হলুদ বসন্ত পর্ব-০৫

0
16

#হলুদ_বসন্ত
#পার্ট_পাঁচ
জাওয়াদ জামী জামী

” রিশাপু, তুমি আগের থেকেও বেশি সুন্দর হয়ে গেছ। আগের তুমির সাথে বর্তমানের তুমির আকাশপাতাল তফাৎ। আচ্ছা, তুমি যে গ্রামে এসেছ ভাইয়া জানে? ”

অবনীর কথায় মৃদু হাসল রিশা।

” আমি বাড়িতে আসার আগে তোর ভাইয়াকে জানিয়েছি। এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দে। তোর ভাইয়াকে জানিয়েই তবে গ্রামে আসতে হবে কেন? আমি কি সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা? ”

” এভাবে বলোনা। তোমাদের সম্পর্ক কত বছরের বলতো? আমার জানামতে, তুমি শুরু থেকেই ভাইয়ার সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব কাজ করেছ। বুয়েটে চান্স না পাওয়ায়, ভাইয়ার কথামতই কিন্তু তুমি ভার্সিটিতে এডমিশন দিয়েছিলে। বুয়েটেও এডমিশন দিয়েছিলে ভাইয়ার ইচ্ছেতেই। এতগুলো বছর পর এসে এ কথা বলছ কেন তুমি? তোমাদের কি ঝগড়া হয়েছে? ভাইয়া বড়মাকে বলেছে, সে এখন বাড়িতে আসতে পারবেনা! অথচ তোমরা কেউ কাউকে না দেখলে থাকতে পারতেনা! ”

” দেখা হওয়াটা কি খুব জরুরী? আমরা এখন আর আগেরমত ইম্যাচিউর নেই। নিজেদের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছি। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। এসব তুই বুঝবিনা। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর দেখবি, অনেক বন্ধু জুটবে। জীবনটা তখন আর ফুলতলা নামক এই গ্রামের ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকবেনা। জীবনের পরিসর বাড়বে ব্যপকভাবে। সবকিছুর মধ্যেই নতুনত্ব খুঁজে পাবি। একটা ছেলে অথবা মেয়ের জীবনে তখন তার ভালোবাসার মানুষ ছাড়াও অনেকেই জায়গা দখল করে নেয়। আর কখনোসখনো তার জীবনে বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয়ে ওঠে। আর তাছাড়া তোর ভাইয়ার পরীক্ষা শুরু হবে কিছুদিন পর। ওর পরীক্ষা শেষ হলে গ্রামে আসবে। তখন আমিও আসব। ”

অবনী তাকিয়ে থাকে রিশার দিকে। এই রিশাকে ওর বড্ড অচেনা লাগছে। যে রিশাপু কখনোই ইশরাক ভাইয়াকে ছাড়া কিছুই বুঝতনা, এখন সেই রিশাপু ভাইয়াকে ছাড়াই ভালো থাকতে শিখে গেছে! বন্ধুবান্ধব নিয়ে গড়ে উঠেছে তার আপন ভূবন!

” আমি ছোট মানুষ, অতশত কথার মারপ্যাঁচ বুঝিনা। আমার লেখাপড়াই হবে কিনা জানিনা, আর তুমি দেখাচ্ছ ভার্সিটির স্বপ্ন! আমি বাপু কোনরকম এসএসসি পাস করে বিয়ে করতে চাই। ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েকে অ, আ, ক,খ, এ, বি, সি, এক, দুই, তিন পড়ানোর মত শিক্ষিত হলেই আমার চলবে। তবে আমার কষ্ট হচ্ছে ভাইয়ার জন্য। সে যদি জানে তোমার অনেক বন্ধু আছে, তখন তার কেমন লাগবে? ”

” তোর ভাইয়া জানে আমার অনেকগুলো বন্ধু আছে। সে তাদেরকে চেনেও। মাঝেমধ্যেই ওদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে। এবার শান্তি পেয়েছিস? শোন, জীবনটা এমনই। কেউ কারও জন্য থেমে থাকেনা। ”

” কি জানি, বাপু। তোমাদের প্রেমের রকমসকম আমার ভালো লাগছেনা। আধুনিক হতে গিয়ে তোমরা নিজেদের প্রেমকে গুরুত্বহীন করে ফেলেছ বলে মনে হচ্ছে। আমি যাই গো। বড় চাচার আসার সময় হয়েছে। বাড়িতে এসে আমাকে না দেখলে চাচা রাগ করবে। ”

” আচ্ছা যা। ”

রিশার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আনমনে হাঁটছে অবনী। রিশাপুর কথার ধরন ওর কাছে ভালো লাগেনি মোটেও। রিশাপু বদলে গেছে। তার চোখে শহুরে জীবনের ঝলকানি দেখেছে অবনী। যেটা ওর ভালো লাগেনি।

