স্বয়ম্বরা (৫ম পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি
৫
ব্যাপারটা এবার ক্লিয়ার হল। সো, মিষ্টার ইশতিয়াক হচ্ছেন ইমতিয়াজ আঙ্কেলের পুত্র। হোয়াট অ্যান এস্কেপ। এই ম্যানিয়াক পুত্রের জন্য প্রস্তাব এনেছিলেন ইমতিয়াজ আঙ্কেল? ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। ইমতিয়াজ আঙ্কেলের নাম শোনার পরে, আমি আর বিশেষ তর্ক করিনি। চুপচাপ নিজের ঘরে ফিরে আসি। ব্যাপারটা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় আবার ভাবা শুরু করলাম।
ঠিকই বলেছে মি হ্যান্ডসাম। মাস ছয়েক আগেরই কথা। আমি তখন থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য রেডি করছি সবকিছু। এমন সময় একদিন ইমতিয়াজ আঙ্কেল আসলেন। প্রায় বিশ বছর পরে দেশে ফিরেছেন। বাবার ছোট বেলার বন্ধু। একসাথে স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এরপরে দুজনের জীবন আলাদা হয়ে যায়। ইমতিয়াজ আঙ্কেল চলে যান আমেরিকা। উনার বাবা মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করতেন। আসলে আমাদের বাসায় অবশ্যই আসতেন।
এরপরে উনার বাবা মা মারা গেলে, দেশে আসা কমে যায়। দেখতে দেখতে সম্পর্কও পাতলা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে ফোন, খবরাখবর নেয়া। ব্যাস। উনাকে নিয়ে আমার স্মৃতিও তাই তেমন খুব একটা নেই। সেদিন যখন হঠাৎ বাসায় এলেন, তখন বাবা পরিচয় করিয়ে দিলেন। স্মৃতি জাগানোর চেষ্টা করলেন,
— মনে আছে ইমতিয়াজ আঙ্কেলকে? যখনই আসতেন, তোমার জন্য চকলেট নিয়ে আসতেন?
মনে না পড়লেও উনার মন রাখার জন্য স্বীকার করলাম
— মনে থাকবে না?
সালাম টালাম সারলাম। কিছু শপিংয় বাকী ছিল। তাই অনুমুতি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাই। সেই এক মুহুর্তের দেখায় আঙ্কেল আমাকে পছন্দ করে ফেলেন। উনার ছেলের সাথে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেন। বাবা আমার মেজাজ জানেন। তাই হ্যাঁ না কিছু না বলে, ‘অরিনের সাথে কথা বলে দেখি’ টাইপ উত্তর দেন। এরপরে আর তেমন কিছু হয় না। আমি থাইল্যান্ড চলে যাই।
ফিরে আসবার পরে বাবা একদিন আমার ঘরে এলেন। মুখের কাচুমাচু ভাব দেখেই বুঝে গেলাম, অস্বস্তিকর কিছু একটা বলবেন। গলা খাকারি দিয়ে শুরু করলেন
— কি করছিস মা?
বাবার এই ইন্ট্রোডাকশানের মানে, ‘এখন একটা রিকোয়েস্ট করব’। পড়ার টেবিলে ছিলাম। বাবার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসি দিলাম। এর মানে হচ্ছে, ‘যা বলতে এসেছো, বলতে পার’।
বাবা বিছানায় বসলেন। বেশ মোলায়েম স্বরে শুরু করলেন
— দেখ মা, তোর মা বেঁচে থাকলে, কথাটা হয়তো সে ই বলতো।
ইমোশানাল টাচ। আমার প্রথম গেস ছিল, বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলবে। আর এই অমায়িক অ্যাপ্রোচের কারণ, এর আগে বার দুয়েক বিয়ের কথা বলতে এসে, বাবা আমার ঝাড়ি খেয়েছে। তারপরও আবার ট্রাই করার মানে, খুব পাওয়ারফুল ক্যান্ডিডেট। বাবা এই পাত্র হারাতে চান না, অর এমন কেউ যার রিকোয়েস্ট উনি ফেলতে পারছেন না।
কড়া একটা ‘না’ বলা যায়। কিন্তু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে মন চাইল না। বললাম
— ছেলেটা কে?
