হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে পর্ব-০৮ এবং শেষ পর্ব

0
28

#হারানো_হিয়ার_নিকুঞ্জ_পথে
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
শেষপর্ব

জরুরী তলব ঠিক কীসের জন্য না বুঝলেও ভাইয়ের অনুরোধে বাড়িতে আসতে হলো অর্ণবকে। সবাই-ই তার অপেক্ষায় ছিল, সেটা প্রত্যেকের চোখেমুখে স্পষ্ট। বাবা-মায়ের মনে ও মুখে কী চলছে বুঝার উপায় নেই, তবে দু’জনে বেশ চিন্তিত। আবার অরূপ ও মুনীরা উশখুশ করছে।

প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে, তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে অর্ণব ভাইকে বলল, “এত ইমার্জেন্সি কেন?”

অরূপ ভাইয়ের কাছে এলো। হাত ধরে সোফায় বসে, অনুরোধের সুরে বলল, “আমি জানি, এই সংসার ও পরিবারের প্রত্যেকের জন্য তুমি অনেককিছু করেছ। কিন্তু নিজের জন্য একবিন্দুও ভাবোনি। মায়ের অহেতুক জেদকে জিতিয়ে দিতে নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়েছ। ঘর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখছ। এবারে আমাকে একটা সুযোগ দাও৷ আমি তোমার গার্ডিয়ান হতে চাই। তোমাকে সুখী দেখতে চাই। আমি জানি, এইবার কিছু ভুল হবে না। কারণ তুমি কোথায় আটকে আছো, সেটা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।”

অর্ণব ভণিতা না করে সোজাসাপটা বলল, “কী বলতে চাস, স্পষ্ট করে বল।”

“তুমি আবার বিয়ে করো ভাইয়া।”

কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটু থমকাল অর্ণব। তারপর মৃদু হেসে বলল, “হঠাৎ বিয়ের কথা বলছিস যে?”

“বয়স হচ্ছে না? আজ নাহয় নিজের জন্য তুমি একাই যথেষ্ট। একটা সময় তুমি যখন বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাবে, তখন কাউকে না কাউকে তোমার দরকার পড়বে, যে তোমার একমাত্র ভরসার কেউ হবে।”

“তুই আমার জন্য এতটা ভেবেছিস, এজন্য খুব ভালো লাগছে। কিন্তু আমি বিয়েশাদী নিয়ে ভাবছি না আর।”

“কেন ভাইয়া?”

“বারবার ড্রামা দেখতে কার ভালো লাগবে? তাছাড়া আমি যে চিন্তাভাবনা মনে পোষণ করে দিন অতিবাহিত করি, সেইম চিন্তাধারার মানুষ পাব খুঁজে? যদি পেয়েও যাই, মনের মিল না হলে? বিশ্বাসের একটা নীড় না হলে? সম্পর্কে ভালোবাসা না জন্মালে? সহানুভূতি ও সহমর্মিতা না থাকলে? সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান না থাকলে? তখন কী করব? বিয়ে কি শুধু সামাজিক রীতিনীতি না কি আত্মিক বন্ধনও? আমি তো বিয়েটাকে স্রেফ একটা কাগজের সিগনেচার ও কবুলের মধ্যেই এর সীমাবদ্ধতা এইটুকু মানতে পারি না। আর আমার চিন্তাভাবনার সাথে মিলে এমন মানুষ পাইনি বলেই ঘর-সংসার নিয়ে ভাবিনী আমি। অথচ দেখ, কত কী ফেস করতে হলো!”

“এখন যদি সেরকম কাউকে পাও, বিয়ে করবে?”

“সেটা সময় বলবে। তাছাড়া, দ্বিতীয়বার আমি কাউকে মানসিক অশান্তি দিতে চাইব না।”

এইটুকু বলে মায়ের দিকে তাকাল অর্ণব। দিলারা জামান চোখমুখ কেমন করে ছেলেকে একনজর দেখে বললেন, “কী বলতে চাস তুই? আমি তোর বউকে মানসিক অশান্তি দিয়েছি?”

“আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাই না, আম্মা। নেক্সট টাইম এসব বলার জন্য আমাকে আর ডাক পাঠাবে না।”

অর্ণব সোফা ছাড়ল। পিছন ফিরে ভাইকে বলল, “তোকে বলি, এমন কোনো অনুরোধ করিস না, যা আমি রাখতে পারব না।”

“কোনোদিনও বিয়ে করবে না?”

“বিয়ে থেকে মন উঠে গেছে আপাতত। যদি কোনোদিন সেরকম কাউকে পাই, যদি মতের মিল হয়, মনের মিল হয়, হয়তো ভেবে দেখব।”

অর্ণব যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে, অরূপ শব্দ তুলে বলল, “আমি চাইছিলাম, মিঠি ভাবী ফের এই ঘরে আসুক। আগের পরিচয়েই।”

পা থামিয়ে পিছনে ফিরল অর্ণব। ভাই, ভাইয়ের বউ, বাবা ও মা, সবাইকে একনজর দেখে বলল, “আবারও ড্রামা সাজাতে চাইছ তোমরা?”

অরূপ দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল, “মিঠি ভাবীর সিচুয়েশন তুমি জানো না ভাইয়া। উনি খুব পেরেশানি ও ভয়ে আছেন। আমার মনে হয়, তুমি তার পাশে থাকলে তার সব ভয় ও পেরেশানি কেটে যাবে।”

“তোকে বলেছেন উনি এইরকম কথা?”

“বলেননি, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম।”

“গুড! মানুষকে বুঝতে শেখার গুণটা থাকা ভালো, কিন্তু কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি রকমের চিন্তা মাথায় ঠাঁই দেয়া উচিত না। উনি কি তোকে বলেছেন, আমাকে তার পাশে দরকার? বলেননি নিশ্চয়ই! যেহেতু উনি নিজে মুখফুটে ওনার প্রবলেমটা তোকে জানাননি, সেখানে তোর এই বাড়াবাড়ি করা সাজে না। এতে উনিও লজ্জায় পড়বেন, আমিও।”

রওনাফ সাহেব এতসব প্যাঁচে না গিয়ে ছেলের মত জানতে বললেন, “এত কথার দরকার নেই। জরুরী যেটা, সেটা শোন। তুই চাইলে আমরা আবার প্রস্তাব রাখতে পারি। ধর্মীয় ও সামাজিক দিক থেকে এই বিয়ে হতে কোনো ধরনের বাধা যেহেতু নেই…।”

“ব্যস…।”

হাত উঠিয়ে বাবাকে থামিয়ে দিল অর্ণব। এরপর আগুন গরম চোখে বলল, “অনেক নাটক হয়েছে। বিয়ে, সংসার, সম্পর্ক এসব নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর প্যারা দিয়ো না। হ্যাঁ, ওই মানুষটার ইমোশন, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং তার সিদ্ধান্তের পর্যাপ্ত মূল্য আমার কাছে ছিল বলেই, আমি কোনোদিকে তাকাইনি। তোমাদের অন্যায়, অনাচার সবটাই মুখবুঁজে সহ্য করেছি যেন লোক হাসাতে না হয়। তার জন্য তোমাদের এবং তোমাদের জন্য তাকে, কাউকেই যেন কোনোপ্রকার বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়! এরপরও যদি ওই মানুষটাকে ঘিরে কিঞ্চিৎ দায়িত্ব ও সম্মানবোধ তোমাদের মধ্যে থাকত, আমাকে ডিভোর্সের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না। যে সম্পর্ক একবার ভেঙে গেছে, সমাজ ও ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে আর জোড়া লাগানোর মতো ফালতু চেষ্টা করো না। দ্বিতীয়বার আমি নিজের ইমোশনকে অসম্মানের মুখে ফেলতে পারব না।”

অরূপ বুঝানোর জন্য বলল, “কিন্তু ভাইয়া, তখন পরিস্থিতি একটু জটিল ছিল! এখন যেহেতু আম্মা নিজেও চাইছেন…।”

“রিয়্যালি? আম্মা চাইছেন? তুই ভালো করে জিজ্ঞেস করে দেখ তো, উনি সত্যিই মিঠিকে এই ঘরে চান কি না!”

