#হলুদ_বসন্ত
#পার্ট_২
জাওয়াদ জামী জামী
” অবনী, দিদি ভাই, একটু শুনে যাও তো। ”
দাদুর ডাক শুনে লাফাতে লাফাতে দাদুর ঘরে গেল অবনী।
” বল, দাদু। ডাকছিলে কেন? ”
” আগে বল পড়াশোনা কেমন হচ্ছে? আর তোমার শরীর আজকে ভালো আছে? ”
” পড়াশোনার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে আমি ভালোই আছি, দাদু। আমি অনেক গবেষণা করে দেখেলাম, বেশি পড়াশোনা করলেও জীবনে বড় হওয়া যায়না, টাকাপয়সা পাওয়া যায়না। বড় হতে হলে, এবং ধনী হতে গেলে লাগে পরিশ্রম। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পড়াশোনা না করে মায়ের সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে কাজ করব। ভালো হবেনা, দাদু? ”
” এই কুবুদ্ধি তোর মাথায় কিভাবে আসল, দিদি ভাই? পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করলে কোন ক্ষতি নেই। জীবনে সম্মান পেতে গেলে পড়াশোনা শিখতে হয়, ভালো রেজাল্ট করতে হয়। এটা পরিক্ষিত। ”
” যে এটা পরিক্ষা করে বের করেছে, সে নিজে অবশ্যই অশিক্ষিত ছিল। পড়াশোনাই যদি জীবনে সব হবে, তাহলে আমার বাবা এম এ পাশ করে কামলা দিতনা। সারাক্ষণ টাকার চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকতনা। বাজার করার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতোনা। ”
নাতনীর কথাগুলো শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বৃদ্ধ আব্দুর রহিম। তার ছোট ছেলের এমন করুন অবস্থার জন্য তিনি নিজেকেই দায়ী করেন সর্বদা। তারই ভুলে আজ ছেলেটা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায়। লজ্জায় ছেলের মুখোমুখি হতে পারেননা তিনি। অবশ্য এসব নিয়ে ছেলে কোনদিনই অভিযোগ জানায়নি। কিংবা পিতাকে কখনোই ঘৃণা করেনি।
” ও দাদু, ডেকেছ কেন বলতো? ”
” এদিকে এস। এই আপেল দুটো রাখ। দু বোন মিলে খেও কেমন? তোমার বড় ফুপু কালকে আমার জন্য এক কেজি আপেল কিনে পাঠিয়েছে। ইশু আর সাদাফ দাদু ভাইকে দু’টো দিয়েছি, দু’টো তোমাদের জন্য রেখেছি। ”
আপেল নিতে ইতস্তত করছে অবনী। সেটা বুঝতে পেরে দাদু ওর হাতে জোড় করে গুঁজে দিলেন।
” লুকাইয়া লুকাইয়া ঐ ছেমরিরে কি দিতাছ, শুনি? এই ছেমরিও যেমন লোভী, তুমিও তেমনি দয়াবান। কাইন্দা-কাইটা চাইতাছে আর তুমি আপেলগুলান দিয়াও দিতাছ? এই ছেমরি আর ওর বইনে আমার সংসারডার উন্নতি হবার দিলনা। ” হুট করেই ঘরে আসলেন কুলসুম বেগম। অবনীর হাত থেকে আপেল দুটো নিয়ে নিজের আঁচলে রাখলেন।
দাদির মুখে এমন অপমানজনক কথা শুনে লজ্জায়, অপমানে চোখে পানি আসল অবনীর। ও তো দাদুর কাছ থেকে চায়নি। তবুও কেন দাদী ওকে এভাবে কথা শোনাল? অবনী বুঝতে পারে দাদী ওদের পরিবারের চারজনকে একটুও পছন্দ করেনা। সারাক্ষণ শুধু কটুকথা শোনায়। তবুও ওর মা কখনোই দাদীর কথায় মন খারাপ করেনা৷
” আমি দাদুর কাছ থেকে আপেলগুলো চাইনি, দাদী। দাদুই আমাকে জোর করে দিল। ”
” দাদু দিল, আর তুই নিয়া নিলি? ফইন্নী ছেমড়ি। খাওন দেখলেই খালি জিবলাডা লকলকায়? তর জিবলায় ঝামা ঘইষা দিমু। তখন খাইস জনমের লাইগ্যা। ”
” কুলসুম, অনেক বলেছ তুমি। আমার সামনে আমার নাতনীকে অপমান করার সাহস কোথায় পাও তুমি? তোমার বয়স হয়েছে, যখন-তখন মরতে পার, এই চিন্তা তোমার মনে কখনো আসেনা? এত পাপ রাখবে কোথায়? ” খেঁকিয়ে উঠলেন আব্দুর রহিম।
