হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে পর্ব-০২

0
23

#হারানো_হিয়ার_নিকুঞ্জ_পথে
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব – ২

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, রান্নাবান্না কমপ্লিট করে, মেয়েকে খাইয়ে, অফিসের উদ্দেশ্যে বের হলো মিঠি। মায়ার শহরে এমনি-এমনি খেয়েপড়ে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই। কর্ম করলে তবেই দু’মুঠো অন্ন জুটে। একটা চাকরি আছে বলেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। নয়তো রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অনাহারে দিন কাটানো লাগত।

মেয়েকে বের হতে দেখে পিছন থেকে ফাতেহা বেগম বললেন, “আজ না গেলে হতো না?”

মিঠি সোজাসাপটা উত্তর দিল, “পরের গোলামী করলে কত কৈফিয়ত দিতে হয় জানো আম্মু? জানো না। খেয়েপড়ে বাঁচার জন্য একটা চাকরি যে জুটেছে, এই ভাগ্য! নয়তো আজ পথে বসে থাকতাম।”

মেয়েকে আদর দিয়ে বারবার ঘড়িতে সময় দেখে মিঠি ফের বলল, “দেরী হয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছি আমি৷ তুমি ওর খেয়াল রেখো। আর দুপুরের ঔষধটা মনে করে খাইয়ে দিয়ো।”

মেয়েটাকে অসুস্থ রেখে কাজে যাওয়ার ইচ্ছে একদমই ছিল না মিঠির৷ কিন্তু উপায় নেই৷ যেতে হবে। জরুরী মিটিং আছে আজ। যথাসময়ে উপস্থিত না হলে, পায়ের তলার মাটি হারিয়ে যাবে।

রাস্তায় এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো ধরনের গাড়ি পাওয়া গেল না। বিরক্ত মিঠি রোদের কড়া তেজ মাথায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এভাবে হাঁটলে কখন পৌঁছাবে কে জানে!

একটা সময় মিঠির থেকে একহাত দূরে একটা প্রাইভেট কার দাঁড়াল৷ জানালার কাঁচ নামিয়ে বের হয়ে এলো একটা হাস্যজ্বল মুখ। মিঠিকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “আপনি এখানে! কোথাও যাচ্ছেন?”

মিঠি কিছুটা অপ্রস্তুত হলো অর্ণবকে দেখে। ছ’মাস হলো এই এলাকায় এসেছে। চাকরি জুটিয়ে থাকার জন্য একটা জায়গা পেয়েছে। কখনও অর্ণবের সাথে এ পথে দেখা হয়নি। অসময়ে এই লোক এখানে কেন এলো?

চেহারা দিয়ে অবশ্য মনের কথা বুঝতে দিল না মিঠি। জোরপূর্বক ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল, “অফিস যাচ্ছি।”

“হেঁটে?”

“কিছু পাচ্ছি না তো! কী করব? মিটিংয়ে দেরী হয়ে যাবে।”

“প্রবলেম না হলে গাড়িতে উঠুন, আমি পৌঁছে দিই?”

মিঠির গাঁইগুঁই দেখে অর্ণব আর জোর করল না। জড়তা ও অনাগ্রহ বুঝতে পেরে ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে এগোতে বলল। এমন সময় মিঠি বলল, “আমি আসলে আপনাকে বিরক্ত করতে চাইছি না।”

অর্ণব কাঁধ নাচিয়ে বলল, “তাইতো! আপনি কেন আমাকে বিরক্ত করবেন? কোনোদিন তো করেননি!”

“খোঁটা দিলেন?”

“জোকস্‌ বুঝেন না? উঠুন তো। দেরী হলে বস বকবে না?”

মিঠি ঘাড় নাড়ল।

অর্ণব ডোর খুলে দিয়ে বলল, “আসুন ম্যাডাম। একদম নিঃসংকোচে।”

আর আপত্তি করল না মিঠি। দেরী বুঝতে পেরে পিছনের সিটে বসল। ঠিক অর্ণবের পাশের ফাঁকা সিটটায়৷

গাড়ি চলতে শুরু করলে মিঠি বাইরের দিকে দৃষ্টি দিয়ে রাখল। প্রথম কিছু মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।

অর্ণবই আগ্রহ দেখাল, “আগে তো এই পথে দেখিনি! নতুন এসেছেন এখানে?”