দিলারা জামানের চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। তিনি এবার মিঠিকে নয়, মিঠির ঘুরে দাঁড়ানোর যোগ্যতাকে ছলেবলে কৌশলে ব্যবহার করতে চাইছিলেন! কিন্তু এইভাবে ছেলের সামনে মোটেও নিজেকে অপদস্ত হতে দিবেন না বলেই বললেন, “কেন চাইব না বাবা?”

অর্ণব অবাক করা কণ্ঠে বলল, “ওমা, তুমি তো ঘরণী চাও। ভুলে গিয়েছ? মিঠি এমন মেয়ে নয় আম্মা। উনি কিন্তু স্ট্রাগল করে এই অবধি এসেছেন শুধু নিজেকে একটা শক্ত স্থানে দাঁড় করানোর জন্য। একদম তোমার চাওয়ার বিপরীত। এখন তো মিঠি তোমার ঘর দেখবে না। কোনো ধরনের অপমান সহ্য করবে না। যে মেয়ে একবার নিজের যোগ্যতা ও সাহসিকতা দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, একটা অমানুষকে পুলিশের ভয়ের ওপর রেখেছে, সে এবার তোমার ওই বটি নিয়ে ফালতু অভিনয়ের দিকে তাকাবেই না। উলটে সামনে দাঁড়িয়ে বলবে কী জানো, আপনি গলায় বটি চালান, আমি বসে বসে দেখি! এমন একটা মেয়েকে আবার ঘরে তুলবে?”

দিলারা জামান ভয় পেয়ে দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ও এখন এইসবও করে?”

“হ্যাঁ, করতে বাধ্য হয়। কারণ এখন আর অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করে বাঁচার দিন নেই। এখন সময় পাল্টেছে৷”

“কিন্তু বাবলা…।”

“শোনো আম্মা, এই বিয়ে নামক মানসিক অশান্তি দিয়ে বাবলাকে তুমি অনেক আগেই মেরে ফেলেছ। এখন যে আছে, সে স্রেফ একটা রোবট মাত্র। যার কাছে কাজের আগে কিছু না। ফ্যামিলির আগে কিছু না। এরজন্য অবশ্য তুমি একা দায়ী নও। কিছুটা দায়ী আমি নিজেও। তাই সবাইকে বলব, আমাকে আর এই ধরনের অনুরোধ তোমরা করো না। আমি কারও অনুরোধ রাখতে পারব না।”

অনেকক্ষণ সবার কথা শোনে মুনীরা এবার মুখ খুলল। বলল, “ভাইয়া, আপনি একবার অন্তত নিজের জন্য ভাবুন। অনেক তো সবার কথা ভাবলেন। নিজেকে কি সুখী দেখতে ইচ্ছে করে না আপনার?”

অর্ণব প্রশ্রয়ের হাসি হেসে মুনীরাকে একনজর দেখল। তার আম্মা এই মুনীরাকেও সারাদিন অত্যাচারের ওপর রেখেছেন। পড়াশোনা ও শিক্ষকতা নিয়ে এখনও কম প্যারা দেন না। কিন্তু মুনীরা ভীষণ ধৈর্য্যশীল এবং বুদ্ধিমতী। স্বামী, সংসার ও শাশুড়ি সবকিছুকেই সে আয়ত্তে আনতে পেরেছে নিজ চেষ্টা ও গুণ দিয়ে। এজন্য মুনীরার দিকে এখন উচ্চবাচ্য তিনি কম করেন। তাছাড়া তাকে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিলেও সে ভয় পায় না। উলটে কটমট চোখে চেয়ে উত্তর দেয়, ‘আমার স্বামীকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাব না।’ ওর এই সাহসিকতা ও যথাসময়ে উচিত জবাব দেয়ার ধরনটাই ভালো লাগে অর্ণবের৷ মেয়েটির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জন্মায়। সে নিজেকে যেমন বুঝে, সম্পর্ককেও বুঝে। বিয়ে নামক বন্ধন তো এমনই হওয়া উচিত!

