#হলুদ_বসন্ত
#পার্ট_৪
জাওয়াদ জামী জামী
” অবনী, নগেন কাকার বাগানে যাবি নাকি আজ রাতে? বারোমাসি আম দেখলাম কাকার বাগানে। পেকে লাল হয়ে আছে। ”
সাদাফের কথা শুনে খুশিতে লাফিয়ে উঠল অবনী। সশব্দে ঢোক গিলল।
” সত্যিই যাবে? আমিও কালকে কাকার বাগানে পাকা পাকা আম দেখেছি। ভেবেছিলাম তোমার সাথে গিয়ে কয়েকটা নিজের মনে করে নিয়ে আসব। ”
” রাতে জেগে থাকিস। বারোটার পর আমি আসব। অর্নিকেও সাথে নিস। তাহলে বেশি করে নিতে পারবি। ”
” আচ্ছা। ”
রাত বারোটা পঁচিশে অবনীর ঘরের জানালায় টোকা দিল সাদাফ। অবনী, অর্নি দু বোনই জেগে ছিল। সাদাফের সংকেত পেতেই তারা পা টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আসল।
” ব্যাগ নিয়েছিস? ” সাদাফ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
” হুম। দুইটা। এবার চল। ”
***
নগেন কাকার বাগানের কাছে গিয়ে ওরা দেখল, বাগানের ভেতরের ছাউনিটায় টিমটিমে আলো জ্বলছে। বিস্ময়ে ওরা তিনজন একে-অপরের মুখপানে চাইল। এত রাতে ওরা বাগানে কাউকে আশা করেনি।
” এটা কি হলো? ছাউনিতে কেউ আছে। ” সাদাফ হতাশ গলায় বলল।
” এখন কি করব রে, সাদাইফ্যা? আম না নিয়ে আমি বাড়িতে যাবইনা। ”
” খবরদার আমার নাম ধরে ডাকবিনা। আমি তোর বড় ভাই। ” নিচু গলায় অবনীকে ধমক দিল সাদাফ।
” তোমরা ঝগড়া থামাবে? যখনই দু’জন একসাথে হও , তখনই তোমাদের ঝগড়া শুরু হয়ে যায়। ঝগড়া না করে আম কিভাবে নিবে সেই চিন্তা কর। ” অর্নি ফিসফিসিয়ে দু’জনকেই সাবধান করে দিল।
” তোর বোনকে সেকথা বোঝা। ”
” আমার কাছে একটা প্ল্যান আছে। ” হঠাৎ অবনী বলল।
” কি? ”
” তুমি অর্নিকে নিয়ে পুকুরের ওইপাশে গিয়ে দাঁড়াও। বাকিটা আমি দেখছি। আমি পুকুরের মাঝখানে ঢিল ছুঁড়লেই তুমি অর্নিকে নিয়ে চলে আসবে। ”
” কি করতে চাচ্ছিস তুই? ধরা পরলে কিন্তু তিনজনেরই খবর আছে। ”
” আমাকে তোমার এতই বোকা মনে হয়? কথা না বলে অর্নিকে নিয়ে পুকুরের ঐপাশে গিয়ে দাঁড়াও। ”
” যা করবার সাবধানে করবি। ”
সাদাফ অর্নিকে নিয়ে চলে যেতেই, অবনী বাগানের ভেতরে একটা মোটা গাছের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্ধকারে হাতড়ে তুলে নেয় কয়েকটা ঢিল। এরপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছাউনিতে ঢিল ছুঁড়ল। পরপর কয়েকটা ঢিল ছুঁড়ল ছাউনি লক্ষ্য করে।
একটু পরেই ছাউনি থেকে হাতে টর্চ বেরিয়ে আসল নগেন ভট্টাচার্য।
” কেডায় রে? ঢেল মারতাছে ক্যাডায়? ” হাঁক ছেড়ে জিজ্ঞেস করল নগেন ভট্টাচার্য।
নগেন কাকাকে বেরিয়ে আসতে দেখে অবনী গাছের আড়ালে চলে গেল। এরপর সেখান থেকেই নাকিস্বরে বলে উঠল,