***

” আজকে কি রান্না করেছ, মা? ” অর্নি মুখ গোমড়া করে জানতে চাইল মায়ের কাছে।

” ডাল আর লাউ শাক ভাজা । আয় খেতে বস। আমি তোর বাবাকে ডেকে নিয়ে আসছি। অবনি, খেতে আয়। ”

” আজকেও ডাল রেঁধেছ, লাউ শাক ভেজেছ? প্রতিদিন এসব খেতে ভালো লাগেনা, মা। কতদিন মাংস খাইনা। ”

অর্নির কথা শুনে তার দিকে তাকালেন মিনারা খাতুন। সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে না পারার কষ্ট তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অভাবের সংসারে দুই মেয়ের পড়াশোনার চালিয়ে, মেয়েদের মুখে ভালো খাবার তুলে দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনা। আজকাল তার স্বামীর শরীর ভালো যাচ্ছেনা। প্রতিমাসে তার ঔষধের পেছনে বেশ কিছু টাকা চলে যায়। অভাবের নাগপাশে চারদিক থেকে আটকে গেছেন তারা। কবে যে সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আসবে সেটাও জানেননা তিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকালেন অর্নির দিকে।

” তোরা তো বড় হয়েছিস, মা? বাবার অবস্থা তোরা না বুঝলে কে বুঝবে? তোর বাবার যদি মাছ-মাংস কেনার মত অবস্থা থাকত, তবে তোদের প্রতিদিন শাক, ভাজি, ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে হতোনা। খবরদার বাবার সামনে এমন কথা বলবিনা। বাবা কষ্ট পাবে। ”

” ঠিক আছে, মা। আর কোনদিনই এমন কথা বলবনা। তুমি খাবার দাও, আমি বাবাকে ডাকছি। ”

” অর্না, অবনী, বাড়িতে আছিস? ”

” আছি, বড়মা। ভেতরে এস। ”

হাতে একটা বাটি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন নাজমা আক্তার।

” মিনারা, আমার দুই মায়ের জন্য তরকারি এনেছি। ওদেরকে খেতে ডাকলে তো আর আমার বাড়িতে গিয়ে খাবেনা। ধন্যি মেয়ে জন্ম দিয়েছিস তুই। ”

” আবার এসব কেন? প্রতিদিন আপনি কিছু না কিছু দিয়ে যান। কিন্তু আমি একদিনও কিছু দিতে পারিনা। ”

” কেন? তোর দিতে হবে কেন? তুই আমার ছোট জা, আমার বোনের মত। অবনী, অর্না আমার মেয়ের মত। মেয়ের মত বলছি কেন? ওরা আমার মেয়েই। ওদের রেখে আমি ভালোমন্দ খাব, এটা কি করে হয় বলতো? আর তোর ভাসুর যদি শোনে আমি তার দুই মাকে না দিয়ে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলেছি, তখন সে আমার কি অবস্থা করবে, সেটা ভালো করেই জানিস তুই। আবার আব্বাও কিন্তু আমাকে ছেড়ে কথা বলবেননা। কথা না বাড়িয়ে ধর এগুলো। ”

তরকারির বাটি মিনারা খাতুনের হাতে দিয়েই নিজের বাড়িতে গেলেন নাজমা আক্তার। শ্বশুরকে খেতে দিতে হবে।

বড় জা চলে গেলে, মিনারা খাতুন ডাকনা তুলে দেখলেন বাটি ভর্তি তরকারি দিয়েছেন তিনি। বড় মাছের ঝোল করেছেন। এই তরকারি দিয়েই তাদের চারজন দুইবেলা খেতে পারবেন। তিনি বুঝলেন জেনে-বুঝেই তার বড় জা তরকারি দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতায় ছেলে গেল তার অন্তর। দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার আখিঁ বেয়ে। তিনি বাটি থেকে খানিকটা তরকারি তুলে রাখলেন। আগামীকাল তিনি মেয়েদের পাতে দিবেন। অন্তত আরো একটা বেলা তার মেয়েরা পেটপুরে খেতে পারবে।

***

” অবনী, সকালে রাকিবের সাথে তোর কি হয়েছিল? ” বড়মার প্রশ্নে তার দিকে তাকায় অবনী।

” আমাকে দেখে ঐ কুত্তাটার শিল্পী হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। সে ভেবেছিল ঘেউ ঘেউ করলেই বোধহয় শিল্পী হওয়া যায়। কিন্তু আমি ওকে সেই সুযোগ দিইনি। যেই ঘেউ ঘেউ শুরু করেছে ঠিক তখনই চৌদ্দটা ইনজেকশন দিয়েছি ওর নোংরা জিভে। ”