” থাম তুমি। আমার পাপের হিসাব করন লাগতোনা। নিজের পাপগুলা হিসাব কইরা রাইখো, তাইলেই হইব। আমার সাথে যেই অন্যায়ডা করছো, তাই লাইগ্যা হাশরের ময়দানে তোমারে আমি আটকামু। তখন হিসাব দিবার পারবা? আমার কাছে সাধু সাইজা লাভ নাই। পোড়ামুখা মিনসে আমার থাইকা ভালো কেউ তোমারে চিনেনা। ” কুলসুম বেগমের বিষ বাক্যগুলো আব্দুর রহিমের কলিজায় আঘাত করল। তিনি কেঁদে ফেললেন।
অবনী এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাদীর কথা শুনছিল। দাদুকে কাঁদতে দেখে ওর কষ্ট হল। কিন্তু দাদীর ভয়ে দাদুর কাছে যাওয়ার সাহস হলোনা। এক পা দু পা করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘর থেকে বেরিয়েই ধাক্কা খেল ইশরাকের সাথে।
” চোখ দু’টো খুলে রেখে হাঁটিস নাকি? কিসের এত ছটফটানি? ”
ইশরাকের কটুক্তি শুনেও না শোনার ভান করে নিজের বাড়ির দিকে গেল অবনী। মাকে দাদীর বলা কথাগুলো বলল। সব শুনেও মিনারা খাতুন কোন প্রত্যত্তর করলেননা। শুধু নীরবে আঁচলে চোখ মুছলেন।
***
” অবনী মা, বাড়িতে আছিস? ” রাতে বাড়িতে ঢুকেই ইসহাক আজাদ গেলেন ছোট ভাইয়ের বাড়িতে।
বড় চাচাকে দেখে অবনী হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে গেল।
” চাচা, তুমি! ”
” তোর সাথে গল্প করতে এলাম। ”
” গল্প করতে এসেছ ভালো কথা। কিন্তু পড়াশোনার কথা যেন বলোনা আবার? ঐটা ছাড়া সব বিষয়েই গল্প করতে রাজি আমি। ”
” সারাজীবন কলেজে ছাত্রছাত্রী পড়িয়েছি। কিন্তু তোর মত পড়া চোর জীবনে একটাও দেখিনি। এটা আমার জন্য কত লজ্জার সেটা কি জানিস? ”
চাচার কথায় মুখ কাঁচুমাচু করল অবনী।
” বড় ভাই, আপনি বসেন। দু’টো রুটি নিয়ে এসেছি, খেয়ে যাবেন। ওর সাথে কথা বলে মাথা নষ্ট করার কোন দরকার নেই। ” মিনারা খাতুন বড় ভাসুরকে বসতে চেয়ার দিলেন।
” ঠিকই বলেছ তুমি। একে বোঝানো আর গাধা পিটিয়ে মানুষ করা একই কাজ। এই যে ধর আপেল আর কমলা এনেছি আমার দুই মায়ের জন্য। এগুলো খেয়েও যদি ওদের বুদ্ধি একটু খোলে। ”
মিনারা খাতুন এতক্ষণে তাদের ঘরে বড় ভাসুরের আসার হেতু বুঝতে পারলেন। দুপুরের ঘটনা নিশ্চয়ই কোননা কোনভাবে তার কানে গেছে। আর ভাতিজীর মন ভালো করতেই তিনি ফলগুলো এনেছেন। কৃতজ্ঞতায় ছেয়ে গেল মিনারা খাতুনের মন। তিনি ভাসুরের হাত থেকে ফলের প্যাকেট নিলেন। কারন দয়ালু এই মানুষটার আনা কোন জিনিস ফেরৎ দেয়ার সাধ্য তার নেই। ফলের প্যাকেট টেবিলে রেখে রান্নাঘরে গেলেন তিনি। দুটো মিষ্টি রেখেছিলেন স্বামীর জন্য, সেটাই ভাসুরের জন্য আনতে গেছেন। ছোট ভাইয়ের বাড়িতে পেটপুরে রুটি খেয়ে, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে নিজের বাড়িতে গেলেন তিনি।
” মা, বড় চাচা কি আমাকে বলা দাদীর কথাগুলো শুনেছে? সেজন্যই সে ফলগুলো এনেছে তাইনা, মা? ” মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল অবনী।
” তোর চাচা এগুলো তোদের ভালোবেসে এনেছেন। বড়দের ভালোবাসা নিয়ে কোন প্রশ্ন করতে নেই, মা। মনে থাকবে? তোরা বস আমি আপেল কেটে নিয়ে আসি। ”
মিনারা খাতুন সব সময়ই ঝগড়াবিবাদ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। শ্বাশুড়ি তাকে হাজার কটুকথা বললেও তিনি চুপচাপ সবকিছু শুনে যান। কখনোই কোন প্রত্যুত্তর করেননা। কারন তিনি সম্পর্কের মারপ্যাঁচ বোঝেন। সেই সাথে এটাও বোঝেন, দুনিয়ায় যার অর্থ নেই, সে-ই সবার কাছে করুনার পাত্র। সবাই তাকে নির্দিধায় ব্যবহার করে। তার স্বামীর অর্থ নেই, কাজেই নিশ্চুপ থাকাটাই তার জন্য সম্মানের।
