#হারানো_হিয়ার_নিকুঞ্জ_পথে
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব – ৬
সেদিনের পর প্রতিদিন একবার করে হোস্টেল থেকে ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তার দিকে চেয়ে থাকত মিঠি। যদি অর্ণব একবার আসে। যদি এসে জানতে চায়, এখানে মিঠির অসুবিধা হচ্ছে কি না! তার কিছু লাগবে কি না। কিন্তু অর্ণব আর আসেনি। আসার কথাও না। যে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় সেখানে আর আশা রাখতে নেই। তবুও মিঠি আশা রেখেছিল৷ খুব বেশি ভরসা করেছিল বলেই, মানিয়ে নিতে চেয়েছিল৷ সম্পর্ক তখন তার কাছে একটু একটু করে ভীষণ মূল্যবান হয়ে ধরা দিতে থাকে। কিন্তু দিলারা জামান, এমন এক ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরী করলেন, সেখানে অর্ণবের মতো শক্তপোক্ত মনের পুরুষ শুকনো মাটিতে আঁচড়ে পড়ে খাবি খেতে লাগল। অর্ণবকে সেদিনই এত অসহায় দেখার পর মিঠি নিজের সিচুয়েশন কাউকে বুঝানোর সুযোগই পায়নি। কেবলই মনে হয়েছে, তার জন্য মা ও ছেলের মধ্যে দ্বন্দ হচ্ছে। যদি সে না থাকে এই দ্বন্দ থাকবে না। তাই তার দূরে সরে যাওয়াই মঙ্গল। এজন্য মন কী চায়, এটা মুখ ফুটে বলা হয়ে উঠেনি। কেবলই একটা দীর্ঘশ্বাস ও কয়েকফোঁটা চোখের পানির মধ্য দিয়ে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তাছাড়া, নিজের মা ও নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নিয়ে মিঠির তখন অথৈজলে ডুবে যাওয়ার অবস্থা। অর্ণব মাকে খুশি রাখতে ঝটপট বলেও দিয়েছিল ডিভোর্স দিয়ে দিবে। আর মিঠি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু শুনছিল। একটা সম্পর্কে বিচ্ছেদ শব্দটা ব্যবহার করা যত সহজ, সেই বিচ্ছেদটাকে কার্যকর করা ততটাই কঠিন। অথচ এই কঠিন কাজ নিমিষের মধ্যেই সহজ করে দিল অর্ণব। এত কাছে এসেও কেউ কীভাবে দূরে চলে যেতে পারে? কেউ কীভাবে ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে পারে? একবার অন্তত অর্ণব যদি বলত, ‘আমার জন্য অপেক্ষা করবেন! আমি ফিরে এসে সব সামলে নিব।’ কিন্তু অর্ণব সে কথাও বলেনি! বলতে পারত না?
মিঠির নিজেরও তখন জেদ ছিল। মায়ের জন্য চিন্তা ছিল বেশি। অর্ণব যদি নিজের মাকে নাও দেখত, অরূপ ছিল, তাদের বাবা ছিলেন, কিন্তু মিঠির মায়ের, মেয়ে ছাড়া কে থাকত? অল্প বয়সে মাথার মধ্যে এত চাপ নিতে পারছিল না মিঠি। দিনকেদিন শাশুড়ির কথাবার্তা তাকে শুধু মানসিক অশান্তিই দেয়নি, বুঝিয়েই দিয়েছে, তিনি কোনোদিন ছেলের জন্য বউ চান না, চান একজন দাসী। অথচ একজন স্ত্রীর হওয়া উচিত ছিল, স্বামীর সর্বক্ষণের সঙ্গিনী পাশাপাশি একটা ঘরকে বাঁচিয়ে রাখার প্রধান খুঁটি। মিঠিকে সেই সুযোগই দেয়নি কেউ৷ না অর্ণব দিল, আর না তার শাশুড়ি।
নুহাশের কাছে ফিরিয়ে দিবে বলে, সবকিছু সে নিজের মর্জিমতো করে ফেলল। দূরে যাওয়ার আগে আবার বলেও গেছে, নুহাশ সব দেখবে। হা হা, কী হাস্যকর কথা না? প্রাক্তন প্রেমিকের দায়িত্বে রেখে গিয়ে মহান সেজেছেন! আচ্ছা, ছ’মাসের সংসারে কোনোদিন কি অর্ণব তার প্রতি দুর্বল হয়নি? তাকে আপন ভাবেনি? মায়া জন্মায়নি? যদি জন্মাত, সেই মায়া থেকেও কি একবার বলতে পারত না, ‘মিঠি আমরা এই সম্পর্কটাকে ভেঙে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাই?’