” ক্যাডায় আইছস? নগেন ভট্টাচার্যী নাকি? আহারে বাছার তরে কত বছর দেখিনা। কাছে আয় বাছা, দুই নয়ন ভইরা তরে দেইখ্যা নেই। ”
গভীর রাতে বাগানের মাঝে এরূপ অচেনা গলা শুনে ভিষণ চমকায় নগেন ভট্টাচার্য। সে হাতে থাকা টর্চ দিয়ে পুরো বাগান দেখে নিল। কিন্তু অবনী মোটা গাছের আড়ালে থাকায় ওকে দেখতে পেলোনা। সুযোগ বুঝে অবনী একটা ঢিল ছুঁড়ল নগেন কাকার পেছনে। নগেন ভট্টাচার্য চমকে পেছনে তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলনা।
“ক..ক.. ক্যাডায়? ক্যাডায় কথা কয়? সামনে আহোনা ক্যা? ” ফ্যাসফেসে গলায় জিজ্ঞেস করল নগেন ভট্টাচার্য।
” একি কতা! আমারে চিস নাই! আমি তোর শান্তি পিসি রে হতচ্ছাড়া। ছুডুকালে সারাদিন আমার কোলে চইড়া বইসা থাকতি, তর মনে নাই? দিনরাত আমার কোলে পেশাব-পায়খানা কইরা ভাসায় দিতি, সেকথা ভুইল্যা গেছস মুখপোড়া? আমি মরছি পঁয়তিরিশ বছর হইছে। এই পঁয়তিরিশ বছরেই আমারে ভুইল্যা গেছস? ছুডুকালে একবার আমার হাতে রাক্ষসের লাহান কামড় দিয়া মাংস সুদ্ধা তুইল্যা নিছিলি, মন আছে তর? ” কথাগুলো বলেই অবনী উঁকি দিল গাছের আড়াল থেকে। হালকা আলোয় নগেন কাকাকে কাঁপতে দেখল।
” ও পিসি, এত বছর পর তুমি ক্যান আইছো? এই রাইত-বিরাতে আইসা আমারে ডর দেখাইতাছো ক্যান? আমি তোমার কি ক্ষতি করছি? ” কান্না জড়িত গলায় জিজ্ঞেস করল নগেন ভট্টাচার্য।
” ক্ষেতি করসনাই, হারামজাদা? কামড় দিয়া যে হাতের মাংস তুইল্যা নিছিলি এইডা ক্ষেতি নয়? এই যে এতবড় বাগানডায় কত আম, লিচু, কাঁটাল, খেজুর ধরে, সেইগুলান একাই গিলিস। আমার নাতি-নাতনিদের কথা তর মনে হয়না? বাবা এই বাগানডা আমারে দিবার চাইছিল, কিন্তু তর মুখপোড়া বাপ হরেন ভট্টাচায্যি আমারে দিবার দেয়নাই। হেয় চুরি কইরা লেইখ্যা নিল। বাঁইচ্যা থাকতে আর বাপের বাড়ির মুখ আমি চখে দেখবার পারিনাই। তুইও কুনদিন খোঁজ নিস নাই আমার হতভাগ্য পিসিমা কিমুন আছে। সারাজীবন আমার সম্পত্তি ভোগদখল কইরা গেছস বাপ-ব্যাটা মিল্ল্যা। এখন আবার বাগান পাহারা দিতাছস? পাড়ার পোলাপান নাহয় দুই-চাইরডা ফল খায়। তা-ও তর সহ্য হয়না? কেপ্পনের ঘরের কেপ্পন। দে এইবার আমার সম্পত্তি আমারে ফিরায় দে। ” নাকি গলা হিসহিসিয়ে বলল।
সব শুনে নগেন ভট্টাচার্যের শ্বাসকষ্ট শুরু হল। তার পিসিমা ভুল কিছুই বলেনি। সত্যিই তার বাবা পিসিমাকে ঠকিয়েছিল। পরে সে-ও পিসিমার কোন খোঁজ রাখেনি। পিসিমার সম্পত্তি নিজের মনে করে ভোগ করছে এতগুলো বছর ধরে।
” তু..তুমি কি চাও, পিসিমা? ক্যান আইছো এত রাইতে? ”
” তর কলিজা ইকটু খাইয়া দেখবার চাই। দিবি নাকি খাইতে? ”