***
” অবনী, এদিকে আয়। ” ইশরাকের ডাকে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় অবনী।
” ডাকছ কেন, ভাইয়া? ”
” আজ থেকে প্রতিদিনই আমরা একটু আগেই স্কুলের জন্য বেরিয়ে যাব, বুঝলি? আমরা বাজারে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াব। রিশা আসলে একসাথে অটোরিকশায় চলে যাব? ”
অবনী, অর্নি, রিশা ওরা জেলা গার্লস স্কুলে পড়ে। ইশরাক আর সাদাফ পড়ে বয়েজ স্কুলে। ওরা একসাথেই স্কুলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে যায়। ইশরাক আর সাদাফ অবনী, অর্নিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের স্কুলে যায়। প্রায়দিনই ওদের সাথে রিশাও যায়। তবে মাঝেমধ্যে অটোরিকশা বুক হয়ে গেলে রিশা অন্য অটোতে করে যায়। রিশাকে নিজেদের অটোতে নেয়ার জন্যই প্ল্যান করেছে ইশরাক।
” কত বুদ্ধি তোমার! সব বুদ্ধিগুলো রিশাপুর জন্য খরচ করলে আমাকে অংক শেখাবে আর কিভাবে? এজন্যই সাতদিন ধরে হাজার চেষ্টা করেও একটা অংক বুঝতে পারিনা। আসলে তোমার বুদ্ধি একটু একটু করে ক্ষয় হয়ে গেছে। সেজন্যই আমাকে ঠিকঠাক মত অংক বোঝাতে পারনা। কিন্তু দোষ হয় আমার। আমি নাকি অংক বুঝিনা! ”
অবনীর কথায় রাগে ইশরাকের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। ইচ্ছে করছে অবনীর মাথায় কয়েকটা গাট্টি মারতে। কিন্তু উঠানে মা আছে, তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল।
” উঠানে মা আছে, তাই বেঁচে গেলি। নইলে আজ তোর মাথায় শিং গজাতে সাহায্য করতাম। ”
” অবনী, ঐ অবনী, তুই আজকে স্কুলে যাবিনা? নাকি আজকেও তোর পেটে ব্যথা করছে? ” সাদাফ এসে পরায় ইশরাক আর কিছুই বললনা।
” ঐ সাদাইফ্যা, আমার পেট, ব্যথা করলে আমার করবে। তাতে তোর কি? তোর এত জ্বলে কেন? আমার স্কুলে কি তুই যাবি? আমার ক্লাস কি তুই করবি? ”
” অবনীর বাচ্চা, আমি তোর এক বছরের বড়। আমাকে ‘ তুই ‘ বলবিনা বলে দিচ্ছি। আর একবার আমাকে ‘ তুই ‘ বললে তোর মুখে আমি কালি ঢেলে দেব। তখন কালো মুখ আর কাউকে দেখাতে পারবিনা। ”
” একশোবার ‘ তুই ‘ বলব, হাজারবার ‘ তুই ‘ বলব। পারলে কিছু করিস। ‘ তুই ‘ ‘ তুই ‘ ‘ তুই ‘। সাদাইফ্যা ‘ তুই ‘ ‘ তুই ‘ ‘ তুই ‘। ”
অবনীর ড্যামকেয়ার ভাব দেখে রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলল সাদাফ। অবনীকে মারতে ওর দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু উল্টো অবনী ওর পিঠে দু ঘা বসিয়ে দিয়ে এক ছুটে ঘরে গেল। এদিকে সাদাফ উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছে।
” সাদাফ, কাঁদছিস কেন? ” ছেলের কান্না শুনে দৌড়ে আসলেন নাজমা আক্তার। ওর মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন।
” ঐ অবনীর বাচ্চা আমাকে মেরেছে। আবার আমাকে ‘ তুই ‘ ও বলেছে। ও কিন্তু আমাকে খুব বেশি জ্বালায়? আমি যে ওর বড় ভাই সেটা মানতেই চায়না। ” কেঁদে কেঁদে মাকে অভিযোগ জানাল সাদাফ।
” ও তোর ছোট বোন। তোর ছোট তার মানে বুদ্ধিও কম। ছোট মানুষ না বুঝে অনেককিছুই করে। এগুলো ধরলে চলে? চল খেয়ে নিবি। ”
মায়ের কথাগুলো টনিকের মতই কাজ করল। থেমে গেল সাদাফের কান্না। বাধ্য ছেলের মত মায়ের পিছুপিছু ঘরে গেল।
চলবে…