ভাবনা থামিয়ে মুনীরার কথার উত্তরে অর্ণব বলল, “তোমরা ভালো আছো, সুখে আছো জানলে আমিও সুখী হব। আমার জন্য চিন্তা করো না।”

***

অরূপ মিঠির পরিস্থিতি জেনে ফাতেহা বেগমকে ভরসা দিয়ে বলেছিল, এবার সে কিছু একটা করবে। প্রয়োজনে অর্ণবকে বুঝাবে। গতকাল রাতেই মেয়েকে তিনি সেসব কথা জানালে, রেগেমেগে ব্যোম হয়ে গেল মিঠি। তড়িঘড়ি ফোন করল অরূপকে। রিসিভ্‌ হতেই বলল, “আম্মুকে কী বলেছেন আপনি?”

অর্ণব তখনও ঘরেই আছে। মুনীরার অনুরোধে রাতের খাবার খেতে বসেছে। এমন সময় এই ফোন অরূপকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিল। সবার অলক্ষ্যে বাইরে এসে বলল, “আমি আসলে ভাইয়া ও আপনার কথা ভেবেই…।”

“আমি বলেছি আপনাকে ভাবতে?”

“না কিন্তু… ভাইয়াকে কোনোভাবেই বিয়ের জন্য রাজি করানো যাচ্ছে না। তাই একটু চেষ্টা করছিলাম আরকি, যদি কোনোভাবে…।”

“শুনুন ভাই, আমি আপনার ভাইয়ের কাছে অপরাধী আর নিজের পাগলামি এবং ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট লজ্জিত। জীবনের এতগুলো বছর পর আমি এখন উপলব্ধি করতে পারি, ঘর-সংসার নামক বন্ধনটা আমার জন্য নয়। সময় অনেক পাল্টেছে ভাই। পাল্টেছি আমিও। যে ঘরকে আমি নিজের ঘর ভাবতে পারিনি, যে মানুষগুলোকে আপন ভাবতে পারিনি, যে ঘরে সম্মানের সাথে নিজের মত প্রকাশ করতে পারিনি, সে ঘরে আবারও সম্মান পাব, এই ভুল ভাবনাটাকে মনে ঠাঁই দিতে পারি না। আর আমি এটাও চাই না, সংসার নামক বন্ধনে আবারও জড়াই। আপনি প্লিজ, এসব নিয়ে আমাকে এবং আপনার ভাইকে কোনো ধরনের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবেন না।”

“কিন্তু ভাবী…।”

“আবার ভাবী?”

“আসলে…।”

“কোনো আসলে-নকলে নাই। আপনি এসব নিয়ে আর কথা বলবেন না, এটাই আমার শেষ কথা। এরপরও যদি আপনি বাড়াবাড়ি কিছু করেছেন, আমি গ্রামের দশজন মুরব্বি ডাকতে বাধ্য হব।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনারা না চাইলে আমি জোর করার কে! কিন্তু কেন চান না, সেটা কি একবার বলবেন?”