” তুই জানিসনা রাকিব কেমন ছেলে? ও তোকে বিরক্ত করলে তুই আমাদেরকে বলবি। কিন্তু তুই সেটা না করে নিজে নিজেই পন্ডিতী করতে গেছিস? বুদ্ধি কবে হবে তোর? বড় হবি কবে? আজকালকার উঠতি বয়সের ছেলেরা কত খারাপ সেটা কি তুই জানিস? আর যদি শুনি তুই কারও সাথে লাগতে গেছিস, সেদিন কিন্তু আমি তোকে থাপড়াব? ”

” আমি কারও সাথেই লাগতে যাইনা, বড়মা। কিন্তু কেউ আমার সাথে লাগতে আসলে তাকে শুধু শিক্ষা দেই। তোমার যদি আমাকে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করে, তবে মার। এই যে আমার গাল। তবুও আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দিওনা। তুমি ভালো করেই জানো আমি নিষ্পাপ একটা বাচ্চা। ” নাজমা আক্তারের দিকে গাল বাড়িয়ে দিল অবনী।

অবনীর দিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল নাজমা আক্তারের। ফুটফুটে একটা কিশোরী সরল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এই চপল মেয়েটাকে নাজমা আক্তার একটু বেশিই ভালোবাসেন। এই পঙ্কিল সমাজের কুটিলতা, নোংরা মানসিকতা, অশ্লীলতা এখনো ছুঁতে পারেনি চপলমতি এই কিশোরীকে। শরীরে বড় হলেও মনের দিকে এখনো ছোট্ট সেই অবনীই রয়ে গেছে মেয়েটা। হুট করেই নাজমা আক্তার অবনীকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিলেন। জড়িয়ে ধরলেন বুকে। বিয়ের পর থেকেই একটা কন্যা সন্তানের সাধ ছিল তার। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তার সেই মনোবাঞ্ছা পূরণ করেননি। এ নিয়ে তিনি আফসোস করতেন সর্বদা। তারপর একদিন জন্ম হল অবনীর। তিনি সর্বপ্রথম কোলে নিয়েছিলেন এই ফুটফুটে মেয়েটিকে। সেদিন থেকেই যেন অলিখিতভাবে এই চপল কিশোরীই তার মেয়ে হয়েছিল। তিনিও হয়েছেন এর মা। গত পনের বছর ধরে তিনি আগলে রেখেছেন অবনীকে।

হঠাৎ করেই বড়মার চুমু পেয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল অবনী। ও জানে বড়মা ওকে কতটা ভালোবাসে, তাই বড়মার ভালোবাসা পেয়ে অভ্যস্ত ও। কিন্তু বড়মা আগে কখনোই এভাবে হুট করে ওকে চুমু দেয়নি।

” শোন, এরপর থেকে কেউ কিছু বললে তুই বাড়িতে এসে জানাবি। নিজে নিজে কিছু করতে যাবিনা, কেমন? ”

” ঠিক আছে, বড়মা। ”

” এবার যা, গিয়ে বই নিয়ে আয়। অর্নাকেও ডেকে নিয়ে আয়। আমি নুডলস রান্না করছি ততক্ষণে। ”

অবনী মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বাড়িতে গেল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ওরা দুই বোন বড় চাচার কাছে পড়তে বসে। ইসহাক আজাদ যত্ন করে দুই ভাতিজীকে পড়ান।

***

পরপর দুইদিন অবনী রিশাদের বাড়িতে যায়নি। তাই আজকে ভেবে রেখেছে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই রিশাপুর কাছে যাবে। রিশাপুর সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করবে। কিন্তু স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরেই ও স্তব্ধ হয়ে গেল, যখন বড়মার মুখে শুনল, কিছুক্ষণ আগেই রিশাপুর বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত। সারাটা বিকেল এমনকি রাতটাও আনমনাভাবেই কেটে গেল অবনীর। সারাক্ষণই ও ইশরাকের কথা চিন্তা করেছে। না জানি কথাটা ভাইয়ার কানে গেলে তার কি হবে? ভাইয়া হয়তো কষ্টে পাগলই হয়ে যাবে। আর কেউ না জানুক অবনী ভালো করেই জানে ভাইয়া রিশাপুকে কতটা ভালোবাসে। এতগুলো বছরের মধ্যে এই প্রথমবার অবনীর মনে রিশার জন্য ঘৃণা জন্মাল। রিশার বলা সেদিনের কথার মানে আজ খুঁজে পেল। না খেয়েই রাতটা ছটফটিয়ে কাটাল অবনী। বাবার ফোন হাতে নিল কয়েকবার, কিন্তু ভাইয়াকে ফোন দেয়ার সাহস পেলোনা সে।

চলবে…