিকে এগিয়ে ডাক লাগাল,
– বৌমা?
– হুম? হ্যাঁ সায়াহ্ন? কিছু বলবে?
রুবি থামে। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে সায়াহ্নর দিকে প্রশ্নসূচক চাইল ও। সায়াহ্ন ওর সামনে দাড়িয়ে একেবারে স্বাভাবিক ভঙিতে বলল,
– কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল আপনাকে। যদিও অনেক আগেই প্রশ্নটা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অধিকারবোধের অভাবে বলা হয়নি।
– হ্ হ্যাঁ. . .বলোনা। কি প্রশ্ন?
– সাঁঝের হসপিটালে সেন্সলেস অবস্থায় আপনি ওর পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাচ্ছিলেন কেন?
বজ্রাহতের মতো আটকে রইল রুবি। শেষ কবে ওকে এমন সপাটে প্রশ্নর মুখোমুখি হতে হয়েছিল, মনে পরেনা ওর। নাইবা অনুমানে ছিল হসপিটালের ওই মুহুর্তটা কারো নজরে আসবে। সায়াহ্ন রুবির জবাবের জন্য একটু অপেক্ষা করে পুনরায় বলল,
– সাঁঝ তো টের পায়নি আপনার ক্ষমা চাওয়া। এখন আমি ওর বর যেহেতু জেনেছি, আপনি বরং আমাকেই বলুন। ওভাবে কেন ক্ষমা চাচ্ছিলেন ওর কাছে? ওরসাথে আপনি কি এমন করেছেন যে আপনার ওর পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজনবোধ হলো?
– কিছু না করেও সাঁঝের সাথে আমি অনেককিছু করেছি সায়াহ্ন। ওরসাথে গোটা দুনিয়া ফেয়ার থাকলেও এক আমি ফেয়ার ছিলাম না। ব্যস ওই অপরাধবোধ থেকেই. . .
– রুবি? আসার সময় আহির জন্য পানি আনিস!
ঘরের ভেতর থেকে ডাক লাগিয়েছিলেন মিসেস মোশাররফ। দরজা দিয়ে বরাবর সামনে তাকালো রুবি। সাঁঝ আহিকে কোলে করে হেলেদুলে হাটছিল আর ওকে নিয়ে আহ্লাদ করছিল। রুবির দৃষ্টি অনুসরণ করে সায়াহ্নও একপলক ভেতরে তাকাল। এরপর আবারো রুবির দিক ফিরে বলল,
– সাঁঝের প্রতি আপনার নট-ফেয়ার বিহেভিয়ার তালুকদার পরিবার কিভাবে সয়েছে, আমি জানি না বৌমা। কিন্তু আমি সায়াহ্ন হামিদ এদিকে একদমই সহনশীল নই। আশা করব আপনি আমার সহ্যশক্তি পরখ করার চেষ্টা করবেন না।
মুচকি হেসে মাথা দুলালো রুবি। সায়াহ্নও হাসিমুখে একটা পানিভরা গ্লাস হাতে ধরিয়ে দিলো ওর। রুবি সেটা নিয়ে ঘরে চলে যায়। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে সায়াহ্ন সাঁঝের নিস্পাপ হাসিটা দেখছিল। ওর মাথায় আজও এটাই আসলো, এই মেয়েটাকেও কেউ কিকরে ভালো না বাসে?
ড্রয়িংরুমেরই একপাশে দিবা ওর বান্ধবীদুটোর সাথে দাড়িয়ে ছিল। অভ্র একটা কাটা আপেলের হাফপ্লেট হাতেকরে ওদের সাথে দাঁড়াল। ওদের ইশারা করলো নেবার জন্য। দিবা বাদে বাকিদুজন হাতে নেয় তা। অভ্র আপেল চিবাতে চিবাতে সায়াহ্নর দিক তাকিয়ে ছিল। দিবার এক বান্ধবী বলল,
– ক্রিকেটার না হয়েও কিকরে ছক্কা মারতে হয়, কেউ তোর ভাইয়ের কাছে শিখুক দিবা! সবদিক সামলে ঠিক বিয়ে করে নিলো সাঁঝ ভাবীকে! জোশ ভাই! জোশ!