বলবে কী করে? মিঠি তো তার কেউ ছিল না। যারজন্য কাছে আসার ওই মুহূর্তটাকে গলাটিপে হত্যা করতে ঔষধ এনে রেখেছে! যেন তার ক্যারিয়ারের পথে কোনো বাধা না আসে। যেন তার কোনো ঔরসজাত সন্তান না হয়! কী অদ্ভুত মানুষ এই অর্ণব। অথচ ওই অদ্ভুত মানুষটার জন্যই মিঠির চোখে পানি আসত। জীবন ও সময় দুটোকেই তার যন্ত্রণার মনে হতো।
তবে একটা কথা সত্যি যে, অর্ণব দেশ ছাড়ার পর মিঠিকে পুরোদমে আগলে রেখেছে নুহাশ৷ তাকে কখনওই বাজে মন্তব্য ও পরিস্থিতির শিকার হতে দেয়নি। নিজে চাকরি খোঁজার ফাঁকে মিঠির সমস্ত বিপদে-আপদে পাশে থেকেছে। সময় এগোনোর সাথে সাথে অর্ণবের সাথে গড়ে ওঠা ছোট্ট সংসারের মায়া কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে মিঠি। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে দুই পরিবারের সম্মতিতে নুহাশের সাথে বিয়ে হয় তার। যদিও নুহাশ বিয়েটা আরও আগে করতে চেয়েছিল, কিন্তু মিঠি মন থেকে প্রস্তুতি নিতে পারছিল না। ফেলে আসা ছোট্ট সংসার ও মানুষ, দুটোরই মায়া কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় লেগেছিল তার৷
বিয়ের পর থেকে প্রতিটা পদক্ষেপে নুহাশকে সে পাশে পায় একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো। যেমনটা সে চেয়েছিল, ঠিক তেমনটাই। কিন্তু সমস্যা তৈরী হলো মিঠি পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে জয়েন করার পর থেকে। চাকরিতে জয়েনের পর সে পরিবারের সবাইকে সময় দিতে পারত না, আবার নিজের মায়ের জন্যও ভাবতে হতো, সবমিলিয়ে এই সংসারেও প্যারা খেতে হয় মিঠিকে। এখানেও নুহাশের বাবা-মা তার চাকরিবাকরি নিয়ে কথা শুনাতে শুরু করেন। রোজ রোজ গালিগালাজ করেন। শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদ, কেউ তাকে ছাড় দিচ্ছে না। হাঁটতে-বসতে, খেতে-ঘুমাতে সবাই তাকে কথা শুনাতে শুরু করলেন। নুহাশ প্রথমে বলেছিল, বিয়ের পর ফাতেহা বেগমকে সে এখানে নিয়ে আসবে। যেহেতু মায়ের দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ নেই, তাই সে এরূপ কথা দিয়েছিল। তার আপন চাচা-চাচিম্মার কাছেও ততদিনে ফাতেহা বেগম একটা বোঝার নাম হয়ে উঠেছিলেন। নুহাশ কথা দিলেও কিন্তু সে কথা রাখতে পারছিল না। কারণ মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার মতো সাহসী পুরুষ এই সমাজে কমই। এদিক থেকে নুহাশ ও অর্ণব প্রায় সমানই। দু’জনের কাছেই মায়ের আদেশ গুরুত্বপূর্ণ! মায়ের কথাই শেষ কথা!
নিজের মায়ের জন্য ভাবতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে খারাপ হয়ে যায় মিঠি। নুহাশও ছেড়ে কথা বলত না। এই করতে করতে সাজানো-গোছানো একটা সংসারও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সময়ের সাথে সাথে মিঠি ও নুহাশ দু’জনেরই মত ভিন্ন হতে লাগল।
এসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত নুহাশ একদিন বলল, “তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও, মিঠি।”
মিঠি উত্তর দিল, “কেন? চাকরিতে কী সমস্যা?”
