#হারানো_হিয়ার_নিকুঞ্জ_পথে
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব – ৫
ফাতেহা বেগমের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে সপ্তাহ দশদিন মায়ের কাছেই থাকল মিঠি। তবে রোজ দুইবার করে সকালে ও সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়িতে এসে রান্নাবান্নার কাজ সামলাতে হয়েছে। সেই সময়ও তাকে শাশুড়ির কটু কথা শোনে, চোখের পানি ফেলতে ফেলতে কাজ করতে হয়েছে।
প্রতিটা মুহূর্তে দিলারা জামান মিঠিকে হুমকির স্বরূপ বলতেন, “আমার কথা শোনো, বউমা। বউ হয়ে এসেছ, বউ-ই থাকো। পড়াশোনার ভূত মাথা থেকে তাড়াও। এত পড়ে কী হবে?”
মিঠি তর্কে না গেলেও যথাসাধ্য চেষ্টা করত ঠাণ্ডা মাথায় শাশুড়িকে বুঝানোর কিন্তু সম্ভব হতো না। ‘পড়াশোনা করলে যে শুধু চাকরিই হয়, তা তো না আন্টি। পড়াশোনা করলে মানুষ জ্ঞানী হয়, বোধবুদ্ধি জাগ্রত হয়। ভালোমন্দ ও ভুল-সঠিকের মধ্যে থাকা পার্থক্য বুঝতে পারে। এইটুকুর জন্য হলেও আমি পড়াশোনা করতে চাই।’ এভাবে বলেও বাঁচতে পারত না। কেউ তার কথাকে গুরুত্বই দিত না।
উনি ফট করে বলে উঠতেন, “এত বোধবুদ্ধির দরকার নেই, বউমা। যা বলছি ভালোমতো শোনো। নয়তো এ বাড়িতে তোমার জায়গা নেই। আমি আমার ছেলের জন্য ঘরণী খুঁজে আনব।”
তার শ্বশুর রওনাফ সাহেবও একইভাবে বলতেন, “মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কাজ কী মা? সেই তো শ্বশুরবাড়ির বাসন মাজতে হয়! ডিউটি যেহেতু এটা, মনোযোগ দিয়ে এটাই করো।”
“আপনারা আপনাদের ছেলেকে কেন পড়াশোনা করিয়েছেন?”
দিলারা জামান উত্তর দেন, “ছেলেরা তো পড়াশোনা করবেই। চাকরিবাকরি করে টাকা-পয়সা কামাবে। বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিবে। ভালো চাকরি পেতে গেলে উচ্চশিক্ষার দরকার আছে।”
“আর মেয়ের বেলায় এই নিয়মটা বদলে যায় কেন? যাদের ঘরে আমার মতো একটিমাত্র কন্যা সন্তান আছে, সেই বাবা-মায়ের দায়িত্ব কে নিবে?”
“সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়, বউমা।”
“কিন্তু আমাকে দেখতে হবে। আমার আম্মুর জন্য আমাকে আরও ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে। তার দায়িত্ব নিতে হবে।”
“তাহলে তুমি বিয়েতে রাজি হয়েছিলে কেন? চলে যাও এখান থেকে। আমার ছেলের ইনকামের একটা টাকাও আমি তোমার পিছনে খরচ হতে দিব না।”
“আপনার ছেলে কিন্তু আমার স্বামী। তিনি যদি আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন, আপনি বাধা দেয়ার কে?”
“আমার ছেলেকে কিনে নিয়েছ বুঝি? দাঁড়াও, শিগগির তোমার ব্যবস্থা করছি। আমার পিঠে ছুরি বসিয়ে আমারই ছেলের টাকা-পয়সা হাত করবে! আর আমি বসে বসে দেখব? হবে না। এই বাড়ি থেকে যেতেই হবে তোমায়। একেবারে। এখানে আমি তোমাকে আর একদিনও সহ্য করব না।”
এমন না যে, মিঠি এখানে থাকার জন্য মরিয়া। সে শুধু শিক্ষার মর্যাদা এবং ছেলে ও মেয়ে যে সমান, দু’দিকেই যে শিক্ষার প্রয়োজন আছে, এটা ওনাদের বুঝাতে ব্যর্থ বলেই খারাপ লাগত বেশি। কেন যে কিছু কিছু মানুষ মেয়েদের শিক্ষাদীক্ষাকে এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, বুঝে আসে না তার। এমনভাবে বলার পর আর কোনোপ্রকার দ্বন্দেও যায়নি। কান ভরে শুনেছে, চোখের পানি ফেলেছে।
দু’জনের এমনতর কথাবার্তার মধ্যেই অর্ণব এসে উপস্থিত হলো বাড়িতে। মিঠিকে তাড়া দিয়ে বলল, “তৈরী হোন জলদি। আপনার তো সামনে ইনকোর্স। এভাবে ঘর-সংসারের পিছনে পড়ে থাকলে বছর শেষে রেজাল্টের খাতায় গোল্লা থাকবে।”
দিলারা জামান থেতে উঠে বললেন, “ও কী কথা! কত রান্নাবান্না বাকি! এখন কেন যাবে?”
