স্বয়ম্বরা (১০ম পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি
১০
কথাটা শুনে যতটা চমকে উঠবে ভেবেছিলাম, ততটা চমকালো না। বরং শান্তভাবে বলল
— আপনি লিভিং রুমে গিয়ে বসুন। আমি আসছি।
কিছুটা অবাক লাগল। আমার গেসটা কি ঠিক হয়নি? নাকি ওভারস্মার্ট? যেটাই হোক, মনে হচ্ছে, এবার পর্দা উঠবে। মেনে নিলাম। কানটা খালি খালি লাগছে। দ্রুত বেডরুমের অ্যাটাচ বাথে গিয়ে দুলটা কানে দিয়ে নিলাম। আসবার আগে ঝট করে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিলাম। মেয়েলি স্বভাব, ইউ নো। যাই হোক, ভালই লাগছে।
এগিয়ে গেলাম লিভিং রুমের দিকে। সোফায় বসে টিভি ছাড়লাম। হ্যান্ডসামের খাওয়া শেষ হয়েছে। ধীরে সুস্থে উঠে রান্নাঘরে গেল। পানির আওয়াজ পাচ্ছি। এক্ষুনি আসবে।
বেশ রোমাঞ্চ ফিল করছি। খেলাটা ধরে ফেলেছি। শুধু তাই না, খেলা আমি জিততে চলেছি। এই প্রথমবারের মত মনে হচ্ছে, দ্যা গেম ইজ ইন মাই ফেভার। আসিফের কিংবা ইশতিয়াকের প্ল্যানটা এবার স্পস্ট বুঝতে পারছি। প্ল্যান ছিল প্রথমে আমাকে অপহরণ করা হবে। এরপরে দেখানো হবে, ইশতিয়াক অন্য একজন কেউ। আর আসল ইশতিয়াক আসিফ নাম নিয়ে একজন কিডন্যাপার সেজে সামনে আসবে। জানাবে, দিন ছয়েকের ভেতর আমি বিয়েতে রাজী না হলে গর্দান যাবে। আর এই কদিন, পাহারা দিতে সারাক্ষণ আমার সাথে আসিফের বেশে থাকবে ইশতিয়াক।
এই সময়ে চলবে বিভিন্নভাবে আমাকে ইম্প্রেস করার চেস্টা। আমার কি পছন্দ, কি অপছন্দ সবই রিসার্চ করা আছে। পছন্দের খাবার দিয়ে শুরু। এরপরে ইশতিয়াকের ক্যারিয়ারের গল্প। উল্টোটাও করল। আসিফকে সেমি নেগেটিভ হিসেবে প্রেজেন্ট করল। যদি দেখে আমি আসিফকে বেশ পছন্দ করতে শুরু করেছি, তখন আসিফ নিজে থেকে টোপটা দেবে। জানাবে, সে আমাকে পছন্দ করে। প্ল্যান ছিল, এই অবস্থায় আমি ওকে অনুরোধ করব, ডাবল ক্রস করার জন্য। তখন, বেশ কিছু অ্যাক্টিং করে, আসিফ রাজী হবে আমাকে ছেড়ে দিতে। ওর এই মহানুভবতা আর এই কদিনের ইম্প্রেসিভ বিহেভে আমি বলে বসব, তুমি এসব পথ থেকে ফিরে আস। আমি তোমার পাশে থাকব। ‘শান্ত কেন মাস্তান’ টাইপ ফিল্মের কাহিনীতে নায়িকারা সচরাচর যা করে।
প্ল্যানটা প্রায় কাজ করেই ফেলেছিল। অফারটা আমি আজ কিংবা কাল হয়তো দিতামই। অপেক্ষা করছিলাম, ওর মনের অবস্থা বোঝার। ভুলটা করে ফেলল গল্পটা বলে। অতি ড্রামাটিক গল্প না বললে হয়তো বিশ্বাস করতাম। কিংবা শুধু যদি একটু অপেক্ষা করত, আমাকে ফাঁদে প্রায় ফেলেই দিয়েছিল। যাইহোক, খেল খতম হতে যাচ্ছে আর কিছুক্ষণের ভেতরে। খুব ভুল যদি না করে থাকি, আসিফ অর ইশতিয়াক, যা ই নাম হোক এই ব্যাটার, এখানে এসে বসার কিছুক্ষণ পরেই এই নাটকের যবনিকার পতন ঘটবে। দ্যা গেম ইজ ওভার।
আসিফ এসে বসল। আমার দিকে সরাসরি তাকাল। হি ইজ লুকিং কনফিডেন্ট। কনফিডেন্স আমারও তুঙ্গে। মাইন্ড গেম শুরু হতে যাচ্ছে। কনফিডেন্সই এখানে মহার্ঘ অস্ত্র। শুরু আসিফই করল
— বলুন, কি জানতে চান।
— আসল ইশতিয়াক কে? আপনি? না ফোনে যার সাথে কথা বলছি, সে?
আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বোঝার চেস্টা করল, প্ল্যান আমি কতটা আঁচ করে ফেলেছি। চোখে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বুঝিয়ে দিলাম, ‘তোমার খেল খতম, ডিয়ার। এখন তোমার কাজ শুধু কনফেস করা।’ বোধহয় কথাটা বুঝল। বড় একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল
— আমিই ইশতিয়াক চৌধুরী।
বিংগো। আই ডিড ইট। খেল খতম। এখন কাজ শুধু গল্পটা জানা। শুরু করলাম। জানতে চাইলাম
— আর ফোনে যে ছিল? ফ্রেন্ড?
আবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আমিও নিস্পলক দৃষ্টি দিলাম। কামঅন ম্যান, কনফেস ইট। ইউ হ্যাভ নো অপশান। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে ফেলল। আবার চোখ তুলল, তবে এবার চোখে বাঁকা একটা হাসি। বলল
— ওটা একটু পরে বলব। আই মিন, ব্যাপারটা একটু কমপ্লিকেটেড।
নিজের অজান্তেই ভ্রু কুঁচকে গেল। এখনও চালাকি? আমাকে গাধা পেয়েছে নাকি? নাকি ফ্রেন্ডকে সেফ করার চেষ্টা? লাভ নেই চান্দু, তোমার চালাকী আর কাজ করবে না। বাঁকা একটা হাসি দিয়ে বললাম
— ডোন্ট ওরি, ইয়োর ফ্রেন্ড ইজ সেফ। প্রতিশোধ যা নেয়ার তা আমি আপনার এগেইন্সটেই নেব।
কথাগুলো শুনে ভয় পেল বলে মনে হল না। আমার চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল
— ভয় আমি পাচ্ছি না। উত্তরটা আপনি বিশ্বাস করবেন না, তাই বলছি না।
— মানে?
— মানে, ওটাও আমি। কথাগুলো আমার, বাট ভয়েস সিন্থেসাইজারের মাধ্যমে চেঞ্জ করা।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। ওর চোখ বলছে, মিথ্যে বলছে না। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? কোন টেকনোলজি? হতে পারে। ব্যাপারটা তাই জানতে চাইলাম
— কিভাবে পসিবল। আপনি তো এখানেই, আমার সামনেই ছিলেন। তাহলে ফোনের ভয়েস আপনার কিভাবে হবে?
— টেকনোলজি।
ব্যাপারটাকে মেনে নিলাম। হতে পারে। ভয়েস সিন্থেসাইজারের কাজ? বাট…। কনফিউজিং। আচ্ছা, এমন হতে পারে আগে থেকে কিছু অ্যানসার রেকর্ড করে রেখেছিল। কাউকে বলে দিয়েছিল, ওটা চালিয়ে দিতে। কাজটা রিস্কি ছিল। যেসব উত্তর রেকর্ড করে রেখেছিল, লাক ফেভার করে যায়। আমার প্রশ্নগুলো ওর উত্তরের সাথে ম্যাচ না করলে হয়তো ফেঁসে যেত।
কিছুটা রিসার্চও কাজে দিয়েছিল হয়তো। স্পেশালি এই কদিন আমার সাথে থেকে হয়তো বুঝে গেছে আমি কি কি জিজ্ঞেস করতে পারি। ব্যাপারটা নিয়ে জানতে ইচ্ছে করছে, বাট এই মুহুর্তে একটাই কথা সবার আগে জানতে চাইছি, কেন এই কাজটা করল। প্রশ্নটা করতে যাব এমন সময় ইশতিয়াক বলত শুরু করল
— দ্যাট ইজ মাই ইনভেনশান।
ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। অবাক হয়ে আসিফের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম
— কোনটা?