” এ কি কথা কইতাছ, পিসিমা? এইডা হয় নাকি? ”
” ক্যান হইবনা? আমার সম্পত্তি ভোগদখল কইরা নিজের সম্পত্তি, ট্যাকাপয়সা বাড়াইছস। আর আমি তোর কলিজা খাইবার চাইলেই যত দোষ আমার? ঐখানেই খাঁড়ায় থাক, আমি আইতাছি। ”
অবনী আরও একবার উঁকি দিয়ে দেখল নগেন কাকা একমনে রাম নাম জপ করছে। একপর্যায়ে সে বাবাগো বলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাগান থেকে। নগেন ভট্টাচার্য যাওয়ার পরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল অবনী। এরপর পুকুরের মাঝখানে ঢিল ছুঁড়ল। ওর পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে রাখল।
একটু পরই অর্নিকে নিয়ে বাগানে ঢুকল সাদাফ।
***
” বড়মা, ও বড়মা? ”
” কি রে ছেমরি, এক চিল্লাইতাছস ক্যান? তর গলায় কি মাইক লাগান রইছে? এত তেজ ক্যান? ”
দাদির খোঁচা মারা কথা শুনে তার দিকে হাসিমুখে তাকায় অবনী।
” আমার গলায় মাইক লাগানো থাকুক, আর চোখে ক্যামেরা লাগানো থাকুক, এতে তোমার কি সমস্যা? আমিতো আর তোমার কাছ থেকে গলা ধার চাইনি। বাবার টাকায় খাই, নিজের গলায় কথা বলি, তাও তোমার সমস্যা? এত সমস্যা নিয়ে বেঁচে আছ কিভাবে? ”
” কি কইলি তুই? আমি বাঁইচা আছি দেইখ্যা তর কলিজায় আগুন লাগছে? আমি মরলে বুইড়ার সম্পত্তি দখল করবার পারবি, বুইড়ার সম্পত্তি দিয়া ফুটানি দেখাইতে পারবি। বাপের জন্মে যেইগুলান করবার পারিস নাই, সেইগুলান করবি। ভাবছস আমি এইগুলান হবার দিমু? আমি সম্পত্তি কুত্তা দিয়া খাওয়ামু, তা-ও তর বাপেরে দিমুনা। তাই বেশি আশা করিসনা। ”
” তোমার সম্পত্তির মুখে থুতু মারি আমরা। তোমার বুইড়ার সম্পত্তি ধুয়ে তুমিই পানি খাও। পারলে মরার পরেও সাথে করে নিয়ে যেও সেগুলো। এমন ভাব কর, মানুষ শুনলে মনে করবে, বাপেরবড়ি থেকে নিয়ে এসেছো সব সম্পত্তি। এদিকে শুনেছি, তোমার বাপের বাড়ির লোকজন ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দার। জমিদারের মেয়ে হলেনা কি করতে, সেটা ভেবেই মাঝেমধ্যে রাতে আমার ঘুম হয়না। ”
” কি কইলি তুই? আমার বাপের বাড়ি নিয়া কথা কস? তোর থোবড়া আমি ভাইঙ্গা ফালামু। যত বড় থোবড়া না, তত বড় কথা! আপদের মুখ দেখবার ইচ্ছা করেনা। তা-ও আপদ দিনে রাইতে আমার পোলার বাড়িতে আইসা ঘুরঘুর করে। লজ্জার মাথা বেঁইচ্যা খাইছে দামড়ি ছেড়ি। এরে বিয়া করব কোন বাপের পোলায়। ”