মিঠি বাইরের দিকে চোখ রেখে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, কিছু মাস আগেই। চাকরির জন্য আসা।”

“ওহ।”

এরপর আবারও নীরবতা। মিঠির আধভেজা অবাধ্য চুলগুলো এলোমেলো বাতাসে উড়তে শুরু করেছে। কিছু চুল উড়ে এসে অর্ণবের কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মিঠি সেটা খেয়াল করে ভ্যানিটিব্যাগ থেকে পাঞ্চক্লিপ বের করে চুল বেঁধে ফেলল। অর্ণব নীরবে সব দেখল, এবং খুব সাবধানে নিজের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখল।

অফিসের কাছাকাছি এসে গাড়ি পার্কিং করে রাখলে, মিঠি আলগোছে নেমে পড়ল। দু’পা এগিয়ে গিয়ে, কী মনে করে যেন পিছনে ফিরল! তারপর খানিকটা নিচু হয়ে জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, “সময় থেমে থাকে না এ্যা আর। ক্রমাগতই সামনে এগোয় আর একসময় সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। আপনি কেন এখনও এগোতে পারেননি?”

অর্ণব পুরোটাই চমকে গেল। কী করে বুঝে ফেলল মেয়েটা! মন পড়তে পারে? অসম্ভব! সে নিজের দিকের স্পষ্টতা তুলে ধরতে বলল, “কে বলেছে আমি থেমে আছি? আমিও তো এগিয়েছি। সাত বছর আগের আমি ও আজকের আমির মধ্যে অনেক পার্থক্য মিঠি। আমি শুধু সামনেই এগোইনি। বিয়ে করে সুখে দিন কাটাচ্ছি। বিন্দাস আছি। ট্রাস্ট মি!”

“তাই?” রহস্যময়ী কণ্ঠে প্রশ্ন করল মিঠি।

অর্ণব দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, তাই।”

“বউকে নিয়ে আসবেন একদিন।”

“কোথায়?”

“আমার বাসায়। দাওয়াত রইল কিন্তু।”

অর্ণব বোকা বোকা দৃষ্টিতে তাকালে মিঠি হেসে বলল, “থ্যাংক ইউ।”

উত্তরে শুধু হাসল অর্ণব৷ এরপর বিদায় নিয়ে চলে গেল৷ মিঠি তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াল, “এই শহর ছাড়তে হবে আমায়। পালাতে হবে এখান থেকে। নয়তো অর্ণব সব জেনে যাবে। এই লোকটাকে কিচ্ছু জানতে দেয়া যাবে না, বুঝতে দেয়া যাবে না।”

প্রাক্তনকে ঘিরে একটা মেয়ের যেমন প্রতারক কিংবা ঠকবাজ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা থাকে, তেমনই একটা পুরুষেরও অভিজ্ঞতা হয়, ছলনাময়ী কিংবা স্বার্থপর রমণী শব্দদ্বয়ের মধ্য দিয়ে। অথচ তাদের সম্পর্কে এরকম কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তবুও যোজন যোজন দূরত্ব আছে! এই দূরত্ব কি শুধু শরীরের না কি মনেরও? কেউ কোনোদিন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টাই করেনি।

***

সরকারি হসপিটালে টানা কয়েকঘণ্টা রোগী দেখে ক্যান্টিনে এসে বসল অর্ণব। এক কাপ ধূমায়িত চা সামনে নিয়ে হসপিটালে আগত নানান ধরনের মানুষের জীবনযাত্রার দিকে চেয়ে থাকল। কারও মুখে হাসি, কারও মুখে কান্না, কারও চেহারায় চিন্তা, কারও বিস্ময়, সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে অর্ণব আবিষ্কার করল, প্রতিটা মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মিলিয়েই গল্প তৈরী হয়। সেইসব গল্পের ভাঁজে ভাঁজে কারও গল্প থাকে সম্পূর্ণ, কারও অসম্পূর্ণ। তবুও চলতে থাকে জীবন, নির্দিষ্ট নিয়মে। জানে, মৃত্যু ছাড়া থামার কোনো অপশন নেই।

ভাবনা থামল ফোনের রিংটোনে। মায়ের নম্বর দেখে রিসিভ্‌ করে সালাম দিল অর্ণব৷

ওপাশ থেকে দিলারা জামান সালামের জবাব দিয়ে ক্যাটকেটে স্বরে বললেন, “তোর সমস্যা কী বাবলা? তুই কি বাড়ি-টাড়ি আসবি না?”