“তুমি কি বুঝতে পারছ না, আমাদের মাঝখানে দূরত্ব চলে এসেছে? সারাদিন দু’জন বাইরে থাকি। বাসায় ফিরে অফিসের কাজ নিয়ে পড়ে থাকি। এমন করলে আমাদের সংসারটা হবে কী করে?”
“কিন্তু আমি চাকরি না করলে আমার আম্মুর কী হবে?”
“আম্মুকে আমাদের কাছে নিয়ে এসো। উনি এখানেই থাকবেন। আমি তার দায়িত্ব নিব।”
“এটা কি মা মেনে নিবেন?”
“কেন নিবেন না? আমি বুঝালে ঠিকই মেনে নিবেন। তুমি ডিভোর্সি জেনেও বউমা বানিয়ে ঘরে তুলতে পারলেন, আর এটা মেনে নিবেন না, কেন? নিশ্চয়ই মানবেন।”
“তুমি কি আমাকে অপমান করলে?”
“অপমান করিনি। যা সত্যি তাই বললাম। এই সমাজে ডিভোর্সি মেয়ের কত কথা শুনতে হয় জানো তো! আমি চাইলেই তোমাকে অসম্মানের মুখে ফেলতে পারতাম। কিন্তু তা করিনি। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। সব জেনেই ভালোবাসি। সারাজীবন বাসবও।”
“এসব বলে কী বুঝাতে চাও? তুমি আমাকে করুণা করেছ?”
“না মিঠি, ভুল ভাবছ তুমি। আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। সারাটা জীবন তোমার সাথেই থাকতে চাই।”
মিঠি নীরবে বসে থাকলে, নুহাশ মিঠির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আগলে নিয়ে বলল, “আমরা একটা বেবি নিই? হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“সব ঠিক নেই বলছ?”
“মিঠি একটা সংসার চাই আমি। পরিপূর্ণ সংসার। প্লিজ, আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না। আমি কথা দিচ্ছি, তুমি, তোমার মা, কারোরই কোনো অসম্মান এখানে হবে না।”
“ঠিক তো?”
“হ্যাঁ, ঠিক।”
নুহাশের কথাও চাকরিও ছেড়ে দিল মিঠি। এরপর একদিন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে নুহাশ আস্তেধীরে জানতে চাইল, “একটা সত্যি কথা বলো তো!”
স্বামীর আদরে ডুবে-ভেসে মিঠি উত্তর দিল, “কী?”
“তোমরা কাছাকাছি এসেছিলে কোনোদিন?”
“যেমন?”
“অর্ণব তোমায় ছুঁয়েছিল? যেহেতু স্বামী-স্ত্রী ছিলে আর একই ঘরে ছিলে! কাছাকাছি আসা তো অস্বাভাবিক না।”
মিঠি সত্যিটা লুকাল না, স্পষ্ট করে বলে দিল। তাতে অবশ্য প্রথম কোনো রিয়েক্ট করেনি নুহাশ। কিন্তু পরবর্তী দিন একটা ভয়ানক কাজ করে বসল।
ফাতেহা বেগমকে নিজেদের বাড়ি এনে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এই নাও মা, একজন দাসী পেয়েছি। আজ থেকে এই ঘরের যাবতীয় কাজকর্ম উনি করবেন। আর ওনার মেয়ে, পতীসেবা করবে।”
লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিলেন ফাতেহা বেগম। কিন্তু মিঠি কিছু করতে পারছিল না। মাকে এই অপমান থেকে বাঁচাবে কী, নিজেকেই সে বাঁচাতে পারল না। স্বামী হয় মানুষের ভরসার জায়গা, সেই স্বামীই হয়ে গেল তার ভয়ের জায়গা। চব্বিশটা ঘণ্টা তাকে মানসিক-শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে বুঝিয়ে দিল, সে ঠিক কী পরিমাণ ভয়ানক পুরুষ! মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার এই ভয়ংকর রূপ দেখে মিঠির কেবল নিজেকেই থুতু মারতে ইচ্ছে করছিল।
এদিকে মিঠি শত চেষ্টা করেও কনসিভ করতে পারছে না। স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে পারছে না। চাকরিতেও যেতে পারছে না। সবমিলিয়ে পরিবারের এই নিত্যনতুন প্যারায় সে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল।
এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচার কোনো উপায় জানা ছিল না মিঠির। একদিকে তার মা এই ঘরের একজন দাসী হয়ে গেলেন আর সে হয়ে গেল ব্যক্তিগত পুরুষের রক্ষিতা।