ফ্যাকাসে একটা হাসি দিল বাবা। কিছুটা স্বস্তিও আছে ঐ হাসিতে। নামটা বলবে? না আগে ছেলের গুণগান করবে ভাবছে। সুযোগটা দেয়া যাবে না। বললাম
— নাম।
— ইমতিয়াজের ছেলে।
স্মাইল সহকারে বাবার দিকে তাকালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম কতটা আগ্রহী বাবা। মনে হচ্ছে উনি মনে প্রাণে চাইছেন, আমি ‘হ্যাঁ’ বলি। বাবার দিকে তাকিয়ে মায়া লাগল। সিদ্ধান্ত নিলাম, সরাসরি ‘না’ বলব না। যদিও আমার এখন বিয়ের কোন ইচ্ছে নেই, তারপরও ঠিক করলাম ‘না’ না বলে‘ভেবে দেখি’ টাইপ কিছু একটা বলব। বাবা চাইলে, ছেলের সাথে মিটও করব। দেন…। যাই হোক বাবাকে বললাম
— কি করে ছেলে?
— আমেরিকায় সেটলড। খুব ভাল ছেলে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।
দপ করে মেজাজ গরম হয়ে গেল। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে বললাম
— এরপরে কোন ছেলে সম্পর্কে বলতে এলে, প্রথমে বলবে শিক্ষাগত যোগ্যতা, এরপরে মানুষ হিসেবে কেমন, দেন কোন দেশের বাসিন্দা। অ্যান্ড ওয়ান থিং, গ্রীণ কার্ড হোল্ডার মানে এই না যে আমি নাচতে নাচতে বিয়ের পিড়িতে গিয়ে বসে পড়ব।
বাবার মুখটা শুকিয়ে গেল। বাবা আমাকে চেনে। এই প্রস্তাবে আমার এইট্টি পারসেন্ট ‘না’ হয়েই গেছে। বাকী বিশ পারসেন্ট ‘না’ টা বলছি না, বাবার সম্মানে। ওটা বলব, ছেলেকে দেখার পরে।
বাবা আরও কিছু বলবে মনে হচ্ছে। ‘ভেবে দেখ’ টাইপ কিছু বলবে না, আমি সিওর। ওটা বললে, এখনই ‘না’ বলে দিব, বাবা জানে। আর কি বলবে? বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এখনই বলবে। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা খাম বের করল বাবা। ও এই ব্যাপার। ছবি। বাবা কিছু বলার আগে আমিই হাত বাড়িয়ে ছবিটা নিলাম। খামটা না খুলে টেবিলের ওপর রাখলাম। বললাম
— পরে এক সময় দেখব।
— একবার দেখে যদি মতামত দিতি
— তাড়াহুড়ার কি আছে। সময় নিয়ে দেখব।
— মানে, মাস ছয়েক পরে ছেলেটা আসবে। বিয়েটা তখনই সেরে ফেলতে চায়।
কথাটা শুনে বাকী টুয়েন্টি পার্সেন্টও ‘না’ হয়ে গেল। বাবার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম
— তোমার মেয়ে কোন ফেলনা না। অ্যান্ড ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফর্মেশান, কোন ছেলে আমাকে বিয়ে করবে না, আমি কোন ছেলেকে বিয়ে করব। আর সেটাও ছেলেটাকে যদি আমার পছন্দ হয়। সো, আমাকে যদি বিয়ে করতে হয়, হি হ্যাজ টু ফেস মাই ‘স্বয়ম্বর’। আর কিছু বলবে?