– তুমি কি বলো অভ্র? ভাইয়াকে ট্রেনিং সেন্টার খুলতে বলব?
অভ্রর কাশি উঠে যায়। তাড়াহুড়ো করে প্লেটটা দিবাকে ধরিয়ে দিয়ে সরে গেল ও। দিবারা তিনজনে শব্দ করে হেসে ফেলল ওর অবস্থা দেখে। অভ্র পানির গোটা গ্লাস শেষ করে তখন মাশফিকের পাশে গিয়ে বসেছে। গলা ঝারার চেষ্টা করছিল ও। মনেমনে বলতে লাগল, ‘এই বোন-ভাই দুটোই এক! কেউ ওকে শান্তিতে দমও নিতে দেয় না।’
গলা ঝারার শব্দে মাশফিক বিরক্ত হয়ে ছোটভাইয়ের দিক তাকালো। ধপ করে অভ্রকে চাটি লাগিয়ে দিলো ও। মাথা ধরে বিস্ময়ে ভাইয়ের দিকে তাকাল অভ্র। মাশফিক ইশারায় বলল সরে গিয়ে কাশতে। এখানেও শান্তি মেলে না অভ্রর। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে, গাল ফুলিয়ে সরে গেল ও। মাশফিক পুনরায় মুলদরজার দিকে তাকায়। সেখানে প্রধান অতিথির মতো সুজি আয়েশে শুয়ে আছে। কুর্তা, জিন্স পরিহিত এক রমণী বেশ অনেকক্ষণ হলো ফোন কানে ধরে কথা বলছে, আর মাঝেমধ্যে সুজির মাথায় তিন আঙুলের ডগায় আদর করছে।
তোফায়লের সাথে বসে জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মাশফিকের এই হাবভাবই দেখছিল সায়াহ্ন। আরেকটা গ্লাস হাতে নিয়ে মাশফিকের দিকে এগিয়ে আসলো ও। তবে ওর আগমন মাশফিক টের পায়নি। সায়াহ্ন নিজেও দরজার দিক তাকিয়ে, গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল,
– নিশাত চৌধুরী। রেডিও মস্তির এডিটর।
হতচকিত হয়ে পাশে তাকালো মাশফিক। সায়াহ্নর একেবারে স্বাভাবিক ভঙিমা, সামনে জুসের গ্লাস। হতভম্ব মাশফিক বুঝল না কি বলবে, কি করবে। সায়াহ্নর পাশ থেকে তোফায়েল খ্যাঁক করে হেসে বলল,
– ভালো মেয়ে বস! বেশ ভালো মেয়ে! আপাতত কোনো কমিটমেন্টে নাই। বাপ একটু বড়লোক, তবে সমস্যা নেই। মেয়ে স্ট্রং, সেল্ফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওম্যান হওয়া প্রেফার করে।
মাশফিক শূণ্য মস্তিষ্কে চেয়ে রইল কেবল। সায়াহ্ন হেসে ওর হাতে জুসের গাল ধরিয়ে দিলো। তারপর ওর কাধে হাত রেখে বলল,
– চিল ব্রো! তুমি আমার লাইনে কালো বিড়াল হয়েছিলে। আমি নাহয় তোমার লাইন সাফ করে দেই। আর আমি সায়াহ্ন যখন দায়িত্ব নিচ্ছি, you need not to worry at all. চৌধুরী ম্যাডাম তোমারই।
মুখ কিঞ্চিৎ হা করে সায়াহ্নর দিকে চেয়ে ছিল মাশফিক। কিন্তু সায়াহ্নর ভাবান্তর নেই। মাশফিক হাতের গ্লাসটা মুখ অবদি তুলল। সায়াহ্ন য়া বুঝিয়েছে, তা মাথায় বসাতে চায় না ও। তবে ও যা বলেছে, সেটা হজম করার জন্য এই জুসটুকো গেলার প্রয়োজনবোধ হচ্ছে ওর। এই স্ট্রং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওম্যান ওর জীবনে আসার আগেই ওর গলা শুকিয়ে গেছে। আপাতত মাশফিকের গলা ভেজানো দরকার।
•
– কি খুঁজছ?