“এখন যাবে মানে, এখনই যাবে।”
মিঠি তবুও সবজি কাটাকুটি করছিল। অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতের কাজ শেষ হোক, এরপর রেডি হচ্ছি।”
মিঠি এই কথা বলতে দেরী, দিলারা জামানের বটি হাতে নিতে দেরী নেই। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন যে, মিঠি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপতে লাগল।
অর্ণব কিছু বলার আগেই দিলারা জামান বটি নিজের গলায় ছুঁইয়ে বললেন, “আজ তুই বলে যাবি, তোর কাছে কে গুরুত্বপূর্ণ! তোর আম্মা, না কি বউ!”
অর্ণব ঝটপট হাত বাড়িয়ে বটি সরিয়ে নিতে গেলে দিলারা জামান কয়েকপা দূরে সরে বললেন, “খবরদার কাছে আসবি না। এক’পা এগোলেই আমি নিজেকে শেষ করে দিব।”
অরূপ ভার্সিটিতে ছিল আর অর্ণবের বাবা ছিলেন বাজারে। মায়ের এই জঘন্য আচরণ কীভাবে থামাবে উপায় খুঁজে পেল না অর্ণব। তবুও চেষ্টা অব্যাহত রেখে বলল, “আম্মা, আমার কথা শোনো। পাগলামি করো না।”
“আমি পাগলামি করছি না। তুই অশান্তি দিয়ে মারছিস আমাকে। আমি একটা বউমা চাই, কোনো চাকরিয়ান নারী চাই না, যে সারাদিন পরপুরুষের সাথে ঘুরবে আর দিনশেষে আমার ঘরে এসে গিন্নীপনা দেখাবে! এসব আমি বরদাস্ত করব না। তুই ওকে বিদায় করে দে।”
“তুমি নিজেই তো তাকে পছন্দ করে এনেছ। এখন কেন এসব কথা বলছ?”
“ভুল করেছি ভুল! ওর যে ডানা গজাবে এটা বুঝিনি। ইচ্ছে তো করছে এক কোপে ওকে শেষ করে দিই।”
“আম্মা…।” চিৎকার দিয়ে উঠল অর্ণব।
ছেলের চিৎকারে দিলারা জামান ফোঁসফোঁস করে উঠলেন, “আমার সাথে চিৎকার না করে ওকে বুঝালেই তো পারিস। পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিলে কী এমন ক্ষতি?”
“ক্ষতি কী, সেটা তুমি বুঝবে না আম্মা। যা কিছুই হয়ে যাক, পড়াশোনা বাদ দেয়ানো যাবে না।”
“এটাই তোর সিদ্ধান্ত, বাবলা?”
“হ্যাঁ!”