বাবা বুঝে গেল, এই মুহুর্তে আমার মেজাজ সপ্তম আসমানে। এখন আর একটা কথা বললে, আমি বার্স্ট করব। বাবা চুপচাপ উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় নজর পড়ল খামটার ওপর। সেটা হাতে নিয়ে বললাম
— এটা নিয়ে যাও। আর ছেলেকে বল, এভাবে পুতুল বিয়ে করার শখ থাকলে, অন্য মেয়ে দেখতে।
বাবা খামটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। এরপরে আর ব্যাপারটা নিয়ে বাবা কথা বলেননি। কেন বলেননি, বলতে পারব না। আমার ধারণা ছিল, আমার শর্ত বাবা উনাকে জানাননি। আমার স্বভাব বাবার জানা। বুঝে গেছেন, এই ছেলেকে আমি ‘না’ বলবই। তাই বন্ধুর প্রেস্টিজের কথা ভেবে সম্ভবতঃ আগে ভাগেই ‘না’ বলে দিয়েছেন। আর নয়তও, ‘মেয়ে এখনও পড়াশোনা করতে চায়’ টাইপ কিছু বলেছেন।
সো দ্যাট গাই হ্যাজ কাম ব্যাক। অ্যান্ড কাম উইথ অ্যা ডেডলি প্ল্যান। তেশরা মার্চ আমাকে বিয়ে করবে। মাথায় রীতিমত আগুন জ্বলতে শুরু করল।
— শুয়ে পড়ুন।
আওয়াজ শুনে ভুত দেখার মত চমকে উঠলাম। কন্ঠস্বরটা সেই হ্যান্ডসামের। মানে রুমে কোথাও স্পীকার ফিট করা আছে। তারচেয়েও জঘন্য ব্যাপার হচ্ছে, ও দেখতে পাচ্ছে আমি ঘুমাইনি। তার মানে রুমে হিডেন ক্যামেরা রাখা আছে। এবং এই মুহূর্তে আমাকে দেখছে। যেটা ক্লিয়ার না, সেটা হচ্ছে, ছেলেটা আমাকে শুনতে পাচ্ছে কি না। ক্যামেরা কোনদিকে বুঝতে পারছি না। সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়েই তাই বললাম
— আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?
— পাচ্ছি।
— এক্ষুনি ক্যামেরা বন্ধ করুন।
— ঘরে কোন ক্যামেরা নেই।
— তাহলে কিভাবে বুঝলেন আমি ঘুমাইনি?
— লাইট জ্বলছে।
উত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম হঠাৎ ঘরের লাইট নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেল। আর সহ্য করতে পারলাম না। কোন কথা না বলে উঠে দাঁড়ালাম। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসলাম। লিভিং রুমে একটা জিরো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। হালকা আলো। কিছুক্ষণ লাগলো অল্প আলোতে চোখটা সইয়ে নিতে। এবার ডাইনিং রুমটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। সেই আলোতে এগিয়ে গেলাম। সামনে এগিয়ে আরেকটা বেডরুম। ভেতর থেকে বন্ধ, এটাতেই ঐ ব্যাটা থাকে। আশে পাশে ভারী কিছু খুঁজলাম। তেমন কিছু পেলাম না। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজায় আঘাত করতে গেলাম। এমন সময় দরজাটা খুলে গেল। হ্যান্ডসাম বেরিয়ে আসল। হাত বাড়িয়ে আমাকে থামতে ইঙ্গিত করল।
— আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন।
— তা ঠিক বোঝাটা কি?
বেশ বড় একটা দীর্ঘশ্বাস টানল ছেলেটা। এরপরে বোঝানোর ভঙ্গি করে বলল
— প্লিজ, ট্রাস্ট মি। যেমনটা আপনি ভাবছেন, তেমন ডিসগাস্টিং কিছু আমি করছি না।
— একটা মেয়ের ঘরে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা ডিসগাস্টিং কিছু না?
— প্লিজ। আই সোয়্যার। আপনার ঘরে কোন হিডেন ক্যামেরা নেই।
ছেলেটার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালাম। এরপরে কাটা কাটা স্বরে বললাম
— কিভাবে বুঝলেন আমি ঘুমাইনি?