চোখমুখ মলিন করে পেছন ফিরল সাঁঝ। ডানকানের চুল সরিয়ে সায়াহ্নকে আগে কানের দুলটা দেখাল ও। এরপর বা কান দেখিয়ে ইশারায় বুঝাল, সে কানের দুলটা নেই। কিচেনে মিসেস সরোয়ারের সামনে দিবা ওকে এই দুলের কথা জিজ্ঞেস করেছে ওকে। মেয়েটা যেমন অদ্ভুত হেসে ওকে বলছিল, ‘ভাবী তোমার বা কানের দুল কোথায়?’ সাঁঝ লজ্জায়ই পরে গিয়েছিল। সায়াহ্ন শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে ওর ইশারা দেখল। সাঁঝ আবারো ড্রেসিংটেবিলে কানেরদুলের খোঁজ শুরু করে দিয়েছিল। ওর বুঝানো শেষ হতেই শার্টের বোতাম লাগানোর পরিবর্তে পুনরায় খুলতে শুরু করে দিলো সায়াহ্ন। এগিয়ে এসে সাঁঝের পেছনে দাঁড়িয়ে বলল,
– কিছু দেখানোর ছিল তোমাকে।
সাঁঝ থেমে পেছন ফেরে। মাথা নাড়িয়ে শুধায়, ‘কি?’ সায়াহ্ন শার্ট সরিয়ে বুকের বা পাশটা দেখাল ওকে। এমনিতেও সাঁঝের চেহারার রঙ ডুবে ছিল। কিন্তু সায়াহ্নর বুকে থাকা লম্বা আঁচড়ের দাগটা দেখে আগে ওর চেহারার ফ্যাকাশে রঙ আরো ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মলিন চেহারায় নেমে আসে একরাশ অপরাধবোধ। নিজের দিক আঙুল তুলে সাঁঝ বোঝাল,
– আমি করেছি এটা?
– আরে না! তুমিতো এটা করেছ!
সায়াহ্নর স্বতঃস্ফূর্ত জবাব! বলতে বলতে পেছনদিক ঘুরে কাধের শার্টও নামিয়ে ফেলেছে ও। বিস্ফোরিত চোখে ওর উন্মক্ত কাধের দাগটা দেখল সাঁঝ। চমকে উঠে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সায়াহ্নর বুকের দাগটা সরু ছিল, হালকা আঁচড়ের ছিল। কিন্তু একইসাইজের এই কাধের দাগটা বেশ মোটা আর গভীর আঁচড়ের। নখের আঁচড় এমন তীব্র হয়, সাঁঝের কল্পনাতেও ছিল না। নাইবা কল্পনায় ছিল, ও এভাবে. . .লজ্জায় হোক, গ্লানিতে হোক, মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল সাঁঝের। কাধ ঝাঁকিয়ে শার্ট ঠিক করে, সায়াহ্ন পুনরায় ওরদিক ফিরল। ঠোঁট থেকে হাত নামিয়ে এবার কান ধরলো সাঁঝ। নতমস্তকে বুঝাল, ‘সরি’। নিচেরঠোঁট কামড়ে ধরে, মুচকি হাসিসমেত বেশ কিছুক্ষণ চেয়েচেয়ে ওর অপরাধী মুখটা দেখল সায়াহ্ন। তারপর শার্টের সর্বওপরের বোতামটা লাগিয়ে এগোলো বেডসাইড ড্রয়ারের দিকে। সেখান থেকে একটা দুল বের করে সেটা সাঁঝের সামনে তুলে ধরে বলল,
– সরি বলতে হবেনা। তোমার নখের আঁচড় তো মানাই যায়। কিন্তু এটার স্ক্র্যাচ হজম হচ্ছিল না। তাই খুলে নিয়েছিলাম।
দৃষ্টি নামিয়ে ছিল সাঁঝ। এতোটাই যে ওর থুতনি ওর গলা ছুঁচ্ছিল। সায়াহ্নর কথাতেও চোখ তুলল না ও। ব্যস দুলটা হাতে নিয়ে বুঝাল,
– পরেরবার থেকে খুলে রাখব।