“তাহলে তুইও শোন, ও যদি আর একদিনও এই সংসারে থাকে, তুই তোর আম্মাকে হারাবি।”
বিয়ের ছ’মাসও হয়নি, এরমধ্যে বাড়ির বউকে নিয়ে মায়ের এই ভুল ধারণা ও অপমানজনক ব্যবহারে অর্ণব কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিল, এমন জঘন্য পরিবেশে মিঠিকে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না। এখনও সংসারই হয়নি, বোঝাপড়া হয়ে উঠেনি, মনের লেনদেন হয়নি, তারমধ্যে সাংসারিক যন্ত্রণা, মায়ের বর্বরতা, সবমিলিয়ে এমন অসহনীয় ঘর-সংসার ও বন্ধন মিঠির জন্য নয়। একটা মেয়ের স্বপ্ন ও জীবন, কোনোকিছুই নষ্ট করার অধিকার তার নেই। জোর করেও যদি এই সম্পর্ক রাখতে চায়, তবুও মিঠি তাকে ভুল বুঝবে আর মা-ও দিনদিন আরও হিংস্র হয়ে উঠবেন। এমন পরিবেশে যে-ই থাকবে, সে-ই মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। জেনে-বুঝে কী করে মিঠিকে এমন যন্ত্রণাদায়ক জীবন সে উপহার দিবে? মিঠি তো তার ক্ষণিকের মোহ নয়! হৃদয় কুঠুরিতে একটু একটু করে জমে ওঠা স্বচ্ছ ও সুন্দর অনুভূতির নাম। যাকে সে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে শুরু করেছে।
চোখের সামনে মিঠির ভবিষ্যৎ নষ্ট হোক, সেটা মানতে পারল না অর্ণব। তা-ই মাকে থামাতে শেষ চেষ্টা করতে বলল, “ঠিক আছে। তুমি যা বলবে, তাই হবে। আমি মিঠিকে বিদায় করে দিব। কিন্তু এখুনি সম্ভব না।”
“কেন সম্ভব না? তুই এখুনি ওকে তালাক দে। এমন বউ আমার চাই না। কথাবার্তা কিচ্ছু শোনে না। নিজের মর্জিমতো চলে। ঘর-সংসার দেখাশোনা করবে না, সে না কি পড়াশোনা করে চাকরি করবে। দরকার নেই ওর মতো বউমার। বের করে দে ওকে।”
“আম্মা, মাথা ঠাণ্ডা রেখে আমার কথা শোনো। আমি এমনিতেও কানাডা চলে যাচ্ছি। আমার সবকিছু কনফার্ম হয়ে গেছে। যাওয়ার আগে আমি ওকে ডিভোর্স দিয়ে যাব।”
“ঠিক তো?”
অর্ণব নিজের মনের অভ্যন্তরে সূঁচ ফোটার মতো যন্ত্রণা অনুভব করলেও সেটুকুকে খুব গোপনে লুকিয়ে রেখে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক।”
“যদি তা না হয়, তাহলে কিন্তু তুই আমার মরা মুখ দেখবি, বাবলা!”
অর্ণব ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, “সেটা আমি কখনওই হতে দিব না, আম্মা।”
দিলারা জামান খুশি হয়ে, হাতের বটি ফেলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমার সোনা ছেলে। আমি তোকে আবার বিয়ে করাব দেখিস।”
অর্ণব মনে মনে বিড়বিড়াল, “তুমি তো আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেললে, আম্মা। মৃত মানুষের আবার বিয়ের শখ কী! ঘর-সংসার কী!”
মিঠি নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে মা-ছেলের কথা শুনল শুধু। একসময় দিলারা জামান একটু সহজ হয়ে মুখ ভেংচিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
অর্ণব মিঠিকে বলল, “ঝটপট তৈরী হোন আপনি। যাওয়ার পথে বাড়ি গিয়ে আপনার আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবেন।”
মিঠি চোখ তুলে বলল, “আমি যদি চলে যাই, আম্মুকে কে দেখবে?”
“চিন্তার কিছু নেই। বাড়ির সবাই আছে। আমি কথা বলেছি। আপনার চাচ্চু আর চাচিম্মা ওনারা দেখাশোনা করবেন। যেকোনো সমস্যা হলেই ওনারা আমাদের জানাবেন। না গেলে তো আপনার পড়াশোনার ক্ষতি হবে।”
***
বাসায় আসার পর হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়ে মিঠি। বাবা নেই, মায়ের কী হবে, মা থাকবে কী করে, এই এক চিন্তায় সে অস্থির হয়ে গেল। কেঁদেকেটে দুর্বল যেমন হলো, তেমনই জ্বর বাঁধিয়ে বিছানাকেই আপন করে নিল। সে রাতে মিঠির শরীরের তাপমাত্রা কমাতে তাকে ক্রমাগত জলপট্টি দিয়ে গেল অর্ণব। মধ্যরাত পর্যন্তই সেবা করল। ঔষধ খাওয়াল, তবুও জ্বর ছাড়ল না।
শেষরাতে আবারও কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে, একটু উষ্ণতা খুঁজতে অর্ণবের বুকের ভেতর গুটিয়ে গেল মিঠি। অর্ণব আবারও একাধারে জলপট্টি দিল, হাত-পা মুছে দিল, তবুও যেন জ্বর নামার নাম নিচ্ছিল না। বমি-টমি করে ভাসিয়ে দিল বেচারি। চিন্তায় অস্থির অর্ণব আর কী করবে ভেবেই পেল না। এক সময় ভাবল, ফার্মেসি থেকে যদি অন্য কোনো ঔষধ এনে খাওয়ানো যায়, এতে হয়তো সেরে যাবে। কিন্তু অসময়ে ফার্মেসি খোলা মিলবে তো?