— থট অ্যাক্টিভেটেড সিস্টেম।
এই নতুন জাতের সফটওয়ার টফটওয়ার নিয়ে আলাপ এড়াতে চাইলাম। আসলে এসব জানবার মুডে খুব একটা আমি এখন নেই। মূল গল্প আমাকে টানছে। বললাম
— এমন ইডিওটিক একটা কাজ কেন করলেন?
— থট অ্যাক্টিভেটেড সিস্টেম ইডিওটিক কাজ?
মাথা দুদিকে নেড়ে না সুচক ইঙ্গিত করলাম। স্মিত হেসে বললাম,
— না। ওটা নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত আবিস্কার।
কথাটা বলে মনে হল, শুনেই ফেলি ব্যাপারটা। আসল গল্প তো পালিয়ে যাচ্ছে না। সামনে ফোনটা রাখা ছিল, সেটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম
— কিভাবে কাজ করে আপনার এই সিস্টেম?
স্মিত হাসল। বলল
— এটা না। থট অ্যাক্টিভেটেড সিস্টেমটা ইন্সটল করা আছে আমার ল্যাপটপে। আমার শরীরে একটা একটা মাইক্রোচিপ ঢোকানো আছে। সেটার সাথে কানেক্টেড আছে আমার ল্যাপটপ। আমার থট ট্রান্সমিট হয়ে যাচ্ছে আমার ল্যাপটপে। এরপরে আমার কাজ শুধু চাওয়া। আমি যে নম্বরে ফোন করতে চাই, আমার ল্যাপটপ সেই নম্বরে ফোন করতে পারে। আমি যা বলতে চাই, যার ভয়েসে বলতে চাই, সব আমার ল্যাপটপ আমার হয়ে করে দেয়।
ইন্টেরেস্টিং তো? ব্যাপারটা বোধহয় বুঝতে পেরেছি। বললাম
— আপনি এখান থেকে ইচ্ছে করেছিলেন, আপনার এই ফোনে ফোন করার। আপনার ল্যাপটপ ফোনটা করে, রাইট?
মাথা ওপর নীচে করে ব্যাপারটা মেনে নিল। এরপরে বলল
— অ্যান্ড এরপরে আমার কথার উত্তরে আপনি যা বলতে চান, তা আপনার ব্রেন থেকে চলে যায় আপনার ল্যাপটপে। ল্যাপটপে সেটাই আমাকে মোবাইলে ফোনে জানায়।
— ইয়েস। আপনার কথার উত্তরে যেসব উত্তর শুনতে পেয়েছেন, সেসব আমার ব্রেন থেকেই এসেছে। আমার ব্রেন থেকে চলে গেছে ল্যাপটপে আর সেখান থেকে ভয়েস সিন্থেসাইজার হয়ে আপনার কানে।
দারুণ তো। এই ব্যাটা তো আসলেই জিনিয়াস। ভালোই লাগছে ছেলেটাকে, বাট, আমার সাথে যা করল, এরপরে, নট পসিবল। এই নোংরা পথে কেন এগোলো? এভাবে কি কোন মেয়ের মন পাওয়া যায়? এমন সময় ইশতিয়াক হঠাৎ বলে উঠল
— না যায় না।
অবাক হয়ে জানতে চাইলাম
— কি যায় না?
আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠোঁটে বাঁকা একটা হাসি এনে উত্তর দিল।
— কোন মেয়ের মন পাওয়া যায় না।
এবার ভয়ংকর রকমের অবাক হলাম। আমার মুখ দেখে কি আমার সব মনের কথা বুঝতে পারছে? এমন সময় ব্যাপারটা মাথায় আসল। ওহ নো। এই লোক তো আমার মন পড়তে পারছে।
মাই গড, তার মানে আমার শরীরেও মাইক্রোচিপ ঢোকানো হয়েছে। তাই তো বলি, এই লোক কিভাবে বুঝে যাচ্ছিল আমি কি ভাবছি। আর আমি ভেবেছিলাম সব কোইনসিডেন্স। আর নয়তো রুমে সি সি ক্যামেরা লাগানো আছে। আর আমার মুখ দেখে বুঝে যাচ্ছে আমার চিন্তাগুলো।
— ইয়েস। কোন রুমে কোন সি সি ক্যামেরা নেই। বুঝতেই পারছেন, সেটার কোন দরকারই ছিল না।
আমি তখন হতবাকের চরমে পৌঁছে গেছি। তার মানে, আমি যে পালাবার মতলব করছিলাম, হি নিউ ইট। আমি যে মনে মনে ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছি, প্ল্যান কষছি ওকে ডাবল ক্রস করার অফার দেব, সেটাও ও জানত। আর সেজন্যই ও গল্পটা ফেঁদেছিল। বুঝিয়েছিল আসলে ইশতিয়াক আর আসিফ রাইভাল। ইঙ্গিতে দিয়েছিল, সুযোগ পেলে ও ইশতিয়াককে হারাতে চায়। যেন আমার মনে প্ল্যানটা আসে, ‘চলো, ইশতিয়াকের প্ল্যান ফেইল করি। আমরা পালিয়ে যাই।’
হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো হতে শুরু করল। অ্যাই অ্যাম ট্রাপড। নো ওয়ে টু এস্কেপ। আমার ব্রেনকে সারাজীবনের মত বন্দী করে ফেলেছে। যে কনফিডেন্স নিয়ে খেলা শুরু করেছিলাম, ঠাস করে সেটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। বুঝতে দেরী হল না, খেলা এখনও ওর কন্ট্রোলে। যদিও অনেকটাই সিওর, তারপরও কথাটা জিজ্ঞেস করলাম, বললাম
— আমার শরীরেও মাইক্রোচিপ ঢোকানো হয়েছে?
আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আমার মুখের ভ্যাবাচ্যাকা চেহারা দেখে যে কেউ বলতে পারবে, আই অ্যাম স্যাটার্ড। কিছু কি বলব? এই লোক আমার ব্রেন তো পড়তেই পারছে। মনের কথা শুনে সেই কিলার স্মাইল দিল। এর মানে হচ্ছে ‘ইয়েস’। পরের প্রশ্নটা করলাম
— আর সেজন্যই কিডন্যাপটা করেছেন?
আবার সেই স্মাইল। তবে এবার উত্তর দিল
— ঠিক তা না। আমাকে নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করার ব্যাপারও ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এবার আমি পরের প্রশ্নটা করলাম
— হোয়াট’স নেক্সট?
চলবে
স্বয়ম্বরা (১১তম পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি
১১
এরপরে, আমার কিডন্যাপ সাগাতে, বেশ নাটকীয় একটা মোড় এল। হ্যান্ডসাম বাবাজী জানাল, সে আমাকে মুক্তি দিচ্ছে। আমি সবকিছু বুঝে যাওয়ার পরে, আই মিন, আসিফ যে ভাড়াটে কিডন্যাপার না, সে ই যে ইশতিয়াক, এটা জেনে যাওয়ার পরে, এছাড়া তার হাতে আর কোন অপশানও ছিল না। গর্দান যাওয়ার যেসব ফাঁকা বুলি দিচ্ছিল, সেসব যে ও কার্যকরী করতে পারবে না, সেটা আমি বুঝে গেছি। আর তাই, এখান থেকে কাজী অফিস, সেখানে বিয়ে সেরে কমিউনিটি সেন্টার, এসব নাটকীয় প্ল্যান সে চাইলেও একজিকিউট করতে পারছে না। তাই, আমার ‘হোয়াট’স নেক্সট’ এর উত্তরে পরাজিত সৈনিকের মত উত্তর দিল
–আগামীকাল, আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।
ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর একটা হাসি নিজের অজান্তেই চলে আসল। অবশ্য আরও একটা ব্যাপার ঘটল। এই ব্যাটাকে ভয়ংকর কোন শাস্তি দেয়ার যে প্ল্যান কষছিলাম, সেটায় উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। আমাকে কিডন্যাপ করে কাজটা খারাপ করেছে, নো ডাউট, তারপরও, কেন যেন মনের ভেতর প্রতিহিংসার ফিলিংটা আর টের পাচ্ছি না। বরং ছেলেটার সঙ্গ খানিকটা এঞ্জয় করতে শুরু করেছি। ঠিক করলাম, আজকের দিনটা ওর সাথে গল্প করে কাটাব।
বিকেলে লিভিং রুমে বসে একটা গল্পের বইয়ে চোখ বুলাচ্ছি, এমন সময় আসিফ অর ইশতিয়াক, যে নামেই ডাকি, লিভিং রুমে আসল। সঙ্গে ওর ল্যাপটপ। আমার সামনের একটা সোফায় বসল। প্রথমে ভেবেছিলাম, আমার সাথে গল্প করতে এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণের ভেতরেই বুঝলাম, ব্যাপারটা তা না। বসেই যথারীতি ল্যাপটপে মনোযোগ দিল। কিছুটা আত্মসম্মানে লাগল। সামনে আমার মত একজন সুন্দরী বসে আছে অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। হাও ডেয়ার হি!