— সেটারও উত্তর দিয়েছি।
নিজেকে সামলালাম। শান্ত স্বরে বললাম
— দেখুন, আপনার ধারণা ঠিক। সুযোগ পেলেই আমি পালাবার চেষ্টা করব। সেজন্য চাইলে আপনি আমার দরজায় তালা লাগাতে পারেন। বাট হিডেন ক্যামেরা থাকলে ঐ রুমে আমি থাকব না।
উত্তরে ছেলেটা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ওকে সুযোগ না দিয়ে আবার বললাম
— ওকে। আই চেঞ্জ মাই মাইন্ড। আমি পালাব না। দ্যাটস মাই ওয়ার্ড।
ছেলেটা উত্তর না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আমিও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এরপরে বললাম
— না পালাবার কারণটাও জানিয়ে দিচ্ছি। আমি নিজেও এর শেষ দেখতে চাই। আপনার ক্লায়েন্ট আমাকে বিয়ে করবে, এই তো? ফাইন। উনাকে জানিয়ে দেবেন, বিয়েতে আমি রাজী। তিন তারিখেই বিয়ে হবে। অ্যান্ড দেন, আই উইল মেক হিম আন্ডারস্ট্যান্ড, হু ইজ অরিন। লেট দ্যা গেম কলড ম্যারেজ বিগিন।
চলবে
স্বয়ম্বরা (৬ষ্ঠ পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি
৬
মেজাজ তখন আমার সপ্তমে চড়ে আছে। স্পেশালি ইশতিয়াক চৌধুরীর পরিচয় পাওয়ার পরে। হারামজাদা রাবণের পথ ধরেছে। তাও আবার নিজে কিডন্যাপ করার মুরোদ নেই, কিডন্যাপার ভাড়া করেছে। রাগটা যখন মাথায় কিলবিল করছিল, তখন আবার জানতে পারলাম রুমে ক্যামেরা আছে। রাগটা সাথে সাথে তিনগুণ বেড়ে গেল।
ক্রুদ্ধ চোখে যখন ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন ছেলেটাও কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমাকে বোধহয় অ্যাসেসও করল কিছুক্ষণ। তবে এবারের চাহনি ওয়াজ নট মাচ কনফিডেন্ট। মন বলছে, ব্রেকডাউন করবে। বললাম
— আমি একটা কথা বারবার বলি না।
— আই সোয়্যার, ঐ রুমে কোন হিডেন ক্যামেরা নেই। ট্রাস্ট মি।
— না। রুম চেঞ্জ হবে। আপনার রুমে আমি থাকব, আপনি আমার রুমে। আই বিলিভ, আপনার রুমে কোন সিসি ক্যামেরা নেই।
হ্যান্ডসাম বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। হয়তো কিছুটা চিন্তা করল, আর কিছু বলবে কি না। অবশেষে, জানাল,
— ওকে।
রুম চেঞ্জ হল। আমি হ্যান্ডসামের রুমে এলাম। ক্যাবিনেটের জিনিসগুলোও এক্সচেঞ্জ হল। দুটো ঘরে আসবাবও একইভাবে সাজানো। এক্সট্রা বলতে এক আলমিরা বই। আর একটা ল্যাপটপ। ল্যাপটপটা আসিফ সাথে নিয়ে গেল। ঘরের চারদিকে তাকালাম। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, এঘরে ক্যামেরা নেই। ছেলেটা বেরিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় কি ভেবে নিজেই জানালো,
— জানিনা বিশ্বাস করবেন কি না, তারপরেও বলছি, ও ঘরের মত এঘরেও কোন ক্যামেরা নেই। তবে স্পীকার আর মাইক্রোফোন, এঘরেও আছে।
বলার ভঙ্গিতে মনে হল, সত্য বলছে। আনলেস প্রুভ আদারওয়াইজ, আপাততঃ এটা বিশ্বাস করা ছাড়া আমার উপায় নেই। স্পীকার আর মাইক্রোফোনের ব্যাপারটা আমি নিজেই অ্যালাউ করলাম। প্রয়োজনে কথা বলা যাবে।
একটা ব্যাপার ক্লিয়ার হল, হ্যান্ডসাম নিজেকে যতটা হার্টলেস দেখাতে চাইছে, ততোটা না। ইমোশনাল গেম খেলা যাবে মনে হচ্ছে। তবে আজকে আর না। একদিনের জন্য অনেক হয়েছে। কোন প্ল্যান করলে আগামীকাল করতে হবে। কাজটা সোজা হবে না, তবে মনে হচ্ছে অসম্ভব হবে না।
একটা ব্যাপারে আমি সিওর। টাকার লোভ দেখিয়ে লাভ হবে না। এথিকস ফেথিকসের কথাগুলো কেবল হুমকি বলে মনে হচ্ছে না, ব্যাটা আসলেই বোধহয় বেশ নীতি মেনে চলে। ওর পেট থেকে কিছু বের করতে চাইলে অন্য লাইনে ট্রাই করতে হবে। সুন্দরী মেয়েদের হাতে ঈশ্বর একটা অমোঘ অস্ত্র দিয়েছেন। রূপ। সেটা ব্যাবহার করা যেতে পারে। আই থিঙ্ক হি লাইকস মি। ওর তাকানোতে কিছুটা হলেও প্রেমিক ভাব আছে। কাজে লাগানো খুব কঠিন হবে না।
এসি অন করে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে গিয়ে আবিস্কার করলাম, ঘুম আসছে না। আসলে কিছুক্ষণ আগেই তো অজ্ঞান দশা থেকে জাগলাম, ঘুম আসবে কোথা থেকে? আমার মনে হয় এখন আর ঘুম আসবে না। কয়েকবার এপাশ ওপাশ করে উঠে বসলাম। জিজ্ঞেস করলাম
— মিস্টার আসিফ, জেগে আছেন?