চিন্তিতমনে সে যখন বিছানা ছেড়ে নামতে যাবে, মিঠিই তাকে জাপটে ধরে রাখল। হাত দিয়ে যত সরায়, মিঠি ততই কাছে আসে। একসময় ফিসফিসিয়ে বলে উঠে, “আপনি তো বড্ড জ্বালাচ্ছেন! দূরে যাচ্ছেন কেন?”
অর্ণব তাকে জোরপূর্বক ঠেলে সরিয়ে বলল, “হুঁশে ফিরুন। দূরে না গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।”
“হোক কেলেঙ্কারি! ক্ষতি কী? আমরা তো স্বামী-স্ত্রী, তাই না?”
মিঠি যে বেহুঁশের তালে উল্টাপাল্টা বকছে, এটা ভেবেই খারাপ লাগল অর্ণবের। দু’হাতে দূরে ঠেলতে গেলে, মিঠি একদম তার বুকের মধ্যিখানে নাকমুখ ঘষে দিয়ে বলল, “এখানে থাকি? ভালো লাগছে।”
অর্ণব ধমকে উঠে বলল, “খুব খারাপ হচ্ছে, চকোলেট। এভাবে চলতে থাকলে একটা পুরুষ বেশিক্ষণ নিজের বৈধ নারীর থেকে দূরে থাকতে পারবে না।”
“তাহলে দূরে যাচ্ছেন কেন? কাছে আসুন!”
মিঠি এবার অঘটন ঘটিয়ে ফেলল৷ দু’হাতে অর্ণবের গলা পেঁচিয়ে ধরে, উত্তপ্ত ঠোঁটের প্রথম স্পর্শ দিল রুক্ষশুষ্ক ঠোঁটে। অর্ণব বার কয়েক নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না। এমন অঘটন ঘটন পটিয়সী নারী জীবনে সে আর দেখেনি। তার সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল ওখানেই। সে-ও সম্পর্কে থাকা অদৃশ্য দেয়ালটা ভেঙে দেয়ার চেষ্টায় কাছে এলো। মাকে দেয়া কথাটা তখন আর মাথায় রইল না। বাকি সময়টুকু কাটল স্বপ্নের চেয়েও ভয়ানক সুন্দরভাবে।
পরদিন মিঠির ঘুম ভাঙল দুপুরে। অর্ণব তখন বাসায় ছিল না। তবে একটা ঔষধ ছিল সেন্টার টেবিলে রাখা। সাথে একটা চিরকুট, তাতে লেখা, “ঔষধটা খেয়ে নিবেন। কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। আর ব্যাগপত্র গুছিয়ে রাখুন৷ আজই আপনি হোস্টেলে উঠবেন।”
কীসের ঔষধ বুঝতে একটু সময় লাগল মিঠির। যখন বুঝল, তীব্র রাগে ফেটে পড়ল সে। ঘরের সবকিছু ভাংচুর করে, অর্ণবের নম্বরে ডায়াল করে রাগত কণ্ঠে বলল, “আপনি একটা অসভ্য পুরুষ। সুযোগ পেয়ে নিজের আসল রূপ দেখিয়ে দিয়েছেন। আমি এখন নুহাশের সামনে দাঁড়াব কী করে? আমি নাহয় বেহুঁশ ছিলাম, আপনি তো হুঁশে ছিলেন। কেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি? কেন আমাকে হুঁশে ফেরাননি! আপনাদের মতো পুরুষের জন্যই মেয়েরা কোত্থাও নিরাপদ না।”
এইটুকু বলে মনের জ্বালা মিটিয়ে, ঔষধটা খেয়ে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে গোসল শেষ করল মিঠি। এরপর ব্যাগপত্র গুছিয়ে, মেজাজে আগুন নিয়ে অর্ণবের অপেক্ষায় রইল।
অর্ণব এসে, তার ব্যাগটা গাড়িতে তুলে বলল, “যা হয়েছে, ভুলে যাবেন৷ আর এসব কথা নুহাশকে বলার দরকার নেই।”
মিঠি খেপাটে স্বরে বলল, “সবকিছু এত সহজ? আপনি কী করে পারলেন এটা করতে? আমার তো নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে এখন!”