এখন আর ভাবী উচ্চারণ করলেন না অরূপ। মিঠি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “জীবন নিয়ে অভিজ্ঞতা কম হয়নি ভাই! ঘর-সংসারের মায়া কাটিয়ে উঠেছি এখন। তাছাড়া যে মা সন্তানকে ডিভোর্স করিয়ে দিতে গলায় বটি তুলতে পারে, সেই মা আবারও গলায় বটি তুলবে না তার কি গ্যারান্টি? আমি মূলত কোনো ধরনের মানসিক অশান্তি আর চাই না। কারও দয়া ও করুণায় বাঁচতে চাই না। এমনকি আমার জন্য আপনাদের পরিবারে ঝামেলা হোক এটাও চাই না। রাখছি, ভালো থাকবেন। এসব নিয়ে আর কথা না বাড়ালেই ভালো।”

***

রাতের খাবার আনতে বাজারে গিয়েছিল মিঠি। এখানে যেহেতু থাকবে না, রান্নাবান্না নিয়ে ঝামেলা করার দরকার নেই। তাই দুটো মানুষের জন্য অল্পস্বল্প খাবার কিনে নিয়েছে। রাতটা কেটে গেলে সকালেই রওনা দিবে। কিন্তু কপাল, এই রাতটাও যেন দীর্ঘ হওয়ার নাম নিয়েছে আজ। বলা নেই, কওয়া নেই, হুট করেই, পথিমধ্যে হঠাৎ অর্ণবের সাথে দেখা হয়ে গেল। মাত্রই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছে সে।

অর্ণব তাকে দেখে অবাক হলো না, তবে মিঠির মিথ্যে কথাগুলো মনে পড়ায় হাসি পেল খুব। সময় পাল্টানোর সাথে সাথে মিঠি এখন শুধু সাবলম্বীই হয়নি, যথেষ্ট আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারীতে পরিণত হয়েছে। তাই নিজের বর্তমান অবস্থান ও ভালোবাসা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার পর, অর্ণবকে দেখে নিজেকে দুর্বল করতে চায়নি এবং কারও সামনে নিজেকে করুণার পাত্রী সাজাতে চায়নি। মিঠির বাচ্চামো ও পাগলামোর পর তার এই নিজেকে শক্ত ও সাহসী রাখার ব্যাপারটা ভালো লেগেছে অর্ণবের। সেইসাথে সে এটাও বুঝেছে, মিঠি অনেক পাল্টেছে।

রাস্তাটা ছোটো। অর্ণবের গাড়িটাই সম্পূর্ণ রাস্তা জুড়ে দেয়াতে মিঠি আটকে গেছে রাস্তায়। সমাধান অর্ণবই দিল। গাড়িটা সামান্য পিছিয়ে মিঠির সামনের পথ সহজ করে দিল। মিঠি শুধু সৌজন্যবোধ থেকে হাসল সামান্য। পালটা হাসল অর্ণব। কে জানে, এটাই হয়তো তাদের শেষদেখা!

অর্ণব গাড়ি বড়ো রাস্তার দিকে এগোতে চাইলে, মিঠি পাশ থেকে বলল, “পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।”

ভ্রু কুঁচকে অর্ণব বলল, “কেন?”

“আমি শুধু আপনার সাথে অন্যায় করেছি বললে ভুল হবে, আপনার গোটা জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছি। আপনি এরজন্য কাকে দায়ী করবেন জানি না, কিন্তু আমার নিজেকেই দোষী মনে হয়৷ একে তো পবিত্র সম্পর্ককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি, সেইসাথে আপনার কাছ থেকে এত এত উপকার নিয়ে বিনিময়ে দিয়েছি শুধু মানসিক যন্ত্রণা। সত্যি বলতে সম্পর্কের প্রতি মায়া জন্মালেও আপনাকে ভালোবাসা হয়ে উঠেনি। যার কারণে…! সেদিন যদি নুহাশের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার সাহস করতাম, হয়তো আপনার জীবনটা বেঁচে যেত।”

“আমি কিছু মনে রাখিনি।”

“যদি তাই হয়, এবার অন্তত নিজের জন্য ভাবুন।”

অর্ণব উল্টোদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলে মিঠি বলল, “আল্লাহ হাফেজ!”

উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে মিঠিকে পিছনে রেখে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনে এগোলো অর্ণব। আস্তেধীরে ড্রাইভ কন্ট্রোল করে বড়ো রাস্তায় উঠল। এরপর স্পীড বাড়িয়ে ক্রমশ দূরে চলে যেতে যেতে মনে মনে বিড়বিড়াল, “পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়েও শুনতে হয়, আমার মতো পুরুষের জন্যই না কি মেয়েরা কোত্থাও নিরাপদ নয়। ভীষণ হাস্যকর। আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি মিঠি। কিন্তু সেদিনের সেই কথা আজও ভুলতে পারিনি! হয়তো কোনোদিন ভুলতে পারবও না৷ হয়তো নিজেকে কোনো মেয়ের নিরাপদ আশ্রয় ভাবতে পারব না। হয়তো কারও ভরসার হয়ে উঠতে পারব না৷ তাই ঘর-সংসার আমার হবে কি না, এর নিশ্চয়তাও নেই। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পাওয়ার তাড়নাও নেই আর। আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা-সম্মান ও মায়া আছে, তবে ইগোর কাছে ভালোবাসাটা বোধহয় ফিকে হয়ে গেছে।”

বাসায় এসে অর্ণব লাগেজে কাপড়চোপড় ভরে, কিছু দিনের জন্য লাপাত্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হসপিটালে জানাল, জরুরী ভিত্তিতে নেটওয়ার্কের বাইরে যাচ্ছে। ফিরে এসে জয়েন করবে। এরপর ফোন সুইচড অফ করে আবারও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অজানার উদ্দেশ্যে। যেখানে সংসার নেই, অশান্তি নেই, কোলাহল নেই, তেমনই একটা গন্তব্যে!

***

রাঙামাটি জেলার একটা বড়ো হসপিটাল থেকে রোগী দেখে বের হচ্ছিল মহিলা ডাক্তার হিয়া মুনজারীন। সে এখানকার একজন নিয়মিত ডাক্তার। কানাডা থেকে দেশে ফিরে নিজের আপন শহরে রোগীদের সেবাশুশ্রূষা দেয়ার দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন নিচু পেশার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে সে।

প্রতিদিনের মতো আজও একজন সি-সেকশনের রোগীকে দেখে, মাত্রই রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দা থেকে নেমে নিচে এসেছিল। এরমধ্যেই হুলস্থুল কাণ্ড শোনে ইমার্জেন্সির দিকে ছুটে এলো। স্ট্রেচারে একজন পেশেন্টকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে না চাইতেও কাছে এসে দাঁড়াল৷ অমনি হিয়া যেন হাজার ভোল্টেজের শক খেল। সমস্ত শরীর দুলে উঠল তার। ওখানেই থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকল সে।

মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে, হিয়া নার্সের কাছে জানতে চাইল, “ওনাকে কোথায় পেয়েছ?”

“রাস্তায় একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, ম্যাম। বাস উলটে খাদে পড়ে গেছে। তবে একটা প্রাইভেট কারে বসে থাকা এই পেশেন্টকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।”

“জলদি ট্রিটমেন্ট শুরু করো।”

“কিন্তু ম্যাম, ওনার তো গার্ডিয়ান কেউ নেই।”

“গার্ডিয়ানের দরকার নেই। আগে ট্রিটমেন্ট শুরু করো। ইমার্জেন্সিতে কোন ডক্টর আছেন?”

“ডক্টর রয়।”

হিয়া নিজেও নার্সের সাথে স্ট্রেচার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। জখমটা কতটুকু এখনও স্পষ্ট নয়, তবে সমস্ত শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। কাটাছেঁড়া সব জায়গায় ট্রিটমেন্ট দেয়া শেষ হলে রোগীকে একটা কেবিনে শিফট করা হলো। ডিউটির সময় পেরিয়ে গেলেও হিয়া বাড়ি ফিরল না। রোগীর পাশের একটা চেয়ারে বসে ঝিমুতে লাগল। এখনও তার কাছে সব অস্পষ্ট!