— আছি।
— ঘুম আসছে না।
— আমার আলমিরাতে কিছু গল্পের বই আছে। ইবুক লোডেড একটা ট্যাবও আছে। ওগুলো পড়তে পারেন।
— আমি সব ধরনের বই পড়ি না।
— একটু চেক করে দেখুন। আপনার পছন্দের বইও আছে।
উঠে এগিয়ে গেলাম। আলমিরা খুললাম। বইয়ের কালেকশান বেশ ভালোই। তিনটে বই পেলাম আমার ফেভারেট রাইটারের। এগুলো পড়া হয়নি। অনেকদিন থেকে খুঁজছিলাম বইগুলো। বিছানায় একটা আইপড আর একটা ট্যাব রাখা। সাথে হেডফোন। কি মনে করে ওদুটাও হাতে নিলাম। বিছানায় গিয়ে বসলাম। বইগুলোর জন্য ব্যাটাকে একটা কৃতজ্ঞতা জানানো যেতে পারে। বললাম
— থ্যাঙ্কস।
— ওয়েলকাম।
এমন সময় চিন্তাটা মাথায় আসল। তাই তো, কেমন আছেন? একটু কথা বলতে পারলে ভাল হত। জিজ্ঞেস করলাম
— আরেকটা হেল্প করা যায়?
— বলুন।
— বাবা কেমন আছে, খবরটা জানা যাবে? আপনিই ফোন করুন। তথ্যটা পেলেই আমার হবে।
— লিভিং রুমে চলে যান। টিভি ছাড়ুন। ওটা আপনার বাসার সাথে কানেক্টেড।
এই হারামজাদা তো দেখি মহা চিজ। আমাদের বাসায়ও সিসি ক্যামেরা ফিট করে ফেলেছে। কবে থেকে ফলো করছে আমাদেরকে? আমার বেডরুমেও লাগিয়েছে নাকি? প্রশ্নটা করতে যাব এমন সময় আওয়াজ ভেসে এল
— আপনার বাসার বেডরুমে কোন সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়নি। শুধু আপনার বাসার লিভিং রুমে আর আপনার বাবার বেডরুমে। সেটাও গতকাল লাগিয়েছি। আপনি যেন বাবাকে দেখতে পান, সেজন্য।
ব্যাটা তো দেখি মাস্টার প্ল্যানার। আমি কি করব, কি চাইব, সবই হোমওয়ার্ক করে রেখেছে আগে থেকে। ফিলিং ইম্প্রেসড। রুমে একটা ঘড়ি ছিল, তাকিয়ে দেখলাম রাত এগারোটা। মানে বাবা এখনও ঘুমায়নি। টক শো দেখছে।
বাইরে বেরিয়ে এলাম। লিভিং রুমে ঢুকলাম। লাইট জ্বালাবার জন্য সুইচ খুঁজছি এমন সময় নিজে থেকেই লাইট জ্বলে উঠল। নিশ্চয়ই ঐ ব্যাটার কাজ। মানে এখানেও ক্যামেরা আছে। এটা মেনে নেয়া যায়। মাইক্রোফোনও কি আছে? টেষ্ট করে দেখা যায়। বললাম
— থ্যাঙ্কস।
— রিমোটে ওয়ান চাপ দিলে লিভিং রুম, টু চাপ দিলে আপনার বাবার বেডরুমের ক্যামেরার ভিউ দেখতে পাবেন।
তার মানে এখানেও স্পিকার আর মাইক্রোফোন আছে। ব্যাটা কিডন্যাপিং কে মহা প্রফেশনাল টাচ দিয়েছে দেখি। সবদিকেই টেকনোলজি ছড়িয়ে আছে। টিভি অন করলাম। বাবার এখন বেডরুমে থাকার কথা। টু চাপ দিলাম। বাবা যথারীতি বেডরুমে শুয়ে টক শো দেখছে। বেশ নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে। আমার ভয়েসে কি এমন বলেছে যে বাবা এমন নিশ্চিন্তে আছে? জিজ্ঞেস করতে যাব এমন সময় স্পিকার আবার বলে উঠল
— আপনার বাবাকে বলা হয়েছে, আপনি বান্ধবীদের সাথে সিলেট ট্যুরে গেছেন। সপ্তাহ খানেক পরে ফিরবেন।
এই ব্যাটা তো দেখছি জিনিয়াস। না বলতেই বুঝে যাচ্ছে। থট রিডিংয়ের কোন ম্যাশিন আছে নাকি ব্যাটার কাছে? কথাটা বললাম না। নাহ, এই চিন্তাটা ব্যাটা ধরতে পারল না। কিংবা ধরলেও জানান দিল না। ওদিক থেকে কোন উত্তরও আসল না।
খানিক্ষণ বাবাকে দেখলাম। বোর লাগছে। টিভি বন্ধ করত যাব, এমন সময় কথাটা মনে আসল। জিজ্ঞেস করলাম
— আপনার টিভিতে আর কি কি দেখা যায়?
