স্বয়ম্বরা পর্ব-৭+৮

0
453

স্বয়ম্বরা (৭ম পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি


সারাটা রাত ছটফট করে কাটল। বই পড়ার চেষ্টা করলাম। লাভ হল না। গানের কালেকশানও খারাপ না। দুএকটা শুনলাম। মন বসছে না। একটু আগের কথোপকথনের প্রতিটা শব্দ এখনও কানে বাজছে। ফোনটা যখন আমার হাতে দিল, তখন ফিল করলাম বুকের ঢিপঢিপ বেড়ে গেছে। অদ্ভুত এক সাসপেন্স অনুভব করলাম। এই গল্পের নায়ক বা ভিলেন, যা ই বলি, তার সাথে প্রথমবের মত আলাপ করতে যাচ্ছি। ফোন হাতে নিয়ে কিছুটা সময় নিলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব সংযত করে আলাপ শুরু করলাম
— হ্যালো
— বলুন।
কিভাবে কথা শুরু করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করেই শুরু করলাম
–আমি অরিন।
–জানি। কিছু বলবেন?
— জ্বি।
এরপরে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে কথাগুলো বলতে শুরু করলাম
–আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় না, দিস ইজ নট দ্যা রাইট ওয়ে টু ম্যারি অ্যা ওমেন?
— রাইট ওয়েতে তো এগিয়েছিলাম, বাট…
কথাটা শেষ করল না। সম্ভবতঃ ইচ্ছে করেই। চুপ করে যাওয়ার ভেতরে কি অঘোষিত একটা হুমকি ছিল? না সিচুয়েশানটা শুধু ডেস্ক্রাইব করল? গলার আওয়াজ শুনে বোঝার চেষ্টা করলাম। ঠিক ক্লিয়ার হলাম হলাম না। বললাম
— সো ইউ ডিসাইডেড টু কিল মি।
— অনলি ইফ ইউ সে ‘নো’।
মনের কোণে বোধহয় ক্ষীণ একটা আশা কাজ করছিল, ‘আই হ্যাভ টু কিল ইউ’ কথাটা আসিফের নিজের হুমকি। ইশতিয়াক চৌধুরীর আইডিয়া না। সেটা ভেঙ্গে গেল। বুঝে গেলাম, এই লোক আসলেই একটা সাইকো। ভেবেছিলাম কিছুটা আলাপ করে মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করব, সেটা নষ্ট হয়ে গেল। আর কাজটার ন্যায় অন্যায় নিয়ে তর্ক করার মানসিকতা অবশিষ্ট নেই। বেশ ধীরে ধীরে স্পস্ট করে তাই উত্তর দিলাম।
— বিয়েতে আমি মত দিয়ে দিয়েছি। আমাকে কি এখন ছেড়ে দেয়া যায়?
— না, মত যেটা দিয়েছেন সেটা ওখান থেকে ছাড়া পাবার জন্য।
ইজি গেস। যে মেয়েকে একজন ছেলে বিয়ে করবে বলে কিডন্যাপ করেছে, তার মিনিমাম আত্মসম্মান থাকলে, এই বিয়েতে মত যে দিয়ে না, সেটা একটা ইজি গেস। তার মানে ‘বিয়েতে রাজী’ বললেও এখান থেকে মুক্তি মিলছে না। তাহলে এই ব্যাটা চাচ্ছে কি আসলে? কথাটা স্পষ্ট করেই জানতে চাইলাম।
— দেন… আমি ছাড়া পাব কবে?
— তিন তারিখ সকালে ওখানে একটা মাইক্রো যাবে। ওটাতে করে ওখান থেকে আপনি পার্লারে যাবেন, ইফ ইউ উইশ। সেখান থেকে, অর ইফ ইউ উইশ সোজাসুজি, কাজী অফিসে। ওখানে বিয়ে হবে এরপরে কমিউনিটি সেন্টারে আমাদের রিসেপশান হবে। আপনার এবং আমার তরফের সব গেস্ট ওখানে থাকবেন। আমরা সবার আশীর্বাদ নেব।
কথাগুলো বলার ভেতরে কিছু একটা ছিল। বুঝলাম, হি ইজ সিরিয়াস। প্রতিটা কথাই এই লোক বিশ্বাস করে এবং ভেরি মাচ কনফিডেন্ট যে এমনটাই ঘটবে। এই ইডিওটের সাথে তর্ক করার কোন মানে হয় না। তারপরও শেষবারের মত ট্রাই করলাম। বললাম
— ডোন্ট ইউ থিঙ্ক, ইউ আর মেকিং অ্যা বিগ মিসটেক?
