#হলুদ_বসন্ত
#পার্ট_৩৪
জাওয়াদ জামী জামী
পেরিয়ে গেছে তিনমাস। অর্নির রেজাল্ট দিয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ও তৃতীয় হয়েছে। অবনী চেয়েছিল পরীক্ষার পরপরই অর্নিকে এডমিশন কোচিংএ ভর্তি করিয়ে দেবে৷ সব ঠিকঠাকাও করে রেখেছিল। কিন্তু হুট করেই অর্নির টাইফয়েড হয়, তাই ও কোচিং করতে পারেনি। এখন ও মোটামুটি সুস্থ আছে। তাই ইশরাক চাচ্ছে ওকে ঢাকা নিয়ে আসতে। এদিকে অবনী গ্রামে যাওয়ার বায়না ধরেছে। ইশরাকও স্ত্রী’কে খুশি করতে ছুটি নিয়েছে। আর বাড়িতে জানিয়ে দিয়েছে, গ্রাম থেকে ফেরার সময় অর্নিকে নিয়ে আসবে। এরইমধ্যে অবশ্য নাজমা আক্তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছেলের বাসায় গিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। তারা সাতদিন ছিলেন ঢাকায়। সেই সুযোগে ঢাকায় অর্নির চিকিৎসাও করিয়েছেন।
ক্লাস শেষ করে অবনী গিয়েছিল সুপার শপে। টুকটাক কেনাকাটা করে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে সব জিনিসপত্র নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। লিফ্টের কাছে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াতে হল। অস্থির হয়ে বারবার ঘড়ি দেখছে।
” অবনী, তুই এখানে? এই বিল্ডিংয়েই থাকিস নাকি? ”
চমকে পেছনে তাকাল অবনী। রিশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যারপরনাই বিরক্ত হল।
” হুম। এখানে আছি কয়েকমাস ধরে। তুমি এখানে কি মনে করে? ”
” আমার ননদ আছে থার্ড ফ্লোরে। তুই কোন ফ্লোরে আছিস? ”
” ফিফথ ফ্লোরে থাকি আমরা। ”
” কত নম্বর ফ্ল্যাট? ”
” ৬০১ A। ”
” ওহ। আমার ননদ আছে ৪০১ B তে। এই বিল্ডিংয়ে ওদের ছয়টা নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। ”
” ওহ্। আচ্ছা, আমি এখন যাব। ভালো থেক। ” অবনী কথা না বাড়িয়ে লিফ্টে ঢুকে গেল। এখানে রিশাকে দেখে ও অবাকই হয়েছে। সেই সাথে কিছু চিন্তাও মাথাচাড়া দিয়েছে। রিশা যদি ইশরাকের মুখোমুখি হয়, তবে বিষয়টা যে খুব একটা ভালো হবে এমনটা নয়। ইশরাক অবশ্যই রিয়্যাক্ট করবে। আর সেটা রিশার জন্য ভালো কিছুই বয়ে আনবেনা।
বাসায় এসে অবনী ফ্রেশ হয়ে গোছগাছ করতে শুরু করল। ওরা সারাদিন কেউই বাসায় থাকেনা, তাই কোন মেইডও রাখতে পারেনি। সব কাজ অবনীকেই করতে হয়। শুধু শুক্রবারে একজন এসে বেশকিছু কাজ করে দিয়ে যায়। সবকাজ শেষ করে রান্নাঘরে গেল অবনী। সাদাফ চিটাগং গেছে। ওরা দু’জন শুধু বাসায়। দু’জনের জন্য রান্না করতে হবে। রান্না প্রায় শেষের দিকে, তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। অবনী ড্রয়িংরুমের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সবেমাত্র রাত আটটা বাজে। ইশরাকের আসতে আরও আধাঘন্টা লাগবে। এই সময় কে আসল?