অর্ণব আস্তেধীরে বলল, “তোমাকে এতবার নিষেধ করার পরও তুমি আমাকে বাবলা কেন ডাকো বলো তো?”

“কেন ডাকি বুঝিস না? অপয়া বংশে এসে আমার একটা বাচ্চাকেও বাঁচাতে পারিনি। এই ঘটনা কতবার বলেছি তোদের। এক কবিরাজ যেদিন বললেন, মৃত সন্তানের আঙুল কেটে তাবিজ বানিয়ে গলায় পরলে না কি মৃত বাচ্চা হবে না আর। তাছাড়া উনি এটাও বলেছিলেন, ঝাঁটা, শলা, লাউ-কদু, মানে এক কথায় প্রথম স্মরণে যা আসে, তেমনই একটা নাম রাখলে বাচ্চারা না কি দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করে। এজন্যই তো আমি তোর নাম বাবলা রাখলাম, ঝাঁটা তো আর রাখতে পারি না। আর তোর ছোটো ভাইয়ের নাম রাখলাম…।”

“আম্মা থামো! এসব কেচ্ছাকাহিনী শুনতে আর ভালো লাগে না। কী বলতে চাও, সরাসরি বলো।”

“তোর বয়স এখন কত?”

“থার্টি থ্রি প্লাস! কেন?”

“সংসারটা যদি বাঁচাতে পারতি, এতদিনে বাচ্চা কোলে নিয়ে হাঁটতি।”

“আম্মা প্লিজ! এইসব ফালতু কথা বলো না।”

“হ্যাঁ, আমি বললেই এইসব কথা ফালতু হয়ে যায় বাবলা।”

“ও আল্লাহ! এই বাবলার চক্করে পড়ে জীবনটা আমার ত্যানাত্যানা হয়ে গেছে!”

“কী বলিস? নামে আবার কী সমস্যা?”

“কী সমস্যা সেটা যদি তুমি বুঝতে!”

দিলারা জামান খানিকক্ষণ থম মেরে বসে থেকে মায়াজড়ানো কণ্ঠে বললেন, “শোন না বাবা। অনেক তো একা থাকলি! এবার নিজের জীবনটা গুছিয়ে নে।”

“সম্ভব নয়, আম্মা।”

“কেন সম্ভব নয়? তোর এই মিছে জেদ আমার ভালো লাগে না বাবলা।”

“মিছে জেদ আমি দেখাচ্ছি না আম্মা। তুমি দেখাচ্ছ! যা আমি করতে পারব না, সেটার জন্যই জোর করছ। তখনও বলেছিলাম আমি আগে ক্যারিয়ার গড়ে নিই, তারপর বিয়ে করি। না… তোমরা কেউ আমার কথা শুনলে না। এমবিবিএস শেষ হওয়া মাত্রই উঠেপড়ে লাগলে বিয়ে করানোর জন্য। তোমরা যা চেয়েছিলে, আমি তো তা-ই করেছিলাম আম্মা, তবুও কেন আজ আবারও আমাকে এসব কথা বলছ?”

“আমি তো তোর ভবিষ্যতের কথা ভেবে…।”

“ভবিষ্যৎ…। যে দিন এখনও অনেক দূরে, তা নিয়েই যত ভাবনা তোমাদের। বাদ দাও তো। এসব নিয়ে প্যারা আর দিয়ো না। আমি ভীষণ ক্লান্ত!”

তার এই ক্লান্তির পরিমাণটা কোনোদিন কাউকে বুঝাতে পারেনি অর্ণব। আজও পারল না।

ছেলের মুখের এমন কথা শোনে দিলারা জামান বললেন, “আমি একটা মেয়ে দেখেছি…।”

ব্যস, কথা ওখানেই থেমে গেল৷ থামিয়ে দিল অর্ণব। কট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফোন সুইচড অফ করে ফেলল। চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে টের পেল, সেটা পানসে৷ মুখে দেয়ার মতো না৷ বসে থেকে আরেক কাপ চা অর্ডার দিল। মনে এলোমেলো চিন্তা! সেইসব চিন্তার ভীড়ে ফেলে আসা দিনের চমৎকার সব স্মৃতি নড়েচড়ে উঠল। অর্ণব আনমনেই আওড়াল, “বাবলা থেকে সোজা তবলা বানিয়ে ছেড়েছে। কী ডেঞ্জারাস মেয়ে!”