কিছু বললাম না। ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ পরে একবার তাকাবে। ‘হাই’ না বলুক অ্যাটলিস্ট সোশ্যাল টাইপ একটা স্মাইল দেবে। কিছুই করল না। রাজ্যের মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করে যাচ্ছে।
মিনিট পনের কাটল। আমার নজর বইয়ের দিকে থাকলেও বই পড়ছি না। অপেক্ষা করছি কখন কথা বলে। মাঝে মাঝেই ওর দিকে তাকাচ্ছি। নাহ। বেশ অনেকটা সময়ই অপেক্ষা করা হয়েছে। এতো অবজ্ঞা সহ্য করা যায় না। যখন দেখলাম হাফ অ্যান আওয়ার পরেও আমার দিকে ফিরে তাকাল না, তখন মেজাজ গরম হতে শুরু করল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, রাগ দেখানোর মানেই হচ্ছে, বুঝিয়ে দেয়া যে আমি ইনসাল্টেড ফিল করছি। সেটা করা যাবে না। যতটা সম্ভব নিজেকে সংযত করে তাই স্বাভাবিক আলাপ শুরুর চেষ্টা করলাম।
— আচ্ছা, আপনারা ছেলেরা এতো গাধা কেন?
এল প্যাটার্নে সাজানো সোফায় বসে আছে। সো ঘাড়টা একটু বাম দিকে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। এরপরে সেই কিলার স্মাইল সহযোগে জানতে চাইল
— কি গাধামি করল ছেলেরা?
কথাটা বলে আবার ল্যাপটপের দিকে নজর ফেরাল। মেজাজ খারাপ হলেও সামলে নিলাম। শান্তভাবেই বললাম
–এই যেমন আপনি। ভেবেছিলেন আমাকে কিডন্যাপ করার পরেও আমার মনে আপনার জন্য প্রেম জাগবে। এটা গাধামি না?
প্রশ্নের উত্তর দিতেই হোক আর রিফ্লেক্স বশেই হোক এবার আমার দিকে তাকাল। দৃষ্টিটা দেখে মনে হচ্ছে দূরে কোথাও দেখছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে বটে কিন্তু মনে হচ্ছে না আমাকে দেখছে। ও আসলে অন্য কিছু ভাবছে। সম্ভবতঃ নিজের কাজ নিয়ে। তবে উত্তর দিল। কেমন যন্ত্রচালিতের মত বলল
— পৃথিবীতে মন বলে কি কিছু আছে?
বেশ অবাক হলাম। ব্যাটা বলে কি? দার্শনিক ফার্সনিক নাকি? নাহ, তা কি করে হয়? এই ব্যাটার তো একটা গার্ল ফ্রেন্ডও ছিল। মেয়েটা মরার পরে এই অবস্থা? না যন্ত্র নিয়ে কাজ করতে করতে মানুষকেও যন্ত্র ভাবতে শুরু করেছে? ওর প্রশ্নটা ক্লিয়ার হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম
— মানে?
ওএবার ভালোভাবে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। এরপরে ছাত্র পড়ানোর ভঙ্গিতে বোঝাতে শুরু করল
— মানে হচ্ছে, মন বলতে আমরা যা বুঝি, তা তো আসলে ব্রেন। আমাদের চিন্তা, ভাবনা, ডিসিশান, ইভেন প্রেম ভালোবাসা, সব ডাটার অরিজিন তো আসলে ব্রেন।
হারামজাদা ইচ্ছে করেই আমাকে রাগাচ্ছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলাম। আমি মরছি আমার যন্ত্রণায় আর এই ব্যাটা আছে মন আর ব্রেনের পার্থক্য নিয়ে। অন্য সময় হলে কি করতাম জানি না, তবে এই মুহূর্তে এমন উদ্ভট আলোচনায় যাওয়ার মুড ছিল না। যে ম্যাসেজটা ওকে দেয়ার ইচ্ছে ছিল, সেটা সরাসরিই জানালাম। বললাম
–ব্রেন, হার্ট, মন, হোটেভার, সেটা তো এভাবে, আই মিন একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করে…
কথাটা আমাকে শেষ করতে দিল না। আমার কথার মাঝেই বলতে শুরু করল
— এভাবে কোন মেয়ের মন পাওয়া যায় না, এই তো?
বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ব্যাটা তো সবই বোঝে। তারপরও কেন এমন গাধামি করছে? এনিওয়ে, আসল উত্তর পাব বলে মনে হচ্ছে না। তারপরও কথা চালিয়ে গেলাম। ওর কথার উত্তরে কেবল ছোট্ট করে বললাম
— হ্যাঁ।
আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মাইক্রোচিপের কারণে আমার চিন্তা তো বুঝতেই পেরে গেছে। ‘জোর করে যদি আমাকে বিয়ে করে, সুযোগ পেলেই এই ব্যাটাকে আমি খুন করব’। হয়তো সেজন্যই আমাকে এই বন্দী দশা থেকে ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু এমন কম্পিউটার জিনিয়াস, এতোটা গাধা হবে, মানতে পারছি না। জোর করে একটা মেয়েকে পাওয়ার চেষ্টা যে গ্রেট গাধামি, এ ব্যাপারটা না বোঝার মত ইডিয়ট এই ব্যাটাকে আমার মনে হয়নি। কেন যেন মনে হচ্ছে, ঘটনা অন্য কিছু। ধরতে পারছি না।
ইশতিয়াকের দিকে তাকালাম। ও আবার ল্যাপটপে ব্যস্ত। আমারও আর কথা বলার মুড ছিল না। উঠতে যাব এমন সময় ও আবার শুরু করল
— দেখুন, ব্রেন ব্যাপারটা আসলে কি? কিছু সিগন্যাল, কিছু ডাটা ট্রান্সমিশান, কিছু স্টোরেজ। আর একটা সিস্টেম সেটা অপারেট করছে…
অন্য কোন পরিস্থিতি হলে হয়তো এসব আলাপ মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, কিন্তু এখন কথাগুলো শোনার মত অবস্থা নেই। ওর কথার শুরুতে একটা সোশ্যাল স্মাইল ঠোঁটে ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বাট যখন দেখলাম ও পুরো টিচিং মোডে, তখন আর পারলাম না। ওকে থামিয়ে বলেছিলাম
–খুব সাইন্স ফিকশান মুভি দেখেন, না?
থট রিড তো করতেই পারছে। আর না পারলেও আমার কথা শুনে যে কেউ বুঝবে, এসব শোনার ইচ্ছে আমার নাই। তারপরও আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। এরপরে হেসে উত্তর দিল
— আর আপনার খুব অপছন্দ, না?
আমিও হেসে ফেললাম। অনেস্ট স্মাইল। তারপরে আর কথাবার্তা হল না। বইটা হাতে নিয়ে আমার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজায় পৌঁছে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। ইশতিয়াক ব্যস্ত নিজের ল্যাপটপে। একটু অবাক লাগছিল। কি এমন কাজ যে আমার দিকে এক নজর তাকাবার সময়ও পাচ্ছে না। কথাটা নিয়ে ভাবতে না চাইলেও, মনের কোণে থেকে গেল। রাতে খাবার টেবিলে তাই জিজ্ঞেস করে ফেললাম
–ল্যাপটপে কি করছেন সারাক্ষণ?
খুব ছোট্ট করে উত্তরটা দিল
— একটা লকারের সিকিউরিটি ভাঙ্গার চেষ্টা করছি
ও, এই ব্যাপার। মিথ্যে বলব না, ওর এসব হ্যাকিং ফ্যাকিং এর গল্প শুনতে একটু এক্সাইটিং তো লাগছিলই। সেই ছোট বয়সে পড়া থ্রিলার স্টোরির পার্ট মনে হচ্ছিল নিজেকে। অনলাইন রবারি? লকারের কোড ভাঙবার চেষ্টা লাইভ দেখতে পাচ্ছি শুনে কেমন রোমাঞ্চ ফিল করলাম। বেশ উৎসাহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম
— পারলেন?
চিন্তিত মুখে আমার দিকে তাকাল। মুখে খাবার। আমিও উৎসাহী চোখে তাকিয়ে আছি আসিফের দিকে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে খাবারটা পেটে চালান করল। এরপরে উত্তরটা দিল
–নাহ। যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি সিকিওরড।
–কি আছে লকারে?