দুল পরার জন্য আয়নার দিকে ফিরতে যাচ্ছিল সাঁঝ। কিন্তু সায়াহ্ন হাত ধরে থামিয়ে দিলো ওকে। নিজেরদিকেই দাড় করিয়ে রেখে ওর হাত থেকে দুলটা নিলো ও। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ওরদিকে চোখ তুলে তাকাল সাঁঝ। সায়াহ্ন নিশব্দে হেসে ওর কানে দুলটা পরিয়ে দিলো। তারপর অতি সন্তর্পণে সে কানেই ঠোঁট ছোঁয়াল। নুইয়ে রইল সাঁঝ। সায়াহ্ন ওর কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
– প্রয়োজন নেই। পরেরবার থেকে আমিই খুলে নেব। আমার মতো করে।
– হয়েছে বউকে চুমু খাওয়া? মা ডাকছে ভাবীকে।
দিবার গলার আওয়াজ শুনতেই সাঁঝ ঝড়ের বেগে আলমারীর আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু এটা ও ভালোকরেই জানে, এই ছুটে পালানোর তরিকা কাজে দেয়নি। কেননা যা দেখার দিবা দেখেই নিয়েছে। আর ওর চুড়িভরা হাত তখনো সায়াহ্নর হাতের মুঠোতে। হতাশ হয়ে দরজায় তাকিয়ে আছে সে। আলমারীর সাথে পিঠ ঠেকিয়ে সাঁঝ ইশারায় অনুনয় করল হাত ছাড়ার জন্য। কিন্তু সায়াহ্ন ওরদিক তাকালোও না। রুমের বাইরে দাড়ানো কলেজসড্রেস পরিহিত দিবাকে বলল,
– বিয়ে করেছি তিনমাস। তোর এই নক না করে এঘরে আসার অভ্যাসটা বদলাচ্ছিস না কেন এখনো?
– বিয়ে করেছিস তিনমাস! তুই দরজা লাগিয়ে বউয়ের সাথে রোমান্স করার অভ্যাস করে নিতে পারছিস না কেন?
সায়াহ্ন এগোতে গিয়েও থেমে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে চেয়ে রইল বোনের দিকে। আর সাঁঝ আলমারীর সাথে পিঠ-মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। জিভ কামড়ে, মাথা নাড়াতে নাড়াতে ব্যস এটাই ভাবতে লাগল, যা ঘটে গেল, এর পর এখন ননদের সামনে ও যাবে কিকরে? আলমারীর আড়ালে ছিল বলে সাঁঝের চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। ভাইয়ের হাতে আবদ্ধ কেবল ওর চুড়িভরা হাতটাই দেখল দিবা। হাসি দমিয়ে বলল,
– ভাবী? তাহলে মাকে গিয়ে বললাম, ভাইয়া তোমাকে ছাড়ছে না। তোমার দেরি হবে।
আলমারীর আড়াল থেকে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে আসলো সাঁঝ। দিবা বলাশেষেই চলে গিয়েছিল। আর সাঁঝ হাটা দিয়েছিল ঘরের বাইরের দিকে। কিন্তু লাভ হয়না। ওর হাত তখনো ছাড় পায়নি। অসহায়ের মতো সায়াহ্নর দিকে তাকাল ও। সায়াহ্ন আরেকহাত কোমড়ে রেখে অন্যদিক তাকিয়ে একটা ছোট্ট দম ফেলল। আবারো সাঁঝের দিক ফিরে বলল,
– ও মজা করছিল সাঁঝ! বাসায় আমরা সবাই ফ্র্যাংকলি কথাবার্তা বলি। কিন্তু তাইবলে এতোটাও না। ও মাকে বলবে না এটা। রিল্যাক্স!