এমনি করে আরও মাসখানেক যখন চলে গেল, মিঠি জানাল সে আবারও চাকরিতে জয়েন করতে চায়। সেদিন নুহাশ এতটাই ভয়ংকর হলো যে, বালতিভরা পানির মধ্যে মিঠির সম্পূর্ণ মুখটা চুবিয়ে রেখে, তার সমস্ত পিঠে ধাঁরাল ব্লেড দিয়ে কেটেছিঁড়ে রক্তাক্ত করে দিল। মিঠি টের পেল, ওইদিনই সে মারা যাচ্ছে। এত অত্যাচার, এত যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায়ও খুঁজে পাচ্ছিল না। কারণ তাদের মা ও মেয়েকে সম্পূর্ণ পরিবার মিলে ঘরবন্দী রেখে নির্যাতন চালিয়েছে। এসব নির্যাতনে ফাতেহা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিন্তু পাষণ্ড মানুষগুলো তাঁকে হাসপাতালে নিল না।
মিঠিও ততদিনে আধমরা। অত্যাচার সহ্যের বাইরে চলে গেলে মিঠি বলল, “তুমি বলেছিলে, মায়ের কোনো অসম্মান হবে না৷ তবে কেন এই দিন দেখতে হচ্ছে? কেন তোমরা সবাই মিলে আমাদের সাথে এমন করছ? কী ক্ষতি করেছি তোমাদের?”
নুহাশ বলল, “আহা, ওনারা মুরব্বি মানুষ। কাজকর্ম নিয়ে কথা কাটাকাটি হলে দু’একটা কথা শুনতে হবেই। তুমি এসব মাথায় নিয়ো না।”
“একশোবার নিব। আমার মাকে আমি কোনো ধরনের অসম্মানজনক জীবন দিব না। উনি এই ঘরের চাকর নন।”
“কী বলতে চাও তুমি?”
“আমি চলে যেতে চাই। এই বাড়ি থেকে। এই সংসার থেকে।”
নুহাশ ঝটপট মিঠির চুলের মুঠি ধরে, ফ্লোরে ফেলে তাকে পা দিয়ে ক্রমাগত লাথি দিতে দিতে বলল, “বেশ্যা কোথাকার! তোর মতো মেয়েকে যে আমার ঘরে জায়গা দিয়েছি, এই ঢের! এখানেই পঁচে মরবি, কিন্তু কোত্থাও যেতে পারবি না।”
ঘরবন্দী থাকতে থাকতে মিঠির জীবনটা দিনদিন অনিরাপদ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এক দাওয়াতের দিনে, পরিবারের সবাই মিলে বাড়ির বাইরে বের হলে, মাকে নিয়ে ঘর থেকে রাস্তায় নামে মিঠি। আগে যেখানে চাকরি করত, সেখানে ফের যোগাযোগ করে, মাকে নিয়ে দুই রুমে আলাদা বাসায় উঠে গেল। সে বুঝে গেল, ঘর-সংসার তার জন্য নয়। তা-ই নুহাশের নামে থানায় মামলা করল। আদালতে ডিভোর্সের দরখাস্ত দিল। নুহাশের শত কাকুতিমিনতিও তখন আর কাজে দিল না। স্ত্রীকে সে বুঝাতেই পারল না। তার মতে এসব ছোটোখাটো ঝামেলা আর এসবের জন্য মামলা-মোকদ্দমার দরকার নেই। কিন্তু মিঠি তো ততদিনে ঘাড়ত্যাড়া মেজাজে ফিরে গেছে। তাকে আর রুখে কে? সময়ের সাথে সাথে সেই অত্যাচারের সম্পর্কও সে ভেঙে দিয়ে একাকী জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
নতুন বাসায় ওঠার পর মিঠি একদিন একটা ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হলো৷ এক বৃষ্টিভেজা রাতে গর্ভবতী এক মহিলা তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাতরাতে লাগলেন। মিঠি সেই দৃশ্য দেখে দূরে না থেকে কাছে এসে তাকে সাহায্য করল। হসপিটালে নেয়ার পর সেই মহিলা একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েই মারা গেলেন। সদ্যোজাত সন্তানকে মাতৃস্নেহ দিতেই তাকে নিজের কাছে নিয়ে এলো মিঠি। নাম দিল সামায়রা মিশু। সেই থেকে ছোট্ট মিশু ও মাকে নিয়েই দিন কেটে যাচ্ছে তার। তবে ওই এলাকায় নুহাশের অত্যাচারের জন্য চাকরিটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না। শেষমেশ চেনা শহরেই ফিরতে হলো, যেখানে একদিন অর্ণবের সাথে ছোট্ট সংসার গড়ে উঠেছিল তার। যার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ছ’মাস!