–বিশ্বের সবচেয়ে দামী সম্পদ
–কি সেটা?
আবার সেই কিলার স্মাইল দিল। অর্থাৎ উত্তর দেবে না।
তারপরও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। বললাম
— কে বানিয়েছে সিস্টেমটা?
কোন উত্তর না দিয়ে একবার শুধু হাসি হাসি মুখে তাকাল। আবার ল্যাপটপে চোখ। আবার চেষ্টা করলাম
— চেনেন উনাকে?
এবার উত্তর আসল
— দেখিনি কখনও। তবে শুনেছি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট সিকিউরিটি সিস্টেম ডিজাইনার
–ওয়াও। আপনার চেয়েও জিনিয়াস? কি নাম ভদ্রলোকের?
উত্তরে ইশতিয়াক আর কিছু বলল না। ভ্রু কুঁচকে শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল। বেশ রাগ হলেও আর কথা বাড়ালাম না। আসলে বাড়াবার সুযোগ পাইনি। একটা ফোন আসে। জানি না সত্যি ফোন না নিজের থট অ্যাক্টিভেটেড ফোন ইউজ করে নিজেই নিজেকে করেছে। তবে কথা আমার সামনেই বলল
–জ্বি…। না, সব আগের প্ল্যানেই হচ্ছে।
কথাটা শুনে রীতিমত চমকে গেলাম। ভেবেছিলাম, দ্যা গেম ইজ ওভার। ধরা পড়ার কারণে ইশতিয়াক ওর প্ল্যান বাতিল করেছে। যেহেতু ওপাশের কথা শুনতে পাচ্ছি না, তাই বুঝতে পারছি না ওর প্রফেশনাল লাইফের কোন প্ল্যান কি না, আমাকে নিয়ে করা ওর প্ল্যানের কথা বলছে। কেন যেন মনে হল আমার ব্যাপারেই কথা হচ্ছে। কি যে হল, চিৎকার করে জানান দিলাম
— নেভার। কক্ষনো না।
আসিফও হাত দিয়ে মাইক্রোফোন ঢাকে। এরপরে আমাকে উদ্দেশ্য শুধু বলল
— প্লিজ।
এরপরে ফোনে অপর পক্ষের কথা শুনল। তারপরে উত্তর দিল
— আমি জানি হাতে সময় নেই। আই অ্যাম ট্রাইয়িং মাই বেস্ট টু মেক ইট ফাস্ট। আপনার তরফ থেকে একটু চেষ্টা করুন।… ইয়েস। আই গেস তিন তারিখে, দুপুর বারোটার ভেতরেই।… ইয়েস। ঠিক সময়ে আমরা আপনার ওখানে পৌঁছে যাব।
এবার আমি সিওর, কথা আমাকে নিয়েই হচ্ছে। ইশতিয়াক লাইন ডিস্কানেক্ট করে আমার দিকে তাকাল। আমিও তখন জানতে চাই
–আমরা মানে? আর তিন তারিখ দুপুর বারোটা মানে কি?
উত্তরে কিছু বলল না। শুধু একটা স্মাইল দিল। যে সফটনেস ওর জন্য তৈরি হয়েছিল এক লহমায় সেটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। যত বড় জিনিয়াসই হোক, এই হারামজাদাকে আমি ছাড়ব না। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে শুধু বললাম
— মানে আপনার প্ল্যান থেকে আপনি সরে আসেননি?
— নো। আমাদের বিয়ে হচ্ছে। আর তিন তারিখেই হচ্ছে।
নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছি না, তবে আমার ধারণা, রাগে তখন আমার চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছিল। কোন রকমে শুধু বললাম
— নো। এবিয়ে হবে না।
খুব শান্ত চেহারা নিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে ইমতিয়াজ শুধু বলল
–হবে।
–জোর করবেন?
মাথা দুদিকে নেড়ে বোঝাল ‘না’। এরপরে বেশ শান্তস্বরেই উত্তরটা দিল। চোখে কোন অনুশোচনা নেই, কোন অপরাধবোধ নেই। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর ভয়ংকরতম জীব। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে তখন নেমে যাচ্ছে ঠাণ্ডা এক স্রোত। কানে তখন বাজছে ওর উত্তরটা
— বিয়ে আপনার কনসেন্টেই হবে। আপনি হাসিমুখেই বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন।
চলবে