. . .
– কোনোভাবে অভ্রর সাথে এখনই বিয়েটা দিয়ে দিবাকে এ বাসা থেকে বিদেয় করা যায়না? বিয়ের পর থেকেই এমন জ্বালাচ্ছে।
সাঁঝ নড়চড় করে ছাড় চাইছিল। কিন্তু সায়াহ্নর কথায় আটকালো ও। ঘাড় বাকিয়ে প্রশ্নসূচক চাইলো। সায়াহ্ন কোমড় ছেড়ে, সে হাতেই নিজের কপাল ডললো। ওউ বুঝে গেছে, এটা ও বাড়াবাড়ি বলে ফেলেছে ও। মনটা খারাপ করে সাঁঝের হাত ছেড়ে দিলো সায়াহ্ন। ছাড় পেতেই সে দ্রুতপদে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওকে অমন ছুটে চলে যেতে দেখে হতাশায় মাথা দুলাল সায়াহ্ন। ছোট্ট একটা দম ফেলে রেডি হলো অফিস যাওয়ার উদ্দেশ্যে। হামিদ পরিবার একসাথে সকালের নাস্তা শেষ করে। বরাবরের মতো আজও সরোয়ার হামিদ মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে সাঁঝ ডাইনিং টেবিলের জগ-গ্লাস ঠিক করছিল। মিসেস সরোয়ার কিচেনে কোনো এক দরকারে গিয়েছেন। টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিক এগোল সায়াহ্ন। ডাক লাগাল,
– মা?
– ব্যস্ত আমি। সাঁঝ? দেখতো সায়াহ্ন কি বলে?
গলা উচিয়ে জবাব দিয়েছিলেন মিসেস সরোয়ার। মায়ের জবাব শুনে হাসি ফোঁটে সায়াহ্নর ঠোঁটের কোণে। অবুঝের মতো এগিয়ে আসলো সাঁঝ। ইশারায় সায়াহ্নকে জিজ্ঞেস করলো,
– কি?
– তেমন কিছুনা। ওই আমি বেরোনোর আগে মায়ের কপালে চুমু দেই। তো মা বলছে আজ সে ব্যস্ত। আজ তোমাকে দিয়ে কাজ চালাতে।
– কিন্তু মা এটা কখন. . .
অবুঝ সাঁঝের ইশারা শেষ হয়না। কনুইয়ের ওপরে ধরে, ওকে টেনে দরজা-রান্নাঘরের মাঝের দেয়ালে ওর পিঠ ঠেকাল সায়াহ্ন। মাত্র কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে কি ঘটে বুঝে ওঠেনা সাঁঝ। মসৃন দেয়াল খামচে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছিল ও। কিন্তু তার আগেই ঠোঁটে সায়াহ্নর ঠোঁটের স্পর্শ ওকে আটকে দেয়। সাঁঝের বিমূঢ়তা লজ্জায় নেমে আসার সাথে সরে যায় সায়াহ্ন। নতমস্তকে বড়বড় দম নিতে থাকা রমণীর লালচে চেহারাটা উঁকি দিয়ে দেখল ও। তারপর আস্তেকরে ‘বাই’ বলে, মূলদরজা খুলে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে।
সকালের শো শেষ করে বিকেল নাগাদ অফিস থেকে বাসায় ফিরলো সায়াহ্ন। কলিংবেল দেওয়ার দুদণ্ডের ভেতরেই খুলে যায় দরজা। সুজিকে কোলে করে সাঁঝ দরজা থেকে সরে দাড়ালো। সায়াহ্ন একটা হাসির সাথে মোবাইল আর মানিব্যাগ ওরহাতে ধরিয়ে দিলো। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,
– দেখো অবস্থা! নতুন বিয়ে হলো আমাদের! ভিসা পাসপোর্টের ঝামেলায় তোমাকে নিয়ে এখনো হানিমুনে যেতে পারলাম না। কিন্তু অফিসিয়াল কাজের নাম করে চালাক এসিপি ঠিকি বউকে নিয়ে দুম করে চিটাগং চলে গেল। দিবাও নাকি বায়না করছিল?