এখানকার ঠিকানা অবশ্য নুহাশ জানে না। আর ফোন-টোনও করেনি। কয়েকমাস ধরে ঠাণ্ডা মেরে আছে। এমনই থাক! তারই শান্তি। যেহেতু সম্পর্ক নেই, যোগাযোগ রাখার প্রশ্নই উঠে না।
পিছনের দিনগুলো হয়তো মিঠি ভুলেই যেত, যদি না অর্ণব আবার সামনে আসত। হুট করে তাকে সেদিন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দেখে বুকের ভেতর তুফান শুরু হয়েছিল। মেপে মেপে কথা বলা ছাড়া কোনো উপায় জানা ছিল না। সেইযে অর্ণব বলেছিল, ফিরে এসে তাকে সুখী দেখতে চায়! তাই নিজের দুঃখী জীবনের গল্প তাকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করল না। এমনকি মিশুকে নিয়েও মিথ্যে বলল, যেন অর্ণব তাকে সুখী জেনে নিজেও সুখী হয়।
অফিস থেকে ফেরার পথে ডে কেয়ার থেকে মেয়েকে নিয়ে শপিংমলে প্রবেশ করল মিঠি। মিশুকে কাঁধের একপাশে, একহাতে আগলে রেখে অন্যহাতে বাচ্চার জন্য দরকারী জিনিস পছন্দ করে বাস্কেটে ভরছিল, এমন সময় পিছন থেকে একটা আর্তনাদ কানে এলো।
ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকিয়ে চমকে গেল মিঠি। অর্ণবের মাথার চুলগুলো দু’হাতে টেনে ধরেছে মিশু। এত জোরে টান দিয়েছে যে, বেচারা চিৎকার দিয়ে উঠেছে। সে-ও ছোটো হাতটা ধরে ঘাড় ফিরিয়েই চমকে গেল।
মিঠি আলগোছে বাচ্চার হাত সরিয়ে, মেয়েকে শাসন করে বলল, “তুমি তো দিনদিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ! এসব কী? মানুষের কি ব্যথা লাগে না?”
ওইটুকু বাচ্চা ধমক খেয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলল। তার কান্নার ধরন দেখে অর্ণব হেসে উঠে, গালদুটোতে হাত বুলিয়ে বলল, “আহা… টুনটুন সোনা! এত কাঁদে না।”
মিঠি চোখমুখ রাঙিয়ে বলল, “ওর নাম টুনটুন না মি. বা…। স্যরি, এ্যা আর।”
“মিশু, রিশু, নিশু যাইহোক, আমি ওকে টুনটুন বলেই ডাকব।”
মিঠি কথা না বাড়িয়ে বাস্কেট চেক করে, দাম মিটিয়ে, বের হওয়ার সময় খেয়াল করল, ছোট্ট একটা টেডিবিয়ার মিশুর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে অর্ণব। বাচ্চাটা তাতেই কান্না ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠেছে।
মিঠি কিছু বলার আগেই, ফোন বেজে উঠল। রিসিভ্ করে কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে বহু পরিচিত এক কণ্ঠস্বরে ভেসে এলো, “আপনি আন্টিকে একা ছাড়লেন কী করে, ভাবী? এই ক’দিনে উনি এখানে একা থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সামান্য একফোঁটা পানি দেয়ারও কেউ নেই। দুর্বল শরীর নিয়ে গাড়িতে উঠতে গিয়ে পড়ে গেছেন। যদি আমি না দেখতাম, দুর্ঘটনা ঘটে যেত।”
***
চলবে…