হলুদ বসন্ত পর্ব-০১

0
16

#হলুদ_বসন্ত
#সূচনা_পর্ব
জাওয়াদ জামী জামী,

” এই ভর দুপুরে কোথায় যাচ্ছিস, অবনী? পেট ব্যথার অযুহাত দিয়ে স্কুলে গেলিনা। কিন্তু এখন ঠিকই নাচতে নাচতে বাহিরে যাচ্ছিস। কোথাও যাবিনা তুই। যা ঘরে গিয়ে পড়তে বস। স্কুলের সময়ও যেই পেরিয়ে গেছে, ঠিক তখনই তোর পেট ব্যথাও সেরে গেল। এমনভাবে অভিনয় চালিয়ে গেলে, তুই ভবিষ্যতে বড় মাপের অভিনেত্রী হতে পারবি। বংশের নাম রাখবি তুই-ই। ” অবনীকে বাহিরে যেতে দেখে ওর বড়মা নাজমা আক্তার চিৎকার করে বললেন।

” আমি নাচতে নাচতে যাচ্ছিনাতো, বড়মা। আমি হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। আজকাল তুমি কি চোখে কম দেখছ নাকি! বড় চাচাকে বলতে হবে তোমাকে চোখের ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে। এই বয়সেই যদি অন্ধ হয়ে যাও, তবে বিয়ের দিনে আমার জামাইয়ের গলায় সোনার চেইন পড়িয়ে দেবে কে? জামাইকে মিষ্টি খাওয়াবে কে? নাআআআ এটা হতে পারেনা। আমার বড়মা অন্ধ হতে পারেনা। ” নাটুকে ভঙ্গিতে বলল অবনী।

অবনীর নাটকীয় ভঙ্গি দেখে হেসে ফেললেন নাজমা আক্তার। এতক্ষণ অবনীর ওপর যতটুকু রেগেছিলেন, নিমেষেই তা উধাও হয়ে গেল।

” ঢঙ্গী মেয়ে, যা ঘরে যা। নাটক, সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দে। তোর রেজাল্ট দেখলে তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীর মৃত্যু ব্যক্তিরাও লজ্জায় আরেকবার মরে যাবে। যা ভাগ। ”

” ও বড়মা, একটু যাইনা। যাব আর আসব। রিশা আপুর সাথে একটু গল্প করেই চলে আসব। ”

” তুই পড়িস ক্লাস সিক্সে , আর রিশা পড়ে ক্লাস নাইনে। ওর সাথে তোর এত গল্প কিসের? গল্প করতে হয় সমবয়সীদের সাথে, সিনিয়রদের সাথে গল্প কিসের রে? ”

” আছে আছে। সেটা তুমি বুঝবেনা। আমি গেলাম হ্যাঁ? ”

কথাটা বলেই অবনী দৌড় দিল। নাজমা আক্তার শুধু দেখলেন। আর মনে মনে ভাবলেন, এই মেয়ে অলিম্পিকে গেলে দৌড়ে নিশ্চয়ই স্বর্ণপদক জিতবে।

***

” রিশাপু ও রিশাপু। তাড়াতাড়ি জানালা খুলে দাও। লাল পিঁপড়া কামড়ে আমার জান শেষ করে দিল। ” জানালায় মৃদু টোকা দিল অবনী।

একটু পরেই খুলে গেল জানালা। উঁকি দিল মিষ্টি মুখের একটা মেয়ে।

” এসেছিস? আমিতো ভেবেছিলাম তুই আসবিনা। ”

” আরেকটু হলেই ধরা খেতাম। তোমার শ্বাশুড়ি আমার আসা প্রায় বন্ধ করেই দিচ্ছিল। একটা দজ্জাল শ্বাশুড়ি জুটবে তোমার কপালে বুঝেছ? এই পিঁপড়া থাম, আর কামড়াসনা। এই বাচ্চা মেয়েটার ওপর একটুও দয়া হয়না তোদের? ” এক পা দিয়ে আরেক পা ঘষে বলল অবনী। এরপর আবার তাকাল রিশার দিকে৷