” আমার বিয়ে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবেনা। আমাকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য আমার বাবাই যথেষ্ট। আমি দামড়ি হই, আর কচি হই সেটা চিন্তা করার জন্য আমার বাবা-মা আছে। তুমি অযথা চিন্তা করে হার্টঅ্যাটাক করোনা। হার্টঅ্যাটাক করে বিছানায় শুয়ে থাকলে শেষে দেখা যাবে, শরীরে ঘা হয়েছে। তোমাকে দেখবার জন্য ছেলের বউ ছাড়া অন্য কেউই থাকবেনা। আর আমরাও চাইবনা তোমার জন্য বড়মা খেটে খেটে মরুক। এমনিতেই তার হাড়মাস জ্বালিয়ে খাচ্ছ তুমি। ”
অবনীর শেষের কথা শুনে রাগে ছ্যাৎ করে উঠল কুলসুম বেগম। সে কঠিন শোনানোর জন্য মুখ খুলল। কিন্তু তার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অবনী। আজকে এতটুকুই থাক। দাদীর কলিজায় আগুন জ্বালাতে এতটুকুই যথেষ্ট। আজকে সারাদিন দাদী ওদেরকে গালিগালাজ করেই কাটাবে। এতে তার শরীর, মন দুইটাই ভালো থাকবে। অবনী যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছে, ওদেরকে কথা শুনালে , গালি দিলে , অপমান করলে দাদী খোশমেজাজে থাকে। সেদিন থেকেই ও দাদীকে উস্কে দেয়, প্ররোচিত করে।
***
” চুমকি চলেছে একা পথে
সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে?
হার মেনেছে চাঁদের আলো
হাসলে তোমায় লাগে আরো ভালো। ”
ফাটা বাঁশের মত গলার গান শুনে পা থেমে গেল অবনীর। রিশাপুর বাড়িতে যাচ্ছিল তার সাথে দেখা করতে। অর্নির মুখে শুনেছে গতকাল সন্ধ্যায় রিশাপু বাড়িতে এসেছে। রিশাপুর বাড়ির সামনে যেতেই ওর কানে আসল ফাটা বাঁশের গলার আওয়াজ। ঘাড় ঘোরাতেই দেখল রাকিব আর ওর সঙ্গীরা বসে আছে চায়ের দোকানে। ওদেরকে পাত্তা না দিয়ে পা বাড়াল অবনী।
” ও সুন্দরী, যাও কোথায়? ” রাকিব চিল্লিয়ে বলল।
তবুও নিরুত্তর থাকল অবনী। কিন্তু রাকিব থেমে থাকবার পাত্র নয়। সে অবনীকে বিরক্ত করার পরিকল্পনা করেছে।
” অবনীর হাসি বাঁধ ভেঙেছে,
উছলে পরে আলো।
ও অবনী রানী তোমার ভালোবাসা ঢালো,
ঢালো আমার বুকে ঢালো। ”
এবার অবনী এগিয়ে গেল রাকিবের দিকে।
” আমার মুখের ভেতর কি নদী আছে, যে নদীর বাঁধ ভাঙ্গবে? তোর বুক কেন ভালোবাসা ঢালতে যাব? তুই পুরো মানুষটাই ময়লার গোডাউন। আমি আমার দামী ভালোবাসা কোন ময়লার গোডাউনে ফেলব বলে কেন মনে হল তোর? তোর মত ময়লার গোডাউনের শরীরে শোভা পায় দুনিয়ার সকল জীবের বিষ্ঠা, থুতু আরও দুগর্ন্ধ জিনিসপত্র। কিরে দেবো নাকি থুতু? ”
অবনীর কথা শুনে লজ্জায়-অপমানে রাকিবের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল। আশেপাশের সবাই অবনীর কথা শুনে হাসছে। ও ভেবেছিল, গান গেয়ে অবনীকে টিজ করতে পারবে, সবার সামনে লজ্জা পাবে অবনী। কিন্তু উল্টো অবনী ওকে সবার সামনে লজ্জায় ফেলল। সবাইকে হাসতে দেখে মুখ কালো করে চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে গেল রাকিব।
চলবে…