ঠোঁট চেপে হাসিটা আটকে, মাথা ওপরনিচ করলো সাঁঝ। সায়াহ্নর পেছনপেছন ঘরে এসেছে ওউ। আপাতত সুজিকে ছেড়ে কাবার্ড থেকে সায়াহ্নর জামাকাপড় বের করছিল। সায়াহ্নর হাতঘড়ি খোলা শেষ হলে ওর সামনে সেগুলো বাড়িয়ে ধরলো। জামার সাথে সাঁঝের হাতও ধরে ফেলে সায়াহ্ন। মৃদ্যু জোর খাটিয়ে, কিছুটা কাছে টেনে দুষ্টুমিভরা আওয়াজে বলল,
– অবশ্য হানিমুনের জন্য আমাদের ফাঁকা বাসাটাও খারাপ না। কি বলো?
ধাক্কা খেয়ে সরে এসেছিল সায়াহ্ন। সাঁঝের কড়া ইশারা পেয়ে হেলেদুলে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় ও। গোসল শেষে বেরোতেই দেখে সাঁঝ বই হাতে ব্যালকনিতে এগোচ্ছে। ওর নুপুর আর চুড়ির আওয়াজ এক মোহনীয় ছন্দ তুলেছে যেন। পেছনপেছন রওনা হয়েছে সুজিও। বেডসাইড টেবিলে ধোঁয়া ওঠা চায়ের মগটা দেখে মুচকি হাসলো সায়াহ্ন। ডানহাতে ভেজা চুলে তোয়ালে চালাতে চালাতে, বাহাতে মগটা নিয়ে ওউ চলে আসলো ব্যালকনিতে। সাঁঝ চেয়ারে বই রেখে, নিচে বসে সুজির সাথে খুনশুটি করছিল। ওর চুড়ির রিনরিন শব্দে মেতে ছিল আশপাশ। সায়াহ্ন গিয়ে অন্য চেয়ারটায় বসল। হাটুতে কনুই ঠেকিয়ে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে চুপচাপ সাঁঝের হাসিখুশি মুখটা দেখছিল ও। সাঁঝ থামে এক পর্যায়ে। চোখ তুলে সায়াহ্নকে দেখে ভ্রু নাচালো,
– কি?
– কিছুনা৷
শেষ হওয়া চায়ের মগ রেলিংয়ে রেখে সায়াহ্ন সুজিকে ধরলো। সাঁঝ বই হাতে দাঁড়িয়ে যায়। বইয়ের বুকমার্ক রাখা জায়গায় আঙুল গুজে সেটাকে বুকে ঠেকিয়ে, আর নিজের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে সায়াহ্নকে দেখতে থাকে ও। দুরন্ত এই মানুষটা দেখতে গিয়ে হুট করেই সাঁঝের চোখ ভরে ওঠে। এতোএতো সুখের মাঝেও বুক অজানা ব্যথায় ভার হয়। মনে পরে যায় ওর জীবনে এই মানুষটার আসা, ওকে আগলে যাওয়া, সব পরিস্থিতিতে ওকে সায়াহ্নর ভালো বেসে যাওয়া, মনে পরে যায় রেস্ট্রুরেন্টের সেই বিভীষিকাময় দিনটা। ওর মতো একটা কথা বলতে না পারা মেয়ের জন্য এই লোকটা সেদিন মৃত্যু অবদি গিয়েছিল। অথচ সেকথা ওকে কোনোদিন বলেনি সে। সাঁঝের চোখ বেয়ে টুপ করে জল গরায়। আর সেটা চোখে পরে সায়াহ্নর। সুজিকে ছেড়ে তৎক্ষনাৎ এগিয়ে আসলো ও। সাঁঝ চেষ্টা করেও পারল না ওর আসার আগে নিজেকে সামলাতে। সায়াহ্ন ওর দুগাল ধরে ব্যস্তভাবে বলল,
– সাঁঝ? কি হয়েছে? কাঁদছ কেন তুমি? কি হয়েছে?