“চকোলেট…।”
“খবরদার! আর একবার যদি ওই ফালতু নামে আমাকে ডেকেছেন তো, আপনাকে আমি…।”
দাঁত কিড়মিড় করে কাঁপতে থাকল মিঠি। অর্ণব চাপা শ্বাস ছেড়ে বলল, “আমরা আজই ডিভোর্স পেপারে সাইন করব। এরপর তো সব আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”
এ কথা শোনে মিঠি একটু রিল্যাক্স হলো। শব্দ না করে গাড়িতে উঠে বসল। অর্ণবও পাশের সিটেই বসল। পুরো রাস্তায় কেউ কোনো কথা বলল না। তবে কোর্টে গিয়ে ডিভোর্স পেপারে সাইন করার পর মিঠিকে একটু স্বাভাবিক দেখা গেল। যেন ভারী বোঝা থেকে মুক্তি পেল! পুরোটা সময় কারও চোখে কষ্ট ছিল না, হা-হুতাশ ছিল না। এই দিনের জন্য আগে থেকেই তো দু’জনে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তাহলে কষ্ট কেন হবে? মন কেন পুড়বে? হা-হুতাশ করেই বা লাভ হবে কী?
এরপর গার্লস হোস্টেলে এসে, গাড়ি থামিয়ে অর্ণব সামান্য কিছু টাকা মিঠির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এগুলো রাখুন। প্রয়োজনে খরচ করবেন।”
মিঠি মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আমার টাকা লাগবে না।”
“এটা দেনমোহরের টাকা। আরও আগেই দেয়া উচিত ছিল! কিন্তু পরিস্থিতি…।”
কিছু সময় চুপ থেকে অর্ণব বলল, “এখানে যদি কোনো সমস্যা হয়, নুহাশকে জানাবেন। ও সব দেখবে। আর ইদ্দতের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে, ওকে বিয়ে করে ফেলবেন।”
মিঠি উত্তর দিল না। মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
অর্ণব হেসে বলল, “আগামী সপ্তাহে আমার ফ্লাইট! এরপর দেশে ফিরে আপনাকে একটা সুখী ও সুন্দর জীবনে দেখতে চাই। আমাকে কথা দিন, গতরাতের সবকিছু আপনি ভুলে যাবেন! আর এই ভুলটার জন্য আমার ওপর কোনো অভিযোগ রাখবেন না!”
মিঠি চোখ বন্ধ করে, নিজেকে একটু সময় দিল। এরপর বলল, “আপনি চলে যান। আমি এতটাও বেকুব নই যে, আপনার মতো গর্দভের স্মৃতি মনে নিয়ে জীবন থামিয়ে রাখব। যান, জলদি যান। আর একমিনিটও যদি আপনাকে এখানে দেখেছি, মাথা ফাটিয়ে ফেলব একদম।”
অর্ণব বুঝল, মিঠি তার কাজে ও আচরণে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু কী করবে? কাছে তো সে আগে আসেনি! মিঠিই তাকে বাধ্য করেছিল। এমন করে কাছে এলে দূরে ঠেলা যায়? এখন তো তার এই ভুল ভাঙাতেও যে ইচ্ছে করছে না। সব তো শেষ-ই। কী হবে কথা বাড়িয়ে? তারচে কিছু অব্যক্ত অনুভূতি মনে নিয়ে সে দূরেই চলে যাক। মিঠি এই শহরে ভালো থাকুক। নতুনভাবে শুরু করুক সব৷ ভুলে যাক তারমতো কাপুরুষকে!
মিঠিকে গেটের সামনে রেখে, ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে অর্ণব বলল, “আপনি এগোন মামা। এখানে আর কোনো প্রয়োজন নেই।”
***
চলবে…