***

অর্ণবের মা ও মিঠির মা একই গ্রামের বাসিন্দা। আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও ভালো বন্ধুত্ব ছিল। সেই হিসেবে ছেলের জন্য পাত্র খুঁজতে গিয়ে মিঠিকে ভীষণ পছন্দ করেছিলেন দিলারা জামান। এমবিবিএস শেষ করে কিছু দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিল অর্ণব। সেই সময় দুই মা যুক্তি করে ছেলেমেয়েকে দেখা করার সুযোগ করে দেন মফস্বলের একটা ছোটোখাটো রেস্টুরেন্টে। অর্ণব যতই উচ্চতর ডিগ্রির অজুহাত দেখাক, কাজ হয়নি। মায়ের এক কথা, মেয়ে পছন্দ করেছেন, তাকে দেখতে হবে। ভালোমন্দ কথা বলতে হবে। এরপর দিনতারিখ পাকা করতে হবে। ব্যস, অর্ণব সুযোগ পেল। শুরুতেই সবাইকে জানিয়ে দিল, মেয়েকে একদম পরিপাটি ও গুছানো স্বভাবের হতে হবে, সেইসাথে ভীষণ ম্যাচিওর ও বোধবুদ্ধি সম্পন্ন। কিন্তু হলো উলটা! কেন? চলুন জেনে আসি।

সেদিন রেস্টুরেন্টে, দেখা করতে এসে মিঠি অর্ণবকে দেখা মাত্রই বলেছিল, “আমার মাথায় অনেক উঁকুন আছে। সারাক্ষণ কিলবিল কিলবিল করে। আমাকে বিয়ে করলে রোজ অসংখ্যবার আপনাকে উঁকুনের কামড় খেতে হবে।”

এইটুকু বলে হাতে থাকা কিটক্যাটে কামড় বসিয়ে পাত্রের মন-মেজাজ বুঝার চেষ্টা করল সাবরীনা মিঠি।

পাত্র সেজে বসে থাকা অর্ণব তার দিকে হা করে তাকিয়েছিল। শুনতে শুনতে মুখের জুসটা মুখ ফস্কে সশব্দে বেরিয়ে এলো। সামনে যা কিছু ছিল, সব খাবার নোংরা হয়ে গেল মুহূর্তেই। ঝটপট ওয়েটার দেখে জায়গা পরিষ্কার করে নিতে চাইল সে।

তাকে বিব্রত করতে মিঠি ফের বলল, “শুনেছি, উঁকুন না কি রাতে সাত চৌকি দৌড়ে। বলা তো যায় না, রাতে একসাথে ঘুমানোর পর সকালে উঠে দেখলেন, আমার মাথার সব উঁকুন আপনার মাথায় ট্রান্সফার হয়ে গেছে। তখন কেমন লাগবে?”

অর্ণব তার এসব কথা পাত্তা দিল না, তবে কেমন যেন একটা মুখ করে বলল, “উঠা যাক?”

মিঠি বলল, “বিশ্বাস হচ্ছে না তাই না? এই দেখুন!”

ভ্যানিটিব্যাগের ভেতর থেকে কাগজে মুড়িয়ে রাখা একগাদা ছোটো-বড়ো উঁকুন পাত্রের সামনে রেখে মিঠি আবারও জোর গলায় বলল, “এগুলো এখানে আসার আগেই চিরুনি চালিয়ে মাথা থেকে নামিয়েছি। আপনি চাইলে এখুনি দেখাতে পারি! ওয়েট…।”

ব্যাগ থেকে কেবল চিরুনি বের করতে যাচ্ছিল মিঠি, এরমধ্যেই অর্ণব মুখের সামনে টিস্যু চেপে বলল, “আমি অসুস্থবোধ করছি। যাচ্ছি হ্যাঁ? আপনি থাকুন।”

জান বাঁচাতে ভোঁ দৌড় অর্ণবের। মিঠি চেয়ারে বসে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। আশেপাশে কয়েকজোড়া কৌতূহলী চোখ তাকে দেখল, তবে সে সেইসব দৃষ্টিকে পাত্তা দিল না। বিল মিটিয়ে, হাতের কাগজ দলা পাকিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দু’হাতে তালি বাজিয়ে আওড়াল, “কিপটে কোথাকার! বিল তো মিটিয়ে যাবে না কি!”