— নো।
নাহ, এই ব্যাটা শুধু সাইকো না, মেয়েদের সম্পর্কে উদ্ভট কোন আইডিয়া নিয়ে চলে। শেষ একটা চেষ্টা করলাম। বললাম
— আপনার কি ধারণা, এই বিয়েতে আপনি সুখী হবেন?
— ইয়েস।

আর কথা বলে লাভ নেই। যা বোঝার, বুঝে গেলাম। একজন ম্যানিয়াকের সাথে ডিল করছি। জনমের মত শিক্ষা দেয়ার যে প্ল্যানটা করেছিলাম, তা বাদ দিতে হচ্ছে। বিয়েতে রাজী না হলে মেরে ফেলার যে হুমকি দিয়েছিল, সেটা করা এর জন্য আসলেই অসম্ভব কিছু না। এ আদৌ আমার সাথে জীবন কাটাবার জন্য বিয়ে করতে চাইছে কিনা সন্দেহ। হি জাস্ট ওয়ান্টস টু সেটল দ্যা স্কোর। রিজেক্টের রিভেঞ্জ। টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার ভিলেনের অ্যাপ্রোচ।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, জানি না। ঘুম ভাঙ্গল দরজায় মোলায়েম একটা নক শুনে। উঠে বসলাম। পোষাক অবিন্যস্ত ছিল দেখে দরজার কাছে গিয়ে বললাম
— টেন মিনিটস
— ওকে।
ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেস হয়ে নিলাম। নতুন একটা পোষাক পড়ে পরিপাটি হয়ে বেরোলাম। ডাইনিং রুমে ঢুকে দেখি টেবিল রেডি। যথারীতি আমার ফেভারেট মেনু। সাথে কিলার স্মাইলসহ মি হ্যান্ডসাম।
গতরাতের কথোপকথনটা তখনও মন থেকে সরে যায়নি। কিছুটা ভয় কাজ করলেও মাথা ঠান্ডা রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এমন সময় কথাটা জানাল আসিফ।
— আপনার বাবা সকালে নাস্তা সেরে ফেলেছেন। এরপরে আপনার ফুপুকে নিয়ে বিয়ের মার্কেটিংয়ে বেরিয়েছেন।
এবার অবাক হলাম না। বুঝলাম, ভয়েস সিন্থেসাইজারের কাজ। বাবাকে ফোনে আমার কন্ঠ জানিয়ে দিয়েছে, বিয়ের মার্কেটিং করে রাখবার জন্য। হয়তো এটাও জানিয়েছে, ইশতিয়াককে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই। গলার স্বর স্বাভাবিক রেখেই জানতে চাইলাম
— আপনার ক্লায়েন্ট কি এখন দেশে?
— জ্বী।
— দেখা হতে পারে?
ছেলেটা খানিকটা প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকাল। এরপরে বলল
— এব্যাপারে কোন নির্দেশনা নেই। আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
আর কথা না বাড়িয়ে স্যান্ডউইচে কামড় দিলাম। ভাল বানিয়েছে। না তাকালেও বুঝতে পারছি, ছেলেটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলা দরকার। গতরাতের আলোচনাটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম
— এই কটা দিন কিভাবে কাটবে?
— ভিডিও গেম আছে, টিভি আছে, কিছু ফিল্ম আছে আর বই
রাগ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু থেমে গেলাম। এই বন্দী দশাতে আসলেই তেমন কিছু অ্যারেঞ্জ করা সম্ভব না। ইন্টারনেট মনে হয় না অ্যালাউ করবে। সো, টিভি, ফিল্ম আর বই দিয়েই সময় কাটাতে হবে। কথা না বাড়িয়ে খাবারে মনযোগ দিলাম। এমন সময় হ্যান্ডসামের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা স্মাইল দিল। এরপরে ফোনটা রিসিভ করল। ফোনটা নিয়ে নিজের রুমের দিকে যাবার জন্য উঠছিল। আমি বলে উঠলাম
— আপনার ক্লায়েন্ট?
উঠতে গিয়েও উঠল না। মাউথ পিসে হাত রেখে আমার দিকে তাকাল। বলল
— জ্বি
— ক্যান আই টক?