দরজা খুলে আরেক দফা বিরক্ত হল অবনী। রিশা দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রতো হোক সৌজন্যতা হোক, কিছু একটার খাতিরেই ও দরজা ছেড়ে দাঁড়াল।
” তোর বাসা দেখতে আসলাম। দেখি কেমন সাজিয়েছিস? ” রিশা ভেতরে ঢুকল।
” বস। তোমার ননদকে বলে এসেছ নিশ্চয়ই? ”
” না বলে আসলে আমার খোঁজ পরে যাবে। তুই কি বাসায় একা নাকি? কাউকে দেখছিনা যে? ”
” সাদাফ ভাইয়া চিটাগং গেছে। আর আমার হাজবেন্ডের ফিরতে সময় লাগবে। ” ইচ্ছে করেই অবনী ‘ আমার হাজবেন্ড ‘ কথাটা জোর দিয়ে বলল।
” ওহ্। ইশরাক কোথায় জব করছে? ”
” একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আছে। ”
” বাসা দেখে তো মনে হচ্ছে, ভালোই স্যালারি পায়! ”
অবনী রিশার চোখে কৌতুহল দেখতে পায়। সেই সাথে আরও কিছু একটা ছিল যেটা অবনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।
” দুই লাখ। তুমি বস, আমি চা নিয়ে আসছি। নাকি কফি খাবে? ”
” কোল্ড কফি হবে? ”
” সাদাফ ভাইয়া খায়। তুমি বস আমি নিয়ে আসছি। ”
” আমি বরং ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখি। দেখি কেমন সাজিয়েছিস। ” অবনীর উত্তরের অপেক্ষা না করে রিশা ফ্ল্যাট দেখতে শুরু করল।
অবনী বিরস মুখে রান্নাঘরে গেল। গালি দিচ্ছে নিজের ভাগ্যকে।
কফির মগ হাতে নিয়ে রিশা দাঁড়িয়ে আছে ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় বেলকনিতে। ওর মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটেছে। অনবরত কথা বলেই চলেছে। অবনী শুধু মাঝেমধ্যে হু হা করে ওর দুই-একটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। কথা বলার কোন আগ্রহই অবনীর মধ্যে দেখা যাচ্ছেনা।
” একা একা তোর এতবড় বাসায় থাকতে ভয় লাগেনা? তোর সারাদিন কাটে কিভাবে? ”
” ভয় লাগবে কেন? আমার একা থেকে অভ্যাস আছে। আর তাছাড়া সারাদিন একা থাকতেও হয়না। আমি বাসায় আসার আগেই সাদাফ ভাইয়া চলে আসে। ”
” ইশরাক কখন আসে? ” মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল রিশা।
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছে করলনা অবনীর। অবশ্য দিতেও হলোনা। তার আগেই আরেকবার কলিংবেল বেজে উঠল।
” তুমি কফি খাও, আমি দেখছি কে আসল। ” অবনী জানে কে আসতে পারে। তারপরও কথাটা বলল।
” আমার বউয়ের মুখটা এমন মলিন দেখাচ্ছে কেন? মুখখানা দেখে মনে হচ্ছে চাঁদে অমাবস্যা চলছে। ” অবনীকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল ইশরাক।
অবনী আঁড়চোখে দেখল রিশা দাঁড়িয়ে আছে গেস্ট রুমের দরজায়। হঠাৎই অবনীর মুখে হাসি ফুটল। অবনী নিজের শরীর এলিয়ে দিল ইশরাকের শরীরে। এরপর ফিসফিস করে ইশরাকের কানে বলল,
” রিশাপু এসেছে আমাদের বাসায়। স্বাভাবিক থাকুন। তাকে বুঝতে দিয়েননা, আর আগমনের খবর আপনি জেনে গেছেন৷ ”
অবনীর কথা শুনে ইশরাকের কপাল কুঁচকে গেল। অবশ্য সেই সাথে দৃঢ় হল ওর হাতের বাঁধন। গভীর ভাবে চুমু দিল অবনীর কানের লতিতে।
” দুপুরে খাওয়ার সময় পাইনি। খুব ক্ষুধা লেগেছে। রান্না করেছিস? ”
” তুমি ফ্রেশ হয়ে এস, আমি খাবার দিচ্ছি। তোমার পছন্দের গলদা চিংড়ির ঝাল ফ্রাই করেছি। সাথে আছে কাতলা মাছের কালিয়া আর টমেটে দিয়ে বেগুন ভর্তা। ”
” জিভে জল এসে গেছে, বউ। আমার পছন্দের খাবার রান্না করার জন্য আজকে তোর জন্য স্পেশাল কিছু থাকবে। ” চোখ টিপে বলল ইশরাক। ইশরাকের ইশারা বুঝতে পেরে হাসল অবনী। ইশরাকের স্পেশাল কিছু মানেই যে মধময় নির্ঘুম রাত সেটা ভালোই জানা আছে অবনীর।
ইশরাক রুমে গেল। অবনীও লজ্জারাঙ্গা মুখে রান্নাঘরে গেল। রিশা দরজায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সবটা দেখছিল। ইশরাকের বাহুতে অবনীকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রিশা। নিজের ভুলেই আজ ওর এই দশা। ভালো থাকতে চেয়ে ইশরাককে ছেড়ে শাহরিয়ারের হাত ধরেছিল। কিন্তু শাহরিয়ার নিজে ভালো থাকতে গিয়ে সংসার জীবনের কিছুমাস পরই অন্য আরেকজনের হাত ধরেছে। গত দুই বছর যাবৎ রিশার প্রতিরাত নির্ঘুম কাটে। সেই সাথে থাকে হতাশা আর নিরব কান্না। এ নিয়ে শাহরিয়ারকে কিছু বলতে গেলে কপালে জোটে মার আর বিদ্রুপ। আজ পর্যন্ত একটা সন্তানের মা হতে পারেনি রিশা। ডক্টর জানিয়েছে, সমস্যা ওর নিজের। সেজন্যই শাহরিয়ার ওর থেকে দূরে সরে গেছে। আজ ইশরাকের সুখী সুখী চেহারা আর হাসিমাখা চেহারাই রিশাকে বলে দিয়েছে, অবনী নিজের পুরুষকে কতটা সুখে রেখেছে। রিশা উপলব্ধি করল, দু ফোঁটা অশ্রু ওর কপোল বেয়ে নিচে নামল। সযতনে চোখের পানি মুছল রিশা।
” রিশাপু, আজকে তুমি আমাদের সাথে খাবে। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি। ”
” না রে, আমাকে বাসায় যেতে হবে। ” রিশা কথা শেষ করতে পারলনা তার আগেই ইশরাকের ডাক দিল অবনীকে।
” অবনী, টাওয়েল কোথায়? খুঁজে পাচ্ছিনা। ”
” তুমি একটু বস, আমি আসছি। ”
অবনী প্রায় দৌড়ে রুমে গেল৷
” এত জোরে চেঁচানোর কি হয়েছে? টাওয়েল তো তোমার হাতেই! পাগল হয়েছ নাকি? ” কথা শেষ হতে না হতেই ইশরাকের হ্যাঁচকা টানে ওর বুকে আছড়ে পরল অবনী।
” কেন নিজের বউকে ডাকতে কি ট্যাক্স দিতে হবে? আমি আমার বউকে যখন খুশি তখনই ডাকতে পারি, সেটা চিল্লিয়ে হোক আর মধুর স্বরেই হোক। ” ইশরাক টুপ করে চুমু দিল অবনীর ঠোঁটে।
অবনী ঠোঁট সরালোনা। বরং একটু বাড়িয়ে ধরল ইশরাকের দিকে। ইশরাক ভ্রু কুঁচকে ইশারায় জানতে চাইল, কি হয়েছে?