— আপনার ফেভারেট চ্যানেল ফর্টি ফাইভ থেকে ফিফটি ফাইভ পর্যন্ত।
ভ্রু কুচকে গেল। ফর্টি ফাইভ দিলাম। আসলেই আমার ফেভারেট চ্যানেল। বাকীগুলো টপাটপ চেক করলাম। স্পট অন। একটা ছেলে দেখি আমার সম্পর্কে ইনস অ্যান্ড আউটস সবই জানে। হঠাৎ কেন যেন ব্যাপারটায় অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। বললাম
— আপনি তো দেখছি আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন।
— সরি ফর দ্যাট। খানিকটা রিসার্চ তো করতেই হয়েছে।
— তা রাবণ সাহেব নিজে সীতাহরণ না করে আপনাকে ভাড়া করলেন কেন?
— সরি ম্যাডাম।
— এথিকস?
— না, রুলস। ক্লায়েন্টকে অযথা প্রশ্ন আমরা করি না।
— আই সি। তা উল্টোটা কি করা যায়? কিডন্যাপিংয়ে আপনার জব এক্সপেরিয়েন্স সম্পর্কে যদি একটু জানতে চাই, বলা যাবে?
— যাবে। কি জানতে চান, বলুন?
— এই… ধরুন… এই প্রফেশানে কবে থেকে বা… কিভাবে এলেন।
— এই প্রফেশানে আছি বছর দুয়েক।
— বাট কেন? ইউ নো অ্যা লট অ্যাবাউট টেকনোলজি।
— তা জানি। এটাকে হবি বলতে পারেন।
— হবি? ওকে…হোয়াট অ্যাবাউট পার্সোনাল লাইফ?
— কি জানতে চান বলুন
— ম্যারিড?
— না।
— গার্লফ্রেন্ড?
— ছিল।
— ছিল কেন?
— ডাইড। ইন অ্যা কার অ্যাক্সিডেন্ট।
— সরি।
— ইটস ওকে।
— আমার সম্পর্কে কিছু জানবার নেই?
— সবই তো জানি।
— কি জানেন?
— একটা প্রাইফেট ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিকসে থার্ড ইয়ারে পড়েন। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। মা ক্যান্সারে মারা গেছেন। হট টেম্পারড। ভেরি চুজি। অ্যান্ড স্টিল সিঙ্গেল।
ঘাড় কাত করে ব্যাপারটা অ্যাপ্রেসিয়েট করলাম। ফিল করলাম ছেলেটার সাথে গল্প করতে ভালোই লাগছে। বললাম
—লিভিং রুমে আসুন না। সামনা সামনি বসে গল্প করি।
কিছুক্ষণ কোন উত্তর পেলাম না। এরপরে দেখলাম, হ্যান্ডসামের রুমের দরজা খুলে গেল। ধীরে ধীরে হেঁটে এগিয়ে আসল। সাদা টিশার্ট আর ঢিলা একটা পায়জামা পড়ে আছে। ড্যাশিং লাগছে। হাতে মোবাইলটা নিয়ে এগিয়ে এসে একটা সোফায় বসল। কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আসিফ ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল ‘কি ব্যাপার’। উত্তরে কিছু না বলে একটা স্মাইল দিলাম। এরপরে ওর দিকে তাকিয়েই জানতে চাইলাম
— আমার কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় আসছে না।
— কি সেটা?