সাঁঝ ভেজা চোখে সামনেরজনের অস্থিরতা দেখল। বিয়ের পর থেকে সায়াহ্ন বরাবরই ওকে বলে আসছে, যা ঘটছিল, তা নিয়ে যেন ও আর না ভাবে। তাই আজ ও আর নিজের ভাবনা বললো না সায়াহ্নকে। নাক টেনে, চেহারায় জোর করে হাসি ফুটিয়ে বুঝালো,
– বইটা স্যাড এন্ডিং।
সাঁঝের গালে, চুলে হাত বুলাল সায়াহ্ন। তারপর ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,
– জানি কি ভাবছিলে। মিথ্যে বলার দরকার নেই।
সাঁঝ হেসে ফেলল। না বলার পরও, আজ আবারো সায়াহ্ন হামিদ ওকে বুঝে গিয়েছিল। বরাবরের মতো। সায়াহ্ন পাশের পেটুনিয়া গাছটায় হাত বাড়িয়ে কমলারঙের ফুল ছিঁড়ল একটা। চমৎকার হাসির সাথে বলল,
– I love you.
ফুল ছিড়তে গিয়ে রেলিংয়ের ওপর থাকা মগটা ফেলে দেওয়ার পরও এমন গা ছাড়া ভঙিমায় ‘ভালোবাসি’ বলেছিল সায়াহ্ন। সাঁঝ আজ আর অবাক হলো না। নাইবা নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘যাকে I love you বললে জবাবে I love you too শুনতে পারবে না, এ মানুষটা কেন তার কাছে এতবার ভালোবাসি জাহির করে?’ কেননা এর জবাব ও এতোদিনে পেয়ে গেছে। ফুলটা হাতে নিয়ে পাশ ফিরলো সাঁঝ। সামনে ডুবতে থাকা লালচে সূর্যের দিকে তাকালো। পূর্বমুখী হওয়ায় তালুকদার নিবাসের ওর ব্যালকনি থেকে ব্যস সকাল দেখা যেত, সূর্যাস্ত না। কিন্তু সায়াহ্নর ঘর পশ্চিমমুখী। সূ্র্যোদয় না থাকলেও, এ ঘর ভরা রঙিন গোধূলি থাকে। ডুবতে থাকা সূর্যের আভায় ডোবা অপরূপ সন্ধ্যা থাকে। আর সে সন্ধ্যার নাম হয় সাঁঝ-সায়াহ্নর সন্ধ্যা। সায়াহ্ন সাঁঝের পিঠে বুক ঠেকিয়ে, ওর হাতের ওপর হাত রেখে দাড়ালো। সাঁঝ হয়তো পেছনে তাকাতে চাইছিল। কিন্তু সুযোগ না থাকায় ও ব্যস পাশের চেয়ারে চোখ বুজে শুয়ে থাকা সুজিকেই দেখল। সায়াহ্ন ওর চুলে ঠোঁট ছুইয়ে, একেবারে নরম আওয়াজে বলল,
– তোমার সব বলতে জানা চোখে জল মানায় না সাঁঝ। তোমাকে ব্যস আদরে মানায়, সোহাগে মানায়। আমি তোমাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি, ভবিষ্যতেও বলব। আর তুমিও মনে রেখো, গোটা পৃথিবীর সামনে তুমি নিরবতা হলেও, আমার জন্য তুমি নিরবতা নও। তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় সুর! আমার আদুরে গোধূলির সুর। আমার সোহাগি সাঁঝমল্লার।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, চোখ বন্ধ করে সায়াহ্নর গলার দিকে মাথা ঠেকালো সাঁঝ। সায়াহ্ন ওর হাতসহ ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলো। সূর্য ডোবে, বেলা শেষ হয়। একের পর এক একসাথে জীবনের সবগুলো গোধূলির সুর বাধতে থাকে সাঁঝ-সায়াহ্ন। প্রেমে, ভালোবাসায়, সোহাগে. . .
~ সমাপ্ত ~