খানিকটা ভাবল। এরপরে মিঃ হ্যান্ডসাম ফোনটা এগিয়ে দিল। এবার গলার স্বর যতটা সম্ভব মোলায়েম করে শুরু করলাম
— হ্যালো। আমি
— বলুন
— আপনার কি মনে হয় না, আপনার প্ল্যানে একটা বড় ফল্ট আছে।
— বিয়ের দিন আমি মত পাল্টে ফেলতে পারেন, এই তো?
অবাক হলাম। ব্যাটা ম্যানিয়াক হলেও বুদ্ধিমান। উত্তর দিলাম
— ইয়েস।
— না। সেটা নিয়ে আমি চিন্তিত না।
— জানতে পারি, কেন?
— কারণ এই কয়দিনে আপনি আমার প্রেমে পড়ে যাবেন।
ব্যাটা বলে কি? প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম। নিজেকে সংবরন করলাম। বললাম
— আর ইউ ম্যাড?
— নো। দ্যাট ওয়াজ দ্যা ডিল। আসিফের উইল মেক ইউ লাভ মি।
কথাটা শুনে উত্তর দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেললাম। এই লোক বলে কি? ঝট করে আসিফের দিকে তাকালাম। সেই কিলিং স্মাইল ঠোঁটে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি হচ্ছে এসব? মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। গান পয়েন্টে বিয়ে করা যেতে পারে, রেপ করা যেতে পারে, বাট প্রেম? কাউকে প্রেমে পড়ানো যায়? উইল মেক মি লাভ হিম, মাই ফুট।
সিদ্ধান্ত নিলাম, ইশতিয়াকের সাথে আর কোন আলাপ করব না। যা করার আমাকে একাই করতে হবে। কথা শেষ হয়ে গেছে এমন ভাব করে ফোনটা হ্যান্ডসামের দিকে এগিয়ে দিলাম।
— কথা হয়ে গেছে।
হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল ছেলেটা। এরপরে ‘হ্যাঁ’ ‘নো প্রব্লেম’ টাইপ কিছু আলাপ সেরে ফোন রেখে দিল। এরপরে টেবিলে বসতে বসতে বলল
— তো? আজকের প্ল্যান?
আড়চোখে ছেলেটার দিকে তাকালাম। কথা বলার মুড নেই। কথাটা স্পস্ট করেই বললাম
— ক্যান ইউ লিভ মি অ্যালোন?
মাথা ওপর নীচ করে সম্মতি জানাল। এরপরে থালাগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াল। একবার ভাবলাম বাধা দিব। দিলাম না। টেবিল ছেড়ে উঠলাম। আসিফ হয়তো ভাবল আমি কিচেনে যেতে চাইছি। তাই জানাল
— আমি করে দেব। আপনি টিভি দেখুন।
ওকে হেল্প করার ইচ্ছে এমনিতেও ছিল না। শুধু নোড করে লিভিং রুমে গিয়ে একটা সোফায় বসলাম। একটু আগেও ‘কিছু একটা করার’ যে প্ল্যানগুলো মাথায় নাড়াচাড়া করছিলাম, সেগুলোর সবটাই বাতিল করলাম। বুঝতে পারছি, একটা না, দুটো ম্যানিয়াকের পাল্লায় পড়েছি। জোর করে আমাকে বিয়ে করা এর উদ্দেশ্য না। এই ছয়দিনে আসিফ উইল মেক মি ফল ইন লাভ উইথ ইশতিয়াক। হাও ক্যান হি? রিয়েলি পাজলড ফিল করছি। এদের সত্যিকারের প্ল্যান কি?
টিভি ছেড়েছি, কিন্তু দেখছি না। এমন সময় আসিফ সেখানে এসে পাশের সোফাটায় বসল। বলল
— হঠাৎ মুড চেঞ্জ?
চোখ তুলে তাকালাম। মুখটা খানিকটা গম্ভীর। মনে হচ্ছে কিছু বলতে চায়। ইতস্ততঃ করছে। আমিই তাই জানতে চাইলাম
— কিছু বলবেন?