” আরেকটা দাও। এবার একটু জোরে। সেই সাথে যেন তোমার ভালোবাসার চিহ্ন রয়ে যায়। ”
” ঘটনা কি? যেই মেয়েকে হাজার খুঁচিয়েও রাজি করানো যায়না, সেই মেয়ে আজ স্বেচ্ছায় চুমু চাইছে! আমার দুষ্টু অবনীর সাথে এটা যায়না। ”
” কথা না বলে যা করতে বলেছি কর। এবং জলদি। কি বলেছি মনে আছে? চিহ্ন থাকে যেন? ”
এবার ইশরাক বুঝতে পারছে অবনীর মতলব। ও রিশাকে দেখাতে চাচ্ছে। ইশরাক হেসে অবনীকে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবাল। ছাড়ল অনেকক্ষণ পর।
ইশরাকের থেকে ছাড়া পেয়ে হাঁপাচ্ছে অবনী। ঠোঁটদুটে একটু জ্বলছেও। আজ পর্যন্ত ইশরাক ওকে এভাবে চুমু খায়নি। অবনী হেসে বাহিরে গেল।
অবনীকে দেখে বুকের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে রিশার। ওর ঠোঁটের কালো দাগ রিশার নজর এড়ায়নি। কিছুক্ষণ আগেও দাগটা অবনীর ঠোঁটে ছিলনা৷
” খুব সুখে আছিস তাইনা? ”
” খুউউব। সে আমার পুরুষ, ভাবলেই আমার শরীরে শিহরণ জাগে। ” এক কথায় অবনী নিজের অনুভূতি বুঝিয়ে দিল৷
রিশা কিছু না বলে ধপ করে সোফায় বসে পরল। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকল। অবনী রিশাকে কিছু না বলে টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
” অবনী, হয়েছে তোর? ” ইশরাক রুম থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় ড্রয়িংরুমে।
” হয়েছে। এস। ”
ইশরাকের গলা পেয়ে রিশা মুখ তুলে তাকাল। একই সাথে ইশরাকেরও নজর গেল রিশার দিকে। চার বছরেরও বেশি সময় পর রিশাকে দেখছে ইশরাক। কিন্তু ওর মনের কোনে কোন ঝড় উঠলনা কিংবা রিশাকে দেখে একটুও ভালো লাগা কাজ করলনা ইশরাকের মনে। সে রিশাকে দেখে বিরক্তিকর একটা ভাব ফুটিয়ে তুলল চোখেমুখে।
” অবনী, আজকাল তোর কি অধোঃপতন হয়েছে যে যার তার সাথে আড্ডা দিচ্ছিস? তোর কাছ থেকে এটা আশা করিনি আমি। ”
” বক বক না করে টেবিলে এস। আর ভুলে যেওনা, রিশাপু আমাদের প্রতিবেশি। ”
” এমন প্রতিবেশিকে ভুল করেও মনে রাখতে চাইনা আমি। এরা মরণঘাতী ভাইরাসের থেকেও বিষাক্ত। এদের ছায়াও যদি শরীরে লাগে, তবে পুরো শরীর পঁচে যাওয়ার ভয় থাকে। ”
ইশরাকের এমন বিদ্রুপাত্নক অথচ অপমানজনক বাক্য শুনে ডুকরে কেঁদে উঠল রিশা। দৌড়ে বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট থেকে।
রিশার কান্না কিংবা ওর চলে যাওয়া ইশরাকের ভেতর কোন প্রভাব ফেললনা। ও ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ার টেনে বসল।
” আজ কি খাবার পাবোনা, বউ? ” ইশরাকের ডাক শুনে চমকে উঠল অবনী। রিশাকে কাঁদতে দেখে ওর খারাপ লাগছে।
চলবে…