রোগীর জ্ঞান ফিরল আরও ঘণ্টাখানেক পর। চোখ মেলে অস্ফুটস্বরে শব্দ করতেই হিয়া ঝড়েরবেগে ছুটে এলো সামনে। বেডের কিনার দিয়ে লটকে পড়া হাতটা সোজা করে বুকের কাছে রাখল। ব্যান্ডেজযুক্ত কপালের একপাশে ধীরস্থিরভাবে হাত বুলিয়ে ডাকল, “আ’রাফি, শুনতে পাচ্ছিস? এখন ঠিক আছিস না? কোথায় কষ্ট হচ্ছে, ঠিক করে বল তো!”

কর্ণকুহরে আ’রাফি ডাক প্রবেশ করে মস্তিষ্কে প্রবল ধাক্কা মারলে ব্যথাতুর চোখদুটো টেনে খুলল অর্ণব। একটা নিষ্পাপ হাসি ও একজোড়া চশমা পরিহিত মায়াবী চোখ দেখে নিজের চোখদুটোকে ভালোমতো ঘষে নিয়ে বলল, “মুন… তুই! এখানে…। আমি কোথায়?”

হিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাসল সামান্য। এরপর বলল, “যাক, হুঁশ আছে তাহলে। আমি তো ভেবেছি, বাংলা সিনেমার মতো স্মৃতিশক্তি গেল বোধহয়।”

কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেলল অর্ণব। একটু স্থির হলো। তারপর বলল, “দেশে ফিরলি কবে?”

“লাস্ট ইয়ারে।”

“আমাকে জানাসনি যে!”

হিয়া সে কথা শুনেও না শুনার ভান করে বলল, “তোর বাড়ির ঠিকানা দে তো! ফোন করে জানাই। এতদূরে এসে কেউ এমন করে দুর্ঘটনা ঘটায়? আমি তো জানতাম, তুই খুব ভালো ড্রাইভ করিস। তাহলে এমনটা হলো কী করে?”

অর্ণবও এত কথার উত্তর দিল না। শুধু বলল, “কয়েকটা দিন আমার এখানেই থাকার ব্যবস্থা কর মুন। তোর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আর কোথাও এই নিয়ে নিউজ করার দরকার নেই। আমার বাড়িতেও খবর পাঠানোর দরকার নেই। আমি কিছুদিন নিজের মতো থাকতে চাই। একদম একলা।”

হিয়া সন্দিহান চেহারায় প্রশ্ন ছুঁড়ল, “হয়েছেটা কি, আ’রাফি? তোকে আমি এত বছর ধরে চিনি৷ কখনও তো এত অসহায় মনে হয়নি। তবে, আজ কেন?”

অর্ণব চোখ বন্ধ করে গভীর করে শ্বাস টেনে বাইরে তাকিয়ে রইল। হিয়া বুঝল, অর্ণব কোনো কথার উত্তর দিবে না। আগেও দিত না। যা কিছুই হোক, এই ছেলেটাকে এমন বিষণ্ণ চেহারায় দেখতে ভালো লাগছে না। অর্ণবকে নিশ্চুপ দেখে সে-ও আর কিছু জানার আগ্রহ দেখাল না। চুপটি করে পাশে বসে রইল। তার ঠোঁটে হাসি কিন্তু মনের কোণে অসংখ্য প্রশ্নের মেলা! সেইসাথে ভাগ্যের এই অদ্ভুত খেলা। যে মানুষ একবার হারায়, তারও যে দেখা পাওয়া সম্ভব, এটা কি ভেবেছিল আগে?

পিছনের কথা মনে করে হিয়া গুনগুনিয়ে গান ধরল,
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে…
কুড়ায়ে ঝরা ফুল একেলা আমি,
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায়!
সুখের স্বরগ হইতে নামি…। (নজরুলগীতি)

***

সমাপ্ত…