এরপর নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কথা ভেবে বিড়বিড়াল, “বিয়ে তো আপনাকে এবার ভাঙতেই হবে মি.। আপনার মতো শুচিবাই লোক আর যাই হোক, উঁকুনওয়ালা মেয়ে পছন্দ করবে না।”

অর্ণব ভীষণ পরিপাটি স্বভাবের ছেলে। রুমের আনাচে-কানাচে নোংরা সে পছন্দ করে না। শুচিবাই না হলেও খুঁতখুঁতে। আর পোকামাকড় তো একেবারেই দেখতে পারে না। এইটুকু মিঠি জেনে যাওয়াতেই তাকে বিব্রত করার এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে মাত্র।

বিজয়ীর হাসি ঠোঁটে নিয়ে আবারও একটা চকোলেটে কামড় দিয়ে মিঠি বের হতে যাবে, এমন সময় দেখল অর্ণব আবার দৌড়ে তার দিকেই আসছে।

কপালে হাত চেপে বিরক্তি প্রকাশ করার আগেই অর্ণব তার সামনে এসে বলল, “বাসায় বলে দিবেন, পাত্র নাকউঁচু স্বভাবের। আপনার মতো উঁকুনওয়ালীকে সে ঘরওয়ালী করবে না। যে নিজেকে জীবাণুমুক্ত রাখতে পারে না, সে ঘরকে কীভাবে জীবাণুর হাত থেকে বাঁচাবে?”

মিঠি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন।”

“রিয়্যালি? আর আপনি যা করলেন, সেটা অপমান না?”

“জি না। আমার যা ইচ্ছে হয়েছে আমি সেটাই করেছি। তাতে আপনার সমস্যা কী, মি. বাবলা না কি তবলা?”

“এই খবরদার! আমাকে বাবলা-তবলা এসব বলবেন না। আমার একটা সুন্দর নাম আছে।”

“তাই? কিন্তু আমার কাছে তো এই বাবলা থুরি তবলাটাই ইন্টারেস্টিং লাগছে।”

অর্ণব আঙুল নাচিয়ে বলল, “আমার নাম অর্ণব আর রাফি। আমি আমার নামের মতোই স্বচ্ছ, সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন।”

“এ্যাহ, আসছে… নামের বাহাদুরি দেখাতে।”

অর্ণব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বিয়ে ক্যান্সেল।”

“অফকোর্স! আপনার মতো আধপাগলকে কে বিয়ে করবে?”

“কী বললেন আপনি?”

“শুনতে পাননি?”

“আপনি একটা জলজ্যান্ত পোকামাকড়ের কারখানা! ফাজিল…। আর যদি আমাকে ফোন করেছেন তো, আপনাকে লেকের পাড়ে থাকা নর্দমার স্তুপে ফেলে আসব।”

“কী? যত বড়ো মুখ নয়, তত বড়ো কথা! আপনাকে আমি আজ উঁকুনের পুকুরে চোবাব।”

চকোলেট শেষ করে মিঠি নিজের জামার লম্বা হাত গোটাতে গোটাতে এক পা এক পা করে অর্ণবের দিকে এগোলে, অর্ণব চোখ বড়ো বড়ো করে একবার তাকিয়েই দৌড় দিল। এক দৌড়ে রিকশায় উঠে ওই স্থান ত্যাগ করে গলা উঁচিয়ে বলল, “আপনার উঁকুন আপনার কাছে রাখুন। প্রয়োজনে ফ্রাই করে খান। তা-ও ওইসব নোংরা পোকামাকড় মানুষের মাথায় ট্রান্সফার করার মতো বিচ্ছিরি চিন্তাভাবনা মনে আনার সাহস করবেন না। নইলে কিন্তু আমি আপনাকে…।”

মিঠি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের নম্বরে ডায়াল করে গমগমে স্বরে বলল, “ওই তবলার বাবা-মাকে বলো, বিয়ে ক্যান্সেল। ওর মতো ঘাড়মাথাহীন বান্দাকে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই আমার।”

যত সহজে বিয়ে ভাঙার এই নাটকটা সাজিয়েছিল মিঠি, তত সহজে কাজটা হয়নি। পরদিনই দুই মা মিলে আলোচনা সেরে বিয়ের দিনতারিখ পাকা করে জমিয়ে শপিং করা শুরু করেছিলেন। সব দেখে মিঠির তখন মাথায় হাত দিয়ে কাঁদার অবস্থা!

***

চলবে…