” খুব ভালো করেই জানো, আমি মাঝেমধ্যে এখানে এসে দাঁড়াই। প্রতিদিন পেছনে এসে পিঁপড়া মারা ঔষধ দিলে কি হয়? তোমার ডাকপিয়ন হতে গিয়ে আমাকে কতকিছু সহ্য করতে হয়, সেটা কি তুমি জানো? বিয়ে না হতেই গুরুত্ব দাওনা, বিয়ে হয়ে গেলে যে কি করবে সেটা আল্লাহই জানেন। ” গোমড়ামুখে বলল অবনী।

” আচ্ছা আচ্ছা, কালকে স্কুল থেকে ফেরার পথে পিঁপড়া মারা ঔষধ কিনব। দে এবার চিঠিটা। ” জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল রিশা।

অবনী এদিকওদিক তাকিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে রিশার হাতে দিল। রিশা চিঠিটা নিয়ে একটা চুমু দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।

” তাড়াতাড়ি কর। তোমার বাড়ির কেউ আমাকে এখানে দেখলে আমার খবর আছে। পরে চুমু খাওয়ার সময় পাবে। ”

একটু হেসে রিশা একটা নীল খাম ধরিয়ে দিল অবনীর হাতে।

” এটা লুকিয়ে রাখ। কেউ যেন না দেখে। চুপিচুপি তোর ভাইয়াকে দিবি। আর এই দশ টাকা ধর, চকলেট খাবি। ”

” টাকা লাগবেনা। আর প্রতিদিন এভাবে সাবধান করতে হবেনা। এক বছর ধরে তোমাদের ডাকপিওনের চাকরি করছি, একবারও ভুল হয়েছে? ”

” ভয় হয়, তাই সাবধান করি। টাকাটা নে। চকলেট খেতে খেতে বাড়ি যা। ”

টাকাটা নিয়েই দৌড় দিল অবনী। এই বাড়ির কেউ ওকে তাদের ত্রী-সীমানায় দেখলে গালি দিয়ে ওর ভূত ছাড়াবে।

***

” ধর তোমার চিঠি। প্রেম করবে তোমরা আর কষ্ট করব আমি। দশ টাকা দিয়েই তোমরা খালাস। কিন্তু আমি প্রতিদিন মশার কামড়, পিঁপড়ার কামড় খেয়েও নিজের দ্বায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছি। তারপরও একটু ভুল করলেই তুমি দুমদাম মারো আমাকে। ”

অবনীর মুখভঙ্গি দেখে হাসল ইশরাক। কিন্তু ওকে পাত্তা দিলনা। মেয়েটা যে নাটক বাজ সেটা ও জানে।

” তোকে এমনি এমনিই মারি আমি? পড়াশোনা করিস ঠিকমত? একটা অংক আজ সাতদিন থেকে করাচ্ছি, কিন্তু তোর মোটা মাথায় সেটা আজও ঢোকেনি। তোকে না মেরে কি মাথায় তুলে নাচব? ”

” আমি অংক বুঝিনা সেটা তোমার দোষ। তুমিই আমাকে বোঝাতে পারোনা। নিজের ব্যর্থতা আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছ! বাহ্ উপকারের এই প্রতিদান দিলে তুমি! দরকার নেই তোমার মত চাচাতো ভাই। দুনিয়াটা স্বার্থপর মানুষজন দিয়েই ভর্তি। ”

” কি বললি তুই? আমি তোকে বোঝাতে পারিনা? আমি সাদাফ আর অর্নিকেও পড়াই। ওরা সব সময়ই ক্লাসে প্রথম হয়। এখানে কার অবদান বেশি বলতে পারিস? ”

” কার আবার? সাদাফ, অর্নির। ওরা তো আর আমার মত সুন্দরী নয়। তাই ভালো করেই জানে পড়াশোনা ছাড়া গতি নেই। ”

” ফাজিল মেয়ে, তুই যাবি? তিন গুনতে গুনতে তুই বাহিরে না গেলে আজ তোর পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব আমি। ”