— ইয়েস।
— বলুন
— আপনি কেন এমন পাগলামী করছেন? আজ হোক কাল হোক, বিয়ে তো আপনাকে করতেই হবে। ছেলেটাও তো পাত্র হিসেবে খারাপ না।
আসিফের দিকে এবার সোজাসুজি তাকালাম। বুঝলাম, এটাই প্ল্যান। এই কদিন ছেলেটার গুণগান করে আমাকে প্রেমে পড়ানোর প্ল্যান করছে। গ্রেট! বললাম
— আপনি নাকি ডিল করেছেন, তিন তারিখের মধ্যে আমি ইশতিয়াকের প্রেমে পড়ে যাব।
আসিফ এবার আমার দিকে সরাসরি তাকাল। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
— ইয়েস।
— অ্যান্ড ইউ থিঙ্ক, ইউ ক্যান ডু দ্যাট।
উত্তর না দিয়ে একটা স্মাইল দিল। এর মানে হচ্ছে, ‘আই হ্যাভ নো ডাউট ইন মাই মাইন্ড’। ঠান্ডা চোখে ছেলেটার দিকে এবার তাকালাম। জানতে চাইলাম
— গর্দান যাওয়ার ভয়ে আমি আপনার ‘ফল ইন লাভ উইথ হিম’য়ের প্রস্তাবে হ্যাঁ বলব, এই তো?
ছেলেটা কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, দিল না। পরিবর্তে অন্য একটা উত্তর দিল।
— তিন তারিখে উত্তরটা নিজেই পেয়ে যাবেন।
বুঝলাম, এই ব্যাটা আর কিছু বলবে না। চেষ্টাও করলাম না। ব্যাটার প্ল্যান না বুঝতে পারলে, খেলায় অংশ নেয়া যাচ্ছে না। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুধু বললাম
— আপনার আগের কেসগুলোর সাকসেস স্টোরি কেমন? আই মিন কতজনকে প্রেমে ফেলতে পেরেছেন?
হ্যান্ডসাম সাহব কথাগুলো শান্তভাবেই শুনল। এরপরে প্রশ্নভরা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল
— সবগুলো। কোন ফেইলিওর নেই। কেন?
— সেটা তিন তারিখে জেনে যাবেন।
হ্যান্ডসাম এবার আর উত্তর দিল না। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মনে হল, সেও চ্যালেঞ্জটা অ্যাকসেপ্ট করল। আমিও আর তর্ক বাড়ালাম না। আবার টপিক চেঞ্জ করলাম। বেশ স্বাভাবিকভাবে জানতে চাইলাম
— কি খাওয়াচ্ছেন আজকে দুপুরে?

চলবে

স্বয়ম্বরা (৮ম পর্ব)
রাজিয়া সুলতানা জেনি

একটা ব্যাপার বুঝে গেলাম, এই কটা দিন এখানেই থাকতে হচ্ছে। দ্যা অনলি অপশান অফ স্কেপ ইজ, বিয়ের দিন। হয়তো বিয়েটা করতে হবে। অ্যাট লিস্ট পেপার ম্যারেজটা সেরে ফেলার আগে, এই লোকের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার কোন সুযোগ দেখতে পাচ্ছি না। কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে এই ব্যাটার সাথে স্কোর সেটল করতে হবে। এই পাবলিক হয়তো ধরেই নিয়েছে বিয়ে হওয়া মানে স্বামীকে দেবতা ভাবব। বর যেমনই হোক, শত অত্যাচার করলেও, তাকে মেনে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেব। এখানেই মিস্টার ইশতিয়াক মিস অরিনকে চেনেনি।
মনের ভেতরে যতটা ঘৃণা কাজ করছে, তাতে মনে হচ্ছে এই লোককে ঠান্ডা মাথায় খুন করতে আমার একটুও হাত কাঁপবে না। আমাকে কিডন্যাপ করে যে এই ব্যাটা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে, এটা ওকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে ছাড়ব। অপেক্ষায় আমিও আছি। আসুক তেশরা মার্চ। ইনফ্যাক্ট ওকে কিভাবে শাস্তি দেব, সেটা নিয়ে আমি প্রতিদিনই ভাবছি। খুব ডেডলি কিছু খুঁজছি।
এর মধ্যে আসিফের সাথে বেশ ফ্রেন্ডলি একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে। একেক দিন একেক রেসিপি করছে। প্রতিটাই ডেলিসাস। সবকিছু বলার আগেই হয়ে যাচ্ছে। যেদিন যা খেতে মন চাইছে, দেখছি সেদিন সেটাই আইটেম। কোইনসিডেন্স? জানি না।