— আপনি এই প্রফেশানে কেন? আই মিন ইউ সিম কোয়ায়েট ইন্টেলিজেন্ট। আসলে… রাবণের হেল্পার হিসেবে আপনাকে কেন যেন মানায় না।
— প্রশংসা? না তিরস্কার?
কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বোঝার চেস্টা করলাম কথাটা কিভাবে নিচ্ছে। মনে হল, ‘রাবণের হেল্পার’ কথাটায় আপত্তি নেই। তারপরও সফট অ্যাপ্রোচে বললাম
— অ্যা বিট অফ বোথ।
— থ্যাঙ্কস।
— আর আমার প্রশ্নের উত্তরটা?
এবার আমার দিকে সোজাসুজি তাকাল। আবার সেই স্মাইল। বলল
— প্রফেশানটা আমি চুজ করিনি, প্রফেশান আমাকে চুজ করেছে।
অবাক হলাম। জানতে চাইলাম
— বুঝলাম না।
এবার কিছুটা উদাস হয়ে বলতে শুরু করল
— একসময় আমি সিকিউরিটি এক্সপার্ট ছিলাম। ভাল চাকরী করতাম। বিভিন্ন ব্যাঙ্কের ইলেকট্রনিক সিকিউরিটি ডিজাইন করতাম।
শেষের শব্দটা কানে বাজল। জানতে চাইলাম
— ‘তাম’ কেন? এখন করেন না?
— না। একবার এক ব্যাঙ্কে রবারি হয় আর ব্লেইমটা আসে আমার ওপর। ইনভেস্টিগেশানে ডাকাতদের একজন স্টেটমেন্ট দেয়, আমি নাকি ওদের ভল্টের পাসওয়ার্ড দিয়ে হেল্প করেছি। সে কারণে জেলও হয়।
— তারপর?
এবার বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিল। এরপরে বলল
— তারপর? তারপর আমার জীবনে ‘শান্ত কেন মাস্তান’ টাইপ ফিল্মের নায়কের মত হয়ে যায়। অনেস্টির এমন পরিণাম দেখে অভিমানে প্রফেশনাল কিডন্যাপার হয়ে গেলাম।
ব্যাটা কি চাপা মারছে? না সত্যি? চেহারা দেখে আন্দাজ করতে পারছি না। হোয়াটেভার, ক্যারেক্টার বেশ ইন্টেরেস্টিং। নিজেকে অবশ্য ‘শান্ত কেন মাস্তান’ টাইপ সিনেমার বিবেক টাইপ হিরোইন হিসেবে কল্পনা করছি না। কেবল নিজের মধ্যে, একজন থ্রিলার গল্পের থ্রিলপ্রেমী নায়িকার উদগ্রীবতা ফিল করলাম। মনে মনে হাসলাম। আমি কি এই ব্যাটাকে পছন্দ করতে শুরু করেছি? পরে ভাবা যাবে। আপাততঃ গল্প এগিয়ে নিলাম। জানতে চাইলাম
— ফ্যামিলিতে আর কে কে আছেন?
— বাবা।
— মা?
— শি ইজ নো মোর।
— সরি।
— ইটস ওকে।
— একটা কথা বলব?
— বলুন।
— আপনার রান্নার হাত কিন্তু বেশ ভাল।
— আই নো।
— মা শিখিয়েছে?
— না। মা যখন মারা যান, আমি তখন খুব ছোট।
এরপরের কথাটা ঠিক কোন কিছু না ভেবেই বলে ফেললাম
— আচ্ছা, আপনাকে যদি ভাল হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, নেবেন?
— প্রলোভন?
— ধরুন তাই।
— না, নেব না।
এমন সময় হ্যান্ডসামের ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা ড্রয়িংরুমের সেন্টার টেবিলের ওপরই রাখা ছিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ক্লায়েন্ট। আসিফ ফোনটা ধরতে যাচ্ছিল। আমি হাত বাড়িয়ে ওকে আটকালাম। বললাম
— আপত্তি না থাকলে, আমি একটু কথা বলতে চাই।
কি ভেবে ব্যাপারটা মেনে নিল। মোবাইলটা এগিয়ে দিল আমার দিকে। ফোনটা রিসিভ করলাম। কানে লাগিয়ে কথোপকথন শুরু করলাম।
— হ্যালো
চলবে।