হুমকিতে কাজ হল। কথাটা শুনেই ভোঁ দৌড় দিল অবনী।

অবনী যেতেই ইশরাক দরজা বন্ধ করে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। খাম থেকে বের করল চিঠি। পরপর কয়েকটা চুমু দিল চিঠিতে। পরপর কয়েকবার পড়ল চিঠিটা।

***

” অবনী, ওঠ, মা। আর কতক্ষণ ঘুমাবি? এখন না উঠলে আজও স্কুলে যাওয়া হবেনা তোর। ”

” আমার মাথাটা ভিষণ ব্যথা করছে, মা। আজকেও বোধহয় স্কুলে যেতে পারবনা। তুমি একটু আমার চুলে বিলি কেটে দাওনা। ”

” এই তো, শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিনই একটা না একটা বাহানা তোর থাকেই। আজকে যদি স্কুলে না যাস, তবে তোর পড়াশোনা বন্ধ করে দেব আমি। ”

” সত্যিই, মা? আর পড়াশোনা করতে হবেনা আমার? বাঁচালে তুমি। পড়াশোনা করতে করতে হাঁপিয়ে গেছি। আর এসব ভালো লাগেনা। ”

মেয়ের এহেন দুঃসাহসিক কথা শুনে রেগে উঠলেন মিনারা খাতুন।

” পড়াশোনা না করলে কি করে খাবি? তোর বাপের কি দশ বিঘা জমি আছে নাকি লাখ টাকা ব্যাংকে জমা আছে? নিজের কপাল নিজেকেই গড়ে নিতে হবে, বুঝেছিস? আমি দিনরাত তোদের চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকি। আর তোরা আমাকে পাগল বানানোর জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকিস। বেয়াদব মেয়ে জন্ম দিয়েছি আমি। ”

” কি হয়েছে, চাচী? এত রাগারাগি করছ কার সাথে? ” ইশরাক ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল।

” কার সাথে আবার? এই যে নবাবের কন্যার সাথে। তিনি নাকি পড়াশোনা করতে করতে হাঁপিয়ে গেছেন। আজকেও তার নাকি মাথা ব্যথা করছে। ইশু, তুই তো এই মেয়েকে একটু শায়েস্তা করতে পারিস? তুই ওকে শাসন করলে আব্বা তোকে কিছুই বলবেননা। আমি কিছু বললেই তো তিনি রাগ দেখান। ”

” তুমি গিয়ে ওর জন্য খাবার রেডি কর। ও দশ মিনিটের মধ্যেই যাচ্ছে। ”

ইশরাকের কথার ওপর আস্থা রেখেই মিনারা খাতুন রান্নাঘরে গেলেন।

” এ্যাহ্ উপদেষ্টা এসেছে। সে বলবে আর আমি খেতে যাব। জীবনেও না। ”

” যাবিনা? ”

” নাহ্। ”

ইশরাক এদিক-ওদিক তাকিয়ে টেবিল থেকে একটা কাঠের স্কেল নিয়ে অবনীর বাহুতে দু ঘা বসিয়ে দিল। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল অবনী।

” ইশরাকের বাচ্চা, তুই আমাকে মারলি কেন? বড়মাকে আমি বলে দেব, তুই রিশাপুকে চিঠি লিখিস। বাড়মাকে দিয়ে তোর বারোটা বাজাব আমি। ” কাঁদতে কাঁদতে বলল অবনী।

অবনীর মুখে এমন কথা শুনে ইশরাকের রাগ আরও বেড়ে গেল। ফলশ্রুতিতে আরও কয়েকটা স্কেলের বারি পরল অবনীর পিঠে।

” কি করবি? মাকে বলবি? এত সাহস তোর? যা বল। দেখবি তোর কি অবস্থা করি আমি। ”

ইশরাকের রাগী চেহারা দেখে ভয় পেল অবনী। সুড়সুড় করে বিছানা থেকে নেমে গেল।

চলবে।