কিছু ব্যাপার রুটিনের মত হয়ে গেছে। সকাল আটটায় নাস্তা। দেন দুজনে মিলে লিভিং রুমে বসে কফি খাই। এরপরে প্রথমেই দেখে নিই বাবা কি করছেন। তারপরে কিছুক্ষণ টিভি দেখি। মাঝে একদিন ভিডিও গেম খেললাম। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইন্টারনেট পেতে পারি কি না। বললাম অনেকদিন ফেসবুক চেক করা হয় না। উত্তরে না সুচক জবাব পেলাম। কখন কাকে ম্যাসেজে জানিয়ে দিই, ‘আমি কিডন্যাপড’। রিস্ক নেয়ার কথা না। হ্যাঁ সুচক উত্তর অবশ্য আমি এক্সপেক্টও করিনি।
গত দুটো দিন এভাবেই হেসে খেলে কাটল। আজ সকালে মজার একটা ঘটনা ঘটল। সকালে এগারোটার দিকে। তখন কেবল ভিডিও গেম খেলা শেষ করেছি। খুব কফি খেতে ইচ্ছে করছিল। রান্নাঘরে আমার প্রবেশে ঠিক নিষেধ নেই, তবে কোন কাজ অ্যালাউ করছে না আসিফ। সেই ‘গেস্ট’ এক্সকিউজ। আসিফকে অর্ডার করতে মন চাইছে না। আচ্ছা, নিজের জন্য কিছু করতে চাইলে কি বারণ করবে? ভাবলাম নিজে গিয়েই বানাই।
উঠতে যাব, এমন সময় আসিফ নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল
— আমি করে দিচ্ছি।
অবাক হলাম। বুঝে উঠতে পারলাম না কি বোঝাতে চাইল। এমন না যে এই সময় আমি নিয়ম করে কফি খাই। আজকেই কেবল ইচ্ছে করেছে। সিসি টিভি ক্যামেরায় কি আমাকে লক্ষ্য করছিল? বাট…। আচ্ছা দেখিই না, ‘আমি করে দিচ্ছি’ বলতে কি বোঝাল।
অপেক্ষার পালা শেষ হল। দুকাপ কফি নিয়ে আসিফ লিভিং রুমে আসল। আজকে ও কালো একটা টিশার্ট পড়েছে। কেন যেন আজকে অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। কিডন্যাপার না হলে… দুর কি সব ভাবছি।
— ঠিক আছে?
আমার কফিতে চুমুক দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ছিল। চুমুকের পরে প্রশ্নটা করল। উত্তরে একটা মিষ্টি স্মাইল দিলাম। এরপরে ব্যাপারটা জানতে চাইলাম
— বুঝলেন কি করে, আমার এখন কফি খেতে ইচ্ছে করছে?
উত্তরে সেই কিলার স্মাইল। নাহ, এই ছেলে তো দেখছি ধীরে ধীরে মনে জায়গা করে নিচ্ছে। এরপরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
— কি ঠিক করলেন?
ছেলেটার দিকে এবার বেশ মনোযোগের দৃষ্টিতে তাকালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম ও কি ভাবছে। বুঝতে পারলাম না। তাই বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম
— কি ব্যাপারে?
— ইশতিয়াককে ভালবাসার ব্যাপারে
— সত্যি জানতে চান?
ছেলেটা কফির কাপে চুমুক দিল। এরপরে মাথা ওপর নিচে ঝুঁকিয়ে সম্মতি বোঝাল। বলল
— ইয়েস।
এবার আসিফের চোখে চোখ রেখে বললাম
— ঠিক করলাম, আপনার ক্লায়েন্টের কথা মত উনাকে তিন তারিখে আমি বিয়ে করব অ্যান্ড দেন, সেদিনই কমিউনিটি সেন্টারে, সবার সামনে ভদ্রলোককে আমি খুন করব। এরপরে আমার কি হবে, এনিয়ে আমি এই মুহুর্তে ভাবছি না।
নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না, তবে আমার ধারণা আমার চোখ দিয়ে তখন আগুন বেরোচ্ছিল। চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনল। কফিতে একটা চুমুক দিল। কিছুক্ষণ ভাবল। এরপরে বলল
— আপনাকে কিডন্যাপের কন্ট্রাক্টটা আমি কেন নিয়েছি জানেন?
এবার বেশ অবাক হলাম। নিজের অজান্তেই ভ্রু কুচকে গেল। আসিফের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অপেক্ষা করে আছি, কি বলে শোনার জন্য। পজটা একটু বেশিই নিচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, কথা গুছিয়ে নিচ্ছে। এবার মুখ তুলল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল
— আপনার জন্য।
আরেকটু হলে হাত থেকে কফির কাপটা পড়ে যাচ্ছিল। বলে কি এই ব্যাটা। আমার হতবাক মুখের দিকে তাকিয়ে আসিফ বাকী কথাগুলো বলা শুরু করল। গল্পটা খুব বিশ্বাস হল না। আবার অবিশ্বাসও হচ্ছে না। কথায় যুক্তি আছে। বাট… একটু বেশি মেলোড্রামাটিক। মনে অবশ্য তখন অন্য প্রশ্ন। জিজ্ঞেস করলাম
— ইশতিয়াকের সাথে পরিচয় কিভাবে?
কফিতে চুমুক দিল। এরপরে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল
— আপনার এই সো কলড প্রেমিক কাম ‘উড বি হাজব্যান্ড’ ছিলেন আমার প্রাক্তন কলিগ। আমেরিকায় একসাথে জব করতাম। একই সিকিউরিটি ফার্মে। হি অলসো ইজ অ্যা জিনিয়াস, লাইক মি। দারুণ সব সিকিউরিটি সফটওয়ার তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। বড় বড় অর্গানাইজেশান তাদের ডাটা সিকিউরড রাখতে আমাদের ফার্মকে হায়ার করা শুরু করে। দেখতে দেখতে ও টপে উঠে যায়। একসময় চাকরী ছেড়ে দিয়ে ফ্রি ল্যান্স কাজ শুরু করে। অ্যান্ড দেন… যাকে বলে লিটারালি টাকার পাহাড় গড়ে তোলে।
কথাগুলো সম্ভবতঃ বলছে আমাকে ইম্প্রেস করার জন্য। পার্ট অফ হিজ ডিল। তাই এই মুহুর্তে কোন কথাই বিশ্বাস করছি না। আর যেভাবে বাই ফোর্স আমাকে বিয়ে করার প্ল্যান ফেঁদেছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ প্রমাণিত হলেও, এই ছেলেকে আমি কোনদিন অ্যাকসেপ্ট করব না। তবে গল্পটা ইন্টেরেস্টিং। বাকীটা শুনতে ইচ্ছে করছে। বললাম
— তারপর?
— তারপর আপনার ইশতিয়াকের আর কোন গল্প নেই। আমার গল্প শুরু।
‘আপনার ইশতিয়াক’ কথাটা ইচ্ছে করেই বলল মনে হল। আমাকে ইরিটেট করার জন্য। এই মুহূর্তে কাহিনী থেকে সরতে চাইছি না। পরে স্কোর সেটল করব। আপাততঃ তাই চুপচাপ রাগটা গিলে ফেললাম। মুখে একটা স্মাইল টেনে জানতে চাইলাম
— বেশ, আপনারটাই শুনি। কি হল এরপরে?
— ঠিক সেই সময়ে, আমার ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে ছিল। ও চলে যাওয়ার পরে সফটওয়্যার ডিজাইনের চিফ আর্কিটেক্ট হই আমি। জিনিয়াস আমি নিজেও কম ছিলাম না। বাট… কেমন করে যেন ঠিক ব্যাটে বলে হচ্ছিল না। যেসব অ্যাসাইনমেন্ট পাচ্ছিলাম, কোন সফটওয়ারই রোবাস্ট হচ্ছিল না। হ্যাকার দিয়ে টেস্ট করতে গেলে দেখা যেত ওরা ক্র্যাক করে ফেলছে। একদিকে ইশতিয়াকের সাফল্য আর অন্যদিকে আমার ব্যার্থতা। একসময় ফিল করলাম সমস্ত ফ্রাস্ট্রেশান গিয়ে পড়ছে এই শালার ওপর। ঠিক করলাম, ওকে ডিস্ট্রয় করব। হ্যাকার হব। ওর তৈরী করা সফটওয়ার হ্যাক করব।
কখন যেন গল্পের ভেতরে ঢুকে গেলাম। বাকীটা জানতে মন চাইছে। গল্পটা গুছিয়ে নেয়ার জন্য আসিফের এই থেমে যাওয়াকে কিছুটা সময় দেয়া উচিৎ। অপেক্ষা করে আছি। বাট আসিফ সেই যে মাথা নীচু করেছে, আর উঠাবার নাম নেই। একেবারে চুপ। অস্থির লাগছে। বাকীটা কি বলবে না? গল্পটা জানতে চাইলে এই ব্যাটা আবার অন্য মিনিং বের করবে। কফিতে চুমুক দিলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পরে আসিফ চোখ তুলল। স্মাইল দিল, তবে এবার বেশ ম্লান। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বলে ফেললাম
— বাকীটা?
ও আবার বলতে শুরু করল
— হ্যাক করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, এই ফিল্ডে আমি রিয়েলি জিনিয়াস। ঠিক সেইসময় কিছু বাজে সঙ্গ জুটে গেল। ছোট খাট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা শুরু করলাম। ভাল ইনকাম হচ্ছিল। অ্যান্ড দেন একদিন হ্যাক করতে গেলাম, আপনার ইশতিয়াকের তৈরি করা সিকিউরিটি কোড।
— ধরা পরে গেলেন?
সম্মতি জানাল। বলল্ল
— ইয়েস। জেল হল। যখন বেরিয়ে আসলাম, তখন বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কি করব। আমার টিমের সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। জমানো টাকা দিয়ে চলছিলাম। একদিন আবিষ্কার করলাম পেছনে ফেউ লেগেছে।
— ইশতিয়াক লাগিয়েছে?
— না। এফবিআই। উইকিলিকসের পরে ওরা হ্যাকার দেখলেই পেছনে লাগে। ওদের ভয় আমি যদি আমেরিকার গোপন কোন নথি হ্যাক করি।
— তারপর?
— তারপর ওরা অফার দিল, প্রফেশান চেঞ্জ করতে। ট্রেনিং দিল। আন্ডারকাভার এজেন্টদের যেসব ট্রেনিং দেয় আর কি। জেমস বন্ড টাইপ। অ্যান্ড দেন, আমাকে ইমিউনিটি দিল। ছোটখাট ক্রাইম করতে পারি, ওরা ধরবে না। শর্ত শুধু একটাই…
— ওদের ওয়েবসাইট হ্যাক করবেন না।
আসিফ সম্মতি জানাল। আমি তখন উদগ্রীব, আমি কিভাবে আসলাম এই গল্পে, সেটা জানার জন্য। জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা।
— আমার কিডন্যাপিংয়ে কিভাবে ইনভল্ভ হলেন?
— এফবিআইয়ের অফার পেয়ে শুরু করলাম ছোটখাট ক্রাইম। দেখলাম সবচেয়ে লাভজনক হচ্ছে ছিনতাই আর কিডন্যাপিংয়ে। একে তো ধরা পড়ার ভয় নেই, অন্যদিকে একটা রিভলভার হলেই কাজ চলে যায়। হ্যাকিং তো জানিই, কাউকে টার্গেট করলে, ওর কম্পিটার হ্যাক করে সেই লোকের সেদিনের প্ল্যানিং জেনে নিতাম। দেখতে দেখতে বেশ দক্ষ কিডন্যাপার হয়ে উঠলাম। অ্যান্ড ওয়ান ডে, ইশতিয়াক কেম টু মি, উইথ ইয়োর পিকচার।
আবার আমার দিকে তাকাল। এবার আমার চোখে চোখ রেখে বলতে লাগল
— ইশতিয়াক যখন আপনার ছবি আমাকে দেখিয়ে বলল, একে কিডন্যাপ করতে হবে, আমি এক বাক্যে রাজী হয়ে গেলাম। যা শর্ত দিল সব মেনে নিলাম।
ব্যাপারটা ক্লিয়ার হল না। কি বোঝাতে চাইছে। আমার ছবি দেখে এই ডিলে রাজী হয়েছে মানে কি? কথাটা জানতে চাইলাম
— একটু এক্সপ্লেইন করবেন?
আসিফ এবার আমার দিকে তাকাল। বলল
— আপনার ছবি দেখে…
এরপরে আমার দিকে তাকাল। কেমন যেন একটা লাজুক টাইপ চাহনি। বলল
— লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। প্রেমে পড়ে গেলাম আপনার। বাট এটাও জানি… আপনার সাথে ম্যাচ মেকিং কোনভাবেই সম্ভব না। তবে অফারটা নিলে একটা প্রাপ্তি আছে। আর তা হচ্ছে আপনার সাথে এই ছটা দিন একসঙ্গে কাটাতে